২ : আলোর পথযাত্রী

২ : আলোর পথযাত্রী

আলোর পথযাত্রী - বিতস্তা ঘোষাল

আলোর পথযাত্রী

২ : আলোর পথযাত্রী

…সৃষ্টির শেষ রহস্য, ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব সেন

“…সৃষ্টির শেষ রহস্য,ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব সেন

কর্তার সিং দুগ্গল: এক বিরল স্রষ্টা

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন  

জীবনের জলছবি : প্রতিভা বসুর জন্মদিনে

দিনটা ছিল ১৪ মার্চ, বৃহস্পতিবার, সালটা ২০০২| আগেরদিন রাতে লেখিকা কঙ্কাবতী দত্ত জানালেন ‘কাল দিদানির জন্মদিন, তুমি আসলে ভালো লাগবে।’

এর আগে আমি জানতাম প্রতিভা বসুর জন্মদিন ১৩মার্চ কিন্তু তিনি জানালেন তিথি অনুযায়ী এবার ১৪মার্চ।

সেই প্রতিভা বসু, যাঁর ‘সমুদ্রহৃদয়’, ‘আলো আমার আলো’, ‘মেঘের পরে মেঘ’, ‘মনময়ূরী’, ‘মধ্যরাতের তারা’, ‘অভিশপ্ত সাধনা’, ‘ভালোবাসার জন্ম’, ‘সেইদিন সকালে’ সহ একাধিক গল্প, উপন্যাস আমার পড়া। তাঁর লেখা গল্প বা উপন্যাসে ব্যবহৃত বিষয়বস্তু যেমন খুব জটিল বা কুটিল নয়, তেমনি তাঁর ভাষা শৈলী ও সরল, ঝরঝরে ও স্নিগ্ধ; ছোট ছোট বাক্যের বিন্যাস গল্পের গতিকে কখনো রুদ্ধ করে দেয়না। তাঁর লেখার চরিত্ররা শেষ অবধি মিলনাত্মক, নারীএখানে অনেকটাই সংসারধর্মী, মমতাময়, ভালোবাসার কাঙাল, আবার মানুষের সরলতা, সততা, মহত্ব-উদারতা, কল্পনা-স্বপ্নর পাশাপাশি তিনি লোভী, ইন্দ্রিয়পরায়ণ, ভীরু, বিদ্বেষী, কুটিল ধরনের মানুষের ছবি ও এঁকেছেন। পাণ্ডিত্য বা কোন নিজস্ব মতবাদ যাকে তথাকথিত ‘ফেমিনিজম’ বলা যেতে পারে এমন কোন কিছুই তাঁর লেখায় নেই। বরং প্রাঞ্জল ও সহজ সরলতাই তাঁর লেখার প্রধান আকর্ষণ।

তাঁর অধিকাংশ গ্রন্থই বাণিজ্যিকভাবে সফলতার মুখ দেখেছে। বেস্ট সেলার লেখিকা তিনি। শোনা যায়, তাঁর জনপ্রিয়তা এমনই ছিল যে বই বিক্রেতা এবং প্রকাশকদের মধ্যে বই প্রকাশ ও বিতরণ নিয়ে ঝগড়ারও ঘটনা ঘটে। এও শোনা যায় বাড়ি করার জন্য যে অর্থ দরকার হয়, তা তিনি লিখেই রোজগার করেছিলেন। তাঁর বেশ কয়েকটি উপন্যাস চলচ্চিত্রায়ণ হয় ও ব্যাপক সফলতা পায়। তার মধ্যে রয়েছে আলো আমার আলো, পথে হল দেরি, অতল জলের আহ্বান ইত্যাদি। কঙ্কাবতীদির স্বামী কল্যান সরকার এইসব গল্প আমাকে বহুবার শুনিয়ে বলেছেন-‘এখনকার সাহিত্যিকরা কেউ প্রতিভা বসু নন।তাঁর লেখা নিয়ে যত সিনেমা হয়েছে, তিনি এখনও যত রয়্যালটি পান তা এখনকার লেখকদের কল্পনার বাইরে।”

সেই প্রতিভা বসু যিনি প্রথম যৌবনে সংগীতশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগনার হাঁসাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ। বাবা আশুতোষ ও মা সরযূবালা দু’জনেই গান ভালোবাসতেন। ছোটো থেকেই সুরেলাকণ্ঠী রানু বা প্রতিভা। বাবা আশুতোষ সোম মেয়েকে যারপরনাই স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। সে স্বাধীনতা শুধু যে পড়াশোনার তা নয়, নাচগান আঁকা নাট্য চর্চা সবেতেই । সমাজের তোয়াক্কা না করে মেয়েকে নামকরা ওস্তাদদের কাছে গান শিখতে পাঠিয়েছিলেন। তখনকার বিখ্যাত ওস্তাদ, চারু দত্তকে গানের মাস্টার রাখা হলো। চারু দত্তর খুব অহংকারী বলে বদনাম ছিলো। তখন তাঁরা আজিমপুরার বাড়িতে থাকতেন, তখনই আশুতোষবাবু একদিন সেধে তাঁকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন।

চারু দত্ত এসে কয়েকখানা গান শোনালেন প্রথমে, তারপর বললেন, ‘শোনো খুকি, আমি কিন্তু খুব কড়া লোক, একশোজন ছাত্র বেছে বড়ো জোর পাঁচজনকে নিই। তুমি যদি তুমি সেই পাঁচজনের এক হয়ে গান শিখতে চাও তাহলে এই লাইনটা শোনো,’

এই বলে গানের একটা লাইন তিনি গেয়ে গেলেন। মস্ত লম্বা লাইন, বলা যায় প্রায় সমস্ত অস্থায়ীটাই তার মধ্যে ধরা আছে এবং সমস্ত লাইনটা শুধু তানের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। বার চারেক গাইলেন তিনি তারপর কাগজে লাইনটা লিখে দিয়ে উঠে যেতে যেতে বললেন, ‘আমার বাড়ির ঠিকানা রেখে গেছি তোমার বাবার কাছে, তুমি যদি চারদিন বাদে তোমার বাবার সঙ্গে গিয়ে আমাকে এ গানটা ঠিক এভাবে গেয়ে শোনাতে পার তাহলেই আমি তোমাকে শেখাবো, নইলে নয়।’

এই প্রস্তাবে রানু খুব খুশি। এ রকম একটা কঠিন সুর তাঁর গলায়ই আসবে না, কিন্তু মায়ের প্রচেষ্টায় তা হয়ে গেল।উনি মাইনে না নিয়েই গান শেখাতে লাগলেন দু তিন মাস পর থেকে। বলতেন, ‘খুকীকে শিখিয়ে মজা।’

এর পর এলেন দিলীপ কুমার রায়। তাঁর কাছেই সবচেয়ে বেশি গান শিখেছিলেন।তাঁর নিজের গান, দ্বিজেন্দ্রলালের গান, অতুলপ্রসাদের গান, এসব তো ছিলই। সবচেয়ে বেশি ছিল নজরুল ইসলামের গান। গলাকে তিনি নানাভাবে খেলাতে শিক্ষা দিলেন। কখনও আস্তে, কখনও জোরে, কখনও মাঝামাঝি। কেমন করে কতটা গড়িয়ে মীড় দিলে লোকের মনে গিয়ে দাগ কাটে, কীভাবে গমক দিলে হৃদয় জেগে ওঠে, গানের ভাষাটাকে কেমন করে অর্থবহ করে তুলতে হয়, সব শিক্ষাই প্রতিভার তাঁর কাছে।

প্রতিভা লিখছেন – “ঐ মার্জিত শিক্ষিত পরিপূর্ণ যুবকটির কাছে আমার শুধু গানের শিক্ষাই হয়নি, কালচার শব্দের অর্থটাও আমি তাঁকে দেখেই ‘প্রথম’ জেনেছিলাম। মাঝে মাঝে সত্যেন বসুর বাড়িতেও গান শেখানোর আসরটা বসাতেন তিনি। সত্যেনদাই এই পরামর্শটা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘তুমি তো তোমার বাবার সঙ্গে প্রাতঃভ্রমণ কর শুনেছি, তা ভ্রমণ করতে করতে এখানে চলে এসো, এখানেই প্রাতরাশ হবে একসঙ্গে, দিলীপ এখানেই গান শেখাবে, তারপর বাড়ি ফিরে যাবে।’”

বাচ্চা বয়েস থেকে হারমোনিয়ম বাজিয়ে বাজিয়ে আঙুল সচল হয়ে গিয়েছিল, তাঁর মুগ্ধতা রানুর উত্তরণ। এই মুগ্ধতাই তাঁকে হারমোনিয়ম বাজাতে এতো উদ্বুদ্ধ করেছিল যে আঙুলের তলায় সাদা-কালো রীডগুলো যেন বাতাসের মতো খেলা করত। তাদের নিয়ে সে যা খুশি করত। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ঝড়ের বেগে চলে গিয়ে ঝড়ের বেগে ফিরে আসত।ওস্তাদজি মাঝে মাঝে তাঁর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতেন। তিনিও প্রায় উপুড় হয়ে পড়ে প্রায় সর্বশক্তি দিয়ে সেই তানের মোকাবিলা করতেন।

ওস্তাদজী বলতেন ‘সাব্বাস! জিতা রহ বেটি জিতা রহ।’

মাত্র এগারো বছর বয়সে প্রথম হিজ মাস্টারস্ ভয়েসে তিনি গান রেকর্ড করেন। রেকর্ড করতে তখন তাঁকে কলকাতা আসতে হয়নি। কর্মকর্তারা ঢাকাতে গিয়েই মেশিন ফিট করেছিলেন। টিকাটুলিতে সুশুংশু রাজার একটি বাড়ি ছিলো। সেই বাড়িটিতেই যন্ত্র ফিট করা হয়েছিলো, সেখানে গিয়েই গান গেয়েছিলেন তিনি। তখন মাইক ছিলো না, ধুতুরা ফুলের মতো দেখতে মস্তবড়ো এক চুভির ভিতর মুখ দিয়ে গান গাইতে হতো। তিন- চারখানা গান রেকর্ড করা হয়েছিলো। তার মধ্যে অতুলপ্রসাদ সেনের ‘বঁধুয়া নিদ নাহি আঁখি পাতে’ গানটি ছিলো।

তিনি লিখছেন- “এই রেকর্ডটি বেরুবার পরে কিঞ্চিৎ বিখ্যাত হয়ে গেলাম। নানা জায়গায় নানা কারণে গানের ডাক পড়তো আমার। একবার একটা স্বদেশীসভায় গান গেয়ে সরলা দেবীর নজরে পড়ে গেলাম। তিনি তখন বীরাষ্টমী ব্রত উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথের মায়ার খেলা নাটকটি অভিনয় করবার জন্য গানের মেয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। ঢাকার সেই কনফারেন্সে তিনি সভানেত্রী হয়ে এসেছিলেন, উদ্বোধন সঙ্গীত, বন্দোমাতরম্ গাওয়া এসব ক্ষেত্রে আমার একচেটিয়া ছিলো। সেই গান শুনেই আমাকে সংগ্রহ করলেন তিনি। তাঁর সঙ্গে কলকাতা এলাম। তখন ঢাকা মেইল একেবারে কাকভোরে এসে শিয়ালদা পৌঁছুতো। সেই শিরশিরে সকালে পৌঁছুলেই দেখা যেতো স্টেশনটি একেবারে ঝকঝকে করে ধোয়ামোছা ফিটফাট। ভোরের রঙ কুয়াশা কুয়াশা থাকতো, বাইরে বেরিয়ে আসতে আসতেই ফুটি ফুটি সূর্যের লাল রঙ ছেয়ে দিতো চারদিকে। দেখা যেতো হোসপাইপ দিয়ে তখন রাস্তা ধুচ্ছে জমাদাররা।

স্টেশনে যে ছেলেটি গাড়ি নিয়ে এসে অপেক্ষা করছিলো তার দিকে তাকিয়ে আর চোখ ফেরাতে পারি না। টাটকা অতসী ফুলের মতো গায়ের রং, কুচকুচে কালো ঘন চুল, আর চোখ, সরলা দেবী বললেন, ‘আমার ছেলে।’ সরলা দেবীর মতো বেশভূষা চলন-বলন সম্পন্ন একজন সুন্দরী মহিলাও যেমন আমার সেই প্রথম দেখা, সরলা দেবীর ছেলের মতো সুন্দর মার্জিত তরুণও আমার সেই প্রথম দেখা।

কিন্তু আরো বিস্ময় অপেক্ষা করেছিলো তাঁর গৃহে তাঁর পুরোনো বালিগঞ্জের এক নাতিবৃহৎ দোতলা বাড়ির অভ্যন্তরে। বাড়ি এসে সরলা দেবী কাঠের সিঁড়ি বেয়ে আমাকে নিয়ে দোতলায় উঠে এলেন। একটা ঘর পার হয়ে বারান্দা দিয়ে অন্য একটা ঘরে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ঘুমোচ্ছো নাকি?’ দেখলাম কারুকার্যখচিত মস্ত উঁচু জাফরিকাটা মেহগনি খাটের মাথার কাছে একটি ইজিচেয়ারে আপাদমস্তক চাদরে ঢেকে একজন এলিয়ে আছেন।

 সরলা দেবীর গলা শুনে চাদর সরিয়ে সোজা হয়ে বসলেন, তাঁর মাথার সাদা ধবধবে লম্বা চুলের গোছা মাটি ছুঁলো, বললেন, ‘এসেছো?’ সরলা দেবী বললেন, ‘এই দ্যাখো, মিসেস কে সি দে বলেছিলেন ঢাকা যাচ্ছো, কানাইবাঁশি কলা নিয়ে এসো। কানাইবাঁশি কলা পেলুম না তাই কানাইবাঁশি আমি সেই আশ্চর্য অলৌকিক গলা নিয়ে এলুম’ বলে আমাকে দেখালেন। রূপলাবণ্যবতীর দিকে স্তম্ভিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে স্থির হয়ে রইলাম।

সরলা দেবী বললেন,’আমার মা, প্রণাম করো। স্বর্ণকুমারী দেবীর নাম জান ?’ 

জানতাম। তা হলে এই স্বর্ণকুমারী দেবী? রবীন্দ্রনাথের দিদি ? চোখ সার্থক হলো। দেশে বিদেশে ঘুরে আজ পর্যন্তও স্বর্ণকুমারী দেবীর মতো সুন্দরী আর আমি দেখিনি।”

স্বাধীনতার আগে বড়ো হওয়ার ফলে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি। সঙ্গীত ছাড়াও দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন খুব অল্প বয়সে। সমকালের বিখ্যাত রাজনীতিক লীলা নাগের হাত ধরে রাজনীতিতে হাতেখড়ি। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অন্যতম নায়ক অনন্ত সিংহের ফাঁসি রদ করার জন্য যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন ছিল, কিন্নরকণ্ঠী রানু লীলাদি’র কথামতো গান গেয়ে সেই অর্থ জোগাড় করেন; ফাঁসিও রদ হয়।এমনকী বিনয় বাদল দিনেশের বিনয়কে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন দিনের পর দিন।

নজরুল ইসলামের স্মৃতি মানেই তাঁর কাছে হাতে হারমোনিয়াম, পাশে বাটাভরা পান, ভাসা ভাসা গলায় আশ্চর্য সুর। মুখে একই সঙ্গে হাসি আর গান এবং তা অনর্গল।

প্রথম যেদিন গান শিখিয়েছিলেন সেদিনের কথা লিখেছেন ‘জীবনের জলছবি’তে- “ রাত জেগে নতুন গান লিখেছেন তিনি, না শিখিয়ে থাকতে পারছেন না। ‘এসো এসো শিল্পির এসোং হারমোনিয়ম নিয়ে বোসো। রাত্তিরে একটা গান লিখেছি, সুরটা তুলে নাও তাড়াতাড়ি, আবার ভুল হয়ে যাবে।’

 গানটা হলো ‘আমার কোনকূলে আজ ভিড়লো তরী, এ কোন সোনার গাঁয়/ভাঁটির টানে আবার কেন উজান যেতে চায়।’ দেখা গেল তখনো তার বয়ান সঠিক নয়, সুরেরও হেরফের হচ্ছে। ঠিক করছেন গাইতে গাইতে, শেখাতে শেখাতে।

দার্জিলিং বেড়াতে গিয়ে দেখা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে। সেখানেই পেয়েছিলেন প্রতিমা দেবীর চিঠি।’আপনি যদি কাল চারটের সময় প্লেন এডেনে এসে আমাদের সঙ্গে চা পান করেন তা হ’লে বাবা মশায় খুব সুখী হবেন।’

“ চিঠিটা পড়ে আমি এমন হতভম্ব হ’য়ে গেলাম যে অনেকক্ষণ পর্যন্ত এই চিঠির মর্মগ্রহণ করতে পারলাম না। আমার নিজের চোখকে আমার বিশ্বাস হচ্ছিলো না। বিশ্বাস হবার কোনো কারণও ছিল না। কোথায় কোন্ ঢাকা শহরের একটি মেয়ে আমি, কী যোগ্যতায় এতোবড় একটা সম্মানের অধিকারী হ’তে পারি? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের পুত্রবধূ আমাকে চায়ের নিমন্ত্রণ করছেন শুধু তাই নয়, আমি গেলে বাবামশায় খুশি হবেন, এরচেয়ে অবিশ্বাস্য ঘটনা আর কী হতে পারে আমার জীবনে ? উত্তেজনায় আমি থর থর করে কাঁপছিলাম। তারপরেই দৌড়ে দোতলায় উঠে এলাম। মাকে ডেকে তুললাম, মামী মাকে ডেকে তুললাম, মুহূর্তের মধ্যে চিঠিটা নিয়ে প্রায় একটা হৈ হৈ শুরু হ’য়ে গেল।

পরের দিন ধুকপুক বক্ষে কাকুর সঙ্গে ঠিক সময়ে মেন এডেনে গিয়ে হাজির হলাম। ঢুকতে সাহস হচ্ছিলো না। বাইরের ঘরে একটি যুবক দাঁড়িয়েছিল, তাঁকে চিঠিটা দেখাতেই সে আমাদের সসম্মানে নিয়ে গেল ভিতরে। গিয়েই দেখতে পেলাম মাঝখানে একটি গদি মোড়া চৌকিতে বসে আছেন তিনি। অনেকক্ষণ মুখে বাক্য সরলো না, সংবিৎ ফিরতে তাড়াতাড়ি গিয়ে প্রণাম করলাম। তিনি সহাস্যে তাকিয়ে বললেন, ‘ও তাহলে তুমিই মন্টুর ছাত্রী? বোসো।’ কাকুকে দেখিয়ে কে জিজ্ঞেস করতেই আমি বললাম, ‘আমার কাকা।’ প্রতিমা ‘লেন, ‘ইনি?’ বললেন, ‘তা হ’লে বৌমা এদের চা দাও।’ এলেন, বসতে বললেন, রবীন্দ্রনাথ।

আসলে আমার কথা উনি দিলীপদার চিঠিতে জেনেছেন। আমাকেও দিলীপদা লিখেছিলেন, এই সময়টায় উনি একমার্সের জন্য পাহাড়ে কাটাবেন, তুমি সেই সুযোগে ওঁর কাছ থেকে ওঁর গান কিছু শিখে নিও। আমি তার জবাবে লিখেছিলাম, ‘রবীন্দ্রনাথ! ওরে বাবা!’

দিলীপদা আবার সেই চিঠি ওঁকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখও হ’য়েছিলেন নিশ্চয়ই, নচেৎ আর আমাকে ডেকে পাঠাবেন কেন?”

শুরু হল তাঁর কাছে গান শেখা।

বদ্ধ কাচের জানালার সঙ্গে সংযুক্ত গোল ঘরের গোল গদির আসন, যেমন পাহাড়ি শহরে প্রায় সর্বত্রই থাকে, সেই আসনে বসতেন তিনি, রবীন্দ্রনাথ বসতেন মুখোমুখি একটি বেতের আরাম কেদারায়, বাইরে কুয়াশাচ্ছন্ন পর্বত আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে উঠতো, আস্তে আস্তে পর্বতের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসতো লাল গোল তপ্ত সূর্য, দৃশ্যের পট পরিবর্তন হতো। রবীন্দ্রনাথের কাঁপা কাঁপা গলার সঙ্গে গলা মিলিয়ে গান করতেন, ‘আমার ক্ষুধিত তৃষিত তাপিত চিত নাথ হে ফিরে এসো, এসো হে’।

একদিন ভেঙে গেল সেই আশ্রয়। গ্রীষ্মের ঋতুতে কলকাতার সব সম্ভ্রান্ত বঙ্গ মহিলা মহল এসে পড়লেন হুড়মুড় ক’রে, তাঁরা জানতেন রবীন্দ্রনাথ একটা নাচ গান ইত্যাদির আসর করতে চান জিমখানা ক্লাবে। টিকিট কেটে হবে। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিলেন সকলের সঙ্গে, বললেন, ‘গানে এই মেয়েটিই লিড দেবে, এক একলার গানও থাকবে। তোমরা প্রস্তুত হও, রিহার্সেল দাও।’

যাঁদের সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিলেন তাঁরা তাঁর দিকে কেউ প্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকালেন না, কোথাকার কোন এক ঢাকা শহর থেকে একটা শ্যামলা রোগা লম্বা বাঙাল মেয়ে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে দেখে তাজ্জব বনে গেলেন। গুরুদেবের কি মাথা খারাপ হয়ে গেল ? বলছেন কি তিনি ?এই মেয়েটা গানে লিড দেবে? স্টেজে বসে হারমোনিয়ম বাজিয়ে ‘সোলো’ গাইবে?

এরপরে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য অশ্রদ্ধা অগ্রাহ্য করবার যতোগুলো পদ্ধতি তাঁদের জানা ছিল অতি সূক্ষ্মভাবে সবই তাঁরা প্রয়োগ করেছিলেন প্রতিভার উপরে। রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব আস্তানাতেও আর ঢুকতে পারেননি।

পাশাপাশি নাটকও করতেন। ভদ্র পরিবারের ছেলে মেয়ে একসঙ্গে নাটক করছে জেনে কৌতূহলে ফেটে পড়েছিলো শহরের লোক, আশাতিরিক্তভবে সমস্ত টিকিট বিক্রি হয়ে গেল। “তারপর দুরু দুরু বক্ষে স্ত্রী-পুরুষে মিলে নাটক করার প্রথম সোপানটি অতিক্রম করলাম আমরা। নিন্দার বান ডাকলো রানু সোমের নামে। কলকাতায় যেমন একটা কেচ্ছার কাগজ বেরুতো ‘শনিবারের চিঠি’, ঢাকায়ও একটা কাগড় বেরুতো যার নাম ‘রবিবারের লাঠি’। সেই রবিবারের লাঠির পাতায় পাতায় রাণু সোম কতো দুশ্চরিত্র তার বিবরণ বেরিয়ে রাতারাতি কাগজের কাটতি বেড়ে গেল তিন গুণ। বীভৎস সব বিবরণ। আমারই জেদে আমি এই নাটকে পুরুষকে মহিলা সাজিয়ে অথবা নারীকে পুরুষ সাজিয়ে স্টেজে নামতে দিইনি। অথচ এই নিন্দামন্দ দেখে আমার চোখেই অশ্রুর বন্যা বয়ে গেল।…।”

তাঁর এই  সঙ্গীত সারা জীবনের সঙ্গী হয়নি। স্বেচ্ছায় সরে গেছিলেন গানের জগত থেকে।

এর পরেই আমরা ধীরে ধীরে পেলাম সাহিত্যিক প্রতিভা বসুকে, লেখলিখি যাঁর শৈশবের ‘কু-অভ্যাস’। বসুমতী সাহিত্য মন্দিরের সুবোধ মজুমদারের অনুরোধে তিনি ও বুদ্ধদেব বসু যুগ্মভাবে উপন্যাস লেখেন। সকলেই ভেবেছিলেন,আসলে তিনি নন, বুদ্ধদেবই লিখবেন। কিন্তু একাই শেষ করলেন জীবনের  সেই প্রথম উপন্যাস মনোলীনা। কোনও প্রকাশক নতুন লেখিকার লেখা ছাপতে রাজি হবেন না  বলে কবিতা ভবন  থেকে সে উপন্যাস বেরোলো। প্রচ্ছদ রমেন চক্রবর্তী। এরপর একের পর এক লেখা। ক্রমে হয়ে উঠলেন সর্বাপেক্ষা বিক্রিত, জনপ্রিয় সাহিত্যিক।

সেই সময় আমি’মহাভারতের মহারণ্যে’ পড়ে তাঁর দৃষ্টিতে ‘মহাভারত’কে নতুন করে চেনার চেষ্টা করছি। যেখানে তিনি  বলছেন,’মহাভারতের ‘মরাল’ কী সেটা ভেবেও বিচলিত হলাম, কেবল এটাই মনে হতে লাগল, এই গ্রন্থ যেন আমাকে এই শিক্ষাই দিল যে যেমন ভালো বলে কিছু নেই, তেমনিই মন্দ বলেও কিছু নেই, সত্য বলেও কিছু নেই, মিথ্যে বলেও কিছু নেই, ধর্ম বলেও কিছু নেই, অধর্ম বলেও কিছু নেই। যা আছে তা কেবল সুবিধাবাদীর সুবিধা ভোগ, এবং ন্যায় অন্যায় বলে যা কিছু আমরা শিখেছিলাম, মহাভারতের মহারণ্যে সে দুটি ধারণার জন্মই হয়নি। মহাভারত কিভাবে ‘ধর্মযুদ্ধ’ হল এই নিয়ে লেখিকার মনে যথেষ্ট জিজ্ঞাসা, যা আমাকেও ভাবিয়েছিল।

এহেন এক লেখিকার জন্মদিন … আমার নিমন্ত্রণ।এক কথায় রাজি। ‘কখন আসব। ‘কঙ্কাবতীদি বললেন, ‘সকালেই এসো, তখন ভিড় কম থাকে।’ ব্যস, আমার সমস্ত চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে গেল, মাত্র রাত টুকুর অপেক্ষা, তারপরই সকাল।

সাড়ে সাতটার মধ্যেই বরানগর থেকে দমদম স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। কী উপহার নিয়ে যাব—ভাবতে ভাবতে মনে হল, ফুল নেওয়াই সবচেয়ে ভালো। একগুচ্ছ রজনীগন্ধা আর গোলাপ কিনলাম।

সাড়ে আটটার মধ্যেই তাঁর বাড়ির দরজার সামনে পৌঁছে গেলাম। বেল বাজানোর আগে পাঁচ মিনিট চুপ করে বাইরে দাঁড়িয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে নিলাম।

বেল বাজানোর পর প্রথম অভ্যর্থনা জানাল তাঁর প্রিয় সারমেয়দ্বয়। প্রথমে খানিকটা ঘাবড়ে গেলেও দিদি নিজেই আমাকে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেলেন। তখন আমি সদ্য ‘অনুবাদ পত্রিকা’-র সহ-সম্পাদিকার দায়িত্ব নিয়েছি।

পরিচয় দেওয়া মাত্রই তিনি বললেন,
— “পত্রিকাটা আছে তোমার সঙ্গে?”

সেই প্রথম আমি বড় মাপের একজন লেখিকার সম্মুখীন। সাদা-সবুজ পাড় শাড়ি পরে বিছানায় বসে আছেন। তাঁকে দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে ভুলেই গিয়েছিলাম—ওনার জন্য ফুল ও পত্রিকা এনেছি। প্রণাম করে যখন সেগুলো তাঁর হাতে দিলাম, তিনি খুব খুশি হয়ে বললেন,
— “বুঝলে, সকালবেলাতেই ফুল পেয়ে মনটা ভীষণ ভালো হয়ে গেল। আমি ফুল খুব ভালোবাসি।”

তারপরই কঙ্কাবতীদিকে বললেন,
— “ওকে পায়েস-মিষ্টি দাও। বৈশম্পায়নবাবু এখনও সম্পাদক আছেন? কেমন আছেন উনি? ওঁকে আমার শ্রদ্ধা জানিয়ো।”

আমি তাঁরই মেয়ে শুনে তিনি বললেন,
— “ও, তা হলে তো তোমার অনুবাদ পত্রিকা-টার দায়িত্ব নেওয়াই উচিত। তোমার দাদুর কাছে দেখেছি ওঁকে—কী ভালো কথা বলতেন!”

বাবা দীর্ঘদিন ধরেই পার্থিব জগৎ থেকে দূরে, আধ্যাত্মিক জীবনে নিমগ্ন। বাইরের কারও সঙ্গে প্রায় কোনো যোগাযোগই নেই। তবু এতদিন পরেও তিনি বাবাকে মনে রেখেছেন শুনে আমার ভীষণ ভালো লাগল।

আমার এক কন্যা আছে শুনে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
— “কী নাম তোমার মেয়ের ?”

‘লিচ্ছবী’। নামটা শুনেই বললেন, ‘নিশ্চয়ই তুমি ইতিহাসের ছাত্রী। কতদূর পড়েছ ? এখন কী করছ ? বাড়িতে আর কে কে আছেন, জামাই কি করে…’, সমস্ত এমনভাবে জানলেন যেন আমি তাঁর কত আপন। তারপর বললেন, ‘সত্যি, আজকালকার মেয়েরা অনেক বেশি পারদর্শী, দেখছ এই মেয়ে কীভাবে সব একা সামলাচ্ছে।’

তখনও আমি সে অর্থে লেখা শুরু করিনি, দু’ একটা লিখেছি, তাও বললেন, ‘তোমার লেখা দিও। পড়ব।’

সেদিন খুব আনন্দ পেয়েছিলাম।একদম নতুন লিখছি শুনেও পড়তে চাইছেন আমার লেখা। মায়াদির (মায়া সিদ্ধান্ত) সম্পাদনায় ‘আশ্রম সংবাদ’-এর পুজো সংখ্যায় ২০০২-এ একটা লেখা বেরোনোর পর আমি পাঠিয়েছিলাম পত্রিকাটি।ভেবেছিলাম ভুলে গেছেন আমার কথা। কতজনই তো আসেন তাঁর কাছে।

কিছুদিন বাদে আরও একবার তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলাম।এত আন্তরিকভাবে আমায় আদর করলেন যে মনেই হলনা এর আগে মাত্র একবার দেখেছেন। আরও খুশি হলাম যখন আমার লেখার প্রশংসা করলেন। তারপর বলেন, “একটু চর্চা করলে তোমার লেখা খুব ভালো হবে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে লেখ । আর প্রচুর পড়ো। আমাদের শাস্ত্রে রামায়ণ মহাভারতে লেখার কত আকড় ছড়িয়ে। নারী চরিত্রগুলো নিয়ে লেখো।তোমার লেখার গতি ভালো।প্রতিদিন নিয়ম করে লেখো আর পড়ো।”

এই অভিব্যক্তি, প্রশংসা, উৎসাহদান যে আমার কাছে কতখানি প্রাপ্তি তা কখনো ভুলতে পারবোনা।একইসঙ্গে ওই কথাগুলো আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছিল।

হলাম যখন আমার লেখার প্রশংসা করলেন।

তারপর বললেন,
— “একটু চর্চা করলে তোমার লেখা খুব ভালো হবে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে লেখো। আর প্রচুর পড়ো। আমাদের শাস্ত্রে—রামায়ণ, মহাভারত-এ লেখার কত উপকরণ ছড়িয়ে আছে। নারী চরিত্রগুলো নিয়ে লেখো। তোমার লেখার গতি ভালো। প্রতিদিন নিয়ম করে লেখো আর পড়ো।”

এই অভিব্যক্তি, এই প্রশংসা ও উৎসাহ আমার কাছে কতখানি প্রাপ্তি—তা আমি কখনও ভুলতে পারব না। একই সঙ্গে তাঁর কথাগুলো আমার আত্মবিশ্বাসও অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছিল।

সেদিন আমি ভাবিওনি, একদিন আমিই লিখব ‘বাল্মীকি আশ্রমে সীতা এবং তারপর…’ কিংবা ‘মিথিলার রাজকন্যা ঊর্মিলা’—আর তা নিয়ে চারদিকে এত আলোচনা হবে। হয়তো অজান্তেই সেই ভাবনার বীজ বপন হয়ে গিয়েছিল সেদিনই।

২০০৬ সালের ১৩ অক্টোবর চলে গেলেন ছোটগল্প ও বৈশাখী নামে দুটি পত্রিকার সম্পাদক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভুবনমোহিনী স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত ও আনন্দ পুরস্কারপ্রাপ্ত এই কিংবদন্তি লেখিকা। সেদিন আমি দিল্লিতে। শেষ বিদায় জানাতে উপস্থিত থাকতে পারিনি।

কিন্তু আমার মনের মধ্যে আজও অক্ষত হয়ে আছে প্রথম দেখা সেই দিদানি—যিনি সহজেই আমাকে আপন করে বুকে টেনে নিয়ে বলেছিলেন,
— “বড় হও, অনেক বড়।

আলোর পথযাত্রী - বিতস্তা ঘোষাল

আলোর পথযাত্রী …সৃষ্টির শেষ রহস্য, ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব সেন

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন  

This entry is part 2 of 7 in the series আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন  

This entry is part 2 of 7 in the series আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর

Read More »

অনুবাদের স্বর্ণযুগ : মধ্যযুগ  

This entry is part 2 of 7 in the series আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক ১ : অনুবাদের বাদ,

Read More »