টেবিল, দূরের সন্ধ্যা কবি পার্থপ্রতীম কাঞ্জিলাল

টেবিল, দূরের সন্ধ্যা কবি পার্থপ্রতীম কাঞ্জিলাল

আলোর পথযাত্রী - বিতস্তা ঘোষাল

আলোর পথযাত্রী

২ : আলোর পথযাত্রী

…সৃষ্টির শেষ রহস্য, ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব সেন

“…সৃষ্টির শেষ রহস্য,ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব সেন

কর্তার সিং দুগ্গল: এক বিরল স্রষ্টা

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন  

অম্লান দত্ত – এক বিশ্ব মানব

রবীন্দ্রনাথ ও বিশ্বকবিতা

এমন কী সন্দীপন যখন স্বপ্নে প্রবেশ করেন তখনও সে স্বপ্নের কোনও ওষ্ঠ নেই,উচ্চারণ নেই

বিশ্বকে বাংলায় চেনার জানলা মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

সোমক দাস : হৃদয়ের ছাইগুলি সযত্নে সাজিয়ে রাখার এক স্বতন্ত্র স্বর

টেবিল, দূরের সন্ধ্যা কবি পার্থপ্রতীম কাঞ্জিলাল

স্ট্রিট-রিয়ালিটির লেখক উৎপল কুমার বসু

অনিতা অগ্নিহোত্রী তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে ইতিহাসই লেখেন

সামান্যভাবে স্বাধীনতায়, স্বাধীন বেঁচে থাকায়, স্বাধীন একটা যৎসামান্য উনুনও জ্বালানোয় বিশ্বাসার্থী কবি অনুরাধা মহাপাত্র

আজন্ম-অর্জিত ভাষার পক্ষে লড়াইয়ের কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

একজন ‘সাতচল্লিশের শিশুর কাহিনী’-র স্রষ্টা সাহিত্যিক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

“স্বপ্নের মতো আয়ু চলে যায় কখনো বা দ্রুত, কখনও বিলম্বিত” — এমনই একটি লাইন লিখেছিলেন কবি পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতা বই ‘দেবী’তে।(প্রকাশনা : অভিজ্ঞান, প্রকাশক: নিশীথ ভড়।)

তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ১৯৮০-৮১ সালে।আমি তখন ছয়-সাত বছরের মেয়ে। তার কিছু আগেই অনুবাদ পত্রিকার সম্পাদক বৈশম্পায়ন ঘোষালের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়েছে। তাঁর নিজের কথায়- “১৯৭৯ সালের অক্টোবরে কফিহাউসে বসে ভাবছি যে এবার আত্মহত্যা ছাড়া পথ নেই, কারণ ‘অমৃত’ পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেছে, শেষ টিউশনটাও চলে গেছে: পত্নীর বিবাহতে পাওয়া যৎসামান্য গয়না প্রায় বেকার চার বছরে শেষ হয়ে গেছে। এমন সময় অলকেশ ভট্টাচার্য এলেন এবং ঘোষালদার কাছে আমাকে নিয়ে গেলেন রমানাথ মজুমদার স্ট্রিটে। অলকেশ যে আমাকে পছন্দ করতেন তা নয়, আমার অবস্থা জেনে মানবিকবোধ থেকেই ওঁর কাছে আমাকে নিয়ে যান। মানুষটির কথা বলা ও কথার ধরন একেবারেই আলাদা। প্রথম আলাপেই জানালেন, “আমি তোমার কথা যত ভাবি, তত তোমার স্ত্রীও ভাবেন না।”নভেম্বরে (১৯৭৯) অঞ্জনাকে নিয়ে তাঁর পত্রিকা অফিসে যাই। অতিদ্রুত তিনি আমার পত্নী অঞ্জনার গুরু হয়ে যান। ডিসেম্বরে আমি প. ব. উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদে করণিকের চাকরিটি পাই (১৯৭৯)। ১৯৮১-র জুনে অঞ্জনা প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (Administrative Training Institute) চাকরি পান। ঘোষালদা ও তাঁর সেই সময়কার বিশেষ বন্ধু সুজিত ব্যানার্জির অনুগ্রহ ও উদ্যোগে এটা সম্ভব হয়।আমি যে চাকরিটা ডিসেম্বরে পেয়েছিলাম সেটা ৭৯-এর এপ্রিলেই পাবার কথা। কিন্তু আটমাস আটকে ছিল।দাদার প্রচেষ্টায় তা এবার হয়ে গেল।”

বাবার সঙ্গে তাঁর এই পরিচয় ও আত্মীয়তার ফলে তিনি হয়ে উঠলেন কাকু আর তাঁর স্ত্রী হলেন পিসি।কিন্তু সেই সময় তাঁর সঙ্গে যে খুব হৃদ্যতা আমার জন্মেছিল তা নয়।তিনিও যে খুব কথা বলতেন আমাদের সঙ্গে সেটাও নয়। সোমক দাস, অনুরাধা মহাপাত্র, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় বা অন্যদের সঙ্গে সহজাত সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তাঁর সঙ্গে তেমন নয়। বরং অঞ্জনা পিসি অনেক কাছের ছিলেন।

তাঁর লেখার সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ার সময়।এর আগে আমি প্রচুর সাহিত্য পড়লেও কবিতার বই খুব একটা পড়তাম না। আমার ছোটো বোন আবার কবিতার বই পড়ত,কারণ সে তখন নানান জায়গায় আবৃত্তি করত। কাজেই পার্থ কাকুর এর মধ্যে যে কটি বই প্রকাশিত হয়েছিল, তার কাছেই ছিল। আমাদের কলেজের একটি ছেলে একদিন কার কোন বই ভালো লাগে-এই নিয়ে আড্ডায় আলোচনা প্রসঙ্গে বলল, তার প্রিয় কবি পার্থ প্রতীম কাঞ্জিলাল। শুনে আমি অবাক হয়ে বললাম, তিনি কী খুব ভালো লেখেন? ছেলেটি আমার দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপের হাসি হেসে বলল-‘তোর মতো মেয়েদের জন্য পার্থদার কবিতা নয়।“ এখন কেন নয় সেটা বোঝার তাগিদেই বাড়ি ফিরে বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম।তিনি বললেন-“ পার্থর কবিতা আজ পাঠক সেভাবে বুঝতে পারছে না।কিন্তু একদিন তাঁর কবিতা নিয়ে প্রচুর কাজ হবে।একেবারেই অন্য রকম ভাষা তার। আধ্যাত্মিকতা ও গেরস্থালী দুটোই মিলে মিশে আছে তার কবিতায়।”

এই আধ্যাত্মিক শব্দটা আমাকে খুব টানে সেই ছোতো থেকেই।ফলে সেদিন রাত থেকেই বোনের থেকে বই নিয়ে শুরু হল তাঁকে পড়া। প্রথমেই পড়লাম ‘দেবী’। ‘দেবী’-র নামকবিতায় তিনি লিখছেন, “যা কিছু সর্বস্ব হতে পারে, দেবী, তার বাইরেও অতিরিক্ত কিছু/ বেড়ে ওঠে, কিছু ফুটে ওঠে/ উৎসর্গ থাকবে তাই, কিংবা উপহার। এই গ্রহে/ প্রথমে প্রকৃতির সামনে, পরে আমাদেরই প্রকৃতি সম্মুখে/ আমরা রয়েছি ঠিক পূর্বপুরুষেরই মতো অসহায়/ পতাকা রয়েছে আমাদের সেরকমই প্রতিষ্ঠা উন্মুখ।/ হে লীয়মান নিদ্রিত সৌন্দর্য, জাগো ভ্রুকুটি নিয়ে/ সংহারে ছলনা নিয়ে।/ হে মাহাত্ম্য, অজস্র আত্মতা আজ হননে নিরাশ হয়ে/ তোমার প্রতীক্ষায় আকুল।/ হে ঐশ্বর্য, নিজেকে উৎসর্গ করো ঐশ্বর্যবিহীন আর দারিদ্রবিহীন/ সাম্য-রূপ-শিল্প অভিষেকে।”

চমকে গেলাম। আরে এইভাবেও লেখা যায়! যখন এই কবিতা তিনি লেখেন তখন নকশাল আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায় চলছে। সেই অস্থির অবস্থায় সেদিনের তরুণপ্রাণ দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ আঁকড়ে ধরেছিল, সেই কালে ‘দেবী’ তাদের কাছে কী বার্তা এনেছিল! তা কি তাদের রাঙা ইস্তাহারই মনে হয়েছিল নাকি অন্য কিছু সেটা না জেনেও এটুকু বুঝেছিলাম তাঁর এই দেবীবন্দনার ভাষা একেবারেই অন্য রকম। তাই “রণপ্রণয় দাও আর্ত পৃথ্বীকে, বিশ্ব হোক নবপ্রণীত… তবে জয়দণ্ড তোলো, সুনির্মিত করো স্বর্ণজয়রথ/ দেবী, নির্ধারিত করো ভবিষ্যৎ…”। এই লাইনের পর এক আক্ষেপ, অভিমানও জুড়ে রইল যেন তাঁর পরের কবিতায় : “তুমি/ নির্মাণ করোনি তার স্বচ্ছ ধ্যানভূমি।… প্রস্তুতির কাল কেন এত দীর্ঘ”।

১৯৪৯ এর ২৩শে ডিসেম্বর মধ্য কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। কলেজে পড়তে পড়তেই বেরিয়েছিল প্রথম বই-‘দেবী’। তাঁর বাবা যে প্রেসে কাজ করতেন (মডার্ন ইন্ডিয়া) সেখান থেকেই ছাপা হয়েছিল। তিনি মাথায় করে বয়ে এনেছিলেন ছেলের বই।পরে ২০০৫-এ ‘দেবীর’ দ্বিতীয় মুদ্রণ হয় বিষয় মুখ থেকে, বিকাশ গণচৌধুরী ও দেবাশিস বিশ্বাসের হাতে। ‘দেবী’র কবিতাগুলি বর্তমান সময়ের পক্ষে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ‘তোমার ও রক্তবর্ণ আনন ফেরাও, হে দারুণা, তুমি খড়্গ তোলো/অস্ত্র উপাচারে তুমি পূজা করো এই রোগগ্রস্ত মানুষের।’…

পরের দিকে লেখার অক্ষরেখা পাল্টে যায়। প্রচুর সনেট লিখতে থাকেন। দ্বিতীয় বই ‘রাত্রি-চতুর্দশী’তে অবশ্য মাত্র চোদ্দটি সনেট-সংগ্রহ। বন্দনা বিলাপ ধ্বনি এবং দেবীধ্বনি- এই দুই পর্বে বিভক্ত ‘দেবী’র আবহাওয়া ‘রাত্রি চতুর্দশী’কেও যেন হালকভাবে ছুঁয়ে যায়। আর্ত ও বিপন্ন সময়কে বাঁচাবার জন্যে দেবীর আবাহন চেয়েছিলেন, ‘পূজা করো এ রোগগ্রস্থ মানুষের/হে দারুণা তুমি খড়্গ  তোলো, থেকে ‘এ পৃথিবী ছাত্রের, শ্রমিকের’ এই দেবীধ্বনিতে উত্তরিত হয়েছিলেন পার্থপ্রতিম। পার্থপ্রতিম জানেন, যেখানে খরা বন্যা খর শীত পা ছোঁড়ে, প্রলাপ বলে, ঘুমে কেটে যায় জাগরণে, সেখানে মূর্তি স্বপ্নে দেখা দিয়ে ডুব দিতে বলে, আর নিজে থাকে উপরের জলে। যথেচ্ছ ছন্দব্যবহারে স্বেচ্ছাচারী পার্থপ্রতিম এখানে অনেক পরিণত: অভিজ্ঞতায় নয়, দক্ষতায় দৃপ্ত। সনেটের কঠিন নিয়মানুবর্তিতার মধ্যেও কত বৈচিত্র সম্ভব, তিনি তা সহজ নৈপুণ্যে প্রমাণ করেছেন। আধুনিকতার আবহ থেকে কবিতাকে তুলে এনেছেন গম্ভীর ক্লাসিকাল আবহাওয়ায়। সীমাবদ্ধ আয়তনের মধ্যে জাগিয়ে তুলেছেন মহাকাব্যের মেজাজ। প্রবাদপ্রতিম কিছু পংক্তিও তাঁর কবিতাতে এনে দিয়েছে অন্যতর মাত্রা। ‘উরুদেশে চন্দ্র নিয়ে জীবতারা নাচে’, ‘পৌরুষ নিতম্ব চায় বিদ্যুতেরা মেঘ… অন্তরে সাগর পাতা, তাই অভিপ্রায়/ অভাগা হয়েও ফের সমুদ্রেই যায়।’ ‘আমরা দেখেছি শুধু ক্ষুন্নিবারণে/বেলা যায়, বিষয়ের প্রভৃতি ইত্যাদি/ হয়ে বেঁচে আছি। ঈশ্বর,তোমাকে জানি মলমূত্রবৎ’।

এক যুগ পরে ‘দেবী’ যদি ভুলে গিয়ে থাকেন কোনো পাঠক-এই সনেট সংগ্রহটির নিবিষ্ট পাঠ তাকে জানিয়ে দেবে পার্থপ্রতিম ছন্দ ও শব্দ ব্যবহারে কত নিখুঁত। স্টোভ, ‘সিমেন্ট, খোট্টা, স্পঞ্জ, স্কেল, কম্পোজিটার, ব্লেড, বর্জাইস ইত্যাদি শব্দের সঙ্গে তিনি স্বল্পয়াসে মিলিয়ে দিতে পারেন দৈবের প্রয়াস, বন্যপ্রাণ, উর্মিকুল, জীবতারা, রিরংসা নির্বেদ, প্রতিযোগিতার হ্রেষা, উৎপলকপাল, উরুব্যাদানের পল্লি, ব্রহ্ম বাহিনীর জল-ইত্যাকার শব্দাবলী।

বিষয় নির্বাচনেও পার্থপ্রতিম অনন্য। কোথাও চর্বিতচর্বন নেই, অনর্থক চালবাজি নেই; নেই অতিকথনের অত্যাচার বা ক্লান্তিকর পুনরক্তিময়তা; আধুনিকতার নামে স্বভাবের অভ্যন্তরীন অসংবদ্ধ এলোমেলোমির আড়ম্বরময় কাব্যপনাও নেই কোথাও। বল্লাহীন ভাবাবেগে কোথাও ভেসে যায়নি কবিতা। আছে পরিচ্ছন্ন পরিমিতি বোধ, প্রকাশের ভঙ্গিমায় আছে আশ্চর্য স্বকীয়তা; যে কাব্য ভাষা একজন কবিকে অন্য সব কবিদের ভিড় থেকে পৃথক অভিধা এনে দেয়, আছে সেই ব্যক্তিগত অসাধারণ কাব্যভাষার পরিচয়।

‘এলেজি: পশ্চিমবঙ্গ’ কবিতার বক্র অনুতাপময়তার মাঝখানে তিনি হঠাৎ যেন নিঃশ্বাস ফেলে বলে ওঠেন: ‘আজ সমস্ত প্রাকৃত। সময়ের চক্রান্তে দীর্ঘিকা বদলে গেছে ‘দিহি’তে, সেখানে আজ কচুরিপানা দৃঢ় সংগঠনে প্রবল জটিল- আর সেই ‘দিহি থেকে ওটে তাপ’

কবিতা পশ্চিমবাংলার তে লিখলেনঃ “ বাংলাপশ্চিমের/কবি ও কবিতা/নিজেদের নিয়ে কিছু মিথ্যা গর্ব করেছিলো/সেইজন্যে, জগদ্দল এক দল ব’লে উঠল, ‘জগদম্বা আমি- /আমার তুষ্টির জন্য ভূমিরক্ত নররক্ত চাই।’”

 ‘সাহিত্যের ইতিহাস ব্যর্থতারই, সফলতা কেবলমাত্র ফলশ্রুতি –এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছিলেন,এই প্রশ্নের প্রসঙ্গে,শরদিন্দু অমনিবাস, ১২-খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৮ থেকে উদ্ধৃতি তুলে বললেন, “ কোনও উত্তর-আধুনিক জবাব নয়, বরং এক দাক্ষিণ্য-প্রাচীন লেখক কে ডাকছি – “সংসারে প্রকৃত কবি বড় বিরল, তাই কবিকে দেখিয়া মানুষ বিস্মিত হইয়া যায়। কবি বড় বিরল, তাই কবিকে দেখিয়া মানুষ বিস্মিত হইয়া যায়। কবি বড় আশ্চর্য মানুষ। যৌবনে যে যৌনধর্মকে কেন্দ্র করিয়া লয় না, যৌবনান্তে বিষয় ধর্মে তাহার রুচি নাই, ধর্মকর্মেও সমান অরুচি। তাই সংসারী তাহাকে অকর্মণ্য বলিয়া গালি দেয়, ধার্মিক গালি দেয় দুষ্ট বলিয়া।…সে কোন্ সংসারের সমুদ্রতীরে নুড়ি কুড়াইতেছে, আর দেখিতেছে, উহা পরশপাথর কি না।বেশির ভাগ কবির জীবন নিস্ফল অন্বেষণেই শেষ হয়, কিন্তু তাই বলিয়া তাহাদের জীবন নিস্ফল নয়। তাহাদের খোঁজার ইতিহাসই কাব্য।” – যে-অফিসার-সাহিত্য বা যে-প্রফেসার-সাহিত্য সাফল্য চায়, তার চিড়ে এতে ভিজবে না, আমি জানি। তবু, এইটুকু বলার, ব্যর্থতা আর বিফলতা এক জিনিস নয়।

 সামাজিক রাজনৈতিক বিশ্বাস বিশেষত, একজন কবির ক্ষেত্রে দায়িত্ব বা ভূমিকা এবং কবিতায় কীভাবে এই আদর্শ প্রতিফলিত হওয়া সম্ভব?এর উত্তরে তিনি বলেন, ‘রাজনীতি’ মানে? নানা উর্দির রাজাদের কুটনীতি? এবং সেই কুটনীতিজ্ঞদের কবি বলে চালানো যায় লোককে ধরে। কিছু পেডগেজি করানো-এই তো কবিদের দায়িত্ব ও ভূমিকা? একটা ফরমান, একটা রাজরুচিকে পদ্য করা ? সাফ বলে রাখি যে, আমি বিশ্বাস করি, ‘পোয়েটস্‌ আর দি আনঅ্যাকনলেজড্‌ লেজিস লেইচার অফ দা ওয়ার্ল্ড! লোকযাত্রানির্বাহীদেরই উচিত কবিদের বোঝার চেষ্টা করা, কবিদের এ-প্রসঙ্গে কোনও আমপ্লিফায়ার বা পাব্লিক অ্যাড্রেস সিস্টেম হওয়ার দায় নেই।” মানুষের, রাষ্ট্রের নিয়তি শেষ-অবধি কে নিয়ন্ত্রণ করে – ধর্ম, না রাজনীতি? এর উত্তর ছিল তাঁর কাছে অত্যন্ত স্পষ্ট। “ধর্ম বা ‘রাজনীতি সবই অস্পষ্ট শব্দ – ‘রাষ্ট্র’, ‘নিয়তি’ – এসবও তাই। এই শব্দগুলির শরীর কেড়ে নিলেই দেখা যাবে, এগুলো থুত্থুড়ে ঠাকুরদার ঠাকুরদা, বর্ষারাতের ভূত সব – শ্রাদ্ধ-শান্তির অপেক্ষায় বসে আছে। ‘নিয়ন্ত্রণ শব্দটি ক্ষমতালোভীরা পছন্দ করেন, শব্দটি আসলে এক টাই-পরা আমলা। ধর্ম-রাজনীতি এগুলো যেমন প্রফেসার-শব্দ, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ-নিয়তি এগুলো তেমন অফিসার-শব্দ। এত আরবান আমি নই যে, এই মহাগুরুনিপাতী গাম্ভীর্য বুঝতে পারব-হমে ছোড়ি দে রে সৈয়াঁ ছোড়ি দে রে ম্যায় নেহি জানে দুনিয়াদারি।”

এই প্রসঙ্গে বলি, তিনি নিজে নিয়মিত জ্যোতিষ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতেন।পাশাপাশি হোমিওপ্যাথি নিয়ে বিশেষ আগ্রহ ছিল।আমাকে মাঝেমধ্যেই অফিস ফেরতা তাঁর নির্দেশ মতো হোমিও ওষুধ কিনে দিয়ে আসতে হত। মাখে মাঝেই আমার ভাগ্য ভবিষ্যৎ কি হতে পারে, এই নিয়ে আলোচনা করতেন, এবং সবার শেষে বলতেন, “তোমাকে এসব বলা বৃথা।তোমার জন্মদাতাই তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।”বাবার নির্দেশে তিনি যখন পিসি অবসর নেবার পর, আমার মেজবোনের ফ্ল্যাটটি কিনে চলে এলেন সিঁথিতে, তখন প্রায়ই যেতে হত তাঁদের তদারকি করার জন্য। অবশ্য মেয়ে মণিকর্ণিকা এখানে না থাকায় ডাক্তার ও অন্য সব সমস্যা সামলাত আমার বোনেরাই। সেই নিয়ে মাঝে মাঝেই ফোন করে আমাকে বলতেন, “আমি চাই না তোমরা আমার এত দায়িত্ব পালন করো।” তাঁর অনুরোধ রাখা যায়নি। কারণ তিনি ২০২০ সালে যেদিন চলে গেলেন আমরা তিন বোন আর সাহিত্য জগতের একজন ছাড়া কেউই ছিলেন না। হয়তো এটাই ভবিতব্য ছিল আমাদের এবং তাঁরও। 

আলোর পথযাত্রী - বিতস্তা ঘোষাল

সোমক দাস : হৃদয়ের ছাইগুলি সযত্নে সাজিয়ে রাখার এক স্বতন্ত্র স্বর স্ট্রিট-রিয়ালিটির লেখক উৎপল কুমার বসু

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

একজন ‘সাতচল্লিশের শিশুর কাহিনী’-র স্রষ্টা সাহিত্যিক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

This entry is part 13 of 18 in the series আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

একজন ‘সাতচল্লিশের শিশুর কাহিনী’-র স্রষ্টা সাহিত্যিক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

This entry is part 13 of 18 in the series আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর

Read More »

ভারতের উৎসব : ঋতুচক্র, কৃষি ও সমাজ

This entry is part 13 of 18 in the series আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস ১ : সিন্ধু–সরস্বতী থেকে

Read More »