ঊর্ণনাভ
ধারাবাহিক উপন্যাস
শ্যামলী রক্ষিত
নবম পর্ব
মিতার বুকের ভেতরটা কেমন হুহু করছিল। এর আগে কোনোদিন এরকমটা হয়নি। ইদানীং কেমন একটা অপরাধবোধ তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। যা কোনোদিন তার জীবনে ছিল না, এখন তাই হচ্ছে। কারও প্রতি দুর্ব্যবহার করে ফেললে নিজেরই অনুশোচনা হচ্ছে। হ্যাঁ, তার জন্য হয়তো তার ব্যবহার পুরোপুরি পাল্টে যাচ্ছে না, আবার সে একই ভুলও করছে, কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে এই দংশন— এ তো কখনো তার অভ্যাসের মধ্যে ছিল না।
সবসময় মনে করত— আমি যা করেছি ঠিক করেছি। আমার কোনো ভুল হয়নি। জীবনে কোনো ব্যাপারে কাউকে ‘সরি’ বলেনি সে। কিন্তু বুকু বাইরে পড়তে চলে যাওয়ার পর আস্তে আস্তে কিছুটা পাল্টে যাচ্ছিল মিতা। তারপর সেই ভয়ংকর মহামারী এসে যেন সবকিছু তালগোল পাকিয়ে দিল। নির্বিষ সাপের মতো হয়ে গেছে সে। মাঝেমাঝেই মেজাজ হারায় ঠিকই, কিন্তু আগের মতো আর বেশিক্ষণ কোনো ক্ষোভ বা ক্রোধ মনের মধ্যে ধরে রাখতে পারে না।
জীবন সম্পর্কে এতদিন তার কোনো গভীর চিন্তাভাবনাই ছিল না। কোনো মানুষের প্রতিও কোনোদিন কোনো সহানুভূতি জাগেনি তার মনে। মিতার মেজাজ দেখে তার মা বারবার বলত,
— “আমার মেয়ে হয়ে তুই কী করে এমন নিষ্ঠুর প্রকৃতির হলি! একেবারে তোর বাবার মতো হয়েছিস। কিন্তু আমিও তোকে দশ মাস পেটে ধরেছি, লালনপালন করেছি, বড় করেছি। আমার কোনো একটা গুণও কি পেলি না?”
এই নিয়ে মায়ের কী আক্ষেপ, কী কষ্ট ছিল এতদিন! যার জন্য মিতাও কোনোদিন মাকে সেভাবে ভালোবাসতে পারেনি। মায়ের কাছে সে কোনোদিন কোনো সম্মান পায়নি— অন্তত তার তাই মনে হত। তার যত কথা, যত গল্প, সব বাবার সঙ্গে। আর মায়ের সঙ্গে বনতো দাদার। দাদা ছিল মায়ের চোখের মণি। আর মিতা সবসময় বাবাকেই ভয় পেত। মা বলত,
— “তোর বাবার ওই জমিদারি মেজাজ আমি সহ্য করতে পারি না। ভয়ে হাত-পা কাঁপে আমার।”
আগে আগে সে বাবার পক্ষ নিয়েই এসব এনজয় করত। মায়ের সেই করুণ, থমথমে, ভয়ার্ত মুখের ছবিটা আজও স্পষ্ট দেখতে পায় সে। সারাজীবন মা বাবাকে ভয় পেয়েছে, চুপ করে সহ্য করেছে বাবার সব অত্যাচার। আর সেই সঙ্গে সেও কি কম অত্যাচার করেছে মায়ের ওপর?
এই জায়গায় এসে থমকে গেল মিতা।
ছোটবেলার একটা ঘটনা তার মনে পড়ে গেল। তখন তার বয়স ন’দশ হবে, আর দাদার তেরো-চোদ্দ। কোনো একটা বিষয় নিয়ে বাবা-মায়ের মধ্যে প্রচণ্ড অশান্তি হচ্ছিল। কেঁদে কেঁদে মায়ের মুখ-চোখ ফুলে গিয়েছিল। দুদিন ধরে মা কিছু খায়নি। মায়ের রাগ ভাঙানোর জন্য দাদা কত চেষ্টা করছিল! মাকে একটু কিছু খাওয়ানোর জন্য আকুল হয়ে উঠেছিল সে। আর মায়ের রাগ না ভাঙাতে পেরে পরদিন দাদাও সকাল থেকে কিছু খায়নি।
দাদার কাণ্ড দেখে ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিল মিতা। তার তখন মনে হয়েছিল— আদিখ্যেতা! বাবা তোমাকে ঠিকই বলেছে! বাবা রেগে গিয়ে দুটো কথা বলেছে বলেই কি মাকে ওরকম রাগ দেখাতে হবে? যত্তসব ন্যাকামো! সেই নিয়ে কান্নাকাটি, উপোস— অসহ্য!
সেই বয়সেই মায়ের ওপর কী রাগ হয়েছিল তার! দাদাকেও খুব বিচ্ছিরি লাগছিল। তখন থেকেই যেন তাদের চারজনের পরিবারে অলিখিতভাবে দুটো ভাগ হয়ে গিয়েছিল— মা আর দাদা একদল, বাবা আর সে আরেকদল।
কী অদ্ভুত এক ঈর্ষাবোধ কাজ করত তার মনের মধ্যে! বাবা যতক্ষণ না বাড়ি ফিরত, ততক্ষণ কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগত। মাকে সে কোনোদিন ভালোবাসেনি, বরং নানাভাবে বিরক্তই ছিল। মাও সেটা বুঝত। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাঝেমাঝে বলত,
— “নিজের পেটের সন্তানই যদি না বুঝল আমায়, তাহলে আর পরের ছেলের দোষ দিয়ে কী লাভ!”
খুব ছোটবেলায় “পরের ছেলে” কথাটার মানে বুঝত না মিতা। তখন বুঝতে পারেনি মা বাবাকেই ইঙ্গিত করত। যতদিন বাবা বেঁচেছিল, ততদিন মাকে সে গ্রাহ্যই করেনি। বাবাই ছিল তার সব।
এমনকি বাবা যদি মায়ের সঙ্গে ভালোবেসে হেসে কথা বলত, ভালো ব্যবহার করত, তখনও তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক জ্বালুনি শুরু হত। এখন সে বোঝে, সেটা হিংসা ছিল। তার মনে হত, বাবা বুঝি মাকেই তার চেয়ে বেশি ভালোবাসছে। ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত ক্রোধ দানা বাঁধত। বাবা হয়তো সেটা কিছুটা টের পেয়েছিল। তাই তার সামনে মাকে তেমন পাত্তা দিয়ে কথা বলত না।
কিন্তু বুকু হওয়ার পর থেকে, যখন তার সম্পূর্ণ ভার মায়ের ওপর দিয়ে সে ডিউটিতে চলে যেত, এবং দিন দিন বুকু তার চেয়ে দিদুনের ওপর বেশি নির্ভর করতে শুরু করল, তখন থেকেই মায়ের ওপর তার মানসিকতা কিছুটা নরম হতে শুরু করেছিল। বুকুর দিদুনকে ছাড়া চলত না। তবু যতদিন বাবা বেঁচেছিল, ততদিন মাকে সে জানতে দেয়নি নিজের এই দুর্বলতার কথা।
বাবা মারা যাওয়ার পর তবে একটু স্বাভাবিক হয়েছে তাদের মা-মেয়ের সম্পর্ক। তাও হয়তো বুকুর জন্যই। এখন মায়ের জন্য যতটুকু পারে দায়িত্ব করার চেষ্টা করে, সেটাও নিজের ছেলের ঠেলায়। বুকু প্রতিদিন ফোনে প্রথমেই জিজ্ঞেস করে— দিদুন কেমন আছে। বাড়িতে মাকে ফোন করতে ভুল হলেও দিদুনকে একদিনও ফোন করতে ভোলে না সে।
মাঝেমাঝে এসব নিয়েও রাগ হত মিতার। মনে হত, মা ইচ্ছে করে ছেলেকে তার কাছ থেকে পর করে নিচ্ছে। কিন্তু সেসব ছিল সাময়িক চিন্তা— বুদবুদের মতো উঠেই মিলিয়ে যেত।
এই সবকিছুর মধ্যে আশ্চর্যভাবে তুষার কোনোদিন এক মুহূর্তের জন্যও নাক গলায়নি। কঠিনভাবে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে সবকিছু থেকে। আগে হলে এসব দিকে নজরই দিত না মিতা, কিন্তু ইদানীং এই বিষয়গুলো তাকে নাড়া দেয়। বুকের মধ্যে টুকটুক করে কেউ যেন টোকা দেয়।
নাহলে আজকের এই ঘটনাটা তাকে এতখানি আঘাত করত না। কাজের লোকের সঙ্গে ঝামেলা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবার সে একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলেছে— সেটা সে নিজেও বুঝছে। অথচ এতদিন এসব ছিল তার কাছে জলভাত। সে দুটো পয়সা বেশি মাইনে দেয় বলেই যা খুশি বলতে পারে— এমন এক অহংকার ছিল তার মধ্যে।
কিন্তু এখন অন্যরকম একটা অনুভূতি হচ্ছে। মনে হচ্ছে, যা হবার হয়ে গেছে। এখন আর ভেবে লাভ নেই। দিপালীকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আবার ফিরিয়ে আনবে। রাগের মাথায় দুটো কথা শুনিয়েছে বলে কাজ ছেড়ে দেবে, এমন বোকা সে নয়। তার ওপর ছেলেকে নিয়ে এখন ওর মনের মধ্যেও কত অশান্তি!
এখন নতুন করে আর কোনো ঝামেলা ডেকে আনতে চায় না মিতা। দিপালীকে ছাড়া চলবে না। মা তো পাগল হয়ে যাবে দিপালী ছাড়া। এদিকে তুষারও খুব রেগে যাবে। এত বড় অন্যায় সে সহ্য করবে না। এর জন্য হয়তো নিজেই কোনো শাস্তি নেবে— বাড়িতে চা খাওয়া বন্ধ করে দেবে, কিংবা অন্য কিছু।
আগে এসব নিয়ে ভাবেনি কোনোদিন মিতা। কেননা, খুব ভেতর থেকে কোনো নিবিড় ভালোবাসামাখা আন্তরিক সম্পর্ক কোনোদিন ছিল না তাদের। অদ্ভুত এক ছড়ানো, নির্লিপ্ত সম্পর্ক— তেল আর জলের মতো। কোনোদিন মিশ খায়নি।
বাইশ বছরের দাম্পত্য জীবন তাদের। কোনোদিন হেসে-ভালোবেসে দুটো কথা পর্যন্ত বলেনি তারা। কোনো বিষয়েই একমত হয়নি। তাদের সংসার চলেছে মিতার একক সিদ্ধান্তে।
প্রথম প্রথম তুষার নিজের পছন্দ-অপছন্দ জানাত, ছেলেকে নিয়ে মতামত দিত, সংসারের নানা বিষয়ে নিজের চিন্তার কথা বলত। কিন্তু মিতা সেসব কোনোদিন গুরুত্ব দেয়নি। তারপর আস্তে আস্তে তুষার একদিন সংসারের সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। নিজের মতো করে বাঁচতে শিখেছে। সংসারের ভালো-মন্দ কোনো কিছুতেই আর মাথা ঘামায় না সে।
কেমন শুকনো বৃক্ষের ডালের মতো সংসারের গায়ে লেগে আছে শুধু। আর কোনো ভূমিকা পালন করে না। সেও আর কিছু করার চেষ্টা করে না। অনেকদিন ধরেই এসব গা-সওয়া হয়ে গেছে সবার কাছে।
ব্যাপারটা বরং ভালোই লেগেছিল মিতার। কারণ, তুষার কোনো বিষয়ে কথা বলতে এলেই সংসারে অশান্তি হত। এখন আর সেসব নেই। তুষার নিজের কাজ নিয়েই বেঁচে আছে— হাসপাতালের ডিউটি, নিয়ম করে কলকাতার বিভিন্ন বস্তিতে রোগী দেখা, বিশেষ করে বাড়ির কাছের বস্তিগুলোর মানুষদের দেখভাল করা।
সংসারের কোনো সুখবর যেমন তাকে খুব আনন্দ দেয় না, তেমনি কোনো গভীর দুঃখও তাকে সেভাবে স্পর্শ করে না। শুধু ছেলেকে নিয়ে কিছু হলেই তুষার প্রচণ্ড কষ্ট পায়। গুম হয়ে বসে থাকে। তার রগের শিরা ফুলে ওঠে। রগের দু’দিকে দপদপ করতে দেখে মিতা। আর সেটা দেখলেই বুকের মধ্যে চিনচিনে একটা ব্যথার ঢেউ ওঠে তার।
কিন্তু এসবও সে আগে বুঝতে পারেনি। এখন ইদানীং চোখে পড়ে।
দিপালীর ব্যাপার নিয়েও তুষার রেগে গেছে। আর দিপালীর জন্য এখন এই মুহূর্তে তার নিজেরও মন খারাপ লাগছে। বুকু বাইরে চলে যাওয়ার পর থেকেই এই পরিবর্তনটা সে টের পাচ্ছে। তার ওপর করোনার আবির্ভাব— এই দুটো জিনিস যেন আমূল পাল্টে দিয়েছে তাকে।
তার সমস্ত অহংকার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
মিতা এখন যেন সম্পূর্ণ পাল্টে যাওয়া এক মানুষ। নিজের এই পরিবর্তন দেখে নিজেই অবাক হয়ে যায়। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ।



