৪ : জিজীবিষা

৪ : জিজীবিষা

This entry is part 4 of 17 in the series জিজীবিষা

জিজীবিষা

১ : জিজীবিষা

২ : জিজীবিষা

৩ : জিজীবিষা

৪ : জিজীবিষা

৫ : জিজীবিষা

৬ : জিজীবিষা

৭ : জিজীবিষা

৮ : জিজীবিষা

৯ : জিজীবিষা

১০ : জিজীবিষা  

১১ : জিজীবিষা

১২ : জিজীবিষা

১৩ : জিজীবিষা

১৪ : জিজীবিষা

১৫ : জিজীবিষা

১৬ : জিজীবিষা

১৭ : জিজীবিষা

সুরঞ্জিত সরকার

৪র্থ পর্ব

শ্যামপুকুর থানা থেকে কৈপুকুর গ্রামের দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার । কৈপুকুর গ্রাম হলেও জনসংখ্যার বিচারে মফস্বল শহরের সমতুল। 

দুই ভাই ফিরতি টোটোতে অবশেষে কৈপুকুরের বাড়িতে পৌঁছাল। পথে যেতে যেতে কল্যাণ বিড়বিড় করতে লাগল, ” আজ আমার প্রোজেক্টের বারোটা বেজে গেল। দেখি ইন্টারনেটের স্পীড কেমন পাওয়া যায়। তবে যাই বলিস আমার কিন্তু ধোঁয়াশা কাটল না।”

__” কাল তো রবিবার ছুটি আছে। সকালের দিকে একবার যাওয়া যেতেই পারে। কি বলো?” বাড়িতে কলিং বেলের সুইচটা টিপে সুমন্ত দাদার দিকে উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।

বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে  খুব একটা এই বাড়িতে আসে না। সুমন্ত আসলে এখানে এলেই পুরানো দিনের কথা ভেবে সে স্মৃতিবেদনাতুর হয়ে পড়ে। 

বেশ কিছুক্ষণ পড়ে সুমন্তর মা ও তার ছোট বোন তিতলি এসে দরজা খুলল।  অনেকদিন পরে দুজনকে একসঙ্গে  দেখে সুমন্তর মা পূর্ণা খুশি হয়ে বললেন, অনেক রাত করে এলি যে তোরা ! তবে একসাথে এসে খুব ভাল করেছিস। দেরী না করে উপরে গিয়ে তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে এসে খেয়ে নে। 

সিড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে দাদুর ঘরের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করল,  “দাদু কেমন আছে মা? জেগে আছে নাকি”?  

প্রশ্নদুটো শুনে সুমন্তর দিকে সামান্য তীর্যক তাকিয়ে বিরক্তির সুরে পূর্ণা বললেন , “আমি তো ওনার ঘরে ঢুকি না। তিতলিই দেখাশোনা করে । উনি আবার ভাল থাকবেন না ! খাচ্ছেন  দাচ্ছেন তো দিব্যি।”

কিছু একটা অসন্তোষের আঁচ পেয়ে সুমন্ত আর কথা বাড়ায় না। 

হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে সুমন্ত আর কল্যাণ যখন নিচে ডাইনিং টেবিলে এল, তখন থমথমে একটা নীরবতা সারা ঘরে বিরাজ করছিল । তাদের চোখেমুখে এখনো আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। সুমন্তর মা খাবার বেড়ে দিচ্ছিলেন, তাঁর চোখেমুখেও যেন একটা চাপা বিরক্তি ও অস্বস্তি। দুই ধরনের অনুভবের বাতাবরণে পরিবেশটা নীরব ও অসহনীয় হয়ে উঠছিল।  

 একটু পরে নীরবতা ভেঙে থালায় হাত দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে কল্যাণ বলল, মামী, আমরা ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করি না তুমি জানো। কিন্তু দিদার বাড়িতে আজ যা হলো … মানে আমরা কোনক্রমে প্রাণ নিয়ে যেন বেরিয়ে আসতে পারলাম। অদ্ভুত সব আওয়াজ! নানারকম অস্বাভাবিক ঘটনা, মনে হচ্ছিল। কেউ যেন অনবরত আমাদের ওপর নজর রাখছে।

একটু থমকে গিয়ে কঠোর গলায় পূর্ণা বললেন, এই জন্যই তোদের আমি বারণ করেছিলাম না ওই অভিশপ্ত বাড়িতে না যেতে ? তাঁর ওপর আজই  ছিল ওনার মৃত্যুর  দিন। পাঁচ বছর হয়ে গেল মা মারা গেছেন, কিন্তু ওই বাড়ির ইটগুলো পর্যন্ত যেন বিষিয়ে আছে। তোরা আমার কথা বিশ্বাস না করলে আমি কী করব!

পাশ থেকে সুমন্ত বলে উঠল,  কিন্তু মা, দাদুর ওপর তুমি এতটা বিরক্ত কেন ? তিতলিকে দিয়ে খাবার পাঠানো, নিজে ঘরে না যাওয়া— এসব কি খুব স্বাভাবিক দেখায় ? দাদু তো ঠাকুমার মৃত্যুর পর থেকেই কেমন যেন একা হয়ে গেছেন। তার উপর নিজের ছেলের মারা যাওয়ার ব্যাপারটা মুখে কিছু না বললেও মনের দিক থেকে একেবারে ভেঙে পড়েছেন।  আমরা নাতিরাও কেউ সেরকমভাবে সময় দিতে পারি না। যে কটা দিন আছে দেখো যেন কষ্ট না পায়। 

পূর্ণা ছেলের উপর উত্তেজিত হয়ে বললেন, তোরা তো সব জানিস না! তোর দাদু কি স্বাভাবিক মানুষ? বুড়ো নিজে টিকে থেকে এক এক করে সবাইকে খাচ্ছে। মাঝে মাঝে এমন করবে যেন এখুনি প্রাণ ত্যাগ করবে! আসলে বয়স হলে জিজীবিষার টান যেন আরো প্রকট হয়ে উঠেছে। ওই যে চব্বিশ ঘণ্টা দরজা বন্ধ করে বসে থাকেন, কী করেন উনি? মা মারা যাওয়ার আগে ঐ বাড়ির কাগজ নিয়ে দাদুর সাথে কত বড় অশান্তি হয়েছিল মনে নেই? তোর বাবা বেঁচে থাকলে কোন ব্যাপার ছিল না। আমার বাড়িতে যথেষ্ট যত্নেই আছে। ভালো না লাগলে কুমারগঞ্জে মেয়ের বাড়িতে গিয়ে থাকুক না ! আমিও একটু ঝাড়া হাত পা হই। ওনার জ্বালায় তো কোথাও বেরোবার জো নেই। বুঝলি কল্যাণ মা কে বলিস একবার এসে কদিনের জন্য নিয়ে যেতে।

—-“আর বলো না মামী , সেবারে তো মাস তিনেক কুমারগঞ্জে গিয়ে ছিলো। কোথাও গিয়ে ওনার শান্তি নেই। ঘরের মধ্যে হেগে মুতে ছেড়িয়ে একাকার অবস্থা করেছিল। কি যেন একটা অস্থিরতায় ভোগে সবসময়!”

তবে আমি আজ আসার সময় দাদুর ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় একটা বিচিত্র গন্ধ পেলাম। ঠিক যেন পুরনো চন্দন আর পচা ফুলের মিশ্রণ।” মামীর দিকে তাকিয়ে কল্যাণ জিজ্ঞেস করল।

তিতলি পাশ থেকে ফোড়ন কেটে বলল,  দাদুকে নিয়ে আর বলো না দাদা। কাল রাতে আমি যখন জল দিতে গিয়েছিলাম, দেখলাম উনি অন্ধকারের মধ্যে কার সাথে যেন কথা বলছেন। অথচ ঘরে কেউ নেই!

ঠিক এই সময় নীচতলা থেকে একটা বিকট শব্দ হলো। যেন ভারী কোনো আসবাবপত্র টেনে মেঝেতে আছাড় মারা হয়েছে। সবাই চমকে উঠল। শব্দটা আসছে সুমন্তর  দাদু অতীশ সরকারের ঘরের দিক থেকেই। সম্পর্কে তিনি কল্যাণের মাতামহ , মায়ের বাবা। 

সুমন্ত প্রশ্ন করল, ‘কিসের শব্দ মা? দাদু কি ঠিক আছে তো ?’

স্থির চোখে পূর্ণা বললেন, ওটা রোজকার ব্যাপার। উনি বোধহয় আজও সেই আলমারিটা খুঁজছেন যেটা কেউ কোনোদিন খুঁজে পায়নি। শোন সুমন্ত, কাল তোরা বলছিলি সকালে আবার ওই বাড়িতে যাবি? আমার মনে হয় তোদের যাওয়া উচিত। কিন্তু ঠাকুমার ঘরের ওই নীল ডায়েরিটা যদি পাাস, তবেই যাবি। নইলে শুধু শুধু ভয় পেতে যাস না।

সুমন্ত বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল, “নীল ডায়েরি? কই আগে তো কখনও বলোনি মা?”

“বলা নিষেধ ছিল। তোর ঠাকুমা বলেছিল, “বৌমা,যেদিন নাতিরা নিজেদের চোখে অস্বাভাবিক কিছু দেখবে, সেদিন ওদের এই ডায়েরির কথা বোলো।” 

তারপর গলারস্বরে একটু তিতকুটে স্বাদ যোগ করে বললেন ,”নীল ডায়েরিটার চাবি তোর দাদুর গলার মালায় ঝোলানো থাকে। পারলে সেটা উদ্ধার কর।”

কল্যাণ ফিসফিস করে সুমন্তর কানের কাছে  বলল, ‘দেখলি তো ? ডায়েরি, চাবি, রহস্যময় দাদু— প্রোজেক্টের চেয়েও বড় রহস্য এবার আমাদের সামনে। কাল সকালে যাওয়ার আগে দাদুর সাথে একবার ভালো করে কথা বলতে হবে।

খাওয়া দাওয়া শেষে দুই ভাই উপরের তলায় শোয়ার ঘরে ঢুকল। ঘরের মৃদু আলোয় সুমন্ত জানলার পাশে দাঁড়াল। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক জমাট অন্ধকারকে ভিন্ন মাত্রায় উপস্থিত করছে মনে হচ্ছে । কল্যাণ এর মধ্যেই বিছানায় তার ল্যাপটপ খুলে রেখে কপালে হাত দিয়ে বসে বসে কিছু ভাবছে। দুজনের চোখেমুখেই অস্থিরতার ছাপ স্পষ্ট। 

সুমন্ত দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে কল্যাণকে বলল, ‘ঘড়িতে রাত বারোটা। ঠিক বারো ঘন্টা আগে এই সময় আমরা পূরবী ভবনের নীচে সেই চাতালে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে রে। সেই অদ্ভুত ঘটনাগুলো… সব কি সত্যি ছিল?’

গম্ভীর স্বরে কল্যাণ বলতে লাগল,  ‘সত্যি না হয়ে উপায় নেই রে! সবচেয়ে বড় রহস্য তো মোবাইলটা নিয়ে। আমি স্পষ্ট মনে করতে পারছি, ওটা আমি ঘরের টেবিলে দিদার ছবির উপরেই রেখেছিলাম। কিন্তু ওটা অবিনাশ টোটোওয়ালার কাছে এল কী করে? আর আশ্চর্যজনকভাবে দিদার ছবিটা নীচের চাতালে কিভাবে গেল?”

“—–এটাই তো সবথেকে ভয়ের কথা! তাহলে কি ওই বাড়ির অশরীরী কিছু আমাদের পিছু পিছু এই বাড়িতেও চলে এল? আর ফোনটা চেক করে দেখলে? কোনো নতুন মেসেজ বা ছবি?”

কল্যাণ ফোনটা ঘাটাঘাটি করতে করতে গ্যালারিতে একটা ঝাপসা ছবি খুঁজে পেল।  সুমন্তকে দেখিয়ে বলল, ‘আমরা যখন পূরবী ভবনের সিঁড়ি দিয়ে হুড়োতাড়া করে নামছিলাম, কেউ একজন পেছন থেকে আমাদের ছবি তুলেছে। কিন্তু ওখানে আমরা দুজন ছাড়া আর  তো কেউ ছিল না!’

সুমন্ত উত্তেজিত হয়ে বলল, “তার মানে মা ঠিকই বলেছে। ওই বাড়িতে এমন কিছু আছে যা আমাদের সাধারণ বুদ্ধির বাইরে। আর ওই নীল ডায়েরির রহস্য? আমার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছে— ‘জিজীবিষা’। দাদুর বেঁচে থাকার এই প্রবল ইচ্ছে কি অন্য কারোর অস্তিত্বকে মুছে দিচ্ছে? মা বলল দাদু নাকি এক এক করে সবাইকে খেয়ে ফেলছেন। কথাটা কি রূপক, নাকি এর পেছনে কোনো ভয়াবহ তান্ত্রিক বা অলৌকিক কারণ আছে?”

“যাই হোক না কেন, কাল সকালে আমাদের আবার যেতেই হবে। ওই নীল ডায়েরি আর চাবি— এই দুটোই এখন আমাদের লক্ষ্য। কিন্তু সুমন্ত, সাবধানে থাকতে হবে। ফোনটা যেভাবে ফিরে এসেছে, তাতে মনে হচ্ছে কেউ আমাদের ওপর নজর রাখছে। আমাদের প্রতিটা পদক্ষেপ কেউ আগে থেকেই জানে।”

জানলা বন্ধ করতে করতে সুমন্ত ঘাড় নাড়াল। “ঠিক বলেছো দাদা। কাল সকালে দাদুর গলার মালা থেকে চাবিটা পাওয়ার একটা সুযোগ খুঁজতে হবে। রহস্যটা শুধু ওই নীল ডায়েরিতেই বন্দি। রাত বাড়ছে, চল একটু ঘুমিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি, যদিও জানি আজ চোখে ঘুম আসবে না।”

“ঘুম আসবে না রে। মনে হচ্ছে অন্ধকারের ওপার থেকে কেউ আমাদের ডাকছে। ‘পূরবী ভবন’ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”

সুমন্ত শুয়ে পড়েছিল। কল্যাণ তখনও ল্যাপটপে অফিসের প্রোজেক্টের কাজ করছিল ,কাজ শেষ করে আলো নিভিয়ে কখন সে ঘুমিয়ে পড়েছিল তা সুমন্ত টের পায়নি। 

এই ঘরটায় নাইটল্যাম্প নেই। আলো নেভানোর পরে ঘুটঘুটে অন্ধকারে শুধু দুজনের প্রশ্বাস – নিশ্বাসের ওঠাপড়ার শব্দ শোনা যেতে লাগল।

পরদিন সকালবেলা সুমন্ত ও কল্যাণ তৈরি হয়ে নিচে নেমে সোফায় গিয়ে বসল। মা পূর্ণা চা ও টিফিন তৈরি করছিলেন। দুই ভাইয়ের চোখ-মুখে ঘুমের তেমন ছাপ নেই ।

চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে পূর্ণা জিজ্ঞেস করল, “তোদের মুখ-চোখ এমন বসা কেন রে? রাতে ঘুম হয়নি বুঝি? ওই বাড়ির আতঙ্ক কি এখন এই বাড়িতেও তোদের তাড়া করছে?”

‘ঠিক তা নয় মা। আসলে কালকের ঘটনার পর আর মাথাটা ঠান্ডা রাখতে পারছি না। মোবাইল ও ঠাকুমার ছবিটা যেভাবে পাওয়া গেল, তাতে অনেক কিছুই আর স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। তারপর ঐ বাড়িতে ঠাকুমার অশরীরী  উপস্থিতি আমাকে ভাবাচ্ছে।”

পাশ থেকে কল্যান বলে উঠল, “মামী, আমরা ঠিক করেছি এখনই একবার দাদুর ঘরে যাব। তুমি কাল নীল ডায়েরির কথা বলেছিলে না? দাদুর গলার মালায় থাকা চাবিটা ছাড়া তো ওই রহস্যের সমাধান সম্ভব নয়।”

উদ্বিগ্ন স্বরে পূর্ণা বললেন, “তোরা কি সত্যিই যাবি? দেখ, আমি কিন্তু তোদের বিপদে ফেলতে চাই না। কিন্তু ওই ডায়েরিটা পাওয়া খুব দরকার। তোদের দাদুর ওই জেদ আর অদ্ভুত জিজীবিষার কারণ সম্ভবত ওই নীল ডায়েরির ভেতরেই লুকিয়ে আছে। ওই বাড়িতে কী অভিশাপ আছে, সেটা তোর দিদা লিখে গিয়েছিলেন ।”

“মা, তুমি বলেছিলে চাবিটা দাদুর গলায় ঝোলানো থাকে। উনি কি সেটা সহজে আমাদের নিতে দেবেন ? কাল যেভাবে জিনিসপত্র ছোড়ার শব্দ পেলাম…সাহসে কুলোচ্ছে না। মাথার ঠিক আছে তো ? “

কণ্ঠস্বর নিচু করে মা ফিসফিসিয়ে বলল, “একটু পরে উনি স্নান করতে যাবেন। এই সময়টাই সুযোগ। তবে সাবধানে থাকিস, দাদু যেন টের না পায়। আর একটা কথা, ডায়েরিটা হাতে পেলে সোজা চলে যাবি পূরবী ভবনে। ওখানে বসেই ওটা খুলবি, এই বাড়িতে নয়।

“কেন মামী? এই বাড়িতে খুললে কী হবে?”

কল্যাণের দিকে তাকিয়ে পূর্ণা একটু থমকে গিয়ে বললেন, “জানি না। তবে তোর দিদা মরার আগে বলে গিয়েছিল, “নীল ডায়েরির ছায়া যেন এই বাড়ির ওপর না পড়ে।” তোরা গেলে ওই অন্ধকার বাড়ির ইতিহাস ওখানেই শেষ করে আসিস।

“ঠিক আছে মা, তুমি চিন্তা কোরো না। আমরা শুধু সত্যিটা জানতে চাই। দাদু যদি বুঝতে পারেন আমরা ওনার চাবি নিয়েছি, তুমি সামলে নিও কিন্তু।”,সুমন্ত বলল। 

পূর্ণা সুমন্তর উদ্দেশ্য জানাল, “আমি সামলে নেব। তোরা শুধু মনে রাখিস, ওই বাড়ির মায়া আর দাদুর বেঁচে থাকার নেশা— এই দুটোর মধ্যে হয়ত একটা গভীর যোগসূত্র আছে। দেরি করিস না, উনি এখনই বাথরুমে ঢুকবেন। যা!”

সুমন্ত ও কল্যাণ ধীর পায়ে দাদুর ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। পূর্ণা স্থির দৃষ্টিতে তাদের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

দাদু খাটে বসে জানলার বাইরে তাকিয়ে আছেন। সুমন্ত ও কল্যাণ ঘরে প্রবেশ করতেই তিনি স্থির দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকালেন।

“অনেকদিন পর দেখা হল দাদু, শরীরটা কেমন আছে আজ তোমার? কাল রাতে খুব শব্দ হয়েছিল ঘরে, কিছু কি পড়ে গিয়েছিল?” 

দাদু গভীর ও কর্কশ স্বরে সুমন্তকে শুধু বলল, “পড়ে যাওয়া জিনিস সব সময় চোখে দেখা যায় না গো নাতি। কিছু জিনিস শুধু শব্দ করে জানান দেয় যে তারা এখনও এই বাড়িতেই আছে। তোরা পারলে একবার আজ ঐ বাড়িতে যাস।”

“হ্যাঁ দাদু। তবে কাল ওখানে আমরা গিয়েছিলাম… ঠিক স্বাভাবিক মনে হলো না। তুমি তো সেখানে অনেক বছর কাটিয়েছো, ঐ বাড়ির অতৃপ্তির কারণটা কী বলতে পারবে?”

অতীশ একটু হেসে কল্যাণের দিকে চেয়ে বলতে লাগলেন, “অতৃপ্তি মানুষের মনে থাকে, ইঁট-পাথরের দেওয়ালে নয়। পূরবী চলে যাওয়ার পর ওই বাড়িটা একটা খোলস হয়ে গেছে। তোরা রক্তমাংসের মানুষ খুঁজছিস, অথচ সেখানে ছায়ারাই রাজত্ব করে।”

সুমন্ত একটু বিস্মিত কন্ঠে বলল, “দাদু, আমরা সব জানি না, কিন্তু মা গতকাল একটা নীল ডায়েরির কথা বলছিল। ঠাকুমার ডায়েরি। ওটা নাকি কোনো রহস্যের সমাধান করতে পারে?”

অতীশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, “পূর্ণা বলেছে? ও তো সব জানেই না। ডায়েরিটা নিছক কোনো কাগজ নয়, ওটা একটা অভিশাপের দলিল। ওটা পেতে গেলে যে সাহস লাগে, তা কি তোদের আছে?

কল্যাণ এগিয়ে এসে বলল , “আমাদের সাহস আছে কি না সেটা বড় কথা নয় দাদু, কিন্তু কাল রাতে তুমি অন্ধকারে কার সাথে কথা বলছিলে? তিতলি ভয় পেয়েছে। তুমি কি কারও উপস্থিতি অনুভব কর?

হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে অতীশ বলতে লাগলেন,   “তোরা বড্ড বেশি কথা বলছিস! ডায়েরি খুঁজছিস তো? ডায়েরির চাবি আমার গলার মালায় আছে, কিন্তু ওটা আমি দেব না। ওটা খুললে যে সত্যিটা বেরোবে, তা সহ্য করার ক্ষমতা তোদের মায়েরও নেই।”

সুমন্ত আবদারের স্বরে দাদুকে বলল, “আমরা শুধু সত্যিটা জানতে চাই। ওই বাড়িতে আমাদের যাওয়া কি ঠিক হবে?”

বৃদ্ধ অতীশ সরকার কণ্ঠস্বর নামিয়ে শুধু বললেন, “গেলে সাবধানে থাকিস। নীল ডায়েরিটা আলমারিতে নেই, ওটা রাখা আছে পূরবীর ঘরে ওই নীল পর্দার আড়ালে রাখা লুকানো সিন্দুকে। কিন্তু মনে রাখিস, চাবিটা ছাড়া ওটা খোলা মানে নিজের বিপদ ডেকে আনা। তোরা যত্নে আছিস, থাক। জিজীবিষার টানে আমি টিকে আছি ঠিকই, কিন্তু ডায়েরিটা খুললে তোদের শান্তি শেষ হয়ে যাবে রে “

কল্যাণ চুপিচুপি ভাইয়ের কানে বলল, “দেখ সুমন্ত, দাদুর চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ দুটো দেখ, কেমন জ্বলছে। চাবিটা আজ যেভাবেই হোক নিতেই হবে।”

—-“কী ফিসফিস করছিস? যা এখান থেকে! তোরা যে জিনিসের পিছনে ছুটছিস, তা পূর্ণাকে বলিস না। ওই নীল ডায়েরিই এই বংশের শেষ চিহ্ন হতে পারে। যা… চলে যা!”

অতীশ সরকার চোখ বন্ধ করে আবার জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সুমন্ত ও কল্যাণ একে অপরের দিকে অপার বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল ।

জিজীবিষা

৩ : জিজীবিষা ৫ : জিজীবিষা

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

This entry is part 4 of 17 in the series জিজীবিষা

This entry is part 4 of 17 in the series জিজীবিষা সলিল সমাধি – ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) সলিল সমাধি ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

This entry is part 4 of 17 in the series জিজীবিষা

This entry is part 4 of 17 in the series জিজীবিষা সলিল সমাধি – ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) সলিল সমাধি ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস

Read More »