ধ্রুপদী সাহিত্য
শ্যামলকৃষ্ণ বসু
৫
তিনি রাবণ

তিনি রাবণ। ঘোর নাদকারী রাবণ।
ধুর্জ্জটি কহিলেন নারদে তখন ,
চারিঅংশ দেখিলে সে কিসের কারন ।
যে রূপে দেখিলে হরি গোলোক ভিতর ।
জন্ম নিতে আছেন ষাটি সহস্র বৎসর ।।
রাবন রাক্ষস হবে পৃথিবী মন্ডলে ।
তাহারে বধিতে জন্ম লবেন ভূতলে ।। [কৃত্তিবাস ]
তিনি রাবন। লংকাপতি রাবন। তিনি লংকেশ্বর দশানন। মহেশ্বর তাঁকে আখ্যা দেন ‘রাবন।’
ব্রহ্মার পুত্র পুলস্ত্য। তস্য পুত্র বিশ্বশ্রবা। বিশ্বশ্রবার প্রথম পক্ষের পুত্র কুবের। এবং বিশ্বশ্রবার দ্বিতীয় পক্ষের পুত্র হলেন রাবণ । এবং তাঁর অন্য দুই ভাই স্বয়ং কুম্ভকর্ণ এবং বিভীষণ। কুবের ছিলেন রাবনের বৈমাত্রেয় ভাই।
কুবের ছিলেন ধনলোকপাল। তিনি একজন গন্ধর্ব।
কিন্তু রাক্ষস কেন রাবণ ? সে এক কাহিনী ।
মহামুনী বিশ্বশ্রবা আছেন তপস্যায়।
কৈকসী বিচিত্র বেশে সন্মুখে দন্ডায়। [ কৃত্তিবাস ]
বিশ্বশ্রবা জিজ্ঞাসেন তারে,‘ কে তুমি রূপসীনি ? কি তোমার অভিলাষ !’
নিকষা বলেন,‘মুনিবর, আমি পুত্র অভিলাষীনি রাক্ষস সুমালীর কন্যা। নাম কৈকসী। রাক্ষসকুলে জন্ম আমার জাতিতে রাক্ষসী।
বিশ্বশ্রবা স্মিতহাস্যে বলে ওঠেন,‘ বুঝেছি কন্যা ! তোমার উদ্দেশ্য পুত্র লাভ। কিন্তু এমন দারুন প্রদোষকালে যদি এলে তবে, তোমার পুত্রগন অবশ্যই এক একজন দারুণ ক্রুরকর্মা রাক্ষস হয়ে উঠবেন।’
কৈকসী বললেন,‘ দয়া করুন মুনীবর। তাঁরা যশস্বী হোক। তাঁরা হউক প্রবল প্রতাপান্বিত এ সমগ্র বিশ্বে !‘
মুনিবর বললেন, ‘ কৈকসী, দারুন তোমার উচ্চাশা। উত্তম, তাহাই হউক। হে নারী, শুন,
তিন পুত্র ধরিবে আপন উদরে।
দুই পুত্র মরিবে আপন অহংকারে।
সর্বকনিষ্ঠ পুত্র হইবে কুলের উচিত।
ধার্মিক হইবে সে বিচারে পন্ডিত। [কৃত্তিবাস ]
যথাকালে কৈকসী এক দারুন রাক্ষস পুত্র প্রসব করলেন। তিনিই রাবণ। দশগ্রীব। বিংশতি হস্ত। মহাদ্রংস্ট নীলাঞ্জন বর্ণ। দশ মাথা কুড়ি হাত। কুড়িটি লোচন। তিনিই দশানন।
যে সময় রাবণের জন্ম হয়েছিল সেই সময় আকাশ অন্ধকারে পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। সেই লগ্ন বা সেই ক্ষণ এমনই অশুভ ছিল যে দেবতারা পর্যন্ত নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে ঐ অশুভ অন্ধকার হতে যথাসম্ভব দূরে সরে গিয়েছিলেন। রাবণ জন্মগ্রহণ করা মাত্র নিজের এক বিরাট রূপ ধারন করে নেন। সে তাঁর জন্মমাত্র তাঁর মাতার সমবয়স পেয়ে যায়, মাতা পার্বতীর ইচ্ছায়।
সে এক কাহিনী। একদিন বৃষবাহনে শিব এবং পার্বতী আকাশপথে ভ্রমন করিতে ছিলেন। তাঁরা হঠাৎ এক পরিত্যক্ত রাক্ষস শিশুর ক্রন্দন শুনতে পেলেন পর্বতকন্দরে। এই শিশু ছিল এক দুরাচারী রাক্ষস রাক্ষসীর সন্তান। তাঁরা তাদের প্রনয় কেলীতে বাধাস্বরূপ এমন সন্তানকে অনায়াসে পরিত্যাগ করতঃ অন্যস্থানে গমন করে। মহেশ্বর যোগবলে সেই সংবাদ অবহিত হলেন এবং মাতা পার্বতীকে সেই সংবাদ অবগত করলেন।
মাতা পার্বতী বড় দুঃখ পেলেন এবং মহেশ্বরকে বললেন, আহা, রাক্ষস সকল কি এমন নিষ্ঠুর যে এমন একরত্তি শিশুকে পরিত্যাগ করে গেছে এই নির্জনে? হে দেবাদিদেব আপনি এর প্রতিকার কিছু করুন।’
তখন দেবাদিদেব মহাদেব সেই শিশুকে তাঁর যোগবলে বর্ধিত করে তুললেন এবং তাঁর মাতার সমবয়স্ক করে তাকে অমরত্বের বর দিলেন এবং তাঁকে আকাশ ভ্রমনের শক্তি দিলেন।
পার্বতী ও তখন এই বর দিলেন, ‘আমি বর দিলাম রাক্ষসী নারীগন গর্ভধারণ মাত্রই সন্তান প্রসব করবে এবং সেই পুত্র হবে তাঁর মাতার সমবয়স্ক।‘
যেমন মাতা পার্বতী ইচ্ছা করেছিলেন তেমনই সকল রাক্ষসীগন প্রসব মাত্রেই তাদের সন্তানগন মাতার সমবয়স্ক হয়ে উঠে। তেমনই রাবন ও জন্ম মাত্রই তাঁর মাতার সমবয়সী হয়ে উঠেছিলেন।
তাই রাবনের কোন বাল্যলীলা বলে কোন কিছু ছিল না। কারণ দশানন এক ভয়ংকর রূপ পেয়ে এক বিরাট শক্তিমদমত্ত পুরুষ রূপে জন্মমাত্রই প্রকট হয়ে উঠেছিলেন। এরপর কৈকসীর দ্বিতীয় পুত্র মহাবল কুম্ভকর্ণ এবং তৃতীয় জন পুত্রি, বিকৃতাননা শূর্পণখা, ভীষন রূপে প্রকট হয়েছিল। এমন তিন তিনজন বিকৃতিময় বিকট রাক্ষস পুত্র কন্যা দেখে কৈকসী ভীত হলেন এবং বিশ্বশ্রবা মুনির কাছে এক ধর্মজ্ঞ ব্রাহ্মন গুণসম্পন্ন পুত্র প্রাপ্তির অনুরোধ করলেন ।
বিশ্বশ্রবা কৈকসীকে বলেন, এইবার যে পুত্র হবে সে হবে ধর্মজ্ঞ এবং ব্রাহ্মণগুণসম্পন্ন। এবং তৎপরে জন্ম নেন বিভীষন যিনি রাক্ষস কুলে জন্ম নিয়ে ও একজন পবিত্রগুণসম্পন্ন রাক্ষস বলে পরিচিত হয়েছিলেন।
রাবণ সব ভাইদের মধ্যে সর্বশক্তিশালী ছিলেন। রাবণ মাত্র একজন ভীষন রাক্ষসই ছিলেন না। তিনি একজন বিদ্বান এবং জ্ঞানী পুরুষ ও ছিলেন। তার মত বিদ্বান পন্ডিত এই বিশ্বমন্ডলে না আগে কেউ ছিল, না পরে ও আর কেউ হবে।
একদিন কুবের তাঁর পুষ্পকরথে চড়ে পিতা বিশ্রবার সঙ্গে সাক্ষাত করতে এলেন। কৈকসী এইবার দশাননকে বললেন, ‘ পুত্র রাবন, তোমার বৈমাত্রেয় ভ্রাতা তেজোময় বৈশ্রবন কুবেরকে দেখো। শোনো পুত্র আমি চাই তুমি স্বয়ং দশানন , রাক্ষসকুল চূড়ামনি, সেই তুমি যাহাতে তাঁর তুল্য হতে পারো এখন হতে তুমি সেই চেস্টাই কর।’ – ঈর্ষা শুধু ঈর্ষা। আর অপরিসীম লোভ ।
কৈকেসীর ঈর্ষা তাঁর সপত্নীপুত্র বৈশ্রবনের প্রতি। কৈকসী শুধু যে দারুনবেলায় ঋষি বিস্রবার কাছে কামার্ত হয়ে পুত্রার্থে এসেছিলেন কথা মাত্র তাই নয়। তাঁর মনে ছিল এক গোপন ঈর্ষা। তাঁর পুত্র হবে বৈশ্রবনের সমান প্রতিদ্বন্ধি। রূপে গুনে ও ধর্মে বৈশ্রবন তখন দেবতা। সে ধনপতি কুবের। সুরলোকের দিকপাল। পুষ্পক বিমানে স্বর্গে বিহার করে।’
রাবন বললেন,‘ মাতা আমি গর্বিত। তিনি ধনেশ্বর কুবের। তিনি আমাদের সন্মানীয় জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। তিনি গুরুজন।’
কৈকশী এক তীব্র আক্ষেপে পুত্রকে বললেন,‘ পুত্র দশানন, তুমি কি দেখেছ তোমার বৈমাত্রেয় ভ্রাতা যিনি, বৈশ্রবন , কি ভীষণ তাঁর তেজ। কি অপরিসীম বিক্রম তাঁর। সে যক্ষ। সে রাক্ষসগনের লঙ্কাপুরী অধিকার করে বসে আছে। সেই রাক্ষসদের লংকাপুরী, রাক্ষসগন কবে করবেন অধিকার ! পুত্র আমার , তুমি কি চাও না সেই লংকাপুরী অধিকার করতে ? অবশ্য তাঁর শৌর্যের তুলনায় এখনো তুমি যে অতি, অতি অকিঞ্চিৎকর পুত্র ?’
রাবন তাঁর মাতার আক্ষেপ অনুধাবন করলেন। রাক্ষসী কাম এবং আসুরী ঈর্ষার মধ্যেই যে রাবনের জন্ম ! তাঁর মধ্যে সেই ইন্ধন সহজেই প্রভাব বিস্তার করবে এতে আর আশ্চর্য কোথায়? কিন্তু শক্তিধর দশানন তাঁর বৈমাত্রেয় ভ্রাতা বৈশ্রবনের সঙ্গে প্রথমে কোন শত্রুতা করতে ইচ্ছা করেননি। তেমন ইচ্ছা তাঁর মনে কোনদিন ও স্থান পেয়ে ওঠেনি।
তবে আজ এইক্ষনে রাবন জননী নিকষা‘র নিদারুন তিরস্কারে রাবনের মনে এক তীব্র ক্ষোভ এবং দুঃখের সঞ্চার হ’লো। রাবন প্রতিজ্ঞা করলেন তিনি স্বয়ং বৈমাত্রেয় ভ্রাতা বৈশ্রবনের তুল্য কিংবা তদঅধিক বলশালী হবেন এবং ওই সোনার লংকা তিনি মাত্র স্বীয় বল প্রয়োগে অবশ্যই অধিকার করবেন , যে লংকাপুরী এখন তাঁর বৈমাত্রেয় ভ্রাতা কুবের এর অধিকারে।
রাবন এইবার স্বীয় জননী কৈকসীকে আশ্বস্ত করলেন,‘ মাতা, আশ্বস্ত হ’ন ! এই যদি আপনার ইচ্ছা, তবে আপনার মন হতে এই মনস্তাপ এই মুহূর্তে দূর করে দিন। আমি শপথ করে বলছি শৌর্যে পরাক্রমে আমি ভ্রাতা বৈশ্রবনের তুল্য কিংবা অধিক বলশালী হব। আমি ওই স্বর্ণলঙ্কা স্বীয় বলে অধিকার করব। আমি আজই তবে ব্রহ্মার কাছে অমরত্ব লাভের জন্য তপস্যা করতে চললাম।’
তারপর রাবণ তাঁর ভ্রাতাদের সঙ্গে গোকর্ণ আশ্রমে গিয়ে অতি উগ্র তপস্যায় বসলেন এবং স্বয়ং ব্রহ্মাকে ঘোর তপস্যায় সাধ্যমতো তুস্ট করলেন। দশাননের সে এক ঘোর তপস্যা। রাবন হাজার হাজার বছর ধরে সম্পূর্ণ উপবাসে থেকে নিজের এক একটি মাথা কেটে অগ্নিতে আহুতি দিলেন। স্বর্গলোক কেঁপে উঠল।
ব্রহ্মা তখন রাবনের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে রাবনকে বর দিতে চাইলেন। রাবণ প্রার্থনা করলেন,‘ আমি যেন দেবতা সুপর্ণ নাগ যক্ষ দৈত্য দানব এবং রাক্ষস গনের অবধ্য হই। অপর প্রাণীদের কথা ভাবিনা। মানুষকে তৃণ জ্ঞান করি।’
ব্রহ্মা বললেন, ‘ তথাস্তু। দশানন, তুমি দেবতা সুপর্ণ নাগ যক্ষ দৈত্যদানব এবং রাক্ষসগনের ও অবধ্য হবে।’
এই সেই রাবন। পৃথিবীর ত্রাস। তবু রাবন ছিলেন পন্ডিত প্রবর।
রাবন একজন সঙ্গীত পারদর্শী ও ছিলেন। তিনি একজন দক্ষ বীনাবাদক ছিলেন। রাবনের সঙ্গীতের ভীষণ দক্ষতা ছিল। রাবন এমন মধুর বীণা বাজাতেন যে, সেই কারনে দেবতারা ও তার বীণাবাদন শুনতে লংকায় চলে আসতেন। নয় কি অদ্ভুত?
তথাপি তিনি ছিলেন পৃথিবী ত্রাস। তিনি রাবন । দুর্জ্জয় স্বভাব রাবন।
আসলে রাবন গুণে রাক্ষস হলে ও তিনি কিন্তু জাতিতে ব্রাহ্মন। কারন তাঁর পিতা একজন ঋষি ছিলেন এবং তাঁর মাতা ছিলেন রাক্ষস রাজ সুমালির কন্যা কৈকেসী।
সেই রাবন তাঁর মাতার প্ররোচনায় বৈমাত্রেয় ভাই কুবেরকে পরাজিত করে তাঁর হাত হতে স্বর্ণলংকা জয় করে নিলেন এবং তাঁর পুষ্পক বিমানকে অধিকার করে নিয়ে একদিন কৈলাসে গমন করলেন দেবাদিদেব মহাদেবকে তুলে এনে লংকায় প্রতিষ্ঠিত করার মানসে। দেবাদিদেব মনে মনে হাসলেন ।
তখন পুষ্পক রথ কার্তিকেয়র জন্মস্থান শরবনে উপস্থিত হতেই পুষ্পক এর গতি সহসা রুদ্ধ হল।
রাবন অবাক হলেন এবং স্বীয় স্পর্ধায় তিনি অদৃশ্য সেই মহাশক্তিকে আহ্বান করে বলে উঠলেন, ‘এই পর্বতে কি কেউ আছেন যিনি আমার গতিকে ব্যহত করলেন ? আমি দশানন বলছি !’
দশাননের মন্ত্রী মারীচ বললেন,‘ মহারাজ এই বিমান কুবের ভিন্ন আর কাকে ও বহন করে না। এই রথ সেই জন্যই নিশ্চল হয়ে গেছে।’
তাঁরা সকলে যখন এইরূপ কথা বলেছেন এমন সময় কোথা হতে এক অদৃশ্য গম্ভীর স্বর ভেসে আসে আকাশমার্গে।
,‘ কে দশগ্রীব ? কেন হঠাৎ তোমার আগমন এই পর্বতে? ফিরে যাও। এখানে গোল ক’রো না। এই পর্বতে শংকর ক্রীড়া করেন। এই স্থান পক্ষী নাগ যক্ষদের গন্ধর্ব ও রাক্ষস সকলেরই অগন্য।’
রাবন ক্রুদ্ধ হয়ে পুষ্পক রথ থেকে নেমে এসে বললেন, ‘ কে এই শংকর ! আমি তাঁকে দেখতে চাই। কে তুমি কথা বলছ ! স্পর্ধা থাকে তো আমার সামনে প্রকট হও।‘
আর তখন সেই কৈলাস পর্বতের অদূরে ঘন কুয়াশার চাদরের আড়ালে দন্ডায়মান অদ্ভুত দর্শন একজন খর্বাকৃতি কাহাকে ও দশানন দেখতে পেলেন। তিনি শিবের অনুচর নন্দী । তিনি রক্তচক্ষু।
তিনি রাবনের পার্শ্বে এলেন। ইনি করাল দশনী। কৃষ্ণ পিঙ্গলবর্ণ। বামনাকৃতি । বিকটাকার। মুন্ডিত মস্তক। হ্রস্ব বাহু। তিনি নন্দী । তিনি সেই শিবস্থানের দ্বারী। হাতে তাঁর জাঠা। বানরের মত মুখ শিব অনুচর নন্দীর।
তাঁকে দেখে দশানন খুব উপহাস করলেন। -’ হাঃ হাঃ হাঃ, ওরে রে দ্বারী ! এ কেমন বানর আকৃতি দেখি তোর ? আমার বড় কৌতুক বোধ হচ্ছে !’
নন্দী বললেন,‘ দশানন, তুমি মদগর্বী, তুমি অহংকারী। এই অহংকারই হবে তোমার পতনের কারন। আমি শংকরের দ্বারপাল। আমার মুখ দেখে তুমি উপহাস করলে? বেশ আমি তোমায় অভিশাপ দিচ্ছি, আমা হেন এমন বানর আকৃতি সব তোমার সর্বনাশ করবে। দুরাচার তোমায় মারার আমার কোন প্রয়োজন নেই। তুমি নিজ দোষে সবংশেই মরবে দশানন।’
নন্দীর অভিশাপ উপেক্ষা করে রাবন অট্টহাস্য করলেন। তারপর বললেন,‘ কোথায় তোর শংকর? আমি এই পর্বত উত্তোলিত করব। শংকর যিনি তিনি কিসের বলে এখানে নিত্য রাজার ন্যায় বিহার করেন? তিনি কি জানেন না যে তার ভয়ের কারন উপস্থিত হয়েছে ?’
নন্দী বলে ওঠে, ‘ দশানন, অহংকার সংবরন ক’রো।’
এইবার মদগর্বী দশানন অট্টহাস্য করে বলে উঠলেন, ‘ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। আমি অহংকারী, আমি শক্তিমদমত্ত। এই দেখো দ্বারপাল নন্দী, আমি এখন এই কৈলাশ পর্বতকে আমার অঙ্গুলি দিয়ে উত্তোলন করব ! আমার শক্তি দেখুক ত্রিভুবন !’
নন্দী বললেন , ‘ ওহে মদগর্বী , নিজ অহংকারেই একদিন তোমার মরণ হবে।’
রাবণ নন্দীর শাপ নাহি শুনে কানে।
কুড়িহাতে সাপটিয়া সে কৈলাস টানে “
কৈলাস ধরিয়া দশানন দিল নাড়া।
সত্তরি যোজন নড়ে কৈলাসের গোড়া।। [কৃত্তিবাস ]
দশানন এইবার তাঁর স্বীয় ভূজবলে সমস্ত শক্তি দিয়ে কৈলাশ পর্বতকে উত্তোলিত করতে অঙ্গীকার করলেন।
পর্বতবাসিগন সব কম্পিত হ’ল রাবনের এমন মদমত্ততায়।
টলমল করে গিরি দেব কাঁপে ডরে।
পৰ্ব্বত নিবাসী গেল ধূর্জটীর’ আড়ে ।।
সবে বলে মহাদেব কর পরিত্রাণ।
কোন বীর আসিয়া পৰ্ব্বত দিল টান ।। [কৃত্তিবাস]
শিবজায়া পার্বতীও কেঁপে উঠলেন এবং মহেশ্বরকে ধরে দাঁড়ালেন। – ‘ একি ! এ কি ! এ কেমন আলোড়ন দেবাদিদেব ? ‘
দেবাদিদেব এক অদ্ভুত হাসি হাসলেন এবং পার্বতীকে একহাতে স্বীয় বাহুতে জড়িয়ে ধরে তর্জনীর ইশারায় শান্ত হতে বলে এইবার তিনি তাঁর বাম পায়ের ক’ড়ে আঙ্গুল দিয়ে কৈলাশ পর্বতকে সামান্য চাপ দিলেন এবং দশাননকে সামান্য নির্জিত করলেন।
রাবণের ক্রিয়া দেখি হাসেন কৃত্তিবাস।
বামচরণের নখে চাপেন কৈলাস ।। [কৃত্তিবাস ]
তৎকালে দশাননের দুই হাত পর্বতের চাপে ভীষণভাবে নিপীড়িত হল।
দশানন সেই অচিন্ত্যনীয় নিষ্পেষণে কঠিন ব্যাথায় ত্রিলোক কম্পিত করে চীৎকার করে উঠলেন ভীমরবে।
অমাত্যগন বললেন,‘ লংকেশ্বর, শুনুন, আপনি নীলকন্ঠ উমাপতি মহাদেবকে সাধ্যায় তপে তুস্ট করুন। তিনি ভিন্ন আপনার অন্য গতি নাই। ‘
ব্যাথাতে রাবণ ছাড়ে মহা চীৎকার।
শিবের নিকটে কি তাহার অহঙ্কার।। [কৃত্তিবাস ]
দশানন তখন সাষ্টাঙ্গে প্রণত হয়ে তাঁর হাতের তীব্র ব্যাথা সহ্য করে ও সামগানে দেবাদিদেবকে প্রসন্ন করলেন।
জটাটবীগলজ্জলপ্রবাহ পাবিতস্থলে ,
গলেংবলম্ব্যলম্বিতাং ভুজঙ্গতুঙ্গমালিকাম্।
ডমড্ডমড্ডমড্ডমন্ত্রিনাদবজ্ঞমর্বয়ং
কারচণ্ডতাণ্ডবংতনোতুনঃশিবঃ শিবম্।। ১।।
ভগবান শিব দশাননের স্তুতিতে প্রসন্ন হয়ে এইবার ধীরে ধীরে তাঁকে মুক্ত করলেন।
‘ হে দেবাদিদেব আপনি প্রসন্ন হ’ন। আমি শক্তিমদমত্তে আপনার বিশ্রামের ব্যাঘাত করেছি। আমি আপনার কৃপাপ্রার্থী। আমি আপনার পরম ভক্ত । আপনি আমাকে দয়া করুন।’
ধূর্জটি এইবার প্রসন্ন হলেন ভক্তের প্রার্থনায় এবং বললেন,‘ দশানন তোমার বীরত্বে আমি প্রীত হয়েছি। তুমি পর্বতের ভারে নিপীড়িত হয়ে দারুন রব করেছিলে। শত্রুর ভীতিকর সেই চীৎকার যে করে সেই ভয়াবহ রবকারী এই জগতে মাত্র তুমি একজন। সেই জন্য তোমার নাম হোক রাবণ।‘
রাবন বললেন,‘হে দেবাদিদেব, আমার পরম আরাধ্য শিবশম্ভু, যদি আপনি আমার প্রতি প্রীত হয়ে থাকেন, তবে আমাকে বর দিন। আমি ব্রহ্মার বরে দেব দানব গন্ধর্ব সকলের অবধ্য। আমি মনুষ্যকে গ্রাহ্য করি না। ব্রহ্মার বরে আমি দীর্ঘায়ু হয়েছি। আপনি আমাকে শক্তি দিন যাহাতে আমার অবশিস্ট আয়ু নিরাপদ হয়।’
তখন মহাদেব রাবণকে চন্দ্রহাস নামে এক মহাদীপ্ত খড়গ দিয়ে বললেন ,’ তোমার কামনা সিদ্ধ হোক। এই অস্ত্রকে অবজ্ঞা ক’রো না। যদি অবজ্ঞা ক’র তবে এই চন্দ্রহাস আমার কাছে ফিরে আসবে।’
রাবন বললেন,‘ যথা আজ্ঞা মহাদেব। আপনি আমার প্রণাম গ্রহণ করুন।‘
৬
নবজন্মে বাল্মিকি

দিন যায়। কাল যায়। ধ্যানযোগী রত্নাকরের নিশ্চলবৎ অবয়বের চতুর্দিকে এতদিনে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত বল্মীক স্তুপ গড়ে উঠেছে। ঝড়জল শীতগ্রীষ্ম কীটপতঙ্গ কিংবা জঙ্গলের হিংস্র প্রানী হতে সেই স্তূপ এক কঠিন বর্ম হয়ে আবরিত করে আছে ঈশ্বরের ধ্যানে মগ্ন রত্নাকরকে।
যে কালে মানুষ দস্যুরত্নাকর এর ভয়ে ওই জঙ্গল দিয়ে যাতায়াত বন্ধ করে অন্য পথে চলে যেতেন তারা এখন নিরাপদে ওই বনপথে চলাচল করেন। সেই স্থানে এসে যেন তাঁরা এক অদ্ভুত প্রশান্তি লাভ করেন। ভ্রমর গুঞ্জনে পাখির কুজনে সেই বনভূমি মুখরিত। কোথা হতে যেন এক সুমধুর ধ্বনি সেই দুর্ভেদ্য জঙ্গলকে এক ঈশ্বরীয় আবাস করে তুলেছে। ওই দূর দিয়ে বয়ে চলেছে দক্ষিনমুখী গোদাবরী। গ্রামের মানুষজন যেন একটা পুণ্যভূমির সন্ধান পায় সেই স্থানে। তারা অনেক খুঁজে কিছু দেখতে না পেলে ও একটি অদ্ভুত দর্শন বল্মীকের স্তূপকে আরাধন যোগ্য মূর্তি মনে করে সেখানে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে দিয়ে যায়। বনের সুমিষ্ট ফলমূল একটা মাটির থালায় নিবেদন করে রাখে সেই বল্মীকের স্তূপের কাছে।
সেই ভীষণ ভয়ঙ্কর বনভূমি আজ যেন হয়ে উঠেছে এক নন্দনকানন। দেবর্ষি নারদ এবার অনেক অনেক দিন পরে গঙ্গাতীরে এসে নামলেন। দীর্ঘ একটা সময় দস্যু রত্নাকরের কোন সংবাদ নেওয়া হয়ে ওঠে নি। তাঁকে যে কথা দিয়ে এসেছিলেন এক বৎসর পরে তাঁর সাথে দেখা করবেন! – আজ এতদিন পরে সেই গভীর বনময় প্রদেশে অবতরন করে দেবর্ষি নারদ যেন এক অদ্ভুত আনন্দ লক্ষ্য করলেন।
পাখির কলরোলে, বায়ুর হিল্লোলে, সতেজ বনানীর যতেক পুষ্পগন্ধে, মনুষ্যগনের নির্ভয় নিঃশঙ্ক চলাচলে যেন এক আনন্দময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে উঠেছে সেই বনভূমিতে। তিনি সেই গভীর বনপথে দস্যু রত্নাকরের খোঁজে এসে অবাক হয়ে গেলেন। বনভূমিতে ধেনু চড়ে বেড়াচ্ছে। রাখাল আপন মনে বেনু বাজাচ্ছে। ময়ুরগুলি কেকাধ্বনি তুলে বনভুমি মুখরিত করে রেখেছে। কিন্তু কোথায় সেই স্থান যেখানে এক মাটির ঢিবির ওপরে একদিন সেই কোনকালে দস্যু রত্নাকরকে মন্ত্রদীক্ষা দিয়ে তিনি তাঁকে ধ্যান করতে বলে গিয়েছিলেন। রত্নাকরকে যে কথা দিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর মন্ত্র যেদিন সাধন হবে সে দিন তিনি নিজেই এসে তাকে জাগ্রত করবেন। কিন্তু কোথায় সেই স্থান ?
মুনিবর সেই গভীর বনপথে দস্যু রত্নাকর এর খোঁজে এসে স্থান নির্ণয় করে উঠতে পারেন না। তিনি অবাক হয়ে সন্ধান করতে থাকেন। অদ্ভুত কথা। আর যাই হোক সেই দস্যুকে যে ‘মরা,মরা’ মন্ত্র জপ করতে বলে গিয়েছিলেন সে তো এই গভীর জঙ্গলেই থাকা উচিত। সে তো আর কোথা ও যাবার কথা নয়। মনে মনে অনুসন্ধান করলেন সেই শিষ্যের অস্তিত্বকে যাকে তিনি তাঁর মানসিক বিভ্রান্তিতে উপদেশ দিয়েছিলেন ‘রাম’ নাম মন্ত্র জপ করতে। নারদ মনে মনে ভাবছেন শিষ্যের কথা। এমন সময়ে দেবর্ষির মনে হল পুণ্যসলিলা গোদাবরী নদীর কুলু কুলু ধ্বনির মত সমগ্র বনময় যেন এক মৃদু ধ্বনি গুঞ্জরিত হয়ে চলেছে।
দেবর্ষি নারদ অবাক হলেন। কোথায় এই ধ্বনি গুঞ্জরিত হয়ে চলেছে ! এ গুঞ্জন তো সামান্য গুঞ্জন নয়। বনময় মধু মক্ষিকার মধু অন্বেষণে উড়ে বেড়াবার ধ্বনি হতে ও সূক্ষ্ম, নিরবিচ্ছিন্ন ও নিরন্তর এক সুরময় ধ্বনি বীণার সুর এর ন্যায় বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। নারদ ধ্বনির উৎস খুঁজতে খুঁজতে যেন হঠাৎ এক বল্মীক স্তুপ দেখতে পেলেন। মনুষ্য আকৃতিময় এক ঋজু বল্মীকস্তুপ এর ভিতর হতে যেন এক সুর লহরী নির্গত হচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন এখানে, এই বল্মীকস্তুপেই তপোমগ্ন হয়ে রয়েছেন শিষ্যবর রত্নাকর।
দেবর্ষি এবার ধীরে ধীরে সেই বল্মীকস্তুপ এর সমীপবর্তী হয়ে এক মৃদু ‘ রাম রাম’’ ধ্বনি তুললেন। কিয়ৎক্ষন পরে বল্মীকস্তুপ এর মধ্যে যেন প্রাণের লক্ষণ দেখা গেল। যেন মহাকালের ধ্যানভঙ্গ হলো। বল্মীক মূর্তির নয়নপথের বল্মীক আবরণ খসে পড়ে। এইবার তাঁর মুখমন্ডলের বল্মীকআবরণ ও খসে পড়ল। শরীরের স্পন্দনে আরো কিছু বল্মীকদল বাহুমূল হতে ঝরে পড়ল।
দেবর্ষি নারদ এইবার মৃদুস্বরে ডেকে ওঠেন শিশ্যকে,’ রত্নাকর !‘ – না না ‘রত্নাকর’ নয় , ‘রত্নাকর’ নয়। সে এখন একজন যোগসিদ্ধ মানব। বল্মীক হতে উত্থিত নবজন্মপ্রাপ্ত এই সিদ্ধপুরুষের নাম হোক বাল্মিকি। নারদ এইবার পরম স্নেহে এক অন্যরকম সম্বোধন করে উঠলেন, ‘ হে শিষ্যবর বাল্মিকী ‘!
নবজন্ম প্রাপ্ত বাল্মিকী এবার সেই বল্মীকের স্তূপ থেকে হাতজোড় করে বলে ওঠেন, ‘গুরুদেব’ !
দেবর্ষি বলে ওঠেন, ‘ওঠো বাল্মিকী, এবার ধ্যানবেদী হতে উঠে এসো। তুমি এতদিনে মন্ত্রসিদ্ধ হয়েছ। তুমি সেই প্রিয়পরমের ধ্যানে সিদ্ধিলাভ করেছো। এবার তুমি নেমে এসো তোমার ধ্যানবেদী হতে। তুমি এখন মহর্ষি হয়ে পরিচিত হবে। জগতে এখন তোমার অনেক কাজ।’
ধ্যানভঙ্গ হয়ে বাল্মিকী এবার গুরুদেব নারদকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন।
নারদ বললেন, ‘এ তোমার এক নবজন্ম। পরমপুরুষ তোমার তপস্যায় খুশি হয়েছেন। এখন থেকে তুমি ‘বাল্মিকী’ নামে জগদ্বিখ্যাত হবে। আমার ইচ্ছা তুমি চিত্রকূট পর্বত এ গিয়ে তোমার আশ্রম গড়ে তোল। চিত্রকূট এক মনোরম স্থান। সেখানে গোদাবরী তীরে তোমার আশ্রম স্থাপন কর।’
মহর্ষি বাল্মিকী জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকান দেবর্ষির দিকে। চিত্রকূটের অবস্থান জানতে বাল্মীকি এবার দেবর্ষি নারদকে বলেন, ‘হে দেবর্ষি আপনি আমাকে বলুন, সে স্থান মাহাত্ম্য কথা।
দেবর্ষি বলেন, ‘ বিন্ধ্যপর্বত এর উত্তরে আছে চিত্রকূট অরণ্য। সে এক বর্ণময় দৃশ্য সমন্বিত পর্বতরাজি। চিত্রকূট এক বিরাট বনরাজিময় প্রদেশ। সেখানে বয়ে চলেছে মন্দাকিনী নদী। ঐ পর্বতরাজীতে নানান উপজাতির বাস। ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর এর জন্ম এই চিত্রকূট পর্বতে। সেখানে সেই পর্বতরাজীর মধ্যে আছে গুপ্ত গোদাবরী। এখানে গোদাবরী নদী এসে মিলেছে। সেই চিত্রকূট এক মনোরম স্থান। সেখানে গোদাবরী নদীর তীরেই হোক তোমার পরম পুন্য আশ্রম।
বাল্মিকী এবার নারদ মুনিকে প্রণাম করে বললেন, ‘দেবর্ষি, আপনি আমার জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত করেছেন। আপনি আমাকে প্রদান করেছেন এক নুতন জীবন। আমি আমার পাপীস্বরূপ হতে সাধনস্তরে উন্নীত হয়েছি সে একমাত্র আপনার আশীর্বাদে। মানুষ কোন উন্নত সত্ত্বার সংস্পর্শে না এলে নিজেকে চিনতে পারে না। আপনার আদেশ শিরোধার্য। আমি চিত্রকূট পর্বত এ গিয়ে আমার কুটির নির্মাণ করে সাধনমার্গ এ থাকতে চাই ।’
দেবর্ষি নারদ খুশী হলেন। বলে উঠলেন, ‘তথাস্তু !’



