ঊর্ণনাভ
ধারাবাহিক উপন্যাস
শ্যামলী রক্ষিত
সপ্তদশ অধ্যায়

দিপালী চলে যাবার পর রান্না সেরে নেয় মালবিকা। প্রতিদিন রান্না করে, তারপর স্নান করতে যায়। আগে মাকে ভালো করে স্নান করিয়ে দেয়। তারপর নিজে স্নানে যায়। কাজ তো তেমন কিছু নেই! দিপালী তো সব করেই যায়। ও এলে একটু প্রাণ খুলে কথা বলে রোজ। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বলতে ওই দিপালীর সঙ্গে যেটুকু। ও এলে যেন বুকের মধ্যে এক ঝলক টাটকা বাতাস ঢোকে। পাড়া-বেপাড়ার নানান খবর থাকে ওর কাছে। ও যেন এসে মালবিকাকে সব বলতে পারলে বাঁচে। আসার পর থেকেই কাজ সারতে সারতে বকবক করে বলতে থাকে সব কিছু। মালবিকাও যেন প্রাণ ফিরে পায় দুটো কথা বলে।
কেন জানি ইদানীং মালবিকার খুব বেশি করে মনে হয়, আদ্রা থেকে তাদের চলে আসাটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল! চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই সুন্দর ছোট্ট রেল কলোনি। কী অপূর্ব ছিল সেই জীবন!
যখনই মালবিকা একা একা বসে থাকে, তখনই আদ্রার কথা মনে পড়ে যায়। হুহু করে বুকের ভেতরটা। কুবকুব করে ডেকে ওঠে শূন্যতার পাখি! সারা মন জুড়ে বিছিয়ে যায় বিষণ্ণতার ছায়া। গ্রীষ্মের সন্ধের মতো ভারী এক সিক্ত শূন্যতাবোধ তার চারদিকে বাহুবিস্তার করে।
তবু সেই জীবনের কাছে বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে তার। কী অদ্ভুত সুখের জীবন ছিল সেসব!
চারদিক খোলামেলা রেল কলোনি। উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে ঢালু পিচের রাস্তা নেমে গেছে। সারি সারি অ্যাজবেস্টসের ছাউনির দেওয়া ঘর। দু’পাশে অজস্র বড়ো বড়ো শাল-সেগুনের গাছ। সবাই বলত, ব্রিটিশ আমলের গাছ এসব। বসন্তকালে আগুন ফুটে উঠত পলাশের ডালে ডালে।
কলোনিতে কিছু কিছু বড়ো বড়ো বাংলো ছিল। সেখানে নাকি সাহেবরা বাস করত। মালবিকা যখন S.E. Railway School-এ প্রাইমারি সেকশনে পড়ত, তখনই মাঝে মাঝে সেইসব বাংলোবাড়িতে কখনও-সখনও সাহেবদের আসতে-যেতে দেখেছে।
সারা কলোনিজুড়ে কত কিছু ছিল। মস্ত বড়ো স্কুল। বয়েজ, গার্লস—আলাদা আলাদা। প্রাইমারিটাও প্রায় একই সঙ্গে লাগোয়া। তবে একেবারে সবশেষে। প্রতিদিন তারা তিনজনে কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে একসঙ্গে ওই রাস্তাটুকু হাঁটতে হাঁটতেই স্কুলে যেত।
গরমকালে রাস্তা থেকে হাতভর্তি বকুলফুল কুড়িয়ে নিয়ে স্কুলে যেত তারা। স্যার-ম্যাডামদের উপহার দিত প্রতিদিন।
সবচেয়ে মজা লাগত বসন্তকালে। সারা রাস্তা পলাশের গালিচা পাতা থাকত। মালবিকার মনে হত, জুতো খুলে খালি পায়ে ওই পথটুকু হেঁটে যাবে। অমন সুন্দর পলাশফুল! জুতো পায়ে মাড়াতে মাড়াতে যেতে খুব খারাপ লাগত। কেমন কষ্ট হত তার! তবুও জুতো পায়েই সে ফুল-বিছানো পথ মাড়িয়ে দলেযেতে বাধ্য হত প্রতিদিন।
হাতভর্তি পলাশফুল কুড়িয়ে নিয়ে যেত স্কুলে তখন।
একটু বড়ো হয়ে যখন থেকে স্বর্ণেন্দুর সঙ্গে বন্ধুত্ব হল, তখন প্রতিদিন ওকেও কিছু না কিছু ফুল কুড়িয়ে উপহার দিত।
“স্বর্ণেন্দু…”—অস্ফুটে উচ্চারণ করল নামটা।
কত নকশাকাটা, স্বপ্নময় একটাজীবন ছিল! কী সাজানো-গোছানো ছিল সেই কলোনি!
স্কুল পেরিয়েছিল সিনেমা হল। ওখানেই প্রথম সিনেমা দেখেছিল মালবিকা—‘হংসরাজ’! উফ! কী কান্না কেঁদেছিল সেই সিনেমাটা দেখে!
তার পাশেই ব্যাডমিন্টন, টেনিস, বিলিয়ার্ড খেলার কোর্ট ছিল। শীতের দিকে কত দিন ধরে ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট হত! কত দূর-দূরান্তের রেল কলোনির ছেলেমেয়েরা খেলতে আসত! কদিন ধরে কী মজাই না হত তাদের! বন্ধুবান্ধব মিলে হইহই করত তারা।
স্বর্ণেন্দুদা আবার ভলান্টিয়ার হত! পাঞ্জাবি পরে, সেজেগুজে, গায়ে আতর লাগিয়ে বারবার আমাদের নাকের গোড়া দিয়ে যাতায়াত করত সাইকেল নিয়ে!
ঘর থেকে মাঝেমাঝেই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ত সুলেখা আর সে। স্কুল থেকে ফিরে কোনো কোনো দিন যেত মনপুরার জঙ্গলে। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বনভূমি!
বাবা বলত, “এটা তৈরি করা বনভূমি।”
প্রচুর সোনাঝুরি গাছ আর ইউক্যালিপটাস। সেইসঙ্গে আম, জাম, কাঁঠাল—সব গাছই ছিল। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে রাস্তা পেরিয়ে চলে যেত বহুদূরে। তারপর যখন সূর্য ডুবে যেত, ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসত খুব দ্রুত। সঙ্গে সঙ্গে সাইকেল ঘুরিয়ে নিয়ে সাঁইসাঁই করে বাড়ি ফিরে আসত।
বাড়ি ফিরতে দেরি হলে ততক্ষণে বাবা বাড়ি ফিরে এলে সেদিন খুব বকুনি খেতে হত। কিন্তু তাই বলে যাওয়া কমেনি তাতে!
কোয়ার্টারে তিনটে করে ঘর ছিল। সামনে ঢুকেই একটা বড়ো হলঘর টাইপের। সেখানে বসার চেয়ার-টেবিল থাকত। বাইরের কোনো মানুষজন এলে সেখানেই বসত, কথা বলত। তারপর ভেতরের দিকে দুটো ঘর, রান্নাঘর, বাথরুম। সব মিলিয়ে বেশ বড়োই।
ঘর থেকে বেরিয়েই পিচের রাস্তা। রাস্তার দু’ধারে বড়ো বড়ো শাল-সেগুনের গাছ। বহু পুরোনো গাছগুলো যেন রেল কলোনিকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিল। সেই ছায়াশীতল, স্নিগ্ধ রাস্তা পেরিয়ে কিছুটা দূরেই জয়চণ্ডী পাহাড়। এদিকে-সেদিকে ছোটো ছোটো টিলা। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে গেলেই সেই ছোট্ট গ্রামটা—নদরা গ্রাম।
যেখান থেকে ননীপিসি কাজ করতে আসত তাদের বাড়িতে।
তাদের ঘরের জানলা দিয়ে দেখা যেত সেই নদরা গ্রাম। ননীপিসি প্রায়ই দেখাত, পাহাড়ের কোলে তাদের সেই ছোট্ট সুন্দর গ্রামটাকে। আর সে তখন অবাক হয়ে দূর থেকে তাদের জানলা দিয়ে দেখত ননীপিসির গ্রাম নদরা।
বড়ো হয়ে সেখানেও চলে যেত সাইকেল নিয়ে।
ত্রিশ বছর আগে ফেলে রেখে আসা আদ্রার রেল কলোনি!
এখন নাকি অনেক পাল্টে গেছে। রাস্তাবরাবর সেই বড়ো বড়ো ব্রিটিশ বৃক্ষগুলো নাকি সব কেটে ফেলেছে। মনপুরার জঙ্গল অনেক সাফ হয়ে গেছে।
এই গত বছর, করোনা শুরু হয়নি তখনও, সুলেখা ফোন করেছিল। ওর সঙ্গে এখনও যোগাযোগ আছে তার। ওর বিয়ে হয়েছিল পুরুলিয়ার কাছে একটা গ্রামে। ছেলে প্রাইমারি স্কুলের টিচার। বিয়েতে নিমন্ত্রণের কার্ড এসেছিল। মালবিকা যায়নি।
খুব ইচ্ছে করেছিল একবার আদ্রা গিয়ে ঘুরে আসবে। কিন্তু বাবার শরীরটা তখন ভালো যাচ্ছিল না। একা একা অত দূরের রাস্তা যেতে পারেনি সে।
তারপর বেশ কয়েক বছর আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। একদিন ফিরে পেল ফেসবুকে।
সুলেখা এখন একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়ায়। ওর একটা মেয়ে আছে। এখন সেই ওখানকার সমস্ত খবরাখবর দেয়। শুনে মন খারাপ লাগে তার।
মালবিকা সেসব পরিবর্তনের কথা শুনতে চায় না। তার ভালো লাগে না পাল্টে যাওয়া মানচিত্রের ছবি দেখতে। সে যা দেখে এসেছে, যে ছবি তার মনের মধ্যে ধরে আছে, তেমনটাই থাক তার চোখে।
ভালো লাগে না পাল্টে যাওয়ার গল্প শুনতে।
শ্রাবণের ভারী মেঘের মতো মন ভারী হয়ে যায় মালবিকার।
সে তাই তার সময়কার আদ্রাতেই হেঁটে চলে, বেরিয়ে মুক্তির আনন্দে ভেসে বেড়ায়।
(চলবে )


