আলোর পথযাত্রী - বিতস্তা ঘোষাল
আলোর পথযাত্রী
বিতস্তা ঘোষাল
“চারিদিকে শূন্যেই ভাসছ তুমি—তোমার জগতে এ-সবের দাম নেই।
শুধু বায়ুবোধ আছে, স্বপ্নদর্শন আছে, আছে সূর্যঘড়ির থালে
নিজের আনন্দছায়া। মাটি গুঁড়ো হয়ে ঝরছে—
কী আহ্লাদ, কী বিস্মরণ—এ তো প্রেম নয়, ভয় নয়,
চিন্তাহীনতা নয়—শুধু বিকেলবেলার আকাশে পাখির ঝাঁপ।
আজও ঘরখোঁজা সমাপ্ত হল না—পড়ে রইল পতঙ্গকুল—
স্রোতে মাছ, পথে নৃত্য গৃহবাসীদের।
কোথায় তোমার বাড়ি? আকাশে ভাসছ কেন?”— উৎপল কুমার বসু
কবি উৎপল কুমার বসুর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ক্লাস টেনে পড়ার সময়, এক হাসপাতালের করিডরে। বাবা তখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন, আইসিইউ-তে। নানা মানুষ আসছেন তাঁর খবর নিতে। উৎপলদাও এসেছিলেন। খুব বেশি কথা হয়নি। শুধু মনে আছে, তিনি বলেছিলেন—“ঘোষালদা নিজেই নিজেকে ঠিক করে নেবেন।” কীভাবে নেবেন, সে কথা তখন বুঝতে পারিনি। তবে মনে হয়েছিল, বাবার এমন কোনো অন্তর্লৌকিক শক্তির সঙ্গে তিনি পরিচিত, যা আমার অজানা।
এরপর তাঁর সঙ্গে আবার যোগাযোগ গড়ে ওঠে ২০০৬ সালে, ঊর্বী প্রকাশনা ও একালের রক্তকরবী-র কর্ণধার প্রয়াত প্রদীপ ভট্টাচার্যের মাধ্যমে। সে সময় রক্তকরবী-তে আমার একগুচ্ছ কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। কপি সংগ্রহ করতে গিয়েছিলাম। প্রদীপকাকু পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পরই উৎপলদা বললেন, “তোমার কবিতা খুব শক্তিশালী। লিখে যাও। ছেড়ো না।”
কবিতা আমি বরাবরই কম লিখেছি। তবু সে সময় কথাটা শুনে ভালোই লেগেছিল। এরপর তিনি বললেন, “অনুবাদ পত্রিকা-য় আমার অনেক অনুবাদ ছাপা হয়েছে। তুমি জানো?”
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। স্যাফো, কমলা দাস, আয়াপ্পা পানিক্কর, অ্যালেন গিন্সবার্গ—অনেকেরই অনুবাদ পড়েছিলাম। তখন পুরোনো অনুবাদ পত্রিকা ঘেঁটে বোঝার চেষ্টা করছি, কারা লিখতেন, পত্রিকার চরিত্র কী ছিল। তাই তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরেছিলাম।
এরপর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ নিয়মিত হয়ে উঠল অনুবাদ আনতে যাওয়ার সূত্রে। গড়িয়াহাটের ‘মেঘমল্লার’ আবাসন সপ্তাহে এক-দুদিনের গন্তব্যস্থল হয়ে উঠল। সকালে গিয়ে দুপুর পর্যন্ত আড্ডা চলত। আমি অবশ্য নেহাতই শ্রোতা। তিনি এবং দিব্যেন্দু পালিত নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। একদিন হেসে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “এই, তুমি বিরক্ত হও না তো? হলেও শোনো। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।”
২০০৭ সালে অনুবাদ পত্রিকা-র ওয়েবসাইট উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন তিনি। মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, “ঘোষালবাবু যোগ্য উত্তরসুরী পেয়েছে। তবে বেশি অনুবাদ করলেই অনুবাদকের ছাপ্পা পড়ে যাবে।” আজও কাজ করতে গিয়ে কথাটার সত্যতা অনুভব করি।
গেলেই নানা বই পড়তে দিতেন, কোনোটা আবার উপহারও দিতেন। এমনই একদিন উপহার পেলাম তাঁর গদ্য সংগ্রহ ১। পড়তে গিয়ে বিস্মিত হলাম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় কিংবা শঙ্খ ঘোষের প্রায় সমসাময়িক হয়েও তাঁর গদ্য ও কবিতার ভাষা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। রবীন্দ্রনাথ একদা বলেছিলেন—“ভালো লেখকমাত্রেই একটি স্বকীয় লিখনরীতি থাকে; কিন্তু বড় লেখকের সেই রীতিটি পরিষ্কার ধরা শক্ত।” উৎপল বসুর ক্ষেত্রে যেন কথাটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য।
এই গদ্যসংকলনে ‘ঐ একমাত্র ভাষা’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ রয়েছে। সেখানে মাতৃভাষা প্রসঙ্গে তিনি লিখছেন—
“আসলে ভাষা নিয়ে অনেকেরই কোনো সমস্যা নেই। … মাতৃভাষা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই। মা তো চিন্তামণি। সমস্যা হল সাহেবদের নিয়ে… আসলে ভাষা একটাই। সেটা বন্দুকের ভাষা। … রাইফেলের ভাষা। যার অপর নাম, আজ নির্দ্বিধায় বলা যায়, মাতৃভাষা।”
পড়তে গিয়ে আজও ভাবি, কথাগুলি কতটা অমোঘ। সময় বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, কিন্তু ক্ষমতা ও ভাষার সম্পর্কের এই নির্মম সত্য যেন বদলায় না।
এই গ্রন্থের ‘সমালোচনা সাহিত্য’ অংশ উল্টে দেখলে বোঝা যায় তাঁর পাঠপরিসরের বিস্তার। ভবতোষ দত্তের তামসী, পরিমল গোস্বামীর দ্বিতীয় স্মৃতি, অজয় হোমের চেনা-অচেনা পাখি, কেতকী কুশারী ডাইসনের ভাবনার ভাস্কর্য, জীবনানন্দ দাশের কাব্যসংগ্রহ, বিষ্ণু দে-র এলোমেলো জীবন ও শিল্পসাহিত্য, কমলকুমার মজুমদারের লুপ্ত পূজাবিধি—এমন অসংখ্য বিচিত্র বই নিয়ে তিনি লিখেছেন।
কারণ তিনি মনে করতেন, বটতলার সাহিত্যকে ‘আগাছা’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এই লেখাগুলিই প্রায়শই অতিসাধারণ মানুষের জীবনকে শৈল্পিক প্রসাধন ছাড়াই ধারণ করে। সাহিত্যের বৃহত্তর ক্যানভাসে তাদেরও একটি মূল্য আছে।
তিনি নিজেই বলেছিলেন—
“সাধারণ—যাকে বলে স্ট্রিট-রিয়ালিটি—সেইসব চিন্তাই আমার লেখায় আছে। উচ্চমার্গীয় কোনো চিন্তা আমার লেখায় নেই।”
হয়তো সেই কারণেই তাঁর কবিতায় একদিকে যেমন পথের ধুলো, সাধারণ মানুষের জীবন, ভ্রমণ ও ইতিহাস আছে, তেমনই আছে গভীর অস্তিত্ববোধ এবং মহাজাগতিক নিঃসঙ্গতার অনুভব।
হয়তো সেই কারণেই তিনি অনায়াসে লিখতে পারেন—
“আসলে মৃত্যুও নয় প্রাকৃতিক, দৈব অনুরোধ।
যাদের সংকেতে আমি যথাযথ সব কাজ ফেলে যাব দূর শূন্যপথে—
তারা কেমন বান্ধব বলো, কোন্ ঘড়ি? কোন্ সূর্যরথ?”
(চৈত্রে রচিত কবিতা)
এই কবিতাগুলি পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়, উৎপল কুমার বসু বাংলা কবিতার মূল স্রোতে থেকেও যেন একটু তফাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক কবি। তিনি আবেগকে অস্বীকার করেন না, কিন্তু আবেগের পরিবর্তে তার গঠনপ্রকৃতি, তার অন্তর্লীন গতিবিদ্যা, তার দৃশ্যমান ও অদৃশ্য উপকরণগুলি পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁর কবিতায় রহস্য আছে, কিন্তু তা কোনো অতীন্দ্রিয় কুহক নয়; বরং বাস্তবের গভীরে লুকিয়ে থাকা অজানা স্তরগুলির অনুসন্ধান।
১৯৫৬ সালে প্রকাশিত চৈত্রে রচিত কবিতা থেকেই তিনি তাঁর কবিতার জন্য একটি স্বতন্ত্র ভাষা ও আঙ্গিক নির্মাণ করতে শুরু করেছিলেন। বাংলা কবিতার প্রচলিত গীতলতা, রোমান্টিক ভাবপ্রবণতা কিংবা অলংকারনির্ভর বাচনভঙ্গির বাইরে এসে তিনি নির্মাণ করেন এক নতুন কাব্যভাষা। সেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যেমন আছে, তেমনই আছে ভূগোল, ইতিহাস, প্রত্নচেতনা, ভ্রমণ, শরীর এবং নগর-বাস্তবতা।
পরবর্তী কালে পুরী সিরিজ (১৯৬৪) এবং আবার পুরী সিরিজ (১৯৭৮) বাংলা কবিতায় এক অভিনব শব্দভাণ্ডার ও দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা করে। এই কাব্যগ্রন্থগুলিকে ঘিরেই উৎপল বসুর তথাকথিত ‘ভ্রমণ-কবিতা’-র ধারণাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যদিও তাঁর ভ্রমণ কেবল স্থানান্তরের বিবরণ নয়; বরং দেখা, চিনে নেওয়া এবং পুনর্নির্মাণের এক অন্তহীন প্রক্রিয়া।
১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু ১৯৬১ সালে হাংরি আন্দোলনের সূচনা হলে কলেজজীবনের বন্ধু সমীর রায়চৌধুরীর সূত্রে সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। হাংরি বুলেটিনে কবিতা প্রকাশের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল এবং চাকরিও হারাতে হয়েছিল। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কবিতা লেখার দায়ে চাকরি হারানোর ঘটনা অত্যন্ত বিরল। কিন্তু এই প্রতিকূলতাও তাঁকে তাঁর নিজস্ব কাব্যপথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
ভাষা, শব্দ, বাক্যগঠন, চিহ্নব্যবহার, এমনকি ছন্দ ও চিত্রকল্প নির্মাণেও তিনি বারবার নিজের স্বাতন্ত্র্য প্রমাণ করেছেন। তাই তিনি লিখতে পারেন—
“একদিন, যখন সময় হবে, বসো এই কাব্যের পাশে…
কোরা কাপড়ের গিঁট, অন্ধক্রোধ—
একদিন দেখো তুমি খুলে।”
(উৎসর্গপত্র, শ্রেষ্ঠ কবিতা)
আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, উৎপল বসুর কবিতার কেন্দ্রে রয়েছে এক নিরন্তর যাত্রা। শুধু ভৌগোলিক নয়, মানসিক ও সাংস্কৃতিকও। তাঁর কবিতার বক্তা যেন সদা-ভ্রমণশীল। পথে বেরিয়ে তিনি কেবল দৃশ্য দেখেন না; দৃশ্যের অন্তর্গত ইতিহাস, মানুষের জীবন, প্রকৃতির নীরব সংকেত এবং সভ্যতার স্তরবিন্যাসও পাঠ করেন।
শ্রেষ্ঠ কবিতা-র ভূমিকায় তিনি লিখছেন—
“নীচে লতাগুল্ম পারিপার্শ্বিকের ভিতর দিয়ে আমরা হেঁটে যেতে থাকলাম উপরের দিকে… চকমকি ঠোকার শব্দে আমি শুনি হাহাকার… আমি দেখি সাংকেতিক পাথর। আদিম পুরুষ কিছু লেখার চেষ্টা করেছিল। তাঁরই বিজ্ঞাপন…”
এই অংশগুলি পড়তে পড়তে মনে হয়, একজন ভূতত্ত্ববিদ, একজন পর্যটক এবং একজন কবি যেন একই সঙ্গে কথা বলছেন। উৎপল বসুর বিশেষত্ব এখানেই—তাঁর কবিতায় পৃথিবীকে দেখা হয় বহুস্তরীয় এক পাঠ্যবস্তুর মতো।
শুধু কবিতা বা গদ্য নয়, গল্পেও তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ ছিল লক্ষণীয়। ‘ঘড়ি’ গল্পের শেষাংশে যেমন একটি সাধারণ গৃহস্থালির বস্তু থেকে সময়, স্মৃতি ও আধুনিকতার প্রশ্ন উঠে আসে। আবার ‘নরখাদক’ গল্পে এক রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যাদুকরের জীবন্ত মুরগি ভক্ষণ থেকে অনায়াসে পৌঁছে যান মিশরের মমি এবং মৃত্যুচেতনার গভীরে। তাঁর গল্পগুলিও তাই প্রচলিত গল্পরীতির বাইরে গিয়ে এক ধরনের ভাবনামূলক গদ্যভূমি নির্মাণ করে।
১৯৩৭ সালে কলকাতার ভবানীপুরে জন্মগ্রহণ করেন উৎপল কুমার বসু। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বহরমপুর ও দিনহাটায়। স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়ার সময় সাহিত্যচর্চার সূচনা এবং পরে কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হওয়া। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ভূতত্ত্বে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর আশুতোষ কলেজে অধ্যাপনা করেন। ষাটের দশকের মাঝামাঝি ইংল্যান্ডে পাড়ি দেন এবং দীর্ঘ প্রায় চৌদ্দ বছর সেখানে বসবাস করেন। দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন-সংযুক্ত বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করেন এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে গণযোগাযোগ বিষয়ে পাঠদান করেন।
তাঁর কাব্যগ্রন্থ সুখদুঃখের সাথী-র জন্য ২০০৬ সালে আনন্দ পুরস্কার এবং ২০১১ সালে রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন। পিয়ামন ভাবে কাব্যগ্রন্থের জন্য ২০১৪ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হন। পরবর্তীকালে কমলা দাসের কবিতার বাংলা অনুবাদের জন্য মরণোত্তর সাহিত্য অকাদেমি অনুবাদ পুরস্কারেও ভূষিত হন।
২০১৫ সালের ৩ অক্টোবর তিনি প্রয়াত হন। কিন্তু বাংলা কবিতার পরিসরে তাঁর উপস্থিতি আজও সমান উজ্জ্বল। কারণ উৎপল কুমার বসু কেবল নতুন ভাষা নির্মাণ করেননি; তিনি বাংলা কবিতাকে নতুন করে পৃথিবী দেখতে শিখিয়েছেন। তাঁর কবিতায় যেমন পথ আছে, তেমনই পথভ্রষ্টতা; যেমন ভ্রমণ আছে, তেমনই আত্মসন্ধান; যেমন স্ট্রিট-রিয়ালিটি আছে, তেমনই মহাজাগতিক বিস্ময়।
এই কারণেই বাংলা কবিতার ইতিহাসে উৎপল কুমার বসু এক অনন্য, অপরিবর্তনীয় এবং এখনও সম্পূর্ণরূপে অনাবিষ্কৃত উপস্থিতি।



