সোমক দাস : হৃদয়ের ছাইগুলি সযত্নে সাজিয়ে রাখার এক স্বতন্ত্র স্বর

সোমক দাস : হৃদয়ের ছাইগুলি সযত্নে সাজিয়ে রাখার এক স্বতন্ত্র স্বর

আলোর পথযাত্রী - বিতস্তা ঘোষাল

আলোর পথযাত্রী

২ : আলোর পথযাত্রী

…সৃষ্টির শেষ রহস্য, ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব সেন

“…সৃষ্টির শেষ রহস্য,ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব সেন

কর্তার সিং দুগ্গল: এক বিরল স্রষ্টা

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন  

অম্লান দত্ত – এক বিশ্ব মানব

রবীন্দ্রনাথ ও বিশ্বকবিতা

এমন কী সন্দীপন যখন স্বপ্নে প্রবেশ করেন তখনও সে স্বপ্নের কোনও ওষ্ঠ নেই,উচ্চারণ নেই

বিশ্বকে বাংলায় চেনার জানলা মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

সোমক দাস : হৃদয়ের ছাইগুলি সযত্নে সাজিয়ে রাখার এক স্বতন্ত্র স্বর

টেবিল, দূরের সন্ধ্যা কবি পার্থপ্রতীম কাঞ্জিলাল

স্ট্রিট-রিয়ালিটির লেখক উৎপল কুমার বসু

অনিতা অগ্নিহোত্রী তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে ইতিহাসই লেখেন

সামান্যভাবে স্বাধীনতায়, স্বাধীন বেঁচে থাকায়, স্বাধীন একটা যৎসামান্য উনুনও জ্বালানোয় বিশ্বাসার্থী কবি অনুরাধা মহাপাত্র

আজন্ম-অর্জিত ভাষার পক্ষে লড়াইয়ের কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

“আসলে দিগন্ত বলে কিছু নেই, যা আছে তা
বৃক্ষরাজিরেখা দিয়ে আকাশ-পরিধিটুকু আঁকা…

আসলে সম্পর্কগুলি দিগন্তের মতো,
নেই তবু আছে মনে হয়।”

বাংলা সাহিত্যে এমন কিছু লেখক আছেন, যাঁদের উপস্থিতি কখনও উচ্চকিত নয়, অথচ তাঁদের লেখা পাঠকের মনে দীর্ঘকাল ধরে অনুরণিত হতে থাকে। তাঁরা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকেও পাঠকের অন্তর্জগতে এক গভীর ও স্থায়ী আসন নির্মাণ করেন। কবি, কথাশিল্পী ও প্রাবন্ধিক সোমক দাস সেই বিরল পরিসরের একজন।

সোমক দাসকে একক কোনো অভিধায় বেঁধে ফেলা কঠিন। তিনি কবি, গল্পকার, স্মৃতিলেখক, পাঠক এবং একই সঙ্গে এক অস্থির অনুসন্ধানী মন। তাঁর সাহিত্যজুড়ে বারবার ফিরে আসে সম্পর্কের ভঙ্গুরতা, মানুষের অন্তর্গত নিঃসঙ্গতা, গৃহহীনতার বোধ, প্রেম, আত্মধ্বংসের আকর্ষণ এবং শেষ পর্যন্ত জীবনের কাছেই ফিরে আসার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা। তাঁর কবিতা যেমন গদ্যের দিকে হাত বাড়ায়, তেমনই তাঁর গদ্য কখনও কখনও কবিতার গোপন ছন্দে স্পন্দিত হয়।

সোমক দাসের সঙ্গে আমার পরিচয়ের সময়কাল নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে বয়স তখন আট বা নয় বছরের বেশি নয়। আমাদের সিঁথির পুরোনো বাড়িতে প্রায়ই নানা সাহিত্যিক, শিল্পী, কবি, অনুবাদক এবং মননশীল মানুষের আসা-যাওয়া ছিল। তাঁদের ভিড়ের মধ্যে একজন সুদর্শন, প্রাণবন্ত মানুষকে আলাদা করে মনে পড়ে। তিনি সোমক দাস।

সেই বয়সে তাঁর সাহিত্য বুঝবার ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু মানুষটিকে মনে রাখার মতো কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল। পরে যখন বড় হলাম, বুঝলাম তিনি শুধু একজন লেখক নন, বাংলা সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র সত্তা। আর তখনই ধীরে ধীরে তাঁর লেখা আমার পাঠজগতের অংশ হয়ে উঠতে শুরু করল।

সোমকের নিজের মুখেই বহুবার শুনেছি তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের কথা। অলকেশ ভট্টাচার্যের হাত ধরেই তাঁর পরিচয় হয়েছিল বৈশম্পায়ন ঘোষালের সঙ্গে। সে প্রসঙ্গ স্মরণ করতে গিয়ে তিনি প্রায়ই বলতেন—“অলোকেশ না থাকলে দাদার সঙ্গে আমার পরিচয়ই হত না।”

একদিনের সেই প্রথম সাক্ষাতের গল্পও তিনি শুনিয়েছিলেন। কলেজ স্ট্রিটের অনুবাদ পত্রিকার অফিসে গিয়ে দেখেছিলেন এক তরুণ বসে আছে। বৈশম্পায়ন ঘোষাল তখনও আসেননি। তরুণটি বলেছিল—“দাদা কিন্তু সত্যিই প্রবলেম সলভার। পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে মানুষ তাঁর কাছে আসে, ফোন করে, পরামর্শ নেয়।”

সোমক পরে বলেছিলেন—“সেদিনই বুঝেছিলাম, অনুবাদ পত্রিকার অফিসটা কেবল একটা সাহিত্যপত্রিকার দপ্তর নয়। এর ভিতরে আরও কিছু আছে। বিপন্ন মানুষকে পথ দেখানো, সাহস দেওয়া, মানুষকে ভরসা দেওয়া—সেটাই যেন আসল কাজ।”

এই বিশ্বাস তাঁর সারাজীবনের সঙ্গী হয়ে ছিল।

জন্ম ১৯৫৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর, কলকাতার দর্জিপাড়ায়। শৈশবের একটি বড় অংশ কেটেছে হুগলির আঁটপুরে। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন অসামান্য মেধাবী। শ্রীবিদ্যানিকেতনে ডাবল প্রোমোশন পেয়ে উচ্চশ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়া থেকে শুরু করে কলেজজীবনে ধারাবাহিক সাফল্য—সবই তাঁর মেধার সাক্ষ্য বহন করে।

প্রথমে প্রেসিডেন্সি কলেজ, পরে বিদ্যাসাগর কলেজে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা। কর্মজীবনে যোগ দেন এ.জি. বেঙ্গলে। কিন্তু চাকরি তাঁর একমাত্র পরিচয় হয়ে ওঠেনি। সমান্তরালে চলতে থাকে সাহিত্যচর্চা, পাঠ এবং আত্মঅনুসন্ধান।

আসলে সোমকের সাহিত্যিক সত্তার বীজ রোপিত হয়েছিল আরও আগে।

নিজেই লিখেছেন, গ্রামের বাড়ির চিলেকোঠা ছিল তাঁর প্রথম সাহিত্যরাজ্য। হ্যারিকেনের আলোয় বসে সঞ্চয়িতা আবৃত্তি করতেন। কবিতা পাঠ করতে করতে অনুভব করতেন এক অদ্ভুত শিহরণ। পরে জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’ তাঁর সামনে খুলে দেয় এক সম্পূর্ণ নতুন জগৎ। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে কবিতার দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন, জীবনানন্দ শেখালেন কবিতার ভিতরে বাস করতে।

সেই সূত্র ধরেই সত্তরের দশকে ছোট পত্রিকা আন্দোলনের আবহে তাঁর আত্মপ্রকাশ। পরপর প্রকাশিত হতে থাকে কাব্যগ্রন্থ। ‘নিরাপদ দূরত্বে থাকুন’, ‘প্রবাহ’, ‘শূন্য পাত্রের পাশে’, ‘বিলাপের ভাষা’, ‘তা তা থৈ থৈ’—একটি একটি করে গড়ে ওঠে তাঁর নিজস্ব কাব্যভুবন।

সোমকের কবিতা পড়লে মনে হয়, তিনি যেন ক্রমাগত কোনো হারিয়ে যাওয়া জিনিসের খোঁজ করছেন। সেই হারানো জিনিসটি কখনও প্রেম, কখনও শৈশব, কখনও সম্পর্ক, কখনও বা নিজেকেই।

তাঁর কবিতার ভাষা আপাত সরল। কিন্তু সেই সরলতার ভিতরে লুকিয়ে থাকে গভীর অস্তিত্ববোধ। সম্পর্ক নিয়ে তাঁর সংশয়, মানুষের একাকিত্ব নিয়ে তাঁর ভাবনা, জীবনের অস্থিরতা নিয়ে তাঁর প্রশ্ন—সবই এসে জমা হয় কয়েকটি সাধারণ শব্দের মধ্যে।

এই কারণেই তাঁর কবিতা পাঠকের মনে দীর্ঘদিন থেকে যায়। পাঠ শেষ হয়ে যায়, কিন্তু কবিতার নীরবতা শেষ হয় না।

কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পরও সোমক দাস থেমে থাকেননি। ধীরে ধীরে তিনি গল্প ও গদ্যের জগতে প্রবেশ করেন। আর সেখানেও দেখা যায় একই মানুষকে—যিনি ঘটনাকে নয়, অনুভবকে কেন্দ্র করে লিখতে চান।

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক অমর মিত্র এক জায়গায় লিখেছিলেন—“সোমক দাস গল্প লেখেন না, কবিতা লেখেন।”

এই মন্তব্যের ভিতরে গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। তাঁর গল্পের গঠন অনেক সময় প্রচলিত কাহিনিরীতি অনুসরণ করে না। সেখানে ঘটনা অপেক্ষা পরিবেশ, বর্ণনা অপেক্ষা অনুভূতি, আর চমকের বদলে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হওয়া মানবিক সত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তাঁর গল্পের মানুষরা নিখুঁত নয়। তারা ভাঙে, ভুল করে, ভালোবাসে, পালিয়ে যায়, আবার ফিরে আসে। তাদের জীবন যেমন বাস্তব, তেমনই গভীরভাবে কবিতাময়।

সম্ভবত এই কারণেই সোমক দাসকে পড়া মানে কেবল সাহিত্য পাঠ নয়; এক মানুষের দীর্ঘ আত্মসন্ধানের যাত্রায় অংশগ্রহণ করা।

সোমক দাসের সাহিত্যিক পরিচয় নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি বিষয় বারবার ফিরে আসে—তিনি মূলত কবি না গল্পকার? প্রশ্নটির উত্তর সম্ভবত তিনিও স্পষ্ট করে দিতে চাইতেন না। কারণ তাঁর গল্পের মধ্যে কবিতার প্রবাহ যেমন রয়েছে, তেমনই তাঁর কবিতার মধ্যে লুকিয়ে থাকে আখ্যানের বীজ।

‘ঘনশ্যাম বাজার’, ‘নীলকণ্ঠের নীচে’, ‘পরুষ পদাবলী’, ‘জড়িয়ে গেছে পা’, ‘শ্রীশ্রী সিদ্ধেশ্বরী কালিকা আশ্রম’, ‘দগ্ধতার দিন’, ‘কেন মেঘ আসে’, ‘ঘনশ্যাম বাগিচা’—প্রতিটি গ্রন্থই পাঠককে এক বিশেষ অভিজ্ঞতার মধ্যে নিয়ে যায়। সেখানে প্রচলিত অর্থে কাহিনির নাটকীয়তা নেই; আছে মানুষের ভেতরের আবহাওয়া।

সোমকের লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত পাঠককে ধরে রাখার ক্ষমতা। তাঁর গদ্য শুরু হয় প্রায় অনায়াস ভঙ্গিতে, কিন্তু কয়েক পৃষ্ঠা এগোতেই পাঠক বুঝতে পারেন, তিনি এমন এক বয়ানের ভিতরে প্রবেশ করেছেন, যেখান থেকে সহজে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়।

‘ঘনশ্যাম বাজার’-এর শুরুটুকু আজও মনে পড়ে। আত্মজৈবনিক স্বীকারোক্তির ঢঙে লেখা সেই গদ্য পাঠককে একের পর এক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। সত্য বলা, মানসিক বিপর্যয়, শহুরে প্রান্তজীবন, যৌনতা, অপমান, আকাঙ্ক্ষা—সবকিছুই সেখানে উপস্থিত, কিন্তু কোনোটি আলাদা করে প্রদর্শিত নয়। বরং জীবনেরই অংশ হয়ে উঠেছে।

এই আখ্যানরীতির কারণেই অমর মিত্র লিখেছিলেন, সোমকের গল্পে থাকে না সেই ‘পাহাড়ি রাস্তার হঠাৎ বাঁক’, যাকে আমরা চমক বলি। থাকে দূরগামী পথ—যা পাঠককে নিজের মতো করে ভাবতে শেখায়। এই মূল্যায়ন অত্যন্ত যথার্থ।

সোমকের গল্পের মানুষরা অধিকাংশই প্রান্তিক, বিপন্ন, অনিশ্চিত। কিন্তু তারা করুণার পাত্র নয়। তারা নিজেদের ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষ। তাদের ভাঙনের মধ্যেও এক ধরনের মর্যাদা আছে।

সোমকের ব্যক্তিজীবন নিয়েও কম আলোচনা হয়নি। তাঁর লেখার সঙ্গে জীবনের দূরত্ব কখনও খুব বেশি ছিল না। বরং অনেক সময়ই মনে হয়েছে, তিনি নিজের জীবনকেই নানা আখ্যান, চরিত্র ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পুনর্লিখন করছেন।

প্রেম, বিচ্ছেদ, সংসার, বন্ধুত্ব, অনিশ্চয়তা, ঘরবদল, ভ্রমণ—এসব তাঁর জীবনেরও অংশ ছিল। তিনি যেন চিরকাল এক জায়গা থেকে আর-এক জায়গায় যাত্রারত মানুষ। স্থিতি তাঁর স্বভাব ছিল না।

একদিন কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন, “পাখির আকাশই ভালো। সেখানেই সে গলা খুলে গান গাইতে পারে। খাঁচা সোনার হলেও গান হারিয়ে যায়।” এই বাক্যের মধ্যেই যেন তাঁর জীবনদর্শন ধরা আছে। তিনি নিরাপত্তার চেয়ে স্বাধীনতাকে, স্থিতির চেয়ে যাত্রাকে, নিশ্চিততার চেয়ে অনুসন্ধানকে বেশি মূল্য দিতেন। তবে এই স্বাধীনতার মূল্যও কম ছিল না। তার সঙ্গে ছিল একাকিত্ব, সংশয়, অস্থিরতা এবং আত্মসংঘর্ষ। তাঁর বহু কবিতা ও গল্পে সেই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ছায়া স্পষ্ট।

লেখক হিসেবে সোমকের একটি বড় পরিচয় আড়ালে থেকে যায়—তিনি ছিলেন অসাধারণ পাঠক। নতুন বই বেরিয়েছে শুনলেই তা সংগ্রহ করার চেষ্টা করতেন। বই হাতে না পাওয়া পর্যন্ত ফোন করতেন। আর পড়া শেষ হলে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় জানাতেন তাঁর প্রতিক্রিয়া। বাংলা সাহিত্যে লেখকদের নিয়ে তাঁর পাঠ-নিবন্ধগুলিও বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। তিনি কেবল বইয়ের সারসংক্ষেপ দিতেন না; বরং বইটির অন্তর্লীন শক্তি, সীমাবদ্ধতা ও তাৎপর্য নিয়ে ভাবতেন। পাঠক হিসেবে তাঁর সততা এবং কৌতূহল ছিল বিরল। অনেক লেখকের প্রথম বই তিনি যত মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন, ততটা মনোযোগ হয়তো প্রতিষ্ঠিত লেখকেরাও পান না। এই উদারতা তাঁর চরিত্রের অন্যতম বড় গুণ।

সোমকের জীবনে বৈশম্পায়ন ঘোষালের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মুখে বহুবার শুনেছি—“দাদার সংস্পর্শে আসার পর থেকেই আমি অন্যরকম শক্তি পেয়েছি।”

এই বিশ্বাস কেবল আবেগের জায়গা থেকে নয়, জীবনদর্শনের জায়গা থেকেও ছিল। বাবার প্রয়াণের পরে স্মরণসভায় তাঁকে দেখেছিলাম শিশুর মতো কাঁদতে। কোনো দীর্ঘ বক্তৃতা নয়, কোনো সাহিত্যিক ভঙ্গি নয়—শুধু এক গভীর ব্যক্তিগত শোক। পরবর্তীকালে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখেছি, পড়ার টেবিলের কাছে সেই স্মৃতি আজও জেগে আছে। মানুষের প্রতি, সম্পর্কের প্রতি, বিশ্বাসের প্রতি সোমকের যে আস্থা ছিল, তার একটি বড় উৎস সম্ভবত এই মানবিক বন্ধনগুলি।

সোমক দাসকে মনে পড়লে আমার বারবার একটি কথাই মনে হয়—তিনি যেন হৃদয়ের ছাইগুলি সযত্নে সাজিয়ে রাখতেন।জীবনের পরাজয়, অপমান, ক্ষয়, ভাঙন—এসব তিনি এড়িয়ে যাননি। আবার সেগুলিকে আত্মদয়ার উপকরণও করেননি। বরং শিল্পে রূপান্তরিত করেছেন। তাঁর কবিতায় যেমন রয়েছে গভীর নীরবতা, তেমনই তাঁর গল্পে রয়েছে দীর্ঘ প্রতিধ্বনি। পাঠ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও সেই শব্দ আমাদের ভেতরে থেকে যায়।

বাংলা সাহিত্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অনেক লেখকের নাম উচ্চারিত হয়, অনেকের হয় না। কিন্তু মূল্যায়নের ইতিহাস এবং সাহিত্যের ইতিহাস সবসময় এক নয়। সোমক দাসের সাহিত্যকে নতুন করে পাঠ করা প্রয়োজন। কারণ তিনি আমাদের সময়ের মানুষের অন্তর্গত ভাঙন, নিঃসঙ্গতা, প্রেম, অস্থিরতা এবং আত্মঅনুসন্ধানের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল রেখে গেছেন। সম্ভবত তাঁর নিজেরই ভাষায় বলা যায়—দিগন্ত যেমন বাস্তবে নেই, অথচ আমাদের চোখে থাকে, তেমনই বাংলা সাহিত্যের মানচিত্রে সোমক দাসের উপস্থিতি। তিনি হয়তো কেন্দ্রের আলোয় ছিলেন না; কিন্তু তাঁর রচনা আজও পাঠকের মনের ভিতরে একটি দীর্ঘ দিগন্তরেখা এঁকে রাখে। আর সেই কারণেই তাঁকে ফিরে দেখা জরুরি।

আলোর পথযাত্রী - বিতস্তা ঘোষাল

বিশ্বকে বাংলায় চেনার জানলা মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় টেবিল, দূরের সন্ধ্যা কবি পার্থপ্রতীম কাঞ্জিলাল

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

আজন্ম-অর্জিত ভাষার পক্ষে লড়াইয়ের কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

This entry is part 12 of 17 in the series আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

আজন্ম-অর্জিত ভাষার পক্ষে লড়াইয়ের কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

This entry is part 12 of 17 in the series আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর

Read More »

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য শ্যামলকৃষ্ণ বসু ৯ অযোধ্যাপতি রাজা দশরথ  [ সর্গ ৫-৭ ] সরযূ নদীর তীরে কোশল নামে সে এক বিশাল দেশ। বিশাল আয়তনের মহতী সমৃদ্ধিশালী

Read More »