এক দৃষ্টিহীন পেঁচা
ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস
কাহিনিকার: সাদেঘ হেদায়েত
বঙ্গানুবাদ: সুপর্ণা বোস
বিংশ শতাব্দীর বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও কালজয়ী পরাবাস্তববাদী মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস সাদেক হেদায়েতের “দ্য ব্লাইন্ড আউল” (বূফ-এ কূর)। ইরানি সাহিত্যের এই অমূল্য সৃষ্টিটি এবার বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য এক অনন্য উপায়ে উপস্থাপিত হয়েছে। বিশিষ্ট অনুবাদক সুপর্ণা বসু অত্যন্ত নিপুণতার সাথে এই জটিল ও অন্ধকার জগতের উপন্যাসটিকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন, যা বিগত ২৬টি রবিবার ধরে ‘রোদ্দুর : The Sunshine-এর Online পাতায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়ে পাঠকদের মুগ্ধ করেছে।
অন্তিম পর্ব
মৃত্যু যেন এক বোবা মানুষের মত, যাকে প্রতিটি শব্দের পুনরাবৃত্তি করতে হয় নিঃশব্দে এবং যখন সে তার আবৃত্তি সমাপ্ত করে তখন মনে হয় যেন এক অর্ধপংক্তি পুনরাবৃত্ত হচ্ছে! সে শব্দহীন শান্তভাবে তার আপন সঙ্গীতটি গুনগুন করতে থাকে!সেই শব্দ যেন শরীরের মাংস ভেদ করে ঢুকে পড়ে! সেই শব্দ যেন করাত কলের কাঠচেরাইয়ের শব্দের মতন!এই তীব্র চিৎকার তো পরমুহূর্তেই চাপা গোঙানির মত!
আমি দুচোখের পাতা এক করতে পারছিলাম না।একদল মদ্যপ রাতপ্রহরী পরস্পরের সঙ্গে কদর্য কথাবার্তা করছিল আর গান গাইতে গাইতে পেরিয়ে যাচ্ছিল,
“চলো যাই পান করি মে
সুরা, যা রে-রাজত্বের
আজ নয়ত আর কবে?”
আমি মনে মনে বললাম, ‘এবার আমার কারাবরণ অনিবার্য।’
কথাটা মনে হতেই অনুভব করলাম, আমার ভেতরে যেন এক অতিমানবীয় শক্তির জোয়ার উঠেছে। কপাল ঠান্ডা হয়ে এল। উঠে দাঁড়ালাম। হলদে ক্লোকটা কাঁধে জড়ালাম, গলার স্কার্ফ দু-এক ফেরতা পেঁচিয়ে নিলাম মাথায়, কাঁধ ঝুঁকিয়ে স্মৃতিচিহ্ন রাখার বাক্সে লুকিয়ে রাখা হাড়ের হাতলওয়ালা ছুরিটা তুলে নিলাম এবং পাশের ঘরের দিকে এগোলাম।
দরজার চৌকাঠে পৌঁছে দেখলাম, ঘরটা সম্পূর্ণ অন্ধকারে ডুবে আছে। মন দিয়ে কান পাততেই তার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম,
‘তুমি এসেছ? তোমার স্কার্ফটা খুলে ফেলো।’
কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত মাদকতা। সে যেন ঠিক সেই ছোট্ট মেয়েটির মতো কথা বলছিল, যে ঘুমের ঘোরে অজান্তেই বিড়বিড় করত। এই স্বর আমি একবার আগেও শুনেছিলাম গভীর নিদ্রার মধ্যে। মনে হল, সে কি স্বপ্ন দেখছে? তার কণ্ঠস্বর যেন ফিরে গেছে সেই নিষ্পাপ বালিকার কণ্ঠে, যে একদিন আমার সঙ্গে সুরেন নদীর তীরে লুকোচুরি খেলত। একটু বাদে আবার শুনলাম
‘ভেতরে এসো… তোমার স্কার্ফটা খুলে ফেলো।’
নিঃশব্দে অন্ধকার ঘরে ঢুকে পড়লাম। চাদর খুললাম, স্কার্ফ খুললাম, তারপর পোশাকও খুলে ফেললাম। কিন্তু অদ্ভুত কারণে, হাড়ের হাতলওয়ালা ছুরিটা তখনও আমার হাতেই রয়ে গেল।
বিছানায় ঢুকতেই তার উষ্ণতা যেন আমাকে নতুন জীবন দিল। আমি জড়িয়ে ধরলাম তার স্নিগ্ধ, সিক্ত, কামার্ত শরীর!মনে পড়ছিল সেই ফ্যাকাশে মুখের, নিষ্পাপ তুর্কমেনীয় তেরছা চোখের রোগা মেয়েটিকে, যে একদিন সুরেন নদীর ধারে আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলেছিল। অথচ সেই মুহূর্তে আমি তাকে আক্রমণ করে বসলাম এক বুনো, ক্ষুধার্ত জন্তুর মতো!আমার বুকের ভিতর গভীরতম প্রেম আর ঘৃণা একাকার হয়ে গিয়েছিল।
আমার স্ত্রীর শীতল, রূপোলি শরীর, যেন এক নাগিনীর মতো, ধীরে ধীরে আমাকে জড়িয়ে ধরল। তার মাদকতাময় স্তনের সুগন্ধ। আমার গলায় জড়িয়ে তার অপরূপ উষ্ণ বাহুযুগল! সেই মুহূর্তে মনে হল, জীবন যদি এখনই শেষ হয়ে যায়, তবু আর কোনো আক্ষেপ থাকবে না। কারণ, সেই মুহূর্তে তার প্রতি আমার সমস্ত ঘৃণা আর প্রতিহিংসা যেন উবে গিয়েছিল।আমি প্রাণপনে কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করলাম।
অজান্তেই তার পা দুটো আমার পায়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেল, হাত দুটি এসে জাপটে ধরল আমার ঘাড়। জীবন্ত, তাজা শরীরের মনোরম উষ্ণতা অনুভব করলাম। আমার জ্বলন্ত দেহের প্রতিটি কণা যেন সেই উষ্ণতা শুষে নিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, শিকারকে যেমন ধীরে ধীরে গিলে ফেলে কোনো বিশাল প্রাণী, সেও তেমন করেই আমাকে নিজের মধ্যে গ্রাস করে নিচ্ছিল।
ভয় আর আনন্দ,দুরকম অনুভূতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। তার ঠোঁটের স্বাদ, শসার ডগার মতো তিতকুটে।
এই অসহ্য সুখের চাপে, ঘামে ভিজে, আমি প্রায় সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লাম। আমার সমগ্র অস্তিত্ব যেন বিজয়ের গান গাইছিল। দণ্ডিত, অসহায় এক মানুষ হয়ে আমি আত্মসমর্পণ করলাম সেই অসীম সমুদ্রের খামখেয়ালি ঢেউয়ের কাছে।
চম্পাফুলের সুগন্ধে ভরা তার চুলগুলো সেঁটে গিয়েছিল আমার মুখে। আমাদের অস্তিত্বের গভীর থেকে একসঙ্গে বেরিয়ে আসছিল যন্ত্রণা আর আনন্দের আর্তনাদ।
হঠাৎ সে এমন জোরে আমার ঠোঁটে কামড় বসাল যে মাঝখানটা ফেটে রক্ত বেরিয়ে এল। সে কি নিজের আঙুলেও এভাবেই কামড়াত? নাকি সে বুঝে ফেলেছিল যে আমি সেই কুষ্ঠরোগে গলিত ঠোঁটওয়ালা বুড়োটা নই?
আমি নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু সামান্যও নড়তে পারলাম না। আমাদের দেহ যেন একে অপরের সঙ্গে জোড়া লেগে গিয়েছিল।
মনে হল, সে পাগল হয়ে গেছে। সেই ধস্তাধস্তির মধ্যেই অজান্তে আমার হাত নড়ে উঠল, আর অনুভব করলাম—লম্বা হাতলওয়ালা ছুরিটা তার শরীরের কোথাও ঢুকে গেছে।
এক উষ্ণ তরল আমার মুখের ওপর ছিটকে পড়ল।
সে এক তীক্ষ্ণ আর্তচিৎকার করে আমাকে ছেড়ে দিল।
মুঠোয় জমে থাকা সেই উষ্ণ তরল অনুভব করলাম, তারপর ছুরিটা দূরে ছুড়ে ফেলে দিলাম। এতে আমার হাত মুক্ত হল। আমি হাত বুলিয়ে দেখলাম তার শরীরের ওপর।
শরীরটা সম্পূর্ণ ঠান্ডা।
সে মৃত।
ঠিক সেই মুহূর্তে আমার কাশি উঠল। কিন্তু ওটা আসলে কাশি ছিল না—ওটা ছিল সেই শুষ্ক, বিভীষিকাময় হাসির প্রতিধ্বনি, যে হাসি শুনলে শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায়।
তাড়াহুড়ো করে চাদরটা কাঁধে জড়িয়ে আমি নিজের ঘরে ফিরে এলাম।
চর্বির প্রদীপের ক্ষীণ আলোয় আমি ধীরে ধীরে আমার মুঠো খুললাম।প্রদীপের ক্ষীণ আলোয় হাত খুলে দেখলাম—আমার হাতের তালুতে তার একটি চোখ পড়ে আছে। আমার সারা শরীর রক্তে ভিজে গেছে।
আমি আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। কিন্তু আতঙ্কে দু-হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললাম। আমি যেন সেই পুরোনো ছেঁড়াকাপড়-ও-হাড় কুড়োনো ফেরিওয়ালার মতো দেখতে হয়ে গেছি—না, আমি-ই সেই মানুষে পরিণত হয়েছি। নাগসাপের মুখোমুখি হয়ে বেঁচে ফেরা মানুষের মতো আমার মাথার চুল আর দাড়ি ধবধবে সাদা হয়ে গেছে। আমার ঠোঁটও সেই বৃদ্ধের মতো মাঝখান থেকে চিরে গেছে। চোখের পাতায় আর কোনো পাপড়ি নেই। বুকের ওপর সাদা লোমের একগুচ্ছ বেরিয়ে এসেছে।
মনে হলো, আমার মধ্যে যেন আর-একটি আত্মা নেমে এসেছে। আমার চিন্তা বদলে গেছে, অনুভূতিও বদলে গেছে। আমার ভেতরে জেগে ওঠা সেই অশুভ সত্তার কবল থেকে নিজেকে আর মুক্ত করতে পারলাম না। মুখ দু-হাতে ঢেকে আমি অনিচ্ছাকৃতভাবে হেসে উঠলাম। সেই হাসি আগের যেকোনো হাসির চেয়ে আরও ভয়ংকর, আরও প্রচণ্ড। সে হাসি আমার সমগ্র অস্তিত্বকে কাঁপিয়ে দিল। যেন দেহের কোনো পরিচিত গভীরতা থেকে নয়, এক অতল শূন্যতার গর্ভ থেকে উঠে এসে গলায় প্রতিধ্বনিত হয়ে বেরিয়ে আসছিল সেই ফাঁপা, বিভীষিকাময় অট্টহাসি।
আমি সত্যিই সেই কাবাড়িওলায় পরিণত হয়েছিলাম।
দীর্ঘ অতলান্ত ঘুম থেকে সহসা জেগে উঠে কী এক অস্থিরতা অনুভব করলাম। চোখ কচলে উঠে বসি ও ক্রমে নিজের মধ্যে ফিরে আসি।নাহ্ আমি আমার ঘরেই রয়েছি!জানালার বাইরে কুয়াশাভেজা আলোআঁধারি।খুব কাছেই কোথাও একটা মোরগ ডাকছে।আমার কাছে রাখা কাংস্যপাত্রের জ্বলন্ত কয়লা ক্রমশ পুড়ে শীতল ছাইয়ে রূপান্তরিত হয়েছে যা আমি একটি ফুঁয়ে উড়িয়ে দিতে পারি।আমার মনে হচ্ছে আমার মস্তিষ্ক এই কয়লার মতই ছাই হয়ে একটি শ্বাসের করুণা- নির্ভর হয়ে পড়ে আছে।
জেগে উঠে আমি প্রথমেই যেটা খুঁজলাম সেটা সেই প্রাচীন পাত্রটি । যা কবরস্থানের সেই শববাহী গাড়ির বৃদ্ধ গাড়োয়ান আমাকে দিয়েছিলেন।সেটা আর দেখতে পেলাম না। চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম,দরজার পাশে কেউ বসে আছে।যার ছায়া খানিকটা ঝুঁকে আছে।বরং বলা ভাল তিনি একজন ন্যুব্জদেহ বৃদ্ধ যার মুখ ও গলা জড়ানো ওড়নায় আংশিকরূপে আবৃত ছিল।তিনি একটি নোংরা রুমালে জড়ানো বয়ামের মত কিছু একটা জিনিস বগলদাবা করে নিয়ে বসেছিলেন এবং সহসা রোমহর্ষক কর্কশ হাস্যে ফেটে পড়লেন।ঠিক সেই মুহূর্তে আমি এগোনোর চেষ্টা করতেই তিনি দরজা দিয়ে পালিয়ে গেলেন। রুমালে জড়ানো জিনিসটা তার হাত থেকে কেড়ে নেবার উদ্দেশ্যে আমি তৎক্ষণাৎ তার পিছু ধাওয়া করলাম।কিন্তু ততক্ষণে তিনি পালিয়েছেন।দ্রুত ফিরে এসে আমার ঘরের জানালা খুলতেই নিচের রাস্তায় তখনো সেই বৃদ্ধের নুব্জ আকৃতি দেখতে পেলাম।তার কাঁধদুটো হাসির দমকে কাঁপছিল।পাত্রটা বগলদাবা করে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দৌড়ে লোকটা কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে গেল।আমি জানলা থেকে ঘুরে দাঁড়ালাম ও নিজের দিকে তাকিয়ে দেখলাম আমার জামাকাপড় ছেঁড়া এবং আপাদমস্তক কাদা ও জমাট রক্তে জবজব করছে।দুটো বিষাক্ত রঙিন মাছি আমার চারপাশে চক্রাকারে উড়ছে এবং কয়েকটি সাদা শূককীট আমার কোটের ওপরে কিলবিল করছিল।আমি আমার বুকের ওপরে এক নারীর শবদেহের ভার অনুভব করলাম…
(সমাপ্ত)



