ঊর্ণনাভ
ধারাবাহিক উপন্যাস
শ্যামলী রক্ষিত
ষষ্ঠদশ পর্ব
এ বছর যেন রোদের বড়ো বাড়াবাড়ি! একেবারে কাঠফাটা রোদ্দুর। করোনা হওয়ার পর থেকেই ওয়েদারটা অনেকখানি বদলে গেছে বলে মনে হয় মালবিকার। গত বছর শীত-বর্ষা দুটোই বেশ জাঁকিয়ে পড়েছিল। এবারও হয়তো তাই পড়বে। বহুকাল কলকাতায় তেমন ঠান্ডাই পড়ছিল না। ওই দু-চার দিন নিম্নচাপের জেরে ঝড়-বৃষ্টি হলে তখন একটুখানি ঠান্ডা পড়ত, তারপর আর শীতের দেখা মিলত না। তবে এবার ওয়েদারটা যেন একটু অন্যরকম।
আদ্রার হাড়কাঁপানো ঠান্ডা এখানে কোনোদিনই ছিল না। শীতকালে তখন আদ্রায় সাত-আট ডিগ্রি টেম্পারেচার। তার সঙ্গে কনকনে ঠান্ডা উত্তরের হাওয়া। সেই হাওয়া যখন শরীরের কোনো খোলা জায়গায় এসে লাগত, মনে হতো ধারালো ছুরি দিয়ে কেউ যেন কেটে দিচ্ছে। ডিসেম্বর-জানুয়ারির শীতে ঘর থেকে বেরোতেই ইচ্ছে করত না। সেই ঠান্ডা কলকাতায় কোনোদিনই ছিল না। তাই আদ্রা থেকে আসার পর কলকাতার এই শীতের মরশুমটা দারুণ লাগত তাদের।
গোটা শীতকাল জুড়ে কলকাতায় কত উৎসব! বাবা তাদের নিয়ে হৈহৈ করে ঘুরে বেড়াতেন। কোনোদিন চিড়িয়াখানা, কোনোদিন ভিক্টোরিয়া, কোনোদিন আবার গড়ের মাঠ। বাবা, মা আর সে—তখন কত ঘুরেছে তারা! তখন অবশ্য একটু ঠান্ডা পড়ত। চাদর, সোয়েটার গায়ে দিতে হতো। শীতকালটা সত্যিই খুব ভালো লাগত মালবিকার।
কিন্তু তারপর কী হল কে জানে! পরপর বেশ কয়েক বছর আর তেমন ঠান্ডাই পড়ল না। রাতের বেলা আর গায়ে কম্বল দিতে হয়নি। একটা পাতলা বিছানার চাদর গায়ে দিলেই চলে যেত। দিনের দিকেও তেমন চাদর-সোয়েটারের দরকার পড়ত না। কিন্তু গত বছর আবার শীতের মরশুম কিছুটা স্বমহিমায় ফিরেছিল কলকাতায়। বেশ ভালো লেগেছিল মালবিকার। স্নান করে এসে ছাদে বসে রোদ পোহাতে খুব আরাম লাগত।
আদ্রায় তো সবকিছুই আলাদা ছিল। তবে বর্ষাকালটা খুব ভালো লাগত তার। টানা সাত-আট দিন ধরে যখন বৃষ্টি হতো, কী মজার ছিল সেইসব বর্ষাপ্লাবিত দিন! সারাদিন-রাত ঘরের মধ্যে থাকা। মা কত কিছু টুকটাক খেতে দিতেন। তখন তো বাড়িতে কৌটোভর্তি খাবার খুব বেশি থাকত না। আর এখনকার মতো অনলাইনে অর্ডার দিলেই নানান স্বাদের খাবার বাড়িতে চলে আসত না। কাজেই কখনো মায়ের পুজো করা বাতাসা, কখনো একটু চিনি, কখনো এক গ্লাস আমূল দুধ—এই ছিল আনন্দ।
সবচেয়ে পছন্দের খাবার ছিল আমূল দুধ। মালবিকা কতবার যে রান্নাঘরে ঢুকে দুধ চুরি করে খেতে গিয়ে মায়ের কাছে ধরা পড়েছে! এইসব ছোটো ছোটো খাবার আর মায়ের রান্না তরকারি—এটুকুই তখন অনেক ছিল।
বৃষ্টির ঝাপটা জানলায় এসে পড়লে জানালার ধারে বসে বসে জয়চণ্ডী পাহাড়ের স্নান দেখতে দেখতে কেটে যেত দিন। আর মাঝেমধ্যে স্বর্ণেন্দু আর মীনা আসত খেলতে। তিনজনে সাপলুডো খেলত তারা।
স্বর্ণেন্দুদার কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা কেমন কুবকুব করে উঠল মালবিকার।
খুব ছোটোবেলা থেকেই তারা একসঙ্গে খেলাধুলো করত। পাশাপাশি কোয়ার্টার ছিল তাদের। বিমলকাকা আর আরতিকাকিমা দুজনেই খুব ভালো মানুষ ছিলেন। দুই পরিবারের মধ্যে বেশ হৃদ্যতা ছিল। মা-বাবা দুজনেই তাঁদের খুব পছন্দ করতেন। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, ঘোরাফেরা, শীতের দিনে পিকনিক করতে যাওয়া—কত স্মৃতি!
ওদের বাড়ি ছিল মেদিনীপুরের খেঁজুরি গ্রামে। গ্রামে অবশ্য খুব একটা যেত না তারা। দেশে জমিজমা নিয়ে বিমলকাকার দাদার সঙ্গে ঝামেলা লেগেছিল। তাই সর্বস্ব ছেড়েছুড়ে দিয়ে চলে এসেছিলেন বিমলকাকা। আর কোনোদিন গ্রামে যাননি।
দুই পরিবারের মধ্যে এতটাই আন্তরিক সম্পর্ক ছিল যে, মুখে কিছু স্পষ্ট করে না বললেও মালবিকা তখনই বুঝতে পেরেছিল—দুই পক্ষই চায় স্বর্ণেন্দু আর মালুর বিয়ে হোক।
স্বর্ণেন্দুদার অবশ্য এসব দিকে নজর দেওয়ার সময় ছিল না। সে তখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার স্বপ্নে বিভোর। নাওয়া-খাওয়া ভুলে দিনরাত বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে পড়ে থাকত।
যে বছর মাধ্যমিক পাস করল স্বর্ণেন্দু, সেই বছরই হোলির দিন প্রথম তাদের সম্পর্ক আলাদা করে এক রঙিন মাত্রা পেয়েছিল।
সেদিনের সেই দৃশ্য এখনও ছবির মতো চোখের পাতায় তিন-তিন করে উড়ে বেড়ায়—ডানা মেলা প্রজাপতির মতো।
সেদিন মাচা নাচা আর লুচি করেছিল মা। আরতিকাকিমাকে আগের দিনই বলে রেখেছিল, ‘তোমাকে আর জলখাবার বানাতে হবে না। ছেলেমেয়েগুলো একসঙ্গে বসে আমার কাছে খাবে। আর তোমাদের দুজনকেও দিয়ে যাব।’
হৈহৈ করে প্রতিযোগিতা করে লুচি খাওয়া চলল। সেদিন স্বর্ণেন্দুদা বারো-খানা লুচি খেয়েছিল, আর মীনা পাঁচটা, না ছটা। তারপর রঙের বালতি, পিচকারি, আবির নিয়ে সেই বটতলায়।
আদ্রা রেল কলোনিতে হোলির দিনই আসল উৎসব হতো। ওখানে তো অনেক নন-বেঙ্গলি বাস করত। তাই দোলের দিন তেমন হৈ-হুল্লোড় কিছু হতো না। দোলের পরের দিন সারাদিন নানা প্রোগ্রাম। সকাল থেকে বাচ্চাদের রং খেলা, বেলা বারোটার পর থেকে বড়োদের।
বাঙালিদের মধ্যে খোল-করতাল নিয়ে আবির খেলতে খেলতে কলোনি ভ্রমণ, আর নন-বেঙ্গলিদের তাসের পার্টি, বাজনা, উদোম নাচ আর তেল-কালি মাখামাখি—উফ! সারাদিন কী যে চলত!
তো তারা বটতলায় রং খেলছিল। হঠাৎ দেখে স্বর্ণেন্দু কেমন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। রং খেলছেই না। চোখে পড়তেই মালবিকা কাছে গিয়ে জানতে চেয়েছিল কী হয়েছে। তখন হুট করে স্বর্ণেন্দু তার সবুজ, হলুদ আর লাল রঙের আবিরের সমস্ত প্যাকেট উজাড় করে মালবিকার গালে-মুখে মাখিয়ে দিয়েছিল।
কত যত্ন করে, কী আন্তরিকভাবে যে সে রং মাখিয়েছিল!
আজও যেন গালে লেগে আছে সেই রং।
মালবিকা গালে হাত বোলাতে থাকে। সেই রং যেন তার সারাটা জীবনের সব বেরঙা রাস্তা রাঙিয়ে দিয়ে তার যাত্রাপথ সুন্দর করে রেখেছিল।
সেই জীবনটা হঠাৎ করেই হারিয়ে গেল।
সবকিছু পাল্টে গেল। জীবনটাই বরবাদ হয়ে গেল তার। তবু যাহোক করে কাটছিল। এই করোনা এসে একেবারেই শেষ করে দিল সবকিছু।
দিনদিন আতঙ্ক বাড়ছে মালবিকার। মায়ের দিন শেষ হয়ে এসেছে। এইভাবে আর কদিনই বা টিকে থাকবেন তিনি? জীবনের পরিণতি যে এরকম হবে, তা মালবিকা কোনোদিন ভাবতেই পারেনি।
অথচ কী সুন্দর ছিল তাদের আদ্রার জীবনটা!
বাবা অফিস যেতেন। রেল কোয়ার্টারে কত বন্ধু-বান্ধব ছিল। সে তো ছোটোবেলা থেকে কোনোদিন আসানসোলের বাড়িতে যায়নি। ঠাকুরদা বাবা-মায়ের বিয়ে মেনে নেননি বলে বাবা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। মাকে নিয়ে আর কোনোদিন সেখানে ফিরে যাননি।
মা কত কিছু ভালো-মন্দ রান্না-বান্না করতেন। সন্ধেবেলায় বাবা যখন অফিস করে বাড়ি ফিরতেন, তার জন্য কিছু না কিছু খাবার নিয়ে আসতেন হাতে করে। কোনোদিন মাছলজেন্স, কোনোদিন ভুতুকাকার দোকান থেকে গরম ইডলি। আর ছিল মঙ্গলদাদুর দোকানের গরম সেওভাজা আর বোঁদে।
কী অপূর্ব ছিল সেই স্বাদ!
মুখে যেন টের পাচ্ছে মালবিকা। জিভের ডগায় জল চলে এসেছে। মুখ চকলেই ঢোঁক গিলে মনে মনে সেই স্বাদ টের পাচ্ছিল মুখে।
আদ্রার প্রতিটি সন্ধ্যা তখন স্বপ্নময় হয়ে উঠত।
তাকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখতেন বাবা-মা! মেয়ে বড়ো হলে, কলেজ পাশ করলেই একটা রাজপুত্রের মতো পাত্র দেখে বিয়ে দিয়ে দেবেন—এই কথা যে কতবার শুনেছে সে নিজের কানে!
সেই ছোটোবেলা থেকেই সময়-সুযোগ পেলেই বাবা তার জন্য এক-এক করে গয়না গড়িয়ে রাখতেন। মা তাকে সেসব গয়না কোনোদিনই পরতে দিতেন না। মা-বাবা দুজনেই মনে মনে জানতেন, ওসব জিনিস বিয়ের সময় লাগবে। সেই উপলক্ষেই বানিয়ে রাখা।
কিন্তু তার মন বুঝত না!
মায়ের কাছে বায়না করত চুড়ি, বালা, হার পরার জন্য। পুজোয় সবাই যখন সাজুগুজু করত, তখন মালবিকা মায়ের কাছে আরও বেশি বায়না করত।
মা বলতেন, ‘না বাবা, ওসব এখন পরতে নেই। সবই তো তোর জন্য বানিয়ে রেখেছি। বড়ো হ, তারপর পরিস।’
একদিন মালবিকা নিজেও বুঝতে শিখেছিল—এসব গয়না এখন পরার জন্য মা বানাননি। সবকিছুই তার বিয়ে উপলক্ষে করা হচ্ছে।
তারপর যখন তার এই কালো অসুখ দেখা দিল, সব স্বপ্ন ভেঙেচুরমার হয়ে গেল মায়ের।
আদ্রা থেকে পালিয়ে এসেছিল যে ভয়ে, এখানেও যে সেসব ছিল না তা নয়। তবু কিছুটা শান্তি পেয়েছিল। শহরের লোকজন সবকিছু নিয়ে অতশত মাথা ঘামায় না। কিছু মনে হলেও মুখে মুখে অপমানসূচক কোনো কথা বলা কিংবা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানো তাদের স্বভাববিরুদ্ধ।
কাজেই এখানে তাকে কোনোদিন আত্মগোপন করে, মুখ লুকিয়ে ঘরের মধ্যে বসে থাকতে হয়নি। সে রাস্তাঘাটে বেরিয়েছে, বন্ধুবান্ধব হয়েছে, স্কুলে-কলেজে পড়াশোনা করেছে—কোনো বাধা হয়নি। জীবন অনেকটাই স্বাভাবিক, স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠেছিল।
কলকাতায় আসার পর বাবা অনেক চেষ্টা করেছিলেন। প্রচুর বড়ো বড়ো স্কিনের ডাক্তার দেখিয়েছেন। যে যেখানে যেতে বলেছে, সেখানেই নিয়ে গেছেন। কিন্তু ভালো হয়নি।
একসময় ওষুধ খাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছিল মালবিকা। তখন আরও বেড়ে গিয়েছিল অসুখটা। সারা গায়ে ছিটছিটে ছোপের মতো দাগ।
তেমন কষ্ট কিছু নেই। শুধু নর্মাল স্কিনের থেকে আলাদা একটা দাগছোপ। কষ্ট বলতে খুব রোদে গেলে, সরাসরি রোদটা লাগলে, তখন একটু চিড়বিড় করে চুলকায়, একটু জ্বালাজ্বালা করে। আর কেমন লালচে রং হয়ে যায়।
কিন্তু তার থেকেও বড়ো ছিল এক অদ্ভুত মনোকষ্ট—যা সারাজীবন বয়ে নিয়ে চলতে হয়েছে তাকে।
লোকসমাজে যেতে ভয়। সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের সঙ্গে মিশে কথা বলেও কিছুতেই আরাম বোধ হয় না। নিজেকে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতেই ইচ্ছে করে।
কী করে যে জীবনটা এমন শুকিয়ে যাওয়া ফুলদানির ফুলের মতো হয়ে গেল!
এই সময় একটা খকখক শব্দ শুনতে পেল মালবিকা। তাড়াতাড়ি উঠে গেল মায়ের ঘরে।
সারাদিন-রাত অসাড় হয়ে পড়ে আছেন মা। কোনো জ্ঞান নেই। ডাকলে সাড়াও দিচ্ছেন না। খাওয়া-দাওয়া প্রায় সবই বন্ধ।
এইভাবে কতদিন কঠিন এক অপেক্ষায় সময় কাটবে, কে জানে!
মালবিকা খাচ্ছে, মাখছে, টুকটাক কাজকর্ম করছে আর আতঙ্ক নিয়ে সর্বক্ষণ অপেক্ষা করছে। কাল একবার ডাক্তারকে ফোন করেছিল। যদি এসে একবার দেখে যান! যদি অবস্থার একটু উন্নতি হয়!
কিন্তু ডাক্তার সঙ্গে সঙ্গেই না করে দিয়েছেন।
বলেছেন, ‘কোনো লাভ নেই। আর কিছু করার নেই। আপনি মনকে শক্ত করুন। প্রস্তুত হোন।’
একথা শোনার পর মায়ের সারা গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে হুহু করে কেঁদেছিল মালবিকা।
মায়ের শ্বাস-প্রশ্বাসের কোনো শব্দ ছিল না। সারাবাড়িতে কোথাও কোনো রকমের শব্দ হচ্ছিল না। কিন্তু দেওয়ালঘড়ির পেন্ডুলামটা ভয়ংকর সরব হয়ে উঠেছিল।
নির্জন সেই ঘরে মালবিকার সমস্ত কান্না মিশে যাচ্ছিল ঘড়ির পেন্ডুলামের শব্দের মধ্যে।
একসময় কান্না থামাল মালবিকা। নিজেকে নিজে সান্ত্বনা দিল। নিজের মনকে শক্ত করল।
কাল সারা রাত আর ঘুমোতে পারেনি।
এই অপার, অতল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তার আর কোনো আপনজন থাকবে না—এই কথাটা ভাবতেই কেমন শূন্য হয়ে যাচ্ছিল মনটা। কেমন নিরাসক্ত, উদ্দেশ্যহীন হয়ে যাচ্ছিল তার সমস্ত অস্তিত্ব।
কেউ যেন কালো কাপড় দিয়ে তার সামনের সমস্ত যাত্রাপথ আটকে দিয়েছে।
সামনের পৃথিবীর কিছুই আর দৃশ্যমান নয়।
শুধু অনিশ্চিত, অন্ধকারময় এক অনন্ত পথরেখা…
(চলবে )



