অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা - তৃষ্ণা বসাক
অনুবাদকের কথা
বিখ্যাত অনুবাদক সঞ্চারী সেনের মুখোমুখি তৃষ্ণা বসাক
পর্ব ১৩
তৃষ্ণা বসাক– প্রথমেই জানতে চাইব আপনার শৈশব, পরিবার, স্কুল, আর আপনার অনুবাদক হবার পেছনে কে বা কোন কোন ঘটনার প্রেরণা রয়েছে।
সঞ্চারী সেন– হ্যাঁ, এই প্রশ্নটা খুব ভালো করেছো। এই বয়েসে শৈশবের কথা ভাবতে ভারী ভালো লাগে। আসলে এটা সত্যি যে আমার পরিবারে, অর্থাৎ পিতৃকুলে সাহিত্য সংস্কৃতি একেবারে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত ছিল। আমার দেখবার সৌভাগ্য হয়নি, কিন্তু আমাদের কুমিল্লা শহরের বাড়িতে সেকালের অনেক বিখ্যাত সাহিত্যিক এবং শিল্পীর প্রায়শই আগমন ঘটত, চলত আড্ডাও। আমার ঠাকুর্দা ছিলেন কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে বাংলার বিভাগীয় প্রধান। সুধীর সেন। ঠাকুমা সুধা সেন ঐ শহরেরই ঈশ্বর পাঠশালার মেয়েদের বিভাগের প্রধানা শিক্ষিকা। ঠাকুর্দা শান্তিনিকেতনেও ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সময়কালে। ‘জনগণমন অধিনায়ক’ সংক্রান্ত একটি চিঠি- খুব ছোট্ট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি চিঠি, কবি লিখেছিলেন আমার পিতামহীকে, খুব গর্বের বিষয় সেটি আজও আমাদের কাছে। আসলে এতটা বলছি আমার পাগলামির প্রেক্ষাপটটা বোঝাবার জন্য। মানে পাগলামি তো এই কারণে, যে বাংলা ভাষাটা সম্পর্কে কোনও আলাদা শিক্ষা না থাকা সত্ত্বেও (আমি বাণিজ্য নিয়ে পড়েছি, তাও স্নাতক স্তর অবধিই, এবং সেটিও সাম্মানিক নয়, সে গল্পে পরে আসছি), অন্যের ভাষার দিকে নজর দেওয়া! যাহোক, যে কথা বলছিলাম, ঐ শৈশবেই অনেক সময় ঘুম ভেঙেছে, কুমিল্লা থেকে আসা নীনা (ঠাকুমাকে ঐ নামেই ডাকতাম, নানী থেকে নীনা কিনা জানিনা) বাবা আর পিসির (পিসি ঢাকাতেই থাকেন এখনও), বৈষ্ণবসাহিত্য নিয়ে আলোচনা শুনে। সত্যি, ওঁরা একসঙ্গে হলেই এরকম সাহিত্য সংস্কৃতির মন্থন হত। রবীন্দ্রনাথ তো বটেই, সঙ্গে নরেশ গুহ, বুদ্ধদেব বসুর মতো আধুনিক কবি, এবং বিদ্যাপতি-চন্ডীদাস, বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব (তিনিও কুমিল্লার), আলি আকবর, বাহাদুর খাঁ, ‘নিখিল বন্দোপাধ্যায়ের হাতটা বড় মিষ্টি’ বলতেন বাবা, আচার্য ক্ষিতিমোহন সেনের সঙ্গে আত্মীয়সুলভ হৃদ্যতা, ক্ষিতিমোহন সেন যে কী অসাধারণ দুরূহ সব কাজ করেছেন বাংলা অনুবাদের ক্ষেত্রে তা তো জানোই– এসব মনের মধ্যে গেঁথে নিয়ে বড় হওয়া– এগুলোই, ঐ যে বলছিলাম পাগলামি, তার জন্ম দিয়েছে। এই প্রসঙ্গে বলে নিই, বাবা সুপ্রিয় সেন একজন স্বনামখ্যাত ক্রীড়া সাহিত্যিক, পিসিমা বাংলাদেশের সাহিত্যক্ষেত্রে প্রখ্যাত নাম সুনন্দা কবীর। পিতামহী সুধা সেনেরও গ্রন্থ ছিল ‘ভারতাত্মা শ্রীকৃষ্ণ’, ‘মহাপ্রভু গৌরাঙ্গ সুন্দর’– বৈষ্ণব সাহিত্য আশ্রিত এবং প্রশংসিত।
আমার প্রত্যেক জন্মদিনে বাবা একটা করে বই আমায় দিতই, স্বল্প রোজগারকে কিছুটা উপেক্ষা করেই। স্বল্প রোজগার, কারণ প্রাইভেট ফার্ম, বাবারও অপূর্ণ ইচ্ছে ছিল সাহিত্যিক হবার, সে যাক্। প্রথম যে বইটা, আমার খুব মনে আছে, নাম ছিল ‘অপরূপ রূপকথা’, বুদ্ধদেব বসুকৃত অনুবাদ, হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যাণ্ডারসনের গল্পের। সেই কুৎসিত হাঁসের ছানা, ‘আগলি ডাকলিং’, কী কষ্ট হত পড়ে। তারপর আরো একটু বড় হলে বিশাল মোটা একটা বই, ‘কিশোর অমনিবাস’, অ কৃ ব, অজিত কৃষ্ণ বসু অনুবাদ করেছিলেন মার্ক টোয়েনের তিনটে উপন্যাস- ‘টম সয়ার”, ‘হাকলবেরি ফিন’ আর ‘দ্য প্রিন্স অ্যাণ্ড দি পপার’। কী অপূর্ব ভাষা! আহা! সেই কৈশোরে যতটুকু বুঝেছিলাম (সেই বইটা হারিয়ে গেছে), মন যাকে বলে তর্ হয়ে গিয়েছিল। স্কুলে আসলে খুব মুখচোরা ছিলাম। পড়তাম ভবানীপুরের ‘ইউনাইটেড মিশনারী গার্লস হাই স্কুলে’- যেতে ভয় পেতাম, একটু কঠোর অনুশাসন ছিল তো! ছোটবেলার তিন ক্লাসে কনভেন্টের অভিজ্ঞতা (মায়ের ইচ্ছেয়, তিনি ছিলেন আবার ব্রেবোর্নের অঙ্কের স্নাতক) আমায় চিরকালই স্কুল, কলেজ, অফিসের নিয়মানুবর্তিতা থেকে তাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়েছে। কিন্তু স্কুলের কিছু বন্ধু ছিল সত্যি ভাল, ভালবাসবার মতোই। আর একটা কথা বলতেই হবে, ছোটবেলায় বন্ধুদের জন্মদিনে দেওয়া নেওয়া চলত সুধীন্দ্রনাথ রাহার অনূদিত সব বিখ্যাত পাশ্চাত্য ধ্রুপদী গল্প উপন্যাসের বই। শুকতারাতেও থাকত তাঁর অনুবাদ করা গল্প। সেসব কাড়াকাড়ি করে পড়তাম।
এইসব কিছুই, হয়তো কিছু বা বাদও গেল, মনের গতিপথ নির্ধারণ করে দিয়েছিল।
তৃষ্ণা বসাক– আমার পরের প্রশ্ন এই যে পরিবার ছাড়া কে বা কারা আপনাকে অনুবাদ করতে সবচেয়ে উৎসাহ দিয়েছেন? উর্দু সাহিত্য আমাদের দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ সাহিত্য, সে ভাষায় অনেক মহান লেখক আছেন। আপনার সবচেয়ে প্রিয় সাহিত্যিক কে এবং কেন তিনি প্রিয়? এখনো পর্যন্ত কাদের কাদের লেখা অনুবাদ করেছেন?
সঞ্চারী সেন-দেখো, আসল সত্যিটা হল যে অনুবাদ করব বলে অনুবাদ করছি এমনটা কিন্তু নয়। মানে শুরুতে ভেবেচিন্তে কিছু করিনি। বাবা আজকাল পত্রিকায় যোগ দিয়েছিলেন একসময়, বিজ্ঞাপন বিভাগে ছিলেন, হয়তো কোনও ক্রোড়পত্র বেরোবে, বিষয় ‘বিবাহ’, তো ইংরেজি জোকবুক থেকে কয়েকটা মজার রসকণিকা তরজমা করে দিলাম বিয়ের পরিণাম সংক্রান্ত। কিন্তু সিরিয়স লেখা লিখলাম, উর্দু ভাষাটা অল্পস্বল্প জেনে ওঠার পর থেকে। আসলে গালিবের কবিতা পড়তে পারলাম তো। ডুবে যেতে লাগলাম। তখন মনে হল যে আমি যেভাবে দেখছি, সেটা যদি কিছুটা অন্যদেরও দেখাতে পারি। সেটাও একরকম স্পর্ধাই। তবে সে সময় আমার যাঁর সঙ্গে সহাবস্থান ছিল, বিবাহসূত্রে, তিনি কিছু বই আমায় সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন। সেটা একরকম উৎসাহদান বলতে হবে। প্রথম বই ‘মির্জা গালিব’ আসলে গালিবের জীবনের কাহিনী, তারই মধ্যে মধ্যে তাঁর কবিতা বা হয়তো দু একখানি চিঠির তরজমা। তবে কবিতার অনুবাদগুলি খুব ভালো হয়নি, তুমিও একবার অনুযোগ করেছিলে মনে আছে। কিন্তু প্রথম সন্তান তো, তাই এই কাজটার প্রতি মায়া আমার বেশি। অফিসের সামনেই থাকত একটি কাশ্মীরী ছেলে, সে সুদে টাকা ধার দিত, তার কাছ থেকেই দশ হাজার টাকা ধার করে এই বইটি ছেপেছিলাম। তারপর প্রকাশক প্রদীপ ভট্টাচার্য বইটির পুনর্মুদ্রণ করেন। আগে বলেছি না, আমি একটু মুখচোরা স্বভাবের ছিলাম, তাই কাজটা লুকিয়ে লুকিয়েই করেছি, না জানলে আর উৎসাহ দেবে কে! আমার খুব ভরসা বা আত্মবিশ্বাস ছিলনা, এখনও খুব একটা নেই, লোকের ভাল লাগবে কিনা! না করে পারিনা, তাই করি, এমনটা বলতে পারো।
উর্দু তো সত্যি আমাদের দেশ শুধু না, এ উপমহাদেশের, পাকিস্তান আর বাংলাদেশকে তো ধরতেই হবে, এক মহান সমৃদ্ধ ভাষা। কিন্তু আমরা বাঙালীরা যতটা বিদেশী ভাষার দিকে ঝুঁকি, ততটা স্বদেশীয় ভাষার দিকে নয়, তুমি খুব ভালো কাজ করছো এক্ষেত্রে, কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, হিন্দু মুসলমানের পারস্পরিক মানসিক দূরত্ব অনেকটা মেটে, যদি ভাষার অপরিচয় ঘোচে তাহলে। সেটাও একটা কারণ বলতে পারো এই কাজগুলো করবার। তবে সেটা একটু পরে এসেছে । প্রথমে একেবারেই ছিল আবেগ, ভাষাটার প্রতি আবেগ, গালিবের প্রতি আবেগ। আমার সবচেয়ে প্রিয় সাহিত্যিক এই ভাষায়, একটু দ্বন্দ্ব আছে জানো, মান্টো আর ইসমতের মধ্যে কে বেশি প্রিয়, এভাবে বললে ভালো হয়, দুজনে মিলিয়ে যেটা হয় সেই সংশ্লেষ। কারণ ওঁরা যেভাবে বলেছেন, যে সত্যিগুলো উন্মোচন করেছেন, একইসঙ্গে দুর্দমনীয় অথচ কোমল ভাষায়— আমার কাছে তার তুলনা নেই। এখনও পর্যন্ত অনুবাদ করেছি, গদ্যে– মান্টো, ইসমত তো বললামই, তা ছাড়া গুলাম আব্বাস, সজ্জাদ জহীর, রাশিদ জাহাঁ, শাকিলা আখতার, সোহেল আজিমাবাদী, কুরুঅতুলেইন হায়দার, খাদিজা মাস্তুর। কবিদের ক্ষেত্রে অল্পস্বল্প (কারণ এক্ষেত্রে আমার আত্মবিশ্বাস একেবারে তলানিতে ), গালিব ছাড়া, ইকবাল, মীর, মোমিন, হসরত মোহানি, মজরুহ্ সুলতানপুরী, সাহির লুধিয়ানভি। নিতান্তই সামান্য। ফয়েজও নামমাত্র। সেটা আরো করিনি, খুব প্রিয় কবি হওয়া সত্বেও, নীলাঞ্জনের (হাজরা) ভয়ে। ওটায় ওর অবিসংবাদিত অধিকার রয়েছে। হ্যাঁ, নীলাঞ্জন অবশ্য মাঝে মাঝেই এই না-চিজ, অধমকে উৎসাহ দিয়েছে তরজমায়। সেটা নিতান্তই বন্ধুসুলভ সৌহার্দ্যের কারণে বলেই আমার বিশ্বাস। আর আমাদের দুজনেরই পরিচিত অকালপ্রয়াত প্রকাশক প্রদীপবাবু আমায় দিয়ে বেশ কিছু কাজ করিয়ে নিয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন সেজন্য অবশ্যই। ইংরেজি বা হিন্দি থেকে অনুবাদ করেছি তাজ বেগম রেনজু আর গীতাঞ্জলি শ্রীর লেখার।
তৃষ্ণা বসাক – এই যে এত অনুবাদ করেছেন, এর পেছনে কি কোন বিশেষ পরিকল্পনা কাজ করেছে? মানে বলতে চাইছি, কেউ ঠিক করতে পারেন আমি শুধু নারীদের সাহিত্য অনুবাদ করব, বা দলিত সাহিত্য অনুবাদ করব, কারণ শুনতে পাই এর জন্য প্রকাশক পাওয়া একটু সহজ। তো আপনি কি বাজারে চলবে এমন কোন বিষয় বা লেখক অনুবাদের জন্যে এযাবত বেছেছেন? নাকি সেসব না ভেবে আপনার বিচারে যাঁরা মহান লেখক, তাঁদের লেখাই নির্বাচন করেছেন, যাঁদের অনুবাদ বাঙালি পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া উচিত মনে হয়েছে? মোট কথা জানতে চাইছি, আপনার লেখক নির্বাচনের মাপকাঠি কী? ইসমত চুঘতাই, মান্টো বা গালিবকেই কেন বাছলেন?
সঞ্চারী সেন- আচ্ছা দেখো, শুরুতেই একটা কথা মনে থাকতে থাকতে বলি, ইসমত আসলে চুগতাই, চুঘতাই নয় কিন্তু। আমরা অমনটা বলি কারণ ইংরেজিতে ওঁর নাম gh দিয়ে লেখা হয়। আসলে আরবী ফারসি ভাষায় গায়েন বলে একটা অক্ষর আছে, যার উচ্চারণ গ এর থেকে কিছু আলাদা। সেটাকে gh দিয়ে লেখা হয়। যেমন গালিব। যেমন গজল। তেমনই চুগতাই।
হ্যাঁ, এখন আসল কথা হল, আমি না চিরকালই বাজার টাজার এসব এড়িয়ে চলেছি। অনুবাদ আমার জীবিকা হবে ভাবিনি তো, লিখতে পারি এমন বিশ্বাস ছিলনা, এখনও নেই, তাই জীবিকার কারণে আমার সে দায় ছিলনা। আর নাম যশ এসবের স্বপ্ন দেখিনি, সত্যি বলতে কি ওই ‘গোপন কোণে আপন মনে থাকতে’ই আমার সবচেয়ে বেশি ভাল লাগে। তাই যখন যেটা ইচ্ছে হয়েছে, না আরও একটা দিক আছে, অনেক সময় প্রকাশকদের অনুরোধেও করেছি। আমি ‘মির্জা গালিব’ বইটা ছাড়া বাকি বইগুলো প্রকাশকদের পরিকল্পনাকে মর্যাদা দিয়েই করেছি। সাময়িকীর লেখা ছাড়া বাকি আর কিছু নিজে থেকে লেখবার সাহস পাইনি। তবে হ্যাঁ, রশিদ জাহাঁ, ভারতবর্ষের প্রথম কমিউনিস্ট নারী সাহিত্যিক, তাঁকে নিয়ে নিজের আবেগে কিছু কাজ করেছি বটে। ইসমতের কথা প্রথম প্রদীপ বাবুর কাছেই শুনেছিলাম। আমি আসলে একজন প্রায়-আচারহীন বামপন্থী। তাই বাজারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক, বুঝতেই পারো। আর নিজে একটা লেখা লিখে প্রকাশকদের দরজায় ঘুরব, সেই সাহসই নেই আমার। তবে আমার বিশ্বাসের সাথে মেলেনা এমন কাজ করিনি কখনও, করবও না। ইসমত, মান্টো ও গালিবকে বিশেষ করে বেছেছি, ওঁদের ছাড়া একমুহূর্তও চলতে পারিনা বলে। বিশেষ করে আজকের সময়ে।
তৃষ্ণা বসাক– এযাবত ঠিক কতগুলি অনুবাদ করেছেন? সবগুলিই কি প্রকাশিত হয়েছে?
সঞ্চারী সেন- এখনও পর্যন্ত অনুবাদগ্রন্থ–
মির্জা গালিব
নির্বাচিত গল্প: ইসমত চুগতাই
সাদাত হাসান মান্টোর গল্প
দ্রোহের গল্প : রশিদ জাহাঁ
দশটি উর্দু দাস্তাঁ-সংকলন, বিভিন্ন লেখকের গল্পের
আমাদের শহর সেই বছর- গীতাঞ্জলি শ্রী (হিন্দি থেকে অনুবাদ)
খলিত দেবদূতেরা- সাদাত হাসান মান্টো (সম্পাদিত তরজমা- ‘গঞ্জে ফরিশতে’)
এ সবগুলোই প্রকাশিত হয়েছে। অপ্রকাশিত কোনও কাজ নেই, কারণ ওই যে বললাম, বেশিরভাগই অনুরোধক্রমে।
তৃষ্ণা বসাক – আপনার কোন অনুবাদটির জন্যে লোকে আপনাকে চিনেছে এবং কোন অনুবাদটি সবথেকে বাণিজ্য সফল?
সঞ্চারী সেন- আমি ঠিক জানিনা, হয়তো ‘মির্জা গালিব’, হয়তো ‘ইসমতের নির্বাচিত গল্প’ কিংবা হয়তো ‘মান্টোর গল্প’। আমি সংকোচে কোনওদিন প্রকাশকদের জিজ্ঞেস করে উঠতে পারিনি, বইয়ের কাটতি কেমন। পাছে তাঁরা মনে করেন তাঁদের লভ্যাংশের কথা জানতে চাইছি। লোকে কতটা চেনে, জানিনা। তুমি বিখ্যাত বলছো, জেনে লজ্জাই পাচ্ছি।
তৃষ্ণা বসাক – একটা কথা আছে যে Translation is nothing but a negotiation. উর্দু থেকে বাংলা অনুবাদে কি কথাটা খাটে? আপনি কি আক্ষরিক অনুবাদেই বিশ্বাসী? না অনুসৃজনে? আপনার অনুবাদের প্রসেসটা ঠিক কী রকম? প্রথমে আক্ষরিক অনুবাদ, তারপর ভাষাটিকে সুন্দর করার জন্যে অল্প হেরফের, নাকি অন্য কিছু?
সঞ্চারী সেন- না, negotiation শব্দটার মধ্যে না কেমন একটা বাধ্যবাধকতা, একটা বাণিজ্যিক গন্ধ আছে। আমার পছন্দ হলনা। কেমন কেজো একটা শব্দ। আমি বিশ্বাস করি, উৎস ভাষা আর লক্ষ্য-ভাষার মধ্যে একটা আত্মিক সম্পর্কে। আসলে আমার খুব গভীর বিশ্বাস যে দেশ কাল নির্বিশেষে মানুষের আবেগ মূলতঃ এক, সে তুমি যে ভাষাতেই তাকে প্রকাশ করোনা কেন! তাই একটা উষ্ণ প্রাণপ্রবাহ এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় বয়ে আসছে, এমনটাই হওয়া উচিত অনুবাদে । যথাসম্ভব মূল ভাষার এসেন্সটা বজায় রেখে। উর্দু থেকে বাংলায় সেটা যতটা সম্ভব, উর্দু থেকে ইংরেজিতে ততটা নয়। একবার দেখেছিলাম, উর্দুর নানহি ইংরেজিতে হয়ে গেছে tiny- অথচ ওটা একটা বাচ্চা মেয়ের নাম! সারা গল্প জুড়ে tiny, tiny পড়তে ভালো লাগে বলো?! অথচ আমরা নানহি শব্দটার সঙ্গে পরিচিত। তাই বাংলা অনুবাদে ঐ নামটাই রাখতে পারছি। আমার বলার কথা হল এই যে, যেহেতু উর্দু এবং বাংলা, দুটো ভাষাতেই সংস্কৃত, আরবী, ফারসির বহু শব্দের চলন রয়েছে, তাই উর্দু থেকে বাংলায় অনুবাদ অনেক সহজ। মূল থেকে আক্ষরিক অনুবাদ বা অনুসৃজন, কোনওটিরই বিশেষ প্রয়োজন পড়ে না। উদাহরণ হিসেবে, ‘উসে বেহদ খুশি মিলী’র তরজমা ‘ওর খুশির সীমা পরিসীমা রইলনা’, করতেই পারো, দু তরফেই ‘খুশি’ অক্ষুণ্ণ রেখে। তবে এটা গদ্যে সহজ, কবিতায় নয়। আমার কাজ তো মূলতঃ গদ্য নিয়েই। কাব্যের গতি দুরূহ, বলাই বাহুল্য। সেখানে অবশ্যই অনুসৃজনের প্রয়োজন হবে। উর্দু কাব্যের চলন, এবং বাংলা কবিতার চালচলন, দুইয়ে বিস্তর ফারাক। দেখো ফারাকও এসেছে ‘ফর্ক’ (আরবী) শব্দ থেকে, যা উর্দুতে হামেশা ব্যবহার হয়। হামেশাও তাই, তবে এ শব্দটা ধ্রুপদী ফারসি!
তৃষ্ণা বসাক – বাংলা থেকে উর্দু অনুবাদও কি করেন? যদি না করেন তবে কেন করেন না? এটাও তো দরকার।
সঞ্চারী সেন- না না, বাংলা থেকে উর্দুতে করবার সাহস পাই না। তবে একবার, অনেক বছর আগে, তখন বামফ্রন্টের আমল, উর্দু অ্যাকাডেমি রবীন্দ্রনাথের গল্প ‘বিচারক’ এর উর্দু অনুবাদ করতে বলেছিলেন, করেওছিলাম। আরও বিভিন্ন উর্দুভাষী মানুষ সে কাজটা করেছিলেন। তারপর সরকার বদল হল। সেটির সংবাদ আর আমার কাছে পৌঁছয়নি। প্রয়োজন আছে জানি, তবে আমি কতটা পারব, জানিনা। ততটা দখল আছে বলে নিশ্চিত নই, লক্ষ্য ভাষাটা আরো বেশি জানতে বুঝতে হয় কিনা!
তৃষ্ণা বসাক – আপনি ট্রান্সলেটর্স ব্লক কে কীভাবে ডিল করেন? এমন কোন ড্রিম প্রজেক্ট আছে যা আপনি অনেক দিন ধরে করতে চাইছেন?
সঞ্চারী সেন- লেখা শুরু করবার ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতা, মানসিক যে ব্লক, সেটা তো হয়ই। তাগাদা বারবার আসার আগে শেষ করতে হবে, এটা একটা যন্ত্রণা বইকি। তবে আত্মসম্মানের কথা ভেবে সেটাকে আস্তে আস্তে তাড়াতে হয়, লিখতে বসতে হয়। আসলে অন্যের মনের কথা লিখছি, নিজের নয়, এটা নিজেই একটা প্রতিবন্ধক তো! আর কোন শব্দ বা এক্সপ্রেশন কিছুতেই আনতে পারছিনা যখন, সে জায়গাটা ছেড়ে যাই, পরের সহজ জায়গাগুলো অনুবাদ করতে থাকি, তারপর হয়তো আধো ঘুমে বা এমনিই একটা শব্দ বা এক্সপ্রেশন মনে এসে যায়। সবসময় যে খুব মনমতো হয়, তাও না, তখন সমঝোতা করতে হয়।
ড্রিম প্রজেক্ট নিয়ে এখনও ভাবিনি, জীবন বড় অনিশ্চিত তো, না হলে শেষ মুহূর্তে অপূর্ণ স্বপ্ন নিয়ে হয়তো কষ্ট পাব!
তৃষ্ণা বসাক- আপনি ভারতীয় সাহিত্য থেকে অনুবাদ করেন। আপনার কি মনে হয়, এই বহুভাষিক দেশে অনুবাদের ভূমিকা অনেকখানি? তার জন্যে কি যথেষ্ট অনুবাদক আছেন? অনুবাদকদের সম্মান ও সাম্মানিক এবং অন্যান্য পরিকাঠামোর ঠিক কতটা অভাব আছে? কীভাবে তা উন্নত করা যায়?
সঞ্চারী সেন- এই বহুভাষিক দেশে অনুবাদের ভূমিকা অসামান্য। দেশের আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখতে অপরিহার্য। অনুবাদকদের সম্মান ও সাম্মানিক যৎসামান্য বলেই আমার ধারণা। সেটা উন্নত হত এদেশের সরকার উদ্যোগী হলে। এ মুহূর্তে সেই আশা সুদূরপরাহত। ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানেরা নিজেরাই অর্থনৈতিকভাবে খুব সবল নন অধিকাংশই, তাই তাঁদের কাছ থেকে বেশি কিছু আশা করা অন্যায় হবে।
তৃষ্ণা বসাক – চাকরির পাশাপাশি অনুবাদ করা কতখানি কঠিন ছিল?
সঞ্চারী সেন- আসলে চাকরিতে ঢুকেছিলাম অনেক কম, প্রায় একুশ বছর বয়েসে। তখন পরিবেশ অন্যরকম ছিল। দশটা পাঁচটা কাজের মধ্যে দমবন্ধকর অবস্থা ছিলনা। ব্যাঙ্কের কাজ সেরে আমার অনেক সহকর্মী গ্রুপে যেতেন নাটকের মহলায়। অনেক খোলামেলা পরিবেশ ছিল সেই আশি নব্বইয়ের দশকে। তাই কাজ শুরু করতে অসুবিধে হয়নি। তারপরে তো অভ্যেস হয়ে গেল। আমি উঁচু পদে যাওয়ার চেষ্টাই করিনি, সেটা আমার স্বভাববিরুদ্ধ হত। পারতাম না ওই অপরিসীম দায়িত্বের চাপ সহ্য করতে। আসলে পারিবারিক আর্থিক অসাচ্ছল্যের ফলে বাংলা নিয়ে পড়া হয়নি, তবু মনের গতি ছিল সেদিকেই, তাই কাজের অবসরে লেখাটাই হয়ে উঠেছিল নিত্যসঙ্গী। নারীজীবন সেদিক থেকে পালন করিনি বলা যায়, অসফল বিবাহ, অপত্যহীনতা আমায় প্রকৃত অর্থে কোনওদিনই কষ্ট দেয়নি বোধহয় এজন্যেই।
তৃষ্ণা বসাক – আপনার কোন কোন অনুবাদ সম্মানিত হয়েছে এখনো পর্যন্ত?
সঞ্চারী সেন- না, কোনো অনুবাদই সম্মানিত হয়নি আনুষ্ঠানিকভাবে। পাঠকের প্রশংসা পেয়েছে হয়তো, ঠিক জানিনা। তবে যখন আমার প্রিয় মানুষটি, যে এখন আমার লেখার প্রথম পাঠকও বটে, লেখা পড়বার পর চোখ তুলে সম্মতিসূচক স্নিগ্ধ হাসি হেসেছে, হয়তো বলেছে, “একটা সুন্দর সাবলীলতা তো আছেই, সঙ্গে আদত লেখক আর তোমার মনটাও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে”, তখন মনে মনে সম্মানিত বোধ করেছি বইকি।
তৃষ্ণা বসাক – আপনার অনুবাদক জীবনে অনেক অসম্মান প্রত্যাখ্যান আছে, অসৎ প্রকাশক আছে, আবার নিশ্চয় এমন কিছু ঘটনা আছে, যা আজো আপনার কাজের স্পৃহা জাগিয়ে রেখেছে? সেইরকম কিছু স্মরণীয় ঘটনা, পাঠকের ভালবাসার কথা জানতে চাই।
সঞ্চারী সেন-এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে একটু কঠিন। পাঠকদের সঙ্গে আমার সত্যি যোগাযোগ নেই। নিজে থেকে কোনও লেখা নিয়ে কোথাও যাইনি, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়েই, কাজেই সে অভিজ্ঞতাও নেই। প্রকাশকদের সঙ্গেও দূরের সম্পর্ক, তাই অসততার পরিচয় পাওয়ার দুর্ভাগ্য ঘটেনি। কিছু ক্ষেত্রে আশাহত যে হইনি তা নয়, হয়তো বইটি যেমন ভাবলাম তেমন হলনা, কিন্তু নিজের বেশ কিছু অপারগতা স্মরণে এনে সে দুঃখ মন থেকে দূর করে দিয়েছি। ‘এন বি এ’র সঙ্গে যুক্ত শ্রী অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী নিতান্তই ভদ্রলোক এবং আদর্শবান মানুষ। ‘ঊর্বী’ প্রকাশনার শ্রী মোহতা, ‘কেতাব-ই’র প্রকাশক, ‘আপন পাঠ’ এর সন্দীপ ইত্যাদি সকলেই অমায়িক ব্যক্তি। ধরে নেওয়া যায় এঁদের সুব্যবহারই এখনও পর্যন্ত আমায় এ কাজে টিকিয়ে রেখেছে।
তৃষ্ণা বসাক– সঞ্চারী, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এতটা সময় আমাকে দেবার জন্যে। শেষে জানতে চাই আপনার ঠিক কতগুলি অনুবাদের বই আসছে সামনে এবং তাদের প্রকাশক কারা?
সঞ্চারী সেন- আমার একটিই মাত্র অনুবাদের বইয়ের কাজ চলছে এখন। সম্ভবতঃ সেটি ‘ধানসিড়ি’ থেকে প্রকাশিত হবে।
তৃষ্ণা বসাক – তরুণ অনুবাদকদের জন্যে আপনি কিছু বলতে চান? কীভাবে তারা এগোতে পারে অনুবাদকে পেশা করে?
সঞ্চারী সেন- দেখো, অনুবাদকে পেশা করতে হলে কী করতে হবে তা আমার জানা নেই। কিন্তু ফাঁকি না দিয়ে, মূল ভাষাটাকে যথাসম্ভব রপ্ত করে নিয়ে, তারপর যদি নিজের ভাষায় আনার চেষ্টা করা যায়, তবে সেই কাজ সফল হবেই। কিন্তু এখন যা অর্থকষ্টের যুগ, একেবারে শুরুতেই একে পেশা হিসেবে ভাববার কথা বলিই বা কী করে! তবু আশায় বুক বাঁধি, আমি যা পারিনি, তা হয়তো তরুণ প্রজন্ম করে দেখাবে, আরো অনেক সাহিত্যপ্রেমীর সাহায্যে! কী বলো?



