এক দৃষ্টিহীন পেঁচা
কাহিনিকার: সাদেঘ হেদায়েত
বঙ্গানুবাদ : সুপর্ণা বোস
বিংশতিতম পর্ব
কিন্তু এক সুস্থ সবল যুবক, যে আচমকাই মারা যায়!যার শরীরের সমস্ত শক্তি মৃত্যুর বিরুদ্ধে অন্তিম লড়াইয়ে রত!তার অনুভূতি কেমন হয়?
আমি প্রায়ই মৃত্যু আর নিজের শরীরের ভাঙন নিয়ে ভাবতাম। সেই ভাবনা আমার জন্যে এতোটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল যে আমাকে আর আলাদা করে ভয় দেখাতে পারত না। বরং আমি মরতে চাইতাম ভীষণভাবে!’নেই’ হয়ে যেতে চাইতাম। কিন্তু একটা ভয় ছিল,আমার শরীরের কণাগুলো যদি এই জনতার শরীরের কণার সঙ্গে মিশে যায়?সেই চিন্তা আমি সহ্য করতে পারতাম না। কখনও কখনও ইচ্ছে হতো আমার যদি খুব লম্বা, সংবেদনশীল আঙুল থাকত, তাহলে আমি নিজের শরীরের প্রতিটি কণা সাবধানে জড়ো করে ফেলতাম, যাতে সেগুলো ওই জনতার সঙ্গে মিশে না যায়।
কখনও কখনও মনে হতো আমার এই পর্যবেক্ষণগুলো মৃত্যু যাতনা কাতর মানুষের মতো। বেঁচে থাকার খিদে, উদ্বেগ, বিস্ময়, ভয়, সবই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমার উপর চাপিয়ে দেওয়া সব মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করার ফলে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এসেছিল। মৃত্যুর পর সম্পূর্ণ অনস্তিত্বের আশাই ছিল আমার একমাত্র সান্ত্বনা।
দ্বিতীয় জীবনের চিন্তা আমাকে ভীত সন্ত্রস্ত ও ক্লান্ত করে তুলত। এই পৃথিবীতেই আমি এখনও অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারিনি তার আবার নাকি আরেকটা পৃথিবী!সে আমার কী কাজে লাগবে?আমার মনে হতো এই পৃথিবী আমার জন্য তৈরি হয়নি। এটি যেন তৈরি হয়েছে একদল ছদ্মবুদ্ধিজীবীর জন্য।একদল নির্লজ্জ, শয়তানি, রূঢ়, ভিখিরির মতো খচ্চর- চালকের জন্য, যাদের মধ্যে অন্তর্দৃষ্টি বা প্রজ্ঞা বলে কিছু নেই। এই পৃথিবী তাদের জন্য, যারা এর উপযোগী করে সৃষ্টি হয়েছে!যারা কসাইখানার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষুধার্ত কুকুরের মতো, সামান্য নাড়িভুঁড়ির আশায় লেজ নাড়তে নাড়তে পৃথিবী আর আকাশের ক্ষমতাবানদের তোষামোদ করে।
দ্বিতীয় জীবনের চিন্তা আমাকে আতঙ্কিত করত, আমাকে ক্লান্ত করে তুলত। এই বীভৎস জগতগুলো আর সেই বিকর্ষণকারী অবয়ব গুলো আবার দেখার কোনো প্রয়োজন আমার ছিল না। ঈশ্বর কি তাঁর জগতকে এভাবে বয়ে যেতে দিয়েছেন!
ঈশ্বর কি তাঁর জগতকে এমনভাবে ধূলিসাৎ করে ফেলেছিলেন? আতঙ্কের চোটে আমি পালিয়ে গেলাম।
ঈশ্বর যেন তাঁর সম্প্রতি অর্জন করা জগৎসমূহ দ্বারা আমাকে ত্রস্ত করার চেষ্টা করছেন?মিথ্যে বলব না।আমি কি সত্যিই একটা দ্বিতীয় জীবন পেতে পারি? তাহলে সেই জীবনে আমার ভাবনা ও অনুভূতিগুলো যেন ভোঁতা হয়!আমি যেন ক্লান্তিহীন মুক্তশ্বাস নিতে পারি।সর্বোপরি লিঙ্গমন্দিরের স্তম্ভের ছায়ায় জীবন কাটাতে পারি এমন এক জগতে, যেখানে রোদের তেজ আমার চোখে বিঁধবে না, মানুষের কোলাহল আর জীবনের ব্যস্ততা কানে আঘাত করবে না।
আমি অবিরাম নিজের ভেতরে থিতিয়ে পড়ছিলাম।যেভাবে কোনো প্রাণী শীতঘুমে চলে যায়। অন্যদের কথা আমি কানে শুনতে পেতাম, কিন্তু নিজের কণ্ঠস্বর যেন শুধু গলার ভেতরেই আটকে থাকত। আমার পিছনে যে নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্ব ওত পেতে ছিল, তা ছিল জমাট বাঁধা, ঘন, অনন্ত এক রাতের মতো!সেইসব রাতের মতো, যাদের আঠালো অন্ধকার অপেক্ষা করে থাকে জনশূন্য নগরীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে। আর কামনা ও প্রতিহিংসার স্বপ্ন ঘুরে বেড়ায়।
আমার সমস্ত অস্তিত্ব যেন এসে ঠেকেছিল আমার কণ্ঠে!এক উন্মাদের চুড়ান্ত বাক্যবাণীর মত। যে শক্তি নিঃসঙ্গতার ভিতর থেকে দুই মানুষকে একত্র করে সৃষ্টিতে বাধ্য করে, তার অস্তিত্বও এই উন্মাদনায় নিহিত। এই উন্মাদনা সবার মধ্যেই আছে!তার সঙ্গে মিশে থাকে এক গভীর অনুতাপ, যা ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ে… কারণ একমাত্র মৃত্যুই মিথ্যে বলে না।
মৃত্যুর উপস্থিতি সমস্ত কল্পনাকে ধ্বংস করে দেয়। আমরা মৃত্যুর সন্তান, আর মৃত্যুই আমাদের জীবনের প্রতারণাময়, প্রলোভনসঙ্কুল আকর্ষণ থেকে মুক্তি দেয়। জীবনযাপনের গভীর থেকেই মৃত্যু আমাদের ডেকে নিয়ে যায়। যখন আমরা এত ছোট যে ভাষাও বুঝি না, তখনও খেলতে খেলতে হঠাৎ থেমে যাই,মৃত্যুর সেই আহ্বান শোনার জন্য। সারা জীবন ধরে মৃত্যুর আঙুল আমাদের দিকে তাক করা থাকে।
এমন কি কখনও হয়নি, কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ গভীর চিন্তায় ডুবে গিয়ে মানুষ সময় আর স্থানের বোধ হারিয়ে ফেলেছে? তারপর যখন বাস্তবে ফিরে এসেছে, তখন যেন নতুন করে চারপাশ চিনতে হয়েছে? সেই মুহূর্তটাই মৃত্যুর ডাক।
ঘামে ভেজা, স্যাঁতসেঁতে এই বিছানায়, যখন আমার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছিল আর আমি অস্তিত্বহীনতা ও অনন্ত রাতের কাছে আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছিলাম, তখন আমার সমস্ত হারানো স্মৃতি আর বিস্মৃত ভয় জেগে উঠল।
ভয় হচ্ছিল,বালিশের পালক হঠাৎ ছুরির ফলায় পরিণত হবে; বিছানার জামার বোতাম ফুলে ফেঁপে কলের পাথরের মতো বিশাল হয়ে উঠবে; মেঝেতে পড়ে যাওয়া রুটির টুকরো কাঁচের মতো ভেঙে যাবে। মনে হচ্ছিল, আমি ঘুমিয়ে পড়লেই চর্বির প্রদীপের তেল উথলে পড়ে পুরো শহরটাকে আগুনে পুড়িয়ে দেবে।
কসাইখানার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কুকুরটার থাবার শব্দ যেন ঘোড়ার খুরের আওয়াজ হয়ে প্রতিধ্বনিত হবে।এই ভাবনাও আমাকে তাড়া করছিল। ভয় হচ্ছিল, পুরোনো জিনিসের ফেরিওয়ালা হঠাৎ এমন এক হাসিতে ফেটে পড়বে, যা সে আর থামাতে পারবে না। আমাদের পুকুরপাড়ের কেঁচোটা সাপে পরিণত হবে!এই ভয়ও ছিল। এমনকি আমার লেপটা যেন এক সমাধিফলকে বদলে যাবে, যার মার্বেলের দাঁত বন্ধ হয়ে আমাকে জীবন্ত কবর দেবে।
সবচেয়ে বেশি ভয় ছিল,আমি হয়তো আমার কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলব, আর যতই চিৎকার করি না কেন, কেউ আমাকে সাহায্য করতে আসবে না।
আমি শৈশবকে মনে করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু যখন সেই ইচ্ছা সত্যি হলো, আর আমি আবার সেই দিনের মতো অনুভব করতে লাগলাম, তখন তা আজও ঠিক আগের মতই যন্ত্রণাদায়ক আর কঠিন মনে হলো! কসাইখানার সামনে শুকনো কালো বোঝাবাহী ঘোড়াগুলোর কাশির মতো প্রতিধ্বনিত কাশি!থুথু ফেলতে ভয় করছিল পাছে কফের সঙ্গে রক্ত উঠে আসে!রক্ত!সেই উষ্ণ লবনাক্ত তরল!জীবনের নির্যাস!শরীরের গভীর থেকে নির্গত হয়।এবং বমির সঙ্গে উঠে এসে মৃত্যুর সতর্কতা দেয়!
(চলবে )



