শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন  

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন  

আলোর পথযাত্রী - বিতস্তা ঘোষাল

আলোর পথযাত্রী

২ : আলোর পথযাত্রী

…সৃষ্টির শেষ রহস্য, ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব সেন

“…সৃষ্টির শেষ রহস্য,ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব সেন

কর্তার সিং দুগ্গল: এক বিরল স্রষ্টা

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন  

(অন্তিম পর্ব )

শঙ্খ ঘোষ কেন অনুবাদে অগ্রসর হলেন?কেন ইকবাল, গিরীশ, গ্যিয়েন বা ওকাম্পো?তাঁর অনুবাদের মূল ভাবনাই বা কী ছিল ছিল? এই সকল প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে উত্তরের সন্ধান করতে গেলে দেখতে হবে তার প্রেক্ষাপট।

ষাটের দশকে ব্রেখট-চর্চার (জার্মান) একটি স্রোত লক্ষ্য করা যায়, একই রকমভাবে সত্তরের দশকে শুরু হয় তৃতীয় বিশ্ব এবং স্পেনীয় কবিতা চর্চা। শঙ্খ ঘোষও এই চর্চা থেকে দূরে ছিলেন না, সঙ্গী ছিলেন জার্মান ভাষায় দক্ষ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত এবং তৃতীয় বিশ্বের সাহিত্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের উৎসাহেই তিনি নিকোলাস গ্যিয়েন-চর্চায় মন দিয়েছিলেন। এমনকি গ্যিয়েনের অনূদিত-গ্রন্থ উৎসর্গও করেছেন মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের সঙ্গে সম্পাদিত ‘সপ্ত সিন্ধু দশ দিগন্ত’-এর প্রারম্ভিক আলোচনার এক স্থানে বলেছেন, “অনুবাদকের কাজ মাতার না হলেও ধাত্রীর…” ধাত্রীর মতোই সৃষ্টিকে অনুবাদক লালন করে, বড় করে, এক-স্থান থেকে অন্য-স্থানে নিয়ে যায়।

সত্তরের দশকে যখন গিরিশ কারনাড ‘হয়বদন’ নামে তার কন্নড় নাটক লেখেন তখন সারা ভারতে তা আলোড়ন সৃষ্টি করে। চিত্তরঞ্জন ঘোষ বহুরূপীতে ‘ঘোড়ামুখো পালা’ নামে নাটকটির অনুবাদ করেন, এর কিছু গান রচনা করেছিলেন শঙ্খ ঘোষ (তখনও গিরিশ কারনাড ইংরেজি অনুবাদে হাত দেননি)। যদিও তিনি নাটকটি অনুবাদ করেছিলেন ‘হয়বদন’ নামেই (যখন এর ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে), নক্ষত্র নাট্যগোষ্ঠির জন্য। গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় তাই উৎসর্গ করা হয়েছে চিত্তরঞ্জন ঘোষকে।

শঙ্খ ঘোষ অনুবাদ বিষয়ে যে রুচিবাগীশ বা খুঁতখুঁতে ছিলেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না, বেশিরভাগ ইংরেজি ভাষাকে অনুবাদ্য ভাষা হিসেবে গ্রহণ করে তিনি অনায়াসে বলতে পেরেছেন, “আমার বোধবুদ্ধিমতো অনুগত থাকতে চেয়েছি”, তবে অনুগতের সাথে বাংলার পাঠকের কথা ভেবে স্বতন্ত্রও বজায় রেখেছেন। ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’ অনুবাদে গদ্যের চাল হয়েছে কাব্যময় গদ্য; ‘ইকবাল থেকে’ অনুবাদে হয়েছে গদ্যময় কাব্য। কাব্যভাষা অন্তরের নির্যাস, গদ্যভাষা মূলত ব্যবহারিক। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি অনুবাদ করেছেন ইংরেজি থেকে। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য— “আমি অন্তত আমার বোধবুদ্ধিমতো অনুগতই থাকতে চেয়েছি মূললেখাগুলির কাছে, ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষার ক্ষেত্রে অন্যের সাহায্য নিয়ে। … অনুবাদের সময় মনে রাখতে চেয়েছি আমার ভাষার পাঠকদের কথা, লক্ষ্য রাখতে চেয়েছি তাদের অভিজ্ঞতা আর প্রত্যাশার পরিধি।” (ভূমিকা, ‘বহুল দেবতা বহু স্বর’)

হয়বদর-এর ভূমিকায় এটাও বলেছেন— “অনুবাদের চমৎকার একটা চ্যালেঞ্জ আর আনন্দ আছে।”

অনুবাদ নিয়ে বেশি বলার কারণ অনুবাদ পত্রিকার সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক।

তবে একটি বিষয়ে গভীর দুঃখও পেয়েছি। অনুবাদ পত্রিকায় তাঁর অজস্র অনুবাদ ছাপা হয়েছিল।আমি সেগুলো নিয়ে বই করতে চেয়েছিলাম। তিনি অনুমতি দিয়ে বললেন, সমস্ত অনুবাদ গুলো যেন বই করার আগে তাঁকে পাঠিয়ে দিই ।অনেক দিন আগের অনুবাদ, যদি কিছু বদলাতে হয় বদলে দেবেন। আমি পুরোনো অনুবাদ পত্রিকা ঘেঁটে সে সব জেরক্স করে, কোনোটা টাইপ করে তাঁকে পাঠালাম। কিন্তু তা আর ফেরত এল না। কয়েকবার ফোনে কথাও হল।এর মধ্যেই চলে গেলেন তিনি। পরে দেখলাম সেই বই অন্য এক প্রকাশনা সংস্থা থেকে বেরিয়েছে। ভূমিকা যিনি লিখেছেন, তাতে ‘অনুবাদ পত্রিকার উল্লেখ পর্যন্ত নেই। আমার কথা বাদই দিলাম।

তবে সেসব অভিমান, খারাপ লাগা, দুঃখ একান্তই আমার। বাবা বলতেন, “জীবন কেমন/ জ্যা দেখে যেমন”

আমি দেখি তাই সাহিত্যিক শঙ্খ বাবুকে। যিনি লেখেন,‘ একদিন কবিতার কাছে দাবি করা হয়েছে যে, সে বদলে দেবে সভ্যতার মুখশ্রী। কবির দায়িত্ব প্রায় সন্তের, নেতার।’

গত শতকের সত্তরের দশকে প্রতিষ্ঠানকে ভাঙতে চাওয়াই যৌবনের ধর্ম হয়ে উঠেছিল, ধর্ম হয়ে উঠেছিল জীবনকে মৃত্যুর সামনে রেখে দেখা বা মৃত্যুকে দেখা জীবনের সামনে রেখে। তার পর যৌবনের সেই ধর্ম অবরুদ্ধ আক্রান্ত হয়ে ঠাঁই পায় স্বপ্নের ইতিহাসে। কবির স্মৃতিতে হানা দিতে থাকে সেই দেশমনস্ক দীপ্ত মুখগুলি, একটি কবিতায় তিনি লেখেন: “আমি কেবল দেখেছি চোখ চেয়ে/ হারিয়ে গেল স্বপ্নে দিশাহারা/ শ্রাবণময় আকাশভাঙা চোখ।/ বিপ্লবে সে দীর্ঘজীবী হোক…।”

লেখেন গদ্যেও: “শৃঙ্খলার অজুহাতে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন দমনের নামে যখন একটা প্রজন্মকে বিকৃত বিকলাঙ্গ করে দেওয়া হয় পুলিশের অন্ধকার গুহায়, তখন তার বিরুদ্ধে যদি আমরা সরব হতে নাও পারি, তার সপক্ষে যেন আমরা কখনো না দাঁড়াই। এতটুকু ধিক্‌কার যেন আমাদের অবশিষ্ট থাকে যা ছুঁড়ে দিতে পারি সেই জেলপ্রাচীরের দিকে, যার অভ্যন্তর ভরে আছে বহু নিরপরাধের রক্তস্রোত আর মাংসপিণ্ডে…।”

তাঁর সান্নিধ্য যে অর্থে সম্পাদক বা লেখক হিসেবে অন্যরা পেয়েছেন, আমি সেভাবে কখনো মিশিনি। ওনার বাড়ির রবিবারের আড্ডাতেও কখনো যাইনি। কিন্তু যে মুহূর্তগুলো পেয়েছি তাতেই সমৃদ্ধ হয়েছি। দেখেছি বিভিন্ন ঘটনায় প্রতিবাদী একটা মানুষে মুখ,যা কখনো পথে নেমে সোচ্চার, কখনো কলমের মাধ্যমে। দেখেছি চরম অপমানিত, আঘাত পেয়েও নিরুত্তাপ একটা মুখ। ভেতরে ভেতরে রক্তাত্ব হয়েছেন, কিন্তু প্রকাশ্যে একটি খারাপ কথা বা অভিযোগ করেননি, যাতে কোনও প্রকার অশান্ত পরিবেশ, বিতর্ক তৈরি হতে পারে। আমি এই নিয়ে দু’একবার জিজ্ঞেস করেছি। উনি শান্ত স্বরে বলেছেন, “তুমি বৈশম্পায়নবাবুর মেয়ে। এসব তুচ্ছ আলোচনা থেকে দূরে থেকো। আঘাত এলে সহ্য করার মতো মন তৈরি করতে হয়। শান্ত স্থির থাকতে হয়।”

খুব বেশি মতামত দিতেন না, সবাই বলে যাচ্ছেন, আর উনি নীরব শ্রোতা। অথচ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু উনিই। হয়তো সব শোনার পর একটা প্রতিক্রিয়া দিলেন, কিংবা চুপ থাকলেন। এই সব সময় আমি তাঁর ‘শব্দ আর সত্য’ নামে গ্রন্থের একটি প্রবন্ধ পড়ছিলাম। যাতে তিনি লিখেছেন— “শব্দবাহুল্যের বাইরে দাঁড়িয়ে, ভুল আস্ফালনের বাইরে দাঁড়িয়ে সত্যিই যদি নিজেকে, নিজের ভিতর এবং বাহিরকে, আগ্নেয় জীবনযাপনের বিভীষিকার সামনে খুলে দিতে পারেন কবি, সেই হবে আজ তাঁর অস্তিত্বের পরম যোগ্যতা, তাঁর কবিতা।”

বিপুল তাঁর রচনা সম্ভার—কম বয়সিদের জন্যে লেখা ছড়া-উপন্যাস থেকে কবিতা-শিল্প সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ-সাক্ষাৎকার-ভাষণ-অনুবাদ-রবীন্দ্রনাথ। সেই সুবাদে তাঁর পুরস্কার-সম্মাননাও প্রচুর — সাহিত্য অকাদেমি, নরসিংহদাস পুরস্কার, শিরোমণি, রবীন্দ্রপুরস্কার, কবীর সম্মান, সরস্বতী সম্মান, দেশিকোত্তম, পদ্মভূষণ, জ্ঞানপীঠ।

তাঁকে নিয়ে লিখতে বসে এসব কথাই মনে হচ্ছে। কবির তো মৃত্যু হয় না। কবিতায় বেঁচে থাকেন। বার বার মনে হচ্ছে এই মহামারীর সময় তিনি যেন নিজেকে আত্মাহুতি দিয়ে বলে গেলেন-

“এই তো জানু পেতে বসেছি, পশ্চিম

আজ বসন্তের শূন্য হাত—

ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও

আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক। …

আমারই হাতে এত দিয়েছ সম্ভার

জীর্ণ ক’রে ওকে কোথায় নেবে?

ধ্বংস করে দাও আমাকে ঈশ্বর

আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।”

আলোর পথযাত্রী - বিতস্তা ঘোষাল

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন  

This entry is part 7 of 7 in the series আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন  

This entry is part 7 of 7 in the series আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর

Read More »

অনুবাদের স্বর্ণযুগ : মধ্যযুগ  

This entry is part 7 of 7 in the series আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক ১ : অনুবাদের বাদ,

Read More »