আলোর পথযাত্রী - বিতস্তা ঘোষাল
আলোর পথযাত্রী – ৬
বিতস্তা ঘোষাল
প্রথম ভাগ
শঙ্খ ঘোষ , কবি, প্রাবন্ধিক, চিন্তাবিদ—নাকি একজন আমার দেখা এক অন্য রকম ব্যক্তিত্ব !
লেখালিখি ও সম্পাদনার সূত্রে যোগ একরকম হয়, আবার ব্যক্তিগত যোগাযোগের পরিসর—সেটা অনেক ক্ষেত্রেই পারিবারিক হয়ে ওঠে। আমার ক্ষেত্রে বিদগ্ধ মানুষদের সঙ্গে সম্পর্কগুলো দুভাবেই এসেছে। বলা যেতে পারে, এটা বাড়তি পাওনা।
ভাষা সংসদ ও অনুবাদ পত্রিকার সম্পাদক আমার বাবা, শ্রী বৈশম্পায়ন ঘোষাল, এবং শঙ্খ ঘোষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কটা শ্রদ্ধার। এবং এই শ্রদ্ধা দুজনের চোখেই আজীবন ছিল। কিন্তু আমি তাঁকে চিনেছি প্রথমে তাঁর লেখায়, পরে ব্যক্তিগতভাবে। এবং মজার বিষয়, এটা বাবার মাধ্যমে হয়নি।
বুদ্ধদেব বসুর মেয়ে মিনাক্ষী দত্ত ও জ্যোতির্ময় দত্ত আমেরিকা থেকে কলকাতায় এলেই কঙ্কাবতী দত্ত—মানে তাঁদের মেয়ের—গলফগ্রীণের বাড়িতে সারাদিন-রাত নানা অনুষ্ঠান, হইহট্টগোল, আড্ডা, খাওয়া ও বই প্রকাশের উৎসব চলত। তাতে উপস্থিত থাকতেন দুই বাংলার অজস্র কিংবদন্তি মানুষ। আমিও জুটে যেতাম সেখানে কঙ্কাবতীদির ডাকে।
আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকত এই ক্ষেত্রে। সেটা হল সল্টলেক অঞ্চলের বাসিন্দা এইসব বিখ্যাত মানুষদের গাড়িতে করে গলফগ্রীণে নিয়ে যাওয়া। ফলে আমি পৌঁছে গেলাম সেলিব্রিটিদের অন্দরমহলে, কোনো দাবি ছাড়াই।
এভাবেই আমার দায়িত্ব এসে পড়ল—বিদ্যাসাগর আবাসন থেকে শঙ্খ ঘোষ, তারপর অম্লান দত্ত, ও শেষে শিবনারায়ণ রায়কে নিয়ে আসা ও পৌঁছে দেওয়ার।
এখন যাওয়া মাত্রই যে তাঁরা গাড়িতে বসে পড়বেন, এটা তো হয় না। হয়তো জ্যেঠিমা রেডি হচ্ছেন, আমি তখন তাঁর সঙ্গে গল্প করছি। তখন তো আমি নেহাতই কলেজ শেষ করেছি। ফলে সেই নিয়েই আলোচনা—পড়াশোনার ফাঁকে কী করি, বই পড়ি কিনা—এসব প্রসঙ্গ।
আমি ছোটোবেলা থেকেই বইয়ের পোকা। তাঁর ‘বাবরের প্রার্থনা’, ‘নিভন্ত এই চুল্লীতে মা, একটু আগুন দে’—এসব কবিতা তখন মুখস্থ।
ওয়ান মোর আনফরচুনেট
উইয়ারি অব ব্রেথ
র্যাশলি ইমপোরচুনেট
গন টু হার ডেথ
— থমাস হুড -এর এই পংক্তি ‘যমুনাবতী’ কবিতার প্রারম্ভে ব্যবহৃত হয়েছে। এই প্রসঙ্গে যখন বললাম যে আফ্রিকার সোয়েটো অঞ্চলের বারো বছরের এক মেয়ের মৃত্যুর সঙ্গে কবির ভাবনায় একটি প্রতিবাদী যোগসূত্র তৈরি হয়েছিল, তখন তিনি একটু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন।
বললেন, “এটা যখন লিখি, তখন তো তুমি জন্মাওনি! এর মধ্যে পড়ে ফেলে বিশ্লেষণও করছ?”
আমি বললাম, আমার মনে হয়েছে—তাঁর ‘কবিতার মুহূর্ত’ প্রবন্ধগ্রন্থে সেই যোগসূত্রেরই বিশ্লেষণ আছে। সেখান থেকেই যেন সৃষ্টি হয়েছে কোচবিহারের সেই প্রতিবাদী নারীর আর্তনাদ—“নিভন্ত এই চুল্লীতে মা, একটু আগুন দে।”
এই কবিতার সঙ্গে লোপামুদ্রার গান মিলিয়ে আমি কোরিওগ্রাফিও করেছি। সে কথা বলতেই তিনি বললেন, “এই কবিতার তুমি নাচ করেছ? দেখিও তো কেমন করলে!”
আমি বললাম, ওখানে গিয়ে দেখাব—এখন চলো। অম্লান জ্যেঠু, শিবনারায়ণ জ্যেঠু অপেক্ষা করছেন।
শুনেই উঠে পড়লেন।
শিবনারায়ণ রায় ও অম্লান দত্তের সময়জ্ঞান খুব কড়া ছিল। দেরি হলে আমিই বকা খাব—তাই আমার তাড়া। চারজনকে—কখনো শিবনারায়ণ জ্যেঠুর স্ত্রীকেও—গাড়িতে তুলে চললাম অনুষ্ঠানস্থলে।
এই সময় অম্লান জ্যেঠু আর শিবনারায়ণ জ্যেঠুর মধ্যে কোনো না কোনো বিষয়ে মতান্তর হতই। দুজনেই শঙ্খবাবু এবং আমার কাছে মতামত চাইতেন—কার বক্তব্য সঠিক।
আমি তো একেবারেই নবীন—কি বলব! আর শঙ্খ জ্যেঠু মুচকি মুচকি হাসছেন। বলছেন, “বিতস্তা এখনকার জেনারেশন—ওর মন্তব্য শোনা দরকার।”
এরপর অন্য এক প্রসঙ্গে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হল—২০০৫-০৬ সাল নাগাদ। তখন আমি পত্রিকা দপ্তরে আসা-যাওয়া শুরু করেছি। অনুবাদ পত্রিকায় তাঁর একাধিক লেখা আগে থেকেই প্রকাশিত হয়েছে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর সেটা আরও বাড়ল।
প্যাপিরাসের কর্ণধার অরিজিত কুমারের সঙ্গে পরিচয় হল। তিনি আমাকে হাতে-কলমে পত্রিকা প্রকাশনার কাজ শেখাচ্ছিলেন। তাঁর অনেক বইয়ের লেখক ছিলেন শঙ্খবাবু—দুজনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক।
এই দুইয়ের সংস্পর্শে এসে আমি ক্রমশ মানুষ—কবি—প্রাবন্ধিক শঙ্খ ঘোষের পাশাপাশি একজন শিক্ষককেও পেলাম।
প্যাপিরাস থেকে আমার প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হল—‘একা এবং রঙিন হলুদ বিকেলের গল্প’। আমি জানতাম না, বইটি তাঁর কাছে পৌঁছেছে।
হঠাৎ তাঁর ফোন—
“বিতস্তা, তোমার সব গল্প ভালো হয়নি—তবে ‘একা’ গল্পটা অসাধারণ। বিষয়বর্ণনা খুব ভালো।”
আরেকটি গল্প—‘আত্মজ’—নিয়ে কথা বললেন। লেখার বিন্যাস নিয়ে পরামর্শ দিলেন। আরও লিখতে বললেন।
আমি সেদিন বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম—এত বড় মানুষ আমার লেখা পড়েছেন!
২০১২ সালে প্যাপিরাস থেকে আমার দুটি বই প্রকাশিত হল—একটি উপন্যাস, অন্যটি কর্তার সিং দুগ্গালের গল্পের অনুবাদ। উপন্যাসটির বিষয় নিয়ে অরিজিতবাবুর কিছু দ্বিধা ছিল। তিনি পান্ডুলিপি পাঠালেন শঙ্খবাবুর কাছে।
পড়ার পর তিনি ফোন করলেন—
“এই লেখা তোমাকে বিতর্কিত করতে পারে। প্রকাশ্যে নানা সম্পর্কের কথা বলছ, বাবার কিছু ভাবনাও ব্যবহার করেছ। তাই তাঁর অনুমতি নিও। তবে লেখাটা ভালো—কিছু এডিট দরকার।”
তারপর বললেন—
“দুগ্গালের গল্পের অনুবাদ বেশ ভালো হয়েছে। এটা তোমার প্রথম অনুবাদ? ভালো কাজ।”
এতক্ষণ ভয় লাগছিল—এই কথার পর মনটা হঠাৎ আনন্দে ভরে গেল।
অনুবাদ পত্রিকা প্রকাশিত হলে আমি তাঁর বাড়ি যেতাম নিজে হাতে দিয়ে আসতে। চা, বিস্কুট, সিঙাড়া, মিষ্টি—একটার পর একটা আসতেই থাকত। তিনি পত্রিকা দেখে বলতেন, “তুমি তো ভালোই কাজ করছ—অনেক বিষয় বৈচিত্র আছে।”
তাঁর আদিনিবাস বরিশালের বানারিপাড়া। জন্ম ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। পিতা মণীন্দ্রকুমার ঘোষ, মাতা অমলাবালা। তিনিও শিক্ষকতা করেছেন সারাজীবন।
বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক। তিনি নিজেই বলেছেন—“মুহূর্মুহু আমি বেঁচে থাকি বাংলাদেশের মধ্যেই।”
কবিতা নিয়ে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম—কবিতা কি আচ্ছন্ন অবস্থায় আসে?
তিনি বললেন, “আচ্ছন্নতার কথা ভাবি না, তবে স্বতঃস্ফূর্তিকে মানি। এটা অলৌকিক নয়—বহু অভিজ্ঞতা জমে থাকে, কোনো আকস্মিক আঘাতে তা কবিতা হয়ে ওঠে।”
অনুবাদ প্রসঙ্গে ইকবালকে নিয়ে কাজের কথা বলেছিলেন—রবীন্দ্রনাথ ও ইকবালকে পাশাপাশি দেখার ইচ্ছে থেকেই শুরু। কাজটি দীর্ঘদিন ধরে, থেমে থেমে সম্পন্ন হয়।
নাটকের প্রসঙ্গে তাঁর স্মৃতিচারণ ছিল অসাধারণ। নাট্যনিকেতন, শ্রীরঙ্গম, শিশিরকুমার ভাদুড়ী—সব যেন জীবন্ত হয়ে উঠত তাঁর কথায়। তিনি বলেছিলেন, কীভাবে ধীরে ধীরে সিনেমা এসে থিয়েটারকে সরিয়ে দিল।
একদিন তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতে অন্যরা এসে গেলেন। ভিড় আমার ভালো লাগে না। সেদিনের মতো প্রণাম করে উঠে এলাম।
আজ এতদিন পর ফিরে তাকালে মনে হয়—
এই টুকরো টুকরো মুহূর্তগুলোই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
(চলবে)



