ঊর্ণনাভ
ধারাবাহিক উপন্যাস
শ্যামলী রক্ষিত
দশম পর্ব
দীপালীর সারা শরীর-মন যেন বৈশাখের এই কাঠফাটা রোদের মতোই দাউদাউ করে জ্বলছে! ভেতরে ভেতরে গনগনে আগুনের মতো জ্বলছে সে। অন্য কাজের লোকেদের মতো হাউহাউ করে চিৎকার করতে তার ভালো লাগে না। মুখের ওপর দু-চার কথা শুনিয়ে দিলেই পারত! অন্তত সেই সময়টায় তার মনেও হয়েছিল। কিন্তু এতদিন সে কাজ করছে। দিদি মুডি মানুষ! এরকম একটু-আধটু মাথা গরম করা তার রুটিনের মতোই ছিল। এবং সে হজমও করে নিয়েছে মুখ বুজে।
কিন্তু ইদানীং আর কথায় কথায় রেগে গিয়ে তেমন কিছু বলে না। আর সে কোনোদিন মিতার সঙ্গে সেইভাবে গলাবাজিও করেনি। শুধু এই দিদির সঙ্গেই নয়, অন্য কোনো কাজের বাড়িতেও সে এটা করে না। এটাতার সম্ভ্রমবোধ। তার মানে এটা নয় যে মিতা তাকে একটু বেশি মাইনে দেয়। বলতে গেলেও, ওনার আর ওনার মায়ের বাড়ি—এই দু’জায়গার ঠেলাতেই তার সংসারটা খেয়ে-মেখে ভালো করে চলছে। ওদের কাজও অনেক, মাইনেও দেয় ভালো। কিন্তু তাই বলে যখন যা খুশি বলবে, এটা আর মেনে নিতে পারছে না।
ওনার বাড়ির কাজ আর করবে না বলেই ঠিক করে নিয়েছে সে। কিন্তু তার চিন্তা হচ্ছে মাসিমার জন্য। বেচারি বড্ড ভালো মানুষ! তাকে ভালোও বাসে খুব। তাকে ছাড়া অন্য কোনো কাজের লোক নেবেন না। বলতে গেলে মাসিমার জন্যই তো দিদির মুখনাড়া খেয়েও পড়েছিল এতদিন। কিন্তু আজ দিদি যা অশান্তি করেছে—তুচ্ছ মোচা কাটা নিয়ে, গাজোয়ারি করে শুধু শুধু কথা শুনিয়েছে—ওনার বাড়ির কাজ কিছুতেই করবে না আর।
কিন্তু মাসিমার কাজটা?
এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে থমকে গেল দীপালী। মাসিমার করুণ, অসহায় সেই চাওনি তার চোখের সামনে ভাসছে এখনও। একমাত্র ছেলে বিদেশে পড়ে আছে। আগে-আগে যাও বা একবার করে নিয়ম করে আসত! ছেলে এলেই যেন সারা বাড়ি জেগে উঠত। ছেলে আসার আগে সাজো-সাজো রব পড়ে যেত। মাসিমা যেন খুশিতে ঝলমল করতেন সে সময়। ছেলেটা যে ক’দিন থাকত কাকুলিয়া রোডের সবচেয়ে বড় দোতলা বাড়িটায়, সেই ক’দিন যেন উৎসব লেগে থাকত বাড়িতে। আর মাসিমাও কী আনন্দেই না কাটাতেন দিনগুলো!
আর চলে যাওয়ার পর যেন সব আলো নিভে যেত। মাসিমা ক’দিন একেবারে মরে-মরে থাকতেন। দিদি এসব দেখে গজগজ করতে করতে বলত—
— ছেলেছেলে করে যত আদিখ্যেতা! ছেলে তো স্বার্থপরের একশেষ! অত বড় বাড়ি কিনেছে ক্যালিফোর্নিয়ায়। মাকে নিয়ে গিয়ে রাখতে পারছে না! তার বেলায় তো হাত গুটিয়ে বসে আছে। এদিকে মায়ের একেবারে সোহাগ উথলে পড়ছে!
সে কথা শুনে মাসিমা বলতেন—
— ও তো তোর বড়দা, বুড়ি! ছেলেটাকে এরকম করে বলতে তোর বিবেকে লাগে না?
— বড়দা বলে মাথাটা কিনে রেখেছে তো! বিদেশে থাকছে। বাংলো বাড়ি, দামি গাড়ি সব তো আছে! ছেলে-বউ নিয়ে ফুর্তিতে আছে। কই, তার তো মনে হয় না মাকে নিয়ে গিয়ে সঙ্গে করে রাখি! এখানে তো একা একা পড়ে আছো!
— একা একা পড়ে থাকব কেন, বুড়ি? তুই তো আছিস! আমার দীপালী আছে! তাছাড়া মনু আমাকে প্রতিবারই নিয়ে যাওয়ার কথা বলে। একবার ঘুরে এসেছি, অতেই আমার শান্তি। যেখানেই থাকিস, তোরা ভালো থাক, তাতেই আমার শান্তি। এই নিয়ে শুধু শুধু তুই মাথা গরম করিস না মা। এই ভিটে ছেড়ে আমি কোথাও যেতে চাই না।
সেই কোন কালে এসে ঢুকেছি এই ভিটেতে! সারা জীবনের কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বাড়ির সঙ্গে! এই শেষ বয়সে আমি কোথায় যাব বল?
— কোথাও যাবে না তো! এখানে পচে মরো!
এরপর মাসিমা চুপ করে যেতেন। দিদির দিকে তাকিয়ে থাকতেন, আর চোখ দিয়ে হড়হড় করে জল পড়ত। দিদি যখন চলে যেত, তখন মাসিমা বলতেন—
— সারা জীবন মেয়েটা একই রকম থেকে গেল। এত বয়স হয়েছে, তবু ছেলেটার ওপর ওর হিংসা গেল না। তবু বারবার আমিও ওকে বলেছি, আমার জন্য তোকে কিছু ভাবতে হবে না। তুইও যা না তোর যেখানে খুশি। আমার জন্য ভাবিস না। আমার দীপালী আছে। ও থাকলেই আমার চলবে। আর কাউকে লাগবে না।
সে কথা শুনে আরও রেগে যেত দিদি। কটকট করে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাত তার দিকে। দীপালীর তখন ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া!
এইসব কথা মনে পড়তেই দীপালী খুব চিন্তায় পড়ে গেল। মাসিমার কথাটা তাকে ভাবতেই হবে। মাসিমা সত্যিই তাকে খুব ভালোবাসে। ওই অসহায় মানুষটাকে সে কষ্ট দিতে পারবে না। শুধু একটা বিষয়েই মাসিমার সঙ্গে কথা বলে নিতে হবে—দিদির বাড়ির কাজ করার জন্য যেন তাকে না বলে। তাহলে সে তাদের কারও কাজই করবে না।
এইসব ভাবতে ভাবতে গনগনে সূর্য মাথায় নিয়ে, আগুনের হল্কানিতে জ্বলে-পুড়ে খাক হতে হতে দীপালী রাস্তা হাঁটছিল। বুকের ভেতরটা দপদপ করছে তার। একে তার সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষায় জল ঢেলে দিয়েছে ছেলে। তার মনের যে কী অবস্থা, তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন। ক’দিন ধরে রাতের ঘুম চলে গেছে তার। চিন্তা করে করে কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে না।
বস্তির লোকজন জানতে পারলে কী খুশিই না হবে! সামনে আহা-উহু করবে হয়তো সবাই, কিন্তু আড়াল হলেই বলবে—
— বেশ হয়েছে! ঠিক হয়েছে! বড্ড অহংকার ছিল ছেলে-মেয়ে নিয়ে। হোস্টেলে রেখে মানুষের মতো মানুষ করবে! আশেপাশের বস্তির ছেলেদের সঙ্গে মিশতে দিত না কোনোদিন। ঠিক হয়েছে! দেখ না এবার কেমন লাগে!
তার সমস্ত অহংকার ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে ছেলে। বড্ড বস্তির ছেলেমেয়েদের ঘেন্না করত! ভগবান আছেন মাথার ওপর। এবার তোর ছেলে তো বস্তিরও অধম কাজ করল!
এইসবই বলবে আড়ালে।
লজ্জায়, অপমানে গলায় দড়ি দিয়ে মরতে ইচ্ছে করছে তার। কিন্তু মরতেও পারছে না। অদ্ভুত এক পরিস্থিতির মধ্যে আছে সে। মালুদিদির সঙ্গে এই নিয়ে একটু কথা বলতে পারলে, প্রাণ খুলে অন্তত বুকটা একটু হালকা হত। এখন এই অবস্থাতেও দিদিকে সে কিছুটা বলেছে। দিদিই বারণ করেছে তাকে—
— এখন চুপচাপ থাকতে হবে দীপালী। বেশি কিছু বললে ছেলেটাকে আর শোধরাতে পারবি না। দু’দিন যাক, আমি দেখছি। এখন এই নিয়ে বেশি অশান্তি করিস না যেন!
দিদির কথা মতো সে চুপ করে আছে। সবসময় নজর রাখার চেষ্টা করছে। তবে একটা ব্যাপারে শান্তি—মেয়েটা নিজেকে পুরো শুধরে নিয়েছে। ওই এখন দাদাকে লক্ষ রাখছে।
ছেলেটাকে আদৌ শোধরাতে পারবে কি না কে জানে! বড্ড দুশ্চিন্তা হচ্ছে তার। এত বড় একটা অপরাধ যে রাজু করতে পারে, নিজের চোখে দেখেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না দীপালী। কোথায় যাবে, কাকে বলবে, কার কাছে গেলে তার এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাবে—দিনরাত সেই এক চিন্তা তার।
তার ওপর ডাক্তারদিদির এই আচরণ যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে হয়ে লেগেছে। রাগে, ক্ষোভে চোখে জল এসে যাচ্ছে দীপালীর। ঝাপসা চোখের পাতা আঁচল দিয়ে মুছতে মুছতে দীপালী রাস্তা পার হল।



