আলোর পথযাত্রী - বিতস্তা ঘোষাল
আলোর পথযাত্রী
বিতস্তা ঘোষাল
“ছোটোগল্প হচ্ছে একজন লেখকের ফার্লং। অনেকগুলো ফার্লং পেরিয়ে গেলেই তবে একটি মাইলস্টোনের সন্ধান পান লেখক। মাইলস্টোন মানে একটি উপন্যাস। উপন্যাসেই একজন লেখকের সিদ্ধি। কিন্তু তাঁকে তো জীবনভর পার হতে হয় বহু ফার্লং…”
ভাষা সংসদ থেকে প্রকাশিত আলো হাতে সেই মেয়েটি গ্রন্থের ভূমিকায় জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক তপন বন্দ্যোপাধ্যায় এ কথাগুলি লিখেছিলেন। কথাগুলির মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের দর্শন। শোনা যায়, তিনি চেয়েছিলেন কবি হতে; কিন্তু নিয়তি তাঁকে নিয়ে এল গল্প ও উপন্যাসের জগতে। প্রায় পাঁচ দশকের সাহিত্যসাধনায় তিনি লিখেছেন পাঁচশোরও বেশি ছোটোগল্প এবং প্রায় একশোটি উপন্যাস। পাশাপাশি প্রকাশিত হয়েছে অনুবাদ, কবিতা, স্মৃতিকথা, ভ্রমণকাহিনি ও প্রবন্ধগ্রন্থ।
তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় অবশ্য লেখক হিসেবে, অনেক ছোটবেলা থেকেই। সম্ভবত নয়-দশ বছর বয়সে। বাবার সূত্রে আমাদের বাড়িতে নিয়মিত আসত নানা পত্রপত্রিকা ও সংবাদপত্র। দেশ পত্রিকা এলেই সেটি প্রথমে আমার হাতেই তুলে দেওয়া হতো। আজকের দিনে ক্লাস থ্রি বা ফোরের একটি শিশুর হাতে হয়তো আনন্দমেলা, কিশোর ভারতী কিংবা শুকতারা তুলে দেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের বাড়ির পরিবেশ ছিল একেবারেই অন্যরকম। সেখানে ছোটদের বই আর বড়দের বই—এমন কোনো বিভাজন ছিল না।
ক্লাস টু-তেই আমি পড়ে ফেলেছিলাম টারজান অমনিবাস। বইটি এতটাই প্রিয় ছিল যে, পরীক্ষার আগে পড়ার বইয়ের বদলে সেটিই খুলে বসতাম। মনে হতো, প্রশ্ন বুঝি সেখান থেকেই আসবে, আর আমি গড়গড় করে লিখে দেব! দাদু মাকে প্রায়ই বলতেন, “যেদিন দেখবি মেয়ে কোনো ছেলের হাত ধরে পড়াশোনা না করে পালিয়েছে, সেদিন বুঝবি এই বয়সে এসব বই হাতে তুলে দেওয়ার ফল।” আবার আমার উদ্দেশে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী ছিল—আমি যদি মাধ্যমিক পাশ করি, তবে তিনি নিজের নাম বদলে ফেলবেন!
বাবাকে একদিন এই গল্প বলতেই পরদিন তিনি আমার হাতে তুলে দিলেন টলস্টয়ের War and Peace, শ্রীঅরবিন্দের Savitri এবং আলেকজান্দ্র দ্যুমার The Three Musketeers। ফলে শরৎ রচনাবলি বা দেশ পত্রিকা পড়ার ওপর আমাদের কখনও কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না।
এই দেশ পত্রিকাতেই প্রথম পড়ি তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা। আর তখন থেকেই তাঁর গদ্য আমাকে আকৃষ্ট করে। কারণ, তাঁর ভাষা ছিল সহজ, সাবলীল, অপ্রয়োজনীয় জটিলতামুক্ত। পরে যখন গোয়েন্দা গল্পের নেশা চেপে বসল, তখন তাঁর সৃষ্ট গোয়েন্দা গার্গীরও একনিষ্ঠ পাঠক হয়ে উঠলাম।
তখনও অবশ্য সম্পর্কটি ছিল নিছক লেখক ও পাঠকের। যে তিনি অনুবাদ পত্রিকা-য় একাধিক উল্লেখযোগ্য অনুবাদ করেছেন, তা আমার জানা ছিল না। তাঁর কবিতাও তেমন পড়া হয়নি, যদিও তিনি নিজে প্রথম জীবনে কবিই হতে চেয়েছিলেন।
সত্তরের দশকের শেষদিকে তিনি গদ্য লেখা শুরু করেন। প্রথমে উপন্যাস, পরে ছোটোগল্প। ১৯৭৯ সালে সমতট পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্প ‘হরিণের মাংস’। আশির দশক থেকেই তিনি নিয়মিত গল্প ও উপন্যাস লিখে চলেছেন।
নিজের জন্ম, শৈশব ও সাহিত্যজীবনের সূচনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তপন বন্দ্যোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে লিখেছেন—
“জন্ম সাতক্ষীরার কলারোয়া থানায়। জন্মের দু’মাস আট দিন পর ভারত স্বাধীন হয়। তখন ঠাকুর্দা তিনটি গরুর গাড়িতে বিছানা-বালিশ আর প্রয়োজনীয় কিছু আসবাবপত্র নিয়ে প্রায় সর্বস্বান্ত অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। আরও দুটি উদ্বাস্তু পরিবারের সঙ্গে ইছামতী নদীর তীরে একটি পতিত জমিতে নতুন করে বসতি গড়ে ওঠে।
পৃথিবীকে চিনতে শেখার পর দেখেছি, ছয়চালা একটি কাঁচা ঘরই আমাদের সব। গরান কাঠির বেড়া, মাটি লেপা দেওয়াল, হোগলার ছাউনি। বসিরহাট মহকুমার বাদুড়িয়া গ্রামেই কেটেছে আমার শৈশব, কৈশোর এবং স্কুলজীবন। পরে কলেজে পড়তে কলকাতায় আসি। আবার সাত মাসের জন্য সেই বাদুড়িয়াতেই শিক্ষকতা করতে ফিরে যাই। তারপর ব্যাংকের চাকরি নিয়ে স্থায়ীভাবে কলকাতায়।”
সাহিত্যচর্চার শুরুটাও তাঁর জীবনে খুব ছোটবেলাতেই।
তিনি লিখেছেন—
“ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময় থেকেই সাহিত্যের হাতেখড়ি। ঠাকুমা রূপকথার গল্প শোনাতেন। সেগুলো শুনে খুব অনুপ্রাণিত হতাম। আবার কিশলয় পড়ে মনে হতো, এমন কবিতা তো আমিও লিখতে পারি।
একদিন প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। আমি তখন ক্লাস টু-য়ের ছাত্র। হোমওয়ার্ক করতে করতে হঠাৎ লিখে ফেললাম চার লাইনের একটি ছড়া—
বৃষ্টি পড়ে ঝমঝম,
চলল গাড়ি টমটম,
পথে উঠল একজন মন্ত্রী,
সঙ্গে যতেক যন্ত্রী।
‘যন্ত্রী’ শব্দটি যে একেবারেই বেমানান, তা এখন বুঝি। কিন্তু তখন ‘মন্ত্রী’-র সঙ্গে আর কী শব্দ মিলবে, খুঁজে পাইনি।
বাবা তখন কর্মসূত্রে দূরে থাকতেন। পাঁচ-ছ মাস, কখনও বা বছর ঘুরে দেখা হতো। আমি থাকতাম ঠাকুর্দা-ঠাকুমাদের কাছে। কয়েকটি ছড়া লেখার পর যখন ভাবতে শুরু করেছি আমি বুঝি কবি হয়ে গেছি, তখন বাবা এসে আমাকে একটি ছোট্ট ডায়েরি দিয়ে বললেন—পড়ার খাতায় নয়, এই ডায়েরিতে লিখবে। সেই থেকেই শুরু।”
এই ‘শুরু’ই পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ লেখকের জন্মলগ্ন হয়ে উঠেছিল।
আমার সঙ্গে তাঁর সরাসরি পরিচয় ২০০৫-০৬ সাল নাগাদ। ‘একান্তর’ পত্রিকার সম্পাদক অরূপ আচার্যের মাধ্যমে, তাঁর এক অনুষ্ঠানে। তখন আমি সবে লেখা শুরু করেছি। পরিচয় হওয়ার পর বললেন, “আপনার লেখা পড়েছি, সান্ধ্য প্রতিদিনে। আপনার গল্পের হাত বেশ ভালো।” একজন নতুন লেখকের কাছে এর থেকে বড়ো প্রাপ্তি কী-ই বা হতে পারে!
এরপর বলা বাহুল্য, তাঁর সঙ্গে একটা মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠল। একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিলাম, মানুষটা অন্য লেখকদের থেকে অনেকটাই আলাদা। কোনো দল নেই তাঁর, অথচ প্রত্যেকেই তাঁকে শ্রদ্ধা করেন ও ভালোবাসেন। এবং তিনিও নতুন-পুরোনো সকলকেই খুব আপন করে নিতে পারেন। এই যে বৈশিষ্ট্য, এটাই আমাকে মুগ্ধ করেছিল।
তাঁর লেখকজীবনের কোনও শর্টকাট নেই। আছে কেবল নিরলস অধ্যবসায়। এবং তাই ব্যাঙ্কে চাকরি করার সময়ই জ্যোতির্ময় দত্তের এই উক্তিতে “এই যে তোমরা ব্যাঙ্কের চাকরি করো, ভেতরে কী ঘটে আমরা জানতে পারি না। আমরা স্রেফ চেক জমা দিই, আর টাকা পাই। তুমি ভেতরের কাণ্ডকারখানা জানো। তুমি এই অভিজ্ঞতা এবং তোমার ছেলেবেলা থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত যে জীবন—তা মিলিয়ে-মিশিয়ে একটা গদ্য লিখে আমাকে দাও।”
এই দাবিতে কবিতা ছেড়ে, জ্যোতির্ময় দত্ত বলেছিলেন—“অতএব লিখতে হবে।”
এই ভাবনায় ব্যাঙ্কের যে টিফিন আওয়ার্স—দুটো থেকে আড়াইটে—সে সময় ক্যাশের কাউন্টারের দরজা বন্ধ করে রোজ এক-পাতা, দু-পাতা করে লিখতে থাকলেন। লেখা শেষ হয়েছিল প্রায় চল্লিশ পাতায়!
এটাই তাঁর কোনও পুরস্কার পাওয়ার আগেই ‘কলকাতা’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রথম গদ্য—আত্মজীবনী। শিরোনাম—‘একজন সাতচল্লিশের শিশুর কাহিনী’।
জ্যোতির্ময় দত্তের সঙ্গে পরবর্তীকালে গিয়ে দেখে এসেছেন জরুরি অবস্থায় তাঁর আন্ডারগ্রাউন্ডের দিনগুলোর আস্তানা। তাই নিয়ে লিখে ফেলেন ‘আমাদের জরুরি দিনগুলি’। সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত সম্পাদিত ‘বিভাব’ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় বেরিয়েছিল সেই উপন্যাস।
এরপর এল চাকরিজীবনের বদল। ব্যাঙ্কার থেকে আমলা। এই পর্বে আমলাতন্ত্রের দাপটে সময়ের এক নাজেহাল বাস্তবচিত্র তাঁর গল্পগুলিতে ধরা পড়ল। নিয়মতন্ত্রের মধ্যে প্রতিদিনের জমতে থাকা অজস্র নিরুচ্চার প্রশ্নগুলোকে উস্কে দিয়েছে তাঁর কলম। এই গল্পগুলির মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প ‘রাজ্যপালের অসুখ’ (‘ঋতুপত্র গাঙ্গেয়’, ১৯৮৪)। সাড়া-জাগানো এই গল্পের বিষয়—কলকাতার বাইরে গ্রামীণ এলাকা পরিদর্শনে এসে রাজ্যপালের ‘একটু ক্লান্তি’-র জন্য গোটা প্রশাসন কীভাবে অকারণ নাকাল হয়েছিল, তারই বর্ণনা।
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কাকদ্বীপ, পাথরপ্রতিমা, সাগরদ্বীপ এলাকা পরিদর্শনে এসেছেন বৃদ্ধ রাজ্যপাল। তিন-তিনটি মিটিং সেরে পাঁচ-ছ গ্লাস জল খেয়ে ফেলেছেন। দুপুরের রান্নাও জুতসই হয়নি। রাতে বাংলোয় খাবার সময় তিনি শুধু বলেছিলেন—
“বহুত তকলিফ হুয়া।”
এতেই টেনশন শুরু হয়ে যায় তাঁর পারিষদ এ.ডি. কং-এর। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ডি.এম.-কে ডাক্তারের ব্যবস্থা করতে বলেন।
জিপ ছুটে গিয়ে এলাকার একমাত্র ডাক্তারকে ধরে আনল ভাতের থালার সামনে থেকে। রাজ্যপালের বিরক্তিতে ঠিকমতো পরীক্ষাও করতে পারলেন না। শুধু নাড়িটা ধরেছিলেন। স্পেশালিস্ট আনার পরামর্শ দিলেন।
রাজ্যপালের সঙ্গে যে বিরোধী দলের এম.পি. এসেছিলেন, তিনি—
“Arrange for bringing a specialist from Calcutta.”
বলে পাশের ঘরে ঘুমোতে চলে যান।
এরপর ডি.এম. বি.ডি.ও.-কে, বি.ডি.ও. ও.সি.-কে, ও.সি. ওয়্যারলেস অপারেটরকে ধমক-ধামক দিয়ে কলকাতায় খবর পাঠান।
খবর আসে—
“স্পেশালিস্ট টিমও রেডি। অর্থোপেডিক্স, নিউরোলজিস্ট, কার্ডিওলজিস্ট, ই.এন.টি.—কিন্তু একজন স্পেশালিস্ট এখনও এসে পৌঁছোননি। তিনি ডেন্টিস্ট।”
আবার খবর আসে — “সি.এম.-কে জানানো হয়েছে। গভর্নর অসুস্থ জেনে চিফ মিনিস্টার খুবই অ্যাংশাস। কীভাবে উনি অসুস্থ হলেন, তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে ডি.এম. যেন এখুনি রিপোর্ট পাঠান।”
রাজ্যপালের হোম সেক্রেটারি পনেরো মিনিট ছাড়া-ছাড়া খবর জানতে চান। তিনি ডি.এম. এবং এস.পি.-র উপর বিরক্ত। সবাই সন্ত্রস্ত। চাকরি হারানোর ভয়।
“সবাই উৎকণ্ঠায় টানটান। ঘরের ভেতর রাজ্যপাল কেমন আছেন বোঝা যাচ্ছে না।”
ডাক্তাররা একসময় এসে পৌঁছলেও ঘুমন্ত রাজ্যপালের ঘরে ঢুকতে পারছেন না।
একসময় রাজ্যপালের ঘরে আলো জ্বলল। ঢকঢক করে জল খাওয়ার শব্দ।
“সুযোগ বুঝে এ.ডি. কং দরজায় ঝুঁকে পড়ে বলল, ‘স্যার, আপনি কি জেগেছেন?’
ঘুমচোখে দরজা খুলে রাজ্যপাল অবাক হলেন—‘আপ সব হিঁয়া কিঁউ রহতা হ্যায়? যাও, যাও, শো যাও।’”
ডঃ মাত্রে শরীরের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন — “সাম কো বুক মে কুছ দরদ হুয়া, লেকিন অভি সব ঠিক হ্যায়।”
এতে ভয় পেয়ে যান ডাক্তাররা। ভোরেই শিফট করতে হবে। গাড়িতে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করতে হবে।
সরকারি হেলিকপ্টার গৌহাটি গেছে আসামের মুখ্যমন্ত্রীকে লিফট দিতে। গৌহাটিতে যোগাযোগ করে জানা গেল, সেটি দিল্লি গেছে—একটা ফল্ট ধরা পড়েছিল, তা সারাতে।
হেলিকপ্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করা গেলেও তা এসে নামবে কোথায়?
ডি.এম. নির্দেশ দিলেন, এক ঘণ্টার মধ্যে হেলিপ্যাড তৈরি করতে।
বি.ডি.ও. ছুটতে ছুটতে গেলেন পি.ডব্লিউ.ডি.-র ইঞ্জিনিয়ারের কোয়ার্টারে।
ইঞ্জিনিয়ার ঘুম থেকে উঠে বলেন — “এস্টিমেট করতে হবে, টেন্ডার ডাকতে হবে, কনট্রাক্টরকে ওয়ার্ক-অর্ডার দিতে হবে। সে অনেক হ্যাপা।”
অনেক চেষ্টা-চরিত্র করে ভোরবেলা হেলিপ্যাড তৈরি হল। খড় পাওয়া মুশকিল। খড়ে আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া বেরুলে তবে হেলিকপ্টার নিশানা বুঝতে পারবে।
ও.সি. ছুটে গিয়ে এক গরিবের কুঁড়েঘরের চাল থেকে খড় ছিঁড়ে আনলেন।
রাজ্যপাল ততক্ষণে ঘুম থেকে উঠে বাইরে এসেছেন। সাগরদ্বীপ যাওয়ার প্রোগ্রাম আজ। সে কথা বলে মর্নিং ওয়াকে বেরোলেন।
“ফির ন’ বাজে সাগরদ্বীপ।”
রাজ্যপালের পিছু পিছু এ.ডি. কং চললেন মর্নিং ওয়াকে।
আর তখন গোঁ-গোঁ শব্দে আকাশ কাঁপিয়ে হেলিকপ্টার এসে পৌঁছচ্ছে দিল্লি থেকে। ওদিকে খড়ের চাল ভেঙে খড়ে আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়ার সিগন্যাল দিচ্ছেন ও.সি.।
এ গল্প তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে। এই ঘটনা তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। বাস্তব অবস্থার কথা না ভেবে উঁচু পদের লোকজন তাঁর নীচের আমলাদের নির্দেশ দিয়ে কীভাবে নাকানি-চোবানি খাওয়ান, তাও প্রকাশিত এখানে।
পরবর্তীকালে এসব নানান ঘটনা নিয়েই লেখেন ধারাবাহিক ‘আমলাগাছি’, যা পরে বই হয়। এর ভূমিকায় তিনি লিখেছেন—
“…সে সময় অগ্রজ লেখকেরাও বলতেন, যা চারপাশে দেখবে, সেই বিষয় নিয়ে লেখাই শ্রেয়। তা আমাদের জীবনের একটা বড়ো অংশ কেটেছে অফিসের প্রবল ঝঞ্ঝাটের মধ্যে। একসময় ভেবেছি, সেই অভিজ্ঞতাই তো হয়ে উঠতে পারে লেখার বিষয়।
আজ থেকে চল্লিশ বছরেরও বেশি আগে কালেক্টরেটের চাকরিতে যোগদান করে শব্দটির মহিমা জেনে কিছুটা পুলকিত হইনি, তা নয়। একটু একটু করে আমলাতান্ত্রিকতার যে পৃথিবী আবিষ্কার করেছিলাম, তার মধ্যে প্রতিমুহূর্তে বিজবিজ করে যেমন টেনশন, তেমন খুঁজে পাওয়া যায় অজস্র মজার ঘটনাও।
এই চাকরির আরও একটা সুবিধে এই যে, কোনও একটা জায়গায় থিতু হতে দেয় না মহামান্য সরকার। ফলে ক্রমাগত বদলে যায় পায়ের তলার মাটি। আর বারেবারে স্থানান্তর হওয়ার কারণে এলাকার সমস্যার ধরন যেমন বদলে যায়, তেমনই রূপান্তর ঘটে অভিজ্ঞতার।
কত বিচিত্র চরিত্রের সম্মুখীন হয়ে খুঁজে পেয়েছি জীবনের নানান অর্থ। যেমন দেখা পেয়েছি আকবর বাদশাদের (পড়ুন মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের), সান্নিধ্য পেয়েছি অসংখ্য ব্যুরোক্র্যাটের, তেমনই বর্ষে বর্ষে দলে দলে হরিপদ কেরানিরাও এসেছেন জীবনে, স্পর্শ করেছেন তাঁদের কলমের কালি (পড়ুন হৃদয়) দিয়ে। তাঁদের প্রত্যেকের কাছেই পেয়েছি লেখার রসদ।”
হ্যাঁ, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তপন বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন একটার পর একটা গল্প, উপন্যাস। তাঁর লেখায় প্রথমাবধি গুরুত্ব পেয়েছে অফিস-আদালত, থানা-পুলিশ, সরকারি প্রকল্প, তা নিয়ে সমস্যা, রাজনীতি ইত্যাদি।
তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য গল্প ‘প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা’। সুবর্ণরেখা-সংলগ্ন খড়িগেড়িয়্যা গ্রামের পটভূমিতে লেখা এ গল্পে প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ মানুষদের এবং আমলাদের উৎসাহের শেষ নেই। প্রধানমন্ত্রী যে পথ দিয়ে যাবেন, সেই পথের দুদিকে শালখোঁটা ও কাঁটাতার দিয়ে বেড়া দেওয়া হয়। পুলিশি ব্যবস্থা জোরদার করতে হয়।
এই রাজপুত্তুর প্রধানমন্ত্রী বাঁধা গতে চলেন না। নিজে ড্রাইভ করে গলি-ঘুঁজি রাস্তায় ঢুকে পড়েন। যেমন দুখুর বাড়িতে ঢুকে ছিলেন। আর এই দেখার চোখ দিয়েই সুন্দরবনের একশো বছরের ইতিহাস অবলম্বনে লেখা তিন খণ্ডে প্রকাশিত ‘নদী মাটি অরণ্য’ উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন রাজ্য সরকারের বঙ্কিম পুরস্কার।
পাশাপাশি সীতাকান্ত মহাপাত্রের ‘ভারতবর্ষ’ কাব্যটি মূল ওড়িয়া ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করে অনুবাদ সাহিত্যে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (২০১৯) লাভ করেন। আবার ‘বীরবল’ উপন্যাসের জন্যও পান সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। একই ব্যক্তি দু-বার, দুটি ভিন্ন বিষয়ের ওপর সাহিত্য অকাদেমি পাচ্ছেন—এ সাধারণত বিরল।
আমার চোখে তিনি শুধু একজন সাহিত্যিক হিসাবে বিরল নন, একজন মানুষ হিসাবেও ততটাই স্বতন্ত্র; যিনি পুরো জীবনটাকেই আস্ত ক্যানভাস বানিয়ে, এক-একটা কলমের আঁচড়ে—তাঁর কথায়, কী-প্যাডে—লিখে ফেলেন হাজার হাজার মানুষের জীবনের কাহিনি।



