২১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 21 of 26 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৭ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৮ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৯ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা – দশম পর্ব

১১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৭ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৮ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

 ১৯ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

জীবন প্রত‍্যেক মানুষের সামনে বড় নিস্পৃহ শীতলতায় স্বীয় প্রতিবিম্ব উন্মুক্ত করে।প্রত‍্যেকেই নিজের ভেতর একাধিক মুখোশ বয়ে বেড়ায়।হিসেবি লোকেরা সারা জীবন একই মুখোশ ব‍্যবহার করে।স্বাভাবিকভাবেই সেই মুখোশ ক্রমে মলিন ও কুঁচকে যায়।অনেকে সেই মুখোশ সন্তান সন্ততির জন‍্যে রেখে দেয়।অনেকে আবার সেইসব মুখোশ নিরন্তর বদলাতে থাকে।বয়সকালে তারাই এইসব মুখোশ থেকে পালিয়ে বাঁচতে চেষ্টা করে এবং শেষ মুখোশের আড়াল থেকে তাদের প্রকৃত মুখ বেরিয়ে পড়ে।

আমার ঘরের দেয়ালগুলোর ওপরে একপ্রকার প্রানঘাতী প্রভাব ছিল যা আমার চিন্তাগুলিকেও বিষিয়ে তুলত।আমি নিশ্চিত জানতাম এই ঘরে কোনো মৃত‍্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী তার মৃত‍্যুর পূর্বে এবং কোনো শৃঙ্খলিত বদ্ধ উন্মাদ এই ঘরে বাস করত।

কেবল আমার ঘরের দেয়ালই নয় ঘরের বাইরের দৃশ‍্যেও যেখানে কসাই,কাবাড়িওলা ও আমার দাইমা সেই বেশ‍্যাটা আর যাকিছু আমি দেখতে পেতাম যেমন স‍্যুপ খাবার বাটি,আমার পোশাক,এই সবকিছু মিলে ষড়যন্ত্র করে আমার মনের মধ‍্যে এই ধরণের চিন্তার সৃষ্টি করত।

কয়েক রাত আগে, স্নানের পোশাক বদলের ঘরে জামাকাপড় খুলতে গিয়ে আমার চিন্তাধারা অন্যদিকে মোড় নিল। পরে যখন হামামের কর্মচারী আমার মাথায় জল ঢালল, মনে হল যেন আমার সমস্ত কালো চিন্তা ধুয়ে যাচ্ছে। স্নানঘরের বাষ্পময় দেয়ালে আমি আমার ছায়ার দিকে তাকালাম এবং দেখলাম, দশ বছর আগের শিশুকালের মতোই আমি ভঙ্গুর ও কোমল। মনে পড়ল, তখনও আমার ছায়া এমনভাবেই সেই বাষ্পঢাকা দেয়ালে পড়ত। আমি গভীরভাবে নিজের শরীরের দিকে তাকালাম,উরু, পায়ের কাফ, আর শরীরের মধ্যভাগের দিকে!দৃশ্যটি ছিল হতাশাজনক ও কামনাময়। তাদের ছায়াও ছিল তেমন, যেমনটি দশ বছর আগে শৈশবে ছিল।

আমার মনে হল, আমার সমগ্র জীবন যেন এক উদ্দেশ্যহীন ছায়ার মতো কেটে গেছে!স্নানঘরের দেয়ালে কাঁপতে থাকা অর্থহীন ছায়াদের মতো। হয়তো বলিষ্ঠ, ভারী ও সবল মানুষেরা বাষ্পময় দেয়ালে আরও ঘন ও স্থায়ী ছায়া ফেলে যায়, যা দীর্ঘক্ষণ টিকে থাকে অথচ আমার ছায়া মুহূর্তের মধ্যেই মিলিয়ে যায়।
পোশাক বদলের ঘরে যখন আমি আবার জামা পরছিলাম, তখন আমার চেহারা ও চিন্তা আবার বদলে গেল। যেন আমি এক নতুন জগতে প্রবেশ করেছি!যেন সেই পৃথিবীতেই পুনর্জন্ম নিয়েছি, যাকে আমি ঘৃণা করতাম। যাই হোক, যেহেতু অলৌকিকভাবে আমি স্নানের পুকুরে একখণ্ড লবণের মতো দবীভূত হয়ে যাইনি, তাই আমি নিশ্চিত হলাম যে আমি যেন দ্বিতীয় এক জীবন পেয়েছি।
আমার জীবন তখন আমার কাছে ঠিক ততটাই অস্বাভাবিক, অনিশ্চিত ও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল, যতটা এই মুহূর্তে ব্যবহার করা কলমদানির খাপের নকশাটি। মনে হয়, কোনো এক আচ্ছন্ন!হয়তো পরিপূর্ণতাবাদী!চিত্রকর এই নকশা এঁকেছিল। প্রায়ই যখন আমি এই নকশার দিকে তাকাই, মনে হয় এটি খুব পরিচিত। হয়তো এই নকশার কারণেই আমি লিখি, অথবা এই নকশাই আমাকে লিখতে বাধ্য করে।
কলমদানির খাপের ওপর আঁকা রয়েছে একটি সরু সাইপ্রেস গাছ। তার নিচে এক কুঁজো বৃদ্ধ বসে আছেন ভারতীয় যোগীর মতো। তার গায়ে চাদর জড়ানো, মাথায় পাগড়ি। বিস্ময়ে সে বাম হাতের তর্জনী ঠোঁটে ঠেকিয়ে রেখেছে। তার বিপরীতে, দীর্ঘ কালো পোশাক পরা এক তরুণী,সম্ভবত এক বুগাম দাসী!অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে নৃত্য করছে। তার হাতে একটি লিলি। দু’জনের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে একটি সরু নদী। যা তাদের পৃথক করেছে।

আমার সমস্ত কদর্য ভাবনা গড়গড়ার ভিতরের আফিমের সূক্ষ্ম কোমল স্বর্গীয় ধোঁয়ার মাধ‍্যমে ছড়িয়ে পড়ছিল।এখন এটাই আমার শরীর যে কিনা ভাবতে পারে,এটা আমার সেই শরীর যে স্বপ্ন দেখতে পারে।এ আমার সেই শরীর যা সমস্ত মাধ‍্যাকর্ষণ ও বাতাসের দূষণ থেকে মুক্ত হয়ে ভেসে বেড়াতে পারে এক অচেনা রং ও আকৃতির অজানা পৃথিবীতে!

আফিম আমার মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিল এক বনজ- আত্মা।গাছপালার মতো এক অস্তিত্ব। আমি কি তবে উদ্ভিদে পরিণত হয়েছিলাম?
চামড়ার আসনের উপর বসে, আলখাল্লায় জড়িয়ে, আগুনের পাত্রের সামনে আধঘুমন্ত অবস্থায় যখন আমি সেই জড় উদ্ভিজ্জ আত্মার মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছিলাম, হঠাৎ কেন যেন আমার মনে পড়ল সেই পুরনো কাবাড়িওলার কথা। সেও তো আমার মতোই কুঁজো হয়ে বসে থাকত তার পসরা নিয়ে। এই চিন্তাটি আমাকে আতঙ্কিত করল।
আমি উঠে দাঁড়ালাম, আলখাল্লাটি একপাশে ছুড়ে ফেলে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার উজ্জ্বল গাল কসাইখানার টাটকা মাংসের মতো লাল হয়ে উঠেছিল। এলোমেলো দাড়ি আমার মুখে এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক আকর্ষণ এনে দিয়েছিল। অসুস্থ চোখ দুটিতে ছিল আহত, শিশুসুলভ ও ক্লান্ত এক দৃষ্টি,যেন সমস্ত মানবিক ও পার্থিব বিষয় আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।
আমার নিজের মুখটি আমার ভালো লাগল। তাকে দেখে আমি এক কামুক মত্ততায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে আমি বললাম—
“তোমার যন্ত্রণা এত গভীর যে তা তোমার চোখের তলায় জমে আছে… তুমি কাঁদতে চাইলেও হয়তো চোখের জল ফেলতে পারবে না…”
তারপর আবার বললাম,
“তুমি একটা বোকা! নিজেকে শেষ করে দিচ্ছ না কেন? কিসের অপেক্ষা? আর কী চাও? তোমার ঘরের আলমারিতে কি মদের বোতল নেই? এক চুমুক খেলেই সব শেষ! … বোকা!… তুমি একটা বোকা…”
হঠাৎ বুঝতে পারলাম, আমি হাওয়ার সঙ্গে কথা বলছি! আমার মনে যে বিচিত্র চিন্তাগুলো একত্রিত হচ্ছিল, তাদের মধ্যে কোনো সম্পর্কই ছিল না।
আমি নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিলাম, কিন্তু কথাগুলোর অর্থ বুঝতে পারছিলাম না। আমার মনের ভেতরে সেই শব্দগুলো অন্য শব্দের সঙ্গে মিশে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলছিল।
আমার আঙুলগুলো অস্বাভাবিক দীর্ঘ বলে মনে হচ্ছিল, যেমন জ্বরের সময় হয়। চোখের পাতা ভারী হয়ে এসেছিল, ঠোঁট ফুলে উঠেছিল।
আয়না থেকে মুখ ফিরিয়ে দেখি, দরজার কাছে আমার দাইমা দাঁড়িয়ে আছে।
আমি হো হো করে হেসে উঠলাম। কিন্তু তাঁর মুখে কোনো পরিবর্তন হল না। তার প্রাণহীন চোখ আমার দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে ছিল, সেখানে বিস্ময়, রাগ বা দুঃখের কোনো ছাপ ছিল না।
সাধারণত মানুষ কোনো হাস্যকর ঘটনার জন্য হাসে। কিন্তু আমার হাসি ছিল আরও গভীর। আমি হাসছিলাম সেই মহামূর্খামির ওপর যা মানুষ আজও সমাধান করতে পারেনি, যার উপলব্ধি তার সাধ্যের বাইরে। আমি হাসছিলাম রাতের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া সবকিছুর ওপর, আর হাসছিলাম মৃত্যুকে নিয়ে।
দাইমা আগুনের পাত্রটি তুলে নিল এবং ধীর, মাপা পদক্ষেপে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আমি কপালের ঘাম মুছে ফেললাম। হাতের তালুতে সাদা সাদা দাগ পড়েছিল। দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে মাথা ঠেকালাম। কিছুটা যেন স্বস্তি বোধ করছিলাম।
তারপর আমি নিচু স্বরে একটি সুর গুনগুন করতে শুরু করলাম যার উৎস আমার জানা নেই—
চলো, মদ পান করি—
রেএ রাজ্যের মদ;
আজ যদি নয় তবে আর কবে?

সংকটময় মুহূর্তের আগে এই সুরটি প্রায়ই আমার মনে ভেসে উঠত। এটি আমাকে অস্থির ও উদ্বিগ্ন করে তুলত, যেন হৃদয়ের চারপাশে শক্ত করে বাঁধা কোনো গিঁট। এটি ছিল এক অশুভ পূর্বলক্ষণ!ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা।।

( চলবে )

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা ২২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

আজন্ম-অর্জিত ভাষার পক্ষে লড়াইয়ের কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

This entry is part 21 of 26 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 21 of 26 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর পথযাত্রী …সৃষ্টির

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

আজন্ম-অর্জিত ভাষার পক্ষে লড়াইয়ের কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

This entry is part 21 of 26 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 21 of 26 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর পথযাত্রী …সৃষ্টির

Read More »

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য শ্যামলকৃষ্ণ বসু ৯ অযোধ্যাপতি রাজা দশরথ  [ সর্গ ৫-৭ ] সরযূ নদীর তীরে কোশল নামে সে এক বিশাল দেশ। বিশাল আয়তনের মহতী সমৃদ্ধিশালী

Read More »