১ : জিজীবিষা

১ : জিজীবিষা

This entry is part 1 of 17 in the series জিজীবিষা

জিজীবিষা

১ : জিজীবিষা

২ : জিজীবিষা

৩ : জিজীবিষা

৪ : জিজীবিষা

৫ : জিজীবিষা

৬ : জিজীবিষা

৭ : জিজীবিষা

৮ : জিজীবিষা

৯ : জিজীবিষা

১০ : জিজীবিষা  

১১ : জিজীবিষা

১২ : জিজীবিষা

১৩ : জিজীবিষা

১৪ : জিজীবিষা

১৫ : জিজীবিষা

১৬ : জিজীবিষা

১৭ : জিজীবিষা

সুরঞ্জিত সরকার

প্রথম পর্ব 

দুলাইবাড়ি। মাকাইবাড়ি নয়। 

এক সময় হাওড়ার রামরাজতলা স্টেশনের পশ্চিমদিকে ছিল বহু প্রাচীন ও সুবিশাল এই  জলাশয়। শীত পড়লেই সেখানে সারি সারি পরিযায়ী পাখির আনাগোনা শুরু করত । আট থেকে আশি—গ্রামের সকলেই এই জলাভূমির সঙ্গে পরিচিত ছিল। বহু ঐতিহাসিক ঘটনার নীরব সাক্ষী এই বিল। শোনা যায়, ইংরেজ আমলে নাকি অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামীর হাত-পা বেঁধে এখানে ফেলে দেওয়া হতো। দাঙ্গার সময়েও বহু মানুষ এই জলাশয় সাঁতরে রেললাইন পেরিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছে ।

মহরমের দিন মুসলিমরা ‘হায় হাসান , হায় হোসেন’ ধ্বনি তুলে যেমন নিজেদের রক্ত ঝরাত, তেমনই হিন্দুরাও মহালয়ার সকালে পূর্ব পুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করা থেকে শুরু করে কলা-বউ স্নান করানো কিংবা আপনজনের আত্মশুদ্ধি সবই এক বিলম্বিত ধারায় এর পাড়ে বসেই সম্পন্ন করত। তবে কালের গ্রাসে সেই বিল এখন প্রায় ভরাট। শত শত কচুরিপানা আর জলজ  জংলি লতাগুল্ম ছাড়া চোখে পড়ে না আর কিছুই। পুরোনো বাঁধানো পাড়ে দাঁড়ালে মনে হয় ইঁটগুলো যেন হাড় কঙ্কালের মতো বেরিয়ে এসেছে।

বছর পঞ্চাশ আগে অতীশ সরকার অনেক কষ্টে প্রায় তাঁর সর্বস্ব দিয়ে বিল পারের ধারে রহমান ভাই এর কাছ থেকে একটি জমি সহ বাড়ি কিনেছিলেন। জন্ম সূত্রে অতীশ সরকার ছিলেন ঢাকার মেহেদিপুর গ্রামের লোক। ঢাকার সম্ভ্রান্ত ম্যাজিস্ট্রেট প্যারিমোহনের সুখের আলয়ে ভগবান কৃষ্ণের মতন অষ্টম গর্ভের সন্তান ছিলেন অতীশ। পরিবারের কনিষ্ঠতম সদস্য হিসেবে দাদা ও দিদি ও আত্মীয় স্বজনের বুকভরা ভালবাসায় লালিত পালিত হয়েছিল সে।

কিন্তু বিধি বাম। 

শৈশবকাল থেকেই রূপে, গুণে ও অভিনয়ে সুদর্শন পুরুষ ছিলেন তিনি। অন্যান্য ভাই বোনেদের তুলনায় স্বভাব চরিত্রে সম্পূর্ণ পৃথক প্রকৃতির ছিলেন অতীশ। ভাগ্যদেবতা তাঁর জীবনপঞ্জিকার বিভিন্ন পাতায় সুখের চেয়ে দুঃখ, কষ্ট, ক্লেশ দিয়েই বেশী ভরে রেখেছিলেন। জীবনের যে সময়ে বাবার হাত ধরে পথ চলা শুরু করে মানুষ, সেই মাত্র দেড় বছর বয়সে পিতৃহারা হয়েছিলেন তিনি। এ যেন ছিল নাটকের শুরু। বাপমরা ছেলের পড়াশোনায় একেবারে মন ছিল না। কোনক্রমে ম্যাট্রিক ক্লাসের গন্ডী পেরোতেই বাউন্ডুলে ঘুড়ির মতো যাত্রা নাটকের দলের সাথে দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে ঘুরে বেড়িয়ে জীবন কাটাতে শুরু করল সে । 

মা অম্বিকা দেখলেন ছেলে প্রায় বখে যাবার উপক্রম হয়ে উঠেছে। তাই সময় থাকতে অতীশের মাত্র তেইশ বছর বয়সে তৎকালীন ঢাকা মিটফোর্ড কলেজের স্বনামধন্য ডাক্তার বিশ্বাসের কনিষ্ঠা কন্যা পূরবীর সাথে চার হাত এক করলেন। 

অতীশের জীবনে সুখ ছিল উবে যাওয়া কর্পূরের মতো। শুধু আনন্দের ঘ্রাণটুকু রয়ে যেত, শূন্য আঁখিতে পুড়ে যাওয়ার ছবি ছাড়া আর কিছুই ধরা পড়ত না। ভারতবর্ষ  স্বাধীন হওয়ার পর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে শুরু করল। একদিন সেই উত্তাপে ও আকস্মিক দাঙ্গার আগুনে খড়ের গাদার মতো জ্বলে পুড়ে খাক্ হয়ে গেল দুর্ভাগা অতীশের পৈতৃক ভিটাবাড়ি সহ তাঁর পরিবারের সমস্ত স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি। ভাগ্যের নিষ্ঠুরতা ও নির্মম পরিহাসে এক দুঃস্বপ্নের মতো সর্বহারা অতীশ ও তাঁর সহধর্মিনী সহ পরিবারের অন্যান্যদের ঠাঁই হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের রিফিউজি ক্যাম্পে। এক মুহূর্তের জন্য সকলের মনে হয়েছিল সব বুঝি শেষের পথে। তবুও কেউ হার মানেন নি। এক অদম্য সাহস ও প্রেরনায় ভর করে ঘুড়ে দাঁড়িয়েছিল অতীশ। হার বলে কিছু নেই, তাঁকে যে জিততেই হবে। জীবনের স্বচ্ছন্দ গতিতে ভাঙা-চোড়া রাস্তায় চলতে চলতে এপার বাংলায় তাদের পরম প্রাপ্তি ছিল দুই ছেলে ও মেয়ে। মনে মনে আশার আলো ছিল আবার হয়তো নিজের জন্মভিটায় পরিবার নিয়ে ফিরে যেতে পারবে কোনও একদিন । কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে আত্মপ্রকাশের পর সে আশার আলোও  চিরতরে নিভে গেছিল। দুই দশকের বুকচাপা বেদনা ও অন্তহীন হতাশার সাগরে ডুবতে ডুবতে দুলাইবাড়ির বাড়িটা ছিল তাদের কাছে খুঁজে পাওয়া দ্বীপের মতন। শখ করে বাড়ির নাম দিয়েছিলেন পূরবী ভবন। স্ত্রীর প্রতি আনুগত্য ও ভালবাসার এ ছিল তাঁর এক অনন্য নিদর্শন। পশ্চিমবঙ্গে নিজস্ব হিসেবে এটাই ছিল তাঁদের একমাত্র মাথা গোঁজার ভিটা। কিন্তু বাড়িটা কেনার পরে তিনি জানতে পারেন যে, ঐ বাড়িতে রহমান ভাই এর প্রথম পক্ষের মেয়ে গায়ে আগুন দিয়ে মারা গিয়েছিল। এ খবর শোনার পর থেকেই ওনার স্ত্রী বাড়িতে পূজা অর্চনা করে দোষ কাটানোর খুব চেষ্টা করত। কিন্তু যে কারনেই হোক না, বাড়িতে পারিবারিক অশান্তির শেষ ছিল না। একসময় গেরস্থের কলহ এতটাই বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেছিল যে ওনার ছেলে বৌমা পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে একটু দূরে আলাদা বসতবাড়ি তৈরি করে থাকতে শুরু করে। এমনকি নিজের ছেলে মেয়ের মধ্যেও আন্তরিক সম্পর্ক একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। সব থেকেও যেন এক নিঃসীম শূন্যতা ধীরে ধীরে পরিবারটাকে গ্রাস করে নিয়েছিল। কথায় আছে ‘যেদিকে অভাগা যায় সেদিকে সাগর শুকায়ে যায় ‘। এ যেন অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছিল অতীশের জীবনে। 

কারও কারও  জীবনের প্রতিটি বাঁকে থাকে নতুনতর চমক। আর পাঁচটা মানুষের সঙ্গে তার তূলনা চলেনা। অতীশ নিজেও ভাবেনি তাঁর জীবন এতখানি নাটকীয় হয়ে উঠতে পারে। তাঁর একদা অভিনীত রাজা হরিশ চন্দ্র পালার রাজার মত তার হাল প্রায় চণ্ডালের মত হবে সেই কথা সে দুঃস্বপ্নেও কখনো ভাবতে পারেনি। 

আসলে এটাই শেষ সত্যি যে জীবন নাটকের থেকেও অনেক বেশী পরিবর্তনশীল এবং নাটকীয়। 

(চলবে ) 

জিজীবিষা

২ : জিজীবিষা

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

This entry is part 1 of 17 in the series জিজীবিষা

This entry is part 1 of 17 in the series জিজীবিষা সলিল সমাধি – ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) সলিল সমাধি ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

This entry is part 1 of 17 in the series জিজীবিষা

This entry is part 1 of 17 in the series জিজীবিষা সলিল সমাধি – ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) সলিল সমাধি ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস

Read More »