ধ্রুপদী সাহিত্য : ভজ মন রাম চরণ - শ্যামলকৃষ্ণ বসু
[ আদিকান্ড ২ ]
শ্যামলকৃষ্ণ বসু
ধ্রুপদী সাহিত্য

| ৭ |
সিদ্ধাশ্রম অভিমুখে
দশরাত্মজ রাম চলেছেন মুনিবর বিশ্বামিত্রের সমভিহ্যারে সিদ্ধাশ্রম অভিমুখে। পিছনে পিছনে রামানুজ লক্ষন অগ্রজের নীরব অনুসরণকারী ।
পথে চলতে চলতে তাঁরা এইবার এক বিশাল পুরি দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
বিশ্বামিত্র বললেন,‘এই পুরি সৃজন করেছেন স্বয়ং নারায়ণ। যখন বিষ্ণু ব্রাহ্মন রূপ ধরলেন সেই সময় তিনি এই পুরি নির্মাণ করলেন। এই পুরীর ভিতর আছে এক দিব্য সরোবর। সেই সরোবরে স্নান এবং তর্পণ করলে তার সাত যুগের পাপ বিমোচন হয়। এই সেই পুরি যেখানে সত্য যুগে হয়েছিল সমুদ্রমন্থন। ওই দেখো সেই মন্দার পর্বত যার গায়ে এখনো বাসুকীনাগের চিহ্ণ বর্তমান। ক্ষীরসমুদ্র মন্থনে মন্দার পর্বতকে দন্ড করে মন্থন হয়েছিল এই স্থানে। -মুনি বিশ্বামিত্রের কথা শুনে রাম এবং লক্ষণ সেই পুরিকে তিন তিনবার প্রদক্ষিণ করে নিয়ে তারপরে আবার রওনা হলেন সিদ্ধাশ্রমের দিকে।
দীর্ঘ দুর্গম পথে এমন দুর্গম যাত্রায় বিশ্বামিত্র চলেছেন দুই রাজকুমারকে নিয়ে। রামের নীরব অনুসারী লক্ষন । দীর্ঘপথে লক্ষনের মুখে একটি কথাও নেই। সে শুধু নীরবে ছায়ার মতো কেবল অগ্রজ রামকে অনুসরন করে চলেছেন। প্রয়োজনে সে তার অগ্রজের পাশে দাঁড়িয়ে অস্ত্র ধরছেন, যুদ্ধ ও করছেন। কিন্তু কোন কথা বলছেন না। মৌন বনানী , মৌন ছায়া, তেমনই মৌন লক্ষন ।
চলতে চলতে ঋষি বিশ্বামিত্র এইবার রাম এবং লক্ষনকে দেখালেন বিভিন্ন মানুষ, অনেক জাতি, বিভিন্ন লোকালয় এবং সর্বদেশ। দেশ কাল পাত্রের পরিচয় যে খুবই প্রয়োজন।
বিশ্বামিত্র মুনির সহিত পথ চলতে চলতে রাম ও লক্ষণ এক্ষণে দূরবর্তী পর্বতের কোলে যে ঘন বন তার অপূর্ব দৃশ্য দেখে মোহিত হ’ল। সেই বনে একটি আশ্রম ও দৃশ্যমান।
ছায়া ঘেরা সেই পর্বত সানুর দিকে তাকিয়ে রাম জিজ্ঞাসা করলেন,‘ মহর্ষি আমরা গভীর বন পেরিয়ে এলাম। অহো, চারিদিকে এখন উন্মুক্ত প্রসার। আকাশ ভরা আলো আর বাতাস। স্থানটি বড় পুন্যময় সুখকর বোধ হচ্ছে।’
বিশ্বামিত্র বলেন,‘ রাম, ওই যে পুন্যময় সুখকর স্থান দেখতে পাচ্ছো, ওই সেই আমাদের গন্তব্য, পবিত্র সিদ্ধাশ্রম। ওইখানে অদিতির পুত্র হয়ে বামনরূপী স্বয়ং শ্রীবিষ্ণু তপস্যায় সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। সেজন্য এর নাম হয়েছিল সিদ্ধাশ্রম। মহাতপা কশ্যপ ও একদা ওইখানে তপস্যা করে বিষ্ণুর দর্শন লাভ করেন। বামন রূপে অবতীর্ণ হয়ে শ্রীবিষ্ণু বিরোচনের পুত্র বলির যজ্ঞে ত্রিপাদ ভূমি ভিক্ষা করেছিলেন । তিনি বলিকে নিগৃহিত করে ইন্দ্রকে পুনরায় স্বর্গে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।’
রাম বললেন,’ কি সেই কাহিনী আমি শুনতে ইচ্ছা করি মুনিবর।’
বিশ্বামিত্র বললেন,‘এককালে অসুর বিরোচনের পুত্র রাজা বলি, ইন্দ্রাদি দেবগনকে পরাভূত করে স্বর্গ অধিকার করে নিয়েছিলেন। একবার তিনি একটি যজ্ঞের আয়োজন করেন। তখন দেবগন এই তপোবনে এসে বিষ্ণুকে বললেন, দানবরাজ বলির যজ্ঞে যাচকগন যা প্রার্থনা করছেন তাই পাচ্ছেন। প্রভু, কেননা আপনি দেবগনের হিতার্থে সেই যজ্ঞস্থানে গমন করে বলিরাজার সেই দান গ্রহন করুন এবং স্বর্গের অধিকার পুনরুদ্ধার করুন !
বিষ্ণু তখন কশ্যপ পত্নী অদিতির গর্ভে বামনরূপে জন্মগ্রহন করলেন এবং দানবরাজ বলির কাছে গিয়ে ত্রিপাদ ভূমি ভিক্ষা চাইলেন। – ‘ রাজা বলি তুমি যদি দানবীর হও তাহলে আমাকে মাত্র ত্রিপাদ ভূমি দান ক’র । ‘
রাজা বলি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ ব্রাহ্মন আপনি কেন না আরো কিছু যাচ্ঞা করুন ?’
বামন দেবতা বললেন, ‘ না বলিরাজ , আর কিছু নয়, মাত্র ওই ত্রিপাদ ভূমিই আপনি আমাকে দান করুন।’
অতঃ রাজা বলি সন্মত হ’লেন এবং বামনদেব তাঁর পাদত্রয় দ্বারা ত্রিলোক অধিকার ক’রে ইন্দ্রকে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করলেন।’
রাম অবাক হয়ে শোনেন বিশ্বামিত্রের কথা।
বিশ্বামিত্র বলতে থাকেন,‘ রাম, ওই সিদ্ধাশ্রমেই এখন আমার অবস্থান। ওই সিদ্ধাশ্রমেই আমার যজ্ঞ সাধন প্রয়াস। রাক্ষসেরা ঐখানেই উপদ্রব করে। তুমিই আমার সেই যজ্ঞ রক্ষা করবে রাম। তবে সাবধান ! অনেক বিঘ্ন আসবে। বিপদ আসবে। এখন চলো। ওই যে আমরা এবার এসে গেছি আমাদের আশ্রমে।’
এই কথা বলে বিশ্বামিত্র রামলক্ষন দুই ভাইকে সঙ্গে নিয়ে কর্পূর ও ধুপের গন্ধে আমোদিত পবিত্র আশ্রম প্রাঙ্গনে প্রবেশ করলেন।
তাঁরা সকলে আশ্রমে পদার্পণ করলে আশ্রমবাসী অন্যান্য মুনীগণ শিষ্যগণ সেবকগণ রাম এবং লক্ষণকে যথাচিত আপ্যায়ন ও সৎকার করলেন।
রাম লক্ষন এমন সুন্দর এক আশ্রম দেখে অত্যন্ত মোহিত হয়ে ওঠে। পত্র পুস্প শোভিত আশ্রম । বৃক্ষ ছায়াবৃত ছোট ছোট কুটির, পূজা মন্ডপ ,পাক গৃহ, বিদ্যা আশ্রম, বেদ পাঠের গোলঘর, দুই পাশে বিশাল প্রাঙ্গণ , দুই দিকে বিরাট দুই দীঘি, হংসগন কেলিরত। আশ্রমের গোসালা, পশু চারণ ভূমি, এবং ফলফলাদির বাগান । পালিত মৃগ, গরু এবং চঞ্চল গো বৎস আদি।
রাম বলেন, ‘আহা কোথা রাজসুখ আর কোথায় এমন শান্তির নীড়। তবে এমন মনোহরণ দৃশ্যপটে এমন সুখ নীড় এর ওপরে রাক্ষসদের অত্যাচার খুবই চিন্তার কারণ ভাই লক্ষন !’
লক্ষণ বলে, ‘ রাম , সেই হেতু আমাদের আগমন দুস্ট রাক্ষসদের প্রতিহত করতে এই আশ্রমে।’
রাম বলেন, ‘সে অতি সত্য। বুঝতে অসুবিধা হয় না, কেন মুনিবর যজ্ঞবিঘ্নে চিন্তান্বিত হয়ে থাকেন সেই রাক্ষসদের জন্য।’
আশ্রম সেবকগন রাম লক্ষন এবং গুরু বিশ্বামিত্রের বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দেয়। তাঁরা শ্রান্তি অপনোদনের জন্য সুমিস্ট সরবত আদি পান করতে দেয়।
বিশ্রামান্তে শ্রান্তি অপনোদন হলে মুনি বিশ্বামিত্র রাম এবং লক্ষণকে বলেন , রাম আগামীকাল এই আশ্রমে আরো কয়েকজন অতিথি আসবেন। তারা সকলেই আমার এই যজ্ঞ দেখতে আসছেন। তারা হলেন মিথিলার রাজা জনক এবং তাঁর ভাই কুশধ্বজ এবং তাদের বংশের চার কন্যা। সেই কন্যারা সকলেই গুনবতী বিদ্যাবতি।’
রাম লক্ষন সে সংবাদে বড় প্রীত হলেন। তাঁরা উদ্গ্রীব হয়ে রইলেন নুতন কারো সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য। অযোধ্যার বাইরে এই প্রথম কোন অপরিচিতের সঙ্গে পরিচয় হতে চলেছে অযোধ্যার রাজকুমারদ্বয়ের। আর খুব স্বাভাবিক তাঁরা সেই নুতন পরিচয়ের জন্য উন্মুখ হয়ে রইলেন। তাঁরা আশ্রম পরিভ্রমন করলেন। রাজপ্রাসাদের বাইরে এ এক অন্য জীবনের স্বাদ। এখানে নেই কোন রাজা, নেই কোন রাজন্যবর্গ, পাত্রমিত্র অমাত্য কিংবা কোন মন্ত্রী সান্ত্রী কেহই। পাখিদের কলরব ময়ূরের কেকাধ্বনিতে আশ্রম মথিত। গোধূলিতে গরুগুলি গাভীগুলি আশ্রমে ফিরে এলো। গোবৎসগুলি লাফিয়ে বেড়াচ্ছে । আশ্রম বালকেরা গাভীদের দোহন করছেন।
সমাগত অপরাহ্নে এখানে নিত্য বেদপাঠ। এখানে সন্ধ্যায় সামগান। অনন্তনন্তাময় ঈশ্বরের গুণগান ।
রাম বললেন, ‘ লক্ষন কি মধুর জীবন এখানে। বনবাসী জীবন কত সুন্দর কি সুখময়।’
লক্ষন মাত্র বললেন, ‘ অতি সুন্দর।’
| ৮ |
জন্ম জন্মান্তরের পরিচয়

পরের দিন মিথিলা হতে রাজা জনক এবং তাঁর ভাই কুশধ্বজ এবং মিথিলা রাজবংশের চার রাজকন্যা চার অশ্বযুক্ত দুই রথে তাঁরা এসে পৌঁছালেন সিদ্ধাশ্রমে। সঙ্গে তাদের চতুরঙ্গ সৈন্য। রাজা জনক এলেন হাতির পিঠে হাওদার ছায়ায় বসে।
তাঁরা আশ্রমে এসে পৌছাতেই মুনি বিশ্বামিত্র বলে ওঠেন, ‘অহো, কি আনন্দ! এইতো দেখি স্বয়ং রাজাজনক এবং তাঁর কন্যাগন ও আমার যজ্ঞ দেখতে সুদুর মিথিলা থেকে চলে এসেছেন। রাম দেখো কারা এসেছেন আজা আমাদের অতিথি হয়ে । রাজা জনক এবং তস্য ভ্রাতা কুশধ্বজ এবং তাদের চারকন্যা !
মুনিবর এক্ষনে এগিয়ে গেলেন তাঁদের অভ্যর্থনা করতে। – ‘হে রাজন, আসুন, আসুন। এই সিদ্ধাশ্রমে আপনাদের স্বাগতম। ‘
রাজা জনক এক্ষনে হস্তিপৃষ্ঠ হতে অবতরণ করে বললেন, ‘ঋষিবর আপনি আমার সশ্রদ্ধ প্রনাম গ্রহন করুন। আমি এবং আমার ভ্রাতা এবং আমাদের বংশের চার রাজকন্যা সকলে !’
বিশ্বামিত্র বলেন, ‘সুখীনা ভবন্তু। এসো এসো কন্যাগন !’
রাজা জনক আবার বলেন,‘ ঋষিবর এঁরা আমার এবং আমার ভাইয়ের, আমাদের চন্দ্রবংশের চারকন্যা। এই আমাদের সীতা। সে বেদাদি অধ্যয়ন পিপাসু। সে আপনার যজ্ঞের অনুরাগী।’
বিশ্বামিত্র বলেন, ‘আমার সৌভাগ্য যে, রাজন , আজ আমি তোমার বেদবতী কন্যা সীতার দর্শন পেলাম।’
সীতা বলেন, আমার প্রণাম নেবেন মহর্ষি বিশ্বামিত্র। আমি আপনার কাছে শাস্ত্রকথা শুনব বলে এসেছি।
বিশ্বামিত্র বলেন, সাধু সাধু। বেদবতী সীতার সাথে বেদ নিয়ে আলোচনা হবে, এ যে আমার পরম সৌভাগ্য । রাজা জনক আপনার পরম সৌভাগ্য সীতা মা’কে কোলে পেয়ে।’
রাজা জনক বলেন, ‘ সীতা আমার বংশের সৌভাগ্যলক্ষ্মী।’
আশ্রমবাসী সেবকগণ রাজাজনক এবং তার সমভিব্যাহারী সকলকেই যথাচিত আপ্যায়ন ও সৎকার করলেন সুমিস্ট ফল ফলাদি এবং শরবৎ ইত্যাদি দিয়ে।
এইবার মহামুনি বিশ্বামিত্র রাজা জনককে সম্বোধন বলে ওঠেন, ‘মহারাজা জনক, আজ আমি তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো অযোধ্যার দুই রাজকুমার, সূর্যবংশী রাজা দশরথের নন্দন রাম এবং লক্ষনের। এই হল দশরথের জ্যেষ্ঠপুত্র রাম এবং এই তাঁর ছোট ভাই লক্ষন। তাড়কা রাক্ষসী বধ করে রাম সকলের মঙ্গল সাধন করেছেন। তাদের বীরত্বের কীর্তি জেনেছেন সকলে !’
রাজা জনকের অনুজভ্রাতা কুশধ্বজ এক্ষনে বলে ওঠেন, ‘ অহোঃ, রাজা দশরথের পুত্র রাম! তাড়কা রাক্ষসীকে বধ করে যিনি মর্ত্যবাসীর অশেষ কল্যান সাধন করেছেন ! সাধু , সাধু , সাধু।’
রাজা জনক সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন দুই রাজকুমারের দিকে।- ‘ অদ্ভুত বীরত্ব! তাড়কা রাক্ষসী বধ! সাধু সাধু সাধু ।’
বিশ্বামিত্রমুনি এক্ষনে রাম এবং লক্ষণকে বললেন,‘রাম, লক্ষন, এসো, তোমাদের আমি পরিচয় করিয়ে দিই সাক্ষাৎ ধর্ম অনুরাগী, প্রজারঞ্জক মিথিলা অধিপতি স্বয়ং রাজা জনকের সাথে। অভিবাদন করো তোমরা।’
রাম লক্ষন হাত জোড় করে রাজা জনককে অভিবাদন করেন,’ আমাদের অভিবাদন গ্রহণ করুন মহারাজ।’
রাজা জনক হাস্যমুখে প্রত্যাভিবাদন করলেন দুই যুবরাজকে এবং বললেন, ‘ মহারাজা দশরথের পুত্র রাম, আমি এতদিন তোমার কথা শুনেছি। বশিস্টদেবের শিশ্য তোমরা। আজ তোমাদের দেখে পরম প্রীত হলাম।’
বিশ্বামিত্র বলেন,‘এসো রাম, এসো, এইবার আমি পরিচয় করিয়ে দিই তোমার সঙ্গে এই চন্দ্রবংশীয় চারকন্যা মিথিলার রাজকুমারীদের সাথে। জনকরাজার দুই কন্যা সীতা এবং ঊর্মিলা। এবং এই যে জনক রাজার ছোট ভাই কুশধ্বজ এর দুই কন্যা মান্ডবি এবং শ্রুতকীর্তি।‘
রাম লক্ষন অবাক হয়ে চেয়ে দেখে রাজা জনক এবং তার চার রূপসী কন্যাকে। চারজন ফুল সদৃশ কুমারী। তাঁরা বড়ই সুলক্ষনা।’
রাজা কুশধ্বজ বলে ওঠেন,‘আমাদের বংশে আমাদের দুই ভাইয়ের চারকন্যা। এঁরা ঋষি বিশ্বামিত্রের যজ্ঞ দেখতে আগ্রহী। তাই মিথিলা থেকে আমাদের আগমন।’
ঋষি বিশ্বামিত্র বলেন, ‘এবার রাম তোমরা নিজেরা না হয় নিজেদের মধ্যে আলাপ পরিচয় করে নাও ।
রাম এবং লক্ষন এবার মিথিলার রাজকুমারীদের সঙ্গে বার্তালাপ এবং প্রাথমিক পরিচয় করতে উদ্যোগী হয়। কিন্তু প্রাথমিক পরিচয়ে আড়স্টতা যথেষ্ট। কেউ কারোর দিকে সঠিক ভাবে তাকাতে পারেন না ।
সীতার কাছে রাম যেন কোন জন্মান্তরের পরিচিত বলে মনে হয়।
রাম ও ভাবেন কবে কোন বহু যুগের ওপারে কাকে যেন কথা দিয়ে এসেছিলেন আবার আমাদের দেখা হবে। এ কি সেই ?
রাম এক্ষণে সীতার দিকে তাকিয়ে থাকেন। উভয়ে উভয়ের দিকে তাকিয়ে কেমন একরকম মোহিত হয়ে ওঠেন।
সীতা ও রামকে দেখে দৃষ্টি সরাতে পারেন না। যেন কত পরিচিত। অনিন্দ্যকান্তি পদ্মপলাশ আঁখি ধনুষপানি সালংকৃত নওল কিশোর নবদূর্বাদল শ্যাম। এ রূপ তো ভোলার না। এ যেন কত জন্মের পর আবার দেখা। চোখ ফিরিয়ে নেওয়া মুশকিল। কিন্তু এই অপরূপ রূপের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকা ও বড় কঠিন।
রাম ও যেন অপলক নেত্রে তাকিয়ে দেখলেন জানকি সীতার দিকে। এ যেন জন্ম জন্মান্তরের পরিচয় ।
এবার জনক কন্যা ঊর্মিলা বলেন,’ অযোধ্যা রাজকুমার, আপনি শ্রীরাম। আমি পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি আপনার সঙ্গে আমাদের সবাইকে। ইনি আমার বড় ভগিনী সীতা। ইনি বৈদেহী, জানকি সব নামেই পরিচিত। আর আমি ঊর্মিলা এবং এই আমাদের আরো দুই সহোদরা মান্ডবি এবং শ্রুতকীর্তি।’
রাম এবার দুই হস্ত যুক্ত করে বলে ওঠেন,‘ভদ্রে,আমি রাম। অযোধ্যা নরেশ দশরথ নন্দন। আর এ আমার অনুজ লক্ষন।’
সীতা এবার সলজ্জ ভাবে রামের প্রতি জোড় হস্ত হয়ে বলেন, ‘আমি জানকি। মিথিলা নরেশের কন্যা। আমার অভিবাদন গ্রহন করুন।’
লক্ষন বলে, ‘আমরা অযোধ্যা নরেশ দাশরথি নন্দন। এই যে আমার বড় ভাই রাম ও আমি তার ছোট ভাই লক্ষন। আমাদের আরো দুই ভাই আছে। তারা হলেন ভরত এবং শত্রুঘ্ন।
শ্রুতকীর্তি কৌতুহলি হয়ে লক্ষনকে জিজ্ঞাসা করেন,’আপনাদের কোন ভগিনী ?’
লক্ষন বলে, ‘না দেবী, আমাদের কোন ভগিনী নেই। আপনাদের সান্নিধ্য পেয়ে আমরা আনন্দিত।’
মান্ডবী বলে ওঠেন, ‘ ভাই লক্ষন, আমাদের ও কোন ভাই নেই। আমরা ও চার ভগিনী। আজ আমাদের ও পরম সৌভাগ্য যে আমরা এসেছি ঋষি বিশ্বামিত্রের এই যজ্ঞ অনুষ্ঠান দেখতে।
লক্ষন বলেন, আমরা ও মুনিবর বিশ্বামিত্রের সঙ্গে এই আশ্রমে এসেছি তাঁর যজ্ঞ অনুষ্ঠান প্রতক্ষ্য করতে এবং রাক্ষস কতৃক বিঘ্ন অপনোদন করতে।’
উর্মিলা জিজ্ঞাসা করেন,‘মুনিবর, আমার ভীষণ কৌতুহল হয় জানতে রাক্ষস কারা? এই সব ভূতপ্রেত যক্ষরক্ষ গন্ধর্ব কিন্নর অসুর এরা কারা ? শুনেছি এখানে রাক্ষসগন ভীষণ উৎপাত করে যজ্ঞ নস্ট করে দেয়।
বিশ্বামিত্র বললেন, ‘কন্যা,শোনো, আমি বলি,রাক্ষস কারা! রাক্ষস হল তারা, যারা সৃষ্টির মধ্যে ঘোর অমঙ্গল। এরা যাবত অবিদ্যা। ব্রহ্মার প্রথম সৃষ্টি যত অন্ধকারতম মোহ ক্ষুধা তৃষ্ণা ভোগ ক্রোধ সংঘর্ষ। তাঁর জঘন দেশ থেকে সৃষ্ট হল যত অসুর। তারা নিষ্ঠুর, কামার্ত, ভোগী। নিজের সৃষ্টি দেখে ব্রহ্মা বিমর্ষ হলেন। তিনি ভাবলেন আমার সৃষ্টির এ কি রূপ! তিনি নিজের সৃষ্টি কে নিজেই ধিক্কার দিলেন ‘পাপীয়সী সৃষ্টি ‘ ব’লে। এঁরা সৃষ্টির বিপরীত রূপ। ইতর রূপ। বামা মূর্তি। এই বিকারের জগত থেকে জন্ম নিল যত যক্ষ রক্ষ গন্ধর্ব কিন্নর প্রেত পিশাচ। এই সব ক্ষুধার্ত সৃষ্টি তখন ভগবানকেই গ্রাস করতে চাইল। ‘
ঊর্মিলা বলে ওঠেন , ‘ অদ্ভুত !’
মুনিবর বলতে থাকেন , ‘তখন ব্রহ্মা ভীত হয়ে বললেন,‘ না, না , আমাকে ভক্ষন করোনা। রক্ষা কর, রক্ষা কর। মা মা জক্ষত রক্ষত।’
যারা জক্ষন করতে চাইল তারা হল যক্ষ, আর যারা রক্ষা করতে চাইল না তারা হল রাক্ষস।
দেখো এই যে সব অসুর রাক্ষস পিশাচ এরা নিছক অলীক কল্পনা নয়। রূপকথার গল্প ও নয়।
একজন ক্রুর এবং ক্রুদ্ধ খল চরিত্রের মানুষের এমনই পাশবিক চেহারাকে আমরা কি বলতে পারি ?
একজন কামুক নিষ্ঠুর দাম্ভিক মানুষের চেহারা কি রাক্ষসের সমান নয় ? মানবতাহীন মনুষ্যের অমানুষিক চেহারাতেই এমনি সব অসুর বা রাক্ষসের ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। তবে এই সব যে রাক্ষস কিংবা অসুর এরা সব দেবযোনি। জন্মের পরিচয়ের চেয়ে এদের স্বভাবের পরিচয়ই বড় কথা।
মান্ডবী বললেন, ‘মুনিবর, কিন্তু রাক্ষসেরা মুনি ঋষিগনের যজ্ঞের বিঘ্ন করে যজ্ঞ নষ্ট করতে চায় কেন? যজ্ঞের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কি ?
বিশ্বমিত্র বলেন, আসলে ওই যে গগন সদৃশ অরণ্য এই যে মেঘ সদৃশ্য বন, এখানে ওরা মানুষকে থাকতে দিতে চায় না। ওরা চায় না এই অরন্যে মানুষ তার অধিকার বিস্তার করুক। ওরা তাই যজ্ঞ ভঙ্গ করতে মানুষকে আক্রমণ করে। মানুষের সাথেই ওদের যত হিংস্রতা। ওরা সমগ্র বনভূমি অধিকার করে রাখতে চায়। ওরা লংকার রাজা রাবনের অনুচর। রাবন চায় না কোন ঋষি মুনি যজ্ঞ করুক। মনুষ্যগন যজ্ঞ করে দেব অনুগ্রহ লাভ করুক এবং সুচারু রূপে জীবন যাত্রা নির্বাহ করুক তারা তা চায়না। রাক্ষসগন ক্রূর প্রকৃতির। ওরা মানুষকে জঙ্গল অধিকার করতে বাধা দেয়। প্রকৃতির মাঝে মানুষের সংস্কৃতিকে ওরা তাই বিজাতীয় ক্রোধে আক্রমণ করে।
বিশ্বামিত্র কিঞ্চিৎ জলপান করে নিয়ে বলে উঠলেন, ‘ওই যে দেখছো ওই দিগন্ত বিস্তৃত ভয়াল অন্ধকার অরন্য , ওখানে দিনের আলো প্রবেশ করে না। চারিদিকে থম থম করছে বিভীষিকা। পাতায় পাতায় ওদের পায়ের খস খস শব্দ। বাতাসে ওদের বিষাক্ত নিশ্বাস। শাখায় প্রশাখায় ওদের গমনাগমনের আতংক। পৃথিবীর বুকে ওরা জ্বলন্ত অমঙ্গল, জীবন্ত আতংক।
আশ্রমে উপস্থিত সকলে প্রায় বসে বসে রুদ্ধশ্বাসে শুনে চলেছে ঋষিবরের জীবন্ত বর্ণনা। বিশ্বামিত্র মুনির আশ্রম এমন গহীন জঙ্গল প্রদেশে। এখানে কাছে দূরে যত লোকালয় সেখানে রাক্ষসের উপদ্রব ভীষণ। অহরহ তারা আক্রমন করে বসে। বিশ্বামিত্র মুনির কাছে তাঁরা , এই স্থানের জনজাতি অধিবাসীরা, এই উৎপাতের থেকে মুক্তি চেয়ে আবেদন করেছে। বিশ্বামিত্র এবার তাই বদ্ধ পরিকর এই অঞ্চলকে রাক্ষস মুক্ত করতে।’
বিশ্বামিত্র বলেন, ‘ আমার এই আশ্রমে তাড়কা রাক্ষসীর পুত্র মারীচ এবং সেই সঙ্গে সুবাহু নামে দুই ভাই, দুই ঘোর রাক্ষস, এখানে এসে অত্যাচার করে। মারীচ তাড়কা রাক্ষসীর পুত্র। এঁরা রাক্ষসরাজ রাবনের অনুচর।
কুশধ্বজ বলেন, ‘ মহারাজ , রাক্ষসরাজ রাবণ একজন বেদজ্ঞ বলে শুনেছি।’
বিশ্বামিত্র বললেন, ‘হ্যাঁ, সে কথা সত্য। তবু তিনি একজন রাক্ষস। প্রতাপান্বিত মহা হুতাশন। পাপে পুন্যে মেশা সে এক বিষ এবং অমৃত মিশ্রিত কুম্ভ। তার চরিত্রে যদি উৎকট পাপ প্রবল না হয়ে উঠত তা হলে সে ইন্দ্রের মত স্বর্গের দেবতাদের রাজা হয়ে উঠতে পারত। রাবন ঘোর তপস্যা করে একে একে তার নয়টি মাথা কেটে শিবের চরনে আহুতি দেয়।’
সকলে চমৎকৃত হয়ে ওঠেন । সকলে বলে ওঠেন ,’ অদ্ভুত !’
আর তাই দেবাদিদেব শঙ্কর তাঁর পরম ভক্ত রাবণকে তখন অদ্বিতীয় শক্তিধর হ’তে বর দেন। – বিশ্বামিত্র বললেন।
কুশধ্বজ বলেন , কিন্তু মুনিবর রাবন এমন বেদজ্ঞ। আশ্চরজ্য তাঁর তেজ । তাঁর বীরত্ব শ্রুতি মেধা তপস্যা সত্ত্বে ও তিনি স্বয়ং দশানন এত নীচ হীন পাপাশয় হয়ে উঠলেন কেমন করে ? এত গুন ও মহিমার মধ্যে এমন অদ্ভুত বিকার ও বিকৃতি কি স্বাভাবিক ?
বিশ্বামিত্র বলেন, ‘আসলে রাবনের সকল গুন ও ধর্ম তাঁর জন্মগত আসুরিক স্বভাবদোষে এমন বিপরীত ও উৎকট হয়ে উঠেছে।‘
রাজা কুশধ্বজ বলেন, ‘ যথার্থ , ইহাই সংবাদ।’
| ৯ |
যজ্ঞ ভাবনা
রাজা জনক এক্ষনে বিশ্বামিত্রদেবকে জিজ্ঞাসেন, ‘ মুনিবর , আপনার এই জীবনকে নিয়ে এই যে যজ্ঞ ভাবনা এবং তাদৃশ ভাবনা যদি আপনি আমাদের বলেন,যে, ইহা ঠিক কি উদ্দেশ্যে ! আমি এবং আমরা সকলে এ বিষয়ে স্বতঃই জানতে আগ্রহী।
বিশ্বামিত্র বলেন, ‘রাজা জনক, উত্তম জিজ্ঞাসা আপনার। এই যজ্ঞের উদ্দেশ্য – অসুর বিজয় , অবিদ্যানাশ। অমৃতত্ত্ব লাভ। এই বিদ্যা আঙ্গিরস ঘোর দেবকী পুত্র কৃষ্ণকে দিয়াছিলেন। কৃষ্ণ অপিপাস হইয়াছিলেন ।
রাজা জনক বলেন, ‘সাধু সাধু । আমরা আপনার যজ্ঞের সেবায় নিরত হ’ব ।
ঋষি বিশ্বামিত্র এবার বলে ওঠেন, ‘ রাজা জনক আমি আপনাকে এবং আপনার কন্যা সীতাকে এখানে আসতে আমন্ত্রন করেছিলাম, কারন এই যজ্ঞ দেখতে যারা আসবেন তাদের অন্নসেবা এবং তৃষ্ণামোচনের ভার আমি মা সীতার হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চেয়েছিলাম।’
জনক বলেন, ‘ আমার কন্যারা রাজকুমারী হয়ে ও তাহারা রন্ধন পটিয়সী। তাঁরা তাদের জননী সুনয়নার সঙ্গে রন্ধনকার্য্যে ও ব্যাপৃত থাকে। আমি আপনার অনুরোধে তাই সীতা মা এবং আমাদের চারকন্যাকে নিয়ে এখানে এসেছি আপনার যজ্ঞকালীন সব মহাত্মাদের ক্ষুন্নিবৃত্তি নির্বাহে এবং আগত অতিথিদের খাদ্যের সংস্থান অক্ষুন্ন রাখতে !‘
মুনিবর বলে ওঠেন , ‘ আমি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি আপনাদের আগমনে রাজন।’
সীতা বলেন, ‘ মুনিবর, আমার পিতাশ্রী রাজা জনক যখন মিথিলায় যজ্ঞ করেন, তখন মিথিলায় অনেক মুনিঋষি সাধু মহাত্মাগণ এসে জমায়েত হয়েছিলেন সেই ধর্মসভায়। সমবেত মহাত্মাগণ বেদবেদান্ত নিয়ে আলোচনা এবং বার্তালাপ করতে ব্যস্ত ছিলেন। আমাদের রাজমাতা সুনিপুন হাতে তাহাদের সকলের জন্য সকল রকমের ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারনের সম্পূর্ণ ব্যবস্থা করেছিলেন। আমাকে আমার মাতা সুনয়না শিখিয়েছিলেন কত রকম শস্য, কত রকম ফল, কত রকম তরি তরকারী, কত রকম মশলা আর তাদের কুশল ব্যবহার ইত্যাদি।’
রাজা জনক বললেন,‘ মুনিবর,আমি এ জন্য আমার ধর্মসভা নিয়ে খুবই নিশ্চিন্ত ছিলাম এবং তা সুচারুরূপেই সম্পন্ন হ’তে পেরেছিল।’
এবার ঊর্মিলা বলে ওঠে, ‘ তখন, সেই সময়, আর যাই হোক আমাদের মাতাকে দেখেছিলাম তিনি সেই সব মানুষদের জন্য উৎকৃষ্ট খাদ্যাদি এবং পানীয় সম্ভারের সম্পূর্ণ আয়োজন করে রেখেছিলেন যাহাতে তাঁরা, সাধুমহাত্মাগন কেহই কোনভাবেই অভুক্ত না থেকে যান খাদ্যবিহনে অথবা তৃষ্ণার্ত না থাকেন জল বিহনে।- এবং তাদের শ্রান্তি অপোনোদনের জন্য শীতল ছায়ার ও বন্দোবস্ত করেছিলেন।’
কুশধ্বজ বলেন, ‘ মুনিবর, আমার অগ্রজ মিথিলারাজ রাজা জনক, তাঁর যজ্ঞ সমাপনান্তে আগত সকল মুনি ঋষিগনকে সহস্র সহস্র ধেনু প্রদান করেছিলেন। সেই ধেনু হতে প্রাপ্ত দুগ্ধ সকলের সম্বতসরের খাদ্য এবং পুস্টি জোগায়। সেই গরুর গোবর হতে সম্বৎসরের জ্বালানী প্রস্তুত হয়। সে এক মহান দান !’
মুনিবর বিশ্বামিত্র বলেন , ‘সাধু সাধু ।’
রাজা জনক বলেন, ‘ মহাত্মাগণ আমাকে ব্রহ্মজ্ঞান দিয়েছিলেন। আমি তৎপরিবর্তে তাহাদিগকে ধেনুদান করে তাহাদের সম্বৎসরের প্রয়োজন সাধন করলাম। ধেনু গৃহস্তের কল্যানের জন্য।’
মুনি বিশ্বামিত্র বললেন, ‘ সাধু সাধু ।‘
রাজা কুশধ্বজ বলেন, ‘ঋষিবর যাজ্ঞবল্ক্যকে আমার অগ্রজ, রাজা জনক যে গাভী প্রদান করেছিলেন তা তিনি তাঁর দুই স্ত্রী কাত্যায়নী এবং মৈত্রেয়ীর সামনে রাখলেন। বেদজ্ঞ মৈত্রেয়ী তা নিতে অস্বীকার করলেন। কারন তিনি সংসার ধর্ম অপেক্ষা ব্রহ্মবিদ্যা সাধনে ব্রতী থাকতে চেয়েছিলেন।’
বিশ্বামিত্র বললেন, ‘ যথার্থ !’
রাজা কুশধ্বজ বলতে থাকেন, ‘ তবে তাঁর অন্য স্ত্রী কাত্যায়নী, সেই গাভীদের সাদরে স্বীকার করলেন। তাঁর মতে জ্ঞানী কি অজ্ঞানী সকলেই ক্ষুৎপিপাসাতুর হয়। পেটের ক্ষুধা দূর না হলে জ্ঞানের লিপ্সা মিটতে পারে না। আর যাই হোক, খালি পেটে কখনো ধর্ম সম্ভবে না।’
বিশ্বামিত্র বলেন, ‘ঠিক ঠিক ঠিক। অন্নময় প্রাণ।’
রাজা জনক বললেন,‘ মহাত্মন,জ্ঞান জ্ঞানীর খাদ্য। কিন্তু অন্ন তো সে জীবের খাদ্য। খাদ্য বিনা প্রাণধারন সম্পূর্ণ অসম্ভব। যদি ও আমি রন্ধনশালা বা রন্ধনকর্ম সম্বন্ধে কোন রকম অনুসন্ধিৎসুই নই। তেমনই আমার স্ত্রী সুনয়না আমাদের এই জ্ঞান বর্ধনকারী সভা সম্বন্ধে সত্য সত্যই কোনভাবেই উৎসুক নন। কিন্তু আমার সীতা’মা এই দুই ক্ষেত্র সম্বন্ধে সমান রকমেই উৎসুক ।
ঋষি বিশ্বামিত্র উৎসাহজনক সুরে বলে ওঠেন, ‘ অহো এ যে অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয় রাজন। আসলে এই জীবন এক যজ্ঞ। সব প্রচেষ্টা যেমন কাষ্ঠ হাতায় ঘৃতাহুতি। জ্বলন্ত অগ্নি কর্মের সাফল্য।’
সীতা বলে ওঠেন, ‘মাতা সুনয়না বলেন, রন্ধনশালা হল জীবের যজ্ঞশালা। রন্ধনশালার অগ্নিতে খাদ্য প্রস্তুত হয়। সেই খাদ্য মানবদেহকে পুষ্ট করে। শরীরস্বাস্থ্য সমৃদ্ধ করে। মনের বিকাশ ঘটায়। বোধকে উজ্জীবিত করে। মানব মনকে জ্ঞান আহরনে প্রস্তুত করে।’
বিশ্বামিত্র বলেন,‘সাধু সাধু। আমি সেই কারনেই তোমার শরণ নিয়েছি মিথিলা রাজকুমারী জানকী। তুমি আমার এই যজ্ঞকালে সকলের ক্ষুন্নিবৃত্তির সুচারু ব্যবস্থা করবে বলেই আমি নিশ্চিন্ত হয়ে আছি।’
সীতা বলেন, ‘ আপনি নিশ্চিত থাকুন মহাত্মন। আমরা চার সহোদরা মিলে এখানে এই কয়দিন আপনার যজ্ঞকালে যত জন নিমন্ত্রিত হবেন তাদের ক্ষুন্নিবৃত্তির সব ব্যবস্থাই সম্পন্ন করব।’
বিশ্বামিত্র একজন শিষ্যকে ডেকে বললেন,‘ সোমদত্ত আশেপাশে গ্রাম হতে কি কি দ্রব্য এসেছে যজ্ঞের কারনে আশ্রমে ? ‘
সোমদত্ত বলে ওঠেন,‘ গুরুদেব, তারা শস্য আদি এবং অনেক প্রকার সব্জী ও তরকারী এবং তারা রন্ধনের জন্য যাবতীয় মসলা সব এনে দিয়ে গেছে। সে সব বস্তু ভাঁড়ার ঘরেই সঞ্চিত করে রাখা আছে আপনার আদেশমত।’
বিশ্বামিত্র আবার জিজ্ঞাসা করেন,‘ বেশ বেশ ! আর সিদ্ধাশ্রম এ আগত যজ্ঞের সকল অতিথিদের জন্য কেমন খাদ্যাবলী প্রস্তুত রাখবে বৎস ?
সোমদত্ত বলে, ‘গুরুদেব, আপনি যথা উপদেশ করেছিলেন! অতিথিদের জন্য থাকবে ইক্ষু, মধু, লাজ (খই মুড়ি), এবং উৎকৃষ্ট মদ্য,ও মহার্ঘ পানীয়। এবং বহুপ্রকার ভক্ষ্য। এবং পর্বত প্রমাণ উষ্ণ অন্নরাশি, তৎসহ স্বাদিস্ট ব্যঞ্জনাদি এবং মাংস আদি এবং পায়াসন্ন। তদুপরি থাকবে দধি কুল্যা এবং খান্ডব (মিছরি অথবা খাঁর গুড়)।
মুনিবর সোমদত্তের কথা শুনে খুশী হলেন এবং বললেন, ‘উত্তম । আচ্ছা , শোনো সোমদত্ত ! তুমি জানো রাজনন্দিনী সীতা এসেছেন এবং তাঁর অন্য ভগিনীরা, তাঁরা সকলে এই যজ্ঞের সকল আমন্ত্রিতদের রন্ধন ইত্যাদি সর্বথা দেখবেন। তোমরা সকলে তার সুবন্দোবস্ত করে রেখো।’
সোমদত্ত বললেন, ‘ যথা আজ্ঞা গুরুদেব।’
সন্ধ্যা সমাগত। সকলে সান্ধ্য উপাসনায় মগ্ন হয়ে পড়েন। ধুপদীপ ধুনায় এবং শঙ্খধ্বনিতে সন্ধ্যা ঘোষিত হ’ল ।
ঋষিবর বিশ্বামিত্র স্তোত্র উচ্চারণ করেন,
নমি সচ্চিদানন্দ পরব্রহ্ম সনাতনে
বিশ্বের কারণ যিনি সেই সত্য স্মরণে
স্বর্গে মর্ত্যে আকাশে যেই বিভূ দীপ্তিমান
অন্তরে বাহিরে যেবা আছে চির বিদ্যমান
চৈতন্য স্বরূপ যিনি ভজি সেই সর্বাত্মনে
অসতো মা সদগময়
তমসো মা জ্যোতিরগময়
মৃত্যুরমহ মৃতঙ্গময়।।
আমরা অসত্যে জড়িয়ে আছি। তোমার সঙ্গে মিলনে আমরা সত্য হব।
তোমার সঙ্গে সত্যে মিলন হবে। জ্ঞানে মিলন হবে।
মৃত্যুর পথ মাড়িয়ে অমৃতলোকে মিলন হবে। – [ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ]
এইবার মুনিবর যজ্ঞধুনীর সামনে বসে গেয়ে ওঠেন ,
‘ওং পূর্ণমদ পূর্ণ মিদং পূর্ণাৎ পূর্ণ মুদচ্যতে ।
পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাব শিশ্যতে।’
সকল ব্রহ্মচারী আশ্রমবাসীগন এক কন্ঠে গেয়ে ওঠেন ,
উহা পূর্ণ ইহা পূর্ণ। পূর্ণ হইতে পূর্ণ উদ্গত হয়।
পূর্ণের পূর্ণকে লইয়া গেলে পূর্ণই অবশিষ্ট থাকে ।
পরব্রহ্ম পূর্ণ, এই জগত পূর্ণ। পরব্রহ্ম হইতে এই জগত পরিব্যক্ত হইয়াছে ।
পূর্ণ হইতে পূর্ণ লইয়া যাহা থাকে তাহা ও পূর্ণই। – ‘ওং তৎসৎ ‘ ওং তৎসৎ ওং তৎসৎ ।
সান্ধ্য প্রার্থনা শেষ হল। আশ্রমবাসি সেবকগন এইবার সবার জন্য সুখাদ্য ও সুন্দর পানীয় পরিবেশন করলেন। এখন সন্ধ্যা উত্তীর্ণ রাত্রি প্রথম ভাগ।
সকলে মিষ্টি শরবৎ পান করে দগ্ধ দিনের শ্রান্তি অপনোদন করেন। অন্যদিকে পাকশালার জ্বলন্ত চুলায় অতিথিবর্গের খাদ্য প্রস্তুতের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে এখন ভীষণ ব্যস্ততা।
কিন্তু এ কি ! বাতাসে যেন কেমন এক দুর্গন্ধ ভেসে আসছে। জঙ্গলের ঘনান্ধকারে যেন এক হিংস্র গোঙ্গানীর ক্রুর ধ্বনি শ্রবনে এসে ধাক্কা মারল ! সারমেয়গুলি চীৎকার করে ধেয়ে গেলো ওই অন্ধকারের দিকে। তবে কি মারীচের অনুচরেরা ?
বিশ্বামিত্র বলেন, ‘বৎস রাম, ওই যে ওরা এসেছে। ওরা অমঙ্গলের দূত। ওরা সুযোগের অপেক্ষায় আছে। ওরা একমাত্র আগুনকেই ভয় করে। ওরা তাই থমকে দাঁড়িয়ে আছে। লক্ষন তুমি যাও উত্তর পশ্চিম কোনে। সেখান থেকে রাক্ষসদলকে আক্রমন করো। আর রাম তুমি দক্ষিন পূর্ব দিক হতে ওদের প্রহার কর।‘
রাম এবার লক্ষনকে বলেন, লক্ষন অগ্নিধূম নিক্ষেপ করে ওদের বিব্রত করে দাও।
সংকেত মাত্র লক্ষন হাউই বাজির মতো আকাশ আলো করা এক এক বাণ মুহুর মুহুর নিক্ষেপ করে। সেই বাণ জ্যা হতে নির্গত হয়ে চতুর্দিকে ঘিরে আসা রক্ষকুলকে আতংকিত করে তোলে তাঁর অগ্নি ও সবেগে নির্গত ধূমে। রাক্ষসেরা তাদের মুখ বিবর হতে থুৎকার করে সেই অগ্নি নির্বাপিত করার চেষ্টা করে ।
রাম এবার মুদ্গর বানে রাক্ষস দলকে প্রচন্ড প্রহার করতে থাকে।
লক্ষণ কঙ্কট বাণে রাক্ষসদলে তীক্ষ্ণ আঁচড় দিয়ে অস্থির করে তোলে।
রামচন্দ্র এবার বায়ব্যবাণে রাক্ষসকুলকে প্রচণ্ডভাবে ধরাশায়ী করে রাক্ষস যূথ মধ্যে একটা আতংক সৃষ্টি করেন। রাক্ষসদল এবার সকলে রনে ভঙ্গ দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে পলায়ন করে। তবে হুংকার দিয়ে যায় তারা আবার আসবে বলে। কর্ণবিদারী সেই হুংকার একটা ভয় জিইয়ে রাখে সকলের মধ্যে।
মুনি বিশ্বামিত্র রাম লক্ষণকে বলে ওঠেন, ‘সাধু সাধু সাধু। রাম, লক্ষন, আমি চমৎকৃত তোমাদের দুই ভাইয়ের অদ্ভুত বীরত্বে। মারীচের অনুচরেরা ভীষণ প্রহারে ভয় পেয়ে এবে রনে ভঙ্গ দিয়ে পলায়ন করেছে। এখন আর ভয় নেই ।

রাক্ষসগণ এখানে এভাবেই উপদ্রব করে। এখন ওঁরা আর কয়েকদিন এইদিকে আসবে না। ‘
মুনিবর এইবার তাঁর কমন্ডলু হতে শান্তিবারি ছিটাতে ছিটাতে বলতে থাকেন, ‘ওং স্বস্তি ‘ , ‘ওং স্বস্তি ‘ , ‘ওং স্বস্তি।’
মুহূর্তকাল বিশ্রাম করে রাম-লক্ষণ বিশ্বামিত্রকে বললেন,‘ গুরুদেব আপনি আজই যজ্ঞের দীক্ষা নিন, আপনার সংকল্প সিদ্ধ এবং এই সিদ্ধাশ্রমের নাম সার্থক হয়। এই কথা শুনে মুনি বিশ্বামিত্র বললেন, ‘ যথার্থ ‘ এবং তিনি যজ্ঞে দীক্ষিত হতে সংকল্প নিলেন ।

