১১ : ঊর্ণনাভ

১১ : ঊর্ণনাভ

This entry is part 11 of 17 in the series ঊর্ণনাভ

ঊর্ণনাভ

১ : ঊর্ণনাভ

২ : উর্ণনাভ

৩ : ঊর্ণনাভ

৪ : ঊর্ণনাভ

৫ : ঊর্ণনাভ

৬ : ঊর্ণনাভ

৭ : ঊর্ণনাভ

৮ : ঊর্ণনাভ

৯ : ঊর্ণনাভ

১০ : ঊর্ণনাভ

১১ : ঊর্ণনাভ

১২ : ঊর্ণনাভ

১৩ : ঊর্ণনাভ

১৪ : ঊর্ণনাভ

১৫ : ঊর্ণনাভ

১৬ : ঊর্ণনাভ

১৭ : ঊর্ণনাভ

কাকুলিয়ার রেলগেট থেকে এই রাসটুকু হেঁটে আসতেই কালঘাম ছুটে যাচ্ছে আজ! মনের যন্ত্রণা থাকলে যেমন হয়। কিছুতেই ওই চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না দিপালী। কেবল মনে হচ্ছে, আজ নয় কাল সবকিছু তো জানতেই পারবে সবাই! তখন কী করে যে মুখ দেখাবে! ভাবলেই তার কেমন গা-হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।

বেশ শান্তিতেই ছিল সে। ছেলেটা এমন করল, আর কিছু বলার মুখ রইল না তার। কী করে যে মুখ দেখাবে লোকের কাছে! তার মুখটা পুড়িয়ে দিল এই ছেলে। এতদিন ধরে কত কষ্ট করেছে সে! কোনো দিন এত ক্লান্ত লাগেনি তার। এই দুদিনেই অনেকখানি আয়ু যেন কমে গেছে। শরীর অচল হয়ে যাচ্ছে। হাত-পায়ে একটুও জোর নেই বলে মনে হচ্ছে। কী যে হচ্ছে শরীরটার ভেতরে, তা কেবল সেই জানে।

কাজকর্ম কিছু ভালো লাগছে না। সারাদিন শুধু চুপ করে বসে থাকতেই ইচ্ছে করছে তার। কোনো কাজে গা লাগছে না। দুদিন ধরে সারারাত বিছানায় শুয়ে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করেছে। একটুও ঘুম আসেনি। কিন্তু ভোরের দিকে ক্লান্ত হয়ে কখন একটু ঘুমিয়ে গিয়েছিল হয়তো।

আগে কোনো দিন এরকম হয়নি তার। সারাটা দিন কাজ করেছে, গায়ে-গতরে লাগেনি। কেমন যেন একটা হুড়োহুড়ি নিয়ে কাজ করত সবসময়। হুসহাস করে নিমেষের মধ্যে কাজ সেরে ফেলত। কাজ করতে কোনো দিন এত কষ্ট হয়নি। কোনো কাজ গায়েই লাগেনি কখনও। মনের শান্তি না থাকলে যা হয়—সবসময় যেন বিশ্বজগৎ পুড়ে ছারখার হতে থাকে। কিছুই ভালো লাগে না তখন।

এতদিন সংসারের জন্য গতরপাত করেও তার এমন কষ্ট ছিল না। এই ভয়ংকর মহামারিও তাকে এতটা কাবু করতে পারেনি। অদ্ভুত মনের জোর আর অসম্ভব সাহস তাকে শক্তি জুগিয়েছে। এমন কঠিন সময়েও ফুরফুরে মেজাজে এ-বাড়ি ও-বাড়ি করেছে। কিন্তু এখন যেন তার সমস্ত শক্তি কেউ হরণ করে নিয়েছে। কী কষ্টে যে নিজের প্রাণটাকে ধরে রেখেছে, সে নিজেই জানে।

ভেতরে ভেতরে এত টেনশন ছিল বলেই হয়তো আজ ডাক্তারদিদির হঠাৎ করে মোচা কেটে দেওয়ার কথা শুনেই এত রাগ হয়েছে। অন্য সময় হলে একটু বিরক্ত হলেও তা প্রকাশ না করে সুরসুর করে কেটে দিয়ে মুখ ভার করে বেরিয়ে আসত। কিন্তু আজ কথাটা হুট করে শুনেই মেজাজ বিগড়ে গেল। ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড রাগ আর বিরক্তিবোধ তাকে অস্থির করে দিল। অন্য সময় হলে হয়তো এতটা অধৈর্য হতো না দিপালী।

এখনও রাগে সারা শরীর জ্বালা করছে তার। সমস্ত পথটাই এটা-সেটা, ছয়-ছাপ্পান্ন চিন্তা করতে করতে এসেছে। এতটা পথ হনহন করে হেঁটে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে দিপালী।

সমস্ত রাস্তাটাই শুনশান। পথে-ঘাটে জনমানব নেই। তনু পুকুর মাঠের কাছের রাস্তার ধারে যে বড় ফ্ল্যাটটার কাজ হচ্ছিল—নতুন ফ্ল্যাট—সেটাও অসমাপ্ত পড়ে আছে। সেই বিল্ডিংয়ের নিচে বালির গাদার ওপর চার-পাঁচটা কুকুর কুঁকড়ে শুয়ে আছে। গভীর ঘুমে, না কি কঠিন দুঃখে—কে জানে! ওরা যেন নির্জীব হয়ে পড়ে আছে। চিৎকার-চেঁচামেচিও করছে না। কেমন যেন গভীর শোকমগ্ন।

স্টেশন রোড পেরিয়ে আসার সময় বাজারের মুখে দু-একজনকে দেখতে পেল। দোকানবাজার তো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একদিন করে খুলছে। তাও বেলা দশটা পর্যন্ত। কাজেই দোকানপাট বন্ধ করে এবার তারাই বাড়ি ফিরছে।

মাথার ওপর মে মাসের গনগনে সূর্য। আলো খটখট করছে চারদিকে। কিন্তু এই গভীর নির্জনতা যেন সেই তীব্র আলোর সবটুকুই গ্রাস করে নিচ্ছে। চরাচর ভীষণ অন্ধকারময় লাগছে। আলোও যে কোনো কোনো সময় এমন ভয়ংকর লাগে! এখন এই করোনা-কাল, লকডাউনের সময় তা উপলব্ধি করছে মানুষ।

অদ্ভুত কঠিন নৈঃশব্দ্যের মধ্যে ডুবে আছে জীবজগৎ। অপার অন্ধকারের মধ্যে তাদের নির্বাসন।

দিপালীর এই সমস্ত পথটাই নিজের হাতের তালুর মতো চেনা। কিন্তু এমন নির্জন, নিঃশব্দ পথ দিয়ে আগে তো কোনো দিন হাঁটেনি। তাই এখন প্রায় প্রতিদিন দুপুরবেলা, অগ্নিবর্ষী সূর্যের তাপ অগ্রাহ্য করে এ-বাড়ি ও-বাড়ি করতে করতে, সে যেন এক বিচিত্র ভ্রমণের মধ্যে দিয়ে যায়। অদ্ভুত এক অনুভূতি নিয়ে হেঁটে চলে।

সে অনুভূতি ঠিক কেমন, তা সে ব্যাখ্যা করতে পারবে না। বুকের গভীরে জমে থাকা সেই বিচিত্র বোধ মনের মধ্যে অপূর্ব এক নিবিড়তা এনে দেয়। কী অদ্ভুত আকর্ষণ এই অসীম, অতল নীরবতার!

মাঝেমাঝে এই মস্ত কদমগাছটার নিচে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে দিপালী। ঘন কদমপাতায় ঢাকা ছায়াপথ। সিমসিম করে বয়ে আসে দক্ষিণ পবন। যেন সমুদ্র থেকে উঠে আসা হাওয়া ফাঁকা রেললাইন ধরে ছুটে আসে কলকাতার বুকে।

শীতল, স্নিগ্ধ সেই বাতাস যখন তার শাড়ির আঁচল ধরে লুটোপুটি খায়, সারা গায়ে নরম অনুভূতির প্রলেপ বুলিয়ে দিয়ে আবার বহুদূরে চলে যায়, তখন দিপালীর বুকটা জুড়িয়ে যায়।

ভাবতে থাকে, সেই বাতাস যে দেশ থেকে আসে, সেই দেশ তো তারও। সেই নদীও তার। সেই নদীর জলে শৈশবের প্রতিটি দিন গামছা ছেঁকে গাঙমৌরলা ধরেছে সে। সেই নদী তার মায়ের মতো। আর যে সমুদ্রবন্দর তোলপাড় করে এই বাতাসের ছোটাছুটি, সেও তার বড় আপনজন।

এই সব ছেড়ে একদিন চলে এসেছিল সে। আর আজ সমস্ত কোলাহল মুছে ফেলে যে শহর শ্মশানের নীরবতা নিয়ে বসে আছে, সে-ই যেন গভীর সমুদ্রে দিকভ্রষ্ট নাবিকের মতো কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

তার এক পা যেন বাড়িয়ে দিয়েছে ফিরে আসার পথের দিকে। আর-এক পা কঠিন বন্ধনে বাঁধা পড়ে আছে নাগরিক শৃঙ্খলে।

কাতারে কাতারে মানুষ এখন কলকাতা ছেড়ে ফিরে যাচ্ছে তাদের দ্বীপের দেশে। করোনা এসে যেন তাদের ঘরে ফেরার ডাক দিয়েছে। পরিযায়ী জীবন থেকে তারা মুক্তি পেতে চায়। দিপালী যেন চোখের সামনে দেখতে পায় সেই বিপুল জনরাশির মহামিছিল। ধীরে ধীরে তারা নদীবন্দরে ফেরাচ্ছে তাদের জীবনতরী।

বেশ কিছুক্ষণ সময় দিপালীর কেমন ঘোর লেগে গিয়েছিল। কদমগাছের ঠান্ডা ছায়ায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কত কথাই না মনে পড়ে যাচ্ছিল!

কিন্তু আর সময় নষ্ট করলে চলবে না। সবে দুটো বাড়ির কাজ হয়েছে। এখনও তিন বাড়ির কাজ বাকি পড়ে আছে। একে একে সেগুলোও সারতে হবে তাকে।

এখন আগে দিদির কাছে গিয়ে মন খুলে কথা বলে মনটা হালকা করতে হবে। মালবিকা দিদির কথা মনে পড়তেই দিপালী যেন খানিকটা হালকা হল। দ্রুত পা চালিয়ে গলির রাস্তায় ঢুকে গেল সে।

চলবে 

ঊর্ণনাভ

১০ : ঊর্ণনাভ ১২ : ঊর্ণনাভ

Author

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

ভারতীয় ভাষায় অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ

অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা তৃষ্ণা বসাক মনে আছে নরেন্দ্র হিরোয়ানিকে? টেস্ট অভিষেকে ১৬ টা উইকেট নিয়ে হইচই ফেলে দেওয়া সেই উজ্জ্বল যুবা (সালটা ১৯৮৮

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

ভারতীয় ভাষায় অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ

অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা তৃষ্ণা বসাক মনে আছে নরেন্দ্র হিরোয়ানিকে? টেস্ট অভিষেকে ১৬ টা উইকেট নিয়ে হইচই ফেলে দেওয়া সেই উজ্জ্বল যুবা (সালটা ১৯৮৮

Read More »

কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ ষষ্ঠ পর্ব দশ সেযাত্রায় কীভাবে যে কানাইকে ঘরে ফিরিয়ে এনেছিল শম্ভুচরণ, তা সেই সময় ঠিক জানতাম না। কেউ না বললে আর জানবই বা

Read More »