আলোর পথযাত্রী - বিতস্তা ঘোষাল
আলোর পথযাত্রী
বিতস্তা ঘোষাল
বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে অনুবাদক রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব। ঔপনিবেশিক বাংলায় সংস্কৃতি ক্ষেত্রের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কালে অনুবাদচর্চার ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পাশ্চাত্য সাহিত্য-সংস্কৃতির গ্রহণে অনুবাদ তখন সক্রিয় মাধ্যম। সেই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বাংলা অনুবাদের পালে দিয়েছেন পুবের বাতাস।সারা জীবন ব্যাপী রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি, ইতালীয়, জার্মান, ফরাসি, জাপানি, চিনা প্রভৃতি ভাষার যে সব কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন তার সংখ্যা নেহাত কম নয়। উৎস-কবিতার ভাষা, কবি ও বিষয়বৈচিত্র্য পাঠক রবীন্দ্রনাথের বিশেষ পরিচয়বাহী।অনুবাদগুলি রবীন্দ্রনাথের আত্মনির্মাণের অংশীদারও।কম বয়সের অনুবাদ যেমন কেবলমাত্র ভাষাশিক্ষার মাধ্যম থাকেনি, কবি রবীন্দ্রনাথের প্রথম দিকের কাব্য ভাবনার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। আলোচক রবীন্দ্রনাথও হাতিয়ার করেছেন অনুবাদকে।
রবীন্দ্রনাথ কুমারসম্ভব অনুবাদ করেন আনুমানিক ১৮৭৪ সালের শেষার্ধে।তখন তাঁর বয়স তেরো-চোদ্দ।তাঁর নিজের অনুবাদে হাতেখড়ি ভাষাশিক্ষার জন্যই। এখনো পর্যন্ত ‘আবিষ্কৃত’ ও সংরক্ষিত রবীন্দ্র পাণ্ডুলিপিগুলির মধ্যে ‘প্রাচীনতম’ মালতী-পুঁথি-তে পাওয়া যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ-কৃত একাধিক গদ্য ও পদ্যের অনুবাদ। জীবনস্মৃতি-তে তার কিছু পশ্চাৎপটও- “সমস্ত দুঃখদিনের পর সন্ধ্যাবেলায় টিমটিমে বাতি জ্বালাইয়া বাঙালি ছেলেকে ইংরেজি পড়াইবার ভার যদি স্বয়ং বিষ্ণুদূতের উপরেও দেওয়া যায়, তবু তাহাকে যমদূত বলিয়া মনে হইবেই, তাহাতে সন্দেহ নাই”। অঘোরবাবুর পর যখন জ্ঞানচন্দ্র ভট্টাচার্য মহাশয় পড়াতে এলেন তখন সমস্ত Macbeth-টাই ‘বাংলা ছন্দে’ তর্জমা করতে হলো রবীন্দ্রনাথকে। সম্ভবত তার আগেই কুমারসম্ভব থেকে অনুবাদ করা হয়ে গেছে। মালতী-পুঁথি-তেই পাওয়া যাচ্ছে মেঘনাদবধ কাব্য বিষয়ক ইংরেজি রচনার পাশাপাশি তার বাংলা তর্জমাও। ভাষা শেখাবার জন্য ভালো কাব্য পড়ালে তরবারি দিয়ে ক্ষৌরকার্য করাবার মত হয় বলে সরস মন্তব্য অবশ্য জীবনস্মৃতি-তেই রয়েছে। ভাষাশিক্ষারক্ষেত্রেঅনুবাদকেঅত্যন্তগুরুত্বপূর্ণউপায়মনেকরেছেনতিনি।তাই দেখা যায় ‘ঘরের পড়া’ যুগের সমস্ত কাব্যানুবাদ গৃহশিক্ষকদের নির্দেশে করা নয়। মালতী-পুঁথি-তে এমন অনেক কাব্যানুবাদ আছে যা বালক কবির স্বেচ্ছাকৃত।
পরবর্তীতে আমেদাবাদে থাকার সময় ‘ইংরেজিতে নিতান্তই কাঁচা’ ছিলেন বলে ডিশনারি নিয়ে ইংরেজি বই পড়ে বিলেত যাবারপ্রস্তুতি নিয়েছেন। অ্যাংলো-স্যাক্সন ও অ্যাংলো-নর্মান সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধগুলির রচনা এই সময়ে। ভাষা শিক্ষার এই পর্বে অসংখ্য অ্যাংলো-স্যাক্সন ও অ্যাংলো-নর্মান কবির অনুবাদ ছাড়াও দান্তে ও পিত্রার্কা-র কাব্যও অনুবাদ করেন তিনি।
বঙ্গাব্দ ১২৮৪ থেকে ১২৯১-রবীন্দ্রনাথের অ-ভারতীয় ভাষার কবিতার অনুবাদকে ‘ভারতী যুগ’ বললে অত্যুক্তি হয় না। বাড়ির পত্রিকা ভারতী-র জন্য রবীন্দ্রনাথ অসংখ্য রচনা সৃষ্টি করেছেন এই সময়। ভারতী-র ‘সম্পাদকের বৈঠক’-এ নানান বিষয়ের রচনা জোগান দেওয়ার ফাঁকে অনিয়মিতভাবে নিয়মিত তিনি যোগান দিয়েছেন বিদেশী কবিতার অনুবাদ। একাধিক প্রবন্ধের মধ্যে পদ্য ও গদ্যে পাওয়া যাচ্ছে বিদেশী কবিতার অনুবাদ। Moore,Heine, Burns, Byron, Mrs. Opie, Shakespeare, Shelley, Tennyson, Chappel, Swinburne, C. Rossetti, E. Arnold, Buchanan, Hugo, Mrs. Browning, Myers, de Vere, Webster, Marston প্রভৃতি কবিদের কবিতার অনুবাদ প্রকাশিত হয় এই সময়ের মধ্যে।
‘Alastor’ রবীন্দ্রনাথের শেলির কবিতা অনুবাদে প্রথম উদ্যোগ। মূল কবিতার প্রথম দুটি স্তবকের অনুবাদেই শেষ হয় অনূদিত পাঠ। এরপর ‘Hymn to Intellectual Beauty’-র অনুবাদে শেষ (সপ্তম) স্তবক বাদ দেওয়া হয়। ৬০৪ ছত্রের কবিতা ‘Epipsychidion’-এর ৫২৯ থেকে ৫৯১ ছত্র পর্যন্ত অনুবাদ করেন রবীন্দ্রনাথ। মূল কবিতার ৬২ ছত্র তাঁর অনুবাদে হয় ৬৪ ছত্র। ‘the owls’, ‘the quick bats’-এর মত উপমার সঙ্গে বাদ পড়ে ‘Elysian isle’, ‘Ionian weather’-এর প্রসঙ্গ।
অনুবাদক রবীন্দ্রনাথ যে Shelley-র কবিতা তাঁর নিজের মত করেই পড়ছেন তা আরও বোঝা যায় তাঁর ‘Stanzas Written in Dejection’-এর অনুবাদে। কবিতাটির পঞ্চম স্তবক অনুবাদে বর্জন করা হয়।রবীন্দ্র গবেষক প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় মনে করেন সম্ভবত তিনি Shelley-র ‘Skylark’ ও অনুবাদ করেছিলেন—কিন্তু তা পাওয়া যায়নি।
এরপর প্রকাশিত হয় অজ্ঞাত আইরিশ ও ওয়েলশ্ গানের অনুবাদ। ভারতী-র শ্রাবণ, ১২৯১ সংখ্যায় ‘বিদেশী ফুলের গুচ্ছ’ শিরোনামে একগুচ্ছ বিদেশী কবিতার অনুবাদ প্রকাশিত হয়। একই শিরোনামে কবিতাগুলি সংকলিত হয় কড়ি ও কোমল (১২৯৩) কাব্যে। ‘স্যাক্সন জাতি ও অ্যাঙ্গলো স্যাক্সন সাহিত্য’, ‘বিয়াত্রিচে, দান্তে ও তাঁহার কাব্য’, ‘পিত্রার্কা ও লরা’, ‘নর্ম্মান জাতি ও অ্যাঙ্গলো নৰ্ম্মান সাহিত্য’, ‘চ্যাটার্টন-বালক কবি’ এবং ‘যথার্থ দোসর’ প্রবন্ধগুলির মধ্যেও বহু বিদেশী কবিতার অনুবাদ প্রকাশিত হয়। Dante, Petrarch. Cædmon-অনুসারী, Chatterton, Marlowé প্রভৃতি এবং অজ্ঞাত অ্যাংলো-স্যাক্সন ও অ্যাংলো-নর্মান কবিদের কবিতার অনুবাদ পাওয়া যায় প্রবন্ধগুলিতে।
বঙ্গাব্দ ১২৯১ ও তার পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ-কৃত অ-ভারতীয় ভাষার কবিতার অনুবাদ সংখ্যা নেহাত কম না হলেও কেবলমাত্র অনুবাদের জন্যই কবিতা অনুবাদ এই পর্বে কম। ১২৯১ সালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা ও আলোচনায় প্রকাশিত হয় যথাক্রমে Buchanan ও Hugo’র একটি করে কবিতা। ‘বিদেশী ফুলের গুচ্ছ’ কড়ি ও কোমল (১২৯৩)-এ প্রকাশিত হলে Thomas Hood-এর একটি কবিতার অনুবাদ সংযোজিত হয়। মানসী (১২৯৭) কাব্যে পাওয়া যায় লোকেন্দ্রনাথ পালিতের একটি ইংরেজি কবিতার অনুবাদ। বঙ্গাব্দের এই শতকের মধ্যে এগুলি ছাড়া একগুচ্ছ কবিতার অনুবাদ প্রকাশিত হয় সাধনা পত্রিকায়। সাধনা-র ১২৯৯, বৈশাখ সংখ্যায় Heine-র নয়টি কবিতার অনুবাদ একত্রে প্রকাশিত হয়। কবিতাগুলি ‘জন্মান হইতে অনুবাদিত’ কিনা তা বিতর্কের বিষয় নিঃসন্দেহে তবে রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ-কবিতার মধ্যে এই অনুবাদগুচ্ছটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বঙ্গাব্দ চতুর্দশ শতকের প্রথম দুই দশকে অ-ভারতীয় ভাষার কবিতার অনুবাদ পাওয়া যাচ্ছে কেবল দু’টি। ১৩১২-তে বঙ্গদর্শন, চৈত্র সংখ্যায় Sarojini Naidu-র ‘Palanquin Bearers’ এবং ১৩১৭-য় প্রবাসী-র ফাল্গুন সংখ্যায় প্রকাশিত Stephen Phillips-এর Marpessa-র অনুবাদ। Marpessa-র অনুবাদকে ‘রবীন্দ্রনাথ-কর্তৃক সম্পাদিত রচনা’ বলে মনে করেছেন পুলিনবিহারী সেন। এক্ষেত্রে ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী-কৃত Marpessa-র অনুবাদ আমূল পরিবর্তন করেন রবীন্দ্রনাথ।
লক্ষণীয়, এই পর্বে রবীন্দ্রনাথ অসংখ্য অনুবাদ করেছেন, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা নিজের কবিতার অনুবাদ-বাংলা থেকে ইংরেজিতে।পরবর্তী কালে অনুবাদ বা তর্জমার উপরে রবীন্দ্রনাথ নিজে খুব বেশি ভরসা করেছেন একথা জোর দিয়ে বলা যায় না। নিজের কবিতার ইংরেজি অনুবাদ বিষয়ে নানান সময়ে তাঁর বিভিন্ন মতামত থেকে এ ধারণা আরও পোক্ত হয়। উদাহরণস্বরূপ রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে লেখা একটি দীর্ঘ চিঠির আংশিক উদ্ধৃত করা যেতে পারে- “…যে ব্যক্তির লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে চলে সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নয়। যে-ব্যক্তি গাল খায় এবং নোবেল প্রাইজ পায় সেই হচ্ছে স্যার রবীন্দ্রনাথ। সে সর্ব্বদাই ভয়ে ভয়ে আছে পাছে একদিন ধরা পড়ে যায়। এই জন্য কারো কাছে দাদন নিলে শোধ করার ভয়ে তার রাত্রে ঘুম হয় না। যারা বলে গীতাঞ্জলির ইংরেজি তর্জমা আমি নিজে করি নি, আর কেউ করেছে তারা ঠিকই বলে। বস্তুত স্যার রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি জানেই না। আমাকে কোনো ইংরেজি সভাতে বক্তা বা সভাপতিরূপে যদি ডাকা হয় তাহলেই আমার বিপদ-কেন না যিনি ইংরেজি গীতাঞ্জলি লেখেন তিনি কোনোমতেই আমার সঙ্গে ইংরেজি সভায় আসতে রাজি হন না-এই জন্যে যদি বা সভায় যাই তবে চাণক্য মুনিকে স্মরণ করে “ন ভাষতে’ র দলে বসে থাকি।…মুস্কিল এই যে, অনুবাদ করতে পারি নে, আমাকে প্রায় নতুন করে লিখতে হয়। কেন না ঠিকমত অনুবাদ করতে গেলে নিজেকে ভুলে লেখা চলে না। নিজেকে না ভুললে আমি কথা ভুলি, ব্যাকরণ ভুলি, স্টাইল ভুলি।”
পেশাদার অনুবাদক না হলেও অনুবাদ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের মতামত বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় তাঁর তাত্ত্বিক অবস্থান-আর কি অনায়াসেই তিনি অনুবাদের সমস্যাগুলি চিহ্নিত করেন।অনুবাদ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাবনা স্বচ্ছ হলেও তাঁর সমালোচকদের মধ্যে তা দেখা যায় না সবসময়। বুদ্ধদেব বসু’র ‘ইংরেজিতে রবীন্দ্রনাথ’ বহু পঠিত প্রাসঙ্গিক আলোচনা। প্রবন্ধজুড়ে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেন নিজের কবিতার কত খারাপ অনুবাদ রবীন্দ্রনাথ করেছেন আর সাহেবদের কাছে মহান কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কতখানি খাটো করেছেন তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে। ‘রবীন্দ্রনাথের স্বভাবনির্বন্ধ অনুবাদ কর্মের অনুকূল ছিলো না’ মনে করার পাশাপাশি তাঁর মন্তব্য, “রবীন্দ্রনাথ অনুবাদক হিসেবে এখন পর্যন্ত যথেষ্ট মনোযোগ পাননি; এ-বিষয়ে কিছু মন্তব্য করেছেন একমাত্র এডওয়ার্ড টমসন, কিন্তু আরো বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ আছে।” এডওয়ার্ড টমসনের মতামত বুদ্ধদেব বসু’র কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হওয়াটা খুবই আশ্চর্যের। মূল বাংলার উপর নির্ভর করে সামগ্রিকভাবে তাঁর (রবীন্দ্রনাথের) সাহিত্যিক মূল্যায়নের চেষ্টা করেছেন এডওয়ার্ড টমসন; তাই তাঁর মতামত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ, প্রবাসী (পৌষ, ১৩৪৬)-তে প্রকাশিত ‘রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে রেভারেও টমসনের বহি’ নামের রবীন্দ্র-রচনাটি বুদ্ধদেব বসু’র নজরেএলে বাঙালির ‘বাবু ইংরেজি’ নিয়ে সাহেবদের প্রতিক্রিয়া বিশদে বর্ণনার সময় তিনি নিশ্চয় খেয়াল করতেন যে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ টমসন সাহেবের বাংলা ভাষাজ্ঞান যথেষ্ট বলে মনে করেননি। কেবলমাত্র বুদ্ধদেব বসুই নন, অনুবাদ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ সমালোচকই মূল বাংলা আর অনূদিত ইংরেজি-র তুল্যমূল্য বিচারের প্রতি বেশি মনোযোগী হয়েছেন।আর এই কারণেই ধীরে ধীরে অনুবাদক রবীন্দ্রনাথ হারিয়ে যেতে থাকেন।তাই নিজের কবিতার অনুবাদ বাদ দেওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী এক দশকেও বিদেশী কবিতার অনুবাদ রবীন্দ্রনাথ বিশেষ করেননি।এই সময় অনেক দিন বাদে বাদে তাঁর কৃত অনুবাদ পাই।
১৩২২সবুজপত্র-রপৌষসংখ্যায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত ঘরে-বাইরে উপন্যাসে Browning-এর একটি কবিতার আংশিক অনুবাদ পাওয়া যায়।এরপর ১৩৩৫ থেকে ১৩৪৭-এর মধ্যে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদ হয়। প্রবাসী পত্রিকায় ১৩৩৫-এর ভাদ্র-চৈত্র সংখ্যায় প্রকাশিত ধারাবাহিক শেষের কবিতা-র মধ্যে Donne, Whitman, Hinkson এবং Symons-এর কবিতার অনুবাদ প্রকাশিত হয়। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে মূল কবিতার সামান্য অংশই গৃহীত হয় অনুবাদের জন্য। পরিচয় পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের প্রথম বিদেশী কবিতার অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৩৩৮, কার্তিক সংখ্যায়। Shelley-র কবিতার নীরেন্দ্রনাথ রায়-কৃত অনুবাদের পরিমার্জনা। পরের বছর পরিচয়-এবৈশাখ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ‘আধুনিক কাব্য’ প্রবন্ধটি। প্রবন্ধের মধ্যে পদ্যে ও গদ্যে অনুবাদ পাওয়া যায় Orrick Johns, Amy Lowell, Ezra Pound, T. S. Eliot, Li-Po এবং E. A. Robinson-এর কবিতার। বহু আলোচিত ও বিতর্কিত T. S. Eliot-এর ‘Journey of the Magi’ কবিতার অনুবাদটি পরিচয়-এ প্রকাশিত হয় ১৩৩৯, মাঘ সংখ্যায়। রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর উত্তরসাধকদের মতপার্থক্যের পশ্চাৎপটে শেষের কবিতা ও ‘আধুনিক কাব্য’-র অনুবাদ কবিতাগুলির ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও সাহিত্য মূল্য দুই-ই সমান গুরুত্বের। পরের বছর বঙ্গশ্রী-তে প্রকাশিত হয় হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের একটি কবিতার অনুবাদ। একই পত্রিকা ১৩৪১, বৈশাখ সংখ্যায় ‘ছন্দ’ প্রবন্ধের মধ্যে Whitman-এর একটি কবিতার অনুবাদ দেখা যায়। ভারতবর্ষ পত্রিকার ১৩৪৪, আষাঢ় সংখ্যায় প্রকাশিত অজ্ঞাত কবির কবিতার অনুবাদ ও ১৩৪৭ আষাঢ় সংখ্যার সমসাময়িক-এ প্রকাশিত C. F. Andrews-এর একটি কবিতার অনুবাদ দিয়েই এই তালিকা শেষ হতে পারত, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরেও পাওয়া যায় কিছু অনুবাদ-কবিতা যা প্রকাশিত হয় পরবর্তীকালে। বিলুপ্ত বা দৃষ্টিগোচরে না থাকা অনুবাদের সম্ভাবনাও যথেষ্ট। যেমন শোনা যায় রবীন্দ্রনাথ একগুচ্ছ সাঁওতালি কবিতার অনুবাদ করেছিলেন, কিন্তু তা আর পাওয়া যায় না।
এই আলোচনা শেষ করব রবীন্দ্রনাথ কৃত ভিক্টর হুগোর কবিতার অনুবাদ দিয়ে।কারণ তাঁর মৃত্যুও এই মে মাসেরই ২২ তারিখ।
তারা ও আঁখি
কাল সন্ধ্যাকালে ধীরে সন্ধ্যার বাতাস
বহিয়া আনিতেছিল ফুলের সুবাস।
রাত্রি হ’ল, আঁধারের ঘনীভূত ছায়ে,
পাখীগুলি একে একে পড়িল ঘুমায়ে।
প্রফুল্ল বসন্ত ছিল ঘেরি চারি ধার
আছিল প্রফুল্লতর যৌবন তোমার,
তারকা হাসিতেছিল আকাশের মেয়ে,
ও আঁখি হাসিতেছিল তাহাদের চেয়ে।
দুজনে কহিতেছিনু কথা কানে কানে,
হৃদয় গাহিতেছিল মিষ্টতম তানে।
রজনী দেখিনু অতি সুন্দর উজ্জ্বল,
সোনার তারকাদের ডেকে ধীরে ধীরে,
কহিনু “সমস্ত স্বর্গ ঢাল’ এর শিরে।”
বলিনু আঁখিরে তব, “ওগো আঁখিতারা
ঢালো গো আমার পরে প্রণয়ের ধারা।”



