৩ : ঊর্ণনাভ

৩ : ঊর্ণনাভ

This entry is part 3 of 17 in the series ঊর্ণনাভ

ঊর্ণনাভ

১ : ঊর্ণনাভ

২ : উর্ণনাভ

৩ : ঊর্ণনাভ

৪ : ঊর্ণনাভ

৫ : ঊর্ণনাভ

৬ : ঊর্ণনাভ

৭ : ঊর্ণনাভ

৮ : ঊর্ণনাভ

৯ : ঊর্ণনাভ

১০ : ঊর্ণনাভ

১১ : ঊর্ণনাভ

১২ : ঊর্ণনাভ

১৩ : ঊর্ণনাভ

১৪ : ঊর্ণনাভ

১৫ : ঊর্ণনাভ

১৬ : ঊর্ণনাভ

১৭ : ঊর্ণনাভ

শ্যামলী রক্ষিত 

তৃতীয় পর্ব 

মিতা রান্নাঘরেই ছিল। 

দিপালীর সঙ্গে কথাকাটাকাটি হওয়ার পর থেকেই তার নিজের ভেতরটা খুব খারাপ লাগছিল। টেনশনও হচ্ছিল ভীষণ। সত্যিই সত্যিই যদি দিপালী কাজ ছেড়ে দেয়! এখন এই সময় নতুন করে লোক খুঁজে পাওয়া কি আর মুখের কথা! তার ওপর নতুন লোকের হ্যাপা নিয়ে কত ঝামেলা! দিপালীর মতো কাজের লোক পাওয়া দুষ্কর। সত্যিই তার ভুল হয়ে গেছে। ওইভাবে বলা ঠিক হয়নি।

তার নিজের যেমন-তেমন, কিন্তু মায়ের দিকটা তো আগে ভাবতে হবে। বলতে গেলে দিপালীর ভরসাতেই সে অনেকটা নিশ্চিন্ত। দোকানবাজার, ওষুধ—কোনো দিকেই নজর দিতে হয় না। অসুখ-বিসুখ করলে দরকার হলে রাত পর্যন্ত থেকে যায় দিপালী। যেমন বিশ্বাসী, তেমনি কাজের মেয়ে। সবচেয়ে বড় কথা, মুখরা নয়, বেজার-বিরক্ত হয় না। খুঁজে মরলেও আর দিপালীর মতো একটা কাজের লোক পাবে না।

এর আগেই মাকে অনেক করে বলেছিল—একটা খাওয়া-পরা দিনরাতের লোক রাখি। কিন্তু মায়ের সেই এক কথা—দিপালী থাকলেই হবে, আর কোনো লোক চাই না। তুই বরং ওকে দুটো পয়সা মাইনে বাড়িয়ে দে। ও যেন ছেলেমেয়ে নিয়ে ভালো থাকে।

মিতা এটা স্পষ্ট জানে—মা তার চেয়েও বেশি দিপালীকে চায়। চোখ বুজেও ওর ওপর ভরসা করতে পারে। নিজের মেয়ের ওপরও এতটা নির্ভরতা নেই। দিপালী ছাড়া মাকে বাঁচিয়ে রাখা মুশকিল।

বুকটা চিনচিন করছিল মিতার। সে বুঝতে পারছিল—সে খুব অন্যায় করে ফেলেছে। ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত, সামান্য মোচা কাটাকে কেন্দ্র করে এত বড় ঝামেলা করেছে—যার কোনো দরকারই ছিল না। মোচা ঘণ্টাখানেক খেলেই বা কী ক্ষতি হত! খামোখাই এত কাণ্ড!

কিন্তু এখন এসব ভেবে কী লাভ? হাতের ঢিল একবার ছুড়ে ফেললে আর ফিরিয়ে আনা যায় না। কাজেই ওকে একটু বুঝিয়ে বলতে হবে। সত্যিই তারও ওইভাবে বলা ঠিক হয়নি।

ভেতরে ভেতরে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা হচ্ছিল মিতার। মানুষের মন তো সব সময় একরকম থাকে না। কদিন ধরেই সে দেখছে, দিপালী যেন একটু অন্যরকম। কেমন চিন্তাগ্রস্ত লাগে। একবার জিজ্ঞেস করবে ভেবেও করেনি। তার ওপর আবার এমন কাণ্ড!

ছিঃ! নিজের ওপরই রাগ হচ্ছিল।

বাই চান্স যদি দিপালী কাজ ছেড়ে দেয়, তাহলে তো দু’বাড়ির কাজই ছেড়ে দেবে। তখন কী হবে, মিতা ভালো করেই জানে। মা দিপালীকে না পেলে হার্ট ফেল করবে। অন্য কারও ওপর ভরসা করবে না।

কেন যে মাথাটা এমন গরম হয়ে যায়, বুঝতে পারে না। একটুতেই হুট করে মাথা গরম করা ঠিক নয়—এই কথা মা কতবার বুঝিয়েছে। কিন্তু সে সব কথা এক কান দিয়ে ঢুকে আরেক কান দিয়ে বেরিয়ে যায়।

এই যে সকালটা ঘেঁটে গেল—সেটা তো পুরোপুরি নিজের দোষেই।

কিচ্ছু ভালো লাগছিল না মিতার। চারিদিকের পরিস্থিতিও ভয়ংকর। এমনিতে মন-মেজাজ ভালো নেই, তার ওপর সে নিজেই উটকো ঝামেলা ডেকে আনল।

নিজের পায়ে কুড়ুল মারা আর কাকে বলে!

সকালবেলা মেয়েটাকে খামোখা মুখ শুনিয়েছে। দিপালী তো কোনো ভুল কথাই বলেনি। এখন ভীষণ খারাপ লাগছে।

কাজ সেরে চলে যাওয়ার পর থেকেই মনে হচ্ছে, সে ভুল করেছে। একবার ফোন করবে ভাবলেও পারছে না। এখন করে কোনো লাভ নেই। দিপালীর কাছে ফোন থাকে না। ফোন নিলে নষ্ট হয়ে যায়—তাই বাড়িতেই রেখে বেরোয়। কাজেই সব বাড়ির কাজ সেরে ফিরলেই কেবল ফোনে পাওয়া যাবে।

ততক্ষণ অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

ভয়ে বুক ধুকধুক করছিল মিতার।

দিপালী যাওয়ার সময় আঁচলে হাত মুছতে মুছতে গায়ের কাপড় ঠিক করে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনও গজগজানি শুনতে পেয়েছিল সে—

“এর চেয়ে না খেতে পেয়ে মরাও ভালো! দরকার নেই বেশি মাইনের। অত মেজাজ সহ্য করব না।”

বলেই দরাম করে দরজা বন্ধ করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। হাওয়াই চটির ফটফট শব্দ তুলতে তুলতে চলে গেল দিপালী।

তখন রাগে মিতার মাথায় আগুন জ্বলে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল—কাজ করতে হবে তো কে যা! ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হবে না!

কিন্তু দিপালী অদৃশ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাগ পড়ে যায়। তখন থেকেই দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে।

এদিকে তুষারের কানে নিশ্চয়ই সব গেছে। এমনিতেই শান্ত স্বভাবের মানুষ তুষার। গরিব-দুঃখী মানুষের প্রতি তার ভীষণ মায়া। দিপালীকে খুব পছন্দ করে। কাজের লোক হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখে।

এই কথা যদি ওর কানে যায়, তাহলে নিশ্চিত রেগে যাবে।

এখন ভয়েই আছে মিতা—কী আবার হবে কে জানে!

যাই হোক, আগে রান্নাঘরের কাজ সারা যাক। তারপর যা হবে দেখা যাবে। কদিন ধরে ভীষণ গরম পড়েছে। রান্নাঘরে টেকাই দায়। কলকল করে ঘাম হচ্ছে।

তাড়াতাড়ি রান্না শেষ করে স্নান করলে একটু শান্তি মিলবে। কিন্তু আজ আর নিশ্চিন্তে বসতে পারবে না। যতক্ষণ না দিপালীর সঙ্গে কথা হচ্ছে, ততক্ষণ শান্তি নেই।

এর মধ্যেই তুষার উঠে পড়বে। চা চাইবে, তারপর জলখাবার। জলখাবার বানানো আরেক ঝামেলা। রান্না করতে এমনিতেই তার ভালো লাগে না। করোনা কালের পর থেকেই বাধ্য হয়ে সব করতে হচ্ছে।

ভাবতে ভাবতে সুজির কৌটো চোখে পড়ল। ঠিক করল—আজ সুজির উপমা বানাবে। তুষার পছন্দ করে, ঝামেলাও কম।

উপমা বানিয়ে টেবিলে রেখে এসে দেখে—তুষার ঘুম থেকে উঠে ফোলা চোখে কটকট করে তাকিয়ে আছে। বুঝতে পারল, সবটাই শুনেছে।

ভেতরে ভেতরে রেগে আছে।

আর এমনিতেই সময়টা যাচ্ছে ভীষণ চাপের মধ্যে। সুদীপার মৃত্যু সবাইকে একেবারে স্তব্ধ করে দিয়েছে। সারা হাসপাতাল কেমন থমথম করছে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে আনাচে-কানাচে।

মিতার সারাক্ষণ মনে পড়ছে সুদীপার হাসিভরা মুখটা। চার বছরের একটা বাচ্চার মা। নার্সিং স্টাফ। কী প্রাণবন্ত মেয়ে ছিল! প্রথম করোনার সময় প্রায় একাই সামলেছে হাসপাতাল।

একদিন মিতা ওকে ডেকে বলেছিল—

“বাড়িতে তোমার ছোট বাচ্চা আছে সুদীপা। এত রিস্ক নিও না। নিজের যত্ন নাও।”

সুদীপা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল—

“আমার কিছু হবে না দিদি। আমি ঠিক থাকব।”

আজও সেই কথাগুলো মনে পড়লে বুকের ভেতর হাহাকার করে ওঠে।

(চলবে )

ঊর্ণনাভ

২ : উর্ণনাভ ৪ : ঊর্ণনাভ

Author

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

ভারতীয় ভাষায় অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ

অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা তৃষ্ণা বসাক মনে আছে নরেন্দ্র হিরোয়ানিকে? টেস্ট অভিষেকে ১৬ টা উইকেট নিয়ে হইচই ফেলে দেওয়া সেই উজ্জ্বল যুবা (সালটা ১৯৮৮

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

ভারতীয় ভাষায় অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ

অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা তৃষ্ণা বসাক মনে আছে নরেন্দ্র হিরোয়ানিকে? টেস্ট অভিষেকে ১৬ টা উইকেট নিয়ে হইচই ফেলে দেওয়া সেই উজ্জ্বল যুবা (সালটা ১৯৮৮

Read More »

কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ ষষ্ঠ পর্ব দশ সেযাত্রায় কীভাবে যে কানাইকে ঘরে ফিরিয়ে এনেছিল শম্ভুচরণ, তা সেই সময় ঠিক জানতাম না। কেউ না বললে আর জানবই বা

Read More »