ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া )
রাজীব বরা
[ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে নাজিরা মহাবিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।রাজীব বরা সাহিত্যের বিভিন্ন বিভাগে নিজ প্রতিভার পরিচয় দানে সমর্থ হয়েছেন।তিনি একাধারে কবি,সমালোচক,গল্পকার,ঔপন্যাসিক এবং প্রাবন্ধিক।বর্তমান অসমিয়া কবিতার জগতে রাজীব বরা একটি অতি সুপরিচিত নাম।কাব্যগ্রন্থগুলি যথাক্রমে ‘তটিনী তীরর খেলা’,’ঢেউ’,’মানুহ চেরাই বাচি থকা নাযায়’,’মাউরর দিন’,এই ফালেও কবি আছে’।মৌলিক প্রবন্ধ সংকলন ছাড়াও সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘চিন্তা-পরিক্রমা’,’অসমিয়া আরু কথা সাহিত্যর আভাস’ ইত্যাদি।আলোচ্য উপন্যাস ‘সলিল সমাধি’ (‘জলজাহ’)মাখন হাজরিকা স্মৃতি উপন্যাস পান্ডুলিপি প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয়। এছাড়াও শ্রীবরা বিভিন্ন পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ]
মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ – বাসুদেব দাস
১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলার যমুনামুখে বাসুদেব দাসের জন্ম হয়।১৯৮২ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বে এম এ করেন। আজ পর্যন্ত অসমিয়া অনূদিত গল্পের সংখ্যা পাঁচশত পঞ্চাশটির ও বেশি।সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে নিয়মিত ভাবে অসমিয়া গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ এবং উপন্যাস অনুবাদ করে চলেছেন।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত সংস্থা NEINADএর পক্ষ থেকে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের জন্য Distinguished Life Membership এর দ্বারা সম্মানিত করা হয়।প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশটি।হোমেন বরগোহাঞির অসমিয়া উপন্যাস ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’(সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়) বাংলা অনুবাদের জন্য ২০২৪ সনের সাহিত্য আকাদেমি অনুবাদ পুরস্কারে সম্মানিত হন।
ষষ্ঠ পর্ব
পার কর রঘুনাথ
সেই দুর্যোগের রাত চাঙ থেকে জঙ্ঘা পর্যন্ত ডুবে যাওয়া জলে নেমে দামোদরও বাড়ির চারপাশ দেখছিল।সামনের উঠোনের দিকে থাকা গোয়ালঘরটা এবং তার পাশে থাকা ধানের-ভাঁড়ারটাতে টর্চের আলো ফেলেছিল।তার গোয়ালঘরের ভিতটা বাড়ির অন্যান্য ভিটাগুলির চেয়ে যথেষ্ট উঁচু।বন্যার ভয়ে গ্রামবাসী গোয়ালঘরের ভিটেটা সাধারণত উঁচু করে বাঁধায়।দামোদরের শূন্য গোয়ালঘরটার ভিটেতে তখন প্রায় পায়ের গোছা পর্যন্ত জল।বাঁধ ভেঙ্গে যাবার ভয় আছে বলে জেনে গরু আর গাভী কয়টি ভাই বুধিরামের সঙ্গে মিলে দিনের বেলা নিয়ে রাস্তায় বেঁধে রাখার ব্যবস্থা করেছিল।
শূন্য গোয়ালঘরটিতে টর্চের আলো ফেলতে সে দেখল—কাঠের বাটামটাতে একটা পেঁচা বসে আছে।পাখিটার চোখদুটি টর্চের আলোতে জ্বলজ্বল করে উঠল।ঘরে পেঁচা প্রবেশ করাটা নাকি অমঙ্গলের চিহ্ন।সেরকম অমঙ্গল খণ্ডন করতে গ্রামের মানুষ পুজোপাঠের ব্যবস্থা করে।নাম-কীর্তন করে।এরকম বিশ্বাসকে বুকে নিয়ে বড়ো হওয়া দামোদরের মনে কেন জানি সেই মুহূর্তে ভয়-শঙ্কার ভাব এল না!
পাশের ভাঁড়ার ঘরটাতে আলো ফেলে বুধিরাম দেখল—জল ভাঁড়ারের চাঙ ছুঁতে এখনও একমুঠোর মতো বাকি আছে।তবে যেভাবে জল বেড়ে চলেছে,তাতে চাঙ ছুঁয়ে ফেলা তো বাদই,দুপুরের মধ্যেই হয়তো ডুবিয়েও ফেলবে।আবহাওয়াটা ভালো হলেই হয়তো জলও থমকে দাঁড়াবে,সে মনে মনে বরুণ দেবতার কাছে প্রার্থনা জানাল।ঘরের প্রায় সামনে থাকা নামঘরটার মণিকূটের খোলা দরজা দিয়ে দেখল –মৃদু বাতাসে তখনও কাঁপতে কাঁপতে প্রদীপটা জলের মধ্যে নাচতে নাচতে জ্বলছে।একদিকে শঙ্কা আর অন্যদিকে ঈশ্বরের উপরে ভরসা –দোদুল্যমান অস্থির মনে সে হাতজোড় করে মণিকূটের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানাল।
উঠোনে নামতেই জল তার বুক স্পর্শ করল। পা টিপে টিপে গিয়ে গোয়াল ঘরের খুঁটিতে হেলান দিয়ে রাখা লাঙ্গল-জোয়াল ভাঁড়ারের ধামায় উঠিয়ে রাখল।জোয়ালটা রশি দিয়ে ধামার সঙ্গে বেঁধে রাখল। মাথায় পাগড়ী বেঁধে রাখা গামছাটা খসে হঠাৎ জলে পড়ায় সেটা তুলতে গিয়ে দামোদর দেখল– গামছাটা দূরে সরে গেছে। তখন সে ভালোভাবে বুঝতে পারল যে উঠোনোর জলের স্রোত বেড়েছে। উঠোন থেকে পেছন দিকের বাগানের মধ্য দিয়ে মাঠে আসা-যাওয়া করা পথটা দিয়ে আসা স্রোত তার শরীরটাকেও ঠেলছে। অর্থাৎ ব্রহ্মপুত্রের বর্ধিত জলধারা ছিন্ন রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার গতি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জলের মধ্যে দিয়ে পা টিপে টিপে এগিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে সে সোহাগীকে ডাকল–’ এই জেগে আছিস কি? বন্যার মতিগতি খুব একটা ভালো দেখছিনা। ছিন্ন হয়ে যাওয়া জায়গাটা বড়ো হয়েছে মনে হচ্ছে। জল বেড়েই চলেছে। চাঙ ছুঁতে আর এক বিঘার মতো বাকি আছে। মানুষকে এবার বড়ো চাঙে উঠতে হবে দেখছি।’
দামোদরের কণ্ঠস্বরে ফুটে ওঠা সন্দেহ, শঙ্কা এবং দুর্ভাবনাকে আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টায় সোহাগী বলে উঠল–‘আমাদেরকেও অন্যান্যদের সঙ্গে রাস্তায় একটি চালা তৈরি করার কথা ভাবতে হবে দেখছি। সেখানে তাঁতশাল ঢেকে রাখা এক বাণ্ডিল টিন আছে না; তা দিয়েই ছিন্ন রাস্তার একপ্রান্তে একটা চালা তৈরি করে নেওয়া যেতে পারে। ভালো করে ভোর হতে আর বেশি বাকি নেই। বৃষ্টিও একটু কমেছে বলে মনে হচ্ছে। কলাগাছের ভেলায় করে বেরিয়ে রাস্তার দিকে জোরে একটা আওয়াজ দেবেন।বুধিরাম নৌকাটা নিয়ে এলে প্রত্যেকেই রাস্তায় চলে যাব।আমি জিনিসপত্র গুলো গুছিয়ে নিচ্ছি।’
মেখেলাটা গুটিয়ে কোমরে গুঁজে নিয়ে সোহাগী শোওয়া চাঙ থেকে মেঝেতে আলোড়ন সৃষ্টি করে জলে নামল। হাতে প্রদীপটা নিয়ে সে দুই এক পদ জিনিস গোছাতে লাগল। এটা দুতলার ভিটে। বন্যার ভয়ে কোনো কোনো বাড়ির ভিটে জনগণ অনেক উঁচু করে বাঁধে। জল বেশি হলে অন্য ঘর গুলি ডুবিয়ে ফেললেও দোতলায় আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। তবে এই বন্যা একটা রাক্ষসীর মতো এসেছে। এখন এই উঁচু ভিটেতেও এক হাঁটু জল।কে জানে আরও কতকিছু তলিয়ে যাবে!
সে গলার আওয়াজটা একটু চড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকা মেয়েদের জাগাতে চেষ্টা করল। তবে ছোটো মেয়েটি ঘুমে বিভোর হয়েছিল। বন্যার ভয়ে অন্য দুজন জেগেই ছিল। তার মধ্যে মায়ের ডাকে বড়ো মেয়ে এবং মেজ মেয়েকে প্রস্তুত করল।
প্রদীপটা নিয়ে সোহাগী উনুনের কাছে গেল।রান্নাঘরের উনুনও তখন জলের নিচে। আগের দিন বিকেলে সেগুলি জলে ডুবুডুবু ছিল। ভিতের নিচের অংশ থেকে আসা কেঁচো কেন্নো সেখানে বাসা বেঁধেছিল। সোহাগী রান্না করার সময় ছোটো মেয়েটি এগিয়ে আসা কেঁচো এবং পোকা মাকড় খুন্তি দিয়ে সরিয়ে রাখতে হচ্ছিল। খেতে খেতে রান্না করার উনুনটা প্রায় ডুবে গিয়েছিল। হাড়ি কড়াই মাচার উপর উঠিয়ে রেখে তবেই ভাত মুখে দিতে পেরেছিল।
জল চারপাশটা ডুবিয়ে দিল। শুধুমাত্র ঘরের ভিতটা জেগে থাকার চেয়ে ডুবে যাওয়াই ভালো। না হলে কেঁচো কেন্নো, সাপ-বেঙ, পোকামাকড়ের বাসা হয়ে উঠবে। জল শুকালে ও কেঁচোর গন্ধে সম্পূর্ণ অঞ্চলটি একাকার হবে।মুখে গামছা বেঁধে এই সমস্ত নোংরা পরিষ্কার করার জ্বালা সোহাগী অনেকবার ভোগ করেছে।
বিকেলে খেয়েদেয়ে, হাড়ি-কড়াই পরিষ্কার করে, থালা-বাসন গুটিয়ে রাখল। নিজে পরা কয়েক জোড়া কাপড় চোপড়, দামোদরের ধুতি-পাঞ্জাবি দুটি কাপড়ের পুঁটলি বেঁধে নিল। মেয়েদেরকেও প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় নিয়ে নিতে বলল। বড়ো ট্রাংকটাতে থাকা গহনা গুলি কিছু সঞ্চিত টাকা পয়সা বের করে ছোটো ট্রাঙ্কে ভরিয়ে নিল।ঝেড়ে-ঝুড়ে বের করে রাখা চালের টুকরিগুলি, বড়ো চালায় বীজের জন্য তুলে রাখা কিছু আলু, দুটি কুমড়ো এবং আগেই তুলে না রাখা শাকসব্জি যা ছিল সেগুলিও গুছিয়ে নিল। বাকি কিছু দরকার হলে পরে নিতে পারবে।
ছোটো মেয়েটিকেও ঠেলা ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দিয়ে নৌকা আসার অপেক্ষায় সে উৎকর্ণ হয়ে রইল।বুধিরাম ডাকা পর্যন্ত।
ইতিমধ্যে পৃথিবীতে আলো নেমে এসেছে। কাক ভোরে সেদিন ডাকার জন্য অবশ্য কোনো কাক ছিল না। তবে ঘরের ভেতরে ঝুলিয়ে রাখা খাঁচার মধ্যে পায়রা দুয়েকটি কূজন করছিল। সাত দিনের টানা বৃষ্টিতে হয়তো অন্য পাখিরা বের হতে পারছিল না। তাই হয়তো কাক ভোরেও সমস্ত কিছু নীরব-নিস্তব্ধ। পাখি আসবে কীভাবে,অন্যে ছড়িয়ে দেওয়া ক্ষুদ কুড়ানো উঠোনটা এখন জলের নিচে।
আহারের সন্ধানে বৃষ্টিতে কাক-ভিজে বেড়ানো শালিক, কপোত অথবা মেঘ বাতাসের সঙ্গে যুদ্ধ করে আকাশ পথে উড়ে যাওয়া বকের উড়া বর্ষার সুলভ দৃশ্য। এরকম দৃশ্যে চোখ দেওয়ার মতো অবকাশ দামোদর সোহাগীর নেই, বন্যায় বিপর্যস্ত কারোরই ছিল না। সেদিনের ভোর পাখির কলকাকলিতে হয়নি; হয়েছিল ঘোলা জলের স্রোতে। সেটি একটি গুমোট ভোর, সূর্য নেই, শুধু আলোর আবেশ ছিল।
তবে তার মধ্যেও কোথা থেকে দাঁড়কাকটা এসে হাজির হল। উঠনের পাশে জল থেকে দুহাতের মতো উপরে বেরিয়ে থাকা কাপড় মেলার মোটা তারটার ওপরে বসল এবং দামোদরের চোখের দিকে তাকিয়ে কা কা করে দুটো বিকট চিৎকার করে উঠল। তার চিৎকারে সাত দিনের অনাহারের কথা নাকি অন্য কিছু! শুকনো খরকুটা ঠোঁটে ধরে সে দিতে চাইছিল কি বিপদের আগমনী বার্তা, দামোদর তা ভেবে উঠার আগেই সে উড়ে গেল। আর নানা জনের মুখে ‘কাক চরিত’এর আখ্যান শোনা দামোদরের বুকটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল।
দামোদর উঠোন থেকে মনে করল–আসা যাওয়ার পথে সবসময় দেখা তার পাশের বুধিরামের বাড়িটাও আধার বেশি জলে ডুবে নতুন রূপ লাভ করেছে।বুধিরামের পরিবারটা দুজনের–স্বামী স্ত্রী।ঘরটা ছোটো।ক্রোধ বা কৃত্রিমতাবিহীন,পরিচ্ছন্নভাবে সাজানো-গোছানো।আগের দিন বিকেল বেলায় বাড়ি খালি করে ওরা পথে নেমে চালা তৈরি করে বসবাস করছে।
দামোদরের নৌকাটাও বুধিরামের সঙ্গে আছে। গ্রামে প্রত্যেকের বাড়িতে নৌকা নেই; তিনভাগের একভাগ মানুষের আছে। বন্যার হাত থেকে বাঁচার চেয়ে অন্যান্য অনুষ্ঠানাদিতে নৌকার বেশি প্রয়োজন। আলি বা পথ ছিন্ন না হলে ফিরে যাওয়া বন্যার জল এরাবারীতে এতটা উপদ্রব করে না। অল্প জল বিরক্ত করলেও কখনও কোনো বছরে হয়তো নৌকা নিয়ে প্রাণ বাঁচানোর মতো অবস্থা হয়।তাই মাছ ধরা, ঘাস কাটা ইত্যাদি কাজেই নৌকার ব্যবহার বেশি। তার জন্য বাড়ি বাড়ি নৌকা না হলেও চলে। তাছাড়া একটা নৌকা কিনতে পারার মতো সবার সামর্থ্যও নেই। এক ঘর পাশের ঘরের নৌকা ব্যবহার করে। ভাইয়ে ভাইয়ে মিল থাকলে একটি সার্বজনীন নৌকা হলেও চলে। বুধিরাম এবং দামোদরের মধ্যে একটিই নৌকা।
আগের নৌকাটার কাঠ পচে গিয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে উঠল। বাগানের পরিপুষ্ট পেয়ারা গাছের ডাল ফালা করে, শালমরার কুমারগ্রাম থেকে দামোদর আড়াই হাত গভীর এবং কুড়ি হাত লম্বা নৌকাটা তৈরি করে নিয়েছে। খরালি গ্রামের সামনের খাড়াইতে খুঁটি পুঁতে নৌকাটা ডুবিয়ে রাখে। তবে রোদে তলা ফেটে যাবার ভয়ে সেটি কখনও মানুষ লাগিয়ে টেনে এনে ভাঁড়ার ঘরের ছাদের ঠিক নিচে কাঠের গড়ের উপরে তুলে রাখে। বন্যার সময় ওটি কেবল তারই নয়,ভাই ছাড়া অন্য কয়েকটি মানুষজনের ও সারথি–অন্ধের যষ্টি।
এরাবারী গ্রামের সামনের এই খালটা পিডব্লিউডি রাস্তা বাঁধানোর জন্য মাটি তোলার ফলেই সৃষ্টি হয়েছে।পরে গ্রামের রাস্তাটা বাঁধানোর জন্য পূর্বের খালগুলি থেকে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে ক্রমান্বয়ে গভীরতা লাভ করে একটা প্রকাণ্ড খালে পরিণত হয়েছে।কচুরিপানায় ভরে গিয়ে পরে সেটা একটি গভীর পুকুরের রূপ লাভ করে।এটা গ্রামের সৌন্দর্য ম্লান করবে জানতে পারলে,রাস্তার সঙ্গে যোগাযোগে অসুবিধার সৃষ্টি করবে জানলে মানুষগুলি রাজপথটাকে গ্রামের পথে যেতে দিত।
দাদার মুখ থেকে দামোদর জানা মতে পিডব্লিউডি বিভাগও নাকি রাজপথটাকে সেভাবে বাঁধাতে চেয়েছিল।কমলাবাড়ি থেকে গড়মূর হয়ে জেংরাইমুখী রাস্তাটা এরাবারী গ্রামের গায়ে লাগিয়ে বাঁধাতে চাইছিল।পরে জনগণ রাজি হল না।গ্রামের পথ দিয়ে মোটর চললে ছেলে-শিশু চাপবে বলে ভয়ের জন্যই সেই গ্রাম থেকে সরিয়ে নিয়ে বাঁধানোর জন্য বিভাগকে অনুরোধ করল।তারফল এখনকার জনগণ ভুগছে।বর্ষায় রাস্তায় যেতে হলে নৌকার প্রয়োজন হয়।নাহলে পুরো গ্রামটা একপাক ঘুরে আসতে হবে।তাছাড়া সেইসময়ের জনগণের অহেতুক ভয় এখন নোংরা খালের কারণ হয়ে জনগণকে ভোগায়।
নৌকাটা না থাকায় উঠোন-বাগানে এদিক ওদিক করার জন্য বিশেষ করে বাঁশগাছের ঝোপে গিয়ে প্রাতঃকৃত্যাদি করতে সুবিধা হওয়ার মতো করে তৈ্রি করে নেওয়া কলাগাছের ভেলায় উঠে লাঠির সাহায্যে দামোদর সেটাকে বাগানের দিকে ঠেলে নিল।নৌকায় যেমন তেমন,স্রোতের মধ্যে পড়ে গেলে ভেলা সামলানো কঠিন।সে ভেলাটাকে স্রোতের কবল থেকে বাঁচিয়ে পাশ দিয়ে বেয়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করল।ভেলাটা যখন বাঁশঝোপের কাছে গিয়ে পৌছাল,দেখল-জঙ্গলটাকে চাপ দিয়ে সমগ্র গ্রামের পেছনে কচুরিপানা একটি বৃহৎ সবুজ তৃণভূমির সৃষ্টি করেছে।স্রোতের চাপে সেইসব বাঁশঝাড়ের গায়ে গিয়ে স্তূপীকৃ্ত হয়েছে।বাঁশঝাড়ের ঝোপটা প্রতিরোধ না করলে কচুরিপানা সম্ভবত গ্রামটিকে ভাসিয়ে নিয়ে যেত।ভেলাটা বাঁশগাছে বেঁধে পাশের জলে শৌ্চাদি সম্পন্ন করে বাড়িতে ফিরে আসার সময় স্রোতের মধ্যে পড়ে ভেলার গতিবেগও বেড়ে গেল।উঠোনে পৌছে সে লক্ষ্য করল–বন্যার জল ভাঁড়ারের মাচা স্পর্শ করতে খুব বেশি বাকি নেই।কোনোভাবে যদি জলটা থেমে যেত-সে ভাবল।স্রোতের গতি দেখে এরকম মনে হল যেন নদীর স্রোত উঠোনের পাশের গোয়ালঘর –ভাঁড়ার ঘর সমস্ত কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।যদি সত্যিই সেরকম কিছু ঘটে –কথাটা ভেবে সে ভেতরে ভেতরে ভয় পেয়ে গেল।
নিরবচ্ছিন্ন বৃষ্টির ধারাটা তখন কিছু পরিমাণে থেমেছে। উঠোনের পাশে বারান্দার খুঁটিতে ভেলাটা বেঁধে সে ঘরের প্রায় সামনে থাকা ছিন্ন রাস্তাটার দিকে তাকাল–ওটা দিয়ে শো শো করে জল বয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ভেসে যাচ্ছে কচুরিপানার গর্ত। তার ঘরের প্রায় সামনে থাকা নামঘরটা রাস্তার একটা প্রান্ত চোখের আড়াল করে রেখেছে। পাশেই নাম ঘরের মাটিতে থাকা চালতে গাছ। তার মধ্যে লেগে আছে স্রোতে ভেসে আসা আবর্জনার স্তূপ।
দামোদর রাস্তার দিকে তাকাল। তার চোখে পড়া একটি প্রান্তে মানুষগুলোর ব্যস্ততা বেড়েছে। গাছের ডাল এবং বাঁশের জেং বহন করা এদিক-ওদিক করছে। পি ডব্লিউ ডির কোনো মুহুরি জাতীয় লোক আসছে নাকি? তার মধ্যে বুধিরামকেও অস্পষ্টভাবে দেখে দামোদর নাম ধরে চিৎকার করল–ঐ বুধি, নৌকাটা নিয়ে আয়।’সে শুনতে পেল কিনা বোঝা গেল না।পেছনদিকের বাঁশ বাগানে ধাক্কা খেয়ে কণ্ঠস্বরটা স্রোতের মধ্যে বিলীন হয়ে গেল।
ছিন্ন হয়ে যাওয়া রাস্তাটা প্রশস্ত হওয়ার ফলে স্রোতও বাড়তে শুরু করেছে। বারান্দার খুঁটিতে বেঁধে রাখা ভেলাটা থেকে স্রোতের চাপ সেটাতেও যেন কম্পনের সৃষ্টি করছে। উঠোনের প্রান্তে ভাঁড়ার এবং গোয়াল ঘরের কাছে স্রোতের বেগ বেশি হয়েছে, সেখানে সম্ভবত স্রোত খুঁটির গোড়া গুলিকে আঘাত করছে। স্রোতের চাপ মূল ঘরটাতে খুব বেশি পড়ে নাই যদিও বেড়ার মাটি খসে পড়ছে, পোলার মাটি খসে পড়ছে।, সেই জায়গাগুলোতে ইকরার ফাঁক দিয়ে ভেতরের স্রোতে ঢুকে নদী ঘরের ভেতরে কী যেন খোঁজ করছে।
এভাবে চলতে থাকলে ঘরটাকে হয়তো বাঁচানো যাবে না– দামোদর ভাবল। ওদের পাশে থাকা রজত হলিরামদের পরিবারের সমস্ত মানুষ রাতের বেলাতেই বাড়ি ছেড়ে পথে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। বাঁশ ঝোপের পাশে হওয়ার ফলে বুকে সাহস বেঁধে, খুব একটা অপকার হবে না ভেবে,দামোদর ঘরের ভেতরে রইল। ভাই তাকে বারবার রাস্তায় যাবার জন্য জোর করেছিল। মেয়েরাও তাতে সায় দিয়েছিল। তবে সেই কি যেন ভেবে গেল না।
একটু একটু করে জল গড়িয়ে গেলেও ওদের সামনের দিকটাতেই ছিঁড়বে, সে কথা সে ভাবতে পারেনি। এই জায়গার পথটা কিছু মজবুত এবং উঁচু বলে সে কেন যেন ভেবেছিল। কিন্তু মানুষের ভাবা অনুসারে প্রকৃতি চলে না। নিজের মতে চলে। তার মধ্যে মানুষের বাধা, বিরোধ প্রতিরোধ অনেক সময় অর্থহীন।
ইতিমধ্যে গ্রামের আগের খালটা একটি বেগবতী নদীর রূপ নিয়েছিল। এই নদী ছিন্ন জায়গাটা নিরন্তর ভাবে বড়ো করার চেষ্টা করছিল। মানুষগুলিও সেটা বন্ধ করার জন্য বৃথা চেষ্টা করছিল।। বেশি স্রোত হয়েছিল।ঘূর্ণিপাকের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই পাকে কচুরিপানার স্তূপে ঢুকে আবার বেরিয়ে যাবার দৃশ্য দেখে তীরের মানুষ সত্যিই ভয় পেয়েছিল।কিন্তু সেই স্রোতের মধ্যে ছিন্ন রাস্তার কাছে নৌকা নিয়ে মৃত্যুর মুখে পা রেখে অনেকে জিনিসপত্র এবং মানুষ উদ্ধার কাজে প্রবৃত্ত হয়েছিল।
বারান্দায় বেঁধে রাখা ভেলাটা থেকে জলে নেমে দামোদর ভেতরে পা রেখেছে মাত্র ;ঠিক তখনই রাস্তায় হইচই শোনা গেল।চিৎকার চেঁচামিচি আর হুলুস্থুল।বাইরে বেরিয়ে সে রাস্তার দিকে তাকাল-লোকগুলি যেন ছটফট করছে,গ্রামের দিকে আঙ্গুল দিয়ে কিছু একটা দেখাচ্ছে।কেউ কপালে হাত রেখেছে।কেউ পথের উপরেই বসে পড়েছে।
তার কানে এসে পড়ল উচ্চস্বরে হরিধ্বনি-যেন কীর্তন সভায় গোঁসাই সেবার্থী জনগণকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া আশীর্বাদের মধ্যে গুঁজরে উঠা জনগণের সামগ্রিক হরিধ্বনি।কী ঘটছে তা বোঝার জন্য উৎসুক হয়ে থাকার সময় তার কানে পড়েছে চিৎকার-চেঁচামিচির মধ্যে উচ্চারিত দুটি শব্দ-‘নামঘর…নামঘর…প্রধান খুঁটি…প্রধান খুঁটি।’
অর্ধেকটার মতো জলে ডুবে থাকা নামঘরটার দিকে সে তাকাল-বেত গাছের কামি দিয়ে ফাঁক ফাঁক করে নামঘরটা বেড়া দেওয়া চিকগুলির ফাঁকগুলি দিয়ে স্রোত গড়িয়ে যাচ্ছে।স্রোত নামঘরের খুঁটিগুলিতে আঘাত করছে।না,জলের স্রোত শিকগুলিকে ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে না।তাহলে নামঘরের দিকে অঙুলি নির্দেশ করে জনগণ চিৎকার করছে কেন,প্রত্যেকেই হরিধ্বনি দেওয়ার কারণ কি?দামোদর চিন্তা করতে লাগল।
নামঘরের টিনের দিকে তাকিয়ে দামোদরের চোখ হঠাৎ স্থির হয়ে গেল।টুইয়ের উপরের দিকে হাতি বসে পড়ার মতো একটা প্রকাণ্ড ভাঁজের সৃষ্টি হয়েছে।সেই অংশটা যেন নিচের দিকে বসে গেছে।টুইটা বসে যাবার কারণটা জানতে পেরে মানুষগুলির হইচইয়ের কারণটা সে বুঝতে পারল।স্রোত খুঁটির গোড়ায় আঘাত হেনেহেনে দুর্বল করে ফেলা প্রধান খুঁটিটা হেলে পড়ার জন্যই নামঘরের চ’তি এবং টিনগুলি নিচে বসে গেছে।যদি খুঁটিটাও গড়িয়ে পড়ে।এইবার দামোদর সত্যি বিব্রত হল।তার ভয় করতে লাগল।
তাহলে নামঘরটাই থাকবে না।সেটা গড়িয়ে পড়লে বা ভেসে গেলে তার থেকে হতে পারা বিপদের কথা ভেবে সে বিব্রত হয়ে পড়ল।বন্যায় ঈশ্বর এবং ঈশ্বরের আলয় যদি নিস্তার নেই আমরা কোন ছার-সে ভাবল আর সোহাগীকে চিৎকার করে ডাকল— ‘ঐ শুনছ কি? জিনিসগুলি তাড়াতাড়ি ঠিক কর।নামঘরটাই ভেসে যাবে হয়তো।আমাদের বাড়িগুলি থাকবে কি,থাকবে না কে জানে।তাড়াতাড়ি রাস্তায় গিয়ে উঠতে হবে।এই জাহান্নামে যাওয়া বুধিরামও নৌকাটা নিয়ে এল না।কয়েকবার যে চিৎকার করলাম।সে শুনেছে কি না!’
‘ঐ বুধিরাম, নৌকাটা নিয়ে আয়।’-দামোদরের আহ্বানটা এইবার বিপদে পড়া মানুষের চিৎকারের মতো শোনা গেল।রাস্তায় সমবেত অগণিত মানুষের কোলাহলের মধ্যে এই আহ্বান বুধিরামের কানে পড়েছে কিনা জানারও উপায় হল না।দামোদর ছটফট করতে লাগল।রাস্তার মানুষের কোনোভাবে চোখে পড়ুক বলে ভেলায় উঠে সে হাতের ইশারায় ডাকতে লাগল।
( চলবে )


