এক দৃষ্টিহীন পেঁচা
কাহিনিকার: সাদেঘ হেদায়েত
বঙ্গানুবাদ: সুপর্ণা বোস
চতুর্বিংশতি পর্ব
বস্তুতপক্ষে আমরা যা হয়ে উঠি এবং আমাদের মুখের অভিব্যক্তিতে যা ফুটে ওঠে তা আমাদের অন্তর্নিহিত সন্দেহ, পুঞ্জিভূত হতাশা ও আজন্মলালিত মিলিত ছায়ার অস্পষ্ট বংশগত প্রভাব!আমরা কি এই সবকিছু আমাদের পূর্বপুরুষদের থেকেই বহন করছি না? এই যেমন আমি, আমার পাগলামো প্রবণতার এই বিপুল বোঝার জিম্মেদারী কেবল উত্তরাধিকার সূত্রেই বহন করছি আর এই সব কিছুকে কেবলমাত্র অতিস্বাভাবিক প্রকাশ ভেবে নিতে বাধ্য হয়েছি। আমার আচরণের এই বাধ্যবাধকতাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছি।আমার স্বভাবের এই গোঁয়ার্তুমিও কি বংশগত নয়?যা কেবলমাত্র আমার মৃত্যুর সঙ্গেই সমাপ্ত হবে।এমনকি এই শেষ মুহূর্তেও আমার মুখের প্রতিটি রেখায় চেপে বসা আকাঙ্খার হাস্যকর দাগগুলি আদৌ কি মুছে ফেলা সম্ভব?আসলে যে কোনো ক্ষেত্রেই আমার নিজের মুরোদ কতটুকু তা আমি বেশ জানি।
এসব ভাবতে ভাবতেই সহসা অট্টহাস্যে ফেটে পড়ি!সে যে কী বিকট ভীতিপ্রদ হাসি!হাসির শব্দে নিজেরই মাথার চুল খাড়া হয়ে যাবার জোগাড়!নিজেই নিজের গলার স্বর চিনতে পারছি না।মনে হচ্ছে শব্দটা যেন বাইরে কোথাও থেকে আসছে!সচরাচর যে হাসির শব্দ আমি আমার গলার ভিতর থেকে শুনতে পাই এ তেমন নয়!এই হাসি যেন আমার কানের ভিতর শতগুণে বাজছিল।তারপর আমার কাশি শুরু হল আর কফের সঙ্গে একদলা রক্ত বেরিয়ে এল যেন আমারই যকৃতের একটা ছোটো টুকরো আয়নার ওপর পড়ল।সেটাকে আঙুলে নিয়ে দেখতে দেখতে পিছন ফিরতেই দেখি আমার দাইমা পিছনেই দাঁড়িয়ে ভয়ার্ত চোখে আমাকে দেখছে।মুখ ফ্যাকাশে,মাথায় ঘোমটা খসে গেছে,চোখদুটি নিষ্প্রাণ!তার হাতে একবাটি বার্লির স্যুপ ধরা ছিল যেটা আমাকে খাওয়াতেই সে এসেছিল।আমি দুহাতে মুখ ঢেকে পর্দার পিছনে লুকিয়ে পড়লাম।তারপর যখন আমি একটু ঘুমোবার চেষ্টা করছি একটা আগুনের গোলা যেন আমার মাথার উপর চারপাশ দিয়ে চেপে ধরেছে!ঘরের ভেতরে প্রদীপের ওপরে এক টুকরো চন্দনকাঠ রেখেছিলাম।তার তীব্র গন্ধটা আমার ভেতর কামভাবের উদ্রেক করছিল।গন্ধটা আমার স্ত্রীর পায়ের পেশির গন্ধের মত!যার স্বাদ খানিকটা তেতো শশার মতই আমার মুখে লেগে ছিল!আমি দুহাতে এভাবে নিজের শরীর ঘষতে লাগলাম যেন কল্পনায় আমার নিজের থাই কাফ ও শরীরকে আমার স্ত্রীর সঙ্গে তুলনা করছি।কল্পনায় তার থাই ও নিতম্বের একটি রূপরেখা আঁকছিলাম ও তার শরীরের উষ্ণতা অনুভব করছিলাম।এই কল্পবিলাস আমাকে একপ্রকার তৃপ্তি দিচ্ছিল।আমি তার শরীরটিকে মনেপ্রাণে পেতে চাইছিলাম। এই কামতাড়নার থেকে মুক্তি পেতে আমাকে উঠে পড়তে হল।কিন্তু সেই সময় মাথার ভিতরের আগুনের গোলাটি এতটাই দগ্ধকর হয়ে উঠল যে আমি বিভীষিকাময় স্বপ্নের গভীরে তলিয়ে গেলাম।তখনও ভোরের আলো ফোটেনি একদল মদ্যপ রক্ষীর গানে ঘুম ভেঙে গেল।তারা একে অন্যের প্রতি রসিকতা করছিল।
চলো যাই পান করি মে
রে রাজত্বের সুরা
আজ যদি নয় তো আর কবে?
মনে পড়তেই আমি উদ্দিপীত বোধ করলাম কারণ আমার কাছেও ওরকমই এক পাত্র মদ আছে আমার ঘরের মিটসেফে।নাগের বিষ থেকে তৈরি সেই এক কাপ মদেই জীবন বিরচিত সমস্ত দুঃস্বপ্ন ধুয়ে মুছে যাবে।
কিন্তু সেই বেশ্যা…?এই শব্দটকু আমার তার প্রতি ঈর্ষাকে আরো ঘনীভূত করে তুলেছে আর তাকে আরো বেশি উৎফুল্ল।তাকেও এক পেয়ালা ওই বিষাক্ত সুরা দেওয়ার থেকে বেশি ভাল কিছু কি আমি করতে পারতাম?আরেক পাত্র নিজে গলাধঃকরণ করে দুজনে একসঙ্গে খিঁচুনির যন্ত্রণা ভাগ করতে করতে মরে যেতাম!
ভালোবাসা কি? সাধারণ জনতার জন্যে, ভালোবাসা মানে একধরণের অশালীনতা,একপ্রকার ক্ষণস্থায়ী অসভ্যতা!
এই গড্ডালিকা প্রবাহের কাছে তাদের ভালোবাসার ধারণাটি তাদের কুরুচিপূর্ণ ছড়াগান ও পতিতা বৃত্তির মধ্যেই বেশি প্রকট হয়।তাদের অভব্য বাগধারা যেমন,’গাধার সামনের পা কাদার মধ্যে গুঁজে দাও’ অথবা ‘মাথার ওপর ধুলো ছোঁড়ো’ ইত্যাদি!
তবে তার প্রতি আমার ভালোবাসা একেবারেই ভিন্ন প্রকতির ছিল।আমি তাকে বহুকাল ধরেই চিনিতার সেই আশ্চর্য বাঁকাচোখ।একটা ছোটো আধখোলা ঠোঁট।চাপা কন্ঠস্বর_সবই আমার খুব পুরনো দুখদায়ক স্মৃতির মূর্তিমতী রূপ।যা পাইনি বলেই আমি দিবারাত্র যন্ত্রণা পাই।যা আমারই ছিল অথচ আমাকে চিরকালের জন্যে বঞ্চিত করা হল?এটাই আমার সবচেয়ে ভয়ানক অনুভূতি এক মনোহারি প্রতারণার দারা আমার হতাশাগ্রস্থ ভালোবাসার ধারণাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হল।
যে কোনো কারণেই হোক আমি জানালার বাইরের সেই কসাইটাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য হলাম যে কিনা বিসমিল্লাহ বলে জামার হাতা গুলিয়ে মাংস কাটতে লেগে পড়ে! তার মুখের ভাব ও ধরণ ক্রমাগত আমার চোখের সামনে চলতে থাকে যতক্ষণ না আমি কোনো ভয়ানক সিদ্ধান্তে পৌঁছচ্ছি।
আমি বিছানা থেকে নেমে গিয়ে হাড়ের হাতল দেওয়া ছুরিটা নিয়ে এসে নিজের বালিশের নিচে রাখি।নিছু হয়ে একটা হলুদ চাদর পিঠের ওপর ছুঁড়ে দিই এবং একটা ওড়না দিয়ে মাথামুখ জড়িয়ে নিই।এইবার ওই কসাইয়ের ভাবভঙ্গির সঙ্গে কাবাড়িওলার ধরনধারণ ভালোকরে মিশিয়ে নিয়ে সবটুকু বেশ রপ্ত করে নিই।আমি পা টিপেটিপে বৌয়ের ঘরের দিকে যাই।ঘরটা অন্ধকার।সন্তর্পণে দরজা খুলি।ঘুমের ভেতর সে বিড়বিড় করে ওঠে,’তোমার ওড়না সরাও।’ আমি তার বিছানার কাছে গিয়ে নিজের মুখখানা তার ধীর মৃদু শ্বাসের সামনে নিয়ে যাই।তার মধ্যে আশ্চর্য ধরণের প্রাণদায়ী উষ্ণতা ছিল।আমার ভিতর একটা কিছু ঘটল!কিছুক্ষণ এই উষ্ণতার ভেতর শ্বাস নেওয়ার পর আমি আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠলাম।অনেকদিন পর্যন্ত আমার এমন একটা ধারণা ছিল যে সকলের শ্বাসই ঝলসে দেওয়ার মত গরম!আমি আমার সবকটা ইন্দ্রিয় একাগ্র করে বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম যে ঘরে অন্য কোনো পুরুষ উপস্থিত কি না!তার কোনো একজন প্রেমিক উপস্থিত থাকতেই পারে! কিন্তু নাহ্!সে একাই ছিল।আমি অনুভব করলাম তাল বিষয়ে লোকে যা বলে তা সর্বৈব মিথ্যা এবং ফালতু গুজব।কেউ কীভাবে এতোটা নিশ্চিত হতে পারে যে সে অক্ষতযোনি নয়?আমি তাকে নিয়ে যত উল্টোপালা ভেবেছি বলে মনেমনে লজ্জিত হলাম।কিন্তু এই অনুশোচনা মুহূর্তের অধিক স্থায়ী হল না।কারণ পরমুহূর্তেই আমি একটু দূরে কারোর হাঁচির শব্দ শুনলাম।তারপরেই ভেসে এলো বিদ্রূপাত্মক রোমহর্ষক হাসির আওয়াজ যা আমার শরীরের সব স্নায়ু যেন টেনে বার করে আনল।যদি এই হাসি এবং হাঁচির শব্দ আমি না শুনতাম তাহলে হয়ত ছুরি দিয়ে আজ তার মাংস কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্তে আমি অটল থাকতাম এবং সেই মাংসের টুকরোগুলি আমার জানালার সামনের সেই কষাইকে দিতাম খদ্দেরদেরকে বিক্রি করার জন্যে।আমি যদি আজ সেই হাঁচি আর হাসির শব্দ না শুনতাম তাহলে আজ তার থাইয়ের এক টুকরো মাংস নিয়ে গিয়ে সেই কোরাণপাঠকারী বৃদ্ধকে দিতাম কোরবানির মাংস হিসেবে এবং পরদিন তাঁর কাছে ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করতাম, “গতকাল যে মাংসটা আপনি খেলেন, জানেন ওটা কার শরীরের মাংস ছিল?”



