এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 18 of 18 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৭ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৮ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৯ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা – দশম পর্ব

১১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা


The Blind Owl

কাহিনিকার: সাদেঘ হেদায়েত
বঙ্গানুবাদ: সুপর্ণা বোস

                
 অষ্টাদশ পর্ব

আমিই বা কোন প্রজন্মের ফসল?আমার মধ‍্যেও তো নিহিত আছে বংশ পরম্পরার দুঃখযন্ত্রণা!আমার মধ‍্যে কি অতীত নেই?আমার মধ‍্যে কি এসবের কোনোটাই নেই?__মসজিদ আজান অজু খ‍্যাক্ খ‍্যাক্ করে থুতু ফেলা,সিজদা এবং সর্বশক্তিমানের সামনে প্রণত হওয়া, যাঁর সঙ্গে কেবল আরবী ভাষাতেই কথা বলা যায়।এসব কিছুই কখনো আমার ওপর কোনো প্রভাব ফেলেনি।এমন কি যখন আমি সুস্থ ছিলাম এবং বহুবার মসজিদে যেতাম।আমার উদ্দেশ‍্য ছিল আমার ভাবনাচিন্তা ও অনুভূতিকে কিছু মানুষের নিরর্থক ভাবনাচিন্তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে চেষ্টা করা।আমার চোখ মেঝের চকচকে টাইলস আর আর দেয়ালের সূক্ষ্ম কারুকাজের ওপরেই নিবদ্ধ থাকত।এই নকশাগুলো আমার মনকে মসজিদের বাঁধাধরা থেকে মুক্তি দিত এবং এক অপূর্ব স্বপ্নের জগতে চালান করে দিত।প্রার্থনার সময় আমি চোখ বন্ধ করে দুহাতের পাতায় মুখ ঢেকে এনে এক নিজস্ব রাত্রি ঘনিয়ে আনতাম আর সেই একান্ত রাত্রির ভেতর আমি আমার নিজস্ব প্রার্থনার শব্দগুলি এভাবে নীরবে উচ্চারণ করতাম যেন কোন সর্বশক্তিমান নয় বরং কোনো বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছি!আমার কাছে ঈশ্বর খুব বড় ব‍্যাপার। অন্ততপক্ষে যতক্ষণ আমি এই জ্বরতপ্ত স‍্যাঁতস‍্যাঁতে বিছানায় শুয়ে কোনো বিষয়ই আমার আগ্রহের বিষয় ছিল না।আমি জানতেও চাই না আদৌ ঈশ্বর বলে কেউ আছেন কিনা অথবা তিনি পৃথিবীর শাসকদের ইচ্ছার প্রতিমূর্তি কিনা!তাঁকে তৈরি করা হয়েছিল আদপে নিজেদের দেবত্বকে নিশ্চিত করতে এবং সাধারণ মানুষকে লুটপাট করার জন‍্যে।অন‍্যদিকে ঈশ্বরের একটা কল্পিত অসুস্থ ছবি স্বর্গভাবনার ওপর পৃথিবীতে প্রক্ষিপ্ত হচ্ছিল? জীবনের এই পর্যায়ে আমি কেবল এটুকুই জানতে চাইছিলাম,আজকের রাতটুকু আমি বেঁচে থাকব তো? মৃত‍্যুর তুলনায় মানুষের মতবাদ ধর্মবিশ্বাস ও আস্তিকতার বিষয়টি আমার কাছে দুর্বল ও শিশুসুলভ মনে হয়েছিল।স্বাস্থবান ও সৌভাগ‍্যবানদের জন‍্যে এটা রকরকম বিনোদনই বলা যায়।
তুলনামূলকভাবে মৃত‍্যুর বাস্তবতা ও আমার এই ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা, আধ‍্যাত্মিক পুরস্কার ও শাস্তি বা পুনর্জন্ম দিবস সম্পর্কে আমার পড়াশোনা শুধু এক বিস্বাদ প্রতারণামূলক ধারণা বলেই মনে হয়েছে।আর যে প্রার্থনা আমি শিখেছিলাম তা মৃত‍্যুভয়ে জর্জরিত কিছু অকার্যকরী শব্দ ছাড়া আরকিছুই মনে হয়নি।যারা এই অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগেনি কোনোদিন তারা একথার মর্ম বুঝবে না।বেঁচে থাকার স্পৃহা আমার মধ‍্যে এতোটাই প্রবল হয়ে উঠেছিল যে একবিন্দু আনন্দও আমার দীর্ঘতম বুকধড়ফড়ানি আর যাতনার ক্ষতিপূরণ বলে মনে হত।আমি যন্ত্রনার অস্তিত্ব অনুভব করেছিলাম কিন্তু তার কোনো স্পর্শযোগ‍্য অস্তিত্ব না থাকায় আমি বর্ণনা করতে পারিনি।সাধারণ জনসমুদ্রের মাঝে আমি এক অজানা অচেনা সত্তায় পরিণত হয়েছিলাম!এমনকি এতটাই যে, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে তাদের জগতে আমারও কখনো কোনো অস্তিত্ব ছিল। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়টি হলো, আমি নিজেকে পুরোপুরি জীবিত কিংবা সম্পূর্ণ মৃত,কোনোটাই অনুভব করছিলাম না!আমি ছিলাম কেবলই এক চলমান দেহ যা জীবিতদের জগত থেকে নির্বাসিত হয়ে এখন কেবল বিস্মৃতি আর মৃতদের স্তব্ধতার মধ‍্যে আশ্রয় নিয়েছিল।

বিকেলের দিকে তামাক সেবনের পাত্রটি ছেড়ে উঠে পড়লাম।জানলা দিয়ে বাইরে তাকালাম।একটা কালো গাছ আর কষাইখানার বন্ধ দরজা দেখতে পেলাম।অনেকগুলো কালোকালো ছায়া একে অন‍্যের সাথে মিশে এক প্রকার ক্ষণকালীন শূন‍্যতাবোধ সৃষ্টি হয়েছিল।একটা প্রাগৈতিহাসিক কালো তাঁবুর মত নিকষ কালো আকাশর বুক ফুঁড়ে দেখা দিয়েছিল অগনন উজ্বল নক্ষত্র! ঠিক সেই মুহূর্তে আমি আজানের সুর শুনলাম।অসময়ের আজান!হয়ত কোনো মহিলা, সম্ভবত সেই বেশ‍্যাটা সন্তানের জন্ম দিল।অধবা কথায় আছে না’ইটের ওপর থাকা’ তেমনই কিছু একটা যেন!সেই আজানের সুরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল কুকুরের ডাক!আমি মনেমনে ভাবছিলাম “যদি সত‍্যিই প্রতিটি মানুষের জন‍্যে একটি করে তারা বরাদ্দ থাকে তাহলে আমার জন‍্যে বরাদ্দ হবে সবথেকে দূরবর্তী ফ‍্যাকাশে ও তুচ্ছতম তারাটি অথবা হয়ত আমার কোনো তারাই থাকবে না।”তারপর শুনতে পেলাম একদল মাতাল প্রহরীর দল রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে নিজেদের মধ‍্যে মশকরা করছে। তারপর তারা সবাই মিলে সমবেত কণ্ঠে গাইতে লাগল
“চলো, মদ পান করি
রেএ রাজ্যের মদ!
আজ না হলে, তবে কবে?”
ভয়ে আমি সিঁটিয়ে গেলাম। তাদের গান বাতাসে এক অদ্ভুত প্রতিধ্বনি তুলে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল দূরে। নাহ্ তারা আমাকে খুঁজছিল না!তারা আমাকে চিনত না…

আবারও অন্ধকার আর নীরবতা ফিরে এসে সবকিছুকে ঢেকে দিল। আমি আমার ঘরে চর্বির প্রদীপটি জ্বালালাম না, কারণ সেই ঘন, তরল অন্ধকারের ভিতরে বসে থাকতে আমার ভালো লাগছিল।যে অন্ধকার সবকিছুর মধ্যে মিশে থাকে। অন্ধকার সয়ে গিয়েছিল।সেই অন্ধকারে আমার হারিয়ে যাওয়া চিন্তাগুলো, বিস্মৃত ভয়গুলো, আর আমার মস্তিষ্কের অজানা গহ্বরে লুকিয়ে থাকা ভীতিকর ও অবিশ্বাস্য স্মৃতিগুলো জীবন্ত হয়ে উঠল!নড়াচড়া করতে লাগল, আর আমাকে বিদ্রূপ করতে লাগল!
এই ভয়ংকর, নিরাকার ছায়ামূর্তিগুলো,এই চিন্তাগুলো,ঘরের সর্বত্র ওত পেতে ছিল! ঘরের কোণে, পর্দার আড়ালে, দরজার পাশে।একটি আতঙ্কজনক অবয়ব ঠিক সেখানেই ছিল, পর্দার পাশে। সে নড়ছিল না, সে না বিষণ্ন, না প্রফুল্ল। আমি যতবারই মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকিয়েছি, সে সরাসরি আমার দিকেই চেয়ে ছিল।
তার মুখটি ছিল অদ্ভুতরকম পরিচিত!যেন শৈশবে আমি এই মুখ কোথাও দেখেছিলাম।
সময়টা ফরবরদিন মাসের ত্রয়োদশ দিন ছিল।সুরেন নদীর তীরে কয়েকজন বাচ্ছার সঙ্গে আমিও লুকোচুরি খেলছিলাম।অন‍্য সব সাধারণ মুখের মধ‍্যে এই মুখটিও ছিল।এই মুখটাই আবার আমার ঘরের উল্টোদিকের কসাইয়ের মুখের সঙ্গেও মিলে যাচ্ছিল।নিশ্চিত আমার জীবনের সঙ্গে কোনোভাবে এই লোকটা জুড়ে আছে!আমি একে আগেও দেখেছি।সম্ভবত এটা আমারই যমজ ছায়া!
আমার জীবনসীমার মধ‍্যেই এর পরিসমাপ্তি ঘটবে…
যেই মুহূর্তে আমি চর্বির লন্ঠনটা জ্বালালাম সেই ছায়া অদৃশ‍্য হয়ে গেল।আমি আয়নার সামনে গিয়ে নিজের প্রতিবিম্বে মনোনিবেশ করলাম।নিজেকে অপরিচিত মনে হল!বিষয়টা অদ্ভুত এবং ভয়ানক!আমার ছায়াটি আমার থেকেও অধিক জোরালো!আমি যেন নিজেই সেই প্রতিবিম্ব বনে গেছি!আমার মনে হচ্ছিল আমি এই প্রতিবিম্বের সঙ্গে কিছুতেই একঘরে থাকতে পারব না।আমার ভয় হচ্ছিল যদি আমি ছুট লাগাই তাহলে এই ছায়াও আমাকে তাড়া করবে যেমন দুই বিবদমান মার্জার করে থাকে।অবশেষে আমি নিজের দুটি হাতের পাতা দিয়ে নিজস্ব এক অনন্ত রাত্রি ঘনিয়ে তুললাম।এই ভয়ানক মুহূর্তগুলোর সঙ্গে প্রায়ই এক অদ্ভুত নেশা মিশে থাকত, মাথা ঘুরত, হাঁটু ভেঙে পড়ত আর বমি বমি লাগত। তারপর হঠাৎ টের পেতাম যে আমি নিজের পায়েই দাঁড়িয়ে আছি। দাঁড়িয়ে থাকাটাই যেন এক অলৌকিক ঘটনা। আমি কী করে দাঁড়িয়ে আছি? মনে হচ্ছিল, এক পা নাড়ালেই টলে যাব!মাথা ঝিমঝিমে করত । পৃথিবী এবং তার সমস্ত জীব যেন আমার থেকে বহুদূরে সরে গেছে। অস্পষ্টভাবে আমি এক ভূমিকম্প বা ঘূর্ণিঝড়ের প্রত্যাশা করতাম।যেন তার ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে আমি পুনর্জন্ম নিতে পারি এক শান্ত, উজ্জ্বল দুনিয়ায়।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে বারবার নিজেকেই বলতাম,“মৃত্যু… মৃত্যু…” আমার বন্ধ ঠোঁটের ভিতরের কন্ঠস্বরকেই ভয় পেতাম আমি।একদা যে সাহস আমার ছিল তা আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমি যেন শরতের শুরুতে ঘরে ঢুকে পড়া মাছিদের মতো শীর্ণ, প্রাণহীন, নিজের পাখার গুঞ্জনেই আতঙ্কিত। তারা দেয়ালে স্থির হয়ে লেগে থাকে, যতক্ষণ না বুঝতে পারে তারা এখনো জীবিত! তারপর উন্মত্তের মতো দরজা জানালায় ধাক্কা খেতে খেতে শেষে মৃতদেহের মতো মেঝেতে পড়ে যায়।।

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি