৪ : কালের প্রহরী

৪ : কালের প্রহরী

পাঁচ

ঘোষালবাড়ির নিয়মরীতি ঠিক পছন্দ নয় কানাইচরণের। মহাজনি কারবার তাদের পারিবারিক ব্যবসা, কিন্তু পরিচিত মহলে সে পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করে কানাই। বুইতা থেকে সে ছাড়া আর কোনো ছাত্র নেই, যে প্রাণকৃষ্ণ উচ্চ ইংরাজি বিদ্যালয়ে পড়তে আসে। সেজন্য অবশ্য তার কোনো অহংকারের জন্ম হয়নি। দাদা বিলেতে পড়াশোনা করতে গেছে—এ গল্পও কানাই কখনও কোনো সহপাঠীর কাছে করেনি।

কোথাও কোনো অন্যায় হয়েছে শুনলে প্রতিবাদে এগিয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে এই বয়সেই। লালমুখো ইংরেজ সাহেব কিংবা গোরা পুলিশের ওপর তার খুব রাগ। রাগের কারণ অবশ্য সবাই ঠিকমতো জানে না। তবে স্কুলে বেশ ভালো ছাত্র হিসেবেই পরিচিতি লাভ করেছে কানাই।

ইতিহাসের শিক্ষক অমিয়বাবু—অমিয়ভূষণ ভট্টাচার্যের বিশেষ স্নেহের পাত্র কানাইচরণ। মাঝেমধ্যেই আলাদা করে ডেকে কথা বলতেন কানাইয়ের সঙ্গে। এ নিয়ে ছাত্রমহলে বিভিন্ন রকমের কানাঘুষোও চলত। তবে খুব বেশি হইচই হয়নি কখনও।

শোনা যায়, অমিয়বাবু নাকি গোপন বিপ্লবী দলের লোক। তাই বেছে বেছে ছেলে ধরে মগজধোলাইয়ের কাজ করেন। কানাইকেও কি তিনি দলে টানতে চান? ঠিক বোঝা যায় না। তবে মাঝেমধ্যেই স্কুলছুটির পর কিংবা ছুটির দিনে কানাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন এদিক-ওদিক।

সেদিন বজবজ স্টেশনের পাশের মাঠে গিয়ে কয়েক ঘণ্টা বসেছিলেন দুজনে। অমিয়বাবু শুনিয়েছিলেন কোমাগাতা মারুর সেই কাহিনি। বছর তিনেক আগে ঘটে যাওয়া হাড়হিম করা ঘটনার বিবরণ তন্ময় হয়ে শোনে কানাই। ঘটনাস্থলে বসে সে কাহিনি শুনতে শুনতে কানাইয়ের চোখ দিয়ে কখনও আগুন ঝরে, আবার কখনও চোখের কোণে চিকচিক করে ওঠে জলের ফোঁটা।

—স্যার, গুরদিত সিং তাহলে কোথায় গেলেন? ওঁর কি কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি আজ পর্যন্ত? —প্রশ্ন করে কানাই।

অমিয়বাবু বললেন,
—যতদূর জানি, সেদিন তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে কাঁধে করে উঠিয়ে প্রথমে ঝোপের মধ্যে গা-ঢাকা দেন। অনুগামীদের মত ছিল, দলনেতাকে জীবিত রাখা খুব প্রয়োজন। যাতে পরবর্তী কালে তিনি দেশের মানুষের মধ্যে এই ব্রিটিশ সরকারের কদর্য চেহারাটা তুলে ধরতে পারেন। তাই স্থানীয় মানুষের সাহায্যে একটি বাড়ির পিছনের বাগানে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে লুকিয়েছিলেন সেই রাতে। যদিও পুলিশ আশপাশের সমস্ত বাড়িতে তল্লাশি চালায়, কিন্তু তাঁকে খুঁজে পায়নি।

পরে গভীর রাতে ছদ্মবেশে গঙ্গা পেরিয়ে তিনি পৌঁছে যান বাউড়িয়ায়। সেখান থেকে হাওড়া স্টেশন হয়ে কুলির বেশে চলে যান উড়িষ্যায়। পরে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় তিনি আত্মগোপনে আছেন। শুনেছি, গান্ধিজির সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎও করেছেন। গান্ধিজি নাকি পরামর্শ দিয়েছেন পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণের।

—আপনি কী বলেন, স্যার? তাঁর কি আত্মসমর্পণ করা উচিত?

—না, একদমই না।

—আমারও তাই মত। স্যার, সেদিনের পর এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

সংবেদনশীল ছাত্র কানাইচরণের এই প্রশ্নের মধ্যে লুকিয়েছিল এক নিখাদ দেশপ্রেমিকের আবেগ। কোমাগাতা মারুর সেই দেশপ্রেমিকদের এমন নির্মম পরিণতির কথা শুনে ভিতরে ভিতরে সে যে যথেষ্ট উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল, তা স্পষ্ট বুঝতে পারলেন অমিয়বাবু।

বললেন,
—চলো কানাই, অনেকক্ষণ আমরা বসে আছি। এবার একটু হাঁটা যাক।

হাঁটতে হাঁটতে দুজনে এলেন গঙ্গার দিকে। সেটা পোর্ট কমিশনের সংরক্ষিত অঞ্চল। যদিও পায়ে হেঁটে গঙ্গার হাওয়া খেতে বাধা নেই, তাই নদীর পাড় ধরে তাঁরা হাঁটতে শুরু করলেন। আর অমিয়বাবু শোনাতে থাকলেন ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯১৪-র সেই রক্তাক্ত দিনের পরবর্তী ঘটনাক্রম।

সেই নৃশংস হত্যালীলার পর শুরু হল ব্যাপক তল্লাশি আর ধরপাকড়। বজবজের বিভিন্ন জায়গা থেকে গ্রেফতার করা হয় প্রায় নব্বই জনকে। তাছাড়া বেহালা, মেটিয়াব্রুজ, গার্ডেনরিচ, একবালপুর, বিষ্ণুপুর, ডায়মন্ড হারবার—এমনকি সুদূর বাঁকুড়া থেকে খুঁজে খুঁজে গ্রেফতার করা হয় মোট দুইশো একুশজনকে, যাঁরা ছিলেন সেই জাহাজের যাত্রী।

৩০ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশের বাংলা সরকারের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, মোট ১৩০ রাউন্ড গুলি চালিয়েছিল পুলিশ আর সেনারা। কিন্তু আশপাশের মানুষের কথায়, গুলি চলেছিল তার চেয়ে অনেক বেশি। এর প্রতিবাদে ১৫ অক্টোবর লাহোরে অনুষ্ঠিত হয় এক বিশাল প্রতিবাদসভা।

উত্তেজনায় ফুটতে থাকা কানাই প্রশ্ন করে,
—স্যার, আমাদের বাংলায় তেমন কোনো প্রতিবাদ হল না?

কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন ইতিহাসের শিক্ষক। তারপর মাথা নেড়ে বললেন,
—একেবারে কিছু হল না, তেমনটা নয়। খবরের কাগজগুলো তো প্রচুর লেখালিখি করল। দু-একটা প্রতিবাদসভাও তো হল। তবে সবচেয়ে জোরালো প্রতিবাদ করলেন স্বয়ং রবিবাবু—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করে উঠল কানাইয়ের চোখজোড়া। তার জিজ্ঞাসু চোখের দিকে তাকিয়ে অমিয়বাবু বললেন,
—নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরে অনেক দেশের মতোই কানাডা সরকারও রবিবাবুকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল সেদেশে ভ্রমণের জন্য। কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন সে আমন্ত্রণ। রবিবাবু স্পষ্ট দাবি করেছেন, ব্রিটিশ কলম্বিয়াকে এই ঘটনার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে। এর চেয়ে বড় প্রতিবাদ আর কী-ই বা হতে পারে, বলো?

কানাইচরণের চোখ-মুখের সেই অভিব্যক্তি দেখে তার পিঠে স্নেহের হাত বুলিয়ে দিলেন অমিয়বাবু। বললেন,
—আজ অনেকটা দেরি হয়ে গেল, কানাই। এবার বাড়ি ফেরা উচিত। তোমার বাড়ির লোকেরা নিশ্চয়ই চিন্তা করছেন। আজ যাও, আর একদিন এখানে আসব। সোজা তাকাও, কানাই। ওই যে চটকলের পাঁচিল দেখছ, ঠিক ওই জায়গাতেই চাপা পড়ে আছে এক লজ্জার ইতিহাস। আমরা কোটি কোটি ভারতবাসী এই যে পরাধীনতার অভিশাপ বহন করে চলেছি এতগুলো বছর ধরে, তার গোড়ার কাহিনি।

—মানে, পলাশির যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত?

—কানাই, পলাশির যুদ্ধটা হয়তো হতোই না, সেদিন যদি…

আগুন জ্বলে উঠল কানাইয়ের চোখে। উত্তেজনায় তার ভিতরটা যে কাঁপছে, বেশ বুঝতে পারেন অমিয়বাবু। হয়তো এমনটাই তিনি চাইছিলেন। তাই তিনিও দৃশ্যতই বেশ খুশি। কিন্তু মুখে বললেন,

—উঁহু, আজ নয় কানাই। আজ বাড়ি যাও। অন্য একদিন আসা যাবে।

ছয়

সকালবেলায় গৌরবদ্যির দালানে হাজির জনা চারেক রোগী। একসঙ্গে চারজন রোগীর অপেক্ষা করা শেষ কবে দেখেছে, মনে পড়ে না গৌরের। গৌরের বউ মৃণালের খুশির পারদটাও তাই আজ বেশ ঊর্ধ্বগামী।

সকাল সকাল বাসি পাট সেরে, চান করে ভিজে কাপড়ে পুকুর থেকে এক কলশি জল নিয়ে উঠোনে পা দিয়েছে। অমনি চোখে পড়ল, সদর দরজা দিয়ে বংশী ঢুকছে বাড়িতে।

বংশীকে দেখেই মৃণালের মেজাজটা গেল চটকে।

‘ও পোড়ামুখো আবার কী করতে সকালবেলায় ভিটেতে এলো!’—মনে মনে বলে মৃণাল। সকালবেলায় ঠাকুরের পায়ে একটু চন্দন-তুলসী চড়িয়ে কোথায় পেন্নাম করবে, তা নয়। কোথা থেকে অনামুখো বংশী মাঝিটা এসে হাজির!

মনে মনে গজগজ করতে করতে ঠাকুরঘরে ঢোকে মৃণাল। ভিজে কাপড়েই একটা বড়সড় পেন্নাম করে ঘরে আসে কাপড় ছাড়তে।

গৌর চারজন রোগীর সঙ্গেই একবার করে প্রাথমিক কথা বলে নিয়েছে।

কাল চাল কুটতে গিয়ে ঢেঁকিতে পড়ে ডান হাতের কবজি ফুলে ঢোল হয়ে আছে কুব্জার। চুন-হলুদ লাগিয়ে পানপাতা বেঁধে রাতটা কোনো রকমে কাটিয়েছে। ব্যথার চোটে দু-চোখের পাতা এক করতে পারেনি সারা রাত। তাই ভোর থাকতেই হাজির হয়েছে বদ্যিবাড়িতে। গৌর তার জন্য মলম তৈরি করছে।

শিবুর ছেলের ধুম জ্বর। জলপট্টি লাগিয়ে, বারবার মাথা ধুয়েও কমছে না। কানু এসেছে মায়ের বাতের ব্যথার ওষুধ নিতে।

বিষ্টুর ছেলেকে নিয়ে এসেছে ললিতা। রাতে এক থালা পিঠে খেয়ে পেট ফেঁপে ঢোল হয়ে আছে তার। সৎছেলে কষ্টে ছটফট করলে পাড়ার লোকে মন্দ বলবে, তাই সকাল হতেই তাকে নিয়ে চলে এসেছে বিষ্টুর বউ।

সকালবেলায় রোগী বাড়লে প্রহ্লাদকে কাছে ডেকে নেয় গৌর। একটু একটু করে বিদ্যা শেখার পরামর্শ দেয় ছেলেকে।

রোগীর নাড়ি টিপে রোগনির্ণয় করা তো আর চাড্ডিখানি কথা নয়। এ শিক্ষা একদিনে শেখাও যায় না। তার জন্য চাই সাধনা। ধৈর্য আর অধ্যবসায় ছাড়া এ বিদ্যা আয়ত্ত হয় না।

নিত্যদিন গৌর টিকটিক করে ছেলের পেছনে,

‘আমরা পাঁচ পুরুষের বদ্যিরেখোকা। এ বিদ্যা আমাদের বংশে ঈশ্বরের দান। বিদ্যাশিক্ষা করতে হলে ঈশ্বরকে তুষ্ট করেই শিক্ষাগ্রহণ করতে হয়।’

কিন্তু কে কার কথা শোনে! প্রহ্লাদের সেদিকে খুব একটা ঝোঁক আছে বলে তো মনে হয় না। ছেলের কেবল উড়ুউড়ু মন।

যাই হোক, আজ বড় হামানদিস্তায় তাকে বসিয়ে দিয়েছে চূর্ণ করতে। নিজে খল-নুড়ি নিয়ে শেকড়বাকড়ের মলম তৈরির ফাঁকে বংশীকে দেখে বলে উঠল,

—কী ব্যাপার বংশী, হঠাৎ এই গেঁয়ো কোবরেজের কাছে কেন রে? কী হল? মিনসিপাল্টির হাসপাতাল কি ওষুধ দিচ্ছে না নাকি?

বংশী বুঝতে পারে গৌরবদ্যির হুল ফোটানোর কারণ। তার বউয়ের বমির সময় ছোট ঠাকুর বলেছিল,

‘এ কম্ম কোবরেজের নয় রে বংশী। তাড়াতাড়ি পঞ্চু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যা। নাহলে মিনসিপাল্টির হাসপাতালে নিয়ে যা। বেঁচে যাবে।’

তড়িঘড়ি গরুর গাড়ির ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন ছোট ঠাকুর। তাই বজবজের হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে জ্যান্ত মানুষটাকে ঘরে ফিরিয়ে আনতে পেরেছিল সে যাত্রায়।

মেয়েটা আজ দুদিন ধরে জ্বরে পড়ে আছে, তাই ওষুধ নিতে আসতে দেখেই জ্বলে উঠেছে গৌরবদ্যি।

শান্তস্বভাবের নিরীহ মানুষ বংশী মাঝি বলল,

—গৌরদা, কাজলি টা জ্বরে পড়েছে আজ দুদিন। গা-হাতে খুব ব্যথা, বিছানা থেকে উঠতে পারছে নে গো। একটু ভালো করে ওষুধ দাও দিকিনি।

কাজলির নাম শুনে হামানদিস্তায় শব্দটা একটু মৃদু হয়ে আসে। গৌর বলে,

—তা হাসপাতালের ডাক্তাররা কি আজকাল জ্বরের চিকিৎসে করছেন না? নাকি বিলিতি চিকিৎসেতে আর ভরসা নেই, বংশী?

বদ্যির কথা শুনে সবাই একটুখানি আমোদ অনুভব করে। কারও কারও ঠোঁটের কোণে খেলে যায় হালকা হাসি।

মস্করার পাত্র হচ্ছে বুঝেও বোকার মতো দালানে উঠে মাদুরের ওপর বসে পড়ে বংশী। প্রহ্লাদের কপালে ভাঁজ পড়ে। বংশীর মুখে কাজলির জ্বরের কথা শুনে ছেলেটা যে চিন্তিত হয়ে পড়েছে, তা বেশ বুঝতে পারে গৌর।

প্রহ্লাদকে বলে,

—যা, ঘর থেকে মকরের ধ্বজের বয়েমটা নিয়ে আয় তো।

সাত

সে বছর ধানের ফলন বেশ ভালো হল। মাঠের নধর চারাগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল। কার্তিকের হালকা হাওয়ায় ঢেউ খেলে যায় খেতে। সদ্য দুর্গাপুজো মিটেছে, স্কুলেও ছুটির আমেজ। তাই রবিবারের এই দুপুরে অমিয়বাবু আর কানাইয়ের অভিযান নদীর পাড়ে।

সকাল সকাল বেরিয়ে বুইতা থেকে কানাই চলে আসে বজবজ রেলস্টেশনের কাছে। গুরুশিষ্যের এই অভিযান নেহাত উদ্দেশ্যহীন নয়। এক টুকরো ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার বাসনা আর দেশপ্রেমের তালিম দেওয়াই লক্ষ্য অমিয়বাবুর। অন্যদিকে নিজের জন্মস্থানের আশপাশের ইতিহাস জানার অনন্ত ইচ্ছা আর দেশকে বোঝার আকাঙ্ক্ষা কানাইচরণের।

পোর্ট কমিশনের এই সংরক্ষিত এলাকায় গঙ্গার ধারে ঘোরাঘুরি করার নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও সারাক্ষণ বন্দুকধারী গোরা পুলিশের নজরদারি থাকে। অমিয়বাবু ভালোই জানেন, পুলিশের আচরণ এখানে মোটেই মানবিক নয়। তাদের মর্জি হলেই যে কোনো নেটিভকে যখন-তখন ধরে নিয়ে যাবে পোর্টের থানায়। তারপর ফাটকে আটকে অত্যাচার, মিথ্যা মামলায় জেরবার করার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। তাই কানাইকে নিয়ে গঙ্গার পাড়ে বেড়াতে এলেও সতর্ক দৃষ্টি রেখে চলেছেন তিনি।

—ওই যে দেখছ বড়ো পাঁচিল, ওর ভিতরে যে কুঠিগুলো দেখা যাচ্ছে, সব এই চটকলের সাহেবদের থাকার জায়গা। প্রত্যেকটি কুঠিতে আছে বিপুল বিলাসিতার ব্যবস্থা। ওরাই চটকলের মজুরদের সঙ্গে প্রতিদিন করে পশুর মতো ব্যবহার। জানো কানাই, মুখের রক্ত তুলে অমানুষিক পরিশ্রম করে সাহেবদের লাভের কড়ি ঘরে তুলে দেয় এই মজুর আর কুলিরা। বিনিময়ে ওরা যা পায়, তাতে সুস্থভাবে বেঁচে থাকা যায় না।

গঙ্গার পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে কথাগুলো বললেন অমিয়বাবু।

—স্যার, এই মজুররা থাকে কোথায়? —প্রশ্ন করে কানাই।

—ওদের থাকার জায়গাটা যদি তুমি দেখ, বুঝতে পারবে কী অমানুষিক জীবন ওরা যাপন করে। কারখানার পিছন দিকে মজুরদের বস্তি আছে। ছোটো ছোটো খুপরি ঘরে পশুর মতো থাকতে হয় ওদের। ঘরের সামনেই কাঁচা নর্দমা। দুর্গন্ধময় সেই নর্দমার সামনেই থাকা, খাওয়া, বসবাস—এইসব মজুরদের। এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে মজুররা।

—স্যার, সেখানে কি আমরা যেতে পারি না?

—হ্যাঁ, কেন পারি না? নিশ্চয়ই পারি। কিন্তু কানাই, আজ তো আমরা এখানে এসেছি অন্য উদ্দেশ্যে। তোমাকে এ দেশের এক কলঙ্কিত ইতিহাসের মুখোমুখি করাব বলে। তাই আজ যদি আমরা মজুরবস্তির দিকে যাই, তাহলে যে সেই ইতিহাসের পাতাও ওল্টানো হবে না!

—ঠিক আছে, স্যার। তবে তাই হোক। আজ আমরা সেই ইতিহাসের সামনেই বসি।

কানাইকে নিয়ে গঙ্গার পাড় ধরে হাঁটতে লাগলেন অমিয়বাবু। এগিয়ে চললেন বজবজ জুটমিলের ফটকের দিকে।

এখানে কোনো মজুরের দেখা পাওয়া যাবে না। আসলে এদিকটায় মূল কারখানার বাইরে ব্রিটিশ কর্মীদের থাকার জায়গা। বড়ো বড়ো সব কুঠিবাড়ি। সেসব বাড়ির স্থাপত্যশৈলী দেখে অবাক হতে হয় বইকি। ইউরোপীয় আদলে বড়ো বড়ো খিলান আর সুবিশাল নির্মাণ স্থানীয় বিত্তশালীদের প্রাসাদের থেকে অনেকটাই ভিন্ন।

পাঁচিলের ভিতরে সবচেয়ে বড়ো আর বিলাসবহুল এক কুঠি আছে, নাম যার হরলক্কা। সে কুঠির কারুকাজ আর ভিতরের বার্মাটিকের আসবাবপত্র নাকি মহামূল্যবান। একসময় কলকাতা হাইকোর্টের দুই বিচারপতি তৈরি করেছিলেন এই হরলক্কা। প্রকৃতির কাছাকাছি, নদীর ধারে নির্জনে বসবাসের উদ্দেশ্যে তাঁরা তৈরি করেছিলেন এই কুঠি।

এখানে বেশ সুখেই ছিলেন প্রধান বিচারপতি বার্নেস পিকক ও দায়রা জজ লুই জ্যাকসন। প্রতিদিন ঘোড়ার গাড়ি চড়ে যেতেন কলকাতায়। আবার আদালত শেষ করে ফিরে আসতেন এই হরলক্কায়।

১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড মেয়ো আন্দামান পরিদর্শনে গিয়ে খুন হলেন। নির্জন সমুদ্রতীরে তাঁকে খুন করল এক দণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত কয়েদি। যে ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল এ দেশে বসবাসকারী সমস্ত ব্রিটিশকে। যারা বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করত, আতঙ্কিত হয়ে পড়ল সবাই।

হুগলি নদীর তীরে বিভিন্ন জায়গায় এমন বেশ কিছু কুঠি গড়ে উঠেছিল। সেইসব বিলাসবহুল কুঠি ছেড়ে আতঙ্কিত ইংরেজরা চলে গেল কলকাতার ফিরিঙ্গিপাড়ায়। তখন এই হরলক্কা কুঠিও বিক্রি হয়ে গেল।

লন্ডনের বিখ্যাত শিল্পপতি জর্জ ইউয়েলের অ্যান্ড্রু ইউয়েল কোম্পানি কিনে নিল হরলক্কা কুঠি। স্বয়ং ইউয়েল সাহেবের নাকি এতটাই পছন্দ হয়েছিল এই কুঠির পরিবেশ যে তিনি এখানে টানা মাস চারেক বসবাস করেন প্রচুর লোকলস্কর নিয়ে। তারপর তাঁর কোম্পানি এখানে প্রথম তৈরি করল চটকল। সেটা ছিল ১৮৭৩ সাল।

হাঁটতে হাঁটতে কথাগুলো কানাইকে শোনালেন অমিয়বাবু। বললেন,

—তুমি জানো এই ইউয়েল সাহেব কে ছিলেন?

—না, স্যার।

—এই জর্জ ইউয়েল জাতীয় কংগ্রেসের চতুর্থ সভাপতি। ১৮৮৮ সালেই ইউয়েল সাহেব সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনিই ছিলেন প্রথম অ-ভারতীয় কংগ্রেস সভাপতি।

কথায় কথায় তাঁরা চলে এসেছেন একেবারে ফটকের কাছে। সেখানে চটকলের দারোয়ানের কড়া পাহারা। ফলে ভিতরে প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। দেশি দারোয়ান চেঁচামেচি জুড়ে দিল—এক্ষুণি আবার কোনো সাহেব অফিসার চলে আসতে পারে। তখন আর এক বিপত্তি।

তাই আর এগোলেন না অমিয়বাবু। কানাইয়ের হাত চেপে ধরে বললেন,

—এসো, আমরা নিচে নামি।

ধীরে ধীরে পাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে জলের কাছে চলে এলেন দুজনে। এখান থেকে খেয়া পারাপারের ব্যবস্থা আছে। স্থানীয় লোকজন আর চটকলের মজুরদের বাউড়িয়া যাওয়া-আসার জলপথ এটা। তাই এই ঝাউতলা ঘাটে বসে কথা বললে কেউ কোনো আপত্তি করবে না, জানেন অমিয়বাবু। সেই ঝুঁকিহীন ঝাউতলাতেই বসলেন দুজনে।

গঙ্গার পাশে যে জায়গায় অমিয়বাবু বসে আছেন কানাইকে নিয়ে, ঠিক তার কাছাকাছিই ছিল দুর্গের প্রাচীর। সেই বজবজ দুর্গের পোশাকি নাম ছিল নিজগড়।

এই যে নদী প্রবাহিত হচ্ছে এ জনপদের পাশ দিয়ে, এখানে তার নাম হুগলি। তবে হুগলি নদীর এই স্রোত কিন্তু আদিগঙ্গা নয়। আদিগঙ্গার গতিপথ একসময় পরিবর্তিত হয়ে যে ধারা এখন প্রবাহিত হচ্ছে, তা সরাসরি মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। তাই সেই মজে যাওয়া আদিগঙ্গার জায়গায় এই হুগলি নদীই এখন গঙ্গার মূলস্রোত। প্রবীণ লোকেরা কেউ কেউ কাটিগঙ্গাও বলে।

এই নদীর সূত্রেই সারা পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ ঘটেছে এ জনপদের। সমুদ্রপথে বঙ্গদেশে প্রবেশের প্রথম দ্বার হওয়ায় অসংখ্য ঝড়ঝাপটা আর শত্রুর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুও হয়ে উঠেছিল এই জনপদ।

ষোড়শ শতাব্দীতে মগ জলদস্যুরা বড়ো বড়ো বজরা নিয়ে আরাকান দেশ থেকে এসে বজবজের ঘাটেই ভেড়াত তাদের জলযান। বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তারা নারী, পুরুষ ও শিশুদের অপহরণ করে এনে ওইসব বজরায় চাপিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দাসবাজারে করত পাচার। অপহৃতরা ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি হয়ে যেত পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে।

সেই মগ জলদস্যুদের অত্যাচারে সমগ্র ভাটির দেশের মানুষ ছিলেন সন্ত্রস্ত। আজকের এই জনপদও একসময় ছিল ভাটি অঞ্চলেরই অংশ। বাংলার বারোভুঁইয়া-খ্যাত রাজা প্রতাপাদিত্য ছিলেন এই সমস্ত অঞ্চলের ভূস্বামী। মগ জলদস্যুদের অত্যাচার থেকে প্রজাদের রক্ষা করতে বজবজে তিনি নির্মাণ করেন একটি নৌঘাঁটি। পরবর্তী কালে বাংলার নবাবরা সেটিকে আরও বড়ো করে একটি সম্পূর্ণ কেল্লার রূপ দেন। চারদিকে পরিখা কেটে বেশ সুরক্ষিত গড় হিসেবে তাঁরা গড়ে তোলেন বজবজ কেল্লাকে।

১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে ভূস্বামী সাবর্ণ রায়চৌধুরীর থেকে তিনটি গ্রাম—সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতার জমিদারির স্বত্ব কিনে নিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। মাত্র তেরোশো টাকার বিনিময়ে সেই জমিদারি হস্তান্তরিত হল কোম্পানির প্রতিনিধি জব চার্নকের হাতে। পরের দেড়শো বছরের মধ্যে ইংরেজ বেনিয়াদের অত্যাচার আর কূট-অভিসন্ধিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেন বাংলার মানুষ।

এদিকে বাংলার ইতিহাসে তখন ঘটতে থাকে একের পর এক বর্ণময় ঘটনা।

পুত্রহীন নবাব আলিবর্দি খাঁর মৃত্যু হল ৯ এপ্রিল ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে। আলিবর্দির প্রথম কন্যা ঘসেটি বেগমের বিষনজর থেকে নবাবের সিংহাসনে বসলেন সিরাজদ্দৌলা। সিরাজ ছিলেন আলিবর্দির ছোটো মেয়ে আমিনা বেগমের ছেলে।

অন্যদিকে সন্তানহীনতা থেকে উৎপন্ন হওয়া মানসিক জটিলতার কারণে সিরাজের সিংহাসন লাভের ঘটনাকে আরও ক্ষিপ্ত করে তুলল ঘসেটি বেগমকে। নবাবমহলের অন্দরেই শুরু হয়ে গেল সিরাজবিরোধী চক্রান্তের জাল বোনা। যে চক্রের মধ্যমণি হয়ে বসলেন ঘসেটি বেগম।

ঘসেটি বেগমের প্রধান পরামর্শদাতা হয়ে উঠল ঢাকার দেওয়ান রাজবল্লভ। বিপুল ধনাঢ্য রাজবল্লভের নাকি সম্পত্তির সীমা-পরিসীমা ছিল না। এহেন রাজবল্লভের ধনভাণ্ডারে সিরাজের নজর পড়বে আন্দাজ করেই যথাসম্ভব ধনরাশিসহ পুত্র কৃষ্ণদাস বল্লভকে পাঠিয়ে দেন কলকাতায় ইংরেজের আশ্রয়ে। তার ফলেই ইংরেজের সঙ্গে বন্ধুত্ব আর সিরাজবিরোধী চক্রের বৃত্তের মাঝে চলে আসেন রাজবল্লভ।

সিরাজদ্দৌলা নবাবের সিংহাসনে বসার পর উদ্যোগী হলেন ইংরেজ বেনিয়াদের অত্যাচার থেকে বাংলাকে মুক্ত করতে। এমন সময়ে মুর্শিদাবাদে খবর পৌঁছল যে, ইংরেজরা তাদের কলকাতার দুর্গ সংস্কার করতে চাইছে।

নবাব নির্দেশ পাঠালেন, দুর্গ সংস্কার করা যাবে না। এমন নির্দেশে কর্ণপাত না করেই চলতে থাকল দুর্গ সংস্কারের কাজ। ক্ষিপ্ত নবাব মুর্শিদাবাদ থেকে পঞ্চাশ হাজার সৈন্য নিয়ে এসে অবরোধ করলেন ইংরেজের কলকাতার দুর্গ। সেই অভিযানে সিরাজের সঙ্গে ছিলেন মিরজাফর, রায়দুর্লভ, মানিকচাঁদ, মিরমদনের মতো দক্ষ সেনাপতিরা।

কিন্তু সৈন্যসামন্তহীন ইংরেজদের দুর্গ দখল করতে সিরাজকে কোনো কষ্টই করতে হল না। কলকাতা থেকে সম্পূর্ণ বিতাড়িত করে নগরকে ইংরেজমুক্ত করলেন নবাব। দখল নিয়ে কলকাতার নাম বদল করলেন তিনি। নানা আলিবর্দি খাঁর নামে কলকাতার নামকরণ করলেন আলিনগর। নবাবের প্রতিনিধি মানিকচাঁদকে আলিনগরের দায়িত্ব সমর্পণ করে সিরাজ ফিরে গেলেন মুর্শিদাবাদে।

কলকাতা থেকে বিতাড়িত ইংরেজের দল অত্যন্ত সন্তর্পণে বজবজ কেল্লার নজর এড়িয়ে প্রায় চল্লিশ মাইল দক্ষিণে ফলতায় গিয়ে আশ্রয় নিল ওলন্দাজদের এক পরিত্যক্ত কেল্লায়। কলকাতার গভর্নর মিস্টার ড্রেক কিছু সৈন্যসহ বজরা নোঙর করলেন ফলতার কেল্লায়। একে একে ঢাকা, বহরমপুরসহ বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের কুঠিয়ালরা কুঠি ছেড়ে সিরাজের ভয়ে পালিয়ে এল ফলতায়।

নবাব সিরাজ কড়া হুকুম জারি করলেন ফলতায় আশ্রয় নেওয়া ইংরেজদের বিরুদ্ধে। ওই পলাতক ইংরেজের দল যাতে কোনোভাবেই না খাদ্য এবং পানীয়ের জোগান পায়, সেই নির্দেশ দিলেন নবাব।

অন্যদিকে বয়সে নবীন নবাব সিরাজের স্বেচ্ছাচারী মনোভাব, লাম্পট্য আর অসৌজন্যমূলক আচরণের জন্য বাংলার ধনাঢ্য, ভূস্বামী, জমিদারদের একাংশের মধ্যে পুঞ্জীভূত হচ্ছিল ক্ষোভ। তারা ক্রমশ নবাবমহলের অন্দরে গড়ে ওঠা সিরাজবিরোধী চক্রের মধ্যে চলে আসে।

সেই চক্রের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে নাম লিখিয়েছিলেন রাজা নবকৃষ্ণ দেব। তিনি রাতের অন্ধকারে গরুর গাড়ি বোঝাই করে কলকাতা থেকে খাদ্য ও পানীয় পাঠালেন ফলতার কেল্লায়। ইংরেজের সঙ্গে বন্ধুত্ব সুদৃঢ় করতে নবকৃষ্ণ দেব এই সাহায্য করলেও ফলতার অস্বাস্থ্যকর জলহাওয়া আর মশার কামড়ে পরিত্যক্ত কেল্লার মধ্যেই বহু ইংরেজের মৃত্যু ঘটে।

তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সদর দপ্তর ছিল মাদ্রাজে। বিতাড়িত কলকাতার গভর্নর মিস্টার ড্রেক কলকাতার দুরবস্থার কথা জানিয়ে খবর পাঠালেন মাদ্রাজের সদর দপ্তরে। ড্রেক জানালেন, কলকাতা পুনরুদ্ধার করতে না পারলে বাংলা থেকে পাততাড়ি গোটাতে হবে কোম্পানিকে। তাই দ্রুত মাদ্রাজ থেকে সৈন্যসহ যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে কলকাতার দখল নেবার আর্জি জানালেন ড্রেক।

কিছুদিনের মধ্যেই মাদ্রাজ থেকে পাঁচটি যুদ্ধজাহাজ, ন’শো ইংরেজ সৈন্য ও এগারোশো দেশি সৈন্যসহ প্রচুর গোলাবারুদ, অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রওনা হল ফলতার দিকে। বঙ্গোপসাগরে প্রবল ঝড়ের মধ্যে কয়েকটি পালতোলা জাহাজ গেল ডুবে।

অবশেষে ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর টাইগার, কেন্ট ও সলবেরি নামের তিনটি যুদ্ধজাহাজ ও কয়েকটি বাণিজ্যতরী রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে এসে পৌঁছল ফলতায়। ইতিমধ্যেই আলিনগরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নবাবের প্রতিনিধি মানিকচাঁদের সঙ্গে বিপুল অর্থের বিনিময়ে কোম্পানির রফা হয়ে যায়।

১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর, বাংলার বুকে প্রথম রণসজ্জায় সজ্জিত হয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাহিনী শুরু করল যুদ্ধযাত্রা। ফলতার কেল্লা থেকে শুরু, গন্তব্য বজবজের কেল্লা। কারণ বজবজ দুর্গ দখল না করে যাত্রা করা যাবে না কলকাতা অভিমুখে।

সন্ধ্যের মুখে বজবজ দুর্গ থেকে কয়েক মাইল আগে মায়াপুরে নোঙর করল ক্লাইভের নৌজাহাজ। সঙ্গে আটশো ব্রিটিশ সৈন্য, এক হাজার দেশি সেনা ও গোলাবারুদ আর কামান। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন যুদ্ধজাহাজ নিয়ে জলপথে এগিয়ে গেলেন বজবজ কেল্লার দিকে।

এদিকে স্থানীয় মানুষের সাহায্যে বনজঙ্গলের পথ ধরে শেষরাতে ক্লাইভ পৌঁছল বজবজ কেল্লার দ্বারপ্রান্তে। ওদিকে কলকাতা দুর্গ থেকে দুই হাজার অশ্বারোহী সৈন্য, পনেরোশো পদাতিক সৈন্য ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদসহ মানিকচাঁদ আগেই পৌঁছে যায় বজবজ দুর্গে।

সেদিন এ জনপদের সকাল শুরু হল তীব্র গোলাবর্ষণের শব্দে। বেশ কিছুক্ষণ ক্লাইভের সঙ্গে নকল যুদ্ধের খেলা চালাল নবাবের সেনাপতি মানিকচাঁদ। কিছুক্ষণ পর যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে দুর্গের মধ্যে আশ্রয় নিয়ে কার্যত ফাঁকা ময়দান ছেড়ে দিল ক্লাইভকে।

ওদিকে যুদ্ধজাহাজ থেকে গোলাবর্ষণ করে দুর্গের প্রাচীর গুঁড়িয়ে দিল ওয়াটসন। সুযোগ বুঝে সৈন্যসামন্তসহ কলকাতার অভিমুখে পালিয়ে যায় নবাবের দায়িত্বপ্রাপ্ত দুর্গরক্ষক মানিকচাঁদ। কার্যত বিনাবাধায় ফাঁকা কেল্লার দখল নিল সৈন্যরা। ২৯ ডিসেম্বর ১৭৫৬ বজবজ কেল্লার মাথায় উড়িয়ে দেওয়া হল ব্রিটিশের ইউনিয়ন জ্যাক।

মানিকচাঁদের এই বিশ্বাসঘাতকতার ফলে কেবল বজবজ দুর্গ কোম্পানির পদানতই হল না, সেই সঙ্গে নিশ্চিত হয়ে গেল কোম্পানির কলকাতা পুনর্দখল। ২ জানুয়ারি ১৭৫৭, ক্লাইভের নেতৃত্বে কলকাতার দুর্গ পুনর্দখল করল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।

শুধুমাত্র কলকাতা পুনর্দখল বা নবাবের বাহিনীর পরাজয়ই নয়, সেই সঙ্গে বিপুল উৎসাহে সিরাজবিরোধী চক্রান্তের হল গতিবৃদ্ধি। সেই চক্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় কয়েক মাস পরেই জুনে পলাশির আমবাগানে এ দেশের সর্বকালের জঘন্যতম বিশ্বাসঘাতকতার সেই করুণ কাহিনি হল অনুষ্ঠিত।

যুদ্ধের নামে অনুষ্ঠিত হল প্রহসন।

অস্তমিত হল বাংলার স্বাধীনতার সূর্য।

পরবর্তী দুটো শতাব্দীর জন্য ভারতবর্ষের কপালে এঁকে দেওয়া গেল পরাধীনতার কলঙ্কজনক টিকা।

এই ইতিহাসের প্রায় কিছুই জানা ছিল না কানাইয়ের। কেবলমাত্র এটুকুই সে ভাসাভাসা জানত—এখানে একটা কেল্লা ছিল। যেখানে নাকি একসময় ভীষণ যুদ্ধ হয়েছিল। আর সে যুদ্ধেই ইংরেজের হাতে শোচনীয় পরাজয় ঘটেছিল নবাব সিরাজের।

কিন্তু সেই ঘটনার নেপথ্যকাহিনি যে এমন করুণ আর সাংঘাতিক বিশ্বাসঘাতকতার, তার বিন্দুবিসর্গও জানা ছিল না কানাইয়ের।

এই ইতিহাস বর্ণনায় যত এগিয়েছেন অমিয়বাবু, ততই চোয়াল শক্ত হয়েছে কানাইয়ের। কখনও উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটেছে তার রক্ত, আবার কখনও ঘৃণায় নদীর পাড়ে গজানো সজীব ঘাসের ডগায় চাপ দিয়েছে দু-আঙুলের মাঝে। রাগে, ঘৃণায় সজোরে তুলে ফেলেছে অসংখ্য ঘাস। চাপড় দিয়েছে মাটিতে।

কথা বলার মাঝেও এসবের কিছুই এড়িয়ে যায়নি অমিয়বাবুর চোখ। হয়তো এই প্রতিক্রিয়াটাই ছিল তাঁর প্রত্যাশিত।

নদীর পাড়ে সেই পড়ন্ত বিকেলে দুজন অসমবয়সি বন্ধু—আসলে সম্পর্কে যারা গুরু-শিষ্য—বেশ কিছুক্ষণ ডুবে থাকল নীরবতায়।

অমিয়বাবু বোঝেন, এমন কাহিনি শোনার পর কানাইয়ের মতো সংবেদনশীল কিশোরের মধ্যে কী অভিঘাত হতে পারে। তাই দীর্ঘ নৈঃশব্দই শ্রেয় মনে করে চুপচাপ তাকিয়ে থাকলেন নদীর স্রোতের দিকে।

নীরবতা ভাঙল কানাইয়ের প্রশ্নে।

—স্যার, তারপর কী হল?

—পলাশির যুদ্ধের পর ক্লাইভ আর কোম্পানির পুতুল নবাব মিরজাফরের মধ্যে একটা চুক্তি হল সে বছর ৩০ ডিসেম্বর। সেই চুক্তি অনুযায়ী কলকাতা থেকে দক্ষিণে কুলপি পর্যন্ত বিশাল এলাকা চলে গেল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে। নবাব নয়, কোম্পানি হয়ে গেল এই এলাকার শাসক।

সেই থেকেই এই বজবজসহ চব্বিশ পরগনার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শুরু হল ব্রিটিশের ঔপনিবেশিক শাসন। আজ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি, এই ভারতবর্ষের যে পরাধীনতার যন্ত্রণা, তার সূচনা ঘটেছিল সেই চুক্তির ফলেই।

( চলবে )

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য শ্যামলকৃষ্ণ বসু [ আদিকান্ড ২ ]    | ১৯ | কন্যা বিদায় পরদিন প্রভাতে বাজল আর এক বিদায়ের সুর। ঋষি বিশ্বামিত্র বিদায় নিলেন সবার

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য শ্যামলকৃষ্ণ বসু [ আদিকান্ড ২ ]    | ১৯ | কন্যা বিদায় পরদিন প্রভাতে বাজল আর এক বিদায়ের সুর। ঋষি বিশ্বামিত্র বিদায় নিলেন সবার

Read More »

৪ : কালের প্রহরী

                      শুভাশিস ঘোষ একটি বাড়ির চোখ দিয়ে দেখা দুই শতাব্দীর ইতিহাস, মানুষের জীবন ও সময়ের নির্মম পরিবর্তনের কাহিনি পাঁচ ঘোষালবাড়ির নিয়মরীতি ঠিক পছন্দ নয় কানাইচরণের।

Read More »