জিজীবিষা
ধারাবাহিক উপন্যাস
সুরঞ্জিত সরকার
দ্বাদশ পর্ব
কৈপুকুরের শান্ত অন্ধকার চিরে যখন নীল রঙের এসইউভি গাড়িটি গ্রামের মোড়ে এসে থামল, তখন বাড়ির ভেতরে এক হাড়কাঁপানো নিস্তব্ধতা নেমে এল। সুমন্ত আর কল্যাণ জানলার পর্দা সামান্য ফাঁক করে দেখল, গাড়ির হেডলাইট নিভিয়ে চার-পাঁচজন ছায়ামূর্তি নিঃশব্দে নামছে।
গাড়ি থেকে নেমে লোকগুলো ছড়িয়ে পড়ল সরকার বাড়ির চারদিকে। কারো হাতে লোহার রড, কারো হাতে চৌকো খঞ্জর—যার ওপর হ্যারিকেনের আবছা আলোয় সেই অশুভ ত্রিশূল চিহ্ন ঝিলিক দিচ্ছে। তারা বাগানের পাঁচিল ঘেঁষে দালানের একদম নিচে এসে জড়ো হলো।
সুমন্ত নিচু গলায় বলল, “দাদু, ওরা এসে গেছে। অবিনাশের লোকরা আমাদের ঘিরে ফেলেছে।”
বাড়ির পেছনের আমগাছটার আড়াল থেকে খসখস শব্দ ভেসে আসছে। কল্যাণ দেখল, একজন লোক টর্চের আলো ফেলে রান্নাঘরের জানলাটা পরীক্ষা করছে। তারা যেন ঠিক জানে বাড়ির কোন দিকটা দুর্বল। সুমন্ত দেখল, সামনের গেটের কাছে একজন দাঁড়িয়ে ফোনে ওপার বাংলার সেই শিমুল সরকারের সাথে কথা বলছে।
দাদু অতীশ খাপ থেকে তরবারি বের করে শান্ত অথচ ইস্পাতের মতো কঠোর গলায় বললেন, “ওরা ভাবছে অতীশ বুড়ো হয়ে গেছে। কিন্তু ওরা জানে না, এই বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে আমাদের পূর্বপুরুষদের শক্তি মিশে আছে।”
পূর্ণা আর সুনীপা তখন ঘরের কোণে মেয়েকে জাপ্টে ধরে বসে আছেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে সুমন্তর ফোনে একটি ভাইব্রেশন হলো। সৌরীশদার মেসেজ— “পুলিশ গ্রামের পুব দিকের বাঁশবাগানে পজিশন নিয়েছে। ওরা বাড়ির ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলেই সিগন্যাল দেবে। তোরা কেউ দরজা খুলিস না।”
সৌরীশদার এই মেসেজ সুমন্তদের মনে নতুন সাহস জোগাল।
হঠাৎ নিচতলার কপাটে এক বিকট আওয়াজ হলো।অবিনাশের এক চ্যালা চিৎকার করে উঠল, “অতীশ বাবু, ডায়েরিটা বের করে দিন, নইলে বাড়ির ওপর পেট্রোল বোমা মারব!”
অতীশ গম্ভীর গলায় জানলা দিয়ে হাঁক দিলেন, “এক পা এগোলে তোর খুলি উড়ে যাবে!”
সৌরীশদার নিখুঁত পরিকল্পনা আর পুলিশের অতর্কিত হামলায় সরকার বাড়ির চারপাশের গুমোট ভাবটা মুহূর্তের মধ্যে রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। বাঁশবাগানে ওত পেতে থাকা পুলিশের বিশেষ বাহিনী যখন চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলল, তখন ত্রিশূল বাহিনীর পালানোর পথ প্রায় বন্ধ।
অবিনাশের লোকরা যখন পেট্রোল বোমা ছোঁড়ার হুমকি দিচ্ছিল, ঠিক তখনই থানার বড়বাবুর নির্দেশে পুলিশের জোরালো সার্চলাইটগুলো জ্বলে উঠল। অন্ধকারের বুক চিরে পুলিশের সাইরেন আর পিস্তলের গর্জন শোনা গেল।
বড়বাবু মেগাফোনে চিৎকার করে বললেন, “আইন নিজের হাতে নিও না! চারপাশ থেকে ঘেরাও করা হয়েছে, সারেন্ডার করো!”
অবিনাশের দুই সাগরেদ পুলিশের ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করলেও প্রশিক্ষিত পুলিশ বাহিনীর সামনে তারা টিকতে পারল না। লাঠিচার্জ আর কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলিতেই তাদের দম্ভ ধুলোয় মিশে গেল। সুমন্ত আর কল্যাণ ওপরের জানলা থেকে দেখল, অন্ধকারের মধ্যে কয়েকটা ছায়ামূর্তি ঝোপঝাড় মাড়িয়ে পাগলের মতো বনের দিকে ছুটছে।
নিজেদের নীল গাড়িটি স্টার্ট দেওয়ার সুযোগ না পেয়ে অবিনাশের বাকি লোকরা পেছনের পুকুর পাড় দিয়ে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। পুলিশের অতর্কিত হামলায় তারা এতটাই দিশেহারা হয়ে পড়েছিল যে তাদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র আর মোবাইল ফোনগুলো বাগানেই পড়ে রইল।
বিপদ কিছুটা কাটতেই বড়বাবু সরকার বাড়ির সদর দরজায় এসে দাঁড়ালেন। দাদু অতীশ দরজা খুলতেই তিনি ক্লান্ত কিন্তু বিজয়ী হাসিতে বললেন, “আপাতত ওরা পিছু হটেছে অতীশ বাবু। কয়েকজনকে আমরা কব্জা করেছি, তবে অবিনাশ আর তার মূল পান্ডারা অন্ধকারের সুযোগে পশ্চিমদিকে পালানোর চেষ্টা করছে।”
পূর্ণা দেবী আর সুনীপা দীর্ঘক্ষণ পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। সুমন্ত আর কল্যাণ নিচে নেমে এসে বড়বাবুকে ধন্যবাদ জানাল।
কিন্তু দাদু গম্ভীর গলায় বললেন, “ওরা পালিয়েছে মানেই সব শেষ নয় বড়বাবু। শিমুল সরকার ওপার বাংলায় বসে এবার মরণকামড় দেবে। আমাদের এখনই মেহেদিপুরের সেই আদি ভিটের হদিস পেতে হবে।”
বড়বাবু ও তাঁর দল উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোনগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠালে সেখান থেকে শিমুল সরকারের অপরাধ জগতের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করল। কল লিস্ট, মেসেজ এবং জিপিএস লোকেশন বিশ্লেষণ করে পুলিশ শিমুল সরকারের একাধিক গোপন আড্ডার হদিস পেল।
ফোনের জিপিএস ট্র্যাকিং ও মেসেজ থেকে নিশ্চিত হওয়া গেল যে, শিমুল সরকার ওপার বাংলার ঢাকার মেহেদিপুরের সেই পৈতৃক ভিটেটিকে তাঁর প্রধান আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছেন।
ফোন থেকে কিছু সাংকেতিক বার্তার হদিস পাওয়া গেল যা থেকে বোঝা যায়, সীমান্তের কাছেই কোনো এক পুরনো চটকল বা গুদামঘরে তাদের একটি অস্থায়ী আড্ডা রয়েছে। এখান থেকেই মূলত এপার বাংলায় মাদক ও লোক পাচারের কাজ নিয়ন্ত্রণ করা হতো।
শিমুল সরকারের সাথে অবিনাশ ও তার লোকেদের নিয়মিত কথোপকথনের অডিও রেকর্ড পাওয়া গেছে। সেখানে শিমুলকে বলতে শোনা গেছে— “অতীশকে সরাতে পারলে মেহেদিপুরের সিন্দুকটা আমাদের হবেই।”
কন্টাক্ট লিস্টে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম পাওয়া গেছে যারা এই ‘ত্রিশূল’ সংগঠনের সাথে গোপনে যুক্ত। এর ফলে বোঝা গেল শিমুলের জাল কত গভীরে বিস্তৃত।
(চলবে)


