অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা
তৃষ্ণা বসাক
Translation is a mental activity in which a meaning of given linguistic discourse is rendered from one language to another.
আমার ভ্রমণ আসলে অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছিল। রামলাল বাজারে নেমে রজনীকান্ত দাস রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটা হারিয়ে যাওয়া নদীর দেখা পেয়েছিলাম আমি। সেই নদীর জল ছুঁয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম প্রায় অপরিচিত এক পথে। খুব কম লোকেই এ পথে হাঁটে। বাঁধানো সড়ক নয়, লোকের পায়ে পায়ে তৈরি হওয়া পথ, মাঝে মাঝেই সে পথ হারিয়ে যায় চোখের সামনে থেকে।
না।এ ঠিক কোন নদীর গল্প নয়। হারিয়ে যাওয়া একটি লিপি, যে নদীর মতোই নাব্য ছিল একসময়, আর তার নামের মধ্যেই তো লুকিয়ে আছে নদী। তিরহুত বা তিরহুতিয়া যার উৎস তীরভুক্তি মানে এমন এক নদীতীর যাকে তিন তিনবার বলিদান দ্বারা শুদ্ধ করা হয়েছে। তীরভুক্তি নামটি প্রথম পাওয়া যায় বৈশালীর কাছে বসাঢ়ের মুদ্রায় খ্রিস্টিয় চতুর্থ শতকে। ভূগোলের তীরভুক্তি আসলে বিদেহ, প্রাচীন ভারতের শিক্ষা সংস্কৃতি রাজনীতিতে যার প্রতিপত্তি ছিল অসামান্য। খ্রিস্টিয় চতুর্থ-পঞ্চম শতকে এর নাম হয় মিথিলা বা তীরভুক্তি।
এই সেই মিথিলা যেখানে জনকের সভায় যাজ্ঞবল্ক্যকে প্রশ্ন করে বিপদে ফেলে দিয়েছিলেন অর্বাচীন গার্গী ‘নক্ষত্রলোক কীসে ওতপ্রোত?’ তাঁর সঙ্গে পেরে না উঠে তর্ক যুদ্ধের সব শালীনতা অতিক্রম করে যাজ্ঞবল্ক্য বলে উঠেছিলেন ‘অতিপ্রশ্ন করো না গার্গী, তোমার মস্তক খসে পড়বে’ সেই মিথিলার মেয়ে জানকী অপমানের শর্তসাপেক্ষ সহবাসের থেকে শ্রেয় বলে মনে করেছিলেন মাটির আশ্রয়কে।
শতপথ ব্রাহ্মণে (খ্রি পূ ১০০০-৬০০) এর সীমা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে সদানীরা নদীকে (যার অন্য নামগুলি গণ্ডক, রাপ্তী, করতোয়া) যা কৌশল থেকে বিদেহকে আলাদা করেছিল। বৃহৎ বিষ্ণু পুরাণে (খ্রি পঞ্চম শতক) বলা হয়েছে পূর্বে কৌশিকী পশ্চিমে গণ্ডকী, দক্ষিণে গঙ্গা ও উত্তরে হিমালয় দ্বারা পরিবৃত মিথিলা।
শুধু তো দেশের নয়, ভাষার একটা নিজস্ব ভুগোল আছে, তারও সীমারেখা নির্দিষ্ট করে বলতে হয়। যে কাজটি করে গেছেন স্যার র্জজ এ গ্রিয়ারসন। উনবিংশ শতাব্দীতে এই মানুষটি মৈথিলী ভাষা নিয়ে যে মাপের কাজ করে গেছেন তা এককথায় অবিশ্বাস্য। গ্রিয়ারসন বলেছেন ‘প্রাচীন মিথিলার ভাষার ওপর পশ্চিম প্রান্তে হিন্দী (ভোজপুরী) অনধিকার প্রবেশ করে এবং যেন প্রতিশোধ রূপে তা গঙ্গা পেরিয়ে উত্তর পটনা এবং মুঙ্গের ও ভাগলপুর জেলার দক্ষিণপ্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া কোশী পেরিয়ে পূর্ণিয়াও অধিকার করে’
এখন মৈথিলী ভাষায় কথা বলে উত্তর পূর্ব বিহারের ২৬ টি জেলার প্রায় তিন কোটি মানুষ এবং প্রতিবেশী রাজ্য নেপালের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ।নেপালের দ্বিতীয় প্রধান ভাষা এটি। যে ভাষায় ভাত ও ভোট চাওয়া যায়, গান গাওয়া যায়, কবিতা লেখা যায়, সে তো ভীষণ জ্যান্ত একটা ভাষা। কিন্তু যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকত ভাষা সরস্বতী, সেই হংস লিপিটি কই? কোথায় সেই তিরহুতিয়া বা মিথিলাক্ষর, নদীর মতো চলতে চলতে যে হারিয়ে গেল হঠাৎ?
বর্ষার এক ঘনঘোর দুপুরে রজনীকান্ত দাস রোডের এক ছায়াচ্ছন্ন বাড়িতে সেই হারানো আখরগুলি হঠাৎ জেগে উঠল আমার আঙুলের ছোঁয়ায়, আর অমনি শুরু হয়ে গেল আমার যাত্রা।আমার কোলে মিথিলাক্ষর লিপির একটা কপি ফেলে খেতে গিয়েছেন গৌরীদি, শ্রীমতি গৌরী সেন। তাঁকে ছাড়া আমার এ ভ্রমণ সম্ভব নয়। তাঁর জন্যেই জনাকীর্ণ রাজপথ ছেড়ে ঘন নির্জন পথে আমার চলা। সে সময় তো একটা ভাষাকে আশ্রয় করে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম প্রাত্যহিক অস্তিত্বের বিপ্রতীপে, এমন একটা ভাষা যে জীবনকে উল্টোদিক থেকে দেখতে শেখাবে।
জীবনের চিরাচরিত রাস্তায় আমরা এতটাই অভ্যস্ত যে সেই প্রায়ান্ধকার ঘরে অচেনা একটি লিপি হাতড়াতে হাতড়াতে প্রথমেই আমার মনে হল ‘আরে! এ তো বাংলাই!’ তারপর আরও ভালভাবে দেখতে বোঝা গেল অনেক মিল থাকলেও এ এক স্বতন্ত্র লিপি। যদিও প্রথম নজরে ভুল হওয়াই স্বাভাবিক। তবু সাধারনীকরণের প্রবণতা যে আমাদের আছে তা স্বীকার করে নেওয়াই ভালো। তাই কবিতা পাঠের আসরে মৈথিলী কবি হিন্দী অনুবাদ পড়লে যখন দাবী ওঠে মৈথিলী কবিতা পড়ার, তখন বিখ্যাত বাঙালি কবি বলেন ‘হ্যাঁ হ্যাঁ মৈথিলীই হোক, ওই তো আমাদের বিদ্যাপতি’
প্রকৃত সত্য হল বিদ্যাপতি বাঙালি নন, তাঁর বর্ণনামূলক গাথা কাব্যের সবই অবহটহ ভাষায় লেখা, অন্যদিকে গীতিকবিতাগুলো সম্পূর্ণ মৈথিলীতে। এখানেও আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকে এক গভীর বিস্ময়। মৈথিলী সাহিত্যের অগ্রপথিক বিদ্যাপতি ঠাকুর, যিনি প্রথম সাহস করে বললেন ‘দেসিল বয়না সব জন মিঠা’ মানে দেশীয় ভাষা সব থেকে মিস্টি, সংস্কৃত থেকে সবার চোখ ঘুরিয়ে দিলেন দেশীয় ভাষার দিকে, সীতার মাটিতে জন্মে তিনি কেন মৈথিলী রামায়ণ লিখলেন না? মেতে রইলেন রাধাকৃষ্ণের প্রেম নিয়ে? শুধু তিনি কেন, তারপরেও বহু শতাব্দী কেউ না, মৈথিলী ভাষায় রামায়ণ পড়ার জন্যে কেন আমাদের অপেক্ষা করতে হল চন্দা ঝার জন্যে ১৮৯৮ পর্যন্ত?
এরকম অনেক প্রশ্ন নিয়ে শুরু হল আমার যাত্রা। অনেক প্রশ্ন, অনেক ভয়ও। গৌরীদি বললেন ‘দেখেছ, কুশী নদীতে কি ভয়ঙ্কর বন্যা হয়েছে! ভেবে দেখো যাবে কি না’। গভীর রাতে ট্রেনের দুলুনি ছাপিয়ে আসছিল ছলছল শব্দ। একটি ছেলে খড়্গপুর থেকে উঠেছিল। মধুবনী কিংবা রাজনগর যাবে। অনন্ত টকটাইম তার। সে সারারাত একটি মেয়ের সঙ্গে কথা বলে গেল। মেয়েটি তার গার্লফ্রেন্ড নয়, অন্য কারো সঙ্গে তাকে মাল্টিপ্লেক্সে ঘুরতে দেখা গেছে, কথা সারারাত ঘুরে চলল এই খড়কুটোকে আশ্রয় করে।
হয়তো এল সি ডি-র আলো নেভার আগেই সকাল হয়ে এল। দ্বারভাঙ্গা। কেউ বলে দ্বারভঙ্গ, কেউ দ্বারবঙ্গ। অনেক ঘিঞ্জি রাস্তা, নোংরা খাটাল, উপচানো নর্দমা পেরিয়ে মিশ্রটোলায় আদিত্য সদনের সামনে রিকশা থামল। দ্বারভাঙ্গায় মাঝে মাঝে কারেন্ট আসে।সারা দুপুর হোটেলে ছটফট করে বিকেল হতেই বেরিয়ে পড়েছি। ভেবেছিলাম একটু আগেই হয়তো এসে পড়লাম। গেট ঠেলে ঢুকতে গিয়ে দেখলাম শ্রীমান আদিত্য হন্ত দন্ত হয়ে বেরোচ্ছে। বুঝলাম আড্ডার গন্ধ পেলে মৈথিলীদের আর তর সয় না। বাড়িটা অমরজীর। চন্দ্রকান্ত মিশ্র অমর মৈথিলী কবিতার স্তম্ভ বিশেষ। আদিত্য ওঁর নাতি। ওর নামেই আদিত্য সদন।
সকালে যখন ফোনে অমরজীর সঙ্গে কথা হল, উনি বাড়ির দিক নির্দেশ দিলেন, তখন ভেবেছিলাম এটা নিছক সৌজন্য সাক্ষাতের বেশি নয়। শুধু তাঁর সঙ্গেই দেখা হবে। এসে দেখলাম একেবারে চাঁদের হাট বসে গেছে।মৈথিলী সাহিত্যের রথী মহারথীরা উপবিষ্ট, ভয়ে ভয়ে বসতেই প্রশ্ন এল-‘আচ্ছা আপনারা বিমল মিত্রকে উপযুক্ত সম্মান দেন না কেন বলুন তো?’
প্রশ্ন ছুঁড়েছেন কথাকার অমরনাথ ঝা।
এক মৈথিলী ভদ্রমহিলা, সীতা, হয়তো এরকম পরিস্থিতিতেই পাতাল প্রবেশ করেছিলেন। আমি উল্টে জিজ্ঞেস করলাম ‘বিমল মিত্র কি আপনার প্রিয় লেখক?’
‘হ্যাঁ, তাঁর ‘আমি বিশ্বাস করি’ আমি অজস্র বার পড়েছি। ওই বইটাই বলতে পারেন আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দ্যায়’
‘আপনি বিমল মিত্র কি বাংলায় পড়েছেন না মৈথিলীতে? মানে আমি জানতে চাইছি বিমল মিত্র কি বাংলায় অনূদিত হয়েছেন?’
‘শুধু বিমল মিত্র কেন, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র থেকে শুরু করে বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় রাজশেখর বসু, আশাপূর্ণা দেবী- এঁদের প্রচুর প্রচুর অনুবাদ মৈথিলীতে আছে। অমরজীই তো রাজশেখর বসুর বেশ কিছু ছোটগল্প অনুবাদ করেছেন’
অমরজী আমার দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসেন। ধুতির ওপর সাদা ধপধপে গেঞ্জি, দীর্ঘকায়, শালপ্রাংশু উত্তর আশির এই যুবকের কবিতা একটু পরেই শুনব আর ক্ষুরধার ব্যঙ্গে শাণিত সেই কবিতা শুনে বুঝে যাব কেন অনুবাদের জন্যে রাজশেখর বসুকেই বেছে নিয়েছেন তিনি।
চা মিস্টি আসে, সঙ্গে প্রবাদ প্রতিম মাখনা। আমার মুখে মাখানা শুনে হাসির রোল ওঠে।
অশোকজী বললেন ‘মাখানা নয়, মাই খানা, আপ্যায়নে, রংগপ্রিয়তায় খাদ্যাভ্যাসে বাঙ্গালির সঙ্গে অনেক মিল মৈথিলীদের। তবে তাঁদের সব কিছুই বাঙ্গালিদের তুলনায় একটু বড় সড়। স্বাস্থ্যের দীপ্তি শুধু চেহারাতেও নয়, সংস্কৃতি আর সাহিত্যেও। আর সেই স্বাস্থ্য শ্রী অনেকখানি রস শুসে নিচ্ছে গ্রাম ও লোক সংস্কৃতি থেকে।
‘আচ্ছা, বিশ্বায়ন, প্রযুক্তির আগ্রাসন, বিচ্ছিন্নতাবোধ, জাদু বাস্তবতা- এসব কি সেভাবে আসছে আধুনিক মৈথিলী সাহিত্যে?’ প্রশ্ন শুনে কিছুটা অসন্তুষ্ট গলায় অমরনাথ জী বললেন ‘মৈথিলী সাহিত্য মানুষকে নিয়েই আর মানুষের সমস্যা তো চিরকালীন’
তর্ক চলতে থাকে। গল্প এবং হ্যাঁ গানও। রবীন্দ্রনাথের গান সম্বল করে যে কোন দুস্তর পারাবার পাড়ি দেওয়া যায়। চলে কবিতা পাঠও। অদ্ভুত সুর করে কবিতা পড়েন ওঁরা। প্রতি স্তবকের শেষ পদ উচ্চারণের সময় যেভাবে কবির সঙ্গে গলা মেলান সমবেত শ্রোতা, তাতে বোঝা যায় এমনভাবে প্রায়ই মিলিত হন ওঁরা।মৈথিলী কবিতা এখনো খুব ইন্টার- অ্যাক্টিভ। সন্ধ্যা গাঢ় হয়, মশারা ঝাঁকে ঝাঁকে কবিতা কিংবা নতুন রক্তের টানে এসে জড় হয়। ওঁদের বলার কথা অনেক। অনেকেই প্রচুর বাংলা সাহিত্য পড়েছেন এবং তা মূল বাংলাতেই।
‘আমরা বাংলা জানি, বাংলা বুঝি, পড়তেও পারি’ শুধু মৈথিলী কেন, অন্য ভারতীয় ভাষাভাষী অনেকেই এমন কথা বলেছেন আমাকে অনেক বার।আপাত সরল বিবৃতি মনে হলেও এটি আসলে বাঙ্গালির দিকে তোলা অভিযোগের ত র্জনী। সংখ্যা গরিষ্ঠ বাঙালি, ভারতের অন্য ভাষা বা সেই ভাষার সাহিত্য সম্পর্কে খোঁজখবর রাখে না, রাখার প্রয়োজনই মনে করে না। যে বাঙালি বুদ্ধিজীবী কথায় কথায় মার্কেজ, কুন্দেরা, পামুক, দেরিদা আওড়ান, তিনি অনেক সময়ই রাজকমল চৌধুরী, কে সচ্চিদানন্দন, অজিত কৌর কি নীলমণি ফুকনের লেখা পড়া তো দূরের কথা, এঁদের নামী শোনেননি। বাংলার বাইরে গেলে প্রতিনিধিত্বের যে অলিখিত দায় ঘাড়ে চাপে, তা মেনে নিয়ে আমি চুপ করে থাকি। হঠাৎ অশোকজী নিজের মনে বললেন ‘আসলে মিথিলাক্ষর আর বাংলা লিপির খুব মিল ছিল তো। তাই বাংলা পড়াটা আমাদের পক্ষে সহজ। নিশ্চয় জানেন, তিরহুতিয়া লিপি এখন আর নেই, এখন দেবনাগরীতে মৈথিলী লেখা হয়’
পাশ থেকে একজন বললেন ‘আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে দেবনাগরী হরফ’
গলার কাছে প্রশ্ন উঠে এল ‘কেন?’ কিন্তু তখন আবার গানের দাবী উঠল। প্রত্যাশিত ভাবেই সব প্রশ্নকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলেন রবীন্দ্রনাথ।
পরের দিন মধুবনী। যাত্রা শুরু হল যুগপৎ বিস্ময় ও ভুল নিয়ে। চালকের পাশের আসন থেকে ভ্রমণ সঙ্গী অমরনাথ জী সেদিনের টাটকা হিন্দুস্থান টাইমসটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন ‘আপনার খবরটা দেখেছেন?’
অদৃশ্য প্রতিনিধিত্বের ভূত কাঁধে চেপেই ছিল, তাই প্রবাসে গৌরবে বহুবচন ভেবে আমি প্রথম পাতায় ছাপা দাদার কীর্তি মানে সৌরভের সেঞ্চুরিতে মনোনিবেশ করলাম। অমরনাথ হাঁ হাঁ করে বললেন ‘আহা ওটা নয়, এই যে তিনের পাতায়’ আশ্চর্য হয়ে দেখি আগের সন্ধ্যার বিস্তৃত বিবরণ ছাপা হয়েছে। শিরোনামে আমার একটা বয়ানে ভুল ছাপা হয়েছে- ‘জড় সে জুড়া হ্যাঁয় বাংলা সাহিত্য’ গতকাল সভা শেষে চলে আসার সময় আমার মুখ থেকে একটা ওয়ান লাইনার শুনতে চাওয়া হয়েছিল। আমি বলেছিলাম ‘মৈথিলী সাহিত্য খুব রুটেড।’ সেটাই চাপানো হয়েছে বাংলা সাহিত্যের ঘাড়ে। যাইহোক, এই ভুলকে সঙ্গে নিয়েই হৈমন্তিক ফসলের সম্ভার পাশে রেখে গাড়ি ছুটল। কৃষিনির্ভর জীবন, নানা কাজে ব্যস্ত রয়েছে, জল আনতে যাওয়ার সেই চিরকালীন ভারতীয় ভঙ্গিমা এই ফ্রেমে যথাযথ মনে হয়। দাঁতে চাপা রঙ্গিন আঁচলের ফাঁক দিয়ে খঞ্জন দৃষ্টি মনে পড়িয়ে দ্যায় অনন্ত অভিসারিকাকে, মনে পড়ে বিশপি গ্রামের সেই নিপুণ নাগরিক কবিকে যিনি তত্ত্বের চেয়ে বেশি প্রয়োগে বিশ্বাস করতেন, যিনি সাহস করে বলতে পেরেছিলেন ‘শাস্ত্রের চেয়ে শস্ত্রবিদ্যা শ্রেয় কারণ দেশ যদি রক্ষা না করা যায়, তবে শুকনো জ্ঞানের চর্চা করে কী হবে?’ তিরহুত কলোনিতে ডঃ দেবকান্ত ঝার বাড়ির সামনে গাড়ি থামল। ডঃ দেবকান্ত ঝা মৈথিলী ভাষা সাহিত্যের এক অসামান্য পণ্ডিত।শুকনো পণ্ডিত নন, রসসমুদ্র। এহেন মানুষটি আমাকে শামা ধানের পায়েস দিয়ে আপ্যায়িত করলেন। বিবাহিতা কন্যাকে পিতৃগৃহে আদর করার এ এক মৈথিলী দস্তুর। শামা সম্ভবত শ্যামক থেকে এসেছে। আবছাভাবে মনে পড়ল রবীন্দ্রকবিতায় শামা ধান্যের কথা। তখন অলস মধ্যাহ্ন। রোদ আশ্চর্য নরম। সুন্দর প্রশস্ত বাড়িটির দোতলায় বিরাট খোলা বারান্দায় বসে মৈথিলী বাঙালি সম্পর্ক, পক্ষধর মিশ্র – এইসব শুনতে শুনতে আমার হঠাৎ রজনীকান্ত দাস রোডের সেই ছায়াচ্ছন্ন বাড়ি আর মেঘলা দুপুরের কথা মনে পড়ে গেল।
আমি বলে উঠলাম
‘আচ্ছা, তিরহুতিয়া লিপির বদলে কেন এখন দেবনাগরী হরফে মৈথিলী লেখা হয়?’
উত্তরে দেবকান্ত ঝা এক আশ্চ র্য গল্প শনালেন। মৈথিলী রাজারা বরাবরই শিল্প সাহিত্যের পৃষ্ঠ পোষকতা করে আসছেন। কিন্তু তাঁদের ঝোঁক সংস্কৃতের দিকে। রাজদরবারে মৈথিলী চিরকালের উপেক্ষিতা। যখন হাতে লেখা পুঁথির যুগ শেষ হয়ে এল আধুনিক মুদ্রণ ব্যবস্থা, তখন প্রয়োজন হল তিরহুতিয়া বা মিথিলাক্ষর ধাতব হরফ ঢালাই করার। কিন্তু সেই কাজ করার উপযুক্ত প্রাযুক্তিক পরিকাঠামো নাকি মিথিলায় সেই সময় ছিল না। তাই দেবনাগরী হরফেই ছাপা হতে লাগল মৈথিলী। তিরহুতিয়া থেকে গেল প্রাচীন পুথিপত্রের হলুদ পাতার আড়ালে।
গল্প যেভাবে গড়ে ওঠে, কিছু কল্পনা, কিছু জনশ্রুতি, কিছু অবদমিত ক্ষোভের প্রক্ষেপণ, সেসব সরিয়ে সত্যের হিরণ্ময় মুখ দেখতে গিয়ে খটকা লাগে। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমেই যেখানে শ্রীরামপুরে কেরী সাহেব প্রায় সব ভারতীয় ভাষার লিপির ছাঁচ বানিয়ে ফেলেছেন, ছাপা হচ্ছে তামিল, অসমীয়া এইরকম বহু ভাষায় বাইবেল, সেখানে বাংলার সঙ্গে সবদিক থেকেই কাছের মিথিলায় মৈথিলী হরফ ঢালাইয়ের প্রযুক্তি এতই দুর্বল হল যে, বেছে নিতে হল দেবনাগরী? এই সংশয় ও শামা চালের পায়েসের সৌরভ নিয়ে এবার আমাদের গন্তব্য জিতবারপুর। মাঝখানে অবশ্য মিট দা প্রেস ছিল। সুপার মার্কেটের একতলায় একটুকরো দোকান ঘর। একটা জেরক্স মেশিন আর খানকতক চেয়ার। সেটাই মধুবনী প্রেস ক্লাব। বসে বসে চোখে পড়ল কেরোসিন তেল সংগ্রহের লম্বা লাইন। হঠাৎ মাটি ফুঁড়ে এসে হাজির হলেন দৈনিক জাগরণ সহ বেশ কয়েকটি প্রিন্ট মিডিয়া এবং ২৪ ঘণ্টা চ্যানেলের কয়েকটি সাংবাদিক।
গরুর রচনাকে যেভাবে শ্মশানে নিয়ে যেতে হয়, সেইরকম দক্ষতায় আমাকে কয়েকটা সাদামাটা প্রশ্ন করে ওঁরা চলে গেলেন তসলিমা নাসরিনে।আমার বক্তব্য সুবিধে মতো কেটেছেঁটে , সম্পূর্ণ না বলা কথা জুড়ে প্রাসঙ্গিক কথা বাদ দিয়ে তা পরের দিন ছাপাও হয়ে গেল খবরের কাগজে।
জিতবারপুর ভারতবর্ষের অসংখ্য দারিদ্র্যলাঞ্ছিত গ্রামের একটি। সেই কুঁড়েঘর, দেওয়ালে ঘুঁটে, ন্যাংটো শিশু আর গাড়ির পেছনে ওড়া ধুলোর মেঘ। এইসব পেরিয়ে যে বাড়িটির সামনে গাড়ি থামল, তার সামনে এর আগেও অনেক গাড়ি থেমেছে এবং বিদেশি অতিথির মুখও এখানে খুব অচেনা নয়।কারণ বাড়িটা সীতাদেবীর। এই বাড়িরই একটা রঙ না হওয়া ইঁটের দেওয়ালের সামনে একটা মান্ধাতার আমলের দেরাজের ওপর আরও নানা পুরস্কারের পাশে রাষ্ট্রপতি পদক সাজানো। মধুবনী চিত্রকলার প্রবাদপ্রতিম শিল্পী সীতাদেবী জিতবারপুরের মতো অখ্যাত গ্রামকে পর্যটন গরিমা দিয়ে গেছেন। সীতাদেবী আর নেই। তাঁর ছেলে, নাতিরা কাজ করে যাচ্ছেন। দেশীয় কাগজ, রং জোগাড় করা খুবই অর্থসাপেক্ষ ব্যাপার। তার থেকেও শক্ত কাজ ছবি ডিলিট করার এই সময়ে ছবিগুলোকে মাথার মধ্যে ভেবে তোলা। সূর্য, রাধাকৃষ্ণ- অসাধারণ কয়েকটা ছবি দেখে গাড়িতে উঠেছি। খুব ক্লান্ত লাগছে। অমরনাথজী বললেন ‘ফেরার পথে যদি একটু লেহরিয়া সরাই হয়ে যান, রামদেব ঝা ওখানে থাকেন। খুব অসুস্থ। আপনি গেলে খুশি হবেন’ ভাগ্যিস বলেছিলেন। নইলে যে নদীর খোঁজে বেরিয়েছি, তার মোহনা আমার অজানাই থেকে যেত। বাড়ি মানে যেমন শুধু ছাদ নয়, মাটি থেকে শক্ত ভিতের ওপর তিলে তিলে ইঁট গেঁথে বাড়ি গড়ে তুলতে হয়, তেমনি বিশ শতকে মৈথিলী সাহিত্যে সেই ইঁট গাঁথার অত্যন্ত জরুরী কাজটা যারা করেছিলেন, তাঁদের অন্যতম রামদেব ঝা। তাঁর ‘আংরেজী ফুলো কা চিট্টহি’ একসময় প্রচুর সাড়া ফেলেছিল। এখন এই উত্তর আশিতে দুরারোগ্য কর্কট রোগ শরীরে নিয়ে তিনি ব্যস্ত অভিধান রচনার কাজে। আর বিষয়টিও কত অভিনব। রান্নাবান্না, সাজগোজ সংক্রান্ত যাবতীয় মৈথিলী শব্দের কোষগ্রন্থ হতে চলেছে এটি।তখন সন্ধে হয়ে এসেছে। নিচু ছাদের সাদামাটা বাড়ির সামনে গাড়ি থামল। সামনেই কালীপূজো। চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই অজস্র শ্যামাপোকা আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানাল। দীর্ঘকায় এক শীর্ণ ভদ্রলোক বেরিয়ে এসে ভেতরে যেতে বললেন, ভেতরের ঘরটাতে নিষ্প্রভ বাল্ব জ্বলছিল। তাই পোকার উপদ্রব কম। বিছানায় অভিধানের পাণ্ডুলিপি ছড়ানো ছিটানো। তার মধ্যে আমার জায়গা হয়ে গেল। কথায় কথায় উনি জিজ্ঞাসা করলেন
‘বাংলাতে তো এ ধরনের অভিধান নিশ্চয় আগে হয়ে গেছে?’
আমি যখন লজ্জিতমুখে না বললাম, তখন ওঁর বিস্ময় চোখে পড়ার মত।কথার মাঝে আমার ডাক পড়ল অন্দরমহলে। সেখানে রামদেব ঝার স্ত্রী কন্যাদের সঙ্গে আলাপ হল। জ্যেষ্ঠা কন্যা বিবাহিতা,সম্ভবত ইন্দোরে থাকে, ছুটিতে বাপেরবাড়ি এসেছে। অনেক বলার পর সে রামদেবজীর লেখা একটি মৈথিলী গীত শোনাল। কনিষ্ঠা স্থানীয় এঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বি টেক করে। সে আপাতত ব্যস্ত তার প্রজেক্ট নিয়ে। আমার এম টেক ন্যানটেকনলজিতে শুনে তার আনন্দ দেখে কে। সে তো এই বিষয়ের ওপরেই তার প্রজেক্ট দিতে চায়। আনন্দে লাফাতে লাফাতে সে পাশের ঘর থেকে তার ল্যাপটপ নিয়ে এল।
আগেই বলেছি দ্বারভাঙ্গায় মাঝে মাঝে কারেন্ট থাকে। আর যখন থাকে, তখনকার ভোল্টেজের কথা না বলাই ভালো। সেই টিমটিমে আলোয়, বিছানায় আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত ব্যবহারিকতার মধ্যে বসানো ল্যাপটপের উজ্জ্বল স্ক্রিন আর ততোধিক উজ্জ্বল মেয়েটির দুচোখের দিকে তাকিয়ে আমি যেন আমার সেই নদীর মোহনা দেখতে পেলাম। ডিজিটাল হরফের বিস্ফোরণের মধ্যে দাঁড়িয়ে তা আদৌ অধরা বলে আমার বোধ হল না। ডিজিটাল মৈথিলী হরফ নিয়ে পাশের রাষ্ট নেপালে যে সব গবেষণা চলছে, মৈথিলীকে ইউনিকোড মানচিত্রে আনার জন্য যেসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা সেই মুহূর্তে আমার অজানা হলেও আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল মহাসমুদ্রের দিকে নিজের গতি ও ছন্দে বয়ে চলা একটা নদীর সমস্তটা। আমি দেখতে পেলাম মৈথিলী লিপির প্রতিটি বর্ণ ধরে ধরে বানানো হচ্ছে বিটম্যাপ কিংবা ভেক্টর ইমেজ। তাকে ভরা হচ্ছে বৈদ্যুতিন স্মৃতিতে।রামদেবজীর কনিষ্ঠা কন্যার মতো কোন তরুণী তিরহুতিয়া লিপিতে ইমেল পাঠাচ্ছে তার দয়িতকে, নতুন কোন বিদ্যাপতি এসে বৈদ্যুতিন হরফে মাউস ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লিখছেন-
পিয়া পরদেশ তাশ তুঅ পাশহি, তঁ বলহ সখি আন
যে প্রতিপালক সে ভেল পাবক, ইথি তো বলত আন
নতুন যুগ তো নতুন প্রকাশভঙ্গি চাইবেই। অবধারিত ভাবে মনে পড়ে যায় টি এস এলিয়টকে।
For last years words belong to last last years’ language
And next years words await another voice
ফেরার সময় বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের ভগ্নপ্রায় বসতবাড়ির প্রত্ন অন্ধকার ছুঁয়ে ফেলে স্বভাবতই বিষাদ যখন ঘিরে ফেলল বাকি যাত্রাপথ, তখনো আমি মনে মনে সেই নদীর তীর দিয়ে চলেছি। অষ্টম তফসিলে স্থান পাওয়া মৈথিলী, এত আত্মদানের পরেও কি সে তীরভুক্তি হতে পারবে না?

( চলবে )


