ভজ মন রাম চরণ

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য : ভজ মন রাম চরণ - শ্যামলকৃষ্ণ বসু

ভজ মন রাম চরণ

ভজ মন রাম চরণ

ভজ মন রাম চরণ

শ্যামলকৃষ্ণ বসু

| ৪ |

ঋষি বিশ্বামিত্রের সেই গমন পথের চিহ্ন ধরে এখন রামায়ন কথার গতি সঞ্চার হতে চলেছে। ধনুশপানি সালংকৃত দুই রাজকুমার চলেছেন বিশ্বামিত্রের পিছনে। যেন অচিন্ত্যশক্তি রুদ্রকে অনুসরন করে চলেছেন অগ্নিপুত্র স্কন্দ ও বিশাখ।

রাম এর পিছনে পিছনে চলেছেন লক্ষন, যেন নীরব প্রহরী।  কাঁধেতে ধনুর্বাণ তীর ভরা তুনে, কোমরে খর্গ ঝোলে বধিতে অরি। অর্ধযোজনাধিক পথ অতিক্রম করি,  সরযূর দক্ষিণ তটে দাঁড়ালেন ত্রয়ী !

এতটা পথ এতক্ষন কেউ কোন কথা বলেননি। অনেক দূরেই চলে এসেছেন তাঁরা তিনজনে অযোধ্যা হ’তে। প্রায় অর্ধযোজনাধিক পথ তারা হেঁটে এসেছেন।   

বেলা এখন দ্বিপ্রহর। পিছনে দেখা যায় শ্যামগম্ভীর অস্পস্ট রেখায় চিত্রিত ওই যে অযোধ্যা। দুই পাশে সবুজ প্রান্তর। সামনে বহমানা  ওই যে সরযূ নদী।

এইবার সরযূ নদীর দক্ষিন তটে এসে দাঁড়ালেন বিশ্বামিত্র। বেলা পড়ে আসছে। আজ আর এগোন সমীচীন হবে না। সামনে তাড়কা বন। ওখানে থাকে এক রাক্ষসী , নাম তাড়কা । ভয়ংকর সেই রাক্ষসী , ভয়ানক রকমের হিংস্র । কাল এই তাড়কা বন দিনের আলোয় পেরিয়ে যেতে হবে। নচেৎ রাক্ষসীর আক্রমনের সম্ভাবনা প্রবল। 

মুনিবর মনে মনে ভাবলেন, ওই গহন বনপ্রদেশে প্রবেশের আগে এই দুই বালক রাজকুমারকে তিনি এমন এক মন্ত্রদীক্ষা  দেবেন যাহাতে দুই রাজকুমার এর হঠাৎ এমত পথ চলার কায়িক শ্রম লাঘব হয় কিংবা আকস্মিক জ্বরজ্বালা হ’তে কিংবা অন্য কোন কারনে তাহারা আক্রান্ত হয়ে না পড়ে। 

মুনিবর বিশ্বামিত্র বললেন, ‘রাম , লক্ষন, তিষ্ঠ ! আমরা অযোধ্যা হতে অনেক দূরেই চলে এসেছি। আজ এখানেই আমাদের পথ চলার সমাপ্তি হোক। আজ আমরা এখানেই বিশ্রাম করব। ‘

রাম বললেন , ‘ যথা আজ্ঞা  মুনিবর !’ 

বিশ্বামিত্র বললেন , ‘কাল আমরা ওই গহীন বনে প্রবেশ করব। প্রতিপদে তোমরা সাবধানে পথ চলবে। হিংস্র জন্তু এড়িয়ে আমাদের পথ চলা। শোনো বৎস, এক সময় আমরা রাক্ষসের মুখোমুখি ও হ’ব। সামনে তাড়কা বন। ভয় পেয়ো না। এখানে আছে বড় ভয়ংকর এক রাক্ষসী। 

রাম জিজ্ঞাসা করে , ‘ রাক্ষসী ?’

মুনিবর বলেন, ‘ হ্যাঁ, সে এক ভয়ংকর রাক্ষসী।  নাম তাঁর  তাড়কা। এঁর কাহিনী আমি তোমাদের পরে বলব। বৎস, অবধান ক’র , পিতার ছত্রছায়া ছেড়ে এখন তোমরা নিজের পায়ে জীবনের পথে সদ্য পথ চলা শুরু করলে। এই পথ বড় কঠিন। এক কালে তোমরা তোমাদের পিতার সঙ্গী হয়ে শিকারে অনুগমন করেছিলে। সে ছিল একরকম ! সে ছিল পিতার সাহচর্যে পিতার পাশে পাশে থেকে জীবনকে চেনা ও জানার সামান্য অনুভব। তখন তোমরা তোমাদের পিতৃদেবকে এবং তাঁর অনুচরদেরকে   শিকার করতে দেখেছিলে প্রমোদ ছলে, ব্যাঘ্র বরাহ মৃগ। ‘

রাম লক্ষন,  ‘  যথার্থ গুরুদেব।‘

মুনি বিশ্বামিত্র বলেন, ‘কিন্তু এখন তোমরা নিজেরাই শিকার করবে , না অহেতুক নয় , মাত্র তোমাদের জীবন ধারনের কারনে। নিজেদের খাদ্য তোমরা নিজেরাই সংগ্রহ করবে। পথের যত বাধা বিপত্তি সব তোমরা নিজেরাই দূর করবে। কোথা ও কোন আর্তকে রক্ষা করবে। কখনো কোন দুর্জনকে শাসন করবে। রাম, অবধান ক’র, আমি চিন্তা করেছি, আজ আমি তোমাদের দুটি মন্ত্র দেবো, যাহাতে তোমরা তোমাদের পথ চলার কায়িক শ্রম বা আকস্মিক জ্বরজ্বালা কিংবা অন্য কোন কারনে  কোনভাবেই পথিমধ্যে আক্রান্ত হয়ে না প’ড়।‘

রাম জিজ্ঞাসা করে, ‘ কি সেই মন্ত্র গুরুদেব ?’

মুনীবর বলেন, ‘ সেই মন্ত্রদ্বয়ের নাম বলা এবং অতিবলা। এই মন্ত্রে যাবে দূরে শ্রম জ্বর জ্বালা !  ক্ষুৎপিপাসা নিবৃত্তে ও এই মন্ত্র অতীব জরুরী ।  রাম , আমার জীবনের সকল তপস্যা সকল সিদ্ধি আজ আমি তোমাকে দান করব।  ‘বলা ‘ ও ‘অতিবলা ‘ মন্ত্র দুইটি তুমি গ্রহণ ক’র।                                 

                ’ মন্ত্র দিব আমি এবে, ‘ বলা অতিবলা‘ । 

                 ক্ষুৎ পিপাসা নিবৃত্তে অতীব জরুরী ! 

                 এই মন্ত্রে যাবে দূরে শ্রম জ্বরজ্বালা !

                   রূপহানি না হইবে, ধর্ষে যদি অরি ।। [স্বরচিত ]

রাম বলে, ‘ যথা আজ্ঞা গুরুদেব।’

মুনি বিশ্বামিত্র এইবার রাম এবং লক্ষনকে বললেন, ‘বেশ ! তবে রাম এবং লক্ষন, তোমরা দুই ভ্রাতা এক্ষনে এক সাথে গমন করো এবং ওই নদীর জলে অবগাহন করে আচমনাদি সেরে এসো। ‘

দুই রাজপুত্র রাম এবং লক্ষন এক্ষনে গুরু বিশ্বামিত্রের আদেশে এইবার স্নান আচমন সেরে এসে ভক্তি সহকারে মুনির আদেশ অনুসারে মন্ত্র নিতে বসলেন।

রাম লক্ষন দুই রাজপুত্র মুনি বিশ্বামিত্রের কাছে মন্ত্র নিলেন ।

বিশ্বামিত্র রামকে মন্ত্রদীক্ষা দিয়ে বললেন, ‘রাম, এই মন্ত্রগুণে এখন হ’তে শৌর্যেবীর্যে এবং জ্ঞানে ও দাক্ষিন্যে কিংবা কর্মদক্ষতায় এবং কর্তব্য নির্ধারণে অথবা বিচারে ও বাগ্মিতায় তোমার তুল্য কেউ হবে না। এই মন্ত্র নিখিল জ্ঞানের আকর ও মঙ্গলের প্রসূতি। রাম আমার বিচারে তুমিই হলে এই মন্ত্রের উপযুক্ত আধার। আমি তাই এই মন্ত্র তোমাকেই দিলাম। ‘

          সৌভাগ্যে দক্ষতায় জ্ঞানে কি চিন্তনে , 

          তথ্য নির্ণয় কালেও মনঃসংযোগ রবে !

          যদি অরি বাক্য বারি করে তব সনে ,

          উত্তর প্রত্যুত্তরে তারা যুঝিতে না পারিবে।। 

           কহিলেন শ্রীরামে তিনি ভবিষ্যৎ কর্মানি 

            অরণ্যে থাকিত হবে দিলেন উপদেশ 

           তৎপরে দিনক্ষণ আর শুভাশুভ গনি

         কহিলেন , অরণ্যেতে করিবেন প্রবেশ।। 

         দুই ভ্রাতারে মন্ত্র দিলেন বিশ্বামিত্র মুনি

          সোনার প্রদীপে হ’ল অগ্নি সঞ্চারিত ,

         জীবনে নুতন গতি আনিলেন তিনি । 

    এবে রাম হইলেন অধ্যাত্মসত্ত্বায় উপনীত।। [স্বরচিত ]  

রাম বিশ্বামিত্রকে প্রনাম করলেন। সোনার প্রদীপে যেন অগ্নি সঞ্চারিত হ’ল। নব্যযুবক রামচন্দ্র নিজের অজ্ঞাতে আপন অধ্যাত্মসত্ত্বায় উপনীত হয়ে উঠলেন ! 

বিশ্বামিত্র এইবার বললেন, ‘বৎস, আজ পথশ্রমে তোমরা ক্লান্ত। এসো তবে আমরা আজ এইখানেই সবাই  বিশ্রাম করি। আজ আমাদের পথ চলার বিরাম। আমি জানি এখানে এই কঠিন ভূমিতে তোমাদের রাজকীয় বিশ্রামের বিষম বিঘ্ন হবে। রাম, এখানে রাজপ্রাসাদ নেই।  নেই কোন রাজসুখ ।  এখানে রাজভোগ নেই।  নেই কোন ফেননিভ রাজশয্যা।  এখানে এই গহীন কাননে শুধুমাত্র ফলমূল আহরন করে ভক্ষন করা, নচেৎ নিজ হাতে শিকার পূর্বক উদরপূর্তি করা। রাম এ হল জীবনের এক ভীষণ পরীক্ষা। নিজেকে কঠিন করে গড়ে তোলার সাধনা। কঠিন জীবন। কঠিন পরিস্থিতি। কঠিন শ্রম। জীবনে কোন ভাবেই ভেঙ্গে না পড়ার এ হ’ল এক কঠিন সাধনা। কষ্ট সহিষ্ণুতার এ এক কঠিন পরীক্ষা।

রাম বললেন, ‘ গুরুদেব, আমাদের কোন কষ্ট হবে না। পিতা আমাদের আদেশ করেছেন আপনার বাক্য প্রতিপদে মেনে চলতে। আপনি যে ভাবে বলবেন আমরা তেমন ভাবেই চলব। ‘

বিশ্বামিত্র বললেন, ‘সাধু ,সাধু ।  রাম, কাল আমরা ওই  রাক্ষস অধ্যুষিত গভীর অরন্যে প্রবেশ করব। ঐ গভীর অরন্য মধ্যেই এখন হতে তোমাদের করতে হবে দিনযাপন।’

রাম বললেন , ‘ যথা আজ্ঞা গুরুদেব !’ 

বিশ্বামিত্র বললেন, ‘ যাক, এখন  তবে আমাদের উদরপূর্তির কোন ব্যবস্থা  প্রয়োজন। লক্ষন কিংকর্তব্য ? ’

লক্ষন বলে,‘  মুনিবর, আমি অচিরেই তবে কিছু শিকার করে আনছি এখন !’  

মুনিবর বললেন , ‘ যথার্থ বৎস ! তাই যাও ।’

লক্ষন তবে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ না ক’রে পায়ে পায়ে  শিকার করতে এগিয়ে যায় গভীর বনের দিকে। 

রাম জিজ্ঞাসা করে, ‘মুনিবর, আপনি আমাকে বলুন , এই যে অসুর কিংবা রাক্ষস, এরা কারা? আমরা যাদের রাক্ষস বলি আর যারা অসুর , তারা সব কি একই শ্রেণির ? ‘

বিশ্বামিত্র বলেন, ‘ উত্তম প্রশ্ন করেছ রাম। শোনো, আমি বলি।  রাক্ষস বা অসুর এঁরা কেউই একই শ্রেনীর না। এরা দুই ভিন্ন  প্রজাতির। অসুরগন কাশ্যপ ঋষির সন্তান। যারা অসুর, তাঁরা থাকে পাতালে। এবং তাঁরা সবসময় দেবতাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয় স্বর্গের অধিকার পেতে। ‘ 

রাম জিজ্ঞাসা করে, ‘ গুরুদেব , তবে রাক্ষস যারা ?’

বিশ্বামিত্র বলেন, ‘ আর রাক্ষস যাহারা, তাঁরা পুলস্ত্য ঋষি হতে উদ্ভুত। তাঁরা থাকে সব গহীন বনে এবং জঙ্গলে। তাঁরা মানুষের সাথে দ্বন্দে লিপ্ত হয়। কশ্যপ এবং পুলস্ত্য এঁরা হলেন ব্রহ্মার মানসপুত্র।’ 

রাম জিজ্ঞাসেন, ‘ অর্থাৎ , দেবতারা থাকেন স্বর্গে ! আমরা মনুষ্যগন থাকি এই মর্ত্যে ! আর অসুরগন তবে পাতালে ?’ 

বিশ্বামিত্র বলেন, ‘ যথার্থ। আসলে দেবতা অসুর ও মানুষ তিনজনেই প্রজাপতির সন্তান।‘

রাম অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেন , ‘ সে তবে কেমন ভাবে সম্ভব ?’

বিশ্বামিত্র বলেন, ‘ রাম,  আমি বলি শোনো ! ভগবানের বামা শক্তির এক বিকৃত ও ক্রুর রূপ হ’ল অসুর। এককালে প্রজাপতির পৃষ্ঠদেশ হতে অধর্ম, নিঋতি এবং মৃত্যুর ভয়ংকর লোক সব সৃষ্টি হয়েছিল। তাই সৃষ্ট হয়েছিল যত অসুর। তাঁরা নিষ্ঠুর, তাঁরা কামার্ত, তাঁরা ভোগী। ব্রহ্মার প্রথম সৃষ্টির যতেক অন্ধকারতম দিক, যেমন, মোহ ক্ষুধা তৃষ্ণা ভোগ ক্রোধ সংঘর্ষ  ইত্যাদি নিয়ে সৃষ্ট এই অসুর প্রজাতি।‘

রাম জিজ্ঞাসা করেন, ‘ তবে, রাক্ষস কারা !’ 

বিশ্বামিত্র বললেন,‘শোনো বৎস ! প্রজাপতি ব্রহ্মা প্রথমে জল সৃষ্টি করলেন। ওই জলের মধ্যে সৃষ্ট যত প্রাণী ক্ষুধায় কাতর হয়ে চীৎকার করে জিজ্ঞাসা করল -’ আমরা এখন কি করব ?’

ব্রহ্মা বললেন, ‘তোমরা এই জল রক্ষা ক’র।’

তখন তাদের মধ্যে কেউ বলল, ‘ আমরা এই জল রক্ষা করব। আবার কেউ বলল আমরা এই জলকে যক্ষণ করব । অর্থাৎ পুজা করব।’ 

যারা ‘রক্ষা’ করব বলল তারা হল রাক্ষস। আর যারা বলল ‘যক্ষন’ [ পুজা ] করব। –  তারা হল ‘যক্ষ‘। 

             রক্ষাম ইতি  যইরুক্তং রাক্ষসান্তে  ভবন্তু বঃ ।

             যক্ষাম ইতি যইরুক্তং  যক্ষ এব  ভবন্তু বঃ ।। [বাল্মীকি ] 

রাম অবাক হয়ে বলে,’  অদ্ভুত সৃষ্টি তবে মুনিবর ?’

বিশ্বামিত্র বলেন , ‘ হ্যাঁ , রাম , সৃষ্টি মাত্রেই অদ্ভুত !’

রাম জিজ্ঞাসা করেন, ” কিন্তু , সৃষ্টির মধ্যে অমঙ্গল কেন? অবিদ্যা কেন? পাপ এল কোথা হতে? শয়তানের জন্ম দিল কে ?

ভগবানই যদি আছেন, তবে অ-ভগবানের আবির্ভাব কেন, অপ্রতিহত প্রভাব কেন? যে সত্তা সর্বজ্ঞানময় সর্বশক্তিময় সর্বআনন্দময়-জাগ্রতের জগতে তা নিশ্চিহ্ন হয়ে লোপ পেল কি রকমে?

বিশ্বামিত্র বললেন , ‘ রাম , অ-ভগবানও ভগবান-, বলতে পারো ভগবানের ছায়া, ইতর রূপ, বিপরীত দিক্-বামা মূর্তি। সৃষ্টিতে ও ভগবান চরম বৈপরীত্যের প্রয়োজন বোধ করলেন , কারণ , এক প্রান্তের “না”-কে অন্য প্রান্তের “হাঁ” তে পরিণত করবার জন্য। এই সত্য প্রমাণ করবার জন্য যে, ভগবান এমনি এক অদ্বিতীয় বাস্তব বস্তু যে তাকে অস্বীকার করে চলেও শেষে তারই মধ্যে গিয়ে পড়তে হয়। চরম নেতি যেখানে ঠিক সেখানে পরম ইতি।’

রাম এক্ষনে মুনি বিশ্বামিত্রের কথা শুনে ভাবন্বিত হয়ে পড়ে ।

লক্ষন এইবার একটি সম্বর হরিন শিকার করে আনলেন। তারপর সেই তপ্ত মধ্যাহ্নে বৃক্ষরাজীর ছায়ায় বসে তখন আগুন জ্বলিয়ে সেই মাংসে তারা উদরপূর্তি করলেন। এ এক কঠিন জীবন। পিতা মাতা আপনজন, ত্যজি সুখী গৃহ কোন, বনে বনে বিচরন ! এ এক অদ্ভুত অসামান্য জীবন। জীবনের জটিলতা কি তাঁরা এখন ও জানে না। সদ্য তাদের অভিজ্ঞতার শুরু । মানুষের কুৎসিত করাল দৃষ্টি তাঁরা এখনো দেখেননি। 

বালকদের অরণ্য জীবনে দীক্ষা দিলেন মহামুনি বিশ্বামিত্র। পথশ্রমে ক্লান্ত তাঁরা। সে দিনের মত তাদের পথ চলার বিরাম হল।  দিনান্তে নদীর ধারে গাছের ছায়ায় সবুজ ঘাসের উপরে বসে তারা বিশ্বামিত্রের কাছে কত গল্প শুনলেন। তাঁরা শুনলেন ঋষি বিশ্বামিত্রের তপস্বী জীবনের কথা, তাঁর কঠিন সাধনার কথা,  তাঁর রাজা হতে ঋষি হয়ে ওঠার কথা।   

অপরাহ্ন মেঘে ভেসে চলেছে শ্বেতপক্ষ বলাকা। চারিদিকে সবুজ প্রান্তরের হাওয়া। দূরে ওই অস্পস্ট লোকালয়। সরযূর জলে সন্ধ্যা মেঘের ছায়া। শোনা যাচ্ছে সরযূ নদীর জল কলোচ্ছ্বাস। বকের পাখায় নেমে এলো সন্ধ্যা ।

সকলে এবার সান্ধ্য তপ সেরে নিলেন। ক্লান্ত ললাটে এসে লাগছে সরযূর শীতল হাওয়া  মায়ের স্নেহ স্পর্শের মতো শান্ত স্নিগ্ধ মধুর। ধীরে ধীরে অঙ্গ জুড়িয়ে আসে। নয়নে নেমে আসে ঘুম।  

সোনার পালঙ্ক নেই , বিলাসি রাজশয্যা নেই। নেই পরিচারিকাদের হস্তের স্নিগ্ধ চামর ব্যজন। সেই খোলা আকাশের নীচে , নদীর ধারে, গাছের ছায়ায় সবুজ ঘাসের উপর কখন তাঁরা শুয়ে পড়লেন গুরু বিশ্বামিত্রের মতোই পাশাপাশি এক ধারে , অযোধ্যার দুই কিশোর রাজকুমার রাম ও লক্ষন, কে জানে?

বিশ্বামিত্র রামকে মন্ত্র দীক্ষা দিয়েছেন। এখন হয়তো দিচ্ছেন কষ্ট সহিষ্ণুতার দীক্ষা। এই তো তপস্যা।                                  

সেই রাত্রি দুই কিশোর রাম ও লক্ষন তাদের পথ প্রদর্শক এবং মন্ত্রগুরু বিশ্বামিত্রের সঙ্গে সরযূ নদীর তীরে সুখে অতিবাহিত  করলেন। তাঁরা সেই উন্মুক্ত প্রান্তরে অনভ্যস্ত তৃণ শয্যায় শুয়ে রাত কাটালেন। এমন কৃচ্ছ সাধন তাদের রাজকীয় জীবনে এই প্রথম। কিন্তু বিশ্বামিত্রের মিষ্ট আলাপে তারা কোন ক্লেশ অনুভব করলেন না। রাত্রি প্রভাত হলে তারা স্নান আদি এবং আহ্নিক ইত্যাদি দৈবকর্ম সেরে তৎপরে সাবিত্রি মন্ত্র জপ করে আবার তিনজনে পথ চলা শুরু করলেন।

রাম এবং লক্ষণকে নিয়ে মুনি বিশ্বামিত্র এবার আবার পদব্রজে রওনা হলেন।  চলতে চলতে তারা দূরে এক বিশাল পুরি দেখে এবার থমকে দাঁড়ালেন ।

রাম জিজ্ঞাসা করলেন,‘ ওই বিশাল পুরী কার ? ‘

বিশ্বামিত্র বলেন, ‘ ওই পুরী হল কামদেব মদনের পুরী। ওই হল কন্দর্প আশ্রম। এ হল অঙ্গ জনপদ। গঙ্গা ও সরযূর সঙ্গম স্থল। আজ আমরা এই আশ্রমে থাকব।’

রাম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ কন্দর্প কে ? 

বিশ্বামিত্র বললেন,‘ কন্দর্প হলেন কামের দেবতা। তিনি ছিলেন অনিন্দ্য সুন্দর কন্দর্পকান্তি। তাঁর নাম মদন। একদা স্বয়ং মহাদেব যখন এই স্থান দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন কন্দর্প তার চিত্ত বিকার উৎপাদন করেন। রুদ্রের ক্রোধ দৃস্টিতে কন্দর্পের সর্বাঙ্গ ভস্মীভূত হয়ে যায়। তদবধি তার নাম হয় অনঙ্গ এবং এই স্থানের নাম  হয় অঙ্গদেশ। তাঁরই  শিষ্যগন পুরুষানুক্রমে এখন এই স্থানে বাস করেন। চলো বৎস, আজ আমরা এই আশ্রমেই সুখে রাত্রি যাপন করব ! 

এক্ষনে আশ্রমবাসি মুনিগন বিশ্বামিত্রের আগমনে অত্যন্ত প্রীত হয়ে তাদের যথোচিত সৎকার এবং রাত্রি  যাপনের ব্যবস্থা করলেন। বিশ্বামিত্র এবং অন্য তাপসগন তাহদের মনোহর কথায় ও কাহিনীতে রাম ও লক্ষনের চিত্ত বিনোদন করতে লাগলেন। 

রামকে পেয়ে সবাই আনন্দিত। সকলে রামের সাহচর্যে মোহিত। 

পরদিন তাঁরা আবার যাত্রা শুরু করলেন।

গঙ্গা তীরে এসে নৌকা যোগে তারা পার হচ্ছেন। নৌকার মধ্যে বসে রাম এইবার কৌতুহল বশে বিশ্বামিত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন,‘ মহর্ষি ও কিসের শব্দ ? আমরা যে জলরাশি ভেদ করে যাচ্ছি তাঁরই কি এই তুমুল শব্দ ? ‘

বিশ্বামিত্র বললেন, ‘ হ্যাঁ বৎস ! এ হল গঙ্গা ও সরযূর সঙ্গম স্থল।  গঙ্গা ও সরযূর সঙ্গমে এ হল সংক্ষুব্ধ বারি রাশির তুমুল জল কলোচ্ছ্বাস। শোনো রাম, সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা কৈলাশ পর্বতে তাঁর মন দ্বারা এক সরোবর রচনা করেছিলেন। সেই সরোবরের নাম তাই মানস সরোবর। অযোধ্যার দিকে যে পুন্যতোয়া নদী গেছে তা ব্রহ্মার সরোবর থেকে নিঃসৃত। সেই জন্য তার নাম সরযূ। সেই সরযূ নদী এখানে জাহ্নবীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তারই বারি সংক্ষোভের ফলে এই অতুলনীয় শব্দ উত্থিত হচ্ছে। রাম তুমি এই ত্রৈলোক্যপাবনী সুরনদী মা গঙ্গাকে প্রনাম করো।’

রাম লক্ষন এক্ষনে বিশ্বামিত্রের উপদেশে বারি সংক্ষুব্ধ ওই নদী জলধারার উদ্দেশ্যে ভক্তিভরে প্রনাম করলেন। তারপরে তাঁরা  নদীর দক্ষিন তীরে নেমে বিশ্বামিত্রের সঙ্গে চলতে থাকলেন।

বিশ্বামিত্র রামকে বললেন, ‘ রাম , এইবার সামনে ঐ দেখো এক শ্বাপদসংকুল ভয়াল অরন্য। তাড়কা বন। এখানে আছে অনেক হিংস্র প্রানী। সাবধান।                                                                                         

দুটি সবুজ প্রানের শিখা রাম আর লক্ষন বিশ্বামিত্র ঋষিকে অনুসরন করে চলেছে অরন্যপথের সংকট যাত্রায়। জগতে হিংসা কি তাঁরা এখনো জানে না।             

বিশ্বামিত্র বললেন, ‘রাম এ এক গহীন অরণ্য। নরকের গহ্বরে পুঞ্জিত অন্ধকারের মতো দুর্গম। দিনের বেলায় অন্ধকার। ওই শোনো ঝিঁ ঝিঁ’র কলস্বন। গাছের জটিল শাখায় শাখায় জড়িয়ে আছে বিষধরগন। বৃক্ষশীর্ষে ওই দেখো বসে আছে অসংখ্য গৃধ। ওই শোনো,  হিংস্র জন্তু সকলের বিকট শব্দ। বনের বাতাসে ঘোর অমঙ্গলের  আতংক আর অভিশাপের নিঃশ্বাস।

রামচন্দ্র যেন প্রসন্ন সিংহ শাবকের দৃষ্টিতে ওই ভয়ংকর বনের দিকে তাকিয়ে  থাকেন।

লক্ষন জিজ্ঞাসা করেন, ‘ওই ভীষণ অরন্যের নাম কি গুরুদেব ? ‘

বিশ্বামিত্র বলেন,‘ ওই সেই তাড়কা বন। ওই অরন্যের ভিতর দিয়ে আমাদের গন্তব্যে যেতে হবে । ওই আমাদের পথ। ওই পথে দাঁড়িয়ে থাকে রাক্ষসী তাড়কা। সে ছিল একজন যক্ষিণী। অগস্ত্যের শাপে সে হয়ে যায় এক ভীষণা রাক্ষসিনী । ‘

দুই কিশোর রাম লক্ষন তাকিয়ে দেখেন,  কি ভয়াল অন্ধকার অরন্য। চারিদিকে থমথম করছে বিভীষিকা। বাতাসে সাপের নিঃশ্বাস। পাতায় পাতায় প্রেত পিশাচের আতংক। 

অরন্যের ভয়াল অন্ধকারে লুকিয়ে ওত পেতে আছে রাবনের অনুচর মারীচ ও সুবাহু। আর তাদের দলের অগনিত ক্ষুধিত রাক্ষসগণ সব। আর আছে বিকট দশনা অতিঘোরা ভয়াল কানী রাক্ষসী তাড়কা। 

দুই কিশোর অবাক হয়ে শোনেন বিশ্বামিত্রের কথা। ভয়ঙ্করী তাড়কা রাক্ষসীর কথা।

বিশ্বামিত্র বললেন, ‘ শোনো রাম, এই তাড়কা আগে ছিল ছিল এক সুন্দরী যক্ষিণী। সে ছিল শুদ্ধাচারী তপস্বী সুকেতুর কন্যা। সুকেতুর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা আশীর্বাদ করলেন। ব্রহ্মার বরে জন্ম নিল তার অতুলনীয়া এক সুন্দরী কন্যা। জম্ভের পুত্র সুন্দের সঙ্গে তার বিবাহ হ’ল। এই যক্ষিনীর পুত্র মারীচ। সেই মারীচ আর তার ভাই সুবাহু এক্ষনে আমার যজ্ঞে ভীষণ রকমে উৎপাত শুরু করেছে। রাম,  আমি তাই তোমাকে নিয়ে এসেছি আমার সঙ্গে এর প্রতিকার করতে। 

রাম বলেন, ‘গুরুদেব আমার সামান্য অস্ত্র শিক্ষায় যথোচিত সাধ্য আমি ওই রাক্ষসদের প্রতিরোধ করব । আমি আছি আর আমার সঙ্গে আছে আমার বীর ভ্রাতা লক্ষন। গুরুদেব আপনি চিন্তা করবেন না।’     

বিশ্বামিত্র বলেন,‘ আমি জানি তোমরা দুই ভ্রাতা আমার দুই বাহু। তোমরা আমার যোগ্য শিষ্য। রাম কাল এই অরন্য আমরা পার করব। এই অরন্যে পথ চেনা দুষ্কর। এই বনের ভিতর দিয়ে যেতে আছে রাক্ষসী তাড়কার বাধা। অন্য যে পথ সে ভীষণ দীর্ঘ পথ। সে তিন দিনের পথ। সিদ্ধাশ্রমে যেতে হবে অনেক ঘুরে ঘুরে।’

রাম সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। পুন: মুনিবর বিশ্বামিত্র তাঁদের বললেন, ‘রাম সামনে আমাদের দুটি পথ। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন পথ অবলম্বন ? ‘

          এই পথে যাই ঘরে তৃতীয় প্রহরে

          ওই পথে তিনদিনে যাই মোরা ঘরে।।

          তিনদিনের পথে সেথা নাই কোন বাধা ,

          তৃতীয় প্রহরের পথে রাক্ষসের ভয় সদা।। [কৃত্তিবাস]

রাম বললেন, ‘ মুনিবর, আমার মনে হয়, যে পথে রাক্ষসের বাধা, আমরা যদি তবে সেই পথেই এগিয়ে যাই , তাহলে আমরা পথের বাধাগুলির সম্যক ধারনা পেতে পারি।’

মুনি বিশ্বামিত্র রামের কথা অনুধাবন করে তাই বললেন , ‘ উত্তম। অতি উত্তম । ‘

রাম বললেন, ‘গুরুদেব, যে পথে ভয়, সেই পথই আমরা তবে কেন না দেখে যাই এখন। আমি বলব যে পথে বাধা সেই পথেই অনুসন্ধান সর্বথা । ‘

বিশ্বামিত্র রামের কথা শুনে আহ্লাদিত হলেন। মনে মনে বললেন ‘ বাঃ ! একেই বলে সিদ্ধান্ত।’ 

বিশ্বামিত্র বলেন, ‘ সঠিক সিদ্ধান্ত রাম। তোমার অনুমান সর্বথা । যেখানে সমস্যার উদ্ভব সেই সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়া কোন বিচক্ষণতা নয়।’

রাম বলেন, মুনিবর , যদি সে রাক্ষসী পথে আসে সভে খাইতে,

                               বিচারে নাহিক দোষ তবে তাহারে মারিতে।। [কৃত্তিবাস]

বিশ্বামিত্র বলেন, ‘ উত্তম ! বেশ,  রাম, এইবার তবে চলা যাক এখন সেই পথে !’ 

                                                [ আদিকান্ড ২ ]

| ৫ |

রাক্ষসী তাড়কা সংহার 

ঋষি বিশ্বামিত্র রাম লক্ষনকে সঙ্গে নিয়ে অতঃ প্রবেশ করলেন তাড়কা বনে। এই সেই গহীন অরণ্য তাড়কাবন। এই তাড়কাবনেই এককালে ছিল ঋষি অগস্ত্যর আশ্রম। এখন আর তার কোন অস্তিত্ব ও নেই। পরিত্যাক্ত সেই স্থান। এ এখন এক ভীষণ গহীন অরণ্য প্রদেশ।

ধনুষ্পানি সালঙ্কৃত দুই রাজকুমার চলেছেন বিশ্বামিত্রের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঘনঘোর জঙ্গল পথে। অরণ্যের ভয়াল অন্ধকারে লুকিয়ে আছে যতেক হিংস্র শ্বাপদ। আর ওত পেতে আছে ভয়ালকানি রাক্ষসী তাড়কা। এখানে কোন লোকালয় নেই। দিনের বেলায় ও কেউ সেই অন্ধকার বনের দিকে যায় না। মনুষ্য বিদ্বেষী, ঋষিমুনি বিরোধী, যাগযজ্ঞ বিনষ্টকারীনি রাক্ষসিনী তাড়কা এবং তাঁর পুত্র মারিচের অত্যাচারে মলোদ ও কবুষ নামে দু’দুটি সমৃদ্ধ জনপদ আজ সম্পূর্ন নিশ্চিহ্ন এবং অরণ্যে পরিণত। 

রাম জিজ্ঞাসা করেন,‘ মুনিবর কেমন করে সেই যক্ষিণী রাক্ষসী তাড়কা হলেন ?’

বিশ্বামিত্র বললেন,‘ এখন তবে সেই কথা বলি তোমায় রাম ! যক্ষ সুকেতুর কন্যা ছিল তাড়কা। সে ছিল যক্ষিনি। অগস্ত্যমুনির শাপে সে হয়ে যায় রাক্ষসিনী। তাঁর দুই পুত্র মারিচ এবং সুবাহু, তাঁরা ও রাক্ষস। তাঁরা উভয়েই রক্ষরাজ রাবণের অনুগত অনুচর।’ 

পথ চলতে চলতে রাম সেই গল্প শোনেন। বিশ্বামিত্র বলে চলেন,‘ একদিন মারীচের পিতা সুন্দ কোনো এক অপরাধে অগস্ত্য মুনির অভিশাপে নিহত হ’ন। 

রাম জিজ্ঞাসেন , ‘ কে ঋষি অগস্ত্য ?’ 

মুনিবর বিশ্বামিত্র বলেন , ‘ ঋষি অগস্ত্য হলেন বেদ এর মন্ত্র দ্রষ্টা ঋষি ! মিত্র ও বরুণ দেবতার তেজে যজ্ঞ কুন্ড হতে তাঁর উৎপত্তি ।  তিনি বিন্ধ্য পর্বতের গুরু । তিনি দৈত্য বাতাপিকে বধ করেছিলেন । তিনি সমুদ্র শোষণ করে কাল্কেয় দৈত্যগণকে

বিনাশ করেছিলেন।’ 

রাম বলেন, ‘অদ্ভুত !’

বিশ্বামিত্র বলেন, ‘ সেই অগস্ত্য মুনির অভিশাপে একদিন মারীচের পিতা সুন্দ কোনো এক ভয়ানক অপরাধে নিহত হয়েছিল। তখন পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে ক্রুদ্ধ মারীচ অগস্ত্যের আশ্রম আক্রমন করে বসে। যক্ষিণী তাড়কা ও ক্রুদ্ধ হয়ে ছুটে যায় ঋষি অগস্ত্যকে হত্যা করতে, যাঁর অভিশাপে দৈত্য সুন্দ নিহত হয়েছিল। সেই মারীচ এবং যক্ষিণী তাড়কা এইবার বহু ব্রাহ্মন এবং শিশ্য সমাবৃত অগস্ত্যের আশ্রমকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। অগস্ত্য ঋষি তখন তাদের অভিশাপ দেন, ‘ তোমরা রাক্ষস হও। সেই হতে মারীচ ও তার মাতা, যারা ছিল আসলে যক্ষ এবং যক্ষিণী, তাঁরা তখন হয়ে যায় ঘোরদর্শন রাক্ষস ও রাক্ষসী। কালে অগস্ত্যের সেই আশ্রম হয়ে যায় রাক্ষস সমাকীর্ণ ভয়ংকর তাড়কা বন। সেখানে এখন কোন লোকালয় নেই। দিনের বেলায় ও কেউ সেই অন্ধকার বনের দিকে যায় না।                                      

সে গহীন অরণ্যে আছে তাড়কা রাক্ষসী 

মানুষের মুণ্ড লয়ে খেলে গোল্লা ছুট 

প্রবেশিত না দেয় মনুষ্য কি মুনি ঋষি

অরণ্যের অধিকারে বুদ্ধি তার কুট।।

মনুষ্য যজ্ঞ করে যজ্ঞে ভীষণ ভয় 

মানুষের কর্মকান্ডে বিঘ্নিত প্রকৃতি 

প্রকৃতির মাঝে মানুষ অনধিকার হয় 

মানুষ দেখিলে দেখায় প্রমাদ বিকৃতি।। [স্বরচিত ]

যথারীতি সেই অরন্যে তিনজন মনুষ্যকে প্রবেশ  করতে দেখে রাক্ষসী  তাড়কা  ভীষণ হুংকার দিয়ে ওঠে , ‘ কে  রে তোঁরা মাঁনুষ এঁসেছিস এঁখানে ?’

            হাই হাই হুম হুম হাউ মা উ খাউ 

        তেড়ে আসে তাড়কা হিংস্র চিৎকারে !

       ‘রক্ত খাব আমি এবে ,মানষের গন্ধ পাউ ‘

      বিশ্বামিত্র বলেন , রাম, ‘সংহারো ইহারে ‘।

      অভিশপ্ত তাড়কা এই ছিল যক্ষ কন্যা 

      অগস্তর শাপে সে হয়েছে রাক্ষসী 

    তোমার হাতে মুক্তি হলে হবে সে ধন্যা

    এ অরণ্য ‘ ভয় মুক্ত’ করো এবে আসি।  [স্বরচিত ]

বিশ্বামিত্র রামকে সতর্ক করেন, ‘রাম, ওই ওই ওই দেখো, ওই যে সেই ভয়ংকর রাক্ষসী তাড়কা। তুমি তাকে বধ কর। রাম স্ত্রী হত্যা হবে বলে দ্বিধা করো না। প্রজার কল্যাণের জন্য এ তোমার পরম কর্তব্য। এ তোমার রাজধর্ম। প্রজা হিতার্থে রাজাকে সব কিছু করতে হয়। ‘

রাম বিশ্বমিত্রের বাক্য পালনে দ্বিধা করে না। তাড়কা রাক্ষসীকে দ্বন্দে আহবান করতে রাম লক্ষন ধনুকে টংকার দেয়। ধনুকে টংকার দিতেই আকাশ বাতাস অরণ্য কম্পিত করে রাক্ষসী তাড়কা ভীষণ হুংকার দিয়ে ওঠে। বিকট মূর্তি তাঁর প্রেতের বসন, গলায় নরমুণ্ডের মালা পরিহিতা রাক্ষসী তাড়কা ঝড়ের বেগে এসে দাঁড়ায়।

              ‘হাঁউ মাঁউ খাঁউ । মাঁনুষের গন্ধ পাউ । 

             কে তোরা এখানে , কি হেতু বিঘ্ন ঘটাউ ?’

               অগস্ত্য মারিল মোর ভর্তা সুদ্বন্দ রে

              ‘রাক্ষসী হয়ে যা’ বলি শাপ দিল মোরে !!

রাম হুংকার দেন , ‘  ওরে রে রাক্ষসী,  যজ্ঞভঙ্গকারিণী , আজ আমার হাতে তোর মরণ !’

রাক্ষসী তাড়কা চীৎকার করে ওঠে ,  ওরে রে রে

           দাশরথি , তোর আমি কি করেছি বল

            আমারে কেন তুই মারিবি কেবল ?

            রাম বলেন রাক্ষসীনি ক’র যে অত্যাচার !

            অগস্ত্যর আশ্রম তুমি করেছ ছারখার ।   

             যজ্ঞনাশিনী তুই বলেন মুনিগন            

            আমি চাই রাক্ষসী , তুই কর পলায়ন।

এইবার রাক্ষসী তাড়কা চীৎকার করে ওঠে , 

            কে রে তুই তাড়কারে দেখাস বড় ডর

            এত যদি সখ তোর , আয় তবে মর ।।  [স্বরচিত ]

রাক্ষসী  তাড়কা এবার এক ভীষণ পাথর মাথায় তুলে ছুঁড়ে মারে ।

লক্ষন বলে, ‘ রাম, সাবধান। তাড়কা বড়  নির্মম।‘

রাম বলেন, ’লক্ষন,  এই  প্রলয়ংকর রাক্ষসীকে আমি সম্পূর্ণ অক্ষম এবং হত বল করে ছেড়ে দিতে চাই। ‘

তাড়কা রাক্ষসী  এইবার এক ভীষণ প্রহেলিকা সৃষ্টি করে তোলে। রাম বাণ মেরে সেই প্রহেলিকা দূর করে দেয়।

দেখতে দেখতে কোথা হতে এক ভীষণ কালোমেঘের ধোঁয়া এসে রাম লক্ষণকে ঢেকে দেয়।

বিশ্বামিত্র বলেন, ‘ রাম , এ  দুরাচারী । এঁকে হত্যা করো। নৃশংস কি অনৃশংস বলে পিছিয়ে এসো না। রাম তুমি ফুলের মত কোমল হলে চলবে না তোমাকে হতে হবে বজ্রের মতো কঠোর।’‘

বিশ্বামিত্র রামকে কঠোর রাজনৈতিক শিক্ষা দিচ্ছেন। যুবরাজ রামের কোমল হৃদয়তন্ত্রীকে তিনি ললিতে কঠোরে তীক্ষ্ণ করে ধরতে চান। 

তাড়কা রাক্ষসী ধুলিকঙ্কর ছুঁড়ে রাম লক্ষণকে অন্ধ করে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এইবার ভীষণ ভীষণ শিলাবর্ষণ হতে লাগলো। রাম বাণ মেরে এক্ষনে সেই শিলা বর্ষণ বন্ধ করলেন। 

রাক্ষসী তখন তীক্ষ্ণনখর শানিয়ে নিয়ে রামকে প্রতিআক্রমণ করে। রাম এইবার এক তীক্ষ্ণবানে তাড়কা রাক্ষসীর দুই হাত  কর্তন করে ফেলে। রাক্ষসী তথাপি দুর্ধর্ষ বেগে এগিয়ে আসতে থাকে । 

লক্ষণ এক্ষনে তাড়কা রাক্ষসীর নাক ও কান কর্তন করে তাকে আর ও পর্যুদস্ত করে তোলে ।

এবার রক্তাক্ত মুখে বিকৃত রাক্ষসী বিকট শব্দে হুংকার দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যুদ্ধ করতে লাগলো।

বিশ্বামিত্র উদ্বিগ্ন স্বরে বলে ওঠেন, রাম,সাবধান, এঁকে নারী বলে অবহেলা ক’র না। রাক্ষসরা স্বভাবতঃ মায়াবী । সমাগত সন্ধ্যায় এরা ভীষণ দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠে। বিলম্ব করো না। পাপীয়সী রাক্ষসীকে এই মুহূর্তে হত্যা করো ।

রাক্ষসী তাড়কা এবার নখদন্ত বিস্তৃত করে লোলজিহ্বা প্রসারিত করে অন্ধশ্বাপদের মতো প্রাণবিদারক ধ্বনি তুলে রাম লক্ষন দুই ভাইকে তাঁর বিশাল হাতের পাঞ্জায় চেপে ধরে গিলে ফেলতে ছুটে আসতে থাকে। 

রাম তখন তীক্ষ্ণ এক শরাঘাতে বিশাল ধুম্রবর্ণ তাড়কা রাক্ষসীর বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। তাড়কা রাক্ষসী এইবার এক বিকট আর্তনাদ করে কয়েক যোজন ভূমিতে নিপাতিত হ’ল। 

দেবতারা সন্তুষ্ট হলেন। এক ভীষণ প্রহেলিকা নিপতিত হল।  

মৃত রাক্ষসী তাড়কা এবার ধীরে ধীরে তার সেই পূর্বের সুন্দরী যক্ষিণী রূপ প্রাপ্ত হল। রামের হাতে মৃত্যু হয়ে সে তাঁর অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে গেলো। এক বিরাট অমঙ্গল যেন পৃথিবী হতে বিনাশ হল ।

বিশ্বামিত্রের উদ্দেশ্য সফল হল অবশ্যই। 

তিনি রামকে এই ভয়ানক পরিবেশে নিয়ে এসেছেন জীবনের কঠোর থেকে কঠোরতম শিক্ষাদান করতে। রামের ক্ষত্রিয় সত্বাকে উজ্জীবিত করে তুলতে। এই তো জীবনের দীক্ষা।

                                      [আদিকান্ড ২]

| ৬ |

রামের দিব্যাস্ত্র লাভ

বিশ্বামিত্র রামকে বললেন, ‘রাম এইবার আমার একটি উদ্দেশ্য সফল হ’ল। আমি তোমাকে এই ভয়ানক পরিবেশে কেনো নিয়ে এসেছি,  জানো ?’ 

রাম জোড়াসনে বসে জোড়হস্তে কৌতুহলী হয়ে তাকিয়ে থাকে ঋষি বিশ্বামিত্রের দিকে এবং বিশ্বামিত্রের জিজ্ঞাসার উত্তরে বলে ওঠেন, ‘ নিশ্চয়ই আমাকে কোন কঠিন শিক্ষা প্রদান করতে , গুরুদেব !’

বিশ্বামিত্র রামচন্দ্রের কথা শুনে প্রীত হলেন। তিনি বলে উঠলেন, ‘ যথার্থ বৎস ! তোমাকে আমি নিয়ে এসেছি জীবনের কঠোর হতে কঠোরতর এবং কঠোরতম শিক্ষা দান করতে। তুমি তাড়কা রাক্ষসীকে বধ করে এক বিরাট মানব কল্যানের কার্য্য  সাধন করেছো। এ কার্য্য অন্য কাহারো পক্ষেই সম্ভব ছিলনা। তোমার পরাক্রম দেখে আমি স্বতঃই পরিতুষ্ট । রাম, কাল আমি তোমাকে অদ্ভুত কিছু দিব্যাস্ত্র দান করতে ইচ্ছা করি।’

রাম বলে, ‘সে আপনার অসীম কৃপা।’   

বিশ্বামিত্র বলেন, ’ রাম, সেই সকল অস্ত্রের প্রভাবে তুমি দেবতা রাক্ষস অসুর গন্ধর্ব কিন্নর সমূহ সকলকে পরাস্ত করতে পারবে।’ 

রাম বলেন, ‘ মুনিবর , দেবতা অসুর এবং মানুষ তিনজনেই প্রজাপতির সন্তান। তাহলে তাদের মধ্যে বৈপিরীত্য কেন ?’

বিশ্বামিত্র বলেন , উত্তম প্রশ্ন বৎস ! শোনো তিন জনের তিন স্বভাব। স্বভাব দিয়েই আকৃতি গড়ে ওঠে। একজন ক্রূর ক্রুদ্ধ খল মানুষের মধ্যে থাকে সর্প প্রকৃতি, একজন কামুক নিষ্ঠুর দাম্ভিক মানুষের  মধ্যে পাবে রাক্ষস প্রকৃতি । বৎস সে কোন ভুল দেখা নয়।  মানুষের চেহারাই তাঁর মুখোশ।  রাম, জন্ম দিয়ে নয় , স্বভাব দিয়ে , গুণ এবং কর্ম দিয়েই তার পরিচয় , যেখানে বিচার্য , কে সত্যকারের মানুষ আর কে রাক্ষস !  আসলে , লোভে ক্ষোভে দর্পে কামে ক্রোধে কেউ একজন হতে পারে নিষ্ঠুর রাক্ষস !  কিংবা নীচতায় হীনতায় কুৎসিত কদর্য ক্লেদে কেঊ হয়ত হতে পারে এক অশুচি পিশাচ। আবার রূপে গন্ধে সৌন্দর্যে শিল্পে কেউ হয়ত হয়ে ওঠেন মনোহর গন্ধর্ব । কেউ আবার সত্যে ধর্মে ত্যাগে তপস্যায় ধৈর্যে বিশুদ্ধ প্রশান্ত নির্ভয়। কেউ ধ্যানে গম্ভীর ।  কেউ জ্ঞানে গম্ভীর ।’

কথায় কথায় রাত হ’তে থাকে।  

মুনিবর বললেন, ‘ যাক রাত হয়েছে। রাম লক্ষন, আজ তবে এই গহীণ কাননে এসো বিশ্রাম করা যাক।’

রাম বলেন,  ‘যথা আজ্ঞা গুরুদেব।।

মুনিবর এইবার লক্ষনকে সঙ্গে নিয়ে কিছু মন্ত্রপূত সর্ষপ চতুর্দিকে ছিটিয়ে দিয়ে অস্টকোন বন্ধন করলেন । তার চিন্তা দুই রাজকুমারকে নিয়ে যাদের দ্বায়িত্ব তাঁর উপরে ন্যস্ত ।

বিশ্বামিত্র এবং রাম লক্ষণ দুই ভাই আজ তাড়কা বধের পর সেই গহীন অরন্যে পরম নিশ্চিন্তে রাত্রি যাপন করলেন। নিবিড় বনানী। শুভ্র চন্দ্রালোকের সঙ্গে মিশেছে ঘন ছায়ানীল অন্ধকার। মাথার উপরে গাঢ় অভ্ররেখা। তারাভরা ওই নিঃশব্দ আকাশ। আর অরন্যের স্তব্ধ মৌন রহস্যতা। 

অরন্যের আর এক রাত্রি ভোর হ’ল। বনের শাখাপল্লবে লতায়পাতায় ঘনসবুজের উপর সোনার আলো ঝলমল করতে লাগল।

বাতাসে বনফুলের মিস্টি গন্ধ। পাখি ডাকছে। ঝরা পাতার মর্মর। চুত্যমঞ্জরী নাগকেশরের রেনু বিছানো বনপথে ত্রস্থ হরিনি ছুটে চলেছে।

রামের কিশোর জীবনে এ এক নুতন সুপ্রভাত। গতকাল তাড়কা রাক্ষসীকে বধ করেছেন। আজ বিশ্বামিত্র দিব্যাস্ত্র দান করবেন বলে আদেশ করেছেন।

রাম লক্ষন প্রস্তুত হয়ে নিলেন। প্রভাতে রাম লক্ষন স্নানাদি সেরে পূর্বাস্য হয়ে ধ্যানস্থ হলেন। 

অত: প্রভাত কালের পূজা সমাপনান্তে বিশ্বামিত্র রামকে বললেন, ‘ ভদ্রং তে রাজপুত্র ! রাম তুমি আমাকে অনুধাবন করো। আজ তোমাকে নিখিল জগতের সকল দিব্যাস্ত্র দান করব। দেবতা, গন্ধর্ব,যক্ষ, রক্ষ, নাগ সকলেই এই  অস্ত্রের কাছে  অসহায় । বিবিধ তাদের নাম । বিবিধ তাদের শক্তি । বিবিধ তাদের বর্ণ এবং আকৃতি।

আমি এবার বিভিন্ন অস্ত্র সমূহকে আহবান করছি। অবধান ক’রো ।  প্রজাপতি কৃশাশ্বের মন্ত্রজাত অত্যুজ্জ্বল এই সব অস্ত্র । অমোঘ তাদের শক্তি ।

বিশ্বামিত্র এবার মুদিত নেত্রে ধ্যানে বসে আবাহনমন্ত্র জপ করে দিব্যাস্ত্র সকলকে আহবান করলেন। তাঁরা সব উজ্জ্বল তেজা দিব্য আয়ুধ মূর্তি যত। বিদ্যুতের রেখায় রেখায় তাদের ঝলসিত দীপ্তি। কেউ চন্দ্রের মতো স্নিগ্ধ, কেউ  সূর্যের মত প্রখর।  অগ্নির মত আবর্তিত ওই সব আয়ুধ সকল। 

ক্রমে ক্রমে আবির্ভূত হতে থাকে ধর্ম চক্র, কাল চক্র, ইন্দ্র চক্র,দন্ড চক্র,বিষ্ণুচক্র। 

মুনিবর বললেন,‘ রাম এই সব চক্র আমি তোমায় দান করলাম। তুমি এই পঞ্চচক্রে যে কোন  শত্রুকে পরাস্ত করতে পারবে। এই নাও তোমাকে দিলাম মারাত্মক পাশ। এঁরা  ধর্ম পাশ, কাল পাশ, বারুন পাশ ।

এইবার তুমি ধারন কর ব্রহ্মশির,ঐহিক,ব্রহ্মাস্ত্র। 

এই নাও এই বার হাতে তুলে নাও বজ্র, শৈবশূল, বায়ব অস্ত্র, বর্ষণাস্ত্র, শোষণাস্ত্র। 

রাম জিজ্ঞাসা করেন , গুরুদেব কি পরিচয় এই সব অস্ত্রাদির ?

বিশ্বামিত্র বলেন,‘ রাম, এরা সকলে এক একটি দিব্যাস্ত্র। এরা তোমার আজ্ঞাবাহি কিংকর। তুমি এদের গ্রহণ করো। তুমি স্মরণ করলে এরা তোমার নিকট আবির্ভূত হবে।

রাম প্রণত হয়ে বললেন, ‘ গুরুদেব এ আপনার অশেষ করুণা যে আপনি আমায় দিব্যাস্ত্র জ্ঞান দিলেন।

বিশ্বমিত্র বললেন, ‘শোনো, এঁরা সব প্রজাপতি কৃশ্বাশ্বের তনয়। এদের উপযুক্ত মন্ত্র দ্বারা আবাহন ও প্রহারণ করবে। আমি তোমায় এই অস্ত্র দ্বারা শত্রু সংহার মন্ত্র এবং বিমুক্ত অস্ত্রগুলির পুনরাকর্ষণ কৌশল ও শিক্ষা দেবো। ‘ – এবং এইবার বিশ্বামিত্র তদনুরূপ রামকে যত্নপূর্বক অস্ত্র চালন এবং মন্ত্রদান করলেন ।

রাম গভীর অধ্যবসায়ে সেই সব অস্ত্র সঞ্চালন মন্ত্র শিখে নিলেন।

বিশ্বামিত্র রাম লক্ষণকে বিভিন্ন অস্ত্রের বিভিন্ন প্রয়োগ শেখালেন।

রাম শিখলেন কেমন করে এক বিশাল বৃক্ষকে শর প্রয়োগে অগ্নি দ্বারা প্রজ্জ্বলিত করা সম্ভব। কেমন করে বাণ দ্বারা মৃত্তিকা ভেদ করে জলকে প্রস্রবণ করা যায়। কেমন করে শর শাসনে গতিময় বায়ুকে প্রবাহিত করা যায় কিংবা বায়ুকে রুদ্ধ করা যায়। মুনিবর বিশ্বামিত্র অক্লান্ত পরিশ্রমে দুই শিশ্যকে ভীষণ সব অস্ত্রের নিগূঢ় সব প্রয়োগ শেখালেন। রাম এবং লক্ষণ  যথেষ্ট অধ্যবসায়ে সেই সব কুট অস্ত্রের প্রয়োগ কৌশল শিখলেন।

বিশ্বামিত্র বললেন, ‘রাম তুমি এই সব দিব্যাস্ত্রকে অভিনন্দিত কর। এঁরা সকল দেবতার দীপ্ত তপস্যার তেজ।

‘তেজাংসি তপোময়ানি। ইচ্ছামাত্র এঁরা রূপ ধারন করে। সংকল্প মাত্র এঁরা পলকে সংহার করে। কামরূপান বলবান ।’

বিশ্বামিত্র প্রতিটি অস্ত্রের আবাহন  এবং  তাদের প্রয়োগ ও প্রত্যাহার মন্ত্র দান করলেন রামকে ।

তখন উজ্জ্বলকান্তি মন্ত্রমূর্তি অস্ত্ররূপী শক্তি সকল রামের সন্মুখে এসে প্রণত হয়ে দাঁড়ালেন । তাঁরা রামকে বললেন, ‘কিং করবাম তে ! কি করব আজ্ঞা করুন !’ 

তখন রাম প্রসন্নমনে সকল দিব্যাস্ত্রগণের উপরে করস্পর্শ করে তাদের যথা সমাদর অভিনন্দিত করে এক্ষনে অনুমতি করলেন,  ‘ হে দিব্যাস্ত্রগন, আমি স্মরণ করলে তোমরা আমার নিকট উপস্থিত হ’য়ো।’

বিশ্বামিত্র বললেন,‘ রাম এই সব দিব্যাস্ত্র জ্ঞান আমি তোমায় দিতে পেরে নিশ্চিন্ত হলাম। গুরু বিদ্যা দিতে পারে। কিন্তু শিষ্য যদি সেই বিদ্যার সমুহ উপযোগ না করতে পারে তাতে বিদ্যা নষ্ট হয়। এ আমার সমস্ত জীবনে অর্জিত বিদ্যা।’

রাম বলেন, ‘ গুরুদেব আমি ধন্য আপনার কাছে এত প্রকার শস্ত্রের শাস্ত্রসম্মত প্রয়োগ জানতে পেরে। আপনি অনন্য। আমি এই সব অস্ত্রের যথাযথ প্রয়োগ করব ।’ 

বিশ্বামিত্র বললেন, ‘বৎস আমি এমনটাই আশা করব তোমার কাছে। এবার চলো পুনর্বার যাত্রা শুরু করা যাক।

রাম জিজ্ঞাসা করেন, ‘গুরুদেব এবার আমাদের  যাত্রা কোন পথে ?’

মুনিবর বললেন, ‘ বৎস ,  এবার আমাদের গন্তব্য সিদ্ধাশ্রম অভিমুখে।’

আবার চলেছেন বিশ্বামিত্র। পিছনে চলেছেন রাম ও লক্ষন। 

বিশ্বামিত্র পথ চলতে চলতে কত কি দ্রষ্টব্য, কত রকমের গল্প বলতে থাকেন রাম এবং লক্ষন কে তাদের পথশ্রমের ক্লান্তি অপনোদন করতে। 

ধ্রুপদী সাহিত্য : ভজ মন রাম চরণ - শ্যামলকৃষ্ণ বসু

ভজ মন রাম চরণ

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি