বিশ্ব সাহিত্য
বিবেক চট্টোপাধ্যায়
বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে গ্রীক ট্র্যাজেডি মানুষের নিয়তি, অহংকার এবং অসহায়তার এক চিরন্তন দলিল। এই ট্র্যাজেডির কেন্দ্রবিন্দুতে যে কয়টি চরিত্র মানবমনের গভীর ক্ষত এবং ভাগ্যের নির্মমতাকে ফুটিয়ে তুলেছে, তাদের মধ্যে থিবসের রানী জোকাস্তা (Jocasta) অন্যতম। সোফোক্লিসের ‘ইডিপাস রেক্স’ (Oedipus Rex) নাটকের এই কেন্দ্রীয় চরিত্রটি মূলত ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের শিকার – এর এক চিরন্তন প্রতীক। নিজের অজান্তে জড়িয়ে পড়া অজাচার (Incest), পারিবারিক গোপন সত্য এবং নিয়তিকে ফাঁকি দেওয়ার এক মরিয়া চেষ্টা কীভাবে একটি জীবনকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে—জোকাস্তা তারই জীবন্ত উদাহরণ। সাহিত্য ও পৌরাণিক কাহিনীতে জোকাস্তার এই পতন একক কোনো ঘটনা নয়; বরং বিশ্বসাহিত্যের একাধিক নারী চরিত্রের মধ্যে এই একই ট্রাজিক সুর, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এবং পারিবারিক বিপর্যয় লক্ষ্য করা যায়।
জোকাস্তা ও সমসাময়িক ট্রাজিক চরিত্রের তুলনামূলক পরিমণ্ডলের কথায় এবার আসি। জোকাস্তার জীবনের ট্র্যাজেডি, তাঁর মানসিক যন্ত্রণা এবং নিয়তির সাথে লড়াইয়ের ধরনটিকে বুঝতে হলে সাহিত্যের অন্যান্য সমান্তরাল চরিত্রের সাথে তাঁর তুলনা করা আবশ্যক।
জোকাস্তার ট্র্যাজেডির সবচেয়ে বড় প্রতিচ্ছবি হলেন তাঁর নিজের ছেলে এবং স্বামী ইডিপাস। দুজনের নিয়তি একই সূত্রে গাঁথা। জোকাস্তার মতোই ইডিপাসও সারা জীবন একটি অভিশপ্ত ভবিষ্যদ্বাণী এড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে তিনি নিজেই তা পূরণ করেন। তবে এই দুই চরিত্রের বিপর্যয়ের প্রকৃতি ভিন্ন। জোকাস্তার ট্র্যাজেডি মূলত অভ্যন্তরীণ—যেখানে মাতৃত্ব এবং পত্নীত্বের ভূমিকা একে অপরকে গ্রাস করে। অন্যদিকে, ইডিপাসের ট্র্যাজেডি বাহ্যিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক। “অ্যানাগনোরিসিস” বা সত্য প্রকাশের চূড়ান্ত মুহূর্তে দুজনেই তাঁদের সামাজিক মর্যাদা, পরিবার এবং মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।
এবারে আসি ইউরিপিডিসের ‘হিপোলাইটস’ নাটকের রানী ফেড্রার কথায়। যে নিষিদ্ধ আকাঙ্খার দহনে জ্বলেছে। যার সাথে জোকাস্তার সাদৃশ্য রয়েছে নিষিদ্ধ সম্পর্কের টানাপোড়েনে। তবে এই দুই চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক তফাত স্পষ্ট। জোকাস্তা যেখানে সম্পূর্ণ অজান্তে অজাচারের অপরাধে জড়িয়ে পড়েছিলেন, ফেড্রা সেখানে তাঁর সৎ ছেলে হিপোলাইটসের প্রতি নিজের পাপপূর্ণ অনুভূতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন। ফেড্রার ট্র্যাজেডি ছিল তাঁর জৈবিক আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক কর্তব্যের মধ্যকার এক অন্তহীন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। তবে এই দুই নারীর পরিণতির পথ ছিল এক—উভয়েই অসহ্য সামাজিক কলঙ্ক এবং আত্মগ্লানি থেকে বাঁচতে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
শেকসপিয়রের ‘হ্যামলেট’ নাটকের রানী গার্ট্রুড। ইনি হলেন জোকাস্তার এক আধুনিক ও রাজনৈতিক সংস্করণ। দুজনেই এমন রানী যারা মা এবং স্ত্রী—এই দুই বিষম ভূমিকার গোলকধাঁধায় বন্দি হয়ে পড়েছিলেন। হ্যামলেটের সাথে গার্ট্রুডের সম্পর্কের অবচেতন স্তরে “ইডিপাস কমপ্লেক্স” (Oedipus Complex)-এর উপস্থিতি নিয়ে সাহিত্যে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। জোকাস্তার মতোই গার্ট্রুডও তাঁর নতুন স্বামীর অপরাধের ব্যাপারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এক প্রকার অন্ধত্ব বজায় রেখেছিলেন। জোকাস্তার আত্মহনন যেমন থিবস নগরীর শান্তি কেড়ে নিয়েছিল, গার্ট্রুডের মৃত্যুও তেমনি ডেনমার্কের রাজবংশের চূড়ান্ত পতন ডেকে আনে।
মাতৃত্বের এক ভিন্ন রূপ পাওয়া ক্লাইটেমনেস্ট্রা ও হেকিউবার মধ্যে। গ্রীক পুরাণের এই দুই রানী জোকাস্তার মতোই মাতৃত্বের চরম মূল্য চুকিয়েছিলেন। জোকাস্তা যেখানে ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেন, ক্লাইটেমনেস্ট্রা সেখানে প্রতিশোধের তরবারি নিজের হাতে তুলে নেন। আবার ট্রয়ের রানী হেকিউবারের গল্পটি জোকাস্তার মতোই মানুষের সহ্যশক্তির শেষ সীমাকে স্পর্শ করে, যেখানে তিনি নিজের চোখের সামনে পুরো বংশ এবং সাম্রাজ্যের ধ্বংস প্রত্যক্ষ করেন।
আবার আমরা ভারতবর্ষের পুরাণের দিকে তাকাই সেখানেও ট্রাজিক উপাদান পাব। প্রথমেই আসি কুন্তীর কথায়। কুন্তী কর্ণের পরিচয় সারা জীবন অবদমিত করে রেখেছিলেন। লোকলজ্জা এবং সামাজিক সম্মানের ভয়ে তিনি নিজের মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষাকে অবচেতন মনে চেপে রাখেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে কর্ণের মুখোমুখি হওয়া তাঁর সেই দীর্ঘকালীন অবদমনের এক চূড়ান্ত মনস্তাত্ত্বিক বিস্ফোরণ। কুন্তীও সদ্যোজাত কর্ণকে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। মহাভারতের যুদ্ধে যখন তিনি জানেন যে তাঁর এক সন্তান (অর্জুন) অন্য সন্তানের (কর্ণ) মুখোমুখি হবেন, একে অপরকে হত্যা করতে উদ্যত হবেন, তখন তাঁর মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন চরম আকার ধারণ করে। তিনি যুদ্ধের আগে কর্ণের কাছে গিয়ে নিজের মাতৃত্বের অধিকার দাবি করেন, যা তাঁর দীর্ঘদিনের পাপবোধ মোচনের এক মরিয়া চেষ্টা ছিল। পরশুরামের মা রেণুকা যখন গন্ধর্বরাজের জলক্রীড়া দেখে মনে মনে ক্ষণিকের জন্য বিচলিত হয়েছিলেন, তখন তাঁর স্বামী জমদগ্নি তাঁর মানসিক ব্যভিচার ধরতে পারেন। রেণুকার অপরাধবোধ তাঁর নিজের মনস্তত্ত্বকে অবশ করে দিয়েছিল, যার কারণে পুত্র পরশুরাম যখন কুঠার নিয়ে তাঁর শিরশ্ছেদ করতে আসেন, তিনি কোনো প্রতিরোধ করেননি। মনস্তত্ত্বে চরম মানসিক আঘাত বা ট্রমার বহিঃপ্রকাশ ঘটে নীরবতায়। জোকাস্তা যখন চূড়ান্ত সত্য বুঝতে পারেন, তিনি চিৎকার না করে নিঃশব্দে শোবার ঘরে চলে যান এবং দরজা বন্ধ করে দেন। কুন্তীর জীবনেও এই দীর্ঘ নীরবতা ছিল তাঁর মানসিক যন্ত্রণার প্রধান কারণ, যা তিনি যুধিষ্ঠিরের কাছে কর্ণের মৃত্যুর পর প্রকাশ করেন।
পুরাণের কিছু রূপক গল্পে অনিচ্ছাকৃত বা নিয়তি-তাড়িত অজাচার (incest)-এর ইঙ্গিত মেলে। পুরাণের অন্যতম বিখ্যাত ও বিতর্কিত ঘটনা হল মহাবিশ্বের স্রষ্টা ব্রহ্মা তাঁর শরীর থেকে এক সুন্দরী নারীর সৃষ্টি করেন, যিনি সরস্বতী বা শতরূপা নামে পরিচিত। ব্রহ্মা তাঁর নিজের সৃষ্ট এই কন্যার সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন। সরস্বতী ব্রহ্মার দৃষ্টি এড়াতে বিভিন্ন দিকে পালিয়ে যান, যার ফলে ব্রহ্মার চার দিকে চারটি মুখের সৃষ্টি হয়। ভারতীয় পুরাণে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করা হয়েছে এবং এই পাপের কারণেই মর্ত্যে ব্রহ্মার কোনো পূজা করা হয় না।
ঋগ্বেদের ১০ম মণ্ডলে যম ও যমী নামের যমজ ভাই-বোনের একটি সুপরিচিত সূক্ত রয়েছে। সেখানে বোন যমী মানবজাতির বংশবৃদ্ধির দোহাই দিয়ে ভাই যমের সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ভাই যম স্পষ্ট ভাষায় এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। তিনি এটিকে অধর্ম এবং এক চরম পাপ বা অপরাধ হিসেবে গণ্য করে বোনকে বোঝান যে, দেবতারা সবসময় মানুষের ভালো-মন্দ কাজ পর্যবেক্ষণ করছেন।
ঋগ্বেদ এবং শতপথ ব্রাহ্মণে প্রজাপতি বা দ্যাউস (আকাশের দেবতা) কর্তৃক তাঁর নিজের কন্যা ঊষার (ভোর) প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার বিবরণ আছে। এই সম্পর্ককে বৈদিক সাহিত্যে অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে দেখা হয়েছে। অন্যান্য দেবতারা প্রজাপতির এই আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে রুদ্র বা শিবকে সৃষ্টি করেন, যিনি প্রজাপতিকে শাস্তি দিতে তাঁর দিকে তীর নিক্ষেপ করেন।
জোকাস্তা এবং তাঁর সমগোত্রীয় চরিত্রগুলোর পতনের অন্তরালে কিছু নির্দিষ্ট ট্রাজিক উপাদান কাজ করে।
এই চরিত্রগুলোর মূল ভুলটি কোনো মন্দ উদ্দেশ্য থেকে আসে না; বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবারকে রক্ষা করার একটি অন্ধ চেষ্টা থেকেই এর জন্ম হয়। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস হল এই চরিত্রগুলো সমস্যা বা অভিশাপ থেকে যত দূরে পালানোর চেষ্টা করে, অলক্ষ্যে তত দ্রুত তারা সেই ধ্বংসের দিকেই এগিয়ে যায়। প্রাচীন গ্রীক ও এলিজাবেথীয় ট্র্যাজেডিতে অভিজাত নারীদের সামাজিক, নৈতিক এবং পারিবারিক পৃথিবী যখন পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, তখন আত্মসম্মান ও মর্যাদা রক্ষার শেষ অবলম্বন হিসেবে আত্মহত্যাই ছিল একমাত্র পথ।
আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জোকাস্তাকে কেবল ভাগ্যের এক নিষ্ক্রিয় পুতুল হিসেবে দেখা ভুল হবে। তাঁর চরিত্রের মধ্যে একটি তীব্র “ইচ্ছাকৃত অন্ধত্ব” বা সত্যকে অস্বীকার করার প্রবণতা ছিল। যখন ইডিপাস তাঁর অতীতের সত্য উদঘাটন করতে মরিয়া, তখন জোকাস্তা তাঁকে বারবার থামানোর চেষ্টা করেন। তাঁর সেই উক্তি—“যেমনভাবে পারা যায়, কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে জীবন বাঁচানোই শ্রেয়”—প্রমাণ করে যে, তিনি সত্যের চেয়ে পরিবারের স্থায়িত্ব এবং কৃত্রিম শান্তিকেই বেশি প্রধান্য দিচ্ছিলেন। তিনি অবচেতনভাবেই হয়তো সত্যটি জানতেন, কিন্তু তা প্রকাশ করার সাহস বা মানসিক প্রস্তুতি তাঁর ছিল না।
সোফোক্লিসের মূল নাটকে জোকাস্তা সত্য জানার পর কোনো জোরালো প্রতিবাদ না করে, নীরবে মঞ্চ ত্যাগ করেন এবং অন্তরালে গিয়ে আত্মহত্যা করেন। তবে আধুনিক সাহিত্যিক ও নাট্যকারেরা এই “নীরবতা”-কে নতুনভাবে পুনর্নির্মাণ করছেন। সমসাময়িক বিভিন্ন রূপান্তর বা অ্যাডাপ্টেশনে জোকাস্তাকে কেবল একজন ট্রাজিক মা বা স্ত্রী হিসেবে না দেখিয়ে, একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং নিজের সিদ্ধান্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা নারী হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আধুনিক লেখকেরা তাঁর নীরব আত্মত্যাগকে সমাজের পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন, যেখানে তিনি নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পান।
পরিশেষে বলা যায়, জোকাস্তা কেবল প্রাচীন গ্রীসের কোনো পৌরাণিক রানী নন, বরং তিনি মানব নিয়তির এক শাশ্বত রূপক। হাজার বছর ধরে তাঁর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের জ্ঞান ও চেষ্টার একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে, যার বাইরে নিয়তি বা প্রকৃতির নিয়ম কাজ করে। একই সাথে, গার্ট্রুড, ফেড্রা, কুন্তি বা রেণুকার মতো চরিত্রদের সাথে তাঁর সাদৃশ্য প্রমাণ করে যে, কাল ও সংস্কৃতির সীমানা পেরিয়ে মাতৃত্বের সংকট, সামাজিক কলঙ্কের ভয় এবং সত্যের মুখোমুখি হওয়ার মনস্তাত্ত্বিক লড়াই মানুষের চিরন্তন এক ট্র্যাজেডি।



