৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 4 of 26 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৭ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৮ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৯ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা – দশম পর্ব

১১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৭ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৮ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

 ১৯ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

কাহিনিকার: সাদেঘ হেদায়েত

বঙ্গানুবাদ: সুপর্ণা বোস

পর্ব : চার

সেই রাতে যা ঘটা উচিত ছিল না সেটাই ঘটলো। আমি ভূতগ্রস্তের মত হাঁটছিলাম কিন্তু সেই একলা প্রহরে এবং মুহূর্তগুলিতে ঠিক কি ঘটেছিল তা আমি আর স্মরণ করতে পারি না। চারিপাশে ঘন কুয়াশা সত্বেও তার আবছা ভয়ার্ত মুখ ঠিক যেমন পেনের খাপের উপর আঁকা হতো, ধোঁয়ার ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো।স্থির এবং ভাবলেশহীন অবয়ব আমার চোখের সামনে পার্থিব আকার ধারণ করতে শুরু করল। আগের থেকে আরো অনেক বেশি দৃঢ় ভাবে।ফিরতে অনেকটা রাত হয়ে গেল। একটা ঘন কুয়াশা বাতাসে ঝুলে ছিল।এত ঘন যে চলার পথটুকুও দেখতে পাচ্ছিলাম না।এমনকি নিজের পায়ের পাতাও দেখা যাচ্ছিল না।তবু অভ্যাসবশত এবং বিশেষ কোন ক্ষমতা বলে যা সেই সময় আমার মধ্যে জেগে উঠেছিল,আমি বাড়ি ফিরতে সক্ষম হয়েছিলাম।যখন বাড়ি পৌঁছলাম তখন খেয়াল হলো একটি আবছায়া নারীমূর্তি আমার দোরের চাতালে বসে আছে। তাকে চিনতে আমার ভুল হলো না,এই ছায়া অবয়ব আসলে তারই।

তালা খোলার জন্য আমি একটা দেশটাই জ্বালালাম। আমার চোখ অনিচ্ছাকৃতভাবে সেই কালো বসন পরিহিতার দিকে চলে গেল।সেই দুটি চোখ চিনতে পারলাম।দুটি দীঘল চোখ। রুপালি ছোট্ট মুখে দুটি বড় বড় চোখ। যেই দুটি চোখ একজন পুরুষের মুখের ওপর ঘোরাফেরা করছিল কোন কিছু লক্ষ্য না করেই। হতভম্ব ও বিস্মিত আমি স্থানুবত দাঁড়িয়ে রইলাম। নিজেকে মনে হল এমন একজন মানুষ যে স্বপ্ন দেখছে এবং জানে যে ঘুমিয়ে রয়েছে অথচ চাইলেই সে জেগে উঠতে পারছে না।দেশলাইটা নিজে নিজেই জ্বলে শেষ হয়ে গেল। আমার আঙুলে ছ্যাকা লাগতেই সংবিত ফিরে পেলাম। আমি চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুললাম এবং তাকে প্রবেশের পথ করে দিতে একপাশে সরে দাঁড়ালাম।সে চাতাল থেকে উঠে দাঁড়াল। এভাবে হেঁটে গেল যেন এই পথ তার কতকালের চেনা।সে অন্ধকার বারান্দাটুকু পেরিয়ে গিয়ে আমার ঘরের দরজা খুলে প্রবেশ করল। আমি তাকে অনুসরণ করে তাড়াতাড়ি ঘরের আলো জ্বেলে দিলাম এবং দেখলাম সে ততক্ষণে আমার বিছানার ওপর শুয়ে পড়েছে।তার মুখখানা ছায়ার দিকে ঘোরানো ছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম না সে আমাকে দেখতে কিংবা শুনতে পাচ্ছে কিনা। তাকে দেখে মনে যাচ্ছিল না যে সে ভয় পেয়েছে অথবা আমাকে সে প্রতিহত করতে চায়। বরং মনে হচ্ছিল সে যেন আপন ঘরে এসে পৌঁছেছে।

আমার মনে প্রশ্নের উদয় হচ্ছিল। সে কি অসুস্থ? সে কি পথ হারিয়েছে? সে এভাবে এসে পৌঁছেছে যেন এক নিদ্রাচারী ঘুমের মধ্যে হেঁটে এসেছে। পুরোপুরি অচেতন। আমার সেই সময়ের মানসিক অবস্থা কোন জীবন্ত মানুষের কল্পনাতীত। একপ্রকার বর্ণনাতীত ভালো লাগা; একই সঙ্গে যন্ত্রনাও। না আমি কোন ভুল করিনি।সেদিনের দেখা সেই নারী এবং আজকের এই বালিকাটি একই মানুষ। আমি সব সময় আমাদের প্রথম দেখা হওয়ার কথা চিন্তা করতাম।সেতো এমনই হবে। আমার কাছে এই অবস্থা যেন অনন্ত গভীর নিদ্রা। যে গভীর নিদ্রায় মানুষ স্বপ্ন দেখে।এই স্তব্ধতা আমার কাছে এক অনন্ত জীবন বহন করে আনলো। যার শুরুটা বলা মুশকিল।যার কোন শেষ ছিল না।অসীম অনন্ত।
আমার কাছে সে এক অলৌকিক নারী।

তার মুখ আমার স্মৃতিতে এমন তীব্রভাবে গেঁথে ছিল এভাবে আর কখনো কারোর ক্ষেত্রেই হয়নি।আমার সারা শরীর কাঁপতে শুরু করেছিল হাঁটু অসাড় হয়ে যাচ্ছিল আমি আমার জীবনের সমস্ত দুঃখের গল্প তার দীর্ঘ চোখে, তার আশ্চর্য রকম দীর্ঘ চোখে অর্পিত হল,তার উৎসুক ও উজ্জ্বল চোখের মণিদুটি এমন ছিল, যেন টলটলে অশ্রুর ভিতর নিক্ষিপ্ত দুটি কালো হীরে। তার চোখে, তার ঘন কালো দুটি চোখে আমি এক অনন্ত রাত্রি খুঁজে পেলাম। নিকষ অন্ধকার; যা আমি এতো কাল ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম।আমি সেই মন্ত্র মুগ্ধকর আঁধারে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। অনুভব করলাম কোন একটা শক্তি আমার ভিতর থেকে সমস্ত নির্যাস টেনে বার করে নিল। আমার পায়ের তলার মাটি কেঁপে উঠল; এই মুহূর্তে যদি আমি মাটিতে পড়ে যেতাম হয়ত সেই পতন থেকে এক বর্ণনাতীত সুখ পেতে পারতাম।

আমার হৃদস্পন্দন থমকে গেল। ভয় করতে লাগলো।আমার শ্বাস হয়তো তাকে হারিয়ে ফেলবে। যেন সে একটা মেঘের টুকরো অথবা একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলী।আমি আমার শ্বাস প্রশ্বাস চেপে রাখলাম।তার অলৌকিক স্তব্ধতায় মনে হল একটা কাচের দেয়াল যেন আমাদের মধ‍্যে বিরাজ করছে।এই নীরব প্রহর।প্রতিটি মুহূর্ত আর অনন্ত সময়,আমায় বিঁধতে থাকল।তার ক্লান্ত চোখ যেন এমন কিছু দেখছিল যা আর কেউ দেখছে না! যেন সে মৃত‍্যুকে দেখছিল! তার চোখ দুটি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসছিল।তারপর একেবারে বন্ধ হয়ে গেল।সেই মুহূর্তের নিবিড়তা আমায় ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিল।মনে হলো যেন এক ডুবন্ত মানুষ শ্বাসবায়ুর জন‍্যে সহসা বাতাসের ওপর ভেসে উঠেছে।আমি শার্টের হাতায় কপালের ঘাম মুছলাম।

তার মুখে সেই এক রকম শান্ত স্থির অভিব‍্যক্তি।মুখটা শুকিয়ে গিয়েছিল।সে আড় হয়ে শুয়ে বাম হাতের তর্জনী চিবোচ্ছিল।তার মুখের রং রুপোর মত উজ্বল।কালোরঙের আঁটো পোশাকের ভিতর দিয়ে তার পা, বাহু,স্তনদ্বয় ও বাকি শরীরের অঙ্গপ্রত‍্যঙ্গগুলি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।ভালো করে দেখার জন‍্য আমি প্রায় ঝুঁকে পড়েছিলাম তার দিকে।তবু মনে হচ্ছিল সে যেন আমার থেকে অনেক দূরে।

হঠাৎ আমার অনুভব হলো যে আমি তার হৃদয়ের কথা কিছুই জানিনা এবং আমাদের মধ্যে আদৌ কোন সম্পর্ক বজায় ছিল না। আমি কিছু বলতে চাইছিলাম কিন্তু ভয় হল তার কান বোধহয় কোন দূরাগত সঙ্গীতের মতন স্বর্গীয় শব্দ শুনতে অভ‍্যস্থ এবং আমার কথা হয়তো তার ঘৃণার উদ্রেক করবে।

আমার মনে হল সে হয়তো ক্ষুধার্ত,তৃষ্ণার্ত। যদিও বেশ জানি বাড়িতে তেমন কিছুই খাবার নেই।তবু মিটকেসটা খুললাম কিছু খাবার খোঁজার জন্য এবং মনে পড়ে গেল যে আমার কাছে পারিবারিক সূত্রে প্রাপ্ত পুরনো মদ আছে কুলুঙ্গিতে রাখা। আমি লাফিয়ে টুলে উঠলাম এবং কুলুঙ্গী থেকে মদের পাত্রটি নামিয়ে আনলাম। খুব সাবধানে পা টিপে তার বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। সে একটি ক্লান্ত বিধ্বস্ত শিশুর মতন ঘুমোচ্ছিল। সে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন ছিল এবং তার ভেলভেটের মতো দীর্ঘ আঁখিপল্লব সংবদ্ধ ছিল। আমি খুব আস্তে করে ভৃঙ্গারের ঢাকা টি খুলে তার বন্ধ দাঁতের ফাঁক দিয়ে এক পেয়ালা মদ ঢেলে দিলাম গলায়। এই প্রথমবার তার চোখ বন্ধ থাকায় আমার ভিতর একটা অদ্ভুত স্বস্তি হল।যে ক্ষত আমাকে যন্ত্রণা দিচ্ছিল এবং যে দুঃস্বপ্ন আমাকে ভেতর থেকে তার উত্তপ্ত নখ দিয়ে চিরে ফেলছিল তা যেন কিছুটা প্রশমিত হলো।আমি আমার চেয়ারটা তার বিছানার আরো কাছে টেনে নিয়ে এলাম এবং তার মুখের দিকে চেয়ে বসে রইলাম। বড়ই শিশুসুলভ মুখ এবং স্বভাব।এমন নিষ্পাপ মুখের মহিলা বালিকা অথবা পরী এইভাবে যন্ত্রণা দিতে পারে? এটা কি সম্ভব যে তার একটা দ্বৈত জীবন আছে?কি করে সে এতোটা শান্ত থাকতে পারে? একইসঙ্গে শান্ত এবং অভদ্র? এখন আমি তার শরীরের উত্তাপ অনুভব করতে পারছি। তার ঘন কালো চুল থেকে উঠে আসা সোঁদা সুগন্ধ। আমার হাত নিয়ন্ত্রণে ছিল না এখন আমি সেটা দিয়ে তার চুলে বিলি কাটতে লাগলাম। যে অলকচূর্ণ সর্বদাই তার কপালের উপর পড়ে থাকতো।তারপর আমি আমার আঙ্গুলগুলো তার চুলের ভেতর ডুবিয়ে দিলাম। চুলগুলো ঠান্ডা এবং ভেজা।ঠান্ডা।ভীষণ ঠান্ডা। যেন সে বেশ কয়েকদিন আগেই মারা গিয়েছে। আমি আমার হাতটি তার বুকের কাছে নিয়ে গেলাম। তার স্তনের নিচে হৃদয়ের উপরে রাখলাম। হৃদস্পন্দন ছিল না।একটি আয়না এনে তার নাকের সামনে ধরলাম। সামান্যতম প্রাণের লক্ষণও পেলাম না…

(ক্ৰমশঃ)

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা ৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

Author

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

 : ঊর্ণনাভ

ধারাবাহিক উপন্যাস শ্যামলী রক্ষিত ঊনবিংশতি অধ্যায়  যেদিন প্রথম তার গালের এই সাদা দাগের ছিটেটা দেখতে পেয়েছিল, সেদিনের কথাটা কোনোদিন ভুলবে না মালবিকা! বিকেলে জবজবে করে

Read More »

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

 : ঊর্ণনাভ

ধারাবাহিক উপন্যাস শ্যামলী রক্ষিত ঊনবিংশতি অধ্যায়  যেদিন প্রথম তার গালের এই সাদা দাগের ছিটেটা দেখতে পেয়েছিল, সেদিনের কথাটা কোনোদিন ভুলবে না মালবিকা! বিকেলে জবজবে করে

Read More »

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ  অষ্টম পর্ব চোদ্দো অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলেন গান্ধিজি। তাঁর সঙ্গে মতিলাল নেহেরু, চিত্তরঞ্জন দাশদের মতের মিল হল না। তাঁরা তৈরি করলেন স্বরাজ

Read More »