ঊর্ণনাভ
ধারাবাহিক উপন্যাস
শ্যামলী রক্ষিত
দ্বাদশ অধ্যায়
কলিংবেলের শব্দ হতেই বারান্দা দিয়ে দড়িবাঁধা ব্যাগের মধ্যে চাবির গোছাটা নামিয়ে দিতে গিয়েছিল মালবিকা।
রোদের ছটা চোখে লাগতেই যেন ধাঁধিয়ে গেল দু’চোখ। সাড়ে দশটা বাজে, অথচ এমন খটখটে রোদ! বাইরের রাস্তার দিকে তাকানো যাচ্ছে না—যেন আগুনের হলকা ছড়িয়ে আছে চারদিকে।
ডানদিকের যে রাস্তাটা সুইমিং পুলের দিকে গেছে, সেইদিকে চ্যাটার্জি আন্টিকে ঝুঁকে কী যেন খুঁজতে দেখল মালবিকা। ওদিকেই একটা বিশাল কদমগাছ। তার ঘন ছায়া পথের উপর নরম অন্ধকার বিছিয়ে রেখেছে। চারপাশে বড় বড় ফ্ল্যাটবাড়ি, কংক্রিটের উঁচু দেয়াল, চকচকে জানালা—তার মাঝখানে সবুজ পাতায় ভরা সেই কদমগাছ যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো প্রাচীন রাজা, নাগরিক বিন্যাসকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে।
সেই ছায়ার দিকে তাকিয়ে মালবিকার মনে অদ্ভুত এক স্নিগ্ধতা নেমে এল। চোখ ফেরাতে পারল না সে। গ্রিলের ফাঁকে মুখ গলিয়ে, থুতনি ঠেকিয়ে নির্নিমেষ তাকিয়ে রইল বৃক্ষছায়ার জাদুবাস্তবতার দিকে।
এভাবেই কখনও কখনও তার বুকের খাঁচায় বন্দি মনটা মুক্ত হয়ে যায়। দূরের দিগন্ত ছুঁয়ে পাহাড়ের চড়াই-উতরাই বেয়ে হারিয়ে যায় কোনো অজানা প্রান্তরে। তখন সে যেন ডানা মেলা পরী।
এই অভ্যাস তার ছোটবেলা থেকেই। খুব ভালো লাগত এভাবে দাঁড়িয়ে খাঁচাবন্দি পাখির মতো মুক্তির আকাশ ছুঁতে। আদ্রায় থাকাকালীন জানলার রডের ফাঁক দিয়ে পা দুটো ঝুলিয়ে দিয়ে বসে থাকত সে। দূরে নীলচে জয়েরচণ্ডী পাহাড়ের ঢেউখেলানো টিলা দেখা যেত। কী অদ্ভুত নিবিড় ভালো লাগা ভেসে আসত সেইসব দুপুরে!
মা মজা করে বলত,
— আগের জন্মে তুই নির্ঘাত হনুমান ছিলি। তা না হলে কেউ সারাদিন এভাবে বসে থাকতে পারে?
— কী হল দিদি? ওরকম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী দেখছ?
দিপালীর গলায় বিরক্তির সুর।
— ওই চাটুজ্যে বুড়ির রগড় দেখছ? বলো তো, ওর আর কাজ কী! ছেলেমেয়েরা সব বাইরে পড়ে আছে, আর উনি এদিকে সাতমহলা বাড়ি বুকে নিয়ে পিঁপড়ের পাছা টিপে খাচ্ছেন। এমন ছেলেমেয়ে থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। একবার এসে উঁকি মারে না! মানুষটা একা একা ভূতের মতো পড়ে আছে।
দিপালীকে এত রেগে যেতে দেখে অবাক হল মালবিকা। ভালো করে তাকাল তার দিকে। মুখচোখ কেমন ঝামরে আছে। বুঝল, কিছু একটা হয়েছে।
এমনিতে ক’দিন ধরেই ওর মন ভালো নেই। ছেলেটাকে নিয়ে ভীষণ টেনশনে আছে। পরশুদিন যা বলেছিল, তা শুনে মালবিকারও বুক কেঁপে উঠেছিল।
দীর্ঘদিন ধরে ডুবে ডুবে জল খাচ্ছিল ছেলেটা—কেউ টেরই পায়নি। এখন পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেছে।
মালবিকা ভাবছিল, আসলে দোষটা কার?
করোনার পর থেকেই যেন সব ওলটপালট হয়ে গেল। এই বয়সে হাতে যদি সারাক্ষণ একটা ফোন থাকে, সঙ্গে অনন্ত ইন্টারনেট—তাহলে মাথা বিগড়োবে না তো কী হবে!
দিপালী তো সকাল আটটা-সাড়ে আটটায় বেরোয়। ফিরতে ফিরতে তিনটে-সাড়ে তিনটে। পাঁচ-ছ’টা বাড়ির কাজ করে মানুষটা। সারাদিন ছেলেমেয়ের পাশে বসে থাকবে কী করে?
ছেলেমেয়েরা ক্লাসের নাম করে ফোন নিয়ে বসে থাকে। কখনো গেম, কখনো খারাপ ভিডিও, কখনো সোশ্যাল মিডিয়া। কে দেখবে? কে বারণ করবে?
মালবিকার খুব খারাপ লাগে। একসময় কী সুন্দর পড়াশোনা করছিল দুই ভাইবোন! হোস্টেলে থাকত। মাসে মাসে দিপালী গিয়ে দেখে আসত। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল।
তারপর করোনা এল।
এখন ছেলেটা যেন অন্য মানুষ। মালবিকা একদিন ডেকেও পাঠিয়েছিল, এল না। অথচ আগে বাড়ি এলে দেখা করতই।
সব বদলে গেছে।
— কী হল? চলো এবার। এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি?
দিপালী আবার বলতে শুরু করল।
— ওই বুড়ি এখন রাস্তায় পয়সা খুঁজে বেড়াচ্ছে। একদিন নাকি দশ টাকার কয়েন পেয়েছিল। তারপর থেকে নেশা হয়ে গেছে। মাঝেমাঝেই বেরিয়ে পড়ে।
সেদিন দুপুরবেলা এই আগুনরোদে দেখলাম খুঁজছে।
আমি বললাম,
— ও মাসিমা, এই ভরদুপুরে পয়সা খুঁজছেন?
উনি হেসে বললেন,
— কী করব মা! ঘুম আসে না। সারাদিন একা থাকি। ভাবলাম, যদি পাঁচটা-দশটা টাকা কুড়িয়ে পাই!
কথাটা শুনে কেমন মায়া হল জানো?
আমি চুপিচুপি ব্যাগ থেকে একটা পাঁচ টাকার কয়েন বের করে ওনার সামনে ফেলে দিলাম। উনি খেয়াল করেননি। আমি শুধু বললাম,
— আমার মন বলছে, আজ আপনি পাবেন। ভালো করে খুঁজুন।
বলেই চলে এলাম।
মালবিকা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল দিপালীর দিকে।
ধীরে ধীরে যেন সে ডুবে যেতে লাগল দিপালীর বুকের ভিতরের সেই গভীর সরোবরে—আরও গভীরে, আরও গভীরে।
( চলবে )



