জিজীবিষা
ধারাবাহিক উপন্যাস
সুরঞ্জিত সরকার
ষোড়শ পর্ব
দাদু থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে পুরনো কাঠের সিন্দুকটা হাতড়ালেন। কয়েক মিনিটের জন্য হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজির পর তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
দাদু হতাশ গলায় বলল, “না রে সুমন্ত, কবজটা নেই! ওটা যেখানে রাখা ছিল, সেখানে কেবল একটা ফাঁকা খাপ পড়ে আছে। আমি নিশ্চিত যযে ওটা কেউ সরিয়ে ফেলেছে।”
সুনীপা একটু আতঙ্কের সাথে বলে উঠল, “তার মানে আমাদের বাড়িতেই কি কেউ বাইরের লোকের চর হয়ে ঢুকেছিল? দাদু, ভালো করে মনে করে দেখুন তো!”
ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির জানলার কাঁচ ভেদ করে একটা পাথর এসে পড়ল মেঝেতে। পাথরে একটা চিরকুট জড়ানো। সুমন্ত ক্ষিপ্র হাতে সেটা তুলে নিল। তাতে কাঁচা হাতে লেখা:
“রহমান যে কবজটা ফেলে গিয়েছিল, সেটা এখন আমাদের কাছে। ওটা কোনো চাবি নয় সুমন্তবাবু, ওটা একটা ‘ডেডম্যানস সুইচ’-এর ট্রিগার। কুঠুরির শেষ কোণে যে গোপন সিন্দুকটা তোমরা খুঁজছো, সেটা নাড়া দিলেই গোটা পূরবী ভবন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। রহমান ভয়ে পালিয়েছিল কারণ সে জানত এই বাড়ির ভিতের নিচে ডিনামাইট পোঁতা আছে। অবিনাশের শেষ চাল এখনো বাকি।”
সুমন্ত তাড়াতাড়ি পুলিশের উদ্দেশ্য ফোন করল, “দাদা! বড়বাবু! আপনারা কুঠুরির ভেতরে কোনো সিন্দুকে হাত দেবেন না! ওটা ট্র্যাপ!”
সুমন্তর মা পূর্ণা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলতে লাগল, “রহমান সাহেব তবে এই বিপদের কথাই বলেছিলেন? তিনি কি জানতেন অবিনাশরা এই বাড়িটাকে একটা জীবন্ত বোমায় পরিণত করে রেখেছে? “
সুমন্ত ওদিকে ফোনে সৌরীশদাকে বলতে লাগল, “দাদা! সবাইকে নিয়ে কুঠুরি থেকে এখুনি বেরিয়ে এসো! কেউ কোনো সিন্দুক বা দেওয়ালের খাঁজে হাত যেন না দেয়। রহমান ভাই যে কবজটার কথা বলেছিলেন, সেটা আসলে একটা ট্রিগার। অবিনাশের লোকেরা ওটা সরিয়ে ফেলেছে। গোটা বাড়ির ভিতের নিচে ওরা ডিনামাইট সেট করে রেখেছে—ওটা একটা মরণফাঁদ!”
ফোনের ওপাশে সৌরীশদার গম্ভীর কিন্তু ত্বরিত নির্দেশ শোনা গেল। সকলেই বুঝতে পারলেন পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ।
পুলিশ সুপার সৌরীশদা ফরেনসিক টিমের উদ্দেশ্যে বললেন, “সবাই এখনই বাইরে আসুন! দ্রুত! ইভাকুয়েট দ্য এরিয়া!”
ফরেনসিক অফিসাররা তখন কুঠুরির একদম শেষ প্রান্তে একটা ভারি লোহার দরজার লক পরীক্ষা করছিলেন। টিমলিডারের সতর্কবার্তা আসামাত্র তাঁরা হাতের যন্ত্রপাতি ফেলে ঝড়ের গতিতে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে এলেন। ঠিক তখনই একটা মৃদু যান্ত্রিক শব্দ শোনা গেল কুঠুরির ভেতর থেকে—কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে।
সবাই যখন সদর দরজার বাইরে ফাঁকা রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই এক বিকট শব্দে গোটা পাড়া কেঁপে উঠল। তবে বিস্ফোরণটা ওপরের দিকে নয়, বরং মাটির গভীরে হওয়ায় পূরবী ভবন পুরোপুরি ধসে পড়ল না, কিন্তু কুঠুরির সেই গোপন দরজা আর হাড়গোড়ের প্রমাণগুলো চিরতরে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেল।
বড়বাবু হাঁপাতে হাঁপাতে বলতে লাগল, “অল্পের জন্য বেঁচে গেলাম স্যার! আপনার ভাই ঠিক সময়ে ফোন না করলে আজ আমরা কেউ ফিরতাম না।”
সুমন্ত ও কল্যাণ দেরী না করে দাদুকে নিয়ে পূরবী ভবনে গিয়ে উপস্থিত হল। কান্নাভেজা চোখে বাড়ির দিকে তাকিয়ে দাদু অতীশ বলতে লাগল, “রহমান সাহেব তবে এই ধ্বংসেরই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। অবিনাশ নিজের অপরাধের সব প্রমাণ শেষ করে দিল।”
বড়বাবু চোখমুখ শক্ত করে উত্তরদিল, “প্রমাণ শেষ করলেও লড়াই শেষ হয়নি। ও এই বিস্ফোরণটা রিমোটের মাধ্যমে কাছাকাছি কোনো জায়গা থেকেই ঘটিয়েছে। স্যার পুলিশ ফোর্সকে পশ্চিমের দিকে এগোতে বলুন। অবিনাশ এখন ভাবছে আমরা সবাই শেষ, এটাই ওকে ধরার সেরা সুযোগ!”
বিস্ফোরণের ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে গেলেও সুমন্ত আর কল্যাণের চোখে তখন অবিনাশকে ধরার এক নতুন জেদ।



