১৪ : ঊর্ণনাভ

১৪ : ঊর্ণনাভ

This entry is part 14 of 14 in the series ঊর্ণনাভ

ঊর্ণনাভ

১ : ঊর্ণনাভ

২ : উর্ণনাভ

৩ : ঊর্ণনাভ

৪ : ঊর্ণনাভ

৫ : ঊর্ণনাভ

৬ : ঊর্ণনাভ

৭ : ঊর্ণনাভ

৮ : ঊর্ণনাভ

৯ : ঊর্ণনাভ

১০ : ঊর্ণনাভ

১১ : ঊর্ণনাভ

১২ : ঊর্ণনাভ

১৩ : ঊর্ণনাভ

১৪ : ঊর্ণনাভ

ধারাবাহিক উপন্যাস

দিপালী একটু থমকে গেল। এতক্ষণ যেন একটা ঘোরের মধ্যেই ছিল সে। যেন নিশিপাওয়া মানুষের মতো—কাকে, কখন, কোথায় কী বলছে, তার কোনো হুঁশই ছিল না। কিন্তু মালবিকা যখন করুণ, বিষণ্ন মুখে তার দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলল, দিপালীর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। যেন কেউ তাকে সজোরে ধাক্কা দিল।

মুহূর্তের মধ্যেই তার মনে হলো—ছি! এ কী করল সে! এই অবস্থায় দিদির কাছে এমন কথা বলা কি তার উচিত হয়েছে?

মাসিমাকে নিয়ে বেচারি কতটা অস্থির হয়ে আছে! বিছানায় শুয়ে মানুষটা যেন ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছেন। খাওয়াদাওয়া প্রায় বন্ধ। শরীর একেবারে অসাড়। দূর থেকে দেখলে মনে হয় মৃতদেহ পড়ে আছে। খুব কাছে গিয়ে দেখলে তবেই বোঝা যায়—গলার কাছে এখনও ক্ষীণ স্পন্দন আছে। যেন সমস্ত প্রাণটুকু ওই গলার কাছেই এসে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। যে কোনো মুহূর্তে উড়ে যাবে প্রাণপাখি।

এমন সময়ে বড় শত্রুও কাউকে আঘাত করে কথা বলে না। আর সে কিনা, দিদির এত আপন মানুষ হয়েও, হঠাৎ মাইনে বাড়ানোর কথা তুলে বসল! এর চেয়ে অমানুষিক আর কী হতে পারে?

মাইনে বাড়ানোর কথা বলার সময় তো এ ছিল না। যাই হোক, ওনার মা তো! মনের ভেতরে কী ঝড় বইছে, তা তো একমাত্র উনিই জানেন। এমন অবস্থায় সে কী করে এমন কথা বলে ফেলল?

নিজের ওপরই প্রবল রাগ হলো দিপালীর। মানুষ না পিশাচ হয়ে যাচ্ছে সে?

কয়েক দিন ধরেই দিদির মন ভালো নেই। অথচ এই মানুষটিই তো তার সব বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়িয়েছে। সংসারের ছোট-বড় সব কথাই দিদির সঙ্গে আলোচনা করে সে। ছেলের অধঃপতন দেখে যখন সে একেবারে ভেঙে পড়েছিল, তখন তো দিদিই তাকে সাহস দিয়েছিল। কত বুঝিয়েছিল, কতভাবে মন শক্ত করতে শিখিয়েছিল! সেই মানুষটাকেই আজ সে সবচেয়ে কষ্টের সময়ে আঘাত করল!

রাগের মাথায় মানুষের মুখের লাগাম থাকে না। নিজের রাগ এসে পড়ল অন্যের ওপর। যেখানে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা পায়, সবচেয়ে বেশি নির্ভরতা খুঁজে পায়, সেখানেই আবার ভুল করে ফেলল।

নিজেই যেন নিজের কাছে ছোট হয়ে গেল দিপালী।

সিঁড়িতে ঝাঁট দিতে দিতে একেবারে নিচের গেট পর্যন্ত নেমে এল সে। নিচের তলাটা এখন বন্ধ। করোনা শুরু হওয়ার পর থেকেই ভাড়াটে ছেলেটা গ্রামে চলে গেছে। কলেজে পড়ে। কবে ফিরবে, তার ঠিক নেই। তবু দিপালী প্রতিদিন ওদিকটাও ঝাঁট দিয়ে রাখে।

এত বড় বাড়ি! কত শখ করে মেসোমশাই বানিয়েছিলেন! অথচ থাকার লোক মাত্র দু’জন। নিচের ছেলেটা থাকলে তবু দিদির একটু ভরসা ছিল। রাতবিরেতে কিছু হলে অন্তত ডাকাডাকি করা যেত। এখন তো সেটুকুও নেই।

দিদির নিজেরও তো কেউ নেই। ভাইবোন নেই, কাছের আত্মীয়স্বজন নেই। দিপালীর ওপরেই কতখানি নির্ভর করেন মানুষটা!

মাসিমা তো প্রায়ই বলতেন—

—”শেষ জীবনে তোরা দু’বোন একসঙ্গে থাকিস মা। তোর ছেলে-মেয়েরা মানুষ হয়ে গেলে তোর আর কোনো পিছুটান থাকবে না। মেয়েটা আমার একেবারে একা। আপন বলতে তোদের ছাড়া আর কেউ নেই। ওর বিয়ে-থা হবে না। এই বাড়িটা তোদেরই থাকবে। আর যে ক’টা টাকা আছে, তাতে দু’বেলা শাকভাত খেয়ে কেটে যাবে।”

কথাগুলো মনে পড়তেই দিপালীর বুকটা আরও ভারী হয়ে উঠল।

সত্যিই তো, কী অপরাধ ছিল দিদির? লেখাপড়া জানা, শিক্ষিতা, সুন্দর একটি মেয়ে। অথচ ভাগ্য এমন নির্মম পরিহাস করল! এমন এক অসুখ তাকে গ্রাস করল, যার কোনো আরোগ্য নেই। শরীরে তেমন যন্ত্রণা নেই, কিন্তু সমাজের চোখে যেন সে অপরাধী। ছোটবেলায় তো এই রোগ ছিল না। হঠাৎ এই অসুখ ধরা পড়ার পর থেকেই সবকিছু পাল্টে গেল।

এসব গল্পই শুনেছে দিপালী মাসিমার মুখে। তখন তিনি সুস্থ ছিলেন। গল্প করতে খুব ভালোবাসতেন। বুড়ো মানুষ, সারাদিন চুপচাপ থাকতে কষ্ট হতো। দিপালী এলেই যেন প্রাণ খুলে কথা বলতেন।

তখনই জানতে পেরেছিল—মেসোমশাই অবসর নেওয়ার পর যে সামান্য টাকা পেয়েছিলেন, সেটাই মা-মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য রেখে গিয়েছেন। সেই সঞ্চয়ের টাকাতেই চলছে সংসার। দিদির কয়েকটা টিউশন ছিল, করোনার পর সেগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে।

কয়েক দিন আগেই দিদি বলছিল—

—”এই পৃথিবীতে আপন বলতে তোদেরই পাই, দিপালী। তোদের ভরসাতেই মাকে নিয়ে বেঁচে আছি।”

বলতে বলতে তার গলা ভারী হয়ে গিয়েছিল।

দিপালীরও খুব মায়া হয় এদের জন্য। সত্যিই তো—মা-মেয়ে দু’জন কত অসহায়! কিছু হলে খবর নেওয়ারও কেউ নেই।

মাসিমার কাছেই শুনেছে, দিদির বাবারা নাকি দুই ভাই ছিলেন। কিন্তু কাকার সঙ্গে বহু বছর কোনো সম্পর্ক নেই। মেসোমশাই নিজের পছন্দে বিয়ে করেছিলেন বলে বাড়ির লোক তাঁকে মেনে নেয়নি। আসানসোলের পৈতৃক বাড়িতে তিনি প্রায় যেতেনই না। শুধু ঠাকুরদা-ঠাকুমা মারা যাওয়ার পর দু’বার গিয়েছিলেন। তাও একাই। শ্মশান থেকে সোজা ফিরে এসেছিলেন। তারপর আর কখনও যাননি।

সব কথা মনে পড়তে পড়তে দিপালী সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিল। বুকের ভেতর অনুশোচনা তোলপাড় করছে। নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হচ্ছে তার।

কী যে হচ্ছে আজকাল! মনের মধ্যে শান্তি না থাকলে বোধহয় এমনই হয়। একের পর এক ভুল করে চলেছে সে। সত্যিই কি তবে মাথাটা আর ঠিক আছে ?

(চলবে)

ঊর্ণনাভ

১৩ : ঊর্ণনাভ

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

একজন ‘সাতচল্লিশের শিশুর কাহিনী’-র স্রষ্টা সাহিত্যিক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

This entry is part 14 of 14 in the series ঊর্ণনাভ

This entry is part 14 of 14 in the series ঊর্ণনাভ আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর পথযাত্রী …সৃষ্টির শেষ রহস্য,

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

একজন ‘সাতচল্লিশের শিশুর কাহিনী’-র স্রষ্টা সাহিত্যিক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

This entry is part 14 of 14 in the series ঊর্ণনাভ

This entry is part 14 of 14 in the series ঊর্ণনাভ আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর পথযাত্রী …সৃষ্টির শেষ রহস্য,

Read More »