সামান্যভাবে স্বাধীনতায়, স্বাধীন বেঁচে থাকায়, স্বাধীন একটা যৎসামান্য উনুনও জ্বালানোয় বিশ্বাসার্থী কবি অনুরাধা মহাপাত্র

সামান্যভাবে স্বাধীনতায়, স্বাধীন বেঁচে থাকায়, স্বাধীন একটা যৎসামান্য উনুনও জ্বালানোয় বিশ্বাসার্থী কবি অনুরাধা মহাপাত্র

আলোর পথযাত্রী - বিতস্তা ঘোষাল

আলোর পথযাত্রী

২ : আলোর পথযাত্রী

…সৃষ্টির শেষ রহস্য, ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব সেন

“…সৃষ্টির শেষ রহস্য,ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব সেন

কর্তার সিং দুগ্গল: এক বিরল স্রষ্টা

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন  

অম্লান দত্ত – এক বিশ্ব মানব

রবীন্দ্রনাথ ও বিশ্বকবিতা

এমন কী সন্দীপন যখন স্বপ্নে প্রবেশ করেন তখনও সে স্বপ্নের কোনও ওষ্ঠ নেই,উচ্চারণ নেই

বিশ্বকে বাংলায় চেনার জানলা মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

সোমক দাস : হৃদয়ের ছাইগুলি সযত্নে সাজিয়ে রাখার এক স্বতন্ত্র স্বর

টেবিল, দূরের সন্ধ্যা কবি পার্থপ্রতীম কাঞ্জিলাল

স্ট্রিট-রিয়ালিটির লেখক উৎপল কুমার বসু

অনিতা অগ্নিহোত্রী তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে ইতিহাসই লেখেন

সামান্যভাবে স্বাধীনতায়, স্বাধীন বেঁচে থাকায়, স্বাধীন একটা যৎসামান্য উনুনও জ্বালানোয় বিশ্বাসার্থী কবি অনুরাধা মহাপাত্র

অনুরাধা মহাপাত্রকে কেন পিসি না বলে দিদি বলি এর কারণ আমি নিজেও জানি না।অথচ পিসি বলাটাই সমীচীন ছিল।ছোট বয়সে বাবার সঙ্গে যাঁদের পরিচয় হয়েছিল তাঁরা সকলেই তো পুরুষ হলে কাকু জ্যেঠু বা মামা- অন্য দিকে মহিলা মাত্রেই পিসি কাকিমা…।এর একমাত্র ব্যতিক্রম তিনি।সে যাইহোক আসল বিষয় হচ্ছে আত্মীয়তা।সেটা অবিচ্ছেদ্য।

তিনি কলকাতায় এসেছিলেন ১৯৭৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় এম এ পড়ার জন্য।তখন থেকে মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামের মেয়েটির ঠিকানা কলকাতা।তবে স্থায়ী ঠিকানা এই কয়েক বছর আগে পর্যন্ত অনুরাধা মহাপাত্র কেয়ার অফ বৈশম্পায়ন ঘোষাল।গায়ত্রী নিকেতন, কলকাতা-৫০।এটা বলার একমাত্র কারণ আমাদের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্রের নিবিড়তা।তাঁর জীবনে মা –বাবা রামকৃষ্ণ- মা সারদা- মা কালির পরেই যদি কেউ জীবন্ত ঈশ্বর রূপে পূজিত হন তিনি আমার বাবা, তাঁর পরম শ্রদ্ধেয় দাদা।

কিন্তু এর সঙ্গে তাঁর কবিতা লেখার কী সম্পর্ক? এ প্রশ্ন তাঁকে করলে এক মুহুর্ত না ভেবেই তিনি উত্তর দেন, দাদার সঙ্গ না পেলে জীবন দর্শন সম্পূর্ণ হত না। অথচ বাবা তাঁকে কত বকতেন। সেই বয়সে মনে হত বাবার বকা সহ্য করছেন কেন? পরে বুঝেছিলাম এ হল গুরু শিষ্যর এমন সংযোগ যেখানে আমাদের বাহ্যিক জীবনের চাওয়া-পাওয়া মান অপমান রাগ ক্ষোভ কোনোটাই স্পর্শ করা যায় না। যা বাইরে থেকে বকুনি মনে হলেও অপর পক্ষের কাছে তা কেবল আত্মার অনুসন্ধান।

আমি অবশ্য তাঁর কবিতা বহু বছর পর্যন্ত পড়িনি। শুধু তিনি কেন, আমি সে অর্থে কবিতার নিবিড় পাঠক ছিলাম না অনেক বড়ো পর্যন্ত। জানতাম তিনি সাহিত্যের জগতে খুবই প্রসিদ্ধ কবি- এটুকুই! অথচ তাঁর যে বই প্রকাশিত হল নব্বই-য়ের দশকে তাঁর প্রকাশক ‘নীল সরস্বতী’ যা আমাদের প্রেস। এরপরের বইটির প্রকাশক ‘ভাষা সংসদ’ যাতে আবার প্রকাশকের নামের জায়গায় আমার নাম। এই নামের সূত্র ধরেই দিদির কবিতা পড়তে বাধ্য হলাম। কারণ আমাদের কলেজের কবিতা সাহিত্য নিয়ে আড্ডায় একদিন এক কবি বন্ধু একটি বই নিয়ে এসে আমার হাতে দিয়ে বললেন- ‘এই তুই প্রকাশক? অনুরাধা মহাপাত্রের বই তুই বের করেছিস?’ আমি আকাশ থেকে পড়লেও অল্প হেসে সে যাত্রায় ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কিছু না বলে বইটা উল্টেপালটে দেখে বাড়ি চলে এলাম। সেই রবিবার অনুরাধাদি এলে বললাম- ‘তোমার বইয়ের প্রকাশক আমি? আমার কপি কোথায়?’

দিদি বিষয়টা বুঝতে না পেরে বাবার দিকে চাইলে বাবা বললেন- ‘ওকে সই করে একটা বই দিয়ে দিস।’

বলা ভালো সেই আমার প্রথম দিদিকে পড়া শুরু। “রন্ধনশালায় আছে আমারও চুল্লি হবার অধিকার।/কিন্তু ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসীকে কে জ্বালাবে শূন্যে বিদ্যুতে?/সারাদিন এই ভাবি-ফুল আর ছাই শেষে নক্ষত্রের/ বোবা অট্টহাস।/’ফিরে এসো’, বললেও কোনোদিন কোনো চাকা/ ফেরে না আবার।/অতলান্ত থেকে এই অক্ষর তুলে আনা।/ব্যর্থ এই বেঁচে থাকা কিছুই পারে না।/নিজেকে আগুন করে নিজে, আগুনের ওপরে শুয়ে, তারা গোনা।/ফলে আর কবি হওয়া কখনো হল না।/বরং একটু ভালো শাক-পাতা-রান্না খাবার লোভে/ দেখি, ইত্যাকার শ্মশান ও শহর থেকে/ জ্বলা কয়লা, চণ্ড কয়লা, ক্ষয়-কয়লা/আঁচলে কুড়িয়ে ওই ফাটা ঠোঁট, ঝাঁকড়া চুল,/ কালশিটে পড়া চোখ ব্রহ্মময়ী সাজাচ্ছেন /রান্নাঘর কবিতা থেকে দশফুট তেরো ইঞ্চি দূরে।”( বেঁচে থাকা, টুকিটাকি –উৎসারিত আকাশ)

খুবই কঠিন মনে হওয়ার পাশাপাশি কোথায় যেন একটা ইমেজ তৈরি হয়ে যাচ্ছিল নিজের মনের মধ্যে।ভাবার চেষ্টা করছি ছবিটাকে, কিন্তু ভাঙা ভাঙা ক্ষয়া ক্ষয়া চাঁদের মতো তা সরে যাচ্ছে। পুরো ছবিটা কল্পনা করতে পারছি না। সেই সময় যেহেতু প্রচুর নাচ করতাম, প্রায়ই স্টেজেই কাটাতাম ,তাই কোনো কিছু ভালো লাগলে মুহূর্তের মধ্যে চেষ্টা করতাম তাকে কিভাবে রূপ দেব। এক্ষেত্রে সেটা পারলাম না। রাতে বাবাকে সে কথা বলতে বললেন, ‘কবির লেখায় ডুব দাও।ভেতরে অন্বেষণ করো, যেভাবে আকাশের গভীরতা দেখতে শিখেছ, শ্মশানে বসে জীবনের সারসত্য, তেমনি এখানেও ডুব দাও,পড়ো আরও পড়ো।” 

সেই ডুব দেওয়া থেকেই কবি অনুরাধা মহাপাত্রকে অন্বেষণ।

জন্ম ১৯৫৭ সালে।দশ-এগারো বছর বয়সে নিজে স্কুলে পড়ার পাশাপাশি গ্রামের প্রান্তিক মানুষদের কিম্বা যারা স্কুলে যেতে পারতেন না তাদের জন্য নিজেই পাঠশালা গড়ে তুলে পড়াতেন যা তিনি স্কুলে শিখছেন তাই।সেই ছাত্রীদের মধ্যে একটি বাচ্চার মৃত্যু তাঁকে এতটাই নাড়িয়ে দিয়েছিল যে লিখলেন জীবনের প্রথম কবিতা-‘অনিতা মারা গেছে’।এরপর ১৯৭১ এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে নিজেকে তাঁর শরিক মনে করে স্কুল ম্যাগাজিনে লিখলেন মুজিবুর রহমানকে উৎসর্গ করে কবিতা।এটাই তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা।কলেজ জীবনের মধ্যেই কবিতার সংখ্যা হাজার ছুঁয়ে গেল।আশেপাশের যা কিছু দেখতেন- সমাজ, মানুষ, প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই সবই হয়ে উঠল তাঁর কবিতার ভাষা। ইতমধ্যে পশ্চিমবঙ্গ সেইসময় যত ছোট বড়ো পত্রিকা বেরত সেখানেই তাঁর লেখা প্রকাশিত হচ্ছিল। এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দিতেন তাঁর বড়ো দাদা, যিনি নিজেও সেইসময় উল্লেখযোগ্য গল্পকার। বাড়িতে ছিল স্বাধীন মুক্ত চিন্তার পরিবেশ। ছেলেবেলা থেকেই প্রকৃতির মতো মুক্তি ও স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তাই তাঁর বন্ধু গাছ, পাখি, মথ, শালিখ, ঘাসফড়িং, শ্যামাঘাস, আকাশ, হাঁস, কলমি-দাম, ধানখেত আর নাথ, কাহার, মাঝি, ধুনুরি, ধানকাটার মজুরপরিবার। সে অর্থে তথাকথিত মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এক মার্জিনাল জগতে বিচরণ করতে বেশি ভালোবাসেন। বেশি প্রাণের স্পর্শ পান বাল্যবান্ধবী পাষাণী, খেলার সঙ্গী ফড়িং নামের ছেলেটি, মাঝি ভূষণজ্যাঠা, নাথ ঘরের সৌদামিনি বউদি, মাটির ঘরের কারিগর নিশানাথদা, ফকিরার মায়ের সান্নিধ্যে।কৈশোরেই প্রবাদপ্রতিম সাহিত্যকার মানিক, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, সতীনাথ, জীবনানন্দ, কমলকুমার মজুমদার, অদ্বৈত মল্লবর্মন,জীবনানন্দ,সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, শিবরাম চক্রবর্তী, দীপক মজুমদার, জ্যোতির্ময় দত্ত, শঙ্খ ঘোষ ও দেবেশ রায়ের লেখা বিচিত্র ভাবে উৎসুক করে তোলে তাঁকে।

এর পর যখন গ্রামের জেলার মেয়েদের স্কুল বড়োজোর কলেজ পর্যন্ত গণ্ডী তখন তিনি একা একটা মেয়ে, যার কলকাতা শহরে কেউ নেই –চলে এলেন সেখানেই পড়তে।১৯৭৯ সাল তাঁর জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য পর্ব।তাঁর সঙ্গে পরিচয় হল অনুবাদ পত্রিকার সম্পাদক বৈশম্পায়ন ঘোষালের।এতদিন তাঁর লেখা ছিল সমাজ কেন্দ্রীক, প্রতিবাদ বা বিদ্রোহ ,প্রেমের পাশাপাশি এবার তাঁর কবিতার গতি অজস্র ধারায় বইতে লাগল।অধ্যাত্মভাবেও বাঙ্ময় হয়ে উঠল কবিতা।তারই প্রকাশ ‘শ্রীমায়ের আকাশ’।

তিনি লেখেনঃ

 “… হায় মধ্যবিত্ত, হায় মধ্যপন্থী শোক!/উপনিষদ অথবা মাও-জে-দঙ-এর পকেটবুক সংস্করণ / বাজারে বেরোয়।/রামপ্রসাদের মাঠে লাল নীল পরমাণু-ডিম। /বস্তুত রাত্রি এই জীবনকে ছিন্নমস্তার মতো / অবিরাম প্রতীকী করেছে। /আরও কতোদিন ঠিক বেঁচে থাকতে হবে?/ আগামী বছরের বাজেট অবধি।/তখন কি জলের ধ্বনিও কান থেকে সাপের গতিতে / বহুদূরে সরে যাবে?/এখনও মনে হয় সদ্য জন্মানো সব শিশুদের চোখের/ কাজলে কিছু দূর্বাদলের আভা/ বৃষ্টির ছায়া হয়ে দোলে।” ( গতি ও মৃত্যর কথা)

অম্লান দত্ত, শিবানারায়ণ রায় তাঁর গদ্য চিন্তাকে সমৃদ্ধ করে।মহাভারত তাঁর প্রিয় গ্রন্থ। নব্বইয়ের দশকেই তাঁর ইংরেজি অনুবাদ গ্রন্থ “Another Spring, Darkness: Selected Poems” প্রকাশিত হয়। মূলত আমেরিকান কবি ও গবেষক ক্যারোলিন রাইট (Carolyne Wright) অনুবাদ করেছেন। সঙ্গে ছিলেন প্রবাদপ্রতীম ব্যক্তিত্ব জ্যোতির্ময় দত্ত। কাব্যগ্রন্থটি গ্রামীণ ও শহুরে প্রান্তিক মানুষের সংগ্রাম, একাকীত্ব, এবং সামাজিক-রাজনৈতিক অবদমনকে পরাবাস্তববাদী ভাবনার আলোকে তুলে ধরে। মেদিনীপুর ও কলকাতার পটভূমিতে রচিত এই কবিতাগুলো সুবিধাবঞ্চিত মানুষের যন্ত্রণার এক অনন্য সাহিত্যিক দলিল হিসেবে চিহ্নিত হয়। অনুরাধা এরপরই ইউরোপে কবিতা পাঠ করতে যান ফ্রান্স থেকে আসা আহবানে।

নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন… “আমি আসলে ক্রমশ খুব সামান্য একজন মানুষ হতে চাই- যতটা সামান্য একজন কাঠকুড়ানি মেয়ে, ছাগলছানা কোলে আদিবাসী, ধানের বোঝা বয়ে নিয়ে যাওয়া নৌকোর মাঝি বা কোনো একজন পথিক। আমি একজন অন্বেষণরত পথিক। আমি সামান্যভাবে স্বাধীনতায়, স্বাধীন বেঁচে থাকায়, স্বাধীন একটা যৎসামান্য উনুনও জ্বালানোয় বিশ্বাসার্থী, যদি সেই আলো যে কোনো নক্ষত্রের চেয়েও প্রদীপ্ত হয় যে কোনো মুখোশের বিরুদ্ধে।

জীবিকার কারণে একাধিক এন জিও সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন নানা সময়। কিন্তু কবিতার অমোঘ টান তাঁকে দীর্ঘদিন কোথাও থিতু হতে দেয়নি।ভাড়া বাড়িও বদলেছেন একাধিক বার। মানসিকভাবে শারীরিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন বহু সময়।কবিতা তাকে আশ্রয় দিয়েছে মায়ের মতোই। শ্রী বৈশম্পায়ন কে উৎসর্গ করে লিখলেন –

“এসেছেন তাই, এক সাধক, এই স্থানে, /আকাশ, পুষ্প, মৃত্তিকায় উদ্ভাসন, /ক্রন্দসী, পূজা করি, তাঁকেই যে,/ মানস পুজা, নেই আবাহন, বিসর্জন।/মায়ের মতন, চিবুকে তিনি, আঙুল ছুঁয়ে,/ জীবনভরা, অন্ধকার সমুদ্রের, দূর বাঁকে /পিতার মতো, আভাস পাই, তাঁর চোখে /ভোরের পদ্ম, অতলান্তিক, ফুটে ওঠে।/…পায়ের শব্দে আল্পনায়, কান পাতি,/ মায়ের মতন, অন্ধকার, অনন্তে,/ সকল সিন্ধু, এইখানে, শান্তি পায়, /ঘুম পাড়ায়, মায়ের মতন, ঘুম এসে।/এই মাটির অনাদিকালের, দূর্বাদল /তাঁর পায়ের, স্পর্শে তাই, জন্ম নেয়;/ পিতার মতন, এক সাধক, গরলহীন,/এসেছিলেন, এই স্থানে, আছেন তিনি এই প্রাণে;/অজানা কোনো অসীমতার সৌরভে।”

 নন্দীগ্রামের মেয়ের নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় লেখা কবিতা যেখানে তিনি অজস্র মানুষের কণ্ঠ স্বর হয়ে বলেন- “…আমাদের গ্রাম, আমাদের মাটি এবং মুক্তি আকাশ/ আমাদের গান, আমাদের ভাষা, আমাদের ভালোবাসা / আমাদের ধান, আমাদের ফল, আমাদের লতাপাতা/ আমাদের ফুল, আমাদের আলো, আমাদের নিবিড়তা /অনন্তে আজ আমরাই চলি; আমরা ভুলি না শপথ।”( স্বাধীনতার অধিকার)

“অতঃপর স্রোতের বিরুদ্ধে” তে নিজের লেখা নিয়ে বলতে গিয়ে লেখেনঃ –“প্রায় তিন দশক কবিতা লিখে এরকমই আজ মনে হচ্ছে, না, আমার আর কোনো তৃতীয় পা বা দ্বিতীয় মস্তিষ্ক অথবা দ্বিতীয় হৃদয়ের জন্ম হয়নি। আমি আমিই থেকে গেছি- আমার মাথার ওপর কোনো সোনার বা শোলার মুকুট নেই-কিন্তু মাথা আছে। কিন্তু পৃথিবী কি বদলেছে? দেখি একটু ভাবা যাক। বিশ্ব ছিল, বিশ্বায়ন হয়েছে। যে কোনো প্রাণের একটা ক্লোন হতে পারে, কৃত্রিম হৃৎপিণ্ড বসানো যেতে পারে, ক্লোন শিশু হতে পারে। বিজ্ঞানের দাপটে একজন পুরুষ নারী হতে পারে। বিদেশ থেকে এমন কিছু পরিপূরক খাদ্যপ্রাণ আসতে পারে তাতে বাংলার গেঁড়িগুলি, শামুক থেকে সজনে ডাঁটা, শুশনিশাকও বেমালুম ভুলে যেতে পারে লোক। হকিংয়ের শূন্যতাও আর মানুষের অজানা নয়। যদিও আমাদের দর্শন, কবিতা, সৃষ্টি, শিল্পের শুরুতেই এই নিরাকারত্ব, এই অন্ধকার শূন্যতার কথা মেলে-যার থেকেই বুঝি “শূন্যরূপা শশিভালী” কবিতা পংক্তিটির জন্ম।

কিন্তু এসব সত্ত্বেও চারিদিকে মানবিকতার জায়গাটি খুব শূন্য-আমরা কি একটা বর্বর হিংস্র প্রস্তরযুগেই পড়ে নেই! নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথাই ভাবি, চারপাশের বেঁচে থাকার করুণ লজ্জাজনক অবস্থান ভেবে বিপন্ন বোধ করি। কোথাও একটা সহজ মানবিকতার স্পর্শও নেই- দেশ, সমাজ বদলের কথা তো অনেক দূরে! গিরগিটি, টিকটিকি, এরা হয়তো বহুযুগ আগের প্রজাতি। প্রাগৈতিহাসিক! কিন্তু আধুনিক মানুষ ততটাই প্রাগৈতিহাসিক হচ্ছে-বিশেষ করে শিক্ষিত সমাজ প্রায় মানবিকতাশূন্য একটা অন্ধকার জগতে বাস করছে মনে হয়।

আমরা কি নিজেকে প্রশ্ন করি, কেন এই অন্ধকার?বোধ হয় নয়। নিজের কাছে কি খুব নিভৃতে জানতে চাই কেন এলাম পৃথিবীতে?আমাদের সুদীর্ঘ ইতিহাসই বা আমাদের কী অভিজ্ঞতা দিয়েছে?কলিঙ্গ যুদ্ধে দয়ানদী মানুষের রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল, প্রায় সবটাই এই অভিজ্ঞতার কথা বলে। আর আমরা কোন্ ভবিষ্যতের দিকেইবা যাচ্ছি? এক সময়ে মন্বন্তরে শত শত মানুষ মরে পড়ে থাকলে তাদের মৃতদেহের ওপর কোঁচা লুটিয়ে বাবুরা ডিঙিয়ে পার হয়ে চলে গেছে ফুর্তি করতে। আজো আমরা অভাবী, পাগল, ভিখিরি, শ্রমিক, অন্ত্যজ, অবহেলিতের শবের ওপর দিয়ে ডিঙিয়ে চলে যাই আমাদের তথাকথিত শিল্প, সভ্যতা, কৃষ্টি ও ক্ষমতায়নের দিকে-আমাদের মনুষ্যত্ব মরা কেন্নোর মতো অন্ধকারে থেকে যায়!”

অনুরাধার এযাবৎ প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থ ৩২ টি।ইংরেজিতে দুটি।গদ্য গ্রন্থ ৫টি।লিখেছেন কবি শঙ্খ ঘোষকে নিয়ে ১২০০ পাতার দীর্ঘ গদ্য। বিশ্বের প্রায় বহু ভাষায় অনুদিত তাঁর কবিতা।পেয়েছেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্মৃতি পুরস্কার, বাংলা অকাদেমি পুরস্কার, ভাষা সংসদ প্রদত্ত  “অনুবাদ পত্রিকা জীবনকৃতি সারস্বত সম্মান সহ একাধিক পুরস্কার।এর পর প্রশ্ন জাগে এত লেখা এত সম্মানের পরেও সেইভাবে তাঁকে নিয়ে আলোচনা বা কাজ হল কী? নাকি তাঁর ভাষায় “ভালোবাসা ক্রমে ধ্বংস হলে কবিতা লেখা হয়ে থাকে…” এটাই সারস্বত সত্য!        

আলোর পথযাত্রী - বিতস্তা ঘোষাল

অনিতা অগ্নিহোত্রী তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে ইতিহাসই লেখেন

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

সামান্যভাবে স্বাধীনতায়, স্বাধীন বেঁচে থাকায়, স্বাধীন একটা যৎসামান্য উনুনও জ্বালানোয় বিশ্বাসার্থী কবি অনুরাধা মহাপাত্র

This entry is part 16 of 16 in the series আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

সামান্যভাবে স্বাধীনতায়, স্বাধীন বেঁচে থাকায়, স্বাধীন একটা যৎসামান্য উনুনও জ্বালানোয় বিশ্বাসার্থী কবি অনুরাধা মহাপাত্র

This entry is part 16 of 16 in the series আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর

Read More »

১৫ : অনুবাদের বাদ বিসংবাদ ও সংবেদনা

This entry is part 16 of 16 in the series আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক ১ : অনুবাদের বাদ,

Read More »