১১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 11 of 17 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৭ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৮ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৯ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা – দশম পর্ব

১১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

আমার ঘরের খুঁটিনাটি বলতে গেলে, ঘরের কোণে বাসা বেঁধে থাকা মাকড়সাটি বহুক্ষণ ধরে আমার চিন্তাসূত্র ধরে রাখার পক্ষে যথেষ্ট।যখন আমি শয‍্যাশায়ী ছিলাম কেউই আমার প্রতি দৃকপাত করত না।কেবলমাত্র একটি ঘোড়ারনালের পেরেক আমার এবং আমার স্ত্রীর এমনকি পরিবারের অন‍্যান‍্য শিশুদের দোলনাগুলি ধরে রাখত।সেই পেরেকটির নিচে দেয়ালের অংশ নোনা লেগে ঝরে গিয়েছিল ।সেই উন্মুক্ত ফাটল দিয়ে ভেসে আসত, এই ঘরে আগে বসবাসকারী বস্তু ও জীবজন্তুর গন্ধ।গন্ধটি এত ঘন যে কোনো হাওয়া বা বাতাস সেই স্থবির, অলস দুর্গন্ধকে দূর করতে পারে না। সেখানে রয়েছে শরীরের ঘামের গন্ধ, অতীতের অসুখের গন্ধ, মুখের দুর্গন্ধ, পায়ের দুর্গন্ধ, দেহের গন্ধ, প্রস্রাবের গন্ধ, বাসি তেলের গন্ধ, পচা চাটাই ও পুড়ে যাওয়া অমলেটের গন্ধ, ভাজা পেঁয়াজের গন্ধ, সেদ্ধ করা ওষধি গাছের গন্ধ, ম্যালো পাতার গন্ধ এবং নবজাতকের প্রথম মলের গন্ধ। আছে কৈশোরোত্তীর্ণ এক ছেলের ঘরের বিশেষ গন্ধ। বাইরে থেকে ভেসে আসা বাষ্পের গন্ধও আছে; আছে মৃত গন্ধ কিংবা মরে যাওয়া গন্ধ—যেগুলো এখনও বেঁচে আছে এবং তাদের স্বাতন্ত্র ধরে রেখেছে।
এছাড়াও আরও কিছু গন্ধ আছে,যাদের উৎস অজানা হলেও তারা তাদের ছাপ রেখে গেছে।

আমার ঘরে একটি অন্ধকার আলমারি আছে এবং বাইরের পৃথিবীর দিকে উন্মুক্ত দুটি জানালাও। সাধারণ মানুষের পৃথিবীর দিকে খোলা। একটি জানালা আমাদেরই উঠোনের দিকে খোলে, আর অন্যটি রাস্তার দিকে। সেই জানালা আর সেই রাস্তার মাধ্যমে আমি যুক্ত হয়ে আছি রেই শহরের সঙ্গে।যাকে বলা হয় “পৃথিবীর বধূ”।জুড়ে আছি হাজার হাজার রাস্তা, গলি, সাধারণ বাড়ি, মাদ্রাসা ও কারাভানসরাই নিয়ে গড়ে ওঠা সেই শহরের সঙ্গে।
পৃথিবীর এই বৃহত্তম শহরটি আমার ঘরের পেছনেই বেঁচে থাকে, শ্বাস নেয়। এখানে আমি যখন চোখ বন্ধ করি, তখন শহরের বিশৃঙ্খল ছায়াগুলো,যেগুলো আমার মনে প্রভাব ফেলে,প্রাসাদ, মসজিদ আর বাগান,সব যেন আমার ঘরের কোণে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
এই দুটি জানালা আমাকে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে, সেই সাধারণ মানুষের জগতের সঙ্গে যুক্ত করে। কিন্তু আমার ঘরের ভেতর দেয়ালে একটি আয়না আছে।যেখানে আমি আমার মুখ দেখি। আমার সীমিত জীবনে এই আয়নাটি সেই সাধারণ মানুষের পৃথিবীর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ,কারণ তাদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।

আমার জানালার সামনে শহরের নানা দৃশ্যের মধ্যে একটি কসাইখানা রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন দুটি ভেড়া জবাই হয়। আমি যখনই জানালা দিয়ে তাকাই, তখনই সেই কসাইকে দেখি।
প্রতিদিন ভোরবেলায় দুটি কালো, কৃশকায় বোঝাবাহী ঘোড়া আসে।যেন যক্ষ্মায় আক্রান্ত ঘোড়া, যারা ভীষণ কাশির দমকে কাঁপতে থাকে। তাদের কঙ্কালসার সামনের পা যেন খুরে শেষ হয়েছে।যেন কোনো কঠোর প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে তাদের পা কেটে ফেলে দগ্ধ তেলের মধ্যে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ঘোড়াগুলো, দুপাশে ঝুলন্ত পশুর মৃতদেহ নিয়ে, দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়।
কসাই তার তেলতেলে হাত দিয়ে নিজের মেহেদি-রাঙা দাড়িতে হাত বোলায়, তারপর ক্রেতার দৃষ্টিতে মৃতদেহগুলো পরীক্ষা করে। সে দুটিকে বেছে নেয়, তাদের মোটা লেজ হাতে ওজন করে, ভেতরে নিয়ে গিয়ে দুটি হুকে ঝুলিয়ে দেয়।
দম ফেলতে ফেলতে ঘোড়াগুলো আবার এগিয়ে যায়।
কসাই রক্তমাখা, গলা-কাটা দেহগুলোর গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়। তাদের চোখ স্থির হয়ে আছে; রক্তমাখা চোখের পাতা যেন তাদের কালো খুলির মাঝখান থেকে বেরিয়ে এসেছে। সে হাড়ের হাতলওয়ালা একটি ছুরি নিয়ে সতর্কভাবে তাদের শরীর টুকরো টুকরো করে কাটে এবং হাসিমুখে তার ক্রেতাদের কাছে চর্বিহীন মাংস বিক্রি করে।
এই সব কাজ সে এক অদ্ভুত আনন্দের সঙ্গে করে। আমি নিশ্চিত,এই কাজের মধ্যেই সে এক বিশেষ আনন্দ ও এক ধরনের আসক্তি খুঁজে পায়।
সেই বার্লি -হলুদ রঙের কুকুরটা যে কিনা আমাদের প্রতিবেশীদের ত্রাস হয়ে উঠেছিল সে অনুগত নিষ্পাপ ভিক্ষাপ্রার্থী চোখে সারাক্ষণ কসাইয়ের দিকে চেয়ে থাকত।সে জানত যে কসাই তার পেশাটিকে বেশ উপভোগ করে।

কিছুটা দূরে, এক অদ্ভুত বৃদ্ধ একটা খিলানের নিচে বসে থাকে। তার সামনে একটা কাপড় পাতা, তার ওপর ছড়ানো রয়েছে নানা জিনিস:একটা কাস্তে, দুটো ঘোড়ার নাল, নানা রঙের পুঁতি, একটা লম্বা হাতলওয়ালা ছুরি, একটা ইঁদুর ধরার কল, একটা মরচেধরা সাঁড়াশি, কালি-পাত্রে জল ঢালার জন্য একটা ড্রপার, ভাঙা দাঁতের চিরুনি, একটা কার্ণিক, আর একটা নোংরা রুমালে ঢাকা ঝকঝকে জার।
আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো কখনো দিন আর মাস ধরে, এই বুড়ো মানুষটাকে লক্ষ্য করি। সে সবসময় একটা নোংরা দোপাট্টা আর শুস্থার শহরে তৈরি একটা ক্লোক পরে থাকে। তার কলারের বোতাম খোলা, সেখান থেকে বুকের সাদা লোম বাইরে বেরিয়ে থাকে। তার হাতে একটা তাবিজ বাঁধা, আর চোখের পাতা যেন কোনো নাছোড়, নির্লজ্জ অসুখে আক্রান্ত যে অসুখ তাকে ভেতর থেকে ধীরে ধীরে খেয়ে ফেলছে। সে প্রতিদিন একই ভঙ্গিতে বসে থাকে। তবে বৃহস্পতিবারে, তার হলুদে হয়ে যাওয়া ফোকলা দাঁতেই, সে কোরান পড়ে।মনে হয় এভাবেই সে জীবিকা নির্বাহ করে, কারণ আমি কখনো কাউকে তার কাছ থেকে কিছু কিনতে দেখিনি।

এই মানুষটার মুখ আমার সমস্ত দুঃস্বপ্নের অংশ বলে মনে হয়। তার সরু কপাল, খোঁচা খোঁচা চুলে ঢাকা মাথা:যার ওপরে একটা উঁচু অংশ;আর চারপাশে জড়ানো হলদেটে পাগড়ি থেকে যেন আগাছার মতো জেদি, বোকা চিন্তাগুলো গজিয়ে ওঠে।
মনে হয়, এই বুড়ো মানুষের জীবন আর তার সামনে সাজানো মালপত্রের ভান্ডারের মধ্যে একটা অদ্ভুত সম্পর্ক আছে।অনেকবার ইচ্ছে হয়েছে তার সঙ্গে কথা বলি বা তার দোকান থেকে কিছু কিনি, কিন্তু প্রতিবারই দ্বিধায় পিছিয়ে গেছি।
আমার দাইমার মতে, যৌবনে এই লোকটা ছিল একজন কুমোর। এখন, একজন দোকানদার হয়েও, সে নিজের জন্য কেবল একটি জার রেখে দিয়েছে।

এগুলোই ছিল বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে আমার সংযোগ।
আর ভেতরের পৃথিবী? সেখানে শুধু দাইমা আর এক পতিতার মতো স্ত্রী ছাড়া আর কেউ ছিল না।সেই দাইমাই ছিল আমাদের দুজনেরই পরিচর্যাকারী। সে আমাদের দুজনকেই লালন-পালন করেছে।
আমার স্ত্রী আর আমি শুধু কাছের আত্মীয়ই নই, আমাদের দাদি আমাদের দুজনকেই একই সঙ্গে দুধ খাইয়েছিলেন। তাত্ত্বিকভাবে, তার মা-ই আমার মা ;কারণ আমি কখনো আমার আসল বাবা-মাকে দেখিনি।
তার মা এক লম্বা, সাদা চুলের মহিলা।তিনি আমাকেও মানুষ করেছেন। আমি তাকে নিজের মায়ের মতোই ভালোবাসতাম। আসলে, সেই মায়ের প্রতি ভালোবাসার কারণেই আমি তার মেয়েকে বিয়ে করেছিলাম।
আমার বাবা-মাকে নিয়ে অনেক গল্প শুনেছি, কিন্তু আমার মনে হয় শুধু একটা গল্পই সত্যি,যেটা দাইমা আমাকে বলেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, আমার বাবা আর কাকা ছিল যমজ।মুখ, গঠন, স্বভাব,সবকিছুই একেবারে এক। এমনকি তাদের কণ্ঠস্বরও এতটাই মিল ছিল যে আলাদা করা কঠিন ছিল। তাদের মধ্যে এমন গভীর বন্ধন ছিল যে, একজন অসুস্থ হলে অন্যজনও অসুস্থ হয়ে পড়ত।
তারা যেন সত্যিই একে অপরের প্রতিরূপ ছিল।
দুজনেই ব্যবসায়ী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, আর বিশ বছর বয়সে তারা ভারতে আসে। সঙ্গে নিয়ে আসে নানা রকম জিনিস—বিভিন্ন ধরনের কাপড়, রেশম, ছাপা কাপড়, সুতির কাপড়, জোব্বা, শাল, সূঁচ, মাটির বাসন, মুলতানি মাটি, আর কলমের খাপ। তারা এগুলো ভারতে বিক্রি করত।
শোনা যায়, আমার বাবা বেনারস শহরেই থেকে যান, আর কাকা চলে যান ভারতের অন্য শহরগুলোতে ব্যবসা করতে।

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা – দশম পর্ব ১২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি