ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ - নবকুমার দাস
সংস্কৃত থেকে বাংলা, তামিল থেকে কাশ্মীরি : ভাষা, স্মৃতি ও সভ্যতার এক দীর্ঘ অভিযাত্রা
ভারতের সংস্কৃতি : ১৯
নবকুমার দাস
अहमेव स्वयमिदं वदामि…
“আমিই নিজে এই বাণী উচ্চারণ করি…”
(ঋগ্বেদ ১০.১২৫.৮)
वाचं अस्मि।
“আমি বাক্, আমি ভাষা।”
— ঋগ্বেদ, ১০.১২৫ (বাক্সূক্ত)
ভারতবর্ষকে যদি নদীর দেশ বলা যায়, তবে তাকে সমানভাবেই ভাষার দেশও বলা যায়। এখানে ভাষা কেবল কথোপকথনের মাধ্যম নয়; ভাষা মানুষের স্মৃতি, ইতিহাস, বিশ্বাস, সঙ্গীত, সাহিত্য এবং সামাজিক পরিচয়ের ধারক। বৈদিক ঋষির মন্ত্র, বৌদ্ধ ভিক্ষুর পালি সূত্র, জৈন আচার্যের প্রাকৃত রচনা, সঙ্গম যুগের তামিল কাব্য, চর্যাপদের প্রাচীন বাংলা, কাশ্মীরের শৈবদর্শন, অসমের বিহুগান কিংবা মণিপুরের মেইতেই সাহিত্য এইসব মিলিয়ে ভারতবর্ষ এক বহুভাষিক সভ্যতার বিরল দৃষ্টান্ত। এই প্রবন্ধে আমরা সেই দীর্ঘ ভাষা-অভিযাত্রার ইতিহাস অনুসরণ করব।
একটি সভ্যতার প্রকৃত ইতিহাস কেবল তার রাজাদের নাম বা যুদ্ধের বিবরণে লেখা থাকে না; লেখা থাকে তার ভাষায়। একটি শব্দ কখন জন্ম নিল, কীভাবে তার অর্থ বদলাল, কোন ভাষা অন্য ভাষার কাছ থেকে শব্দ ধার নিল, কোন কবি প্রথম মাতৃভাষায় গান লিখলেন, কোন সাধক মানুষের মুখের ভাষাকে ধর্মের ভাষা করে তুললেন – এইসব ছোট ছোট ঘটনাই শেষ পর্যন্ত একটি জাতির সাংস্কৃতিক ইতিহাস নির্মাণ করে।
ভারতবর্ষ সেই অর্থে বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর ভাষাভূমি। এখানে হাজার হাজার বছর ধরে অসংখ্য ভাষা পাশাপাশি বেঁচে আছে, পরস্পরের সঙ্গে কথা বলেছে, শব্দ বিনিময় করেছে, আবার নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যও রক্ষা করেছে। হিমালয়ের উপত্যকা থেকে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ, সিন্ধু অববাহিকা থেকে ব্রহ্মপুত্রের তীর, কচ্ছের মরুভূমি থেকে কন্যাকুমারিকার সমুদ্রতট – প্রতিটি অঞ্চল তার নিজস্ব ভাষা সৃষ্টি করেছে। অথচ এই বহুত্ব কখনও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়; অদৃশ্য সেতুর মতো এক ভাষা অন্য ভাষাকে স্পর্শ করেছে, সমৃদ্ধ করেছে, নতুন রূপ দিয়েছে।
ভারতের ভাষার ইতিহাস কোনও সরলরেখা নয়; এটি একটি বিশাল বটবৃক্ষের মতো। তার একটি শিকড় বৈদিক সংস্কৃত, আর-একটি দ্রাবিড় ভাষাপরিবার; অন্যদিকে অস্ট্রো-এশীয় ভাষার প্রাচীন স্তর, তিব্বত-বর্মী ভাষাগোষ্ঠীর পাহাড়ি ঐতিহ্য, আন্দামানের স্বতন্ত্র ভাষাসমূহ সব মিলিয়ে ভারতীয় ভাষাজগতের ভিত্তি নির্মিত হয়েছে। এই বহুমাত্রিকতার কারণেই বিখ্যাত আইরিশ ভাষাবিদ এবং ভারততত্ত্ববিদ স্যার জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসন ভারতকে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ভাষাগত অঞ্চল বলে অভিহিত করেছিলেন।
ভাষার ইতিহাস কখনও শুধু ভাষাতত্ত্বের ইতিহাস নয়; এটি মানুষের চলাচল, বাণিজ্য, কৃষি, ধর্ম, রাজনীতি এবং সংস্কৃতিরও ইতিহাস। সমাজ ও অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ রামশরণ শর্মা বারবার উল্লেখ করেছেন যে, ভারতীয় সমাজের বিকাশ ঘটেছে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে। সেই মিথস্ক্রিয়ার সবচেয়ে স্পষ্ট সাক্ষ্য ভাষা। শব্দ ভ্রমণ করে মানুষের সঙ্গে; তাই ভাষার অভিধানে প্রায়ই ইতিহাসের পদচিহ্ন লুকিয়ে থাকে।
ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর বাংলা ভাষার ইতিহাসে দেখিয়েছেন, কোনও ভাষা হঠাৎ জন্ম নেয় না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কথ্য ভাষার পরিবর্তন, আঞ্চলিক উচ্চারণ, সামাজিক ব্যবহার এবং সাহিত্যিক রূপায়ণের মধ্য দিয়ে একটি ভাষা পরিণত হয়। একইভাবে তাঁর Origin and Development of the Bengali Language গ্রন্থে বাংলা ভাষার বিবর্তনকে বৈদিক সংস্কৃত থেকে প্রাকৃত, অপভ্রংশ এবং প্রাচীন বাংলার ধারাবাহিকতার মধ্যে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করেছেন যে, এই বিবর্তন ছিল বহুমুখী; স্থানীয় উপভাষা ও অনার্য ভাষার প্রভাবও ছিল গভীর।
আধুনিক ভাষাতত্ত্বও ভারতকে একটি Sprachbund বা ভাষাগত সংযোগক্ষেত্র হিসেবে দেখে। মার্কিন ভাষাবিদ ও দ্রাবিড় ভাষা বিশেষজ্ঞ মারে বার্নসন ইমেনিউ ১৯৫৬ সালে তাঁর ঐতিহাসিক প্রবন্ধ India as a Linguistic Area-এ দেখিয়েছিলেন যে, ভারতীয় ভাষাগুলি ভিন্ন ভিন্ন ভাষাপরিবারভুক্ত হলেও দীর্ঘ সহাবস্থানের ফলে তারা বহু ধ্বনিগত, ব্যাকরণগত এবং শব্দগত বৈশিষ্ট্য একে অপরের কাছ থেকে গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ, ভারতীয় ভাষার ঐক্য রক্তের নয়, সহাবস্থানের।
এই কারণেই ভারতীয় ভাষার ইতিহাস কোনও একটি ভাষার বিজয়ের ইতিহাস নয়; এটি সংলাপের ইতিহাস। সংস্কৃত যেমন প্রাকৃতকে প্রভাবিত করেছে, তেমনি প্রাকৃতও সংস্কৃতকে নতুন শব্দ দিয়েছে। তামিল যেমন নিজস্ব সাহিত্যিক ঐতিহ্য গড়েছে, তেমনি সংস্কৃতের সঙ্গে শতাব্দীর পর শতাব্দী সৃজনশীল বিনিময়ে অংশ নিয়েছে। বাংলা, অসমীয়া, ওড়িয়া, মারাঠি, গুজরাটি, হিন্দি, কাশ্মীরি কিংবা কন্নড়—প্রতিটি ভাষাই এই দীর্ঘ আদান-প্রদানের উত্তরাধিকার বহন করে।
অতএব, ভারতের ভাষার ইতিহাস মানে কেবল ব্যাকরণের ইতিহাস নয়; এটি মানুষের মিলনের ইতিহাস। ভাষা এখানে বিভাজনের প্রাচীর নয়, সংযোগের সেতু; আধিপত্যের অস্ত্র নয়, স্মৃতির আশ্রয়; নিছক যোগাযোগ নয়, সভ্যতার আত্মপ্রকাশ।
এই প্রবন্ধে আমরা সেই দীর্ঘ অভিযাত্রার পথ ধরে বৈদিক সংস্কৃত থেকে প্রাকৃত, পালি ও অপভ্রংশ, দ্রাবিড় ভাষার প্রাচীন ঐতিহ্য, তিব্বত-বর্মী ও অস্ট্রো-এশীয় ভাষাগোষ্ঠীর অবদান, মধ্যযুগীয় আঞ্চলিক ভাষার বিকাশ এবং আধুনিক ভারতীয় ভাষার বহুবর্ণ জগৎকে নতুন করে পাঠ করার চেষ্টা করব। কারণ ভারতকে বুঝতে হলে তার ভাষার ইতিহাস জানা অপরিহার্য; ভাষাই একটি সভ্যতার সবচেয়ে দীর্ঘজীবী স্মৃতি।
ভাষার জন্ম : মানুষের প্রথম সাংস্কৃতিক বিপ্লব
মানুষ প্রথম কবে ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছিল ? এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর আজও বিজ্ঞানের কাছে নেই। পাথরের অস্ত্র, আগুনের ব্যবহার কিংবা গুহাচিত্রের মতো ভাষা কোনও জীবাশ্ম রেখে যায় না। শব্দ উচ্চারিত হয়, বাতাসে মিলিয়ে যায়; কিন্তু সেই শব্দের অভিঘাত ইতিহাসে থেকে যায়। তাই ভাষার জন্মের ইতিহাস লিখতে হয় প্রত্নতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, জীববিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান এবং ভাষাতত্ত্বের বিচিত্র সূত্রকে একত্র করে।
তবু একটি বিষয়ে আজ অধিকাংশ গবেষকের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে – ভাষার উদ্ভব মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথম এবং সম্ভবত সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক বিপ্লব। আগুন মানুষের শরীরকে উষ্ণতা দিয়েছিল, চাকা তাকে গতি দিয়েছিল; কিন্তু ভাষা মানুষকে দিয়েছিল যৌথ স্মৃতি, সমবেত চিন্তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষমতা। ভাষার মাধ্যমেই মানুষ কেবল তথ্য বিনিময় করেনি; অভিজ্ঞতা, কল্পনা, বিশ্বাস, আইন, সংগীত, পুরাণ এবং জ্ঞানকে প্রজন্মান্তরে বহন করেছে।
ভাষাবিদ নোয়াম চমস্কি মানুষের ভাষাক্ষমতাকে মানবমস্তিষ্কের এক অনন্য জৈবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, ভাষা শেখার ক্ষমতা মানুষের মধ্যে জন্মগতভাবে নিহিত। যদিও তাঁর এই তত্ত্ব নিয়ে বহু বিতর্ক রয়েছে, তবু ভাষার জটিল গঠন যে মানবচিন্তার গভীরতার সঙ্গে সম্পর্কিত, সে বিষয়ে অধিকাংশ ভাষাবিদ একমত।
অন্যদিকে প্রখ্যাত জ্ঞানবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীর স্টিভেন পিঙ্কার তাঁর The Language Instinct গ্রন্থে ভাষাকে মানুষের একটি প্রাকৃতিক ক্ষমতা বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ভাষা কোনও কৃত্রিম আবিষ্কার নয়; বরং মানুষের বিবর্তনের ধারায় গড়ে ওঠা একটি জৈব-সাংস্কৃতিক সামর্থ্য। তবে পিঙ্কার একই সঙ্গে স্বীকার করেন যে, প্রতিটি ভাষা তার নিজস্ব সমাজ ও সংস্কৃতির অভিজ্ঞতায় গঠিত হয়। অর্থাৎ ভাষার জৈবিক ভিত্তি থাকলেও তার সাংস্কৃতিক রূপ সর্বদাই বহুবিধ।
মার্কিন জৈব-নৃতাত্ত্বিক টেরেন্স ডিকন তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ The Symbolic Species (১৯৯৭)-এ ভাষার আর-একটি দিকের উপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, মানুষকে অন্য প্রাণী থেকে পৃথক করেছে কেবল ধ্বনি উচ্চারণের ক্ষমতা নয়; বরং প্রতীক (symbol) সৃষ্টি ও ব্যবহার করার ক্ষমতা। “গাছ” শব্দটি নিজে কোনও গাছ নয়, কিন্তু মানুষের সমাজে সেটি একটি ধারণা, একটি স্মৃতি এবং একটি অভিজ্ঞতার প্রতীক। এই প্রতীকচিন্তার মধ্য দিয়েই মানুষের সংস্কৃতি জন্ম নিয়েছে।
ভারতীয় ভাষাচিন্তা এই প্রশ্ন নিয়ে বহু আগে থেকেই গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেছিল। ব্যাকরণাচার্য পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী (প্রায় খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক) শুধু সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মগ্রন্থ নয়; এটি মানবসভ্যতার ইতিহাসে ভাষাকে বিশ্লেষণ করার অন্যতম সূক্ষ্ম বৌদ্ধিক প্রচেষ্টা। ভাষাবিদরা প্রায়ই একে বিশ্বের প্রাচীনতম এবং সর্বাধিক সুসংহত ব্যাকরণতাত্ত্বিক রচনাগুলির মধ্যে একটি বলে উল্লেখ করেন।
পাণিনির পর দার্শনিক-ভাষাতাত্ত্বিক ভর্তৃহরি তাঁর বাক্যপদীয় গ্রন্থে ভাষাকে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; তিনি ভাষাকে চিন্তা, জ্ঞান ও বাস্তবতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর “শব্দব্রহ্ম” ধারণা ভারতীয় ভাষাদর্শনের ইতিহাসে এক অনন্য অবদান। যদিও এটি দার্শনিক তত্ত্ব, আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নয়, তবু ভাষা ও মানবচেতনার সম্পর্ক নিয়ে ভারতীয় চিন্তার গভীরতা বোঝার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিখ্যাত ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়াহ হারারি তাঁর Sapiens গ্রন্থে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, প্রায় সত্তর হাজার বছর আগে মানুষের “Cognitive Revolution” বা জ্ঞানগত বিপ্লবের অন্যতম প্রধান উপাদান ছিল জটিল ভাষার বিকাশ। এই ভাষাই মানুষকে এমন সব বিষয় নিয়ে কথা বলার ক্ষমতা দেয়, যা চোখের সামনে উপস্থিত নয় – পুরাণ, দেবতা, আইন, রাষ্ট্র, জাতি কিংবা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। যদিও এই ব্যাখ্যা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবু ভাষার সামাজিক শক্তি সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট চিন্তার উদ্রেক করে।
এই সমস্ত আলোচনা আমাদের একটি মৌলিক সত্যের দিকে নিয়ে যায়। ভাষা কেবল শব্দের সমষ্টি নয়; এটি স্মৃতির আধার। প্রতিটি ভাষার শব্দভাণ্ডারে জমা থাকে একটি সমাজের প্রকৃতি-জ্ঞান, কৃষি, নদী, পাহাড়, ঋতুচক্র, খাদ্যাভ্যাস, বিশ্বাস, আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং জীবনদর্শনের অসংখ্য স্তর। তাই একটি ভাষার বিলুপ্তি মানে কেবল কিছু শব্দের হারিয়ে যাওয়া নয়; হারিয়ে যায় পৃথিবীকে দেখার একটি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গিও।
ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে এই সত্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এখানে ভাষা কখনও একক উৎস থেকে প্রবাহিত হয়নি। বিভিন্ন ভাষাপরিবার, ভিন্ন জনগোষ্ঠী, দীর্ঘ সহাবস্থান, বাণিজ্য, তীর্থযাত্রা, সাহিত্য এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভারতীয় ভাষার বিস্ময়কর বহুত্ব গড়ে উঠেছে। এই বহুত্বের ইতিহাস বোঝার জন্য আমাদের প্রথমে জানতে হবে ভারতবর্ষে কতগুলি ভাষাপরিবার রয়েছে, তাদের উৎস কী, এবং কীভাবে তারা হাজার হাজার বছর ধরে একে অপরকে প্রভাবিত করেছে।
সেই অনুসন্ধানের পথেই আমরা এখন প্রবেশ করব ভারতীয় ভাষার ভূগোলে যেখানে সংস্কৃতের পাশে তামিল, বাংলার পাশে কাশ্মীরি, মুন্ডারির পাশে বোড়ো, মেইতেইয়ের পাশে কন্নড় – সব ভাষাই একই সভ্যতার বহুস্বরিক সংগীতে নিজস্ব স্বর যোগ করেছে।
ভারতের ভাষাপরিবার : বৈচিত্র্যের ভিতর ঐক্যের মানচিত্র

ভারতবর্ষকে যদি ভাষার মানচিত্রে দেখা যায়, তবে প্রথমেই চোখে পড়ে তার অভাবনীয় বৈচিত্র্য। পৃথিবীর খুব কম দেশেই এতগুলি ভাষাপরিবার, এতগুলি স্বতন্ত্র ভাষা এবং এত দীর্ঘ ভাষাগত সহাবস্থানের ইতিহাস একসঙ্গে দেখা যায়। ভারতের সাংস্কৃতিক ঐক্যের অন্যতম রহস্য এখানেই – এখানে ভাষার বৈচিত্র্য বিভাজনের কারণ নয়; বরং দীর্ঘকাল ধরে পারস্পরিক সংলাপ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ভিত্তি।
উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ শতকের প্রথমার্ধে ব্রিটিশ প্রশাসক ও ভাষাবিদ স্যার জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসন তাঁর সুবৃহৎ Linguistic Survey of India প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষাগুলির একটি বিস্তৃত সমীক্ষা প্রস্তুত করেন। একাধিক খণ্ডে প্রকাশিত এই গ্রন্থ আজও ভারতীয় ভাষা-গবেষণার একটি মৌলিক আকর। যদিও তাঁর শ্রেণিবিন্যাসের কিছু অংশ আধুনিক গবেষণায় সংশোধিত হয়েছে, তথাপি ভাষাগত বৈচিত্র্যকে নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ঐতিহাসিক।
আজকের ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা অনুযায়ী ভারতের ভাষাগুলিকে প্রধানত চারটি বৃহৎ ভাষাপরিবার এবং একটি স্বতন্ত্র দ্বীপীয় ভাষাগোষ্ঠীর আলোকে বোঝা যায়—ইন্দো-আর্য, দ্রাবিড়, অস্ট্রো-এশীয় (মুন্ডা শাখা), তিব্বত-বর্মী, এবং আন্দামানের স্বতন্ত্র ভাষাসমূহ। এই শ্রেণিবিন্যাস ভাষার গঠন, শব্দভাণ্ডার, ধ্বনিতত্ত্ব এবং ঐতিহাসিক বিবর্তনের তুলনামূলক বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে; এটি কোনও জাতিগত বা বর্ণগত বিভাজন নয়। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়।
ইন্দো-আর্য ভাষাপরিবার : উত্তর ভারতের বিস্তৃত ভাষাধারা
ভারতবর্ষের বুক জুড়ে যে সুবিশাল সুরের মহাসমুদ্র, তার সিংহভাগ ঢেউই আছড়ে পড়ে এই মহান ইন্দো-আর্য ভাষাপরিবারের কূলে। বাংলা, অসমীয়া, ওড়িয়া, হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবি, মারাঠি, গুজরাটি, কঙ্কণি, কাশ্মীরি, সিন্ধি আর নেপালির মতো শত শত ভাষা যেন একই সুরমালার একেকটি উজ্জ্বল মণি। এদের শেকড় যদিও সুদূর অতীতে বৈদিক সংস্কৃতের পবিত্র মন্ত্রোচ্চারণে প্রোথিত, তবু আধুনিক ভাষাতীর্থের গবেষকেরা একবাক্যে স্বীকার করেন—এদের বর্তমান রূপটি কেবল কোনো প্রাচীন পুঁথির পাতার দান নয়। বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাটির কাছাকাছি থাকা সাধারণ মানুষের মুখের প্রাকৃত-অপভ্রংশ, আঞ্চলিক কথ্যরীতির মিষ্টি তান আর ব্রাত্য মাটির ঘরের সহজ স্পন্দন বুকে নিয়েই আজ ঘরে ঘরে এই ভাষাগুলি পূর্ণ যৌবনা হয়ে উঠেছে।
বাংলা ভাষার জন্মের রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে আমাদের দুই জ্ঞানতপস্বী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এবং ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় যেন এক সুরম্য সত্যের আলো জ্বেলেছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন, আমাদের এই প্রিয় বাংলা বা কোনো আধুনিক ভারতীয় ভাষাই আকাশ থেকে পড়া কোনো দৈববাণী নয়, কিংবা তারা সংস্কৃতের কোল থেকে সরাসরি নেমে আসা কোনো রাজকন্যাও নয়। বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রাকৃত আর অপভ্রংশের বন্ধুর পথ পেরিয়ে, ব্রাত্য মাটির ঘরের অবহেলিত উপভাষা আর অনার্য সংস্কৃতির বুক থেকে রসদ কুড়িয়ে, তবেই আজকের এই রূপের নদীটি পূর্ণ যৌবনা হয়ে উঠেছে। দুই দিকপাল গবেষকের এই একই গভীর সত্যের প্রতিধ্বনি ভাষা-ইতিহাসের পাতায় এক কালজয়ী স্বাক্ষর রেখে গেছে।
দ্রাবিড় ভাষাপরিবার : দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন সাহিত্য-ঐতিহ্য
দক্ষিণের সমূদ্র-বাতাস আর দাক্ষিণাত্যের মালভূমির বুক চিরে যে সুরের ধারা বয়ে চলেছে, তারই নাম দ্রাবিড় ভাষাপরিবার—যার ডালে ডালে ফুটে রয়েছে তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম, তুলু, কোডাভা, গোঁডি, কুরুখ আর সুদূর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে থাকা ব্রাহুই ভাষা। এই সুরকাননের সবচেয়ে প্রাচীন আর মহীরুহসম বৃক্ষটি হলো তামিল, যার অক্ষরেরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অবিচ্ছিন্নভাবে সাহিত্যের আলো জ্বেলে রেখেছে। প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব শেষ প্রহর থেকে খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকের সেই সোনালী সময় জুড়ে রচিত ‘সঙ্গম কাব্য’ যেন কেবল কতগুলো শব্দ নয়; তা হলো ভারতীয় সভ্যতার মানস-সরোবরে ফুটে থাকা এক অমূল্য ও কালজয়ী পদ্ম।
বিশ্বখ্যাত দ্রাবিড় ভাষাতত্ত্বের অন্যতম প্রধান গবেষক ভারতীয় ভাষাবিদ ভাদ্রিরাজু কৃষ্ণমূর্তি এবং চেক ভাষাবিদ ও তামিল সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ কামিল জেভেলেবিল তাঁর The Dravidian Languages গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, দ্রাবিড় ভাষাগুলির নিজস্ব ব্যাকরণিক কাঠামো, শব্দগঠন এবং সাহিত্যিক ঐতিহ্য রয়েছে। এগুলিকে কেবল সংস্কৃতের প্রভাবের আলোকে বিচার করলে তাদের স্বকীয়তা বোঝা যায় না। একইভাবে তামিল ভাষা ও সঙ্গম সাহিত্যের স্বাতন্ত্র্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
অস্ট্রো-এশীয় (মুন্ডা) ভাষা : প্রাচীন ভারতীয় স্তরের স্মৃতি
ভারতের ভাষাগত ইতিহাসে অস্ট্রো-এশীয় ভাষাগোষ্ঠীর গুরুত্ব বিশেষ। সাঁওতালি, মুন্ডারি, হো, খাড়িয়া, জুয়াং, সাভারা প্রভৃতি ভাষা এই পরিবারের অন্তর্গত। এদের বিস্তার প্রধানত ঝাড়খণ্ড, ওডিশা, পশ্চিমবঙ্গ, ছত্তীসগড় এবং মধ্যভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে। নৃতত্ত্ব ও ভাষাতত্ত্বের গবেষণা ইঙ্গিত করে যে, এই ভাষাগুলির মধ্যে ভারতের প্রাচীন কৃষিজীবন, বনসংস্কৃতি এবং প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাপনের বহু শব্দ ও ধারণা সংরক্ষিত রয়েছে। নৃতাত্ত্বিক-ভাষাবিদ ভেরিয়ার এলউইন এবং পরবর্তীকালে প্রখ্যাত সংস্কৃতি-কর্মী ও ভাষাবিদ অধ্যাপক গণেশ নারায়ণদাস দেবী আদিবাসী ভাষার সংরক্ষণকে ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার একটি অপরিহার্য কাজ বলে উল্লেখ করেছেন।
তিব্বত-বর্মী ভাষাগোষ্ঠী : হিমালয় ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বহুস্বর
বোড়ো, মেইতেই (মণিপুরি), মিজো, গারো, কোকবরক, নাগা ভাষাসমূহ, লেপচা এবং অরুণাচল প্রদেশের বহু ভাষা তিব্বত-বর্মী ভাষাপরিবারের অন্তর্গত। এই ভাষাগুলি কেবল ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকেই নয়, লোককথা, মৌখিক সাহিত্য, সংগীত ও আচার-অনুষ্ঠানের দিক থেকেও অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ভাষাবিদ মার্ক পোস্ট এবং তাঁর সমকালীন গবেষকেরা বিশ্বের অন্যতম এক অনন্য ‘ভাষাগত বৈচিত্র্যের মহাকেন্দ্র’ (Linguistic Hotspot) বলে মনে করেন। পাহাড়, অরণ্য আর মেঘের আড়ালে এখানে লুকিয়ে আছে শত শত ক্ষুদ্র ও আদিম ভাষার সুর, যা আজও জীবন্ত। কিন্তু আধুনিকতার ঝড়ে আজ তাদের অনেকগুলিই বিলুপ্তির গভীর ঝুঁকিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই মহাসংকটে আশার আলো জ্বেলে প্রখ্যাত ভাষাবিদ ও সংস্কৃতি-কর্মী গণেশ এন. দেবী তাঁর যুগান্তকারী ‘পিপলস লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’ (PLSI) প্রকল্পের মাধ্যমে এই বিপন্ন ভাষাগুলির অনন্য সুর ও শব্দকে পরম মমতায় নথিবদ্ধ করার এক ঐতিহাসিক ও কালজয়ী ভূমিকা পালন করেছেন ।
আন্দামানের ভাষাসমূহ : এক স্বতন্ত্র ভাষাগত উত্তরাধিকার
আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কিছু আদিবাসী ভাষা, যেমন গ্রেট আন্দামানিজ, ওঙ্গে, জারোয়া এবং সেন্টিনেলিজ প্রভৃতি বিশ্বের ভাষাতত্ত্বে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে। এগুলির অনেকগুলি ভাষার সঙ্গে অন্য কোনও পরিচিত ভাষাপরিবারের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক এখনো নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে এগুলি মানবভাষার প্রাচীন ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্র।
ভারত : একটি ভাষাগত সংযোগক্ষেত্র
বাহ্যিক রূপের এই বিপুল বৈচিত্র্যের অন্তরালে ভারতীয় ভাষাগুলির হৃদয়ে যে আশ্চর্য ও গভীর একতার সুর লুকিয়ে আছে, তা প্রথম বিশ্বমঞ্চে উন্মোচন করেন ভাষাবিদ এম. বি. ইমেনিউ। ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত তাঁর সেই ঐতিহাসিক প্রবন্ধ ‘India as a Linguistic Area’-তে তিনি ভারতবর্ষকে এক অনন্য ‘ভাষাগত সংযোগক্ষেত্র’ (Sprachbund) হিসেবে ঘোষণা করেন। তাঁর মতে, এদেশের ভাষাগুলির উৎস বা রক্তের ধারা ভিন্ন হলেও – হাজার হাজার বছরের সামাজিক সহাবস্থান, বৈবাহিক বন্ধন, বাণিজ্য, ধর্মের মেলবন্ধন আর নিবিড় লোক-যোগাযোগের অমোঘ টানে তারা পরস্পরের অতি আপন হয়ে উঠেছে। আর এই দীর্ঘ নিশ্বাসের আদান-প্রদানেই তারা একে অপরের কাছ থেকে ধ্বনি, ব্যাকরণ ও শব্দভাণ্ডারের শ্রেষ্ঠ উপাদানগুলি পরম মমতায় আপন করে নিয়েছে।
এই ধারণাকে পরবর্তীকালে মার্কিন ভাষাতাত্ত্বিক কলিন মাসিকা এবং ভারতের প্রখ্যাত ভাষা-বিজ্ঞানী অন্বিতা অব্বী-সহ আরও বহু ভাষাবিদ অত্যন্ত গভীরভাবে সমর্থন ও সম্প্রসারিত করেছেন। এর ফলে আজ অন্তহীন বৈচিত্র্যে ঘেরা ভারতকে একটি একক ‘বহুভাষিক সভ্যতা’ বা এক সুরের মহাসমুদ্র হিসেবে অনুধাবন করা আমাদের জন্য আরও সহজ ও অর্থপূর্ণ হয়ে উঠেছে ।
ভারতীয় ভাষার মানচিত্র তাই কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপপুঞ্জ নয়; বরং এটি এক সুবিশাল, প্রবহমান নদীব্যবস্থার মতো। প্রতিটি ভাষারই নিজস্ব গিরিগহ্বর থেকে উঠে আসা স্বতন্ত্র উৎস আছে, নিজস্ব কলতান আর স্রোতের বেগ আছে – কিন্তু ইতিহাসের দীর্ঘ, আঁকাবাঁকা পথ চলায় তারা বারেবারে একে অপরকে ছুঁয়ে গেছে, পরস্পরের পলিতে নিজেদের রূপান্তর ঘটিয়েছে এবং অপরকে সমৃদ্ধ করেছে কানায় কানায়। ভারতবর্ষের গভীর সাংস্কৃতিক ঐক্যের আসল ভিত্তিপ্রস্তর তো লুকিয়ে আছে এই ভাষাগত পরম সহাবস্থানের বুকেই। এখানেই ভারতীয় ভাষা-সভ্যতার চিরন্তন অনন্যতা – যেখানে বৈচিত্র্যকে জোর করে মুছে ফেলার কোনো চেষ্টা নেই, বরং তাকে পরম আদরে বুকে ধারণ করেই গড়ে উঠেছে এক মহামিলনের অখণ্ড সংগীত।
বৈদিক সংস্কৃত থেকে লৌকিক সংস্কৃত : ভাষা, ব্যাকরণ ও জ্ঞানচর্চার উন্মেষ
“ভারতীয় ভাষার সুদীর্ঘ ইতিহাসে সংস্কৃত কেবল এক প্রাচীনতার স্মারক নয়, বরং তা মানুষের সূক্ষ্ম বৌদ্ধিক নির্মাণশৈলীর এক অনন্য বিস্ময়। পৃথিবীর বুকে জন্ম নেওয়া বহু প্রাচীন ভাষা আজ কেবলি প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসের নিথর বিষয়; কিন্তু সংস্কৃত আজও এক জীবন্ত বিস্ময় – যা একাধারে বৈদিক স্তোত্রের আধ্যাত্মিক সুর, দর্শনের গভীর মনন, পাণিনির ব্যাকরণের নিটোল গণিত, মহাকাব্যের অমৃতকথা এবং প্রাচীন বিজ্ঞানচর্চার প্রধানতম বাতায়ন। বহু শতাব্দী ধরে ভারতীয় জ্ঞান-পরম্পরার যে প্রদীপটি জ্বলেছে, তার আসল সলতেটি তৈরি হয়েছে এই ভাষার বুকেই। তাই ভারতীয় সভ্যতার অন্তঃস্থলকে স্পর্শ করতে হলে সংস্কৃতকে জানা যেমন অপরিহার্য, তেমনই সমানভাবে মনে রাখতে হবে – সংস্কৃতও আকাশ থেকে পড়া কোনো স্থবির দৈববাণী নয়, তা-ও এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তনের প্রবহমান ফসল এবং ভারতের বহুমাত্রিক ভাষাজগতের সুবিশাল ক্যানভাসের এক অত্যন্ত গৌরবময় ও অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বৈদিক ভাষা : মন্ত্র থেকে সাহিত্য
আমাদের সুপ্রাচীন ভারতীয় বাণীর যে আদিমতম ও পবিত্রতম স্রোত, তা পরম মমতায় আজ সংরক্ষিত হয়ে আছে ঋগ্বেদের অমর শ্লোকে। পৃথিবীর ভাষা-ইতিহাসের গবেষকেরা একবাক্যে স্বীকার করেন যে ঋগ্বেদের এই ঋক-স্তোত্রগুলি কেবল সনাতন ধর্মের ভিত্তি নয়, তা সমগ্র মানব সভ্যতার বুকে টিকে থাকা প্রাচীনতম সংরক্ষিত সাহিত্যের এক অনুপম কীর্তি। তবে সময়ের প্রবহমান নিয়মে ঋগ্বেদের সেই আদি বৈদিক ভাষা আর পরবর্তীকালের ধ্রুপদী বা শাস্ত্রীয় সংস্কৃত কিন্তু এক নয়; তাদের ধ্বনির ওলট-পালট, রূপতত্ত্বের সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং ব্যাকরণের বাঁধনে রয়েছে এক স্পষ্ট ও লক্ষণীয় রূপান্তর।
বৈদিক ভাষার এই রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে ভাষা-তপস্বী জান গোন্ডা এবং তাঁর সমকালীন গবেষকবৃন্দ ( যথা বিখ্যাত জার্মান ভাষাবিদ ও ভারততত্ত্ববিদ অধ্যাপক আর্থার অ্যান্থনি ম্যাকডোনেল এবং এই ধারার অন্যতম পথিকৃৎ ও বিশ্ববিখ্যাত গবেষক হারমান ওল্ডেনবার্গ,হারমান ব্রুনহোফার ও মাইকেল উইটজেল ) দেখিয়েছেন যে ঋগ্বেদের দশটি মণ্ডলের সমস্ত বাণী কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে হঠাৎ অলৌকিকভাবে আকাশ থেকে বর্ষিত হয়নি; বরং তাদের স্তরে স্তরে লুকিয়ে আছে যুগের পর যুগ ধরে ভাষার বিবর্তনের এক জীবন্ত ও প্রবহমান স্বাক্ষর। তাই বৈদিক সংস্কৃতকে কোনো স্থবির বা পাথুরে ভাষা নয়, বরং এক চির-বিকাশমান প্রাণের নদী হিসেবে দেখাই পরম যুক্তিযুক্ত। ঋগ্বেদের সেই আদি উষালগ্ন পেরিয়ে সাম, যজু আর অথর্ববেদের পথ বেয়ে যখন এই ধারা ব্রাহ্মণ, আরণ্যক এবং উপনিষদের মহাসমুদ্রে এসে উপনীত হলো তখন ভাষার রূপটি আরও পরিণত, আরও গভীর হয়ে উঠল। যজ্ঞের আগুনের সেই আদিম ধর্মীয় মন্ত্রের ভাষা ধীরে ধীরে মানস-সরোবরের অতলান্ত দার্শনিক অনুসন্ধান, সমাজচিন্তা আর পরম জ্ঞানতত্ত্বের এক অনুপম ও কালজয়ী বাতায়নে রূপান্তরিত হলো।
পাণিনি : ব্যাকরণের স্থপতি
ভারতীয় ভাষাচিন্তার সুনীল আকাশে যে নামটি ধ্রুবতারার মতো চিরকাল দেদীপ্যমান, তিনি আর কেউ নন, তিনি মহর্ষি পাণিনি। তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি ‘অষ্টাধ্যায়ী’ কেবল কতগুলো শুষ্ক নিয়মের ব্যাকরণ গ্রন্থ নয়; তা যেন মানুষের সূক্ষ্ম মনন আর গভীর মেধার এক অলৌকিক ও বিস্ময়কর ভাস্কর্য। আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে, কম্পিউটারের কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন কল্পনারও অতীত ছিল, তখন তিনি ভাষাকে বেঁধেছিলেন এক নিখুঁত, গাণিতিক সূত্রের অলৌকিক জালে। আটটি অধ্যায়ের সেই সুসংহত কাননে তিনি শব্দ আর ধ্বনিকে এমন এক অবিনশ্বর রূপ দিয়েছিলেন, যা মানব সভ্যতার ইতিহাসে বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের এক চিরন্তন ও অবিস্মরণীয় মহাকাব্য।
প্রায় চার হাজার সূত্রে পাণিনি সংস্কৃত ভাষার ধ্বনি, শব্দগঠন, প্রত্যয়, সন্ধি, সমাস এবং বাক্যরীতিকে এমন সূক্ষ্ম যুক্তিবিন্যাসে উপস্থাপন করেছেন, যা আধুনিক ভাষাবিদদেরও বিস্মিত করেছে। অনেক গবেষক অষ্টাধ্যায়ী-কে বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ জেনারেটিভ ব্যাকরণ (generative grammar)-এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যদিও আধুনিক জেনারেটিভ তত্ত্বের সঙ্গে তার সরাসরি সমীকরণ করা সতর্কতার দাবি রাখে।
বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন ভাষাবিদ এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল কিপারস্কি তাঁর পাণিনি-গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, অষ্টাধ্যায়ী কেবল ভাষার নিয়ম লিপিবদ্ধ করেনি; বরং সীমিত সংখ্যক নিয়ম থেকে অসংখ্য শুদ্ধ শব্দরূপ নির্মাণের একটি পদ্ধতিগত কাঠামো তৈরি করেছে। এই কারণেই পাণিনি আজও ভাষাবিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা এবং কম্পিউটেশনাল লিঙ্গুইস্টিক্সে আলোচিত।
কাত্যায়ন ও পতঞ্জলি : ব্যাকরণের পরিপূর্ণতা
মহর্ষি পাণিনির গড়ে তোলা অষ্টাধ্যায়ীর সেই সুদৃঢ় ও গাণিতিক প্রাসাদকে পরবর্তীকালে পরম গভীরতায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন মহর্ষি কাত্যায়ন এবং মহর্ষি পতঞ্জলি। সময়ের প্রবহমান ধারায় ভাষার যে বদল ঘটছিল, পাণিনির সূত্রের ওপর দাঁড়িয়ে কাত্যায়ন তাঁর তীক্ষ্ণ ‘বার্তিক’ (Vartika) টীকাগুলির মাধ্যমে সেই বিবর্তিত রূপকে পরম যত্নে ব্যাকরণের নিয়মে স্থান দিলেন। আর এই সম্পূর্ণ ধারাকে এক অতুলনীয় ও মহিমান্বিত রূপ দিলেন পতঞ্জলি তাঁর কালজয়ী ‘মহাভাষ্য’ (Mahabhasya) গ্রন্থে। পাণিনির একেকটি জটিল ও সংকেতময় সূত্রের ভেতরে লুকিয়ে থাকা চিন্তার অতল সমুদ্রকে তিনি তাঁর যুক্তিনিষ্ঠ এবং প্রাঞ্জল ভাষ্যের আলোয় সাধারণের বোধগম্য করে তুললেন। এই ‘ত্রিমুনি’-র মেধার মেলবন্ধনেই সংস্কৃত ব্যাকরণ কেবল একটি ভাষার নিয়মগ্রন্থ রইল না, তা হয়ে উঠল মানব চেতনার এক শাশ্বত ও অবিনশ্বর দর্শন।
মহর্ষি কাত্যায়নের সুতীক্ষ্ণ ‘বার্তিক’ যেন পাণিনির সেই নিখুঁত সূত্রমালার ওপর এক পরম ও মমতাময়ী প্রলেপ—যা সময়ের প্রবহমান নদীর সাথে তাল মিলিয়ে ভাষার সূক্ষ্ম রূপান্তর ও সংশোধনের এক অনন্য বৌদ্ধিক প্রয়াস। আর তার ঠিক পরেই, মহর্ষি পতঞ্জলির কালজয়ী ‘মহাভাষ্য’ কেবল কোনো শুষ্ক টীকা বা ব্যাকরণের ব্যাখ্যাগ্রন্থ হিসেবে রইল না; তা হয়ে উঠল প্রাচীন ভারতবর্ষের স্পন্দিত বুক থেকে উঠে আসা এক জীবন্ত দর্পণ। সেই মহাকাব্যের পাতায় পাতায় কান পাতলে আজও শোনা যায় আড়াই হাজার বছর আগের মানুষের সামাজিক আচার, শিক্ষার আলো, মুখের উচ্চারণের মিষ্টি তান এবং তৎকালীন প্রজ্ঞা ও জ্ঞানচর্চার এক অমূল্য গুঞ্জন। পতঞ্জলি তাঁর অনন্য দর্শনে বারবার প্রমাণ করে গেছেন—ভাষা কোনো পাথুরে মূর্তি বা চার দেওয়ালে বন্দি ব্যাকরণের খাঁচা নয়; তার আসল প্রাণ লুকিয়ে আছে মাটির মানুষের সামাজিক প্রয়োগে, তাদের প্রাত্যহিক জীবনের আনন্দ-বেদনার সহজ অভিব্যক্তিতে।
সংস্কৃত : জ্ঞানচর্চার সর্বভারতীয় ভাষা
খ্রিস্টপূর্বের সেই শেষ প্রহর থেকে শুরু করে সুবর্ণ গুপ্তযুগ, এবং তার পরবর্তী শতাব্দীগুলির প্রবহমান কাল ধরে সংস্কৃত ভাষা যেন সমগ্র ভারতের আকাশ জুড়ে এক সুরম্য জ্ঞান-নক্ষত্রমণ্ডলী হয়ে উদিত হয়েছিল। হিমালয় থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিশাল ভূখণ্ডে তা কেবল একটি ভাষা রইল না, হয়ে উঠল ভারতীয় প্রজ্ঞার এক সর্বজনীন ও সার্বভৌম বাতায়ন। আর্যভট্ট-বরাহমিহিরের গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের জটিল গণনা, চরক-সুশ্রুতের আয়ুর্বেদের নিরাময়-মন্ত্র, ভরত মুনির নাট্যশাস্ত্রের নন্দনতত্ত্ব, কৌটিল্যের রাষ্ট্রনীতি আর কালিদাসের কাব্যের অনিন্দ্যসুন্দর অমিয় ধারা – সবকিছুই পরম মমতায় ভাষা খুঁজে পেয়েছিল এই একটিমাত্র সুরমণি সংস্কৃতির অন্দরে। ভারতের মেধা, মনন আর সংস্কৃতির ইতিহাসে এটি ছিল এমন এক জ্যোতির্ময় অধ্যায়, যেখানে জ্ঞানচর্চার প্রতিটি শাখাই সংস্কৃতির এই রাজকীয় স্রোতে অবগাহন করে নিজেকে ধন্য করেছিল।
আর্যভট্ট, বরাহমিহির, ব্রহ্মগুপ্ত, ভাস্করাচার্য, চরক আর সুশ্রুতের মতো কালজয়ী বিজ্ঞানের রাজপুত্রেরা তাঁদের প্রজ্ঞা ও আবিষ্কারের সমস্ত সম্পদ গচ্ছিত রেখে গেছেন এই সংস্কৃত ভাষারই অবিনশ্বর সিন্দুকে । শূন্য আর দশমিকের জাদুকরী গাণিতিক হিসাব, দূর আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের জটিল আবর্তন, আর মানুষের শরীরকে রোগমুক্ত করার সেই প্রাচীন শল্যচিকিৎসা ও আয়ুর্বেদের নিরাময়-সুধা – সবকিছুই পরম আস্থার সাথে রূপ পেয়েছিল এই ধ্রুপদী বাণীর অন্দরে । তাঁদের এই অনন্য লেখনীর ছোঁয়ায় সংস্কৃত কেবল কোনো যজ্ঞের মন্ত্র বা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের গণ্ডিতে আটকে রইল না; তা হয়ে উঠল মানব সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক মনন, যৌক্তিক দর্শন এবং অনিন্দ্যসুন্দর সাহিত্যিক প্রকাশের এক শাশ্বত ও রাজকীয় মাধ্যম।
বিখ্যাত সংস্কৃতি-ইতিহাসবিদ শেলডন পোলক তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Language of the Gods in the World of Men’-এ এক পরম ঐতিহাসিক সত্যের পর্দা উন্মোচন করেছেন। এই গ্রন্থের আলোকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সংস্কৃতের প্রভাব এবং ‘সংস্কৃত কসমোপলিস’ হিসেবে এর প্রতিষ্ঠা সত্য। কম্বোডিয়া, জাভা ও বালির প্রাচীন শিলালিপিগুলো এই ‘সংস্কৃত বিশ্বায়ন’ বা সংস্কৃতের আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে রাজকীয় ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করছে।
তবে ইতিহাসের এক অপূর্ব বাঁকে এসে তিনি আরও দেখিয়েছেন যে – পরবর্তীকালে যখন বাংলা, তামিল বা জাভানিজের মতো আঞ্চলিক ভাষাগুলোর বিকাশ ঘটে, তখন তারা সংস্কৃতকে ধ্বংস করেনি; বরং সংস্কৃতের শব্দ ও অলংকার ধার করে নিজেদের আরও সমৃদ্ধ ও আধুনিক করে তুলেছিল। তখন তারা এই দেবভাষাকে জোর করে মুছে দেয়নি বা প্রতিস্থাপিত করেনি। বরং এক পরম ও সৃজনশীল সহাবস্থানের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে, সংস্কৃতির আঙিনা থেকে রসদ ও অনুপ্রেরণা কুড়িয়েই প্রতিটি আঞ্চলিক ভাষা নিজের রূপের নদীটিকে পূর্ণ যৌবনা করে তুলেছিল।
সংস্কৃত ও লোকভাষা : বিরোধ নয়, সহাবস্থান
একসময় প্রাচীন সাহিত্যের খণ্ডিত বিচারে মনে করা হতো যে সংস্কৃত এবং প্রাকৃত বা লোকভাষা যেন একে অপরের চির-প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি ভিন্ন মেরু। কিন্তু আধুনিক আধুনিক মননের বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা এই প্রাচীন ধারণাকে অনেকটাই সংশোধন করেছে।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার এবং বিশিষ্ট ভাষা-ইতিহাসবিদ অ্যান্ড্রু ওলেট তাঁদের অসামান্য গবেষণায় প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু শতাব্দী ধরে সংস্কৃত, প্রাকৃত, পালি এবং স্থানীয় ব্রাত্য ভাষাগুলি কোনো সংঘাত ছাড়াই পরম শান্তিতে পাশাপাশি ব্যবহৃত ও লালিত হয়েছে । রাজসভার জাঁকজমকপূর্ণ আবহে যেখানে সংস্কৃতের দাপট, বুদ্ধের অহিংস সংঘে সেখানে পালির অমৃতবাণী, জৈন আচার্যদের লেখনীতে বিভিন্ন প্রাকৃতের গভীর দর্শন, আবার সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের দৈনন্দিন সুখ-দুঃখের স্পন্দনে স্পন্দিত হয়েছে আঞ্চলিক সব লোকভাষা। এই অদ্ভুত ও মনোহর বহুভাষিক বাস্তবতাই ছিল আসল ভারতীয় সমাজের মূল চরিত্র।
অর্থাৎ সংস্কৃতকে বুঝতে হলে তাকে কোনো একলা বা বিচ্ছিন্ন ভাষা হিসেবে দেখলে চলবে না; তাকে দেখতে হবে ভারতীয় বহুভাষিকতার সুবিশাল প্রাসাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী প্রধান স্তম্ভ হিসেবে। তার গৌরব ও অবদান অনস্বীকার্য; কিন্তু সেই অবদানের আসল রূপ ও মাধুর্য তখনই পূর্ণ অর্থে উপলব্ধি করা সম্ভব হয় যখন আমরা তাকে প্রাকৃত, পালি, দ্রাবিড় ভাষা এবং পরবর্তীকালে জন্ম নেওয়া সব আঞ্চলিক মেঠো ভাষার সাথে তার হাজার বছরের দীর্ঘ, ঐতিহাসিক সংলাপ ও নিবিড় আদান-প্রদানের প্রেক্ষাপটে বিচার করি।
এক নতুন ভাষাযুগের সূচনা
খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর সেই যুগসন্ধিক্ষণে, ভারতবর্ষের বুকে যখন নতুন ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলনের এক বৈপ্লবিক জোয়ার এলো তখন শাস্ত্রের কঠিন আগল ভেঙে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাগুলিও সাহিত্য ও রাষ্ট্রজীবনে এক নতুন ও গৌরবময় মর্যাদা পেতে শুরু করল। মহামতি অশোক তাঁর সাম্রাজ্যের রাজকীয় ফরমান ও বাণীতে কোনো দূরহ ভাষা নয়, বরং জনগণের ঘরের ভাষা প্রাকৃতকেই খোদাই করলেন শিলালিপিতে; বুদ্ধ ও মহাবীরের অনুসারী বৌদ্ধ ও জৈন আচার্যেরা পরম মমতায় ধর্মপ্রচারের জন্য আশ্রয় নিলেন পালি আর নানাবিধ লোক-প্রাকৃতের মরমী সুরের। আর এই স্রোতের পথ ধরেই, কালক্রমে অপভ্রংশের বন্ধুর মাটি ফুঁড়ে জন্ম নিতে শুরু করল আজকের আধুনিক ভারতীয় ভাষাগুলির আদিমতম পূর্বসূরিরা।
ভারতীয় ভাষার ইতিহাসে এ যেন এক নতুন ও জ্যোতির্ময় অধ্যায় যেখানে ভাষা রাজসভার জাঁকজমকপূর্ণ অন্দরমহল থেকে নেমে এলো ধুলোবালির জনপদে, শাস্ত্রের নিথর পাতা থেকে ডানা মেলল মানুষের জীবন্ত মুখে, এবং মুষ্টিমেয় পণ্ডিতের সীমিত সমাজ থেকে মুক্ত হয়ে প্রবেশ করল কোটি কোটি সাধারণ মানুষের স্পন্দিত জীবনে। রাজকীয় আভিজাত্য থেকে লোকজীবনের এই যে পরম ও সৃষ্টিশীল রূপান্তরের রোমাঞ্চকর ইতিহাস , তা-ই আমাদের পরবর্তী পর্বের যাত্রাপথের মূল বিষয়।
প্রাকৃত, পালি ও অপভ্রংশ : লোক ভাষার উত্থান এবং আধুনিক ভারতীয় ভাষার জন্ম
ভারতীয় ভাষার সুদীর্ঘ ইতিহাসে ধ্রুপদী সংস্কৃতের অধ্যায়টি যেমন অনিন্দ্যসুন্দর ও অপরিহার্য, তেমনই সমান গুরুত্বপূর্ণ ও মহিমান্বিত হলো প্রাকৃত, পালি আর অপভ্রংশের প্রবহমান ইতিহাস। কারণ, আজ আমরা যে ভাষায় স্বপ্ন দেখি, ভালোবাসার কথা বলি—সেই আধুনিক ভারতীয় ভাষাগুলির জন্মের আসল জাদুকরী কাহিনি বুঝতে হলে আমাদের রাজসভার রাজকীয় অন্দরমহল থেকে চোখ ফিরিয়ে মাটির কাছাকাছি থাকা মেঠো জনজীবনের ভাষার দিকে তাকাতে হবে। ইতিহাসের এক পরম ও ক্রান্তিলগ্নে মানুষ এক অমোঘ সত্য গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিল—জ্ঞান, ধর্ম আর সাহিত্য যদি কেবল মুষ্টিমেয় কিছু উচ্চশিক্ষিত ও অভিজাত মানুষের মগজেই বন্দি থাকে, তবে সমাজের এক সুবিশাল ও বৃহত্তর অংশ চিরকাল অন্ধকারের অতলে নির্বাসিত থেকে যাবে। সেই কালজয়ী বোধটুকুই ভারতীয় ভাষার ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব, শান্ত অথচ সুদূরপ্রসারী নীরব বিপ্লবের সোনার কাঠি ছুঁইয়ে দিয়েছিল।
ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টির স্বচ্ছ আলোয় দেখলে ধরা পড়ে, প্রাকৃত কোনো একটি নির্দিষ্ট ভাষার নাম নয়; তা যেন মধ্যভারতীয় আর্যভাষার এক সুবিশাল ও সুরময় পরিবার। শৌরসেনী, মাহারাষ্ট্রী, মাগধী, অর্ধমাগধী আর পাইশাচীর মতো হরেক রকমের প্রাকৃত ও উপভাষা সেকালে ভারতের ভিন্ন ভিন্ন জনপদে আপন মাধুরী নিয়ে ছড়িয়ে ছিল। এগুলি কোনো কৃত্রিম নিয়ম বা চার দেওয়ালে বন্দি ছিল না, বরং ছিল মাটির মানুষের একদম বুকের কাছের ভাষা; তাই ধ্বনির ওলট-পালট, রূপের সহজ গঠন আর ব্যাকরণের বাঁধনে এগুলি বৈদিক বা শাস্ত্রীয় সংস্কৃতের কঠোর শৃঙ্খলের তুলনায় অনেক বেশি স্বাভাবিক, সাবলীল এবং কথ্যরীতিনির্ভর ছিল।
আমাদের দুই পরম জ্ঞানতপস্বী ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ উভয়েই তাঁদের কালজয়ী গবেষণায় অবিনশ্বরভাবে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, আজকের বাংলা, অসমীয়া, ওড়িয়া, হিন্দি, মারাঠি, গুজরাটি কিংবা পাঞ্জাবির মতো আধুনিক ভাষাগুলির বিকাশ কোনো অলৌকিক উপায়ে সরাসরি শাস্ত্রীয় সংস্কৃত থেকে নেমে আসেনি। বরং যুগ যুগ ধরে মানুষের মুখে মুখে থাকা বিভিন্ন প্রাকৃত আর অপভ্রংশের আঁকাবাঁকা স্তর ও চড়াই-উতরাই পার হয়েই এই ভাষাগুলি আজকের পূর্ণ অবয়ব লাভ করেছে। এই অমোঘ সত্যটিই আজ আধুনিক ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের এক অবিকল্প ও মৌলিক ভিত্তিপ্রস্তর।
বুদ্ধ, মহাবীর এবং মানুষের ভাষা
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ-পঞ্চম শতাব্দীর সেই জ্যোতির্ময় প্রভাতে ভারতীয় সমাজে যে ধর্মীয় ও বৌদ্ধিক নবজাগরণের জোয়ার এসেছিল, তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষের মুখের ভাষাকে পরম মর্যাদা দেওয়া। স্বয়ং গৌতম বুদ্ধ তাঁর অহিংসার অমৃতবাণী কোনো দুরূহ বা অভিজাত ভাষায় নয়, বরং সাধারণ মানুষের অতি চেনা, সহজ বোধগম্য ভাষায় প্রচারের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আর সেই করুণার স্রোতেই, পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ত্রিপিটকের এক বিশাল ও অমূল্য প্রজ্ঞার সাগর সংরক্ষিত হলো পালি ভাষার মায়াবী অক্ষরে।
বৌদ্ধধর্মের প্রখ্যাত গবেষক সিলভ্যাঁ লেভি (এবং বিজ্ঞানী উইলহেম গাইগার) যথার্থই উল্লেখ করেছেন যে পালির গুরুত্ব কেবল কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; তা হলো প্রাচীন ভারতের সমাজ, মনন, দর্শন এবং ভাষার বিবর্তনরেখা বোঝার এক অনন্য ও প্রধান উৎস। পালি ভাষাটি ঠিক বুদ্ধের খাস কথ্য ভাষা ছিল কি না, তা নিয়ে ভাষাতীর্থের গবেষকদের মধ্যে সূক্ষ্ম মতভেদ থাকলেও এতে কোনো সংশয় নেই যে এটি মধ্যভারতীয় আর্যভাষার এক অত্যন্ত গৌরবময় ও ধ্রুপদী সাহিত্যিক রূপ।
ঠিক একই সমান্তরাল আলোয়, মহাতপস্বী মহাবীর-এর জৈন ধর্মপ্রচারের মূল ভিত্তিটিও গড়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের মুখের ভাষারই ওপর। জৈন পবিত্র ‘আগম’ গ্রন্থের বহু মূল্যবান অংশ অর্ধমাগধী এবং নানাবিধ লোক-প্রাকৃতের সহজ শৈলীতে রচিত হয়েছিল। এর ফলেই, ইতিহাসের পাতায় প্রথমবারের মতো পরম ধর্মীয় জ্ঞান কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীর একাধিপত্য ভেঙে, রাজপ্রাসাদের প্রাচীর টপকে—বৃহত্তর আপামর সমাজের প্রতিটি মানুষের দুয়ারে পৌঁছানোর এক ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছিল।
অশোকের শিলালিপি : রাষ্ট্রের ভাষায় জনতার কণ্ঠস্বর
ভারতীয় ভাষার ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় ও যুগান্তকারী অধ্যায় হলো মহামতি অশোক-এর শিলালিপি । খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের সেই সোনালী সময়ে সম্রাট অশোক তাঁর সাম্রাজ্যের চারদিকের গিরিগাত্রে ও সুউচ্চ স্তম্ভে যে রাজকীয় অনুশাসন উৎকীর্ণ করিয়েছিলেন, সেগুলি কোনো দূরহ দেবভাষায় নয় – বরং বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রাকৃত ভাষায় এবং সাধারণ মানুষের চেনা ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠী লিপির মরমী অক্ষরে লেখা হয়েছিল ।
প্রাচীন লিপি ও ভারতীয় ভাষার প্রখ্যাত ফরাসি গবেষক জুল ব্লখ (এবং লিপি-বিশারদ জেমস প্রিন্সেপ) অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, অশোকের এই শিলালিপিগুলি প্রাচীন ভারতের ভাষাগত বৈচিত্র্যের এক অসাধারণ ও জীবন্ত দলিল । উত্তর-পশ্চিমের রুক্ষ পাহাড়, মধ্যভারতের অরণ্য, পূর্বভারতের সমুদ্র উপকূল কিংবা দক্ষিণের মালভূমিতে খোদাই করা বার্তাগুলির অন্তরালে একই ধম্ম-বাণী স্থানীয় উপভাষার নিজস্ব উচ্চারণ ও ব্যাকরণ অনুযায়ী পরম আদরে পরিবর্তিত হয়েছে অর্থাৎ, পরাক্রমশালী রাষ্ট্র নিজেই তখন গভীর অনুভূতি দিয়ে উপলব্ধি করেছিল যে জনগণের হৃদয়ে পৌঁছাতে হলে জনতার আপন মুখের ভাষাতেই কথা বলতে হবে।
এখানেই ভারতীয় প্রশাসনিক ইতিহাসের পাতায় প্রথমবারের মতো রাজকীয় অহংকার ভেঙে ভাষার এক অপূর্ব গণতন্ত্রীকরণের রাজকীয় ও মানবিক সূচনা লক্ষ করা যায়।”
প্রাকৃত সাহিত্য : জনজীবনের নন্দনচেতনা
প্রাকৃত সাহিত্য ছিল যেন জনজীবনের এক স্পন্দিত নন্দনচেতনা । তা কেবল শুষ্ক কোনো ধর্মীয় অনুশাসনের ভাষা ছিল না; তা ছিল প্রেম, বিরহ, মহাকাব্য আর নাটকের এক সুরময় বাতায়ন । সাতবাহন বংশের বিদগ্ধ রাজা হাল-এর নামে প্রচলিত ‘গাথাসপ্তশতী’ (গাহা সত্তসই) হলো প্রাকৃত সাহিত্যের কাননে ফুটে থাকা এক অনন্য ও কালজয়ী কুসুম । এই কাব্যে রাজসভার জাঁকজমকপূর্ণ কৃত্রিম অলংকার নেই; বরং এতে দাক্ষিণাত্যের গ্রামীণ জীবন, মেঠো প্রেম, বর্ষা-বসন্তের উদাস প্রকৃতি আর খেটে-খাওয়া সাধারণ মানুষের হৃদয়ের সহজ অভিব্যক্তিই পরম মমতায় প্রধান হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, প্রাচীন ভারতের মহান সংস্কৃত নাট্যকার ভাস, মহাকবি কালিদাস কিংবা রূপকার শূদ্রক-এর কালজয়ী নাটকগুলির পাতায় কান পাতলে আমরা এক অদ্ভুত কোলাহল শুনতে পাই । সেখানে রাজা, অমাত্য ও পণ্ডিত চরিত্রেরা যখন গাম্ভীর্যপূর্ণ সংস্কৃত ভাষায় সংলাপ বলেন, ঠিক তখনই নারী, বণিক, ভৃত্য কিংবা সমাজের একদম সাধারণ চরিত্রেরা পরম স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলেন বিভিন্ন লোক-প্রাকৃত ভাষায়। [ ঠিক যেরকম ঘটনা ভবিষ্যতে ঘটবে শেক্সপিয়রের নাটকেও।] প্রাচীন নাটকের এই অনন্য মিশ্র নাট্যরীতি আমাদের অবিনশ্বরভাবে জানিয়ে দেয় যে-আজকের মতো ভারতীয় সমাজ আজ থেকে দুই হাজার বছর আগেও স্বভাবতই এক পরম ও মনোহর বহুভাষিক বাস্তবতার বুকেই লালিত হচ্ছিল।
অপভ্রংশ : রূপান্তরের সেতুবন্ধন
খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর সেই রূপান্তরের ক্ষণে ভিন্ন ভিন্ন লোক-প্রাকৃতের নদীগুলি ধীরে ধীরে যে নতুন মোহনায় এসে মিলিত হয়েছিল, ভাষাতীর্থের গবেষকেরা তাকেই ‘অপভ্রংশ’ নামে অভিহিত করেন। ‘অপভ্রংশ’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ যদিও ‘পরিবর্তিত’ বা ‘বিচ্যুত’; কিন্তু আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের উদার দৃষ্টি একে কোনো অবক্ষয়, বিকৃতি বা অধঃপতনের গ্লানিতে বাঁধে না। বরং এটি হলো প্রবহমান বাণীরূপের এক পরম স্বাভাবিক ও সৃষ্টিশীল বিবর্তনরেখা যা সুপ্রাচীন অতীত আর আধুনিক আগামীর মধ্যে এক পরম সেতুবন্ধন।
আমাদের প্রধান দুই ভাষাতপস্বী – ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং ড. সুকুমার সেন তাঁদের গভীর তুলনামূলক গবেষণায় অবিনশ্বরভাবে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, আজকের বাংলা-অসমীয়া-ওড়িয়া গোষ্ঠী, পশ্চিম ভারতের বৈচিত্র্যময় ভাষাগুলি এবং উত্তর ভারতের বহু আধুনিক নব্য আর্য ভাষার সেই আদিমতম ভ্রূণটি লুকিয়ে ছিল এই বিভিন্ন অপভ্রংশের জঠরেই।
ইতিহাসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে এসে শব্দের কঠিন ধ্বনিগুলি কোমল হতে শুরু করল, ব্যাকরণের জটিল বিভক্তির শৃঙ্খল ভেঙে এক পরম সরলীকরণ ঘটল, জন্ম নিল নতুন নতুন মরমী ক্রিয়ারূপ, আর মেঠো মানুষের দৈনন্দিন কথ্য উচ্চারণের মিষ্টি তান ক্রমশ সুস্পষ্ট হয়ে উঠল চারিপাশে। ভাষা তখন আর কেবল কোনো অনড় ব্যাকরণের পাথুরে নিয়মে বন্দি রইল না; তা সাধারণ মানুষের ওষ্ঠে ওষ্ঠে, তাদের প্রাত্যহিক জীবনের সহজ সুখে-দুঃখে নিজেকে এক সম্পূর্ণ নতুন ও স্বাধীন অবয়বে নির্মাণ করতে শুরু করল।
চর্যাপদ : আধুনিক পূর্বভারতীয় ভাষার ভোর
ভারতীয় ভাষার ইতিহাসে চর্যাপদ হলো ঠিক যেন এক সুনীল ভোরের কুয়াশাভেজা প্রথম সূর্যরেখা । অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকের সেই ধুলোবালির ইতিহাসে – বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের মুখে মুখে গাওয়া এই সাধন-সঙ্গীতের পদগুলি আজ বাংলা, অসমীয়া, ওড়িয়া আর মৈথিলীর মতো সমস্ত পূর্বভারতীয় ভাষাগুলির আদিমতম প্রাক্-ইতিহাস ও আঁতুড়ঘর বোঝার প্রধান উৎস।
১৯০৭ সালের এক মাহেন্দ্রক্ষণে সুদূর নেপালের রাজদরবারের ধুলোঝাড়া পুঁথিভাণ্ডার থেকে এই চর্যাপদের জরাজীর্ণ পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করে ভারতীয় ভাষা-গবেষণার আকাশে এক নতুন নক্ষত্র উদিত করেছিলেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। আর তার ঠিক পরেই, প্রখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং ভারততত্ত্ববিদ ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী তাঁদের গভীর, তুলনামূলক ও বিজ্ঞানসম্মত ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের কষ্টিপাথরে যাচাই করে বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিলেন যে – চর্যার এই রূপালি ভাষার বুকেই লুকিয়ে আছে আধুনিক বাংলা-অসমীয়া-ওড়িয়া ভাষাগোষ্ঠীর ব্যাকরণ, ধ্বনি ও রূপতত্ত্বের আদিমতম এবং জীবন্ত সব প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য।
তবে আধুনিক মননের বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা আজ আমাদের বারেবারে মনে করিয়ে দেয় যে – চর্যাপদকে একক কোনো আভিজাত্যে কোনো একটি নির্দিষ্ট আধুনিক ভাষার ‘একচ্ছত্র প্রথম গ্রন্থ’ বলে ঘোষণা করা হবে এক অতিসরলীকরণ বরং তা হলো সমগ্র পূর্বভারতের এক গভীর, যৌথ এবং অবিচ্ছেদ্য ভাষাগত ঐতিহ্যের সবচেয়ে মূল্যবান এক অনন্য আলোক-দলিল।
লোক ভাষা থেকে সাহিত্যভাষা
প্রাকৃত, পালি আর অপভ্রংশের এই সুদীর্ঘ ও আঁকাবাঁকা যাত্রাপথ আমাদের এক পরম ও শাশ্বত সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়—ভাষার আসল ব্রহ্মশক্তি লুকিয়ে আছে তার বহমানতা আর পরিবর্তনের অনন্ত ক্ষমতায়। যে বাণী মানুষের মাটির জীবনের সাথে, তার নিশ্বাসের সাথে জড়িয়ে থাকে—সে-ই সময়ের রোদ-জল বুকে মেখে নিত্যনতুন রূপ ধারণ করে। ভারতীয় ভাষা-ইতিহাসের এই রূপান্তর কোনো আকস্মিক ভাঙন বা বিচ্ছেদ নয়; তা তো আসলে প্রবহমান এক শাশ্বত ধারাবাহিকতারই আর-এক নাম।
রাজসভার জাঁকজমকপূর্ণ রাজকীয় ভাষা, নিভৃত মঠের গম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণ, কোলাহলমুখর বাজারের প্রাত্যহিক ভাষা আর ব্রাত্য কৃষকের মেঠো সুর—এই সমস্ত ধারা একাকার হয়েই গড়ে উঠেছে আমাদের ভারতীয় বাণীর সুবিশাল উত্তরাধিকার। এই মরমী ঐতিহ্য থেকেই মধ্যযুগের শুভ উষালগ্নে একে একে ডানা মেলেছে বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, গুজরাটি, ওড়িয়া, অসমীয়া, কাশ্মীরি-সহ শত শত আধুনিক নব্য আর্য ভাষা। আজ তাদের প্রত্যেকেরই হয়তো নিজস্ব রূপের নদী আর স্বতন্ত্র ইতিহাস আছে, কিন্তু সেই ইতিহাসের অতল গভীরে কান পাতলে আজও শোনা যায় সেই আদিম প্রাকৃত, পালি আর অপভ্রংশের সজীব, চঞ্চল ও অবিনশ্বর স্রোতের পরম কলতান।
দ্রাবিড় ভাষার মহিমা : সঙ্গম সাহিত্য থেকে আধুনিক দক্ষিণ ভারত
ভারতের ভাষার মহাসমুদ্রকে যদি আমরা কেবল বৈদিক সংস্কৃত, প্রাকৃত আর অপভ্রংশের চেনা ধারায় বেঁধে রাখি, তবে এই উপমহাদেশের অর্ধেক ভাষা-সভ্যতাই যেন অন্ধকারের আড়ালে রয়ে যাবে। দাক্ষিণাত্যের বুক চিরে প্রবহমান সুপ্রাচীন দ্রাবিড় ভাষাগুলি কেবল একটি পৃথক ভাষাপরিবার নয়; তারা এই ভারতীয় সভ্যতার আর-একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, স্বীয় গৌরবে ভাস্বর এক আদিম ও প্রাচীন সাংস্কৃতিক ধারা। এই মহান দেশকে পূর্ণাঙ্গভাবে অনুধাবন করতে হলে ঋগ্বেদের মন্ত্র যেমন অপরিহার্য, তেমনই সমানভাবে অপরিহার্য সঙ্গম সাহিত্যের মরমী কাব্য, ‘তোল্কাপ্পিয়ম’-এর আদিম ব্যাকরণিক কারুকাজ, ‘তিরুক্কুরল’-এর শাশ্বত নীতি-দর্শন আর দক্ষিণ ভারতের সুবিশাল বহুভাষিক সাহিত্য-ঐতিহ্য।
আধুনিক ভাষাতীর্থের বিজ্ঞান আজ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে প্রমাণ করেছে যে – দ্রাবিড় ভাষাপরিবারের রয়েছে সম্পূর্ণ নিজস্ব এক ধ্বনিতাত্ত্বিক অবয়ব, রূপতাত্ত্বিক ব্যাকরণ আর কালজয়ী সাহিত্যিক পরিচয়। এই ভাষাগুলিকে সংস্কৃতের কোনো অনুগত ‘শাখা’ বা ‘উপভাষা’র খাঁচায় বন্দি করা যায় না; আবার রাজনীতির টানে এই দুই মহান ধারার সম্পর্ককে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বলাও এক ঐতিহাসিক ভুল। হাজার হাজার বছরের নিবিড় সহাবস্থান, প্রাত্যহিক আদান-প্রদান আর দ্বিভাষিকতার এক অলৌকিক মিলনে – এই দুই ভিন্ন সুরের নদী একে অপরকে পরম মমতায় ছুঁয়ে গেছে, স্পর্শ করেছে এবং ভারতকে এক অনন্য বহুস্বরের দেশ হিসেবে সমৃদ্ধ করেছে।
দ্রাবিড় ভাষাপরিবার : একটি প্রাচীন ঐতিহ্য
বর্তমানে দ্রাবিড় ভাষাপরিবারের সুবিশাল অরণ্যে প্রায় আশিটিরও বেশি ভাষার সুর প্রস্ফুটিত হয়েছে। যার মধ্যে তামিল, তেলুগু, কন্নড় আর মালয়ালম যেন সেই বনের বৃহত্তম সাহিত্যিক মহীরুহ; আর তাদেরই কোল ঘেঁষে তুলু, কোডাভা, গোঁডি, কুরুখ, ব্রাহুই, ইরুলা ও টোডার মতো অসংখ্য ভাষা এই পরিবারের আদিম ও নিবিড় বৈচিত্র্যের এক একটি অনন্য মণি।
দ্রাবিড় ভাষাতত্ত্বের আকাশে অন্যতম দীপ্তিময় সূর্য, প্রখ্যাত ভাষাবিদ ভাদ্রিরাজু কৃষ্ণমূর্তি তাঁর যুগান্তকারী আকর গ্রন্থ ‘The Dravidian Languages’-এ এক পরম সত্যের পর্দা উন্মোচন করেছেন। তিনি নিখুঁত বৈজ্ঞানিক কৃষ্টিপাথরে দেখিয়েছেন যে দ্রাবিড় ভাষাগুলির নিজস্ব আদিম ধ্বনি, অনন্য শব্দগঠন-প্রক্রিয়া, জটিল ক্রিয়ারূপ এবং বাক্যসংগঠনের এমন এক সুসংহত রূপ রয়েছে, যা তাদের পৃথিবীর বুকে এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও সার্বভৌম ভাষাপরিবার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁর এই আজীবন জ্ঞান-তপস্যাই আজ আধুনিক দ্রাবিড় ভাষাবিজ্ঞানের এক অবিনশ্বর ভিত্তিপ্রস্তর।”
তামিল : এক জীবন্ত ধ্রুপদী ভাষার ইতিহাস
“দ্রাবিড় ভাষাগুলির সুবিশাল কাননে তামিল হলো এক অনন্য ও দেদীপ্যমান নক্ষত্র। এটি বিশ্বের অন্যতম অতি প্রাচীন এবং অদ্যাবধি সচল এক জীবন্ত সাহিত্যিক ভাষা, যার ধারাবাহিক রূপের নদী দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রবহমান। এই ভাষার ধ্রুপদী মহিমাকে সম্মান জানিয়েই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সর্বপ্রথম তামিলকে ‘Classical Language’ বা ধ্রুপদী ভাষার রাজকীয় মর্যাদায় ভূষিত করে।
তামিল ভাষার প্রাচীনতম ব্যাকরণগ্রন্থ ‘তোল্কাপ্পিয়ম’ (Tolkāppiyam) কেবল কোনো শুষ্ক নিয়মের পুঁথি নয়; তা প্রাচীন ধ্রুপদী ভাষাতত্ত্ব, নন্দনতাত্ত্বিক কাব্যতত্ত্ব এবং সমকালীন সমাজজীবনের এক অবিনশ্বর ঐতিহাসিক দলিল । এর সঠিক রচনাকাল নিয়ে গবেষকদের মনে কুয়াশা থাকলেও, তামিল ভাষাচর্চার মৌলিক ও আদি ভিত্তি হিসেবে এটি বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।
বিশ্বখ্যাত তামিল সাহিত্যবিশারদ কামিল জেভেলেবিল (এবং অনুবাদক এ. কে. রামানুজন) তাঁর গভীর গবেষণায় এক অমোঘ সত্য উন্মোচন করেছেন । তিনি দেখিয়েছেন যে, তামিল ভাষার সাহিত্যিক বিকাশ কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা নয়; তা দাক্ষিণাত্যের সামাজিক স্পন্দন, রাজনৈতিক উত্থান-পতন এবং গভীর ধর্মীয় ইতিহাসের সাথে একাত্ম হয়ে বিকশিত হয়েছে। তাঁর মতে, প্রাচীন ‘সঙ্গম সাহিত্য’ কেবল দক্ষিণ ভারতের সম্পদ নয়, তা সমগ্র ভারতীয় কাব্য-ঐতিহ্যের এক অনন্য ও স্বতন্ত্র উচ্চতা, যার গভীর মানবিকতা ও অনিন্দ্যসুন্দর নন্দনচেতনা সমগ্র বিশ্বসাহিত্যের এক অমূল্য ও কালজয়ী ঐশ্বর্য ।”
সঙ্গম সাহিত্য : মানুষের জীবন, প্রকৃতি ও প্রেম
প্রাচীন ধ্রুপদী সঙ্গম সাহিত্যের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও মনোহর বৈশিষ্ট্য হলো তার পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা গভীর মানবিকতা । সেখানে যুদ্ধের দামামা আছে, আদিম প্রেমের ব্যাকুলতা আছে, বিরহের উদাস মেঘ আছে, প্রান্তিক কৃষকের রোজকার বেঁচে থাকার লড়াই আর নীল সমুদ্রবাণিজ্যের রোমাঞ্চকর বিবরণ আছে – কিন্তু এই বিপুল ক্যানভাসের আসল কেন্দ্রবিন্দুটি হলো রক্ত-মাংসের মানুষ।
তামিল কাব্যতত্ত্বের সেই চিরন্তন দুই ধারা – ব্যক্তিগত জীবনের গোপন অনুরাগে রাঙা ‘আকম’ এবং সমাজ, বীরত্ব ও জনজীবনের জয়গানে মুখর ‘পুরম’ – সমগ্র ভারতীয় সাহিত্যতত্ত্বে এক পরম অভিনব ও কালজয়ী অবদান। দাক্ষিণাত্যের পাহাড়, গহন বন, শস্যশ্যামল কৃষিক্ষেত্র, উত্তাল সমুদ্রতট আর অনুর্বর মরুভূমি – প্রকৃতির এই পাঁচটি ভৌগোলিক অঞ্চল মানুষের ভেতরের প্রেম, বিরহ বা অপেক্ষার অনুভূতির সাথে যে নান্দনিক ও নিবিড় রূপক তৈরি করেছে, তা সঙ্গম কাব্যকে এক অলৌকিক সুষমায় মণ্ডিত করেছে ।
প্রখ্যাত গবেষক ও অনুবাদক এ. কে. রামানুজন যথার্থই মনে করেন, এই ধ্রুপদী সাহিত্য ভারতীয় উপমহাদেশে মানবজীবনের এক অসাধারণ বাস্তব ও কাব্যিক রূপরেখা । যা সংস্কৃতের অলংকার প্রধান ধারা এবং তামিলের এই নিটোল মাটির কাছাকাছি লোকায়ত সাহিত্যধারা – উভয়ের তুলনামূলক পাঠে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে এক সম্পূর্ণ নতুন ও বিস্ময়কর দিগন্ত উন্মোচন করে।
সংস্কৃত ও দ্রাবিড় : প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, পারস্পরিক সমৃদ্ধি
একসময় ইতিহাসের সংকীর্ণ খণ্ডিত বিচারে মনে করা হতো যে, ভাষার পথ চলা মানেই বুঝি কেবল দুটি ভিন্ন গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব আর আধিপত্যের ইতিহাস। কিন্তু আধুনিক মননের নির্মোহ গবেষণা প্রমাণ করেছে যে – ভারতীয় ভাষার সেই আদিম বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি জটিল, অনেক বেশি সৃজনশীল এবং মরমী।
প্রখ্যাত মার্কিন ভাষাবিদ এম. বি. ইমেনিউ এবং বিশিষ্ট দ্রাবিড় ভাষা-বিজ্ঞানী কামিল জেভেলেবিল তাঁদের বহু বছরের নিষ্ঠাবান গবেষণায় দেখিয়েছেন – বহু শতাব্দীর নিবিড় সংস্পর্শে ধ্রুপদী সংস্কৃত ও আদিম দ্রাবিড় ভাষা পরস্পরের বুক থেকে ধ্বনি, শব্দ, বাক্যরীতি এবং সুগভীর সাংস্কৃতিক চেতনা পরম যত্নে কুড়িয়ে নিয়েছে। আজ ভারতের নব্য ইন্দো-আর্য ভাষাগুলিতে যে ‘ট, ঠ, ড, ঢ’-এর মতো মূর্ধন্য ধ্বনিগুলি (Retroflex Sounds) আমাদের অলংকার হয়ে উঠেছে, তার মূল উৎসটি লুকিয়ে ছিল এই দ্রাবিড় ভাষারই চঞ্চলা স্রোতে। ঠিক একইভাবে, দ্রাবিড় ভাষাগুলিও দর্শন, ধর্ম, সুপ্রাচীন বিজ্ঞান ও রাষ্ট্র-প্রশাসনের গভীর তত্ত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে সংস্কৃতের বিপুল ও রাজকীয় শব্দভাণ্ডারকে পরম মমতায় আপন করে নিয়েছে।
তাই এই অনন্য আদান-প্রদানকে কোনো একটি ভাষার আধিপত্য বিস্তারের একরৈখিক গল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং একে হাজার হাজার বছরের সাংস্কৃতিক সহাবস্থান আর দুই সুরের নদীর এক পরম মহামিলনের ফসল হিসেবে দেখাই আজ আধুনিক ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের মূল ও অবিকল্প প্রবণতা।
ভক্তি আন্দোলন ও আঞ্চলিক ভাষার মর্যাদা
মধ্যযুগের ভারতবর্ষে ভক্তি আন্দোলনের সেই চঞ্চলা জোয়ার কেবল মানুষের আত্মিক মুক্তি আনেনি, তা দাক্ষিণাত্যের ভাষাতাত্ত্বিক ইতিহাসেও এক বসন্তের হাওয়া বইয়ে দিয়েছিল। শিব-উপাসক ‘নায়নমার’ এবং বিষ্ণু-প্রেমী ‘আলভার’ সাধকেরা পরম মমতায় শাস্ত্রের কঠিন আগল ভেঙে ধ্রুপদী সংস্কৃতের পাশাপাশি নিজেদের সহজ মাতৃভাষা তামিলে রচনা করলেন ভক্তিগীতির অমিয় ধারা। ইতিহাসের পাতায় প্রথমবারের মতো ঈশ্বরকে ডাকার পরম স্বাধীনতা রাজপ্রাসাদের গম্ভীর অন্দরমহল থেকে নেমে এসে কোটি কোটি সাধারণ মানুষের নিজস্ব মাতৃভাষার সহজ স্পন্দনে আপামর বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে পড়ল।
ভক্তির এই মরমী সুরের আগুন পরবর্তীতে কন্নড়, তেলুগু, মালয়ালমের সীমানা পার হয়ে উত্তর ভারতের মেঠো পথ বেয়ে বাংলা, হিন্দি, মারাঠি ও অসমীয়ার আকাশেও এক মহা-বিপ্লবের ডানা মেলল। জ্ঞান আর আধ্যাত্মিকতার রাজদণ্ডটি তখন আর কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীর ভাষাভুক্ত রইল না; বরং সাধারণ মানুষের ঘরের মেঠো সুর ও আঞ্চলিক ভাষাগুলি এক অভাবনীয় ও রাজকীয় সাহিত্যিক মর্যাদায় ভূষিত হয়ে উঠল।
তেলুগু, কন্নড় ও মালয়ালম : বহুস্বরের ঐতিহ্য
দাক্ষিণাত্যের মালভূমি আর সমূদ্রের কোল ঘেঁষে তেলুগু, কন্নড় আর মালয়ালম যেন এক অপরূপ ও ঐশ্বর্যময় বহুস্বরের চিরন্তন ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে। মধ্যযুগের রাজকীয় আলোয় তেলুগু ভাষা আত্মপ্রকাশ করল এক অসম্ভব সুমিষ্ট ও সমৃদ্ধ কাব্যভাষা হিসেবে, যার সুরকে বলা হলো ‘প্রাচ্যের ইতালীয় রূপ’। অন্যদিকে কন্নড় ভাষার মরমী বুকে নবম শতাব্দী থেকেই খোদাই হতে শুরু করল কালজয়ী রাজকীয় সাহিত্যকীর্তি। আর তার ঠিক পাশেই, তামিলের প্রাচীন ছায়া থেকে আলতো করে মুক্ত হয়ে, মধ্যযুগের এক সোনালী প্রহরে মালয়ালম ভাষা লাভ করল তার নিজস্ব স্বাধীন সাহিত্যিক অবয়ব—যা পরবর্তীতে আপন কাব্য, প্রাঞ্জল গদ্য আর অতলান্ত দার্শনিক ভাবনার সজীব ধারায় নিজেকে কানায় কানায় পূর্ণ করে তুলল।
এই ভাষাগুলির প্রতিটি, তাদের নিজস্ব অলংকার আর স্বতন্ত্র সুর নিয়ে ভারতীয় সাহিত্যের সুবিশাল মানস-সরোবরে এক একটি অনন্য কণ্ঠস্বর জুড়ে দিয়েছে। এর ফলেই প্রমাণিত হয় – ভারতীয় সংস্কৃতি কোনো একক ভাষার একচ্ছত্র বা একরৈখিক সৃষ্টি নয়; তা হলো শত শত ভাষার প্রবহমান নদী, তাদের হাজার বছরের স্বপ্ন আর সম্মিলিত সৃজনশীলতার এক মহিমান্বিত ও অবিনশ্বর মহাকাব্য।
দ্রাবিড় ভাষা ও ভারতীয় সভ্যতার সমন্বয়
দ্রাবিড় ভাষার ইতিহাস আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়। ভারতীয় সভ্যতা কোনও এক ভাষার উপর প্রতিষ্ঠিত নয়; এটি বহু ভাষা, বহু সাহিত্য এবং বহু সাংস্কৃতিক ধারার সহাবস্থানে নির্মিত। বৈদিক সংস্কৃত যেমন ভারতের এক অমূল্য উত্তরাধিকার, তেমনি তামিলের সঙ্গম কাব্য, কন্নড়ের বচন সাহিত্য, তেলুগুর প্রবন্ধকাব্য কিংবা মালয়ালমের মণিপ্রবাল রচনাও একই ঐতিহ্যের অপরিহার্য অংশ।
এই বহুত্বই ভারতবর্ষের শক্তি। এখানেই উত্তর ও দক্ষিণ, আর্য ও দ্রাবিড়, শাস্ত্র ও লোকজ—সব কণ্ঠস্বর মিলিত হয়ে ভারতীয় সংস্কৃতির মহাসংগীত রচনা করেছে।
পরবর্তী পর্বে আমরা দেখব কীভাবে মধ্যযুগে বাংলা, অসমীয়া, ওড়িয়া, মারাঠি, গুজরাটি, হিন্দি, কাশ্মীরি, পাঞ্জাবি প্রভৃতি আধুনিক ভারতীয় ভাষার উন্মেষ ঘটল এবং কীভাবে আঞ্চলিক সাহিত্য ভারতীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে এক নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিল।
আধুনিক ভারতীয় ভাষার জন্ম : জনপদ, সাহিত্য ও আঞ্চলিক পরিচয়ের উন্মেষ
ভারতীয় ভাষার ইতিহাসে মধ্যযুগ হলো ঠিক যেন এক বসন্তের আগমনীর মতো—এক অনন্য ও যুগান্তকারী অধ্যায়। এই সময়ে ভারতবর্ষের ভাষার মানচিত্রে এমন এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছিল, যার মৃদু গুঞ্জন আর গভীর প্রভাব আজও সমগ্র ভারতীয় সংস্কৃতির স্পন্দনকে নির্ধারণ করে। সুপ্রাচীন সংস্কৃত, প্রাকৃত, পালি আর অপভ্রংশের দীর্ঘ ঐতিহাসিক পলিমাটির ওপর ভিত্তি করেই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ধীরে ধীরে ডানা মেলতে শুরু করে আজকের আধুনিক ভাষাগুলি। কিন্তু এই জন্ম কোনো আকস্মিক বা অলৌকিক ঘটনা ছিল না; এর পেছনে সক্রিয় ছিল রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, আঞ্চলিক রাজশক্তিগুলির উত্থান, ভক্তি ও সুফি আন্দোলনের মরমী জোয়ার, নতুন নগরজীবনের বিকাশ এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের নিজের মিষ্টি মাতৃভাষায় সাহিত্য সৃষ্টির এক আকুল ও উদাত্ত আকাঙ্ক্ষা।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রামশরণ শর্মা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে উল্লেখ করেছেন যে, গুপ্ত-পরবর্তী সেই সামন্ততান্ত্রিক যুগ থেকেই ভারতবর্ষে আঞ্চলিক রাষ্ট্র ও স্বতন্ত্র সংস্কৃতির বিকাশ দ্রুততর হতে শুরু করে। প্রতিটি জনপদ তখন নিজের নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় পরম যত্নে নির্মাণ করতে থাকে। আর এই আত্মআবিষ্কারের মিছিলে ভাষা কেবল প্রাত্যহিক যোগাযোগের শুকনো মাধ্যম ছিল না; ভাষাই হয়ে ওঠে প্রতিটি অঞ্চলের আত্মপরিচয় আর গৌরবের প্রধানতম ভিত্তিপ্রস্তর।
বিশিষ্ট ভাষা-ইতিহাসবিদ শেলডন পোলক ইতিহাসের এই মহিমান্বিত ক্ষণটিকে ‘The Vernacular Millennium’ বা ‘আঞ্চলিক ভাষার সহস্রাব্দ’ নামে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, আনুমানিক নবম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর সেই সোনালী প্রহরে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে আঞ্চলিক ভাষাগুলি রাজদরবারের সাহিত্য, শাসন-প্রশাসন এবং উচ্চ সাংস্কৃতিক প্রকাশের এক পরম ও সার্বভৌম মর্যাদা অর্জন করে। প্রাচীন সংস্কৃতের ধ্রুপদী গুরুত্ব অক্ষুণ্ণ থাকলেও, তার রাজকীয় ছায়া থেকে আলতো করে মুক্ত হয়ে বাংলা, কন্নড়, তামিল, মারাঠি, তেলুগু, ওড়িয়া আর গুজরাটির মতো শত শত ভাষা নিজেদের সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্য ও অনন্য রূপের নদীটিকে পূর্ণ যৌবনা করে তোলে।
বাংলা : নদীমাতৃক ভূখণ্ডের ভাষা
আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষার জন্ম যেন পূর্বভারতের এক দীর্ঘ, প্রবহমান ও মরমী ভাষাবিবর্তনের পলিমাটি-মাখা ফসল। চর্যাপদের সেই সুনীল ভোরের কুয়াশাভেজা আদিম সুর থেকে শুরু করে লৌকিক মঙ্গলকাব্য, শ্রীচৈতন্যের চঞ্চলা জোয়ারে ভেসে আসা বৈষ্ণব পদাবলি এবং মধ্যযুগীয় আখ্যান-কাব্যের আঁকাবাঁকা ধারার মধ্য দিয়ে – বাংলা ভাষা ধীরে ধীরে এক পূর্ণাঙ্গ, রূপবতী সাহিত্যভাষায় পরিণত হয়েছে।
ভাষাবিজ্ঞানী ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর বিশ্বখ্যাত ‘The Origin and Development of the Bengali Language’ (ODBL) গ্রন্থে এবং জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তাঁর কালজয়ী ‘বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত’-এ অকাট্যভাবে দেখিয়েছেন যে, বাংলার এই অনিন্দ্যসুন্দর অবয়বটি কোনো একটি নির্দিষ্ট উৎস থেকে হঠাৎ তৈরি হয়নি। বরং এর গঠনে মাগধী ও গৌড়ী প্রাকৃত, বিবর্তিত অপভ্রংশ, মেঠো মানুষের স্থানীয় কথ্যভাষা এবং এই জনপদের আদিমতম অ-আর্য (অস্ট্রো-এশীয় ও দ্রাবিড়) ভাষাগুলির এক পরম ও সম্মিলিত রসায়ন কাজ করেছে। বাংলা তাই কেবল একটি ভাষা নয়, তা এই নদীমাতৃক ভূখণ্ডের এক গভীর বহুসাংস্কৃতিক ও উদার ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল।”
অসমীয়া ও ওড়িয়া : পূর্ব ভারতের দুই স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর
আমাদের প্রিয় অসমীয়া ও ওড়িয়া ভাষার রূপালি নদী দুটিও পূর্বভারতীয় ভাষাগোষ্ঠীর সেই আদিম ও অভিন্ন ইতিহাসের পলিমাটি থেকেই উৎসারিত। তবে মধ্যযুগের এক সোনালী প্রহরে এসে উভয় ভাষাই নিজেদের অনন্য সাহিত্যিক রীতি, স্বতন্ত্র শব্দভাণ্ডার আর রূপতাত্ত্বিক ব্যাকরণের অলংকারে সাজিয়ে দুটি সম্পূর্ণ স্বাধীন কণ্ঠস্বর গড়ে তোলে।
সুদূর অসমে মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শংকরদেব-এর কালজয়ী সাহিত্যকৃতি, ‘অঙ্কীয়া নাট’ আর মরমী বৈষ্ণব ভক্তি-আন্দোলনের চঞ্চলা জোয়ার অসমীয়া ভাষাকে এক পরম ও রাজকীয় সাহিত্যিক মর্যাদা দান করে। অন্যদিকে, ওড়িশার পুণ্যভূমিতে আদি-কবি সারলা দাস-এর লোকায়ত ভাষায় রচিত ‘মহাভারত’ এবং পরবর্তীকালের সুগভীর ভক্তিকাব্যের অমৃতধারা ওড়িয়া সাহিত্যকে এক সুদৃঢ় ও অবিনশ্বর ভিত্তিপ্রস্তর এনে দেয়। এই দুই সুরের মেলবন্ধনেই পূর্ব ভারতের ভাষাতাত্ত্বিক ক্যানভাস এক অপরূপ পূর্ণতা লাভ করে।
হিন্দি : বহু উপভাষার মিলিত উত্তরাধিকার
আধুনিক হিন্দি কোনো একক উৎসের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে উঠে আসা ভাষা নয়; তা যেন উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ উপত্যকা জুড়ে বয়ে চলা ব্রজ, অবধি, খড়িবোলি আর রাজস্থানির মতো শত শত লোক-উপভাষার এক মহিমান্বিত ও মিলিত নদী।
মধ্যযুগের সেই সোনালী প্রহরে মহাকবি তুলসীদাস-এর মরমী ‘অবধি’ বা ‘অওধি’ ভাষায় রচিত রামচরিতমানস, ভক্ত কবীর-এর সহজ-সরল ‘সাধুক্কড়ি’ ভাষার দোঁহা এবং সন্ত সূরদাস-এর সুমিষ্ট ‘ব্রজভাষা’য় গাঁথা কৃষ্ণের পদাবলী – এই বিভিন্ন মেঠো লোকভাষাকে রাজকীয় সাহিত্যিক গৌরবের আসনে অধিষ্ঠিত করে। পরবর্তীকালে, ঊনবিংশ শতকের এক নতুন যুগসন্ধিক্ষণে এসে এই খড়িবোলি উপভাষাকেই শক্ত ভিত্তিপ্রস্তর করে গড়ে ওঠে আজকের আধুনিক মানক বা স্ট্যান্ডার্ড হিন্দি। এই বিপুল আদান-প্রদানের গল্পই প্রমাণ করে যে, হিন্দি হলো ভারতের এক গভীর ও বহুস্বরী মেলবন্ধনের প্রাচীন উত্তরাধিকার।
মারাঠি, গুজরাটি ও পাঞ্জাবি : আঞ্চলিক সংস্কৃতির ভাষা
দাক্ষিণাত্যের মালভূমি থেকে শুরু করে সুদূর পাঞ্জাবের পঞ্চনদের তীরে মধ্যযুগে যে মরমী ভাষা-বিপ্লবের জোয়ার এসেছিল – মারাঠি, গুজরাটি আর পাঞ্জাবি তারই এক একটি রূপালি তরঙ্গ।
মারাঠি বাণীর পুণ্যভূমে সন্ত জ্ঞানেশ্বর-এর রচিত কালজয়ী ‘জ্ঞানেশ্বরী’ এবং সন্ত তুকারাম-এর কণ্ঠের আকুল ‘অভঙ্গ’ গীতিমালা সমগ্র ভারতীয় ভক্তি-সাহিত্যের আঙিনায় এক একটি অমূল্য ও শাশ্বত মণি।
অন্যদিকে, গুজরাটের সমুদ্র-বাতাসে সুর মিলিয়ে আদি-কবি সন্ত নরসিংহ মেহতা সাধারণ মানুষের সহজ ও চেনা ভাষায় গড়ে তুলেছিলেন ভক্তিকাব্যের এক সম্পূর্ণ নতুন ও অনন্য অমৃতধারা। কৃষ্ণের প্রেমে রাঙা তাঁর সেই কাব্যের পবিত্র প্রভাব বহু শতাব্দী ধরে গুজরাটের সামাজিক, মানসিক ও ধর্মীয় জীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে আজ ঘরে ঘরে গুঞ্জরিত হয়।
আর উত্তর ভারতের আকাশে শিখ ধর্মের পরম গুরু, মহাত্মা গুরু নানক-এর ঐশ্বরিক বাণী এবং পরবর্তীকালে পরম পবিত্র ‘গুরু গ্রন্থ সাহিব’-এর মহাসমুদ্রের মতো শান্ত ভাষা পাঞ্জাবিকে এনে দিয়েছিল এক অনন্য আধ্যাত্মিক গভীরতা এবং অবিনশ্বর সাহিত্যিক ভিত্তিপ্রস্তর।
কাশ্মীরি : হিমালয়ের ভাষা, দর্শন ও কাব্য
বরফ-ধোয়া তুঙ্গ হিমালয়ের উপত্যকা চিরে যে সুরের ধারা বয়ে চলেছে, ভারতীয় ভাষাতত্ত্বের মানচিত্রে তার স্থান সত্যিই এক অনন্য উচ্চতায়। কাশ্মীরি ভাষা ইন্দো-আর্য ভাষাপরিবারের ছায়াতলে লালিত হলেও, তার ধ্বনির মায়াবী বিন্যাস আর রূপতাত্ত্বিক ব্যাকরণের বাঁধনে রয়েছে এক অপার্থিব ও পাহাড়ী স্বাতন্ত্র্য।
এই ভাষার মরমী ক্যানভাসে পরম জ্যোতির্ময়ী শৈব যোগিনী সন্ত লাল দেদ-এর ওষ্ঠ থেকে ঝরে পড়া আধ্যাত্মিক সুধায় রাঙা ‘বাখ’ (Vakh) কাব্য এবং তাঁরই ভাবশিষ্য, পরম সুফি সাধক নূন্দ ঋষি (শেখ নূরুদ্দিন ওয়ালী)-র কণ্ঠের সেই পবিত্র বাণী – কাশ্মীরি সাহিত্যের আকাশে কেবল দুটি উজ্জ্বল স্তম্ভ নয়; তা হলো শৈব দর্শন আর সুফি মরমীবাদের এক অনুপম মহামিলনের কালজয়ী মহাকাব্য।
ভাষা ও ভক্তি আন্দোলন
ভারতের এই আধুনিক ও রূপবতী ভাষাগুলির ডানা মেলার ইতিহাসে ভক্তি-আন্দোলনের অবদান সত্যিই এক অনস্বীকার্য মহাকাব্য। পরম ধর্মকে কঠিন পুঁথির পাতা থেকে মুক্ত করে মানুষের অতি চেনা, আপন মাতৃভাষার দুয়ারে পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়েই এই আন্দোলন ব্রাত্য ভাষাকে এনে দিয়েছিল এক অভূতপূর্ব সামাজিক মর্যাদা। সুদূর তামিলনাড়ুর আলভার ও নায়নমার সাধকদের কণ্ঠের আকুল সুর, কন্নড়ের মাটিতে বাসবন্নার মরমী বিদ্রোহের বাণী, মহারাষ্ট্রের আকাশে জ্ঞানেশ্বর ও তুকারামের চঞ্চলা ‘অভঙ্গ’ গীতিমালা, বাংলার নদীমাতৃক বুকে যুগাবতার শ্রীচৈতন্যদেব-এর প্রেম-প্লাবনে ধুয়ে যাওয়া বৈষ্ণব পদাবলির কলতান, আর উত্তর ভারতের মেঠো পথে কবীর ও তুলসীদাসের সহজ দোঁহা – সবাই যেন একই পরম ঐতিহাসিক মেলবন্ধনের একেকটি সুরম্য তরঙ্গ।
ইতিহাসবিদ ও সাহিত্য-তীর্থের গবেষকদের মতে, এটিই ছিল সভ্যতার ইতিহাসের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ – যখন ভাষা কেবল রাজসভার শুষ্ক দলিল বা পণ্ডিতের অহংকার রইল না; বরং তা প্রথমবারের মতো সুবিশাল ও বৃহৎ আপামর জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি আর গভীর ভালোবাসার প্রধানতম রাজকীয় বাহন হয়ে উঠল।
সুফি সাধক ও ভাষার মানবিকতা
ভারতীয় বাণীর রূপালি মানচিত্রে ভক্তি-জোয়ারের সমান্তরালে সুফি সন্তদের মরমী অবদানও এক অতলান্ত ও গভীর ইতিহাস। তাঁরা রাজদরবারের আভিজাত্যে ঘেরা ফারসি ও আরবির রাজকীয় শব্দের সাথে মাটির কাছাকাছি থাকা মেঠো লোকভাষার এমন এক জাদুকরী সংলাপ ঘটিয়েছিলেন – যার বুক চিরে জন্ম নিয়েছিল সম্পূর্ণ নতুন ও উদার এক সাহিত্যধারা। উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ উপত্যকা, বাংলার নদীমাতৃক কূল, পাঞ্জাবের পঞ্চনদের তীর কিংবা দাক্ষিণাত্যের রুক্ষ মালভূমি – প্রতিটি জনপদেই সুফি সাহিত্য সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক কথ্যভাষাকে এনে দিয়েছিল পরম আধ্যাত্মিক অভিব্যক্তির এক মহিমান্বিত ও রাজকীয় মর্যাদা।
তাঁদের এই মরমী সুরের আদান-প্রদানেই ভারতীয় ভাষাগুলির শব্দভাণ্ডার ভরে উঠেছিল নতুন ঐশ্বর্যের হিরে-মুক্তোয়, আর ধর্মের কঠিন দেওয়াল টপকে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির ভেতর উন্মুক্ত হয়েছিল এক পরম ও চিরন্তন মানবিক সংলাপের সুরম্য রাজপথ।
ভাষা থেকে সাহিত্য, সাহিত্য থেকে পরিচয়
মধ্যযুগের সেই রূপালি প্রান্তরে এসে ভারতবর্ষে ভাষা আর কেবল প্রাত্যহিক জীবনের শুকনো মুখের উচ্চারণ রইল না; তা হয়ে উঠল কালজয়ী সাহিত্য, মরমী সংগীত, উদার ধর্ম, রাজকীয় প্রশাসন এবং প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব আত্মপরিচয়ের এক সুদৃঢ় ভিত্তিপ্রস্তর। বাংলা, তামিল, মারাঠি, কন্নড়, গুজরাটি, কাশ্মীরি, অসমীয়া, ওড়িয়া, পাঞ্জাবি কিংবা হিন্দি – প্রতিটি ভাষাই যেমন আপন রূপের কাননে নিজস্ব অমূল্য সাহিত্য সৃষ্টি করল, ঠিক তেমনই সমান্তরালভাবে তারা কানায় কানায় সমৃদ্ধ করে তুলল ভারতীয় সংস্কৃতির এক সুবিশাল ও প্রবহমান মহাসমুদ্রকে।
এই কারণেই, ইতিহাসের পাতায় আধুনিক ভারতীয় ভাষাগুলির এই অনন্য জন্মকে কোনো বিচ্ছিন্ন বা সংকীর্ণ আঞ্চলিক ঘটনা বলা চলে না। এটি তো আসলে ছিল ভারতীয় সভ্যতার বুকে জেগে ওঠা এক সম্পূর্ণ নতুন ও বৈপ্লবিক সাংস্কৃতিক নবজাগরণ – যেখানে মেঠো মানুষের অতি চেনা মিষ্টি মাতৃভাষাটিই হয়ে উঠেছিল পরম জ্ঞান, চিরন্তন সাহিত্য এবং আপন আত্মপরিচয়ের প্রধানতম সার্বভৌম মাধ্যম।
আর এই মহাসংগীতের রেশ ধরেই, আমাদের পরবর্তী পর্বের যাত্রা শুরু হবে সেই রহস্যের খোঁজে – যেখানে অন্তহীন বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও ভারতবর্ষকে ভাষাবিজ্ঞানীরা একবাক্যে একটি ‘Linguistic Area’ বা ‘ভাষাগত সংযোগক্ষেত্র’ বলে অভিহিত করেন। ভাষাতীর্থের মহান গবেষক এম. বি. ইমেনিউ-এর সেই যুগান্তকারী ধারণা এবং পরবর্তী গবেষণার আলোয় ভারতীয় ভাষার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা একতার অবিনশ্বর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাই হবে আমাদের আগামী সফরের মূল আকর্ষক উপাখ্যান।”
ভারত : একটি ভাষাগত সংযোগক্ষেত্র (Linguistic Area) : বৈচিত্র্যের অন্তরালে ঐক্যের বিজ্ঞান
“ভারতবর্ষের ভাষা-ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও মনোহর বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এই যে – এখানে শত শত ভাষা, বহু ভাষাপরিবার এবং অগণিত উপভাষা হাজার হাজার বছর ধরে পাশাপাশি বিকশিত হয়েছে, অথচ তারা কখনো একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো নির্জন দ্বীপ হয়ে থাকেনি। বরং দীর্ঘ সহাবস্থানের চাদর গায়ে জড়িয়ে, সামাজিক নিবিড় যোগাযোগ, মেঠো বাণিজ্য, মরমী ধর্মীয় আন্দোলন, বৈবাহিক বন্ধন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন আর পরম সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মধ্য দিয়ে তারা একে অপরকে ক্রমাগত প্রভাবিত করেছে, ছুঁয়ে গেছে। এই জটিল ও জাদুকরী বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করার জন্যই আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান আজ এক বিশেষ ও অনন্য ধারণা ব্যবহার করে ‘Linguistic Area’ বা ‘Seprachbund’ (ভাষাগত সংযোগক্ষেত্র)।
এই ধারণার পবিত্র আলোকবর্তিকাকে আন্তর্জাতিক ভাষাতত্ত্বের দরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বিশ্বখ্যাত ভাষাবিদ এম. বি. ইমেনিউ । ১৯৫৬ সালের এক মাহেন্দ্রক্ষণে প্রকাশিত তাঁর সেই ঐতিহাসিক গবেষণাপত্র ‘India as a Linguistic Area’ ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অবিনশ্বর মাইলফলক । ইমেনিউ-এর সেই বক্তব্য ছিল সত্যিই এক যুগান্তকারী ইশতেহার – ভারতের এই বহু ভাষা ভিন্ন ভিন্ন ভাষাপরিবারভুক্ত হলেও, হাজার হাজার বছরের নিবিড় সহাবস্থানের ফলে তারা একে অপরের শরীর থেকে এমন বহু কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে, যা কেবল কোনো একলা বংশগত বা রক্তের উৎস দিয়ে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। অর্থাৎ, ভাষাগুলির জন্মগত আত্মীয়তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনই মহিমান্বিত ও শক্তিশালী হলো তাদের এই দীর্ঘ ও পরম সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের ইতিহাস।”
ভাষার আত্মীয়তা ও ভাষার প্রতিবেশী-সম্পর্ক
ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের চিরাচরিত দৃষ্টি সাধারণত খোঁজে ভাষার আদিম উৎস আর তার রক্ত-সম্পর্কের শেকড়। সেই সূত্রের টানেই যেমন বাংলা, হিন্দি, মারাঠি ও অসমীয়া একাকার হয়ে যায় ইন্দো-আর্য ভাষাপরিবারের সুবিশাল ক্যানভাসে; আর তামিল, তেলুগু ও কন্নড় হাত ধরাধরি করে দাঁড়ায় দ্রাবিড় ভাষাপরিবারের প্রাচীন আঙিনায়। কিন্তু দূরদর্শী ভাষাতপস্বী এম. বি. ইমেনিউ এক বৈপ্লবিক আলো জ্বেলে দেখালেন – ভাষাকে চেনার জন্য এই বংশগত শ্রেণিবিন্যাসটুকুই শেষ কথা নয়। কারণ, মেঘে-মেঘে বেলা হওয়ার মতো দুটি প্রতিবেশী ভাষা যদি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এক উঠোনে পাশাপাশি ব্যবহৃত হতে থাকে, তবে তারা পরস্পরের শরীর থেকে ধ্বনির মিষ্টি তান, শব্দের অলংকার, ব্যাকরণিক নিটোল রীতি, এমনকি মনের ভাব প্রকাশের গোপন পদ্ধতিও পরম যত্নে কুড়িয়ে নিজের করে নেয়।
অতএব, ভাষার ইতিহাস কেবল কোনো শুকনো বংশপরিচয় বা জিনের ইতিহাস নয়; তা হলো পরস্পরের নিশ্বাসের কাছাকাছি থাকা এক পরম ও মরমী প্রতিবেশী সমাজেরও জীবন্ত ইতিহাস।
মূর্ধন্য ধ্বনি : সংলাপের একটি ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ
ভারতীয় ভাষাগুলির উচ্চারণ-শৈলীতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও জাদুকরী বৈশিষ্ট্য হলো মূর্ধন্য ধ্বনি—জিভ উল্টে তালু ছুঁয়ে উচ্চারিত ‘ট, ঠ, ড, ঢ, ণ’ কিংবা ‘ড়, ঢ়’-এর সেই চঞ্চলা ও গম্ভীর নাদ।
প্রখ্যাত ফরাসি ভাষাতপস্বী জুল ব্লখ এবং পরবর্তীকালে তাঁরই ভাবনার দিগন্ত প্রসারিত করে মার্কিন ভাষাবিদ এম. বি. ইমেনিউ সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সহকারে দেখিয়েছেন যে – এই অনন্য ধ্বনিগুলি ভারতের প্রায় সব কটি ভাষাপরিবারে সমভাবে বিস্তৃত হলেও, ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাপরিবারের অন্য কোনো বৈদেশিক ভাষায় (যেমন ইংরেজি, জার্মান বা ফারসি) এদের অস্তিত্ব এভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না। বহু বছরের নিষ্ঠাবান গবেষকদের মতে, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; হাজার হাজার বছর ধরে এদেশের বুকে ইন্দো-আর্য ও আদিম দ্রাবিড় ভাষাভাষী মানুষের যে নিবিড় প্রাত্যহিক সংস্পর্শ ও দ্বিভাষিকতার মেলবন্ধন ঘটেছিল – তারই এক অবিনশ্বর ঐতিহাসিক পলিমাটি হলো এই মূর্ধন্য ধ্বনি । যদিও এর আদিমতম ক্ষণটি নিয়ে ভাষাতীর্থের গবেষকদের মধ্যে আজও তত্ত্বের লড়াই চলছে, তবু দুটি ভিন্ন ধারার ভাষা যে দীর্ঘ সহাবস্থানের সংলাপে একে অপরকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে সেই ঐতিহাসিক সত্যের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে আজ এই মূর্ধন্য ধ্বনি বিশ্বজুড়ে সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত।
শব্দের যাত্রা : ভাষার মধ্যে ভাষার ভ্রমণ
ভারতবর্ষের সুনীল আকাশে ডানা মেলা কোনো ভাষাই সম্পূর্ণ একা বা স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো নির্জন দ্বীপ নয়।
ধ্রুপদী সংস্কৃত থেকে যেমন অসংখ্য শব্দ পরম মমতায় তামিল ভাষার ধমনীতে প্রবেশ করেছে, তেমনই সমান্তরালভাবে প্রাচীন দ্রাবিড় আর অস্ট্রো-এশীয় উৎস থেকেও বহু শব্দ উত্তর ভারতের নব্য আর্য ভাষাগুলির অন্দরে অনায়াসে মিশে গেছে। পরবর্তীকালে ইতিহাসের নানা চড়াই-উতরাইয়ে ফারসি, আরবি, তুর্কি, পর্তুগিজ আর ইংরেজির মতো সুদূর বিদেশের বাণীরূপের নদীগুলিও ভারতীয় ভাষাগুলির শব্দ-সংসারকে প্রতিনিয়ত উপহার দিয়েছে নতুন নতুন শব্দের হিরে-মুক্তো।
আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষার রূপের নদীর দিকে তাকালেই এই পরম সত্যটি ধরা পড়ে – সংস্কৃত ও প্রাকৃতের আদিম পলিমাটির সাথে আরবি, ফারসি, ওলন্দাজ, পর্তুগিজ, ইংরেজি, এমনকি দক্ষিণের দ্রাবিড় উৎসের অজস্র শব্দও এর শব্দভাণ্ডারের অন্দরমহলে পরম আদরে রাজকীয় স্থান পেয়েছে। ভাষার এই উদার ধারগ্রহণ কিংবা শব্দের এই ঘর-সংসার পাতা কোনো দৈন্য বা দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং তা হলো একটি সতত প্রবহমান, জীবন্ত ও প্রাণবন্ত ভাষার পরম স্বাভাবিক ও সৃষ্টিশীল বৈশিষ্ট্য।
ভাষাতীর্থের মহান রূপকার ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাই বারবার উল্লেখ করে গেছেন যে—বাংলা ভাষার আসল ব্রহ্মশক্তি ও অনন্য রূপের রহস্য লুকিয়ে আছে তার এই অসামান্য ও উদার গ্রহণক্ষমতার গভীরে।
ব্যাকরণও ধার নেয়
ভাষা কেবল শব্দের অলংকারই অদলবদল করে না; সে কখনো কখনো তার ভেতরের নিগূঢ় ব্যাকরণিক কঙ্কাল আর সুক্ষ্ম রীতিগুলিও পরস্পরের সাথে পরম মমতায় ভাগ করে নেয়।
প্রখ্যাত মার্কিন ভাষাতাত্ত্বিক কলিন মাসিকা এবং ভারতের শীর্ষস্থানীয় ভাষা-বিজ্ঞানী অন্বিতা অব্বী-র গভীর তুলনামূলক গবেষণায় এক অনন্য সত্য ধরা পড়ে । তাঁরা দেখিয়েছেন যে – ভারতের বিভিন্ন ভাষায় বাক্যগঠনের বিশেষ বিন্যাস, অসমাপিকা ক্রিয়াপদের জাদুকরী ব্যবহার, অনুসর্গের চলন, বাক্যে জোরপ্রকাশের নিজস্ব কৌশল এবং সম্মানসূচক সম্বোধনের এই যে আশ্চর্য ও মনোহর মিল – তা কেবল কোনো আদিম অভিন্ন উৎসের শুকনো ফল নয় বরং তা হলো হাজার হাজার বছরের নিবিড় সামাজিক যোগাযোগ, প্রাত্যহিক সুখ-দুঃখের মেলবন্ধন আর ওষ্ঠে ওষ্ঠে ছুঁয়ে থাকা এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক আদান-প্রদানের জীবন্ত ফসল।
এখানেই ভারতীয় ভাষাবিশ্বের এক পরম ও শাশ্বত অনন্যতা। পৃথিবীর বহু প্রান্তেই ভিন্ন ভিন্ন ভাষাপরিবার যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি অবস্থান করেছে, কিন্তু ভারতবর্ষের মতো এত গভীরভাবে, এত সৃষ্টিশীল মায়ায় কেউ কখনো পরস্পরকে নিজের রঙে রাঙিয়ে তুলতে পারেনি।
ভাষা ও সংস্কৃতির সহাবস্থান
ভাষা কখনো কোনো নির্জন পথে একা একা ভ্রমণ করে না; সে যখনই পা বাড়ায়, তার সাথে সাথে ছায়ার মতো ভ্রমণ করে হাজার বছরের প্রাচীন সংস্কৃতি।
সুপ্রাচীন তীর্থযাত্রা, কোলাহলমুখর বাণিজ্যপথ, প্রজ্ঞার বিশ্ববিদ্যালয়, নিভৃত মঠ-মন্দির, অহিংস বৌদ্ধ বিহার, মরমী সুফি দরগাহ, জাঁকজমকপূর্ণ রাজসভা আর মাটির লোকউৎসব – এসবই ছিল আসলে ভিন্ন ভিন্ন ভাষার পরম মহামিলনক্ষেত্র। নালন্দা, তক্ষশিলা, কাঞ্চিপুরম, উজ্জয়িনী কিংবা আমাদের নদীমাতৃক নবদ্বীপ – এসব কেবল শুষ্ক পুঁথিগত শিক্ষার কেন্দ্র ছিল না; এগুলি ছিল শত শত আঞ্চলিক উপভাষা আর ধ্রুপদী বাণীর এক মনোহর ও উন্মুক্ত সংলাপের ক্ষেত্র।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার এবং সমাজ-ইতিহাসের রূপকার রামশরণ শর্মা ভারতীয় ইতিহাসের অতলান্ত আলোচনায় অবিনশ্বরভাবে দেখিয়েছেন যে এই অবিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক বিনিময়ই হলো ভারতীয় সমাজের সবচেয়ে প্রধান ও চিরন্তন বৈশিষ্ট্য। আর আমাদের মুখের এই ভাষাই হলো সেই জাদুকরী বিনিময়ের সবচেয়ে গতিশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বাহন।
ভারত : বহুভাষিকতার এক জীবন্ত পরীক্ষাগার
প্রখ্যাত ভাষা-অধীশ্বর অধ্যাপক গণেশ এন. দেবী-র দূরদর্শী নেতৃত্বে পরিচালিত ‘পিপলস লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’ (PLSI) এক পরম বাস্তবকে বিশ্বমঞ্চে উন্মোচন করেছে – ভারত আজও এই পৃথিবীর বুকে বহুভাষিকতার এক সুবৃহৎ ও জীবন্ত মহাপ্রয়োগশালা । এখানে সময়ের ঝড়ে বহু আদিম ভাষা আজ বিপন্নতার প্রান্তে দাঁড়িয়ে, বহু ভাষা দ্রুত বদলে নিচ্ছে তার চেনা অবয়ব, আবার সমান্তরালভাবে নতুন সামাজিক বাস্তবতার আলোয় জন্ম নিচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন সব কথ্য ভাষারীতি ।
এই মহাজাগতিক সমীক্ষা আমাদের বারেবারে এক মরমী সত্য মনে করিয়ে দেয়—কোনো একটি ভাষা বা উপভাষাকে টিকিয়ে রাখা মানে কেবল কিছু শুষ্ক শব্দের অভিধান বা ব্যাকরণ রচনা করা নয় [১.৪.৬]। তা হলো মূলত একটি আদিম জনগোষ্ঠীর শত শত বছরের প্রাচীন অলিখিত স্মৃতি, মাটির গান, লোকগাথা, তাদের চিরায়ত কৃষিজ্ঞান, অরণ্য-প্রকৃতির গভীর পরিবেশ-অভিজ্ঞতা এবং এক অনন্য জীবনদর্শনকে মহাকালের বুক থেকে পরম মমতায় চিরকালের জন্য সংরক্ষণ করা।
ঐক্যের প্রকৃত অর্থ
ভারতবর্ষের এই সুবিশাল ভাষাগত ঐক্যের আকাশ কোনো একক ভাষার একচ্ছত্র আধিপত্য বা গায়ের জোরের ফল নয়; তা তো আসলে শত শত ভাষার পরম ও মনোহর সহাবস্থানের এক অনন্য ফসল। এই কারণেই, এই মহিমান্বিত দেশকে পূর্ণাঙ্গভাবে অনুধাবন করতে হলে ‘এক ভাষা, এক সংস্কৃতি’-র মতো কোনো সংকীর্ণ ও একরৈখিক সরল সূত্র মোটেও যথেষ্ট নয়। বরং ভারতীয় অভিজ্ঞতা আমাদের এই মরমী শিক্ষা দেয় একই উঠোনে হাজার হাজার বছর ধরে বহু ভাষা পরম শান্তিতে একসঙ্গে বেঁচে থাকতে পারে, পরস্পরের বুক থেকে রসদ কুড়িয়ে একে অপরকে কানায় কানায় সমৃদ্ধ করতে পারে, তবুও নিজেদের আদিম স্বাতন্ত্র্য ও রূপের নদীটিকে চিরকাল অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে।
সম্ভবত এই কারণেই, ভারতীয় ভাষার এই সুবিশাল ইতিহাস আমাদের এক সুগভীর মানবিক প্রজ্ঞা দান করে – আসল ঐক্য মানে কখনো জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ‘একরূপতা’ বা একঘেয়েমি নয়; ঐক্য মানে প্রতিটি ভিন্নতাকে পরম আদরে বুকে ধারণ করার এক অমোঘ ক্ষমতা। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে আমরা পরম বিস্ময়ে বলি ‘Linguistic Area’ বা ভাষাগত সংযোগক্ষেত্র, ভারতীয় সংস্কৃতির শাশ্বত ও মরমী ভাষায় তাকেই বলা চলে – বহুস্বরের হৃদস্পন্দন বুকে নিয়ে বেঁচে থাকা এক কালজয়ী ও অবিনশ্বর সহাবস্থানের সভ্যতা।
ডিজিটাল যুগে ভারতীয় ভাষার ভবিষ্যৎ : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভাষা-প্রযুক্তি ও বিপন্ন ভাষার চ্যালেঞ্জ
একবিংশ শতাব্দীর এই প্রযুক্তির আলো-আঁধারিতে ভারতীয় ভাষার সুদীর্ঘ ইতিহাস আজ এক সম্পূর্ণ নতুন ও অভাবনীয় মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। একসময় বাণীরূপের নদীগুলি বয়ে চলত মানুষের মৌখিক ঐতিহ্যের সহজ তান, জরাজীর্ণ পুঁথির পাতা, গিরিগাত্রের শিলালিপি, মুদ্রণযন্ত্রের সীসার অক্ষর কিংবা বিদ্যায়তনের পাঠশালার ওপর ভর করে। আর আজ, ভাষার আগামী ভবিষ্যৎ অলক্ষ্যে নির্ধারিত হচ্ছে ডিজিটাল প্রযুক্তি, ইন্টারনেটের অদৃশ্য জাল, স্মার্টফোনের কাঁচের পর্দা, সামাজিক মাধ্যমের কোলাহল আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সেই জাদুকরী অ্যালগরিদমের সাথে তার নিবিড় রসায়নের মাধ্যমে। এই মহাজাগতিক রূপান্তর কেবল কোনো যান্ত্রিক বা প্রযুক্তিগত বদল নয়; তা তো আসলে ভারতীয় সংস্কৃতির আত্মপরিচয়কে টিকিয়ে রাখার এক পরম ও জরুরি অস্তিত্বের প্রশ্ন।
ইতিহাসের ধূসর পাতার দিকে তাকালে স্পষ্ট ধরা পড়ে – প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লবই ভাষাকে দিয়েছে এক নতুন সম্ভাবনা ও ডানা মেলার আকাশ। সুপ্রাচীন ব্রাহ্মী লিপি একদা রাষ্ট্র-প্রশাসনকে এনে দিয়েছিল সুসংহত রূপ, জীর্ণ তালপাতার পুঁথি পরম মমতায় বুকে আগলে রেখেছিল সহস্র বছরের প্রজ্ঞা, উনিশ শতকের মুদ্রণযন্ত্র ঘরে ঘরে জন্ম দিয়েছিল আধুনিক সাহিত্যের জোয়ার; আর আজকের ডিজিটাল প্রযুক্তি ভাষাকে ভৌগোলিক সীমানার শৃঙ্খল ভেঙে ভাসিয়ে দিচ্ছে বিশ্বায়নের মহাসমুদ্রে। কিন্তু এই নতুন যুগের সোনালী আলোর সমান্তরালে ঘনিয়ে এসেছে এক নতুন অন্ধকার ও গভীর সংকটও—যেখানে আমাদের শত শত ক্ষুদ্র, আদিম ও বিপন্ন ভাষাগুলির অস্তিত্ব আজ এক মরণপণ লড়াইয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
ডিজিটাল বিপ্লব : ভাষার নতুন ভূগোল
আজকের এই প্রযুক্তির মায়াবী আলোয় ভারতের শতকোটি মানুষের ওষ্ঠ আর আঙুলের ডগা যেন একাকার হয়ে গেছে মোবাইল ফোনের কাঁচের পর্দায় – যেখানে তাঁরা প্রাত্যহিক জীবনের আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন আর ভালোবাসার কথা অনায়াসে লিখছেন, পড়ছেন এবং পরম মমতায় যোগাযোগ করছেন নিজের মিষ্টি মাতৃভাষায়। সুদূর সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তিগত প্রকৌশলে ইউনিকোড (Unicode) হলো আজ সেই অবিনশ্বর জাদুকরী রাজদণ্ড, যা ভারতীয় সভ্যতার ভিন্ন ভিন্ন লিপিকে ডিজিটাল মহাবিশ্বের বুকে এনে দিয়েছে এক অখণ্ড ও অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত মহাসমন্বয়।
বাংলা, দেবনাগরী, তামিল, গুরুমুখী, গুজরাটি, কন্নড়, মালয়ালম, ওড়িয়া, তেলুগু কিংবা উত্তর-পূর্বের সেই প্রাচীন মেইতেই মায়েক – সহস্র বছরের সমস্ত ঐতিহ্যবাহী প্রধান প্রধান ভারতীয় লিপিই আজ ডিজিটাল শূন্যতার বুক চিরে নিজেদের রাজকীয় অস্তিত্বের ডানা মেলেছে পরম গৌরবে । ভাষাতীর্থের দূরদর্শী পণ্ডিত ও গবেষকদের মতে হাল আমলের এই মহাজাগতিক রূপান্তরটি ভারতীয় ভাষা-সংস্কৃতির সুদীর্ঘ ইতিহাসে, উনিশ শতকের সেই প্রাচীন মুদ্রণযন্ত্রের সীসার অক্ষর আবিষ্কারের পর, মানব সভ্যতার বুকে ঘটে যাওয়া দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং সবচেয়ে বৈপ্লবিক যোগাযোগ-মহাবিপ্লব ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা : নতুন সম্ভাবনা, নতুন প্রশ্ন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ মানুষের মুখের আদিম বাণীরূপ নিয়ে খেলার জাদুকরী পদ্ধতিটিকেই সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। যান্ত্রিক অনুবাদ থেকে শুরু করে চোখের পলকে কণ্ঠস্বর চিনে নেওয়া, বাতাসের ধ্বনিকে কাগজের অক্ষরে রূপ দেওয়া, নিথর অক্ষরের বুকে মানুষের ওষ্ঠের জীবন্ত সুরের কম্পন জাগানো কিংবা ডিজিটাল অভিধান আর ভাষা-শিক্ষার সুবিশাল আঙিনায় – এআই আজ এক চঞ্চলা স্রোতের মতো দ্রুত বেগে অগ্রসর হচ্ছে।
কিন্তু এই রূপালি আলোর সমান্তরালে লুকিয়ে আছে এক পরম ও মৌলিক প্রশ্ন। সিলিকন চিপের এই কৃত্রিম মগজে কোনো একটি ভাষাকে যত বেশি প্রাণবন্ত ও উন্নত করতে হবে, সেই ভাষার ঠিক তত বেশি বিপুল পরিমাণ নিখুঁত ও মানসম্পন্ন ডিজিটাল তথ্য বা ‘কর্পাস’ (Corpus)-এর ক্ষুধার্ত আহার জুগিয়ে যেতে হবে। ইংরেজি বা চীনা ভাষার মতো বৈশ্বিক রাজকন্যারা যেখানে এই ডিজিটাল সম্পদের প্রাচুর্যে রাজত্ব করছে; ভারতের শত শত নদীমাতৃক লোকভাষা ও উপভাষাগুলি কিন্তু এই অলক্ষ্য ডিজিটাল বৈষম্যের দৌড়ে আজও অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।
ফলে, এই নতুন যুগের ভাষা-প্রযুক্তির বিজয় রথ গড়ে তোলা কেবল কোনো যান্ত্রিক কোডারের বা প্রযুক্তিবিদের একলার কাজ হতে পারে না; তা তো আসলে ভাষাবিদ, মরমী সাহিত্যিক, বিদগ্ধ শিক্ষক, দূরদর্শী প্রকাশক আর সমাজবিজ্ঞানীদের এক যৌথ মেধা ও ভালোবাসার মহাসমন্বয়।”
বিপন্ন ভাষা : হারিয়ে যাচ্ছে এক একটি পৃথিবী
ভারতবর্ষ কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়, তা হলো এই পৃথিবীর অন্যতম এক সুরময় ভাষাবৈচিত্র্যের অমর কানন। কিন্তু বিশ্বায়নের রুক্ষ ঝড়ে সেই কাননের অন্তহীন বৈচিত্র্য আজ এক মহাসংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
দূরদর্শী ভাষা-তাত্ত্বিক অধ্যাপক গণেশ এন. দেবী-র অনন্য নেতৃত্বে পরিচালিত ‘পিপলস লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’ (PLSI) এক নির্মম বাস্তবকে আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। এই মহা-সমীক্ষা দেখিয়েছে যে, গত কয়েক দশকে ভারতের বুকে থাকা শত শত ছোট ছোট লোকভাষা তাদের শেষ কথক বা ব্যবহারকারীদের হারিয়ে ফেলেছে, এবং বেশ কিছু চঞ্চলা ভাষা ইতিমধ্যেই মহাকালের অতল গর্ভে চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে। বিশেষত আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের আদিম অরণ্য, মধ্যভারতের প্রাচীন আদিবাসী জনপদ আর উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘে ঢাকা পাহাড়ি উপত্যকার বহু ক্ষুদ্র সুর আজ গুরুতর বিলুপ্তির ঝুঁকিতে স্পন্দিত হচ্ছে।
এই পরম বেদনার প্রসঙ্গে বিশ্ববিখ্যাত ভাষাতপস্বী ডেভিড ক্রিস্টাল তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘Language Death’ (ভাষার মৃত্যু)-এ এক অদ্ভুত ও সুগভীর পর্যবেক্ষণ রেখে গেছেন । তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন – যখন একটি আদিম ভাষা পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়, তখন কেবল অভিধানের কিছু শুষ্ক শব্দ বা অক্ষরেরই মৃত্যু হয় না বরং তার সাথে সাথে নিভে যায় এই অপার সৃষ্টি ও মহাবিশ্বকে দেখার এক সম্পূর্ণ অনন্য, শাশ্বত ও স্বতন্ত্র মানব-দৃষ্টিভঙ্গি । একটি ভাষার সলতেটি নিভে যাওয়ার সাথে সাথেই চিরতরে মুছে যায় একটি আদিম জনগোষ্ঠীর শত শত বছরের প্রাচীন অলিখিত লোককথা, মরমী লোকসংগীত, প্রকৃতির বুক থেকে চেনা সুপ্রাচীন ভেষজ চিকিৎসাজ্ঞান, কৃষির নিবিড় অভিজ্ঞতা, আদিম বনজীবনের মায়াবী স্মৃতি এবং সর্বোপরি একটি রক্ত-মাংসের প্রাচীন জনগোষ্ঠীর অনন্য সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়।
মাতৃভাষা ও শিক্ষার প্রশ্ন
আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানের আলো আজ আমাদের বারেবারে এক শাশ্বত সত্য মনে করিয়ে দেয় – একটি শিশুর প্রথম পাঠ ও প্রাথমিক শিক্ষার আঙিনাটি যদি তার আপন মিষ্টি মাতৃভাষার পলিমাটিতে নির্মিত হয়, তবে তার জ্ঞানার্জনের নদীটি হয়ে ওঠে অনেক বেশি স্বাভাবিক, সাবলীল এবং কার্যকর।
পৃথিবীর বিদগ্ধ শিক্ষাবিদ ও দূরদর্শী ভাষানীতির গবেষকেরা একবাক্যে বিশ্বাস করেন যে, মাতৃভাষা কেবল কোনো বাইরের পোশাক নয়; তা তো আসলে শিশুর ভেতরের আদিম চিন্তাশক্তি, অনন্য সৃজনশীলতা আর আত্মপরিচয়ের গভীরে প্রোথিত এক অবিনশ্বর আত্মিক শিকড়। জীবনের আগামী চড়াই-উতরাইয়ে দাঁড়িয়ে অন্যান্য বহু বৈশ্বিক ভাষা শেখা অবশ্যই পরম প্রয়োজন, কিন্তু তার আসল মজবুত ভিত্তিটি যদি শৈশবে নিজের মায়ের মুখের ভাষার ইঁট-পাথরে গড়ে ওঠে, তবেই মানুষের অন্তরের শিক্ষার গুণগত মানও পৌঁছে যায় এক মহিমান্বিত উচ্চতায়।
ভারতবর্ষের এই চিরন্তন ও মনোহর বহুভাষিক বাস্তবতার মহাসমুদ্রে তাই আপন মাতৃভাষা, চারপাশের চেনা আঞ্চলিক ভাষা, দেশের কার্যকর ভাষা আর সুদূর বিদেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষা – এই চার সুরের ধারার মধ্যে এক পরম ও সুষম মেলবন্ধন গড়ে তোলাই আজ আমাদের অনাগত ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় এবং প্রধানতম নান্দনিক চ্যালেঞ্জ।
অনুবাদ : ভারতীয় ঐক্যের অদৃশ্য সেতু
ভারতবর্ষের এই সুবিশাল ভাষাগত একতার অন্তরালে যে অদৃশ্য ও জাদুকরী শক্তিটি প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে, তা হলো পরম মমতাময়ী ‘অনুবাদ’।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ হয়তো তামিল বা কন্নড় ভাষার গূঢ় ব্যাকরণ জানতেন না, তবু অনুবাদের রূপালি সেতু পার হয়ে সুদূর দক্ষিণ ভারত তাঁকে আপন হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান দিয়েছে। আবার প্রেমচন্দ, শরৎচন্দ্র, অমৃতা প্রীতম, মহশ্বেতা দেবী কিংবা বৈকম মুহম্মদ বশিরের মতো ক্ষণজন্মা কথাকারদের লেখনী – এক অঞ্চলের সীমানা ভেঙে সমগ্র ভারতজুড়ে কোটি কোটি পাঠকের চোখের আলো হয়ে উঠেছে মূলত এই অনুবাদেরই মরমী পরশে।
ডিজিটাল যুগের এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) হয়তো চোখের পলকে যান্ত্রিক অনুবাদের গতি ও শব্দের প্রাচুর্য বাড়িয়ে দিতে পারে; কিন্তু একটি কালজয়ী সাহিত্যের অন্তরের সূক্ষ্ম সংবেদন, তার দেশকাল ও মাটির সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট এবং ভাষার ভেতরের অন্তর্নিহিত রূপ ও নন্দনতত্ত্বকে অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য – রক্ত-মাংসের মানুষের সংবেদনশীল মন ও মানব-অনুবাদকের গভীর স্পর্শ আজও এবং চিরকাল অপরিহার্য।
ডিজিটাল আর্কাইভ : ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব
আজকের এই সিলিকন যুগে ভারতের বহু বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাজ্ঞ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রাচীন গ্রন্থাগারগুলি – আমাদের সহস্র বছরের জরাজীর্ণ পাণ্ডুলিপি, লোকসাহিত্যের অমিয় ধারা, প্রাচীন অভিধান আর মাটির মুখের মৌখিক ঐতিহ্যকে পরম মমতায় সংরক্ষণ করছে ডিজিটাল মহাবিশ্বের অমর অ্যালগরিদমে। এই মহৎ কর্ম কেবল ধূসর অতীতকে ধুলোবালি থেকে রক্ষা করার জীর্ণ প্রয়াস নয়; তা তো আসলে অনাগত ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক ভাষা-প্রযুক্তির এক অবিনশ্বর ও সুদৃঢ় ভিত্তিপ্রস্তর নির্মাণের এক রাজকীয় আয়োজন।
আমাদের মেঠো লোকগান, মাটির কাছাকাছি থাকা আঞ্চলিক শব্দভাণ্ডার, চঞ্চলা উপভাষা, প্রবীণদের মুখের প্রবাদ-প্রবচন আর গ্রামীণ জীবনের নিটোল শব্দকোষ – সবকিছুই এই সভ্যতার সমভাবে মূল্যবান ও পরম সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য। কারণ, ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই দেখা যায় – একটি জীবন্ত ভাষার আসল প্রাণবায়ু কেবল তার রাজকীয় সাহিত্যিক অলংকারের অন্দরে বন্দি থাকে না; তার আসল স্পন্দন তো লুকিয়ে থাকে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের প্রাত্যহিক ও কথ্য জীবনের সহজ কলতানের মাঝে।
ভবিষ্যতের ভারত : বহুভাষিক, বহুস্বরিক, প্রযুক্তিসমৃদ্ধ
ডিজিটাল যুগের এই নতুন আলো-আঁধারি আজ আমাদের ইতিহাসের এক অনন্য চৌরাস্তায় এনে দাঁড় করিয়েছে। যার একদিকে বৈশ্বিক বিশ্বায়নের রুক্ষ ঝড় আমাদের হাজার বছরের প্রাচীন ভাষাগত বৈচিত্র্যকে সংকুচিত করে দিতে পারে; আর ঠিক তার উল্টোদিকে, এই আধুনিক প্রযুক্তিই আবার আমাদের শত শত ক্ষুদ্র ও লোকভাষার মরমী বুকে ফুঁ দিয়ে জাগিয়ে তুলতে পারে এক নতুন জীবনের চঞ্চলা স্রোত।
ভারতবর্ষ যদি আজ তার প্রতিটি প্রান্তিক ভাষাকে ডিজিটাল মহাবিশ্বের বুকে পরম মর্যাদা দিতে পারে, যদি প্রতিটি শিশুর নিজের মিষ্টি মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চা আর প্রযুক্তি-উন্নয়নের এক সমান সুযোগ সৃষ্টি হয়, যদি অনুবাদ, আদিম গবেষণা আর ভাষা-সংরক্ষণকে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির এক পরম ও অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ করা যায়—তবে এই একবিংশ শতাব্দী ভারতীয় বাণীর কোনো অবক্ষয় বা মৃত্যুর অন্ধকার নয়; বরং তা হয়ে উঠবে এক অভূতপূর্ব ও জ্যোতির্ময় মহাজাগতিক পুনর্জাগরণের স্বর্ণযুগ।
সহস্র বছরের ভারতীয় ভাষা-ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় এবং পরম শিক্ষা তো এই যে – ভাষা কখনো কোনো পাথুরে মূর্তি বা স্থবির কঙ্কাল নয়; ভাষা তো আসলে এক প্রবহমান ও অনন্ত নদীর মতো। সে নিত্যনতুন মেঠো উপনদীকে পরম মমতায় বুকে গ্রহণ করে, অচেনা নতুন নতুন ভূখণ্ড অতিক্রম করে, মহাকালের বুকে এক নতুন মহাসমুদ্রের দিকে এগিয়ে যায়। এই আধুনিক ডিজিটাল যুগেও বাণীর সেই রাজকীয় যাত্রা অবিনশ্বরভাবে অব্যাহত থাকবে – যদি আমরা ভাষাকে কেবল কোনো যান্ত্রিক কোডিং বা প্রযুক্তির শুকনো উপাদান হিসেবে না দেখে, তাকে প্রতিটি রক্ত-মাংসের মানুষের বেঁচে থাকার আনন্দ, তার স্বপ্ন আর সাংস্কৃতিক আত্মার পরম প্রকাশ হিসেবে পরম শ্রদ্ধায় দেখতে শিখি।
ভাষা : ভারতের আত্মার ব্যাকরণ
“वागेव विश्वभुवनी।”- বাক্ই বিশ্বসৃষ্টির অন্যতম ভিত্তি।
বৈদিক ভাবনা
आ नो भद्राः क्रतवो यन्तु विश्वतः। – চারিদিক থেকে কল্যাণকর চিন্তা আমাদের কাছে এসে পৌঁছাক।
— ঋগ্বেদ (১.৮৯.১)
ভারতীয় ভাষা-ইতিহাসের সেই সুপ্রাচীন ও দীর্ঘ অভিযাত্রার নদীটি পার হয়ে, আমরা যখন আজকের এই আধুনিক একবিংশ শতাব্দীর প্রান্তে এসে দাঁড়াই – তখন এক পরম ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রশ্ন আমাদের চেতনার দুয়ারে এসে আঘাত করে – এই অন্তহীন বৈচিত্র্য, এই বিপুল বর্ণমালার তরঙ্গের মধ্যে সমগ্র ভারতকে আসলে এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রেখেছে কী?
সেই রহস্যের উত্তরটি কিন্তু কোনো একক ভাষার সংকীর্ণ আভিজাত্যের মধ্যে লুকিয়ে নেই।
ধ্রুপদী সংস্কৃত নিশ্চিতভাবেই এই পবিত্র ভারতবর্ষের এক মহৎ ও কালজয়ী উত্তরাধিকার, কিন্তু ভারত কেবল একক সংস্কৃতের নয়। আদিম তামিল এই পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রাচীন জীবন্ত সাহিত্যিক ভাষা, কিন্তু ভারত কেবল একক তামিলেরও নয়। বাংলা, কাশ্মীরি, অসমীয়া, ওড়িয়া, মারাঠি, গুজরাটি, কন্নড়, তেলুগু, মালয়ালম, পাঞ্জাবি, উর্দু, মেইতেই, বোড়ো, সাঁওতালি, ডোগরি, কোকবরক কিংবা পাহাড় ও অরণ্যের আড়ালে থাকা শত শত আদিবাসী ভাষা – এদের প্রতিটিই ভারতীয় আত্মপরিচয়ের একেকটি অবিচ্ছেদ্য, সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং পবিত্রতম অঙ্গ।
পরাক্রমশালী ভারতবর্ষকে তাই কোনো একটিমাত্র একরৈখিক ভাষা বা একঘেয়েমির চাদর দিয়ে কখনো ব্যাখ্যা করা যায় না; ভারতকে একমাত্র তখনই পূর্ণরূপে বোঝা সম্ভব – যখন আমরা তাকে এই বিপুল বহুস্বরের পরম, সৃষ্টিশীল ও মরমী সহাবস্থানের আলোয় দেখতে শিখি।”
ভাষা : সভ্যতার জীবন্ত স্মৃতি
একটি ভাষা কেবল ব্যাকরণ, অভিধান বা সাহিত্য নয়।
একটি ভাষার মধ্যে সংরক্ষিত থাকে একটি সমাজের নদীর নাম, বনের নাম, পাখির ডাক, কৃষির অভিজ্ঞতা, ঋতুচক্র, উৎসব, লোকবিশ্বাস, চিকিৎসাজ্ঞান, সংগীত, হাসি, কান্না এবং মানুষের জীবনযাপনের হাজার বছরের স্মৃতি।
যখন কোনও ভাষা বিলুপ্ত হয়, তখন কেবল একটি যোগাযোগব্যবস্থা হারায় না; মানবসভ্যতার একটি সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারও হারিয়ে যায়।
এই কারণেই ভাষা সংরক্ষণ কোনও ভাষাবিদের একক দায়িত্ব নয়; এটি একটি সভ্যতার আত্মরক্ষার দায়িত্ব।
ভারতের শক্তি : বহুভাষিকতা
বিশ্বের বহু পরাক্রমশালী রাষ্ট্র যেখানে কৃত্রিম একরূপতার একঘেয়েমি পথ বেছে নিয়ে নিজেদের ভাষাগত বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করেছে, ভারতবর্ষ সেখানে হেঁটেছে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অনন্য সুন্দরের পথে ।
স্বাধীন ভারতের পবিত্র সংবিধান এদেশের মাটির কোনো একটিমাত্র একক ভাষাকে জাতির একচ্ছত্র পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেনি বরং, এ মাটির চিরন্তন বহুভাষিকতাকেই দিয়েছে পরম ও রাজকীয় সাংবিধানিক মর্যাদা । এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত কেবল কোনো শুকনো বা যান্ত্রিক প্রশাসনিক নিয়ম ছিল না; তা তো আসলে ছিল ভারতীয় সভ্যতার হাজার বছরের প্রাচীন অভিজ্ঞতা ও পরম আস্থার এক শাশ্বত স্বীকৃতি ।
ইতিহাসের ধূসর পাতা সাক্ষ্য দেয় – এই সুপ্রাচীন উপমহাদেশে ভাষা কখনো কখনো সাময়িক সংঘাতের আগুনও জ্বেলেছে, আবার মরমী মেলবন্ধনের পরম সংলাপও নির্মাণ করেছে । কিন্তু সময়ের দীর্ঘ ক্যানভাসে ভারতীয় সংস্কৃতির সবচেয়ে প্রধান ও অবিনশ্বর ব্রহ্মশক্তি ছিল তার উদার আদান-প্রদান । ধ্রুপদী সংস্কৃত যেমন প্রাকৃতের চঞ্চলা নদীকে আপন ঐশ্বর্যে প্রভাবিত করেছে, সেই প্রাকৃতই আবার ভালোবেসে জন্ম দিয়েছে আজকের আধুনিক ভাষাগুলিকে; দাক্ষিণাত্যের প্রাচীন দ্রাবিড় ভাষা উত্তর ভারতের ইন্দো-আর্য ভাষাকে দিয়েছে মূর্ধন্য ধ্বনির অপূর্ব অলংকার, আর ইতিহাসের নানা চড়াই-উতরাইয়ে ফারসি, আরবি, পর্তুগিজ ও ইংরেজির নদীগুলি ভারতীয় বাণীর শব্দ-সংসারকে প্রতিনিয়ত কানায় কানায় প্রসারিত করেছে।
ভারতবর্ষের এই গৌরবময় ভাষা-সভ্যতা তাই কোনো পাথুরে দেওয়াল বা চার দেওয়ালে বন্দি বন্ধ দুর্গ নয়; তা তো আসলে বিশ্বজনীন মহামিলনের এক উন্মুক্ত ও সুরম্য শাশ্বত অঙ্গন।
অনুবাদ : ভারতের অদৃশ্য জাতীয় সেতু
ভারতবর্ষের এই সুবিশাল ও বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ঐক্যের অন্তরালে সবচেয়ে শক্তিশালী, মরমী এবং অলৌকিক মাধ্যমটি হলো পরম মমতাময়ী ‘অনুবাদ’।
যে বাঙালি পাঠক দাক্ষিণাত্যের সুপ্রাচীন প্রজ্ঞার আকর ‘তিরুক্কুরল’-এর শ্লোক পড়ে মুগ্ধ হন, যে তামিল পাঠক নিজের অজান্তেই রক্তে মেখে নেন রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির অমৃতসুর, যে কাশ্মীরি পাঠক তুঙ্গ হিমালয়ের কোলে বসে ইছামতী বা আরণ্যেকের অরণ্য-প্রকৃতির মায়ায় বিভূতিভূষণকে পরম আদরে গ্রহণ করেন, কিংবা যে বাংলা পাঠক উত্তর ভারতের মেঠো ধুলোবালির গন্ধ মাখা প্রেমচন্দ কিংবা কন্নড় সাহিত্যের দিকপাল ইউ. আর. অনন্তমূর্তিকে নিজের ঘরের মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করেন—তাঁদের প্রত্যেকেরই হৃদয়ের মণিকোঠায় এই চিরন্তন ও বহুস্বরী ভারতবর্ষ প্রতিদিন এক সম্পূর্ণ নতুন রূপে জন্ম নেয়।
অনুবাদ কখনো কোনো ভাষার আদিম স্বাতন্ত্র্য বা রূপের নদীটিকে জোর করে প্রতিস্থাপন বা মুছে দেয় না; অনুবাদ তো আসলে দুটি ভিন্ন সুরের ভাষার ওষ্ঠে ওষ্ঠে এক অবিনশ্বর ও নিবিড় মৈত্রীর বন্ধন গড়ে তোলে। এই পরম ও শাশ্বত কারণেই , অনাগত ভবিষ্যতের অখণ্ড ও সংহত ভারতকে যদি আরও বেশি আত্মিক বন্ধনে দৃঢ় করতে হয়, তবে এই অন্তহীন ‘আন্তঃভারতীয় অনুবাদ-আন্দোলন’-এর রূপালি সুতোটিকে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত বিস্তৃত জনপদে আরও বেশি গভীর ও সুদূরপ্রসারী করে তুলতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানবিক ভাষা
ডিজিটাল যুগের এই নতুন আলোয় ভাষার সামনে ডানা মেলার এক অলৌকিক সম্ভাবনা এসেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চোখের পলকে অনুবাদ করবে, জরাজীর্ণ অক্ষরের আয়ু সংরক্ষণ করবে, মহাবিপন্ন ভাষার শেষ শব্দভাণ্ডার পরম মমতায় নথিভুক্ত করবে এবং অনাগত নতুন প্রজন্মকে নিজের মিষ্টি মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণে অনন্য সহায়তা করবে।
কিন্তু সিলিকন চিপের এই যান্ত্রিক প্রযুক্তি কখনো কোনো ভাষার জীবন্ত আত্মাকে সৃষ্টি করতে পারে না। একটি শিশুর ঘুমের গভীর থেকে উঠে আসা লোরি বা দিয়ালা বা ঘুমপাড়ানি গান, এক মেঠো বাউলের উদাস লোকগান, দাদু-ঠাকুমার মুখের সুপ্রাচীন প্রবাদ, এক কবির হৃদয়ের রক্তে রাঙা কবিতা কিংবা একটি মায়ের ওষ্ঠ থেকে ঝরে পড়া সন্তানের জীবনের প্রথম শব্দটি – এসবের অন্তহীন মানবিক গভীরতা ও প্রাণের স্পন্দনকে প্রযুক্তি হয়তো পরম যত্নে ধারণ করতে পারে, কিন্তু তাকে নতুন করে জন্ম দেওয়ার ঐশ্বরিক ক্ষমতা তার নেই।
অতএব, এই যান্ত্রিক প্রযুক্তিকে মানুষের জীবন্ত ভাষার কোনো একলা বিকল্প হিসেবে নয়; বরং বাণীরূপের এক পরম ও অনুগত সহযাত্রী হিসেবে গ্রহণ করাই হবে আমাদের অনাগত ভবিষ্যতের একমাত্র রাজপথ।
ভর্তৃহরি থেকে রবীন্দ্রনাথ : ভাষার দার্শনিক উত্তরাধিকার
প্রাচীন ভারতের প্রাজ্ঞ ব্যাকরণ-দার্শনিক ভর্তৃহরি তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘বাক্যপদীয়’-এ “শব্দব্রহ্ম”-এর সেই অমর ও শাশ্বত ধারণা উপস্থাপন করেছিলেন। তাঁর মতে, ভাষা কেবল কোনো শুকনো চিন্তার বাহন বা পোশাক নয়; মানুষের ভাষা আর তার অন্তরের চেতনা পরস্পরের সাথে এক অবিনশ্বর বন্ধনে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। আর এই পরম দর্শনের বহু শতাব্দী পরে, বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে সমগ্র বিশ্বমানবতার কথা বলতে গিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভাষার এই অন্তহীন বৈচিত্র্যকে কোনো কৃত্রিম দেয়াল বা বিভাজন হিসেবে দেখেননি। তাঁর উদার দৃষ্টিতে প্রতিটি ভিন্ন ভাষা ছিল আসলে এই অনন্ত মহাবিশ্ব আর মানবসভ্যতাকে দেখার এক একটি স্বতন্ত্র, জ্যোতির্ময় ও সুন্দর বাতায়ন।
প্রাচীন আর আধুনিকের এই দুই মহান ভাবনার অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে এক সুগভীর ও শাশ্বত সেতুবন্ধন। ভাষা তখনই তার পরম সার্থকতা খুঁজে পায়, যখন তা মানুষকে কোনো সংকীর্ণ বা অন্ধকারের গণ্ডির দিকে টেনে নিয়ে যায় না; বরং হাত ধরাধরি করে পৌঁছে দেয় এক বৃহত্তর ও বিশ্বজনীন মানবিকতার আলোকোজ্জ্বল মহাসমুদ্রে।
শেষকথা : ভারতের সংস্কৃতির মহাসংগীত
আমাদের এই প্রাজ্ঞ অন্বেষণে আমরা সুপ্রাচীন বৈদিক সংস্কৃতের গম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণ থেকে শুরু করে প্রাকৃত, পালি আর অপভ্রংশের মেঠো পথ বেয়ে তামিল, বাংলা, কাশ্মীরি, মারাঠি, উর্দু ও সাঁওতালির মতো শত শত ভাষার রূপালি নদী পেরিয়ে, আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের যুক্তিশাস্ত্র, সাংবিধানিক উদার দর্শন এবং পরিশেষে এই একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ডিজিটাল যুগ পর্যন্ত ভারতীয় বাণীর এক দীর্ঘ, রোমাঞ্চকর ও মহাকাব্যিক যাত্রাপথ অনুসরণ করেছি। আর এই সুবিশাল তীর্থযাত্রার সবচেয়ে বড় এবং পরম শিক্ষা তো একটিই – পরাক্রমশালী ভারতবর্ষ কোনো একটিমাত্র একক ভাষার সংকীর্ণ দেশ নয়; ভারত হলো এই পৃথিবীর বুকে শত শত ভাষার এক পরম ও মনোহর মিলনভূমি। এখানে ভিন্ন ভিন্ন ভাষার পথ চলা মানে কোনো কৃত্রিম প্রতিযোগিতা বা সংঘাতের ইতিহাস নয়; তা তো আসলে পরস্পরের ওষ্ঠে ওষ্ঠে হাজার হাজার বছরের এক নিবিড় ও মরমী সংলাপের অবিনশ্বর ইতিহাস। এখানে বাহ্যিক বৈচিত্র্য কখনো কোনো দেয়াল বা বিভাজনের কারণ হয়ে দাঁড়ায় না; বরং সেই অন্তহীন বৈচিত্র্যই হলো আমাদের অখণ্ড একতার সবচেয়ে সুদৃঢ় ও প্রধানতম ভিত্তিপ্রস্তর। আর এখানেই লুকিয়ে আছে ভারতীয় সংস্কৃতির সেই শাশ্বত ও চিরন্তন অনন্যতা।
একটি প্রবহমান নদী যেমন চারপাশের অসংখ্য চঞ্চলা উপনদীকে পরম মমতায় নিজের বুকে গ্রহণ করেও কখনো নিজের আদিম পরিচয় হারায় না – তেমনি আমাদের এই পুণ্যময় ভারতবর্ষও শত শত ভাষা, সহস্র উপভাষা, মায়াবী লিপি আর কালজয়ী সাহিত্যকে নিজের বুক পেতে ধারণ করেও এক সুবিশাল ও বৃহত্তর একক সাংস্কৃতিক সত্তায় পরিণত হয়েছে। এই পরম ও শাশ্বত কারণেই – ভারতীয় ভাষার এই সুদীর্ঘ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কেবল কোনো ব্যাকরণ বা অক্ষরের ইতিহাস নয়; এটি হলো রক্ত-মাংসের মানুষের ইতিহাস। এটি হলো পরম সহাবস্থানের ইতিহাস। এটি হলো সহস্র বছরের প্রাচীন স্মৃতির ইতিহাস। আর এটিই হলো আমাদের অনাগত আগামী ভবিষ্যতের সবচেয়ে দীপ্তিময় ইতিহাসও। আর সেই আলোর ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক হয়ে আজ আড়াই হাজার বছর পরেও আমাদের চেতনার আকাশে প্রতিধ্বনিত হয় ঋগ্বেদের সেই চিরন্তন ও ঐশ্বরিক আহ্বান – “आ नो भद्राः क्रतवो यन्तु विश्वतः।”
চারিদিক থেকে সমস্ত কল্যাণকর ও সুন্দর চিন্তা আমাদের কাছে এসে পৌঁছাক। কারণ, ইতিহাসের পাতায় যে মহান সভ্যতা পৃথিবীর সব ভাষার কণ্ঠস্বরকে পরম মমতায় ও শ্রদ্ধায় শুনতে শেখে – শেষ পর্যন্ত অনাগত অনন্ত ভবিষ্যৎও কেবল তারই জয়গানে মুখরিত হয়।”


