ধ্রুপদী সাহিত্য : ভজ মন রাম চরণ - শ্যামলকৃষ্ণ বসু
ধ্রুপদী সাহিত্য
শ্যামলকৃষ্ণ বসু
[আদিকান্ড ২]
| ১৬ |
হরধনু ভঙ্গ
কনক সিংহাসনে বসে আছেন রাজা জনক, যিনি স্বয়ং সীরধ্বজ, এবং তাঁর ভাই রাজা কুশধ্বজ। পাশে রত্নসিংহাসনে উপবিষ্ট মুনি বিশ্বামিত্র। তাঁর পাশে বসে আছেন অযোধ্যার রাজকুমার রাম এবং তাঁর অনুজ লক্ষ্মণ। রাজপ্রাসাদের বিশাল সভাগৃহে সীতার স্বয়ংবর সভা অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। কত যে অনাহূত, আমন্ত্রিত রাজা ও রাজপুত্র, কত যে বীর এসে সেই স্বয়ংবর সভায় ভিড় বাড়িয়েছেন, তার ইয়ত্তা নেই।
রাজমন্ত্রী তাঁর নথিভুক্ত বয়ান থেকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী এক-একজন রাজার নাম, তাঁর রাজ্যের নাম, তিনি বিবাহিত হলে তাঁর কয়টি বিবাহ, তাঁর কী কী বীরত্বগাথা এবং তিনি কতগুলি যুদ্ধ জয় করেছেন—সেই সমস্ত বিস্তারিত বিবরণ মুখে মুখে বলতে থাকেন।
‘সভাসদ ও সকল অতিথিবৃন্দ, এইবার আপনাদের সামনে আসছেন অমুক দেশের তমুক রাজকুমার। তিনি বর্তমানে তিন পত্নীবান। তিনি চোল, কাশী, কাঞ্চী ও মগধের রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। তিনি একবার তাঁর রাজ্যের সীমানা আক্রমণ থেকে রক্ষা করেছেন এবং অন্য রাজ্যের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি স্বয়ং দুইবার পরাজিত হয়েছেন।’
ঘোষণার পরে সেই সব বীরপুঙ্গব হাতের পেশি ফুলিয়ে প্রচণ্ড উন্নাসিক অহংকারের ভঙ্গিতে ভীষণ এক হুংকার ছেড়ে, গর্বিত পদভারে বীরত্বের দাপট দেখিয়ে মঞ্চে রাখা হরধনুর সামনে এগিয়ে যান।
তাঁদের মধ্যে শৈবচাপের প্রতি সামান্যতম নম্রতা বা কোনওরকম ভক্তির লক্ষণও দেখা যায় না। কারণ তাঁরা নিজেদের প্রচণ্ড বীর বলে মনে করেন। অতএব হরধনু হাতে তুলতে গিয়ে এক-একজন এক-এক রকম ভীষণ বীরত্বের ভঙ্গি দেখান। কত রকমের কসরত, কত রঙ্গ! এই বুঝি তিনি হরধনু ভেঙে তিন খণ্ড করে দেবেন। অথচ শেষ পর্যন্ত কিছুই করতে না পেরে সকলের হাসির রোলের মধ্যে মাথা নিচু করে নিজ নিজ আসনে গিয়ে বসে পড়েন।
বিফল মনোরথ প্রতিদ্বন্দ্বীগণ উৎকট হাসিতে পরাজিত জনকে হেয় করে আনন্দ পান। বীরপুরুষেরা একে অপরকে ঠাট্টা-তামাশা করে আসর সরগরম করে রাখেন।
রাজা জনক এবং তাঁর ভ্রাতা রাজা কুশধ্বজ মাথা নিচু করে বসে আছেন। এইসব বীরপুঙ্গবের নানা কসরত এবং তাঁদের মহা-মহা আস্ফালন ক্রমে সকলের মধ্যেই এক বিচিত্র বিরক্তির জন্ম দিতে শুরু করেছে।
রাজসিংহাসনের কিছুটা দক্ষিণ পাশে রাজা জনকের স্ত্রী সুনয়না এবং তাঁর দুই কন্যা সীতা ও ঊর্মিলা, এবং রাজা কুশধ্বজের স্ত্রী ও তাঁর দুই কন্যা মান্ডবী ও শ্রুতকীর্তি—তাঁরা সকলেই স্বয়ংবর সভা দেখতে বসেছেন।
মহারানি সুনয়না বলে ওঠেন, ‘মহারাজ, আমি অনুমান করেছিলাম, কেউই এই হরধনু ভঙ্গ করতে পারবে না। এভাবে স্বয়ংবর সভা হতে পারে না। এভাবে আমার সীতা মায়ের ভাগ্যের পরীক্ষা বন্ধ করা হোক, মহারাজ। যারা নামে মাত্র বীর, চলনে-বলনে যাদের শিক্ষা-দীক্ষা, ধৈর্য বা তিতিক্ষা নেই, যাদের শীল বা শ্রদ্ধা নেই, যারা আস্ফালনকারী ও অবিনীত, শ্রদ্ধাহীন ও দুর্বিনীত, শিক্ষাহীন ও অসংযত—তাঁরা আপনার রাজকুলের কোনও কন্যারই সমকক্ষ নন। আপনি বন্ধ করুন এদের এই তামাশা। লজ্জায় আমার মাথা অবনত হয়ে আসছে।’
রাজসভা এখন নিস্তব্ধ।
রাজা জনক অনুভব করেন, এই স্বয়ংবর সভায় যে রাজপুত্রগণ এসেছেন, তাঁদের কেউই সেই অর্থে প্রকৃত বীর নন। হরধনু হাতে তোলার মতো বিন্দুমাত্র যোগ্যতাও তাঁরা রাখেন না। এ যেন বৃথা সময়ের অপচয়।
রাজা জনক ভীষণ হতাশ হয়ে এবার বলে ওঠেন, ‘স্বয়ংবর সভায় আগত রাজপুরুষগণ, এতক্ষণ এই প্রতিস্পর্ধায় আমি এবং সমাগত সকলে যা প্রত্যক্ষ করলাম, তাতে আমি স্পষ্টতই হতাশ। এই হরধনু ভঙ্গ করা, আমার মনে হয়, আপনাদের কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। প্রকৃত বীর ছাড়া এই হরধনু কেউ উত্তোলন করতেই পারবেন না। এমন বীর কেউ এই মহীতে আছেন কি না, তা এখন ভীষণ চিন্তার বিষয়। এতক্ষণ আপনাদের যে পরাক্রম যৎমাত্র প্রত্যক্ষ করলাম, তা অত্যন্ত বিসদৃশ রকমের হাস্যকর। আমি চাই না, আপনাদের মতো আর কোনও উন্নাসিক, উচ্ছৃঙ্খল, উদ্ভবাহু বীরপুঙ্গব এই স্বর্গীয় হরধনুর অকারণ অবমাননা করুন। আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না—পৃথিবী কি সত্যিই বীরশূন্য হয়ে এসেছে?’
লক্ষ্মণ এবার উত্তেজিতভাবে উঠে দাঁড়িয়ে বলে ওঠেন, ‘না, মহারাজ! না, না, না! আপনি এ কথা বলে আর লজ্জা দেবেন না। পৃথিবী এখনও বীরশূন্য হয়নি। হতে পারে না। এ আপনার অনুচিত হতাশা, মিথ্যা আক্ষেপ। আপনার কথায় আমার শরীরে উষ্ণ শোণিত প্রবাহিত হতে শুরু করেছে। এভাবে আপনি সকলকে নির্বীর্য বলতে পারেন না।’
বিশ্বামিত্র বলেন, ‘লক্ষ্মণ, তুমি এমন উত্তেজিত হয়ো না, রামানুজ।’
লক্ষ্মণ বলতে থাকেন, ‘গুরুদেব, আমায় এ কথা বলতেই হবে যে, দশরথিনন্দনগণ জীবিত থাকতে এই পৃথিবী বীরশূন্য হতে পারে না। এইসব কথায় সূর্যবংশীয় বীরদের বিলক্ষণ অপমান বোধ হয়। আমার অগ্রজ দশরথনন্দন রামেরও এতে অবমাননা করা হয়। আমার অগ্রজ রাম অযোধ্যার রাজকুমার এবং একজন প্রকৃত বীর। তিনি এখনও এই হরধনুতে গুণসংযোগ করার মতো সুযোগ পাননি। আমার গর্ব হচ্ছে, এই মিথিলায়, এই সসাগরা ধরনীতে, হয়তো এক অভূতপূর্ব ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করব। এই হরধনু ভঙ্গ হলে পৃথিবীর তাবৎ বীরগণ, নরপতিগণ সাক্ষী হবেন। দেবগণ সাক্ষী হবেন। গন্ধর্বগণ সাক্ষী হবেন।’
রাম বললেন, ‘লক্ষ্মণ, শান্ত হও। এমন উষ্মা এখন অনুচিত।’
লক্ষ্মণ তাঁর উষ্মা সংবরণ করতে চেয়ে বলে ওঠেন, ‘রাঘব, এ আমার শ্লাঘার কারণ যে এখনও স্বয়ং আমার ভ্রাতার মতো বীর আছেন এই ভূমণ্ডলে। আমি তাঁর অপমান হতে দিতে পারি না।’
বিশ্বামিত্র বলেন, ‘তিষ্ঠ, লক্ষ্মণ, তিষ্ঠ।’
রাজা জনক বলে ওঠেন, ‘হে দশরথি, আমি কারও অহংকারে আঘাত করতে চাইনি। তবে আমার দুঃখ এই যে, হয়তো হরধনু ভঙ্গ করতে বলে আমি ভুল কিছু করে ফেলেছি। এ আমার কন্যা, বীর্যশুল্কা সীতার স্বয়ংবরের প্রশ্ন। এখন মনে হচ্ছে, আমার এত শীঘ্র নিরাশ হওয়ার কোনও কারণ ছিল না।’
এবার গৌতমপুত্র মুনি শতানন্দ বললেন, ‘রাজন, এ এক প্রতিযোগিতা। এই স্পর্ধা আপনার বীর্যশুল্কা কন্যার স্বয়ংবরের। আমরা চাই, প্রকৃত বীর তাঁর শৌর্য-বীর্যে প্রকাশিত হউন। হরধনু ভঙ্গ করে যিনি এই মহীতে অতুল কীর্তি স্থাপন করবেন, তিনি সীতার বরমাল্য লাভ করবেন। এখন কে সেই বীর আছেন এই মহীতে, আমরা তা দেখতে চাই।’
এক্ষণে মুনি বিশ্বামিত্র উঠে দাঁড়ান। তিনি বলেন, ‘রাজা জনকের ক্ষোভ যথার্থ। তবে হরধনু ভঙ্গ তো আর নিঃক্ষত্রিয়ের কাজ নয়। আজ এই সভায় যে সুরবীরগণ এসেছেন, তাঁদের বিক্রম এতক্ষণ দেখা হল। এবার আমি বলব, যদি আর কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকেন, তাহলে আমি চাই দশরথনন্দন রামকে হরধনু ভঙ্গ করতে আমন্ত্রণ করা হোক।’
রাজা জনক, মুনি শতানন্দ এবং যতেক দর্শনার্থী ঋষি, মুনি, রাজর্ষি, দেব ও গন্ধর্ব সকলে ‘সাধু! সাধু!’ বলে হর্ষধ্বনি করে ওঠেন।
রাজা জনক বলে ওঠেন, ‘আমি সবিনয়ে এখন অযোধ্যাকুমার যুবরাজ রামকে হরধনু ভঙ্গের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’
বিশ্বামিত্র রামকে বলেন, ‘রাম, ওঠো। আর দেরি করার কোনও কারণ নেই। যাও, এবার তুমি এই হরধনু উত্তোলন করে দেখাও। দিনমণি উন্মুখ হয়ে রয়েছেন তোমার এই বিশেষ কীর্তি অবলোকন করতে। তারপর তিনি অস্তাচলে যাবেন।’
মুনি বলিলেন রাম দেখাও কৌতুক।
মনোরথ পূর্ণ কর ভাঙ্গিয়া ধনুক ॥ [কৃত্তিবাস ]
মুনি বিশ্বামিত্রের কথায় দশরথনন্দন রাম উঠে দাঁড়ালেন। তিনি গুরুদেবকে প্রণাম করলেন। তারপর রাজা জনক, মুনি শতানন্দ এবং রানি সুনয়নার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করলেন।
রাজা জনকের স্ত্রী সুনয়না তাকিয়ে দেখেন রামকে। আহা, অনিন্দ্যকান্তি পুরুষোত্তম রাম! এই তো আমার বীর্যশুল্কা সীতার যোগ্য বর। আমি তবে এত কেন হতাশ হয়ে পড়ছিলাম!
রানি সুনয়না যেন এক আশার আলো দেখতে পেলেন। রামকে দেখে তিনি বোধ হয় দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত হলেন—হরধনু ভঙ্গ করবেন রাম, এতে কোনও দ্বিধা নেই। শুধু দুরদুর বক্ষে সময়ের প্রতীক্ষা।
সীতা তাকিয়ে থাকেন রামের দিকে লাজনম্র চোখে। আচমকাই যেন এক তৃষিত দৃষ্টির মিলন ঘটে গেল রাজকুমার রামের সঙ্গে। সীতা বুঝি এইক্ষণে হর-পার্বতীর কাছে প্রার্থনা করলেন।
রাম সভাস্থ সকলের প্রতি সম্মান ও সৌজন্য প্রদর্শন করলেন। সভাস্থ সকলে অযোধ্যাকুমারের দিকে তাকিয়ে থাকেন—তাঁর সমুন্নত অবয়ব, তাঁর অঙ্গসৌষ্ঠব, তাঁর বীরোচিত পদক্ষেপের দিকে।
এক্ষণে নবজলধরশ্যাম, আয়তনেত্র, উন্নতকায়, বলিষ্ঠবাহু, নবযৌবনপ্রাপ্ত স্বয়ং রাম দৃপ্ত পদভারে সেই বিশাল হরধনু তাঁর বাম হস্তে তুলে নিয়ে মুহূর্তে তাতে জ্যা রোপণ করলেন। সমস্ত প্রণম্য ঋষি-মুনি, দেব-গন্ধর্ব ও গুরু-পিতাকে স্মরণ করে এবার তিনি ঋষি বিশ্বামিত্রের দিকে তাকালেন।
মুনিবর বললেন, ‘রাম, দাও টান!’
আর রাম তৎক্ষণাৎ এক টানে সেই হরধনুকে দ্বিখণ্ডিত করলেন।
সারা সভাস্থল থেকে স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল, দিক-দিগন্তে ভীষণ রবে সেই ধনুকভঙ্গের গর্জন প্রতিধ্বনিত হল। সারা পৃথিবী আলোড়িত হয়ে পড়ল। সেই ভীষণ ধ্বনিতে সকলে অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।
স্বর্গলোকে দুন্দুভি বেজে উঠল। দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করলেন।
এ কী! এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য! এ যে কল্পনারও অতীত!

গুন চড়াওয়ে রাম মারে যেই টান ,
যেন, বিদ্যুৎ ঝলকিল ওই মেঘ রাজ্যে
চক্ষের নিমিষে দেখো ধনু দুইখান
তুমূল সে ধ্বনি যে ঐ সবলোকে গর্জে ।।
সুর নর গন্ধর্ব কিন্নর যত আসে,
হরধনু তুলিতে সভে কিছুতে না পারে ।।
সীতা ও তুলিতে পারে যে ধনু অনায়াসে
এক নাহি বীর কেহু উঠায় সে ধনুশ্বরে।।
যত বীর ছিল অধীর হরধনু ভাঙ্গিতে ,
একহু না ছিল বীর, ধনু সো উঠাওয়ে।।
রাম হেন বীর এবে আদেশ লভিতে
নিমেষে তুলিয়া ধনু গুন চড়াওয়ে ।।
গুরু পিতা ঋষি মুনি দেব সর্বজনে
প্রনমিল রাম সভে চক্ষু মুদিয়া।
প্রনমে দেবাদিদেবে সীতা মনে মনে
রামের বিক্রমে সভে উঠিল ত্রাসিয়া ।। [ স্বরচিত ]
বিশ্বামিত্র প্রচণ্ড আনন্দে রাজা জনককে বলে উঠলেন,
‘রাজা জনক, দেখো, দেখো, চেয়ে দেখো—অযোধ্যাকুমার দশরথী রাম শৈবচাপ হরধনু ভঙ্গ করেছেন। বিশ্বসংসারে স্বতঃই দুর্লভ এই ঘটনা।’
রাজা জনক উল্লসিত হয়ে বলে উঠলেন,
‘হর হর মহাদেব! হর হর মহাদেব! আজ আমার ঘরে স্বয়ং নারায়ণ এসেছেন। এমনই ভবিষ্যদ্বাণী হয়েছিল একদিন।’
রাজসভায় যত বীর ছিলেন, সকলেই তাঁদের পরাজয় ভুলে প্রচণ্ড নিনাদে ‘জয় রামচন্দ্রের জয়’ ধ্বনি তুলে আনন্দ-কোলাহলে মত্ত হয়ে পড়লেন।
জনকনন্দিনী সীতা হৃদয়াবেগে হর-পার্বতীর উদ্দেশ্যে জোড়হাতে প্রণাম করলেন। এ যে স্বপ্ন! এক—হরধনু ভঙ্গ। দুই—স্বপ্নের পুরুষ রাজকুমার রাম, যিনি সেই মহান দিব্যপুরুষ; তাঁর গলায় বরমাল্য তুলে দেওয়ার পরম লগ্ন।
সভায় সকল পাত্র মিত্র অমাত্য মুনি ঋষিগন ধ্বনি তুললেন,
জনক নন্দিনী সীতা, এই সে মাহেন্দ্রক্ষন,
রামের কণ্ঠে কর বিজয়মাল্য অর্পণ।
তখন জনক রাজসভায় তুমুল হর্ষধ্বনি ও জয়ধ্বনির মধ্যে ব্রীড়াভারাবনতা সীতা তাঁর অন্য ভগিনীদের সাহচর্যে মঞ্চে নেমে এলেন। সেখানে অযোধ্যাকুমার দশরথনন্দন রাম স্মিতহাস্যে, দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। রাজা জনক, মুনি বিশ্বামিত্র, রাজা কুশধ্বজ এবং রাজপুরোহিত মুনি শতানন্দ সকলেই উঠে এসে রামকে অভিনন্দিত করলেন।
সীতা তাঁর অনুজা ভগিনীদের সঙ্গে এসে রামের গলায় বিজয়মাল্য পরিয়ে দিলেন। চার চোখের মিলনে, অভিনন্দন ও সম্বর্ধনার আবহে, বাদ্যধ্বনি-সহ মহাকলরোলে দেব-গন্ধর্ব সকলেই ‘সাধু! সাধু!’ ধ্বনি দিয়ে উঠলেন।
রামের গলায় সীতা জয়মাল্য পরিয়ে দিয়েছেন। এবার তাঁর বরমাল্য পরানোর অপেক্ষা। সকলেই রামকে সীতার যোগ্য পাত্র মনে করেন। তাই আনন্দ-উৎসবে মেতে উঠল সারা মিথিলা রাজ্য।
বিশ্বামিত্র বললেন, ‘রাজা জনক, আমি জানতাম, রাম এই হরধনু ভঙ্গ করবেন।’
জনক বললেন, ‘নিশ্চয়ই, মুনিবর। আপনার অনুমান সঠিক। রাম আমাদের আনন্দবর্ধন করেছেন। আমার বীর্যশুল্কা কন্যা সীতার উপযুক্ত বর হবেন রাম। আমি উৎসুক হয়ে রয়েছি রামের সঙ্গে সীতার বিবাহের জন্য। মুনিবর, আমি আপনাকে একটি কথা জিজ্ঞাসা করি—রাম উপঢৌকন হিসেবে কী নিতে সম্মত, তা যদি আপনি আমাকে জানান। রাম চাইলে আমি তাঁকে আমার রাজত্বের অর্ধেকও সমর্পণ করতে পারি।’
বিশ্বামিত্র বললেন, ‘উত্তম! তবে, রাজা জনক, আমি এই বিষয়ে রামের সঙ্গে আলোচনা না করে রাজপুরোহিত শতানন্দই আপনার বার্তা রামের গোচর করুন।’
রাজা জনক বললেন, ‘যথার্থ, যথার্থ বলেছেন আপনি। বেশ, তবে আমি মুনি শতানন্দকে অনুরোধ করব এই বিবাহের দৌত্যকার্যে।’
মুনি শতানন্দ বললেন, ‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। আমিই আপনার প্রস্তাব নিয়ে রামের গোচর করব, মহারাজ জনক।’
| ১৭ |
বিবাহ প্রস্তাব
এক্ষনে মুনি শতানন্দ রামকে গিয়ে সেই কথা জ্ঞাপন করলেন।
‘দশরাত্মজ রাম, আমি রাজা জনক এর বার্তাবহ হয়ে তোমার কাছে এসেছি। রাজা জনক তোমাকে কি দিয়ে আপ্যায়ন করবেন সেই কথা তিনি জানতে ইচ্ছুক। তিনি তোমাকে তাঁর রাজ্যের অর্ধেক দান করতে ইচ্ছুক । তুমি কি ইচ্ছা কর ?’
রাম বললেন, ’ মুনিবর, তাত জনককে বলবেন, আমি কোন কিছুই চাই না। মহারাজা জনক আমা প্রতি গভীর স্নেহবান। তিনি যা কিছু দিতে চেয়েছেন আমার সে সবে কোন প্রয়োজন নেই। রাজা হওয়া রাজত্ব করা সে সব নিয়ে আমার কোন স্পৃহা নেই। আমি এমন প্রস্তাব অনুমোদন করতে পারি না।’
শতানন্দ বললেন,‘সাধু সাধু। রাম, এই পৃথিবীতে যেন সবাই তোমার মত নির্লোভ তোমার মত জিতেন্দ্রিয় হতে পারে। যে রাজ্য ও রাজত্ব হেলায় ফিরিয়ে দেয় তার মত পুজ্য আর কে হতে পারে এই পৃথিবীতে।’
রাম বলেন,‘ মুনিবর, আমি হরধনু ভঙ্গ করেছি এ আমার ক্ষত্রিয়জাত বীরত্ব। সীতা আমায় বরমাল্য দিয়েছেন। সে আমার অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয়। তবে আমি চাই আমাদের চার ভাইয়ের বিবাহ এই একই পরিবারে হোক।’
চারি ভাই জন্ম লইয়াছি একদিনে
সে সবারে ছাড়ি বিবাহ করি কেমনে ?
এ চারি ভ্রাতাকে কন্যা দিবে চারি ,
চারি ভাই বিবাহ করিব ঘরে তাঁরি ।। [কৃত্তিবাস ]
শতানন্দ বললেন,‘বেশ, আমি ও তোমার প্রস্তাব অনুমোদন করলাম। এ নহে কোন অসম্ভব কার্য। রাজা কুশধ্বজের আরো দুই কন্যা রত্ন আছেন। আমি রাজা জনকের কাছে সেই প্রস্তাব অবশ্যই রাখব। সাধু সাধু । আমি তবে রাজা জনকের কাছে গিয়ে তোমার প্রস্তাব রাখছি।’ – এবং শতানন্দ প্রস্থান করলেন।
বিশ্বামিত্র বললেন,‘এ তোমার বিচক্ষন প্রস্তাব রাম । এ তোমার মহতি ইচ্ছা।’
রাম বললেন, ‘গুরুদেব আর আমার ইচ্ছা অযোধ্যায় আমার পিতা মহারাজকে যেন এই সংবাদ প্রেরণ করা হয়। তিনি ও আসুন এবং রাজা জনক পিতার সঙ্গে এই বিষয়ে সহৃদয় আলোচনা করুন। ‘
বিশ্বামিত্র বলেন,‘ অবশ্যই। এ তোমার সাধু প্রস্তাব। রাম তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। রাজা জনককে আমি এই সংবাদ জ্ঞাপন করব। অযোধ্যায় অবশ্যই সংবাদ প্রেরণ করা হবে এবং সসাগরা অধিপতি মহারাজা দশরথ ও আসবেন তার পুত্রদের বিবাহ সভায়। তিনি না এলে তার পুত্রদের বিবাহ কেমন করে সম্পন্ন হতে পারে ?’
বিশ্বামিত্র এইবার রাজা জনকের রাজসভায় গেলেন। সেখানে তখন রাজা জনক তার পাত্র মিত্র অমাত্য জনের সঙ্গে বসে আছেন। তিনি মুনিবরকে আসন গ্রহন করতে অনুরোধ করলেন। সেখানে তখন রামের শৌর্যের কথা নিয়ে সে কি হর্ষময় আলোচনায় মগ্ন সবাই ।
রাজা জনকের ভ্রাতা রাজা কুশধ্বজ বললেন,‘ কাল এই ভরা সভায় রাম যে বিক্রমে হরধনু ভঙ্গ করেছেন সেই বিস্ময়ের ছোঁয়া যেন এখনো আমার চোখের সামনে ভাসছে। কত বড় বড় বীর রথী মহারথী ধনুর্ধর সব এসেছিলেন, তারা কেউই সেই হরধনুককে তিলমাত্র তোলার ক্ষমতা রাখেননি। তারা সব মাথা নত করে বিশুষ্ক মুখে নিজ নিজ স্থানে বসে রইলেন। আর নবজলধরশ্যাম আয়তনেত্র উন্নতকায় বলিস্টবাহু নবযৌবন প্রাপ্ত স্বয়ং রাম দৃপ্তপদভারে সেই বিশাল হরধনুকে বাঁ হাতে তুলে নিয়ে মুহূর্তে তাতে জ্যা রোপন করে সমস্ত প্রনম্য ঋষিমুনি দেবগুরু পিতা সবাইকে স্মরন করে এক টানে সেই ধনুকে দ্বিখন্ডিত করলেন। এ যে কি আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছিল মিথিলার এই ভরা রাজসভায়।’
রাজা জনক , যিনি সীরধ্বজ বললেন,‘ অহো ! অহো ! অহোঃ ! সারা সভাস্থলি এমন কি স্বর্গমর্ত্যপাতাল দিকদিগন্তে ভীষণ রবে সেই ধনুভঙ্গের সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল। ঋষিবর আমি চমকিত। আমি গর্বিত। আমি আনন্দিত। আমরা রামের অদ্ভুত বিক্রম প্রত্যক্ষ করলাম। এই ব্যাপার অত্যাশ্চর্য ও অচিন্তনীয়। রামকে পতিরূপে পেয়ে আমার কন্যা জনক বংশে কীর্তি স্থাপন করবেন।’
বিশ্বামিত্র বলেন,‘ রাজন, আমি দৃঢ় নিশ্চিত ছিলাম রাম এর অচিন্ত্যপূর্ব বিক্রম সম্বন্ধে। রাম যে রকম একনিষ্ঠ, যে ভাবে সে আমার যজ্ঞে রাক্ষসদের প্রতিহত করেছিল তাতে সে নিশ্চয়ই হরধনু ভঙ্গ করতে পারবে , সেই বিশ্বাস আমার ছিল।
রাজা কুশধ্বজ বলেন,‘ আমার মনে হয় আমরা সকলে যতেক অযোগ্যজনের অপারগতা দেখে দেখে আমাদের মনের আশা হারিয়ে ফেলেছিলাম।’
রাজা জনক বললেন,‘ বীর সব শত শত, আস্ফালনকারী অবিনীত, শ্রদ্ধাহীন দুর্বিনীত, শিক্ষাহীন অসংযত, জ্ঞানহীন অজ্ঞানতঃ। এরা সব মাত্র আত্মম্ভরিতা এবং আত্মশ্লাঘায় পরিপূর্ণ। আমরা তাদের পরাক্রমকে বীরত্ব বলে ভুল করেছিলাম। তাই রাম এর শক্তি এবং শৌর্য সম্বন্ধে আমরা স্থির নিশ্চয় থাকতে পারিনি।‘
এইবার ঋষি বিশ্বামিত্র রাজা জনককে বললেন, ‘ রাজর্ষি জনক , রামের হরধনু ভঙ্গের সংবাদ অযোধ্যায় প্রেরণ করার ব্যবস্থা করুন। এবং আমার দ্বিতীয় প্রস্তাব রাজা দশরথের চার পুত্রের সঙ্গে তোমাদের বংশের চার কন্যার বিবাহ সম্পন্ন হোক ।’
রাজা জনক বিশ্বামিত্রকে বললেন,‘মহর্ষি, এ আপনার অতি সাধু প্রস্তাব। আমি সানন্দে এই প্রস্তাব স্বীকার করলাম। মুনিবর শতানন্দ ও আমাকে সেই সম্ভাবনার কথা বলেছেন। বেশ তাই হোক। আমাদের বংশের দুই ভাইয়ের চার কন্যার সাথে রামাদি চারভাইয়ের শুভবিবাহ সম্পন্ন হোক। আমার দুতেরা অবিলম্বে রথারোহনে অযোধ্যায় যান এবং সকল সংবাদ জানিয়ে রাজা দশরথকে এখানে নিয়ে আ্সুন। আমি আদেশ দিচ্ছি, আটঘোড়ার রথ প্রস্তুত হোক। রাজা দশরথকে তার পুত্রদের সঙ্গে আমার কন্যার বিবাহ প্রস্তাব নিয়ে আমি দূত প্রেরণ করতে ইচ্ছা করি। কিন্তু কিন্তু কিন্তু কে হবেন এই বিবাহের অনুঘটক ?
মুনি শতানন্দ বললেন, ‘ আহা, তবে কেন না মুনি বিশ্বামিত্রই হউন এই স্বর্গীয় বিবাহের ঘটক ?’
সকলে আনন্দধ্বনি করে উঠলেন। সাধু সাধু সাধু !
রাজা বলিলেন মুনি করি নিবেদন।
তুমি ভিন্ন কে যাইবে অযোধ্যা ভুবন ? [কৃত্তিবাস ]
বিশ্বামিত্র বললেন,‘ উত্তম, রাজা জনক, আমি তবে নিজেই যাব অযোধ্যায় তোমাদের দুই পরিবারের ঘটক হয়ে। আমি নিজে গিয়ে রাজা দশরথকে সাদরে অভ্যর্থনা করে নিয়ে আসব। আমি নিজেই তবে রাম সীতার বিবাহের ঘটকালি করে ত্রিভুবনে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করব !
এই যশঃ আমার ঘুষিবে ত্রিভুবনে ,
বিবাহ দিলাম আমি শ্রী রাম লক্ষনে ।। [কৃত্তিবাস ]
তখন দ্রুতগামী অশ্বের সংযোগে রথ সাজল। আটঘোড়ার সেই রথে আরূঢ় হয়ে বসলেন মুনি বিশ্বামিত্র এক্ষনে রাজা জনকের দূত হয়ে এক স্বর্গীয় বিবাহের অনুঘটক হয়ে।
সারথি রথ নিয়ে চলল অযোধ্যার দিকে বিশ্বামিত্র মুনিকে নিয়ে। তাঁর সঙ্গে আছেন জনক রাজার দূত। অযোধ্যার পথে যেতে যেতে বিশ্বামিত্রর দৃষ্টিতে পড়লো গমন পথে পেরিয়ে আসা সেই সব দ্রষ্টব্যস্থান যা বিশ্বামিত্র রাম এবং লক্ষণকে দেখাতে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন।
অযোধ্যায় মিথিলার রথ রাজদ্বারে গিয়ে থামতে সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। রাজা দশরথ বিশ্বামিত্র মুনিকে রাম লক্ষণ বিহীন দেখে আতঙ্কিত ভাবে বলে ওঠেন, ‘এ কি মুনিবর ! আপনি একা? কোথায় আমার রাম কোথায় লক্ষণ ? কতদিন হয়েছে তারা দুই ভাই অযোধ্যানগর ত্যাগ করে আপনার সঙ্গে গমন করেছিলেন সিদ্ধাশ্রমে যজ্ঞ রক্ষার্থে ! কিন্তু আজ আপনি একা ফিরে এসেছেন। কি সংবাদ আমার রামের ? তাদের দুই ভাইয়ের সর্ব কুশল তো?
বিশ্বামিত্র হাসছেন। এইবার দশরথের অস্থিরতা দেখে বলে ওঠেন,‘ আহা, রাজা দশরথ। শান্ত হও। তুমি কি মনে কর আমি তোমার রামকে কোন বিপদের মুখে ঠেলে দেবো ? না , না , তেমন কর্ম আমার দ্বারা সম্ভব নয় কখনো মহারাজা দশরথ । আমি যে তোমার জন্য কি সুখবর এনেছি তুমি না শুনলে বিশ্বাস করবে না।’
দশরথ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ সুখবর ? রাজা জনকের মিথিলা হতে আপনার আগমন কি সেই সুসংবাদ নিয়ে ? অহোঃ , শীঘ্র বলুন কি সেই সুসংবাদ ?’’
বিশ্বামিত্র বলেন,‘ রাজা রাজ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যাবে। তুমি আনন্দ কর।’
দশরথ বলেন, ‘ আমার রামের কুশল তো ?’
মন্ত্রীবর সুমন্ত্র বলেন,‘ আহা মহারাজ ! এ আপনার অতি উদ্বেগ। আপনি তো প্রত্যক্ষ করছেন মুনিবর এক্ষনে মিথিলা হতে রাজা জনকের রথে এসে পৌঁছেছেন। নিশ্চই কোন শুভ সংবাদ তিনি নিয়ে এসেছেন। সঙ্গে রয়েছেন দুতেরা । রাজা দশরথ আপনি অহেতুক চিন্তিত হয়ে রয়েছেন আপনার রামের জন্য।
বিশ্বামিত্র মৃদু হাস্যমুখে বলে ওঠেন, ‘ আমি জানি রাম তোমার প্রিয়পুত্র। তার জন্য তোমার উদ্বেগ সর্বজন বিদিত। রাজন আমি তার সুকীর্তি ঘোষণা করতেই আপনার সকাশে ছুটে এসেছি মিথিলা হতে। আজ তোমার রামের সুমহানকীর্তি আমি তোমার কাছে বর্ণনা করবো।
দশরথ বলেন, ‘ আমি লজ্জিত আমার উদ্বেগের জন্য। কিন্তু রাম এখন কোথায় ?’
‘রাজা দশরথ, আপনার রাম এখন মিথিলার জনকনগরে অবস্থান করছে,’ – বিশ্বামিত্র বলেন,‘সেখানে সে এক অতুল কীর্তি স্থাপনা করেছে। রাজন , সেই সংবাদ শুনলে তুমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবে।’
রাজা দশরথ অধৈর্য ভাবে বলে ওঠেন, ‘ কি সেই অতুল কীর্তি শীঘ্র আমাকে শোনান আপনি।’
বিশ্বামিত্র এবার রামের অদ্ভুত অতুলকীর্তি রাজা দশরথকে প্রকাশ করেন।
বিশ্বামিত্র বলেন শুনহ যশোধন।
পুত্রের বিক্রম কথা করহ শ্রবণ ॥
তাড়কাকে মারিলেন কৌশল্যানন্দন।
অহল্যার করিলেন শাপ বিমোচন ॥
মম যজ্ঞ কৃতার্থ করিলেন শ্রীরাম।
রাক্ষস মারিয়া পূর্ণ করিলেন কাম ॥ [কৃত্তিবাস]
শোনো রাজা দশরথ, বলি শোনো রামের কথা। তোমার প্রিয়পুত্র রামকে আমি সিদ্ধাশ্রমে নিয়ে যাওয়ার পথে তাড়কা বনে সে রাক্ষসী তাড়কাকে বধ করে।
দশরথ বলেন, ‘ অহোঃ, কি আশ্চর্য !’
বিশ্বামিত্র আবার বলেন,’ অতঃপর সিদ্ধাশ্রমে গিয়ে সে আমার যজ্ঞ রক্ষা করে এবং সে তিনলক্ষ রাক্ষসকে বধ করে আমাদের আনন্দবর্ধন করে।’
দশরথ বলেন, ‘ এ সংবাদ ততোধিক অত্যাশ্চর্য !’
বিশ্বামিত্র বলেন,‘সেই স্থান হতে সে মিথিলা নগরীতে যাওয়ার পথে গৌতমমুনির স্ত্রী পাষাণী অহল্যার শাপমোচন করে।’
অযোধ্যাবাসী বলেন,‘ সাধু সাধু সাধু।‘ রাজা দশরথ বলেন, ‘ অহো, আমি গর্বিত আমার রাম এর বীরত্ব কথা শুনে। ’
বিশ্বামিত্র এবার বললেন,‘তারপর, বলি শুনুন রাজন, আপনার পুত্র রাম মিথিলায় গিয়ে সীতার স্বয়ংবর সভায় দাঁড়ালেন। স্বয়ংবর সভায় আগত রাজপুরুষগন, শিবের সেই হরধনু কেউ উত্তোলন করতেই পারলেন না।
রাজা জনক তখন সবিনয়ে যুবরাজ রামকে হরধনু ভঙ্গের আমন্ত্রন জানালেন।
রাম সভাস্থ সকলের প্রতি সন্মান সৌজন্য প্রদর্শন করলেন। তারপর রাম দৃপ্তপদভারে সেই বিশাল হরধনুর সামনে গেলেন এবং সেই বিশাল হরধনুকে তাঁর বামহস্তে তুলে নিয়ে মুহূর্তে তাহাতে জ্যা রোপন করে সমস্ত প্রনম্য ঋষিমুনি দেবগন্ধর্ব গুরু পিতা সবাইকে স্মরন করে এক টানে সেই হরধনুকে দ্বিখন্ডিত করলেন।
আজ্ঞা পেয়ে শ্রীরাম দিলেন গুণে টান।
মড় মড় শব্দে ধনু হৈল দুইখান।।
সভায় সকল লোক হারাইল জ্ঞান।
ত্রিভুবন সঘনে হইল কম্পমান ॥
হইলেন জনক ভূপতি হরষিত।
বাদ্য বাজে মিথিলানগরে অগণিত ॥ [কৃত্তিবাস ]
সারা সভাস্থলি হতে স্বর্গমর্ত্যপাতাল দিকে দিগন্তরে ভীষণ রবে সেই ধনুক ভঙ্গের গর্জন প্রতিধ্বনিত হল। সারা পৃথিবী আলোড়িত হয়ে পড়ল। সেই ভীষণ ধ্বনিতে সকলে অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।
স্বর্গলোকে দুন্দুভি বেজে উঠল। দেবতারা পুস্পবৃস্টি করলেন। সে যে কি এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। সে ছিল কল্পনার ও অতীত।
রাম হরধনু ভঙ্গ করে সকল রাজপুরুষগনকে এবং ত্রিলোকবাসীকে অভিভুত করে ফেলে এবং সে সীতার বরমাল্য লাভ করে।’
রাজা দশরথ এবং তার সভাসদগণ ঋষি বিশ্বামিত্রের কথা শুনে আনন্দে এক বিরাট হর্ষধ্বনি করে উঠলেন।
রাজা দশরথ বলেন, ‘মুনিবর আপনি আমাকে আমার রামের অতুলকীর্তির গরিমাময় সংবাদ শুনিয়ে ভীষণ আনন্দ দিলেন। এখন আপনি যে শুভ সংবাদ এনেছেন সেই সমাচার আমি শুনতে উদ্গ্রীব।’
বিশ্বামিত্র বললেন,‘ রাজন, আপনি শুনলে আনন্দ পাবেন, আমি এক শুভ প্রস্তাব নিয়ে আপনার কাছে এসেছি । ইক্ষ্বাকু ও বিদেহ এই দুই রাজবংশ গুনে গরিমায় অতুলনীয়। এই দুই পরিবারের ধর্মসম্বন্ধ স্থাপন করতে আমি নিজেই ঘটক হয়ে তোমার কাছে এসেছি। আপনার পুত্র রামের ইচ্ছা, এই একই পরিবারে তাদের চারভাইয়ের বিবাহ সম্পন্ন হোক। রাজা জনক ও এমতে সম্মত হয়েছেন।’
বশিষ্ঠদেব বললেন, ‘ সাধু সাধু। এ অতি উত্তম প্রস্তাব। রাম এক বিচক্ষন প্রস্তাবই রেখেছেন।’
দশরথ বললেন,’ গুরুদেব আমার পুত্রদের বৈবাহিক সম্বন্ধে তেমনই আমার ইচ্ছা। আমার রাম অত্যন্ত বিচক্ষণ ব্যক্তির মত কথা বলেছে। আমি এই মত বৈবাহিক সম্বন্ধে সত্য সত্যই আগ্রহান্বিত। আপনি বশিষ্ঠদেব, আপনি কি বলেন ?’
বশিষ্ঠদেব এবার বলেন,‘ মহর্ষি বিশ্বামিত্র যখন এই সম্বন্ধ উত্থাপন করেছেন এবং রাজা জনকের ভূমিজা কন্যা সীতার সঙ্গে রামের বিবাহ যখন প্রারব্ধ তখন এরূপ সম্বন্ধ সকলেরই প্রশংসনীয়। ইক্ষ্বাকু ও বিদেহ এই দুই রাজবংশ গুনে ও গরিমায় অতুলনীয়। এদের মধ্যে ধর্ম সম্বন্ধ স্থাপিত হলে যে কল্যাণ সাধিত হবে , অযোধ্যাপতি রাজা দশরথ , তা অকল্পনীয়।’
বিশ্বামিত্র বলেন,‘এই সম্বন্ধকে অটুট ও নিশ্চিন্ত করার জন্য রাজা দশরথের চার পুত্রের সঙ্গে রাজা জনক ও তার ভাই কুশধ্বজের চন্দ্রবংশীয় চারকন্যার বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে আমি এসেছি। রাজা জনকের দুই কন্যা। সীতা ও ঊর্মিলা। এবং তস্য ভ্রাতা রাজা কুশধ্বজের দুই কন্যা,মান্ডবী এবং শ্রুতকীর্তি। আমার ইচ্ছা রাম এর সাথে সীতার এবং লক্ষনের সাথে ঊর্মিলার এবং মান্ডবীর সাথে ভরতের এবং শত্রুঘ্নর সাথে শ্রুতকীর্তির বিবাহ সম্পন্ন হোক।’
দশরথ বলেন ,’ মহর্ষি বিশ্বামিত্র এ আপনার অতি উত্তম প্রস্তাব ।
বশিষ্ঠ মুনি বলেন,‘ আমিও সর্বান্তকরনে এই সম্বন্ধ অনুমোদন করি। রাজকুমারদের ভিন্ন ভিন্ন বংশে বিবাহ হলে বংশের ভিতর আত্মকলহ অবশ্যম্ভাবী এবং সেই হেতু সূর্যবংশীয় কুলে ভাইদের মধ্যে বিরোধ হতে পারে। তাদের ভ্রাতৃত্ব এবং সম্প্রীতি ভেঙে যেতে পারে।’
মন্ত্রিবর সুমন্ত্র দশরথকে বললেন, ‘গুরুদেব যথার্থ বলেছেন মহারাজ। আপনি সর্বান্তকরনে এই সম্বন্ধ স্বীকার করুন। মহারাজ এইবার আপনি প্রস্তুত হন। অন্য দুই রাজকুমার ভরত এবং শত্রুঘ্ন প্রস্তুত হয়ে চলুন জনকনগরে।’
রাজা দশরথ এবং তাঁর রানীগণ কৌশল্যা, কৈকেয়ী এবং সুমিত্রা সকলে পুত্রদের বিবাহ সংবাদে আনন্দিত হয়ে রাজপুরীতে হুলুধ্বনি শঙ্খ ধ্বনি দিয়ে আনন্দ সংবাদকে বরণ করলেন।
রাজা দশরথ তখন তাঁর প্রধানমন্ত্রী সুমন্ত্রকে বললেন,’ সুমন্ত্র কোষাধ্যক্ষকে আদেশ কর রাজকোষ হতে পর্যাপ্ত ধন এবং মনিরত্ন নিয়ে উৎকৃষ্ট সব দোলা আর শিবিকা সজ্জিত করে অদ্যই মিথিলা যাত্রা করুক। আমাদের সঙ্গে চলুক সশস্ত্র রক্ষীরা। চতুরঙ্গ সেনা ও যাবে সঙ্গে। শুভযাত্রার পুরোভাগে থাকবেন ঋষি বশিষ্ঠ এবং বামদেব জাবালি কশ্যপ মার্কণ্ডেয় এবং মহর্ষি কাত্যায়ন।’
সুমন্ত্র বললেন,‘ যথা আজ্ঞা মহারাজ। শুভ কার্যে বিলম্ব নয় ।
রাজা দশরথ বললেন,‘ সুমন্ত্র তুমি আমার রথ যোজনা কর।’
সুমন্ত্র বললেন, ‘যথা আজ্ঞা মহারাজ। ‘
পরদিন প্রভাতে দশরথের আজ্ঞায় ধনাধক্ষ্যগণ প্রচুর ধনরত্ন নিয়ে এবং সৈন্য দ্বারা সুরক্ষিত হয়ে মিথিলা যাত্রা করলেন।
বশিষ্ঠ বামদেব প্রভৃতি বিপ্রগন বিবিধ যানে অগ্রসর হলেন।
রাজা দশরথ রথে চললেন। পশ্চাতে চতুরঙ্গিনী সেনা ও আগুয়ান হল।
চার দিন পরে সকলে বিদেহ দেশে গিয়ে উপস্থিত হলেন।
বিদেহ বর্তমানে নেপালের মিথিলা নামে পরিচিত ।
| ১৮ |
রামাদির বিবাহ
সমগ্র বিদেহনগর আজ উৎসব মুখরিত। মঙ্গলবাদ্য পুরিত। আলোকমালায় সজ্জিত। চারিদিকে ভাট ও নান্দীকারের নৃত্য গীত। বিদেহ ও রঘুবংশের যশ গান করছে যত সুত মাগধ ও চারণবৃন্দ।
রাজা দশরথ এর অযোধ্যা হতে আগমন হেতু তার পুরবর্গের জন্য এক বিরাট মহলের বন্দোবস্ত করেছেন রাজা জনক। তাঁর ভাই কুশধ্বজ ও সর্বকার্যে রাজা জনকের সহায়ক।
ওই রাজা দশরথ এসে পড়েছেন তার বিরাট পুরবর্গ এবং চতুরঙ্গ সেনা নিয়ে। সে যেন এক বিশাল স্রোত এসে মিশে গেলো মিথিলার রাজপুরীতে।
মিথিলা অধিপতি রাজা জনক তাঁর পুরোহিত শতানন্দকে সঙ্গে নিয়ে দশরথকে অভ্যর্থনা করলেন।
রাজা জনক নিবেদন করলেন,‘হে রঘুকূলপতি,আপনার শুভাগমন হোক। আপনার পদার্পণে আমরা সৌভাগ্যবান হলাম। ভগবান বশিষ্ঠ ও ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠগণের পুণ্য আগমনে আমার রাজকূল ধন্য হল। আমার রাজ্য ও প্রজার জীবন পবিত্র হল।’
মহারাজা দশরথ বললেন ,’ এর সকল শ্রেয়ঃ মুনিবর বিশ্বামিত্রের নিঃসন্দেহে। রাজা জনক আমি গর্বিত আমার নয়নমনি রাম যে গৌরব স্থাপন করেছে হরধনু ভঙ্গ করে। কোথায় আমার রাম লক্ষন ? ‘
এক্ষনে রাম ও লক্ষন পিতা দশরথের সঙ্গে মিলিত হলেন। মহারাজা দশরথ রাম এবং লক্ষনকে পরম আদরে এবং পিতৃস্নেহে আলিঙ্গন করলেন। তিনি রামকে বললেন,‘রাম আমি গর্বিত তোমার হরধনুভঙ্গের মহান গৌরবে। আমি মুনিবর বিশ্বমিত্রের সঙ্গে তোমাদের দুই ভাইকে প্রেরন করে সমুচিত গর্বের অধিকারী হয়েছি। যাও ভাইদের সঙ্গে মিলিত হও তোমরা।’
রাম এবং লক্ষন ভাইদের সঙ্গে মিলিত হলেন। এবং তাঁরা স্বীয় মাতাদের সঙ্গে মিলিত হলেন। যেন আজ চাঁদের হাট দীর্ঘ দিন পরে আজ মিথিলার রাজপুরীতে ।
রাজা জনক বললেন,‘ আপনার নয়নমনি রাম হরধনু ভঙ্গ করে যে শৌর্য প্রদান করেছেন তা সূর্যবংশীয়ের উপযুক্ত গৌরব বহন করছে। মহারাজ আমি প্রতিশ্রুত আমার কন্যা সীতার সঙ্গে আপনার পুত্র রাম এর বিবাহ দিতে। ভাগ্যগুনে আমার কন্যাদানের সকল বিঘ্ন দূর হল। মহাবল রঘুবংশীয়গনের সঙ্গে সম্বন্ধের ফলে আমার কুল সম্মানিত হল।’
দশরথ বললেন, ‘আমি ও আপনার সুলক্ষণা কন্যাদ্বয় সীতা ও উর্মিলার সাথে আমার রাম ও লক্ষণের বিবাহে আনন্দিত হব।’
রাজা জনক বললেন,‘ মহারাজ, কাল প্রভাতে আপনি তবে ঋষিগণের সঙ্গে যজ্ঞ সমাপন করে বিবাহ নির্বাহ করবেন।’
এতদসমাদৃত হয়ে দশরথ বললেন,‘ বিদেহ অধিপতি মহারাজা জনক, আপনি ধর্মজ্ঞ। আপনি কন্যাদান করবেন। তাই আপনি দাতা, আমরা গ্রহিতা মাত্র। দাতার অধীন আমরা আপনার আজ্ঞা পালন করব শুধু।’
সভাস্থ সকলে বলে উঠলেন, ‘সাধু সাধু।’
দশরথ উত্তর দিলেন,‘ ধর্মজ্ঞ আমি শুনেছি , যে, দাতার বশেই দান গ্রহণ করতে হয়। অতএব আপনি যা বলবেন আমি তাই করব।’
পরাক্রান্ত রাজা দশরথের এমন শ্রেয় যশস্কর বিনয়বাক্য শুনে রাজা জনক মুগ্ধ হলেন। মুনি ঋষিগন ও পরস্পর মিলিত হয়ে পরমানন্দ লাভ করলেন।
জনক বললেন, ‘ আমরা দুই ভাই। মিথিলার পাশেই ইক্ষুমতি নদী। সেই নদীর কূলে সাংকাশ্য নগরী। আমার ভাই কুশধ্বজ সেই নগরীর রাজা। সে আমার সকল দৈবকার্যের সহায়ক। আমি আপনার অন্য দুইপুত্র ভরত ও শত্রুঘ্নর সাথে রাজা কুশধ্বজ এর দুই কন্যা মান্ডবি ও শ্রুত কীর্তির বিবাহের প্রস্তাব ও রাখছি।’
বিশ্বামিত্র বলেন, ‘রাজা কুশধ্বজ ধার্মিক এবং তেজস্বী। তাঁর দুই কন্যা রূপে ও গুনে অনন্যা। আমি আপনার অন্য দুই পুত্র ভরত ও শত্রুঘ্নর সাথে রাজা কুশধ্বজ এর দুই কন্যা মান্ডবি ও শ্রুতকীর্তির বিবাহের প্রস্তাব ও করেছি ।’
রাজা দশরথ বললেন,‘ মহামুনি আমি আপনার সেই প্রস্তাব ও সর্বান্তকরণে সমর্থন করলাম।’
বিশ্বামিত্র বলেন, ‘আমি বলব ইক্ষ্বাকু ও বিদেহ এই দুই রাজবংশ গুনে ও গরিমায় অতুলনীয় । এদের মধ্যে ধর্মসম্বন্ধ স্থাপিত হলে যে কল্যাণ হবে , মহারাজ , তাহা অকল্পনীয় ।
‘অচিন্ত্যান্য প্রমেয়ানি কুলানি নরপুঙ্গব।’
ইক্ষ্বাকুণাং বিদেহানাং নৈষাং তুল্যোহস্তি কশ্চন ।।
সদৃশো ধর্মসম্বন্ধঃ রূপসম্পদা । [আদিকান্ড ] [বাল্মিকি]
এই সম্বন্ধকে অটুট ও নিশ্চিন্ত করার জন্য আমি রাজা দশরথ এর চার রাজকুমারকে এক সঙ্গে এক পরিবারে বিবাহের প্রস্তাব রাখলাম।’
রাজা জনক বললেন,’আপনার এই প্রস্তাব অতীব আনন্দের এবং গ্রহণযোগ্য। আমরা এই প্রস্তাব সানন্দে সমর্থন করলাম ।
বশিষ্ঠদেব এইবার দশরথকে বলে ওঠেন,‘ সাধু সাধু। মহারাজ, আমি বলি শুনুন, ভিন্ন বংশে বিবাহ হলে বংশের ভিতরে আত্মকলহ ঘটে। এতে সূর্য্যবংশের কুল ভেঙে যেতে পারে। আমি এই ব্যবস্থা কুশলতার সর্বান্তকরণে সমর্থন করি।’
মহারাজা দশরথ বললেন,‘ আপনারা সমাজ এবং সংসার সম্বন্ধে বিচক্ষন। আপনারা আমার পরম শুভাকাঙ্ক্ষী। আপনাদের সিদ্ধান্ত আমি মাথা পেতে নিলাম। আগামীকাল আমার পুত্রদের সঙ্গে মিথিলা রাজপরিবারের কন্যাদের শুভপরিনয় সম্পন্ন হবে। কি আনন্দ।’
রাজসভায় মহা হর্ষধ্বনি উত্থিত হল। রাজ্যে আনন্দের বান ডেকেছে। কাড়া নাকাড়া তূরী ভেরীর শব্দে মিথিলা রাজ্যে উৎসব নেমে এসেছে।
রাজা জনক বললেন,‘ আপনারা আজ বিশ্রাম করুন। কাল বিবাহ উৎসব শুরু হবে।’
উত্তর ফাল্গুনী তিথিতে, শুভ পুনর্বশু নক্ষত্রে, কর্কট রাশি ও কন্যা লগ্নে বিবাহ যজ্ঞ শুরু হল।
কনক সিংহাসনে বসে আছেন রাজা শিরধ্বজ [রাজা জনক] ও তার পার্শ্বে তাঁর ভ্রাতা রাজা কুশধ্বজ।
তার পাশে রত্ন সিংহাসনে আসীন রাজা দশরথ।
রাজা কুশধ্বজ এসেছেন তাঁর দুই কন্যা মান্ডবী এবং শ্রুতকীর্তিকে নিয়ে। মিথিলার পাশে ইক্ষুমতি নদী। সেই নদীর কুলে সাংকাশ্য নগরী। ধার্মিক কুশধ্বজ তার রাজা । সেই সাংকাশ্য রাজ্য থেকে তিনি এসেছেন মিথিলায়।
রাজা কুশধ্বজের দুই কন্যার সাথে অযোধ্যা নরেশ রাজা দশরথ পুত্র ভরত ও শত্রুঘ্ন ‘র পরিনয় সম্বন্ধ ঋষি বিশ্বামিত্র স্থির করেছিলেন।
অনন্তর দুই ভ্রাতা রাজা জনক এবং রাজা কুশধ্বজ মন্ত্রী সুদামনকে এইবার আজ্ঞা দিলেন বিবাহ কার্য শুরু করতে। রাজা দশরথ বিদেহরাজ জনকের আমন্ত্রনে তাঁর পুত্রদের এবং মন্ত্রীদের নিয়ে রাজসভায় বিবাহ মন্ডপে এসে বসেছেন বিবাহাদি প্রত্যক্ষ করতে।
ঋষি বিশ্বামিত্র ও মুনি শতানন্দ যজ্ঞবেদী প্রস্তুত করলেন। সোনার পালিকায় অলংকৃত বেদীর চারিদিকে গন্ধপুস্পের ডালি। পল্লবাঢ্য পূর্ণ কুম্ভ। যজ্ঞের অর্ঘ্য যত স্রুক ও স্রুব। কলসে ঘৃত। শরাবে সোম । শঙ্খ ও ধূপ পাত্র। পূর্ণ লাজপাত্র। শুদ্ধি কৃত অক্ষত তন্ডুল। যজ্ঞের কুশ ও সমিধ ।
বশিষ্ঠদেব মন্ত্র উচ্চারন করে যজ্ঞের অগ্নি সমিদ্ধ করলেন ।
বিবাহের রীতি অনুসারে রাজপুরোহিতগন পাত্রপাত্রীর কুল পরিচয় দান করলেন।
বশিষ্ঠদেব হলেন রাজা দশরথের মুখপাত্র। তিনি দিলেন সূর্যবংশের পরিচয় ।
দশরথ বললেন,‘ ভগবন বশিষ্ঠ ইক্ষ্বাকুগনের কুল দৈবত। অর্থাৎ ইনি আমাদের কুল পুরোহিত। যিনি গৌরবে ‘ দৈবত, অর্থাৎ দেবতা। আমার সকল কার্যে উনিই বক্তা। ইনি বিশ্বামিত্র এবং অন্যান্য ঋষিগনের অনুমতি নিয়ে আমার কুল পরিচয় দেবেন।
বশিষ্ঠদেব বলতে লাগলেন, ‘ অব্যক্ত হতে ব্রহ্মা। ব্রহ্মা হতে যথাক্রমে মরিচি, কশ্যপ, বিবস্বান, মনু । মনুর পুত্র ইক্ষ্বাকু। এবং তাঁর আরও চারপুরুষ পরে পৃথু, ত্রিশুঙ্কু, ধুন্ধুমার, যুবনাশ্ব ও মান্ধাতা। তাঁরও চারপুরুষ পরে সগর , অসমঞ্জ , অংশুমান, দিলীপ এবং যিনি ভগীরথ এবং তাঁর ছয় পুরুষ পরে অম্বরিশ, নহুশ, যযাতি এবং নাভাগ এবং অজ। অজের পুত্র রাজা দশরথ। তাঁর চার পুত্র , রাম লক্ষণ ভরত শত্রুঘ্ন ।’
বশিষ্ঠদেব অতঃপর বললেন, মহারাজ দশরথের সুলক্ষন সুরবীর, সুকীর্তিমান দুই পুত্র রাম এবং লক্ষনের জন্য আপনার দুই কন্যাকে প্রার্থনা করছি। আপনি এই যোগ্য পাত্রদ্বয়কে কন্যা দান করুন।’
রাজা জনক এর পক্ষে পুরোহিত শতানন্দ এক্ষনে রাজা জনকের কুল পরিচয় জ্ঞাপন করলেন।
শতানন্দ বললেন,‘ ধর্মাত্মা রাজা নিমির পুত্র মিথি। তাঁর পুত্র হলেন জনক। জনক মিথিলা রাজগনের কৌলিক উপাধি। – প্রথম জনক এবং তার তিন পুরুষ পরে দেবরাত। তার চোদ্দ পুরুষ পরে হ্রস্ব রোমা । হ্রস্বরোমার দুই পুত্র। জ্যেষ্ঠ যিনি সীরধ্বজ অর্থাৎ বর্তমান রাজা জনক। এবং কনিষ্ঠ যিনি তিনি হলেন কুশধ্বজ।
রাজা জনক বললেন, ‘ মহারাজ, আমার দুই কন্যা। সীতা, যাকে আমি কর্ষণ ক্ষেত্র হতে পেয়েছি । সে গুন সম্পন্না , লক্ষী স্বরুপা এবং আমার অন্য কন্যা ঊর্মিলা। আমি পরম প্রীতি সহ রামকে আমার জ্যেষ্ঠা কন্যা , যিনি সুরকন্যার ন্যায় রূপবতী বীর্যশুল্কা সীতা এবং লক্ষনকে আমার কনিষ্ঠা কন্যা ঊর্মিলাকে দান করব। এখন রাম লক্ষন পূর্বকৃত্য গোদান এবং পিতৃকার্য সম্পাদন করুন। আজ হতে তৃতীয় দিবসে উত্তর ফাল্গুনী নক্ষত্রে তাদের বিবাহ হবে ।
বিশ্বামিত্র এবং অন্য সকল মুনিগন সহর্ষে এই প্রস্তাব অনুমোদন করলেন, ‘ সাধু সাধু। উত্তম প্রস্তাব।’
বিশ্বামিত্র বললেন, ‘ইক্ষ্বাকু ও বিদেহ এই দুই এর তুল্য কুল নেই। রাম লক্ষনের সঙ্গে সীতা এবং ঊর্মিলার সম্বন্ধ ও অতি যোগ্য। এখন আমার একটি বক্তব্য শুনুন। -আপনার ভ্রাতা কুশ ধ্বজের দুই অনুপমা সুন্দরী কন্যা আছেন। তাদের আমি রাজ কুমার ভরত এবং শ্ত্রুঘ্নর জন্য পরিনয় সুত্র সম্বন্ধের প্রস্তাব রাখছি ।
সভাস্ত সকলে হর্ষ ধ্বনি দিয়ে ওঠেন, সাধু সাধু ।
রাজা জনক ও সানন্দে সন্মতি দিলেন। একই দিনে চার ভ্রাতার বিবাহ হবে এই স্থির হল।
রাজা কুশধ্বজ বললেন,‘মহামুনি বিশ্বামিত্র আমি সন্মানিত। আমি পরম পরিতোষ লাভ করলাম যে আমার দুই কন্যাকে রাজা দশরথের দুই পুত্রের সহিত বিবাহ সম্বন্ধে স্থাপিত করার জন্য। আপনি ধন্য।’
দশরথ এইবার নিজের আবাসে গিয়ে যথাবিধি শ্রাদ্ধ করলেন এবং পরদিন চারপুত্রের হাত দিয়ে এক এক লক্ষ হিসাবে চার লক্ষ স্বর্ণমন্ডিত শৃঙ্গ যুক্ত সবৎসা ধেনু ও কাংস্য দোহন পাত্র দান করলেন ।
বিবাহের দিন আগত হলে দশরথ ঋষিগনকে অগ্রবর্তী করে যজ্ঞস্থানে চললেন।
রাম ও তার তিন ভ্রাতা ও কৌতুক মঙ্গল (অর্থাৎ বিবাহের পূর্বে কৃত্য মঙ্গলাচার বিশেষ) শেষ করে সর্ব আভরনে ভূষিত হয়ে বশিষ্ঠাদির অনুসরন করলেন।
বিবাহ মন্ডপে বেদীমূলে রাম লক্ষন ভরত এবং শ্ত্রুঘ্ন এসে দাঁড়ালেন।
বশিষ্ঠদেব যজ্ঞে পূর্ণাহুতি দিলেন।
রাজা জনক তখন সর্বআভরনভূষিতা সীতাকে যজ্ঞাগ্নির সন্মুখে নিয়ে এলেন। চতুর্দিকে শংখ ধ্বনি উলুধ্বনির মধ্যে রাজা জনক ও তদ ভ্রাতা কুশধজ তাঁদের চার কন্যাকে সঙ্গে এনে বেদিমুলে যজ্ঞকুন্ডের কাছে সমবেত হলেন।
বশিষ্ঠদেব বললেন,’ মহারাজা জনক, সপুত্র দশরথ সম্প্রদাতার আদেশের অপেক্ষা করছেন। দাতা এবং গ্রহীতা একত্র হলেই সকল কার্য সম্পন্ন হবে।’
নৃপতি জনক বললেন,‘আমার কন্যারা মঙ্গলাচরনের পর এখন বেদিমূলে সমবেত হয়েছেন। আমি ও আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছি । এখন বিলম্বের প্রয়োজন কি ! ‘
দশরথ আদি সকলে যজ্ঞসভায় প্রবেশ করলেন।
বশিষ্ঠ শতানন্দ বিশ্বামিত্র যথাবিধি বেদী রচনা করে গন্ধপুস্প যবাংকুরযুক্ত চিত্রকুম্ভ, ধুপাধার, শঙ্খধার, লাজ পত্র প্রভৃতির দ্বারা অলংকৃত করলেন।
অতঃপর বশিষ্টদেব বেদির উপর দর্ভ (অর্থাৎ দূর্বা কুশ প্রভৃতি ছয় রকমের তৃন) ইত্যাদি বিছিয়ে যথাবিধি অগ্নি সংস্থাপন করে হোম আরম্ভ করলেন।
তখন সর্বাভরণভূষিতা সীতাকে এনে অগ্নিসমক্ষে রামের অভিমুখে রেখে রাজা জনক এক্ষনে কৌশল্যার আনন্দবর্ধনকারী রামকে বললেন, ‘রাম, এই আমার কন্যা সীতা। আজ হতে ইনি তোমার সহধর্মচারিণী হলেন। তুমি এঁকে নাও। তোমার পানির দ্বারা এর পানি গ্রহন কর। তোমার মঙ্গল হোক। এই মহাভাগা ( অর্থাৎযিনি মহিমাময়ী বা অশেষ গুণশালিনী) পতিব্রতা সর্বদা ছায়ার ন্যায় তোমার অনুগামিনি হবেন।’
জনক তাঁর কন্যা সম্প্রদানান্তে মন্ত্রপূত জল বর ও বধুর ওপরে হস্ত হতে নিক্ষেপ করলেন।
স্বর্গে দেবগণ আনন্দিত হলেন। অন্তরীক্ষে দেব দুন্দুভি বেজে উঠল।
আকাশ হতে পুষ্প বৃষ্টি হতে লাগল।
ঋষিগণ স্তোত্র মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগলেন।
বিবাহ বাসরে সে কি এক বিশাল হর্ষধ্বনি উত্থিত হল। এ যে এক স্বর্গীয় বিবাহ বাসর।
অতঃপর রাজা জনক তাঁর অন্য কন্যা ঊর্মিলা কে লক্ষনের হস্তে সম্প্রদান করলেন।
তৎপরে রাজা কুশধ্বজ তাঁর দুই কন্যা মান্ডবি ও শ্রুতকীর্তিকে যথাক্রমে ভরত এবং শত্রুঘ্নর হাতে সম্প্রদান করলেন।
দেবতা ও ঋষিগন এক্ষণে সকলে ‘সাধু সাধু’ বললেন।
বিবাহ মঞ্চে পুস্পবৃস্টি হতে লাগল। সেই সঙ্গে দুন্দুভিধ্বনি গীতবাদ্যসহ দ্যুলোকে গন্ধর্বদের স্বর্গীয় সঙ্গীত এবং অপ্সরাদের নৃত্য হতে লাগল। রাজ্যের চতুর্দিকে আনন্দ উৎসব মগ্ন হল পুরবাসীগন।
বিবাহমন্ডপে বিবাহাদি কার্য্য সমাপ্ত হলে, এইবার তুর্য নিনাদের মধ্যে দশরথের চারপুত্র রাম লক্ষন ভরত এবং শত্রুঘ্ন তদীয় বধুদের সঙ্গে তিনবার করে অগ্নি প্রদক্ষিন করে নিজ আবাসে ফিরে গেলেন।
দশরথ ও বশিষ্ঠ আদি সকলের সঙ্গে তাদের অনুগামি হলেন ।
সেই রাত্রি বর বধুগন লয়ে সকলের রাত্রি জাগরণ।
আজ যে বর বধূকে জাগতে হয়। আগামীকাল তারা ইচ্ছামত শয়ন করবে।
আগামীকাল নববিবাহিতদের কালরাত্রি।
বরবধূ কেহই কারো মুখ দেখবেন না ।

( চলবে )


