ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ - নবকুমার দাস
অহিংস সাম্রাজ্যের স্বপ্ন ও সমকালীন বিশ্বরাজনীতির প্রতিধ্বনি
নবকুমার দাস
ভারতের সংস্কৃতি – ৮
ইতিহাসের দীর্ঘ স্রোতে কখনও কখনও এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি সভ্যতা হঠাৎ নিজের আত্মার মুখোমুখি দাঁড়ায়। তখন ইতিহাসের গতিপথ কেবল ক্ষমতার অক্ষ বরাবর নয়, নৈতিকতার আলোয়ও পুনর্গঠিত হয়।
ভারতীয় ইতিহাসে এমন এক অনন্য মুহূর্তের নাম — সম্রাট অশোক।
তিনি কেবল এক সাম্রাজ্যের অধিপতি নন; তিনি এমন এক রাষ্ট্রদর্শনের নির্মাতা, যেখানে রাজনীতি ও নৈতিকতার মিলন ঘটে এক আশ্চর্য সমবায়ে।
বিশ্বের অধিকাংশ সাম্রাজ্যের ইতিহাস শুরু হয় যুদ্ধের গর্জন দিয়ে—রক্ত, ধ্বংস এবং জয়ের উল্লাসে। কিন্তু অশোকের ইতিহাসে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য আছে। তিনি যুদ্ধজয়ী সম্রাট হয়েও ঘোষণা করেছিলেন —“ধর্মবিজয়ই সর্বোচ্চ বিজয়।”
এই ঘোষণা কেবল একটি রাজনৈতিক নীতিবাক্য নয়; এটি মানবসভ্যতার নৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী উপলব্ধি। আজকের বিশ্বে যখন অর্থনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তি ও বাজারের প্রভাব আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে—বিশেষত আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায়—তখন অশোকের ধর্মনীতি নতুন করে আলোচনায় ফিরে আসে। কারণ তিনি এমন এক সাম্রাজ্যের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যার ভিত্তি ছিল না সামরিক শক্তি; বরং করুণা, সহিষ্ণুতা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা।
অশোকের উত্থানকে বুঝতে হলে প্রথমে দেখতে হবে মৌর্য সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। এই সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। তার পেছনে ছিলেন এক অসাধারণ রাষ্ট্রচিন্তক— কৌটিল্য। কৌটিল্যের রচিত অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে রাষ্ট্রশক্তি সম্পর্কে এক বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়। সেখানে বলা হয়েছে “মাৎস্যন্যায়ো ভবতি।” অর্থাৎ শক্তিশালী দুর্বলকে গ্রাস করে—এটাই প্রকৃতির নিয়ম।
রাষ্ট্রকে শক্তিশালী হতে হবে, নতুবা অরাজকতা সৃষ্টি হবে। এই চিন্তাধারা ছিল প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক বাস্তববাদের ভিত্তি। অশোকও প্রথম জীবনে এই বাস্তববাদী রাষ্ট্রনীতির মধ্যেই বেড়ে উঠেছিলেন।
খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে সংঘটিত কলিঙ্গ যুদ্ধ ছিল মৌর্য সাম্রাজ্যের ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায়।আজকের ওডিশা অঞ্চলে অবস্থিত ছিল সেই প্রাচীন কলিঙ্গ। এই যুদ্ধের বিবরণ আমরা পাই অশোকের বিখ্যাত ত্রয়োদশ শিলালিপি –তে দেবানামপ্রিয় প্রিয়দর্শী রাজা বলেন,
“দেবানংপ্রিয় প্রিয়দর্শী রাজা এবম্ আহ—
কলিঙ্গে বিজিতে বহু বধ বহু মরণং।”
অর্থাৎ “কলিঙ্গ দেশ জয় করার পর দেবানামপ্রিয় গভীর অনুতাপ অনুভব করেন। কারণ, যে দেশে বিজয় ঘটে সেখানে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু, বন্দিত্ব এবং দেশান্তর ঘটে।”
কলিঙ্গ জয়ের সময় প্রায় এক লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছিল, দেড় লক্ষ মানুষ বন্দী করা হয়েছিল এবং তারও বহু গুণ মানুষ পরে দুঃখ-কষ্টে প্রাণ হারিয়েছিল। এই ঘটনাই দেবানামপ্রিয়ের হৃদয়ে গভীর বেদনা সৃষ্টি করে। বিশেষত ব্রাহ্মণ, শ্রমণ, গৃহস্থ, অথবা যাঁরা পিতামাতা, গুরুজন, বন্ধু ও স্বজনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল—তাঁদের উপর যে বিপর্যয় নেমে আসে, তাদের বিচ্ছেদ ও দুঃখ দেবানামপ্রিয়কে অত্যন্ত মর্মাহত করে।
অতএব দেবানামপ্রিয় মনে করেন যে প্রকৃত বিজয় অস্ত্রের দ্বারা নয়, ধর্মের দ্বারা অর্জিত হওয়াই শ্রেয়।
এই কারণে দেবানামপ্রিয় এখন থেকে ধর্মবিজয়কেই সর্বোচ্চ বিজয় বলে ঘোষণা করেন। এই ধর্মবিজয় কেবল তাঁর সাম্রাজ্যেই নয়, দূরদেশেও বিস্তৃত হয়েছে—যেখানে গ্রিক রাজা অ্যান্টিওকাস এবং তার পার্শ্ববর্তী অন্যান্য রাজাদের রাজ্য পর্যন্ত এই ধর্মের বার্তা পৌঁছেছে।
দেবানামপ্রিয় চান যে সকল মানুষ সংযম, সহিষ্ণুতা, করুণা এবং ন্যায়ের পথে চলুক।
অতএব ভবিষ্যতে যদি কোনো বিজয় ঘটে, তবে তা যেন অস্ত্রবিজয় নয়, ধর্মবিজয় হয়—এটাই দেবানামপ্রিয়ের অভিলাষ।
এরপরই আসে ইতিহাসের এক বিরল স্বীকারোক্তি- “দেবানংপ্রিয়স্য লহুকং মন্যতে।”
এই হত্যালীলা সম্রাটের কাছে গভীর অনুশোচনার কারণ হয়ে ওঠে। বিশ্ব ইতিহাসে বিজয়ী সম্রাটের এই আত্মসমালোচনা প্রায় নজিরবিহীন। যুদ্ধের ময়দান থেকে তিনি যেন এক নৈতিক জাগরণের পথে প্রবেশ করলেন। কলিঙ্গ যুদ্ধের পর অশোক ঘোষণা করেন, “ধর্মবিজয়ঃ সর্বশ্রেষ্ঠঃ।” অর্থাৎ ধর্মের দ্বারা অর্জিত বিজয়ই সর্বশ্রেষ্ঠ বা ধর্মবিজয়ই সর্বোচ্চ বিজয়। কিন্তু এই “ধর্ম” কোনও সংকীর্ণ ধর্মীয় মতবাদ নয়। এটি ছিল এক নৈতিক মানবতাবাদ যেখানে করুণা, সহিষ্ণুতা ও সামাজিক দায়িত্বকে রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়।
দ্বিতীয় শিলালিপিতে তিনি ঘোষণা করেন, মানুষের চিকিৎসালয়, পশুদের চিকিৎসা, ঔষধি বৃক্ষরোপণ, রাস্তার ধারে কূপ খনন ইত্যাদি। এই নীতিগুলি প্রাচীন বিশ্বের প্রথম কল্যাণকামী রাষ্ট্র ধারণার অন্যতম নিদর্শন।
বাস্তবে অশোকের রাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্মীয় সহিষ্ণুতা। দ্বাদশ শিলালিপিতে তিনি বলেন, “স্বধর্ম প্রশংসা পরধর্ম নিন্দা ন কর্তব্যা।” অর্থাৎ নিজের ধর্মের প্রশংসা করা যেতে পারে, কিন্তু অন্যের ধর্মের নিন্দা করা উচিত নয়। এই নীতি ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভাবনাকে প্রকাশ করে। নিজ ধর্মকে সম্মান করো, কিন্তু অন্য ধর্মকে অবজ্ঞা করো না। এই চিন্তার মধ্যে আমরা প্রাচীন ভারতীয় বহুত্ববাদী দর্শনের প্রতিফলন দেখতে পাই। ঋগ্বেদের বিখ্যাত মন্ত্র, “একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি।” অর্থাৎ , “সত্য এক, জ্ঞানীরা তাকে নানাভাবে ব্যক্ত করেন।” এখানে বহুত্বের মধ্যে ঐক্যের ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে। অশোক এই দার্শনিক ধারণাকে রাষ্ট্রনীতিতে রূপ দিয়েছিলেন।
অনেকেই বলে থাকেন যে অশোকের নৈতিক রাষ্ট্রচিন্তার পেছনে ছিল গৌতম বুদ্ধ-এর প্রভাব। বৌদ্ধ দর্শনে করুণা ও অহিংসা মানবজীবনের কেন্দ্রীয় মূল্যবোধ। ধম্মপদ-এ বলা হয়েছে, ““ন হি ভেরেন ভেরাণি সম্মন্তীধ কুদাচনং; অভেরেন চ সম্মন্তি।” যার অর্থ বিদ্বেষ দিয়ে বিদ্বেষের অবসান হয় না ; অবিদ্বেষই তার অবসান ঘটায়। অশোক এই নীতিকে রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি করেছিলেন।
কিন্তু কি অদ্ভুত বিষয় বহু বর্ষ পরে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার তাঁর টাইটাস এন্ড্রোনিকাস নাটকে একই বিষয় উচ্চারণ করলেন। তিনি লিখলেন ,“Vengeances bring vengeances.” অর্থাৎ প্রতিশোধের চক্র – একটি প্রতিশোধ আরেকটি প্রতিশোধকে জন্ম দেয় এবং শেষ পর্যন্ত সবাই ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়।
অন্যদিকে , অশোক তাঁর বার্তা প্রচারের জন্য যে পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন তা ছিল অভিনব। তিনি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে শিলালিপি স্থাপন করেন। এই শিলালিপিগুলি লেখা হয়েছিল ব্রাহ্মী, খরোষ্ঠী এমনকি গ্রিক ভাষায়। অবশ্যই এটা ছিল প্রাচীন বিশ্বের এক অসাধারণ প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা।রাষ্ট্র সরাসরি জনগণের সঙ্গে কথা বলছে—এই ধারণা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আগেই অশোক বাস্তবায়ন করেছিলেন।
অন্যদিকে অশোকের ধর্মনীতি তাঁর সাম্রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বিভিন্ন দেশে ধর্মদূত পাঠান । তার পুত্র মহেন্দ্র এবং কন্যা সংঘমিত্রা যান শ্রীলঙ্কা-এ। যেখান থেকে বৌদ্ধধর্ম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে বিস্তার লাভ করে। পরবর্তী শতাব্দীতে এই সাংস্কৃতিক প্রবাহ পৌঁছায় চীন, কোরিয়া, জাপান ইত্যাদি দেশে। এটি ছিল ইতিহাসের এক অনন্য “সফট পাওয়ার”এর কূটনীতি।
আজকের আধুনিক পৃথিবীতে সাম্রাজ্যবাদ নতুন রূপ ধারণ করেছে। এখন যুদ্ধক্ষেত্র শুধু সেনাবাহিনীর নয় অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রবাহেরও। এই বৈশ্বিক কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।ডলারভিত্তিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বহুজাতিক কর্পোরেশন—সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে আধুনিক অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য। অশোকের ধর্মবিজয় ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে শক্তির উৎস ছিল- নৈতিকতা, সংস্কৃতি, দার্শনিক সংলাপ ইত্যাদি। অশোক বুঝেছিলেন, সাম্রাজ্য কেবল অস্ত্রের শক্তিতে টিকে থাকে না; টিকে থাকে মানুষের আস্থায়।
ভারতের জাতীয় পতাকায় যে অশোকচক্র রয়েছে, তা কেবল একটি ঐতিহাসিক প্রতীক নয়। এটি ধর্মচক্র বা নৈতিকতার গতিশীল প্রতীক। এই চক্র যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়- রাষ্ট্রের শক্তি কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক নয়; নৈতিকও হতে পারে। অশোকের চিন্তার প্রতিধ্বনি আমরা পরবর্তী ভারতীয় ইতিহাসেও দেখতে পাই। সাম্প্রতিক ইরান-ইজরায়েল-আমেরিকার যুদ্ধে যেন সেই ইতিহাসের দীর্ঘ প্রতিধ্বনি। মহাত্মা গান্ধী অহিংসাকে রাজনৈতিক সংগ্রামের কেন্দ্রে স্থাপন করেছিলেন। গান্ধীর সত্যাগ্রহ ও অশোকের ধর্মনীতি—এই দুইয়ের মধ্যে এক গভীর ঐতিহাসিক সংযোগ রয়েছে।
মানব ইতিহাসে অসংখ্য সাম্রাজ্য উঠেছে ও পতিত হয়েছে। তাদের অধিকাংশের ভিত্তি ছিল যুদ্ধ ও শক্তি। কিন্তু অশোক সেই ইতিহাসে এক ব্যতিক্রম। তিনি দেখিয়েছিলেন যে একটি সাম্রাজ্য করুণার উপরেও দাঁড়াতে পারে। কলিঙ্গ যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে যে উপলব্ধি জন্ম নিয়েছিল, তা আজও মানবসভ্যতার সামনে এক প্রশ্ন রেখে যায়, আমরা কি শক্তির সাম্রাজ্য গড়ব, না কি করুণার ? অশোকের শিলালিপি আজও পাথরের মধ্যে নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার বাণী এখনও মানবসভ্যতার অন্তরে প্রতিধ্বনিত হয়- “ধর্মবিজয়ই সর্বোচ্চ বিজয়।”
তথ্যসূত্র :
1. Romila Thapar — Ashoka and the Decline of the Mauryas
2. Upinder Singh — A History of Ancient and Early Medieval India
3. Patrick Olivelle — Ashoka: In History and Historical Memory
4. ধম্মপদ
5. Archaeological Survey of India — Ashokan Edicts



2 Responses
খুব ভাল লেখা। আগামীতে ভারতীয় সংস্কৃতি নিয়ে আরো লেখা পাব এই আশা করি।
ধন্যবাদ জানাই