অনিতা অগ্নিহোত্রী তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে ইতিহাসই লেখেন

অনিতা অগ্নিহোত্রী তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে ইতিহাসই লেখেন

আলোর পথযাত্রী - বিতস্তা ঘোষাল

আলোর পথযাত্রী

২ : আলোর পথযাত্রী

…সৃষ্টির শেষ রহস্য, ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব সেন

“…সৃষ্টির শেষ রহস্য,ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব সেন

কর্তার সিং দুগ্গল: এক বিরল স্রষ্টা

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন  

অম্লান দত্ত – এক বিশ্ব মানব

রবীন্দ্রনাথ ও বিশ্বকবিতা

এমন কী সন্দীপন যখন স্বপ্নে প্রবেশ করেন তখনও সে স্বপ্নের কোনও ওষ্ঠ নেই,উচ্চারণ নেই

বিশ্বকে বাংলায় চেনার জানলা মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

সোমক দাস : হৃদয়ের ছাইগুলি সযত্নে সাজিয়ে রাখার এক স্বতন্ত্র স্বর

টেবিল, দূরের সন্ধ্যা কবি পার্থপ্রতীম কাঞ্জিলাল

স্ট্রিট-রিয়ালিটির লেখক উৎপল কুমার বসু

অনিতা অগ্নিহোত্রী তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে ইতিহাসই লেখেন

২০০৭ অথবা ২০০৮ সাল, ঠিক মনে নেই। আনন্দবাজার পত্রিকার ‘রবিবাসরীয়’ ক্রোড়পত্রে একটি গল্প পড়ে দারুণভাবে চমকে উঠেছিলাম। গল্পটার নাম ছিল ‘ছায়াযুদ্ধ’, লেখিকা অনিতা অগ্নিহোত্রী।

গল্পের মূল বিষয়বস্তু ছিল আদিবাসীদের জীবন ও সংগ্রাম। সরকার জোরপূর্বক তাঁদের জমি অধিগ্রহণ করে একটি বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দিয়েছে। কোম্পানি নিজেদের মতো করে সেই জমির চারপাশে বিশাল পাঁচিল তুলেছে। ভিটেমাটি হারা আদিবাসীরা সরকারকে সরাসরি সামনে পায়নি, পেয়েছিল কোম্পানির লোকেদের। ক্ষোভে ফেটে পড়া শ-পাঁচেক মানুষ তাড়া করে পাহারারত হাবিলদারকে ধরে টাঙ্গি আর বল্লম দিয়ে ফালাফালা করে দেয়। এর নৃশংস জবাবে পুলিশ চালায় রাউন্ডের পর রাউন্ড গুলি। ঘটনাস্থলেই বারো জন মৃত, আর তিরিশ জন আহত হয়ে হাসপাতালে। এরপর তা নিয়ে শুরু হয় কুৎসিত রাজনৈতিক খেলা আর মিডিয়ার চিৎকার— ‘স্বাধীনতার পর এক গুলিবর্ষণে এতগুলো মানুষ কখনো মারা যায়নি!’

যতদূর মনে পড়ে, গল্পটা শুরু হয়েছিল এক পুলিশ দম্পতিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু গল্প যত এগিয়েছে, একটা গোটা আদিবাসী গ্রামের অবয়ব আর যন্ত্রণার ছবি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। এই ঘটনার পর পরই সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলন আমাদের চেতনাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল।

তখনো আমি লেখিকাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম না। তবে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, এই অসামান্য গল্পটি পড়ার পর থেকেই আমি অনিতা অগ্নিহোত্রীর লেখা নিয়মিত পড়তে শুরু করি। যদিও তাঁর সঙ্গে কখনো আমার সরাসরি সাক্ষাৎ বা কোনো যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি, কিন্তু তাঁর লেখনী আমার মনে চিরস্থায়ী দাগ কেটে গেছে।

তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম কথা ও দেখা ২০২৩ সালের শেষের দিকে। ভূবনেশ্বর পরিচয় লিট ফেস্টে গেছি কবি ফণি মহন্তির ডাকে।তিনি অনুষ্ঠান শেষে বললেন, চলো তোমাকে সীতাকান্ত মহাপাত্রের বাড়ি নিয়ে যাই।কবি সীতাকান্ত ওডিয়া সাহিত্য জগতের কিংবদন্তী পুরুষ। অনেক ছোটোবেলায় ‘অনুবাদ পত্রিকা’র এক অনুষ্ঠানে তাঁকে মালা পরিয়েছিলাম। বাবার সঙ্গে খুবই পরিচয় ছিল তাঁর। কিন্তু তার পর আর যোগাযোগ নেই। দাদা আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর বাবার কথা এবং অন্যান্য কথা চলাকালীন দাদা বললেন, বিতস্তাকে আপনার একটা বই করার অনুমতি দিন।তিনি বললেন বাংলায় আমার দুটি বই হয়েছে।একটা তপন বন্দোপাধ্যায় আরেকটা অনিতা করেছিলেন।কিন্তু বইগুলো পাওয়া যায় না। বিশেষ করে অনিতা যেটি করেছিলেন, সেটি আমার খুব পছন্দ হয়েছিল। আমি বই দুটো দেখতে চাইলাম।তিনি দেখালেন।দাদা বললেন, এই বইটাই তাহলে বিতস্তাকে করতে অনুমতি দিন।

উনি বললেন- বেশ, তবে অনিতার সঙ্গে কথা বলে নিও। আর আমার কাছে একটাই কপি আছে।তুমি অনিতার থেকে নিয়ে নিও।

ফিরে এসে ফেসবুকে বইয়ের ছবি সমেত পোস্ট করলে দিদি কমেন্ট করেন। এর পরই দিদির সঙ্গে কথা বলে আমরা ‘মাটি অপেক্ষা কে’ এই অনুবাদ বইয়ের কাজ শুরু করি। এবং ২০২৪ এ তা প্রকাশিত হয়।

এই বইয়ের ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন “যশস্বী কবি সীতাকান্ত মহাপাত্র র ‘মাটি অপেক্ষা করে ‘ বইটির বাংলা অনুবাদ আমার প্রথম অনুবাদের কাজ ও একমাত্র অনূদিত কবিতা বই। বইটির কথা আমার মাথা থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। কারণ প্রকাশকের কাছ থেকে একটি মাত্র কপি পেরেছিলাম। বহু স্থানান্তরের ফলে সেটা যে কোথায় রেখেছি  এখন মনে নেই। বইটি তার স্মৃতি সহ পুনরায় উদ্ধার হল, গত বছর অনুবাদ পত্রিকা সম্পাদক বিতস্তা ঘোষাল কাজের সূত্রে ভুবনেশ্বর গিয়ে ড সীতাকান্ত মহাপাত্র র সঙ্গে দেখা করলে। ড. মহাপাত্র তাঁর  বাংলায় অনুবাদ হওয়া কবিতা প্রসঙ্গে  অগ্রজ সাহিত্যিক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অনুবাদ ‘ভারতবর্ষ ‘এবং আমার অনুবাদে ‘মাটি অপেক্ষা করে ‘র উল্লেখ করেন। তখন বিতস্তা কবিকে বইটির অনুবাদ পুন:প্রকাশের জন্য অনুমতি ও প্রস্তাব পাঠান। পরে আমি ভুবনেশ্বর গিয়ে কবির সঙ্গে দেখা করে বইটির প্রতিলিপি নিয়ে আসি। সীতাকান্ত বাবুর কাছেও ঐ একটি মাত্র কপি। অনুবাদ বইটি কলকাতা র প্রমা প্রকাশনী থেকে এ বেরিয়ে ছিল। যতদূর মনে আছে প্রকাশক নিজেই অনুরোধ করেছিলেন কবিকে । আমি অনুবাদ করেছিলাম মূল ওড়িয়া ভাষা থেকে।মূল নামটিও বদলাই নি। কারণ কানে শোনায় কথা গুলি বাংলার ই মত।ওড়িয়া , মারাঠী, হিন্দি এই তিনটি ভাষাই আমি জানি। সাহিত্য রচনা করার উপযুক্ত জ্ঞান নেই হয়তো, তবে মূল ভাষা থেকে অনুবাদ করতে অসুবিধে নেই। বইটির অনুবাদের কাজ যখন চলছিল তখন আমি কলকাতায়। তবে ওড়িশায় তার আগে একদশকের বেশি সময় কাটিয়েছি।বলতে গেলে কর্মজীবনের সূচনার কয়েক বছর বিহারের ছোটানাগপুর অঞ্চলে কাটিয়ে আমি ওড়িশায় চলে যাই।তখন আমার বয়স অল্প। কাজে দূর দূরান্তে যেতাম। উপকূল অঞ্চলের নদী, সমুদ্রতট, উত্তর মধ্যওড়িশার পাহাড় , অরণ্য সব কিছু আমাকে মায়ায় জড়িয়ে ছিল। মানুষজন ও খুব সহজ সরল, আদরে আন্তরিকতায় জড়িয়ে রাখেন।ওড়িশার একটি বৈশিষ্ট্য হল শিকড়ের সঙ্গে মানুষের যোগ। শহরের মানুষ ও গ্রামের ভিটে মাটি জমি জিরেত চাষ বাসের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন। যতখানি শহরের তাঁরা ততখানিই গ্রামের।… কত বিচিত্র কবিতা ছোট এই বইটিতে। তাঁর পিতামহ, মা, বাবা সবাই নিজস্ব রূপ ধরে এসে ছেন কবিতায়, এসেছে বাগানের লেবু গাছটি, অন্ধ কবি ভীম ভোই, গ্রাম প্রান্তের শ্মশানের শূন্যতা ও এক বালকের শোক, কিন্তু প্রতিটি কবিতা পরস্পরের সঙ্গে বাঁধা হয়ে আছে এক অদৃশ্য অথচ নিবিড় গ্রন্থিতে, তা হল মাটির ও সম্পর্কের মায়া।

‘ ধানকাটা ‘কবিতাটি এই ভাবে আরম্ভ হয়েছে,

সমস্ত ধানক্ষেতে ছড়িয়ে রয়েছে

মানুষের ক্ষুধা ও স্বেদ,

সারা দিন ঘাই দিয়ে উঠছে

ভাত ও ফ্যানের গন্ধ

মা লক্ষ্মীর শাড়ি মুড়ি দিয়ে আছে পৃথিবী।

মনে হয় যেন যা দৃষ্টি গোচর নয় , সেই ক্ষুধা ও গন্ধের ও ছবি এঁকেছেন কবি।তাঁর কবিতার মধ্যে আছে গ্রামের মাটির সারল্য অথচ ভূয়োদর্শী শিল্পীর নৈপুণ্য …। অনুবাদ করতে কোন কষ্ট হয়নি।কাজও দ্রুত হয়ে গিয়েছিল। বইটি প্রকাশ পেয়েছিল কলকাতার কোন অনুষ্ঠানে, যতদূর মনে পড়ে মহাশ্বেতা দেবীর হাতে। কিন্তু আমি সেখানে আমন্ত্রিত হইনি। একটি মাত্র কপি পরে অনুরোধ করে পেয়েছিলাম। কারণ জানিনা, তবে মূল্যবান একটি বইয়ের বাংলা অনুবাদ প্রকাশকের নিস্পৃহতায় হারিয়েই গেল। পুরোপুরি যেত, বিতস্তার মাধ্যমে এই অনুবাদ চেষ্টার পুনরুদ্ধার না হলে।

আজ থেকে পঁচিশ বছর আগেকার কথা এই সব। সীতাকান্ত মহাপাত্র তখনই খুব বিখ্যাত ছিলেন, ‘শব্দের আকাশ ‘কাব্য গ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯৭৪ সালেই।… ১৯৯৩ তে পেয়েছেন জ্ঞানপীঠ পুরস্কার।তারপর পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষণ। এখন তাঁর বয়স ৮৬। ভুবনেশ্বরের শান্ত এলাকায় নিজের বাড়িতে নিজের মত করে সময় কাটান, বই পত্রের মধ্যে। ‘মাটি অপেক্ষা করে’ শীর্ষক অনুবাদ বইটির পুন:প্রকাশের সংবাদে তিনি ও আনন্দিত। এমন সহজ নিরহংকার মানুষ, ছাপা হলে তিনটি কপি চেয়েছেন নতুন বইয়ের।বিতস্তার পাওনা রইল অনেক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা, অতীতের কিছু সুন্দর স্মৃতি কে ফিরিয়ে দেবার জন্য।”

এটুকুই দিদির সঙ্গে আমার পরিচয়।সে অর্থে একেবারেই কাছের কেউ নই। কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমার বন্ধন মুলত লেখার, তাঁর পাঠক হিসাবে। 

তাঁর জন্ম এবং বেড়ে ওঠা দক্ষিণ কলকাতায়। শৈশবে বাড়িতে সাহিত্যের আবহ ছিল। অক্ষর পরিচয় হওয়ার আগে থেকেই মুখে মুখে কবিতা বলতেন। মাত্র বারো বছর বয়স থেকে ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় কবিতা লিখতেন অনিতা চট্টোপাধ্যায়। ১৯৮২ থেকে ‘অগ্নিহোত্রী’ পদবি ব্যবহার করছেন। তাঁর সাহিত্যজীবনের মূল চালিকা শক্তি মা নমিতা চট্টোপাধ্যায়। মায়ের উৎসাহেই কবিতা থেকে গল্প লিখতে এলেন। প্রথম গল্প ‘স্থানান্তর’ প্রকাশিত হয় দেশ পত্রিকায়। বিশ শতকের আশির বছরগুলি থেকে নিয়মিত গল্প লিখে চলেছেন। তাঁর প্রথম গল্প সংকলন ‘চক্রব্যূহ’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে। উল্লেখ্য তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘চন্দনগাছ’ (১৯৮৭)।         

নীতিহীন হিংস্র রাজনীতির চিহ্ন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, দেশের আর্থ-সামাজিক কাঠামো, অপরিমিত লোভের আগ্রাসনে অরণ্য-নিধন, পরিবেশ ধ্বংস, উন্নয়নের নামে আদিম অধিবাসীদের সমূলে বিনাশ করে শিকড়চ্যুত করা…ইত্যাদি উদগ্র হয়ে থাকে তাঁর গল্পের স্তরে স্তরে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া সমাজ-রাজনৈতিক ঘটনাগুলি বাংলা গল্পে এত গভীরভাবে আর কেউ নিয়ে আসেননি। বিশেষ করে আদিবাসীদের উপর রাষ্ট্রিক সন্ত্রাসের ছবি বারবার উঠে এসেছে তাঁর গল্পে।নগর জীবনের মিথ্যে সুখভোগে নিশ্চিন্ত না হয়ে সত্যিকারের মানুষ ও তাদের জীবনের অনুসন্ধানে যিনি সারাজীবন নিযুক্ত রেখেছেন তাঁর মননকে, ঝাঁ চকচকে উন্নত প্রযুক্তিপূর্ণ লাইফস্টাইলের নীচে লুকিয়ে আছে যে যন্ত্রণা অভাবপূর্ণ জীবনগাথা, তাকে সাহিত্যে তুলে এনে ‘দেশের ভিতরে দেশ’ কে দেখাতে চেয়েছেন তিনি তাঁর প্রতিটি গল্পে, উপন্যাসে, প্রবন্ধে, কবিতায়।

অর্থনীতি বিষয়ে তাঁর পড়াশোনা। পেশাগতভাবে আইএএস, এই সাহিত্যিক কাজে ও না-কাজে ঘুরেছেন ভারতের নানা স্থানে।  স্বভাবতই প্রত্যন্ত অঞ্চলের অচেনা মানুষ, শহরের বাস্তব জীবন, অস্ফুট ভারতবর্ষের স্বরের বিন্যাস চালচিত্রের মতো এসে দাঁড়িয়েছে তাঁর লেখায়। তাঁর অভিজ্ঞতার জগৎ, কর্মজীবনের ছাপ পড়েছে তাঁর সাহিত্যকর্মে। প্রশাসনিক স্তরের উচ্চপদস্থ আমলা হিসাবে তিনি রাষ্ট্র ও সিস্টেমকে অনেক কাছ থেকে দেখেছেন, দেখেছেন সিস্টেমের ভিতরে থাকা নানা ত্রুটি-বিচ্যুতিকে, যা সমাজের নানা স্তরের মানুষের জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে।ভারতবর্ষের মুখের অন্তরালে যে কঙ্কালকীর্ণ মুখটি রয়েছে তা প্রকাশ করার দায়বদ্ধতা তাঁকে দিয়ে তাই লিখিয়েছে একের পর এক গল্প উপন্যাস – ‘মহুলডিহার দিন’ (১৯৯৬), ‘অতলস্পর্শ’ (২০০৬), ‘আয়নায় মানুষ নাই’ (২০১৩), ‘মহানদী’ (২০১৫), ‘সেরা পঞ্চাশটি গল্প’ (২০১৮), ‘কাস্তে’ (২০১৯) , ‘লবণাক্ত’ ইত্যদি।

তাঁর আখ্যানে কোনও কৃত্রিমতা তৈরি হয় না।তাঁর নিজস্ব জীবন-পথের কথাই তুলে ধরেন। সেই জীবন-পথের অনিবার্য অঙ্গ হয়ে ওঠেন আদিম অধিবাসীরা। অরণ্যচারীদের দুঃখ-সংঘাত ভাঙা-গড়ার অবিরাম ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন।

তাঁর গল্পের জোরের জায়গা রাজনীতি-চেতনা। সেই রাজনীতিবোধও তাঁর জীবন-অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই প্রসঙ্গে তাঁর স্বীকারোক্তি— “যেকোনও শিল্পরূপই রাজনৈতিক চেতনার অভিব্যক্তি। অবচেতন থেকে সঞ্চারিত হয় কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে। আমাদের দেশের জনসংখ্যার বৃহত্তম অংশ এঁরাই— প্রান্তিক কৃষিজীবী, দিনমজুর, দলিত আদিবাসী জনসমাজ— স্বাধীনতার এত বছর পরও যাঁদের কথা শোনার, বোঝার উপযুক্ত ব্যবস্থা আমরা করে উঠতে পারিনি। কলকাতা শহর ছাড়ার পর এঁদের সঙ্গে কেটেছে আমার জীবনের তিন দশকের বেশি। প্রশাসনে থেকে নিজেকে মানুষের পক্ষে ভাবার মধ্যে তাত্ত্বিক বিসঙ্গতি আছে। সেই দ্বন্দ্বের ভার বহন করেই আমি আমার কাজ ও লেখালিখি চালিয়ে গেছি। নানা টানাপোড়েন অন্তর যেমন দীর্ণ, ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, তেমনই বহু লেখা সিক্ত হয়েছে নিজেরই চোখের জলে। এই নিরুপায়, অনিশ্চিত অস্তিত্বই আমার আত্মপরিচয়।”(‘বইয়ের দেশ’, সেপ্টেম্বর ২০২০)     

এই যে গভীর রাজনৈতিক চেতনা ও প্রান্তিক মানুষের প্রতি তাঁর অনুভূতিপ্রবণ দৃষ্টি তাই ফুটে উঠেছে ‘কাস্তে’তে। “… যারা দেশান্তরে জন খাটতে যায়, আখ কাটাই-এর কাজে, তাদের ঘরে মেয়ে হলে বলে — ‘এক কইতা কমি’ মানে একটা কাস্তে কম হল। স্বামী-স্ত্রী মিলে এক কাস্তে, ব্যাটাছেলে সন্তান — সেও আধ বা সিকি কাস্তে। কিন্তু মেয়ে তো বাপের সংসারে থাকবে না। সে চলে যাবে পরের ঘর, তাদের ঘরের যে কাজের হাত, তাতে জুড়ে যাবে। বাপের ঘরে কম হবে একটি হাত, একখানা কাস্তে। … কাজেই মেয়েদের জন্ম না দেওয়াটাই বুদ্ধির কাজ। … হাজার টাকায় মেয়ে না ছেলে তার জাঁচ, তিন হাজার টাকায় মেয়ে খালাস। … চলতেই থাকে মারণযজ্ঞ।”

আবার‘মহানদী’-তে বিষয়-কাহিনি-আখ্যান এসব কোনও কিছুই নেই। আছে শুধু মহানদী-ই। আছে তার নিরলস বয়ে চলা। নদী এগিয়ে চলে, উপন্যাস এগিয়ে চলে, পাঠক এগিয়ে চলে, লেখকও এগিয়ে চলেন। ভারতের অন্যতম দীর্ঘ ও বৃহৎ এই নদী ছত্তিশগড়ের ধম্‌তরি জেলার সিহাওয়া পর্বতের পাদদেশ থেকে বেরিয়ে ছত্তিশগড়ের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ওড়িশায় প্রবেশ করেছে। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে ওড়িশার সম্বলপুরে মহানদীর বাঁধ বেঁধে তৈরি করা হয়েছে হীরাকুদ জলভাণ্ডার। এরপর সুবর্ণপুর ও বৌদ্ধ জেলার মধ্য দিয়ে বয়ে মহানদী টিকরপাড়ার গভীর অরণ্যসংকুল গিরিখাতের মাঝখানে এসে পড়েছে। এখান থেকে নয়াগড় হয়ে কটক জেলার মধ্য দিয়ে বয়ে মহানদী জগৎসিংহপুরের কাছে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। হাজার কিলোমিটারের বেশি যাত্রাপথে আছে পাহাড়-পর্বত-মালভূমি-গিরিখাত-অরণ্য-সমতলভূমি-উপনদী-শাখানদী-মোহানা-অজস্র জনপদ-গ্রাম-শহর-বন্দর-জনহীন প্রান্তর ইত্যাদি। আর এই সবই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে মহানদীর জঙ্গম আখ্যানের পটভূমি। এহেন সুবৃহৎ ব্যাপ্ত পটভূমিতে আখ্যায়িত হয়েছে নদী সন্নিহিত অঞ্চলের মানুষজনদের যাপন, মিথ, কিংবদন্তী, লোককথা, লোকপুরাণ, মানুষের মুখে মুখে গড়ে ওঠা জনজীবনের ইতিহাস।

 তাঁর ‘লবণাক্ত’ এ উপন্যাস শুরু হয় মাঘ মাসের শেষে এক লোনা মরুভূমির ঝুপড়িতে।জলের প্রত্যাশায় বসে থাকা মালতীকে দিয়ে। স্বাধীন দেশে তারা ‘বিমুক্ত জনজাতি’- ঘর ও বাহিরের মধ্যে নিরন্তর চলাচল তাদের রক্তে। এদের অধিকাংশই হিন্দু-চুনভালিয়া কোলি সম্প্রদায়ের, মিয়ানা, সান্ধি গোষ্ঠীর আগারিয়ারা মুসলমান। ভারতের উপকূল অঞ্চল জুড়ে কোলিদের বসতি। মুম্বইয়ের মতো শহরেও তাদের মাছ ধরার নৌকা আর জাল চোখে পড়ে। ব্রিটিশ এদেশে আসার অনেক আগে থেকেই, কয়েকশো বছর ধরে লবণের খেতি করে আসছে তারা। বুড়োরা বলে, হাজার। তবে কাগজে-কলমে প্রমাণ নেই। ‘আগর’ মানে লবণের খেত, তাই তাদের নাম ‘আগারিয়া’। রণ অঞ্চলে সমুদ্র ছিল একদিন, তাই এত লবণ মাটির নিচে। কূপ খুঁড়ে যে জল ওঠে, তা সমুদ্র জলের চেয়েও ছ’গুণ বেশি লবণাক্ত।এই আগাড়িয়াদের নিয়ে বর্ণনা দেওয়াকালীনই আমরা জেনে যাই,কচ্ছ উপসাগর,সিন্ধু নদের গতিপথ বদল, ভূমিকম্পে বদলে যাওয়া মানচিত্র, থর মরুভূমির ভৌগলিক বিবরণ। এবং তার সঙ্গে মাইথোলজি, পুরাণ।এক পাত্র জলের অপেক্ষায় ছাতি ফেটে যাওয়া করুণ মুখগুলো দেখতে দেখতে লেখিকা সুনিপুণ ভাবে মালতির মুখ দিয়ে বলিয়েছেন- “হ্যাঁ গো, এত ভাঙা-গড়া হল পৃথিবীর কাছিম পিঠে, আমাদের জন্য একটু মিষ্টি জল আনা করাতে পারল না দেবতারা? তেষ্টা নিয়ে জন্মাবে মানুষ, আবার তেষ্টা নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে- এটা কী ধরনের ন্যায়বিচার, বলো দেখি!”

মালতির পাশাপাশিই আর এক নারী এসে দাঁড়ান পাঠকের সামনে।কস্তুরবা।মহাত্মা গান্ধীর স্ত্রী।আমরা লেখিকার হাত ধরে টাইম মেশিনে পিছনে ফিরে গিয়ে দেখতে পাই ডাণ্ডি অভিযানের আগের রাত, যেখানে কস্তুরবার চোখ দিয়ে দেখি, এই অভিযানের কারণ, প্রস্তুতি পর্ব ও অভিযান শুরু হওয়া। যেখানে গান্ধী একজন মহিলাকেও রাখেনি, হাজার অনুরোধ সত্তেও।কারণ বাপুর যুক্তি, “গাভীদের যেমন হিন্দুরা আক্রমণ করে না, ইংরেজও আমাদের নারীদের আক্রমণ করতে বিরত থাকবে।তা জেনে শুনেও, যদি মহিলাদের আমি সমগামী হতে দিই, সে তো আমাদের কাপুরুষতার পরিচয়ই।…”

ডাণ্ডি মার্চের নব্বই বছর পর ‘‘লবণাক্ত’ উপন্যাসে লেখা হয়। এ এক এমন ভারতের মুখোমুখি দাঁড় করায় আমায় যার উত্তর পাওয়া যায়, এভাবেই- “ব্রিটিশ আমাদের জল দিয়েছিল।লোহার পাইপে মরচে ধরে যাবে বলে, চিনামাটির পাইপ বসিয়ে দিয়েছিল ষাট মাইল, খারাগোড়া থেকে লবণের খেত পর্যন্ত। তার মাঝে মাঝে জল ধরার চৌবাচ্চা বসানো ছিল, পাকা চৌবাচ্চা।মিষ্টি জল পাবে আগারিয়া।তাদের চিন্তা ছিল।”

এ অন্য এক স্বাধীনতা আন্দোলনের বৃত্তান্ত।

অনিতা অগ্নিহোত্রী তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে ইতিহাসই লেখেন।সে ইতিহাস প্রান্তিক মানুষের, সমাজের এবং তা শাসকের দৃষ্টিতে নয়, এক নির্মোহ পর্যবেক্ষণে।

আলোর পথযাত্রী - বিতস্তা ঘোষাল

স্ট্রিট-রিয়ালিটির লেখক উৎপল কুমার বসু

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

১৪ : অনুবাদ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

This entry is part 15 of 15 in the series আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক ১ : অনুবাদের বাদ,

Read More »