জর্জ বার্নার্ড শ
অনুবাদ : অরিজিতা দাস
তৃতীয় অঙ্ক
আজ মিসেস হিগিন্সের ‘অ্যাট হোম’ বা অতিথি আপ্যায়নের দিন। এখনও পর্যন্ত কোনো অতিথি এসে পৌঁছায়নি।চেলসি এমব্যাঙ্কমেন্টের ধারে একটি অভিজাত ফ্ল্যাটে তাঁর বৈঠকখানা অবস্থিত। ঘরটির নদীমুখী তিনটি বড় খোলা জানালা রয়েছে। জানালা পেরিয়ে বেরিয়ে যাওয়া যায় টবে সাজানো ফুলে ভরা একটি ছোট বারান্দায়। ঘরটি অভিজাত হলেও পুরোনো প্রাসাদসুলভ অতিরিক্ত জাঁকজমকপূর্ণ নয়; বরং ছাদের উচ্চতা ও বিন্যাসে এক ধরনের সংযত সৌন্দর্য রয়েছে।আপনি যদি জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়ান, তাহলে বাম পাশে ফায়ারপ্লেসটি দেখতে পাবেন। আর ডান দিকের দেয়ালে, জানালার কাছাকাছি কোণে রয়েছে ঘরের প্রবেশদ্বার।
মিসেস হিগিন্স এমন এক প্রজন্মের নারী, যিনি উইলিয়াম মরিস ও এডওয়ার্ড বার্ন-জোন্সের শিল্পভাবনার মধ্যে বড় হয়েছেন। তাই তাঁর ঘরও তাঁর ছেলে হিগিন্সের ঘরের মতো এলোমেলো বা জিনিসপত্রে ঠাসা নয়। এখানে অকারণ আসবাব, ছোটখাটো টেবিল বা শোপিসের ভিড় নেই।ঘরের মাঝখানে একটি বড় সোফা রাখা আছে। পুরো ঘরের সৌন্দর্য যেন তৈরি হয়েছে খুব কম কিন্তু রুচিসম্মত সাজসজ্জায়—মরিস নকশার কার্পেট, ওয়ালপেপার, চিন্টজ কাপড়ের পর্দা এবং সোফার ব্রোকেড মোড়ক ও কুশনের আবরণ মিলিয়ে। সবকিছুতেই এমন এক শিল্পিত সংযম আছে যে সেখানে বাড়তি অলংকারের প্রয়োজনই পড়ে না।দেওয়ালে টাঙানো কয়েকটি উৎকৃষ্ট তৈলচিত্র ঘরটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এগুলোর বেশিরভাগই বহু বছর আগে গ্রসভেনর গ্যালারির প্রদর্শনী থেকে সংগ্রহ করা—বিশেষত বার্ন-জোন্সের ছবি, হুইসলারের নয়। একটি বিশাল ল্যান্ডস্কেপ চিত্রও আছে, সেসিল লসনের আঁকা, যার ব্যাপ্তি ও মহিমা অনেকটা রুবেন্সের চিত্রকলার কথা মনে করিয়ে দেয়।
ঘরে মিসেস হিগিন্সের যৌবনের একটি প্রতিকৃতিও শোভা পাচ্ছে। তখন তিনি রসেটিয়ান ধারার ঢেউ খেলানো শিল্পসম্মত পোশাক পরতেন—যে পোশাক তৎকালীন প্রচলিত ফ্যাশনের বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহ ছিল। যদিও সেই পোশাকগুলোকে অনেকেই বুঝতে পারেনি এবং ব্যঙ্গচিত্রে পরিণত করেছিল, তবুও সেগুলো আঠারোশ সত্তরের দশকের এক বিশেষ সৌন্দর্যচেতনার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।ঘরের এক কোণে, দরজার বিপরীত দিকে, ষাটোর্ধ্ব মিসেস হিগিন্স একটি সাধারণ অথচ মার্জিত লেখার টেবিলে বসে চিঠি লিখছেন। টেবিলের হাতের কাছেই একটি ঘণ্টার বোতাম রয়েছে। এখন আর তিনি যৌবনের মতো ব্যতিক্রমী পোশাক পরার ঝামেলা করেন না; তাঁর পোশাক সাদামাটা, কিন্তু রুচিশীল।ঘরের আরও ভেতরের দিকে একটি চিপেনডেল চেয়ার রাখা আছে। অন্য পাশে রয়েছে ইনিগো জোন্সের রুচিতে তৈরি খানিকটা রুক্ষ খোদাই করা একটি এলিজাবেথীয় চেয়ার। একই পাশে অলংকৃত কাঠের বাক্সে ঢাকা একটি পিয়ানো রয়েছে। আর ফায়ারপ্লেস ও জানালার মাঝের কোণায় মরিস চিন্টজ কাপড়ে মোড়া একটি ডিভান রাখা, যা ঘরটির শান্ত, শিল্পময় ও মার্জিত আবহকে সম্পূর্ণ করেছে।এখন বিকেল চারটা থেকে পাঁচটার মাঝামাঝি সময়। হঠাৎ দরজাটা জোরে খুলে গেল, আর মাথায় টুপি পরে তড়িঘড়ি করে ভেতরে ঢুকল হিগিন্স।
মিসেস হিগিন্স [আশ্চর্য ও বিরক্ত হয়ে] : হেনরি!
[তাকে ধমক দিয়ে]
আজ এখানে কী করছিস? আজ তো আমার অতিথি আপ্যায়নের দিন। তুই তো কথা দিয়েছিলি, আজ আসবি না।
[হিগিন্স তাকে চুমু খেতে এগিয়ে গেলে, মিসেস হিগিন্স তার মাথা থেকে টুপিটা খুলে হাতে ধরিয়ে দেন।]
হিগিন্স : ওহ্, কী ঝামেলা!
[সে টুপিটা টেবিলের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দেয়।]
মিসেস হিগিন্স : এখনই বাড়ি ফিরে যা।
হিগিন্স [মাকে চুমু খেয়ে] : জানি, মা। কিন্তু আমি ইচ্ছে করেই এসেছি।
মিসেস হিগিন্স : কিন্তু তোর এখানে থাকা উচিত নয়, হেনরি। সত্যিই বলছি। তুই আমার সব বন্ধুদের বিরক্ত করিস। তোকে দেখলেই তারা আসা বন্ধ করে দেয়।
হিগিন্স : ধুর! বাজে কথা। আমি জানি, আমি খুব ভালো হালকা গল্প করতে পারি না। কিন্তু তাতে মানুষ এত কিছু মনে করে না।
[সে আরাম করে সোফায় বসে পড়ে।]
মিসেস হিগিন্স : ওহ্, তাই নাকি! “হালকা গল্প” বলছিস? তোর সেই বড় বড় বক্তৃতাগুলোর কী হবে?সত্যিই বলছি, তোর আজ এখানে থাকা উচিত নয়।
হিগিন্স : কিন্তু আমাকে থাকতেই হবে। তোমার সাহায্য দরকার। একটা ধ্বনিতত্ত্বের ব্যাপার।
মিসেস হিগিন্স : না বাবা, সে আশা ছেড়ে দে। আমি তোকে আগেই বলেছি—তোর ওই স্বরবর্ণের কসরত আমি কিছুই বুঝি না। যদিও তোর নিজের শর্টহ্যান্ডে লেখা পোস্টকার্ডগুলো খুব সুন্দর লাগে, কিন্তু সেগুলো পড়তে আমাকে শেষে আবার তোর পরিষ্কার হাতের লেখার কপিই দেখতে হয়।
হিগিন্স : আচ্ছা আচ্ছা, এটা আসলে ধ্বনিতত্ত্বের ব্যাপার নয়।
মিসেস হিগিন্স : কিন্তু একটু আগেই তো বললি সেটা তাই।
হিগিন্স : ওটা তোমার কাজ নয়। ব্যাপারটা হলো—আমি একটা মেয়েকে নিয়ে কাজ করছি।
মিসেস হিগিন্স [চোখ টিপে মৃদু হাসি নিয়ে] : তার মানে, কোনো মেয়ে বুঝি তোকে নিয়ে কাজ শুরু করেছে?
হিগিন্স : আরে না! আমি প্রেম-ট্রেমের কথা বলছি না।
মিসেস হিগিন্স : কী দুঃখের কথা!
হিগিন্স : কেন বলো তো?
মিসেস হিগিন্স : কারণ তুই তো পঁয়তাল্লিশ বছরের কম বয়সী কোনো মহিলার প্রেমেই পড়িস না। কবে তোর চোখে পড়বে যে পৃথিবীতে সুন্দরী তরুণীরও অভাব নেই?
হিগিন্স : ওহ্, অল্পবয়সী মেয়েদের নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। আমার কাছে একজন আদর্শ নারী মানে—যতটা সম্ভব তোমার মতো দেখতে কেউ।
তবে আমি কখনোই যুবতী মেয়েদের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক আকর্ষণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে চাই না।
হিগিন্স : মেয়েদের ব্যাপারে আমার কিছু অভ্যাস এতটাই গভীরে গেঁথে গেছে যে আর বদলানো সম্ভব নয়।
[সে হঠাৎ উঠে দাঁড়ায় এবং ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে থাকে। হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে পকেটের টাকা আর চাবির ঝনঝন শব্দ শোনা যায়।]
তার ওপর, ওরা সবাই ভীষণ বোকা।
মিসেস হিগিন্স : জানিস, হেনরি, যদি তুই সত্যিই আমাকে ভালোবাসতিস, তাহলে একটা কাজ করতে।
হিগিন্স : ওহ্! কী? বিয়ে করতে, তাই তো?
মিসেস হিগিন্স : না। প্রথমত, এভাবে ছটফট করা বন্ধ কর। আর পকেট থেকে হাত বের কর।
[হিগিন্স বিরক্ত মুখে মায়ের কথা মেনে নেয় এবং আবার বসে পড়ে।]
মিসেস হিগিন্স : এই তো ভালো ছেলে। এবার বল, মেয়েটার ব্যাপারটা কী?
হিগিন্স : সে আজ তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসছে।
মিসেস হিগিন্স : কিন্তু আমার তো মনে পড়ছে না, আমি তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি।
হিগিন্স : তুমি করোনি। আমিই করেছি। আর তুমি যদি ওকে চিনতে, তাহলে কোনোদিনই করতে না।
মিসেস হিগিন্স : সত্যি! কেন?
হিগিন্স : কারণ ব্যাপারটা হলো—সে একটা সাধারণ ফুলওয়ালি মেয়ে। আমি তাকে রাস্তা থেকে তুলে এনেছি।
মিসেস হিগিন্স : আর তারপর তাকে আমার বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেছ!
হিগিন্স [তাড়াতাড়ি উঠে মায়ের কাছে গিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে] : আরে না না, এতে কোনো সমস্যা নেই। আমি ওকে ঠিকমতো কথা বলতে শিখিয়েছি। আর আচরণ নিয়েও কড়া নির্দেশ দিয়েছি।
ওকে শুধু দুটো বিষয় নিয়ে কথা বলতে হবে—আবহাওয়া আর সবার স্বাস্থ্য। মানে, “আজকের দিনটা বেশ সুন্দর”, “আপনি কেমন আছেন”—এই ধরনের কথা। কোনো জটিল আলোচনা বা ব্যক্তিগত বিষয়ে যেন না জড়ায়। তাহলেই সব ঠিক থাকবে।
মিসেস হিগিন্স : নিরাপদ বলছিস? আমাদের স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা? মানে শরীরের ভেতরের সব অবস্থা নিয়েও? হয়তো বাইরের অবস্থাও!
হেনরি, তুই এত বোকা হতে পারিস কী করে?
হিগিন্স [অস্থির ভঙ্গিতে] : কিন্তু ওকে তো কিছু একটা নিয়ে কথা বলতেই হবে!
[নিজেকে সামলে আবার বসে পড়ে।]
আচ্ছা আচ্ছা, ওকে নিয়ে এত চিন্তা কোরো না। ও ঠিকই সামলে নেবে। পিকারিংও আমার সঙ্গে আছে।
আমি বাজি ধরেছি—ছয় মাসের মধ্যে আমি ওকে এমনভাবে তৈরি করব যে সবাই ওকে একেবারে ডাচেস বলে মনে করবে। কয়েক মাস ধরে আমি ওকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, আর সে অবিশ্বাস্য দ্রুত উন্নতি করছে। আমি নিশ্চিত, আমি বাজি জিতব।ওর শ্রবণশক্তি অসাধারণ। আর আমার মধ্যবিত্ত ছাত্রছাত্রীদের চেয়েও ওকে শেখানো সহজ হয়েছে। কারণ ওকে শুধু উচ্চারণ ঠিক করতে হয়নি—পুরো একটা নতুন ভাষাই শিখতে হয়েছে।এখন সে প্রায় তোমার মতোই ইংরেজি বলে—যেমন তুমি ফরাসি বলো।
মিসেস হিগিন্স : আচ্ছা, সেটা তো বেশ আশাব্যঞ্জক শোনাচ্ছে।
হিগিন্স : হ্যাঁ… আবার না-ও।
মিসেস হিগিন্স : তার মানে?
হিগিন্স : দেখো, আমি ওর উচ্চারণ তো ঠিকই শিখিয়ে দিয়েছি। কিন্তু শুধু একজন মানুষ কীভাবে কথা বলে, সেটাই তো সব নয়—সে কী কথা বলে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। আর সমস্যাটা ঠিক সেখানেই।
[ঠিক তখনই বৈঠকখানার পরিচারিকা অতিথিদের নাম ঘোষণা করে তাদের কথার মধ্যে বাধা দেয়।]
পরিচারিকা : মিসেস এবং মিস এইন্সফোর্ড হিল।
[সে সরে যায়।]
হিগিন্স : হায় ঈশ্বর!
[সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায়, টেবিল থেকে নিজের টুপিটা তুলে নেয় এবং দরজার দিকে পালাতে উদ্যত হয়। কিন্তু তার আগেই মিসেস হিগিন্স অতিথিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।]
মিসেস ও মিস এইন্সফোর্ড হিল সেই মা-মেয়ে, যাদের সঙ্গে কভেন্ট গার্ডেনে বৃষ্টির রাতে হিগিন্সের দেখা হয়েছিল।মা ভদ্র, শিক্ষিতা এবং সংযত স্বভাবের; তবে তাঁর মুখে সবসময় আর্থিক অনটনের এক অদৃশ্য উদ্বেগের ছাপ লেগে থাকে।অন্যদিকে মেয়েটি সমাজে চলাফেরার অভ্যাসে বেশ আত্মবিশ্বাসী ও প্রাণবন্ত। তার মধ্যে আছে ভদ্র দারিদ্র্যের একরকম অহংকার—অভাব আছে, কিন্তু আত্মসম্মানে কোনো ঘাটতি নেই।
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল [মিসেস হিগিন্সের দিকে এগিয়ে] : কেমন আছেন?
[তারা হাত মেলান।]
মিস এইন্সফোর্ড হিল : কেমন আছেন?
[সে হালকা ভদ্র অভিবাদন জানায়।]
মিসেস হিগিন্স : আমার ছেলে হেনরি।
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল : ওহ্, আপনার সেই বিখ্যাত ছেলে! প্রফেসর হিগিন্স, আপনার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য আমি কতদিন ধরে অপেক্ষা করছি।
হিগিন্স [গম্ভীর ও অনাগ্রহী ভঙ্গিতে, প্রায় নড়াচড়া না করেই] : আনন্দিত।
[সে পিয়ানোর সামনে দাঁড়িয়ে শুধু কর্কশভাবে মাথা নোয়ায়।]
মিস এইন্সফোর্ড হিল [খুব স্বাভাবিক ও আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে তার দিকে এগিয়ে এসে] : কেমন আছেন?
হিগিন্স [তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে] : আপনাকে আগে কোথাও দেখেছি। ঠিক কোথায় মনে পড়ছে না। তবে আপনার কণ্ঠস্বর আমি শুনেছি—এ বিষয়ে নিশ্চিত।
[একটু থেমে উদাসভাবে]
যাই হোক, সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। আপনি বরং বসুন।
মিসেস হিগিন্স : দুঃখের বিষয়, আমার এই বিখ্যাত ছেলের আদবকায়দা বলে কিছু নেই। আপনারা ওর আচরণকে গুরুত্ব দেবেন না।
মিস এইন্সফোর্ড হিল [হেসে] : আমি দিচ্ছি না।
[সে গিয়ে এলিজাবেথীয় চেয়ারে বসে পড়ে।]
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল [কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও ভদ্রতা বজায় রেখে] : মোটেই না।
[তিনি নিজের মেয়ে ও মিসেস হিগিন্সের মাঝখানে অটোমানের ওপর বসেন। মিসেস হিগিন্স ইতিমধ্যে নিজের চেয়ারটি লেখার টেবিল থেকে ঘুরিয়ে অতিথিদের দিকে মুখ করে নিয়েছেন।]
হিগিন্স : ওহ্, আমি কি খুব অভদ্র আচরণ করলাম? আমার কিন্তু সেরকম কোনো ইচ্ছে ছিল না।
[সে ধীরে ধীরে মাঝের জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। উপস্থিত সবার দিকে পিঠ ফিরিয়ে নদী আর ওপারের ব্যাটারসি পার্কের ফুলগুলোর দিকে এমন মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকে, যেন সেগুলো কোনো অদ্ভুত শিল্পকর্ম বা জমাট বাঁধা রঙিন মিষ্টান্ন।]
[বৈঠকখানার পরিচারিকা আবার ফিরে আসে এবং কর্নেল পিকারিংকে ভেতরে নিয়ে আসে।]
পরিচারিকা : কর্নেল পিকারিং।
[সে সরে যায়।]
পিকারিং : কেমন আছেন, মিসেস হিগিন্স?
মিসেস হিগিন্স : আপনাকে দেখে খুব ভালো লাগছে। আপনি কি মিসেস এইন্সফোর্ড হিল এবং মিস এইন্সফোর্ড হিলকে চেনেন?
[সৌজন্যমূলক ও কিছুটা উৎসাহী অভিবাদন বিনিময় হয়। কর্নেল পিকারিং একটি চিপেনডেল চেয়ার টেনে এনে মিসেস হিগিন্স ও মিসেস এইন্সফোর্ড হিলের মাঝখানে বসেন।]
পিকারিং : হেনরি কি আপনাদের বলেছে, আমরা কী জন্য এখানে এসেছি?
হিগিন্স [জানালার দিক থেকে কাঁধের উপর দিয়ে বিরক্ত স্বরে] : আমাদের কাজের তো বারোটা বেজে গেল! ধুর!
মিসেস হিগিন্স : ওহ্, হেনরি! সত্যিই!
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল [অর্ধেক উঠে দাঁড়িয়ে] : আমরা কি তবে আপনাদের কাজে বাধা দিচ্ছি?
মিসেস হিগিন্স [তাকে আবার বসিয়ে দিয়ে] : না না, মোটেও না। বরং আপনারা খুব ঠিক সময়েই এসেছেন। আমরা চাই, আপনারা আমাদের এক বিশেষ বন্ধুর সঙ্গে পরিচিত হন।
হিগিন্স [হঠাৎ আশাবাদী হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে] : হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই! আমাদের তো কয়েকজন মানুষ দরকারই ছিল। আপনারাও বেশ কাজে লাগবেন।
[ঠিক তখনই বৈঠকখানার পরিচারিকা আবার ফিরে আসে, সঙ্গে ফ্রেডি।]
পরিচারিকা : মিস্টার এইন্সফোর্ড হিল।
হিগিন্স [প্রায় অসহ্য বিরক্তিতে] : হে ভগবান! এদের আবার আরেকজনও আছে নাকি!
ফ্রেডি [মিসেস হিগিন্সের সঙ্গে হাত মিলিয়ে] : হাউ ডু ইউ ডু?
মিসেস হিগিন্স : আপনাকে আসতে দেখে খুব ভালো লাগছে।
[পরিচয় করিয়ে দিয়ে]
কর্নেল পিকারিং।
ফ্রেডি [ভদ্রভাবে মাথা নত করে] : হাউ ডু ইউ ডু?
মিসেস হিগিন্স : আমার মনে হয়, আপনি আমার ছেলে প্রফেসর হিগিন্সকে এখনও চেনেন না।
ফ্রেডি [হিগিন্সের দিকে এগিয়ে] : হাউ ডু ইউ ডু?
হিগিন্স [তাকে এমনভাবে দেখে যেন সন্দেহজনক কোনো লোক] : আমি নিশ্চিত, আপনাকে আগে কোথাও দেখেছি। কিন্তু কোথায়?
ফ্রেডি : আমার তো তা মনে পড়ছে না।
হিগিন্স [হতাশ হয়ে] : যাকগে, তাতে কিছু যায় আসে না। বসুন।
[সে ফ্রেডির সঙ্গে হাত মেলায় এবং প্রায় ঠেলে তাকে জানালার দিকে মুখ করে থাকা অটোম্যানের ওপর বসিয়ে দেয়। তারপর নিজে তার অন্য পাশে বসে পড়ে।]
হিগিন্স : যাই হোক, আমরা সবাই এসে গেছি!
[সে মিসেস এইন্সফোর্ড হিলের পাশে বসে।]
এখন বলুন তো, এলিজা না আসা পর্যন্ত আমরা কী নিয়ে কথা বলব?
মিসেস হিগিন্স : হেনরি, রয়্যাল সোসাইটির বৈজ্ঞানিক সভায় তুমি হয়তো প্রাণকেন্দ্র; কিন্তু সাধারণ সামাজিক আসরে তুমি ভীষণ বিরক্তিকর।
হিগিন্স : তাই নাকি? খুবই দুঃখজনক।
[হঠাৎ যেন একটা উপলব্ধি হয়]
আরে হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হচ্ছে!
[সে জোরে হেসে ওঠে]
হা হা হা!
মিস এইন্সফোর্ড হিল [যিনি মনে মনে হিগিন্সকে বিয়ের জন্য বেশ আকর্ষণীয় পুরুষ বলে ভাবছেন] : আমি বুঝতে পারছি। কারণ আমারও ওইসব হালকা কথাবার্তা একদম ভালো লাগে না। মানুষ যদি অন্তত যা ভাবে তাই সোজাসুজি বলত!
হিগিন্স [আবার গম্ভীর হয়ে] : সর্বনাশ!
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল [মেয়ের কথায় বিস্মিত হয়ে] : কেন বলুন তো?
হিগিন্স : কারণ মানুষ যা ভাবে, সেটাই যথেষ্ট বিপজ্জনক। কিন্তু যদি তারা সত্যিই মনের কথা মুখে বলে ফেলে, তাহলে তো পুরো সমাজটাই ভেঙে পড়বে।
আপনারা কি ভাবেন, আমি যদি এখন ঠিক যা ভাবছি তা বলে ফেলি, তাহলে সেটা খুব আনন্দদায়ক হবে?
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল [হেসে] : তা কি খুব নৈরাশ্যজনক কিছু?
হিগিন্স : নৈরাশ্যজনক? কে বলল? আমি শুধু বলছি, সেটা শোভন হবে না।
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল [গম্ভীরভাবে] : ওহ্, আমি নিশ্চিত আপনি আসলে তা বোঝাতে চাইছেন না, মিস্টার হিগিন্স।
হিগিন্স : দেখুন, আমরা সবাই মোটামুটি অসভ্য। সমাজ আমাদের ভদ্র, সংস্কৃতিবান মানুষ বলে ধরে নেয়—যেন আমরা কবিতা, দর্শন, শিল্পকলা, বিজ্ঞান সবই বুঝি। অথচ সত্যি বলতে কী, আমাদের মধ্যে ক’জন এসবের আসল মানেই জানে?
[মিস এইন্সফোর্ড হিলের দিকে তাকিয়ে]
আপনি কবিতা সম্পর্কে কী জানেন?
[মিসেস এইন্সফোর্ড হিলের দিকে]
আপনি বিজ্ঞান সম্পর্কে কী জানেন?
[ফ্রেডির দিকে ইঙ্গিত করে]
আর এই যুবক শিল্প, বিজ্ঞান বা অন্য কিছু সম্পর্কেই বা কী জানে?আর আমি নিজেই বা দর্শন সম্পর্কে কতটুকু জানি বলে মনে করেন?
মিসেস হিগিন্স [সতর্ক সুরে] : হেনরি, তুমি কি আবার আদবকায়দা নিয়েই বক্তৃতা শুরু করছ?
[ঠিক তখনই পরিচারিকা দরজা খুলে ঘোষণা করে।]
পরিচারিকা : মিস ডুলিটল।
[সে সরে যায়।]
হিগিন্স [তাড়াতাড়ি উঠে মায়ের দিকে ছুটে গিয়ে] : এই যে মা—
[সে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে এলিজাকে ইশারায় বোঝায়, ঘরের গৃহকর্ত্রী কে।]
অত্যন্ত মার্জিত ও রুচিসম্পন্ন পোশাকে এলিজা ঘরে প্রবেশ করে। তার মধ্যে এমন এক স্বাভাবিক আভিজাত্য ও সৌন্দর্যের ছাপ ফুটে ওঠে যে উপস্থিত সবাই বিস্ময়ে প্রায় উঠে দাঁড়ায়।হিগিন্সের ইশারা বুঝে লিজা ধীরে ধীরে ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়ায়।
[হিগিন্স লিজাকে ইশারায় মিসেস হিগিন্সের দিকে এগিয়ে দেয়।]
লিজা [অত্যন্ত শুদ্ধ উচ্চারণে, মোলায়েম ও প্রশিক্ষিত কণ্ঠে] : কেমন আছেন, মিসেস হিগিন্স?
[‘হিগিন্স’ শব্দের ‘ H ’ ধ্বনিটি নিখুঁতভাবে উচ্চারণ করতে গিয়ে সে সামান্য হাঁপিয়ে ওঠে, কিন্তু সফল হয়।]
মিস্টার হিগিন্স আমাকে আসতে বলেছিলেন।
মিসেস হিগিন্স [আন্তরিক স্নেহে] : খুব ভালো করেছ এসেছ, মিস ডুলিটল। তোমাকে দেখে আমি সত্যিই খুশি।
পিকারিং : কেমন আছেন, মিস ডুলিটল?
লিজা [তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে] : কর্নেল পিকারিং, তাই তো?
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল : আমার মনে হচ্ছে, আমাদের আগে কোথাও দেখা হয়েছে। আপনার চোখ দুটো আমার মনে আছে।
লিজা : কেমন আছেন?
[সে খুব সুন্দর ভঙ্গিতে হিগিন্সের ফাঁকা করে দেওয়া জায়গায় অটোম্যানের ওপর বসে পড়ে।]
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল : এ আমার মেয়ে ক্লারা।
লিজা : কেমন আছেন?
ক্লারা [হঠাৎ উৎসাহ নিয়ে] : কেমন আছেন?
[সে লিজার পাশে এসে বসে, যেন চোখ দিয়ে তাকে মাপছে।]
ফ্রেডি [তাদের দিকে একটু ঝুঁকে] : আমার তো ভীষণ ভালো লাগছে।
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল : এ আমার ছেলে ফ্রেডি।
লিজা : কেমন আছেন?
[ফ্রেডি মুগ্ধ হয়ে মাথা নোয়ায় এবং এলিজাবেথীয় চেয়ারে বসে পড়ে।]
হিগিন্স [হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে] : আরে হ্যাঁ! সব মনে পড়ে গেল!
[সবাই বিস্ময়ে তার দিকে তাকায়।]
হিগিন্স : কভেন্ট গার্ডেন!
[তারপর বিরক্তি মিশ্রিত স্বরে]
কী ভয়ংকর একটা রাত ছিল!
মিসেস হিগিন্স : হেনরি, দয়া করে!
[হিগিন্স টেবিলের কিনারায় বসতে যাচ্ছিল।]
আমার লেখার টেবিলে বসো না—ওটা ভেঙে ফেলবে।
হিগিন্স [মুখ গোমড়া করে] : দুঃখিত।
[সে ডিভানের দিকে যেতে গিয়ে ফেন্ডারে ধাক্কা খায়, আগুনের লোহার সরঞ্জামের সঙ্গে হোঁচট খায়, বিড়বিড় করে গালাগাল দিতে দিতে নিজেকে সামলায়, এবং শেষে এমন জোরে সোফায় ধপ করে বসে যে মনে হয় এখনই সেটা ভেঙে পড়বে।]
মিসেস হিগিন্স তার দিকে তাকান, কিন্তু অসীম ধৈর্যে কিছু না বলে নিজেকে সামলে নেন।
এরপর ঘরে এক দীর্ঘ, অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে আসে।
মিসেস হিগিন্স [শেষ পর্যন্ত কথোপকথন শুরু করার জন্য] : তোমাদের কি মনে হয়, বৃষ্টি হবে?
লিজা [গভীর গুরুত্বের সঙ্গে] : ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের পশ্চিমে অবস্থানরত নিম্নচাপটি সম্ভবত ধীরে ধীরে পূর্বদিকে অগ্রসর হবে। বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থার বড় কোনো পরিবর্তনের লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
ফ্রেডি : হা হা! দারুণ! কী ভীষণ মজার!
লিজা : এতে হাসির কী আছে, যুবক? আমি বাজি ধরে বলতে পারি, আমি ঠিকই বলেছি।
ফ্রেডি : অসাধারণ!
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল : আমি শুধু আশা করছি ঠান্ডা না পড়ুক। চারদিকে এত ইনফ্লুয়েঞ্জা ছড়িয়েছে! প্রতি বসন্তেই যেন আমাদের পরিবারে এটা হানা দেয়।
লিজা [গম্ভীর করুণ সুরে] : আমার মাসিও ইনফ্লুয়েঞ্জায় মারা গিয়েছিলেন—অন্তত লোকে তাই বলে।
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল [সহানুভূতির শব্দ করে] : আহা!
লিজা [একই সুরে] : কিন্তু আমি বলি, ওকে ওরাই শেষ করে দিয়েছিল।
মিসেস হিগিন্স [হতবাক] : শেষ করে দিয়েছিল মানে?
লিজা : আরে, ঈশ্বর মঙ্গল করুন! এত শক্তসমর্থ একজন মহিলা ইনফ্লুয়েঞ্জায় মরবে কেন? আগের বছর তো দিব্যি ডিপথেরিয়া সারিয়ে উঠেছিল। আমি নিজের চোখে দেখেছি। তার শরীর প্রায় নীল হয়ে গিয়েছিল। সবাই ভেবেছিল সে মারা গেছে।কিন্তু আমার বাবা তার গলায় চামচ দিয়ে জিন ঢালতে থাকলেন, যতক্ষণ না হঠাৎ জ্ঞান ফিরে পেয়ে মাসি চামচটাই কামড়ে ভেঙে ফেলল।
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল [চমকে উঠে] : হায় ঈশ্বর!
লিজা [অভিযোগভরা গলায়] : এত শক্ত মনের মানুষ ইনফ্লুয়েঞ্জায় মরবে কেন? তার নতুন খড়ের টুপিটার কী হলো, যেটা আমার পাওয়ার কথা ছিল? কেউ সেটা চুরি করেছে। আর আমি বলছি, যারা টুপিটা নিয়েছে, তারাই মাসিকেও শেষ করেছে।
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল : “শেষ করে দিয়েছে” মানে কী?
হিগিন্স [তাড়াতাড়ি ব্যাখ্যা করে] : ওহ্, এটা নতুন ধরনের কথাবার্তা। কাউকে “শেষ করে দেওয়া” মানে তাকে খুন করা।
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল [লিজার দিকে আতঙ্ক নিয়ে] : তুমি নিশ্চয়ই সত্যি সত্যি বিশ্বাস করো না যে তোমার মাসিকে হত্যা করা হয়েছে?
লিজা : কেন করব না? যাদের সঙ্গে উনি থাকতেন, তারা একটা টুপির পিনের জন্যও মানুষ মারতে পারে—খড়ের টুপি তো অনেক বড় জিনিস।
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল : কিন্তু তোমার বাবা যেভাবে তার গলায় মদ ঢালছিলেন, তাতেও তো উনি মারা যেতে পারতেন!
লিজা : উনি? আরে না! জিন তো ওনার কাছে মায়ের দুধের মতো ছিল। তাছাড়া, উনি নিজের গলায় এত মদ ঢেলেছেন যে তার উপকারিতা সম্পর্কে খুব ভালোই জানতেন।
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল : তুমি কি বলতে চাইছ, উনি নিয়মিত মদ খেতেন?
লিজা : মদ খেতেন? কী আশ্চর্য! একেবারে পাগলের মতো।
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল : তোমার জন্য সেটা নিশ্চয়ই খুব দুঃখের ছিল।
লিজা : মোটেই না। আমি যতদূর দেখেছি, তাতে ওনার কোনো ক্ষতিই হয়নি। যদিও উনি রোজ করতেন না।
[হাসতে হাসতে]
বলতে পারেন, মাঝে মাঝে হঠাৎ করেই।
আর একটু মদ খেলেই উনি আরও হাসিখুশি আর প্রেমময় হয়ে উঠতেন। আমার মা তো উনাকে চার পেন্স দিয়ে বলতেন, “যাও, একটু খেয়ে এসো—হাসিখুশি না হওয়া পর্যন্ত ফিরো না।”
অনেক মহিলাকেই স্বামীদের সহনীয় করে তুলতে আগে মাতাল করতে হয়।
[এবার সে পুরোপুরি স্বচ্ছন্দ হয়ে পড়েছে।]
দেখো, ব্যাপারটা হলো—একজন মানুষের যদি সামান্য বিবেকও থাকে, তাহলে হুঁশে থাকলেই সেটা তাকে কষ্ট দেয়। কিন্তু একটু মদ খেলেই সেই বিবেকটা উধাও হয়ে যায়, আর মানুষ খুশি হয়ে ওঠে।
[ফ্রেডির দিকে তাকিয়ে, যে হাসি চাপতে গিয়ে প্রায় দমবন্ধ অবস্থায়]
এই! কী নিয়ে এত হাসছ?
ফ্রেডি : এই নতুন ধরনের “হালকা আলাপ” নিয়ে। তুমি এটা কী দারুণভাবে করছ!
লিজা : যদি আমি ঠিকঠাকই করে থাকি, তাহলে তুমি হাসছ কেন?
[হিগিন্সের দিকে ঘুরে]
আমি কি এমন কিছু বলেছি, যা বলা উচিত ছিল না?
মিসেস হিগিন্স [তাড়াতাড়ি] : একদম না, মিস ডুলিটল।
লিজা : যাক, এ তো আশীর্বাদ!
[আবার বিস্তারিত বলতে উদ্যত হয়]
আমি সবসময় বলি—
হিগিন্স [হঠাৎ উঠে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে] : অ্যাঁহেম!
লিজা [ইশারাটা বুঝে উঠে দাঁড়ায়] : আচ্ছা, এখন আমার যাওয়া উচিত।
[সবাই উঠে দাঁড়ায়। ফ্রেডি তাড়াতাড়ি দরজার দিকে এগিয়ে যায়।]
লিজা : আপনাদের সঙ্গে দেখা হয়ে খুব ভালো লাগল। বিদায়।
[সে মিসেস হিগিন্সের সঙ্গে হাত মেলায়।]
মিসেস হিগিন্স : বিদায়, প্রিয়।
লিজা : বিদায়, কর্নেল পিকারিং।
পিকারিং : বিদায়, মিস ডুলিটল।
[তারা হাত মেলায়।]
লিজা [সবার দিকে মাথা নত করে] : বিদায়, সবাইকে।
ফ্রেডি [তার জন্য দরজা খুলে দিয়ে, উৎসুক ভঙ্গিতে] : আপনি কি পার্ক হয়ে হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছেন, মিস ডুলিটল? যদি তাই হয়…
লিজা : হেঁটে যাব? অসম্ভব!
[এমনভাবে বলে যেন এই প্রস্তাবটাই এক ভয়ংকর অপমান]
আমি ট্যাক্সিতে করেই ফিরব।
[এই ঘোষণা করে সে রাজকীয় ভঙ্গিতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।]
পিকারিং বিস্ময়ে যেন ধপ করে চেয়ারে বসে পড়েন।
আর ফ্রেডি—এলাইজাকে শেষবারের মতো আরেকটু দেখার লোভ সামলাতে না পেরে—তাড়াতাড়ি বারান্দার দিকে ছুটে যায়।
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল [আহত ও হতভম্ব কণ্ঠে] : সত্যিই, আমি এই নতুন ধরনের আচার-ব্যবহারের সঙ্গে কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারছি না।
ক্লারা [এলিজাবেথীয় চেয়ারে আধশোয়া ভঙ্গিতে, বিরক্তি নিয়ে] : ওহ্, মাম্মা, এতটা নাটকীয় হওয়ার কী আছে? তুমি যদি সবসময় এমন সেকেলে ভাব দেখাও, তাহলে লোকে ভাববে আমরা যেন সমাজজীবন বলে কিছুই জানি না।
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল : আমি মেনে নিচ্ছি, আমি হয়তো পুরোনো ধ্যানধারণার মানুষ। কিন্তু তবুও আশা করি, তুমি অন্তত ওই ধরনের ভাষা ব্যবহার শুরু করবে না, ক্লারা।তোমাকে পুরুষদের “পচা লোক” বলতে শুনেছি, সবকিছুকে “জঘন্য”, “পাশবিক” বলতেও শুনেছি—যদিও সেগুলোও আমার কাছে যথেষ্ট অশোভন লাগে। কিন্তু আজ যা শুনলাম, সেটা তো সত্যিই সীমা ছাড়িয়ে গেল।আপনি কি তাই মনে করেন না, কর্নেল পিকারিং?
পিকারিং : আমাকে এ বিষয়ে কিছু বলতে বলবেন না। আমি বহু বছর ভারতবর্ষে কাটিয়েছি। এর মধ্যে ইংল্যান্ডের সামাজিক রীতিনীতি এতটাই বদলে গেছে যে কখনো কখনো বুঝতেই পারি না আমি কোনো সম্ভ্রান্ত ভোজসভায় বসে আছি, নাকি জাহাজের নাবিকদের আড্ডায়।
ক্লারা : এগুলো আসলে পুরোটাই অভ্যাসের ব্যাপার। এখানে ঠিক বা ভুল বলে কিছু নেই। কেউ এসব কথা দিয়ে বিশেষ কিছু বোঝাতেও চায় না।বরং এতে একধরনের অদ্ভুত প্রাণচাঞ্চল্য আছে। সাধারণ, একঘেয়ে কথাবার্তাও এতে হঠাৎ অনেক বেশি আকর্ষণীয় আর জীবন্ত হয়ে ওঠে।আমার তো এই নতুন ধরনের আলাপচারিতা বেশ উপভোগ্য আর অনেক বেশি অকপট মনে হয়।
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল [উঠে দাঁড়িয়ে] : আচ্ছা, তাহলে এবার আমাদের ওঠা উচিত।
[পিকারিং এবং হিগিন্সও উঠে দাঁড়ান।]
ক্লারা : ও হ্যাঁ, আমাদের এখনও আরও তিনটে বাড়িতে যেতে হবে।
বিদায়, মিসেস হিগিন্স।
বিদায়, কর্নেল পিকারিং।
বিদায়, প্রফেসর হিগিন্স।
হিগিন্স [ডিভান থেকে উঠে তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে দিতে] : বিদায়। আর শোনো, ওই তিনটি বাড়ির আসরেও এই নতুন “হালকা আলাপ” চালিয়ে যেও। একটুও ভয় পেয়ো না। বরং জোর দিয়েই শুরু করবে।
ক্লারা [হাসতে হাসতে] : নিশ্চয়ই করব। বিদায়।
সত্যিই, এই ভিক্টোরীয় যুগের ভণ্ড শালীনতার বাতিক কত হাস্যকর!
হিগিন্স [আরও উসকে দিয়ে] : একেবারে জঘন্য রকমের হাস্যকর!
ক্লারা : একদম ফালতু বাজে ব্যাপার!
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল [কঠোর ধমকের সুরে] : ক্লারা!
ক্লারা : হা! হা!
[সে এমন এক উচ্ছ্বাস নিয়ে বেরিয়ে যায়, যেন মুহূর্তের মধ্যেই নিজেকে পুরোপুরি আধুনিক ও সমাজসচেতন নারী হিসেবে আবিষ্কার করেছে। কিছুক্ষণ পর সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাওয়ার সময় তার রুপালি হাসির শব্দ ভেসে আসে।]
ফ্রেডি [আকাশের দিকে তাকিয়ে, যেন সাহস সঞ্চয় করছে] : আচ্ছা… আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করছি—
[শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়ে মিসেস হিগিন্সের দিকে এগিয়ে আসে]
বিদায়।
মিসেস হিগিন্স [হাত মিলিয়ে] : বিদায়।
আপনি কি মিস ডুলিটলের সঙ্গে আবার দেখা করতে চান?
ফ্রেডি [অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে] : ওহ্, হ্যাঁ! খুবই চাই।
মিসেস হিগিন্স : তাহলে তো আপনি আমার ‘অ্যাট হোম’–এর দিনগুলো জানেনই।
ফ্রেডি : জানি। অনেক ধন্যবাদ। বিদায়।
[সে দ্রুত বেরিয়ে যায়।]
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল : বিদায়, মিস্টার হিগিন্স।
হিগিন্স : বিদায়। বিদায়।
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল [পিকারিংকে] : না, কোনো লাভ নেই। আমি কোনোদিন ওইসব নতুন শব্দ ব্যবহার করতে পারব না।
পিকারিং : ব্যবহার না করলেও চলবে। এগুলো বাধ্যতামূলক নয়, জানেন তো। এগুলো ছাড়াও আপনি দিব্যি মানিয়ে নিতে পারবেন।
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল : কিন্তু আমি যদি একেবারে নতুন স্ল্যাং ব্যবহার না করি, তাহলে ক্লারা আমার ওপর ভীষণ বিরক্ত হয়।
বিদায়।
পিকারিং : বিদায়।
[তারা হাত মেলায়।]
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল [মিসেস হিগিন্সকে নিচু স্বরে] : ক্লারার কথাবার্তা কিছু মনে করবেন না।
[পিকারিং বুঝতে পারে, এই কথা তাকে শোনানোর জন্য বলা হয়নি। তাই সে চুপচাপ জানালার পাশে গিয়ে হিগিন্সের পাশে দাঁড়ায়।]
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল [কিছুটা আবেগ নিয়ে] : আমরা খুব গরিব, জানেন তো। আর বেচারি মেয়েটা খুব কমই কোথাও যেতে পারে। তাই ও একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলে। তবে ছেলেটা কিন্তু খুব ভালো। আপনার কি তাই মনে হয় না?
মিসেস হিগিন্স : ওহ্, নিশ্চয়ই। ফ্রেডিকে দেখলে আমি সবসময় খুশি হই।
মিসেস এইন্সফোর্ড হিল : ধন্যবাদ, প্রিয়। বিদায়।
[তিনি বেরিয়ে যান।]
হিগিন্স [উত্তেজনায় প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে] : কী বলো? এলিজাকে কেমন লাগল?
[সে মায়ের হাত ধরে টেনে অটোম্যানের কাছে নিয়ে আসে। মিসেস হিগিন্স সেখানে বসেন—যেখানে একটু আগেই এলিজা বসেছিল। হিগিন্স তার বাঁ পাশে বসে, আর পিকারিং ডান পাশের চেয়ারে ফিরে আসে।]
মিসেস হিগিন্স : বোকা ছেলে, অবশ্যই ওকে ঠিকঠাক লাগেনি।
সে তোমার ধ্বনিতত্ত্বের কৌশল আর তার দর্জির শিল্প—দুটোরই এক অসাধারণ সাফল্য। কিন্তু তুমি যদি এক মুহূর্তের জন্যও ভাবো যে সে সত্যিই সমাজের ভদ্রমহিলাদের মতো আচরণ করেছে, তাহলে তুমি সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত।তার প্রতিটি কথার মধ্যে এমন এক উত্যক্ত, কাঁচা বাস্তবতা আছে যে শোনামাত্র বোঝা যায় সে অন্য জগতের মানুষ।
পিকারিং : কিন্তু আপনার কি মনে হয় না, এ ব্যাপারে কিছু করা যেতে পারে? মানে, তার কথাবার্তা থেকে ওই রুক্ষ, সহিংস ভাবটা একটু কমানো যায়?
মিসেস হিগিন্স : যতদিন সে হেনরির হাতে আছে, ততদিন নয়।
হিগিন্স [আহত গলায়] : তার মানে? আপনি কি বলতে চাইছেন, আমার নিজের ভাষাই অশোভন?
মিসেস হিগিন্স : না, প্রিয়। তোমার ভাষা একেবারে মানানসই হতে পারে—ধরো কোনো খালের নৌকায় বা শ্রমিকদের আড্ডায়। কিন্তু গার্ডেন পার্টিতে নয়।
হিগিন্স [গভীর অভিমানে] : আচ্ছা, তাহলে আমাকে বলতে হয়—
পিকারিং [তাকে থামিয়ে দিয়ে] : আরে হিগিন্স, তোমাকে একটু আত্মসমালোচনা করতে শিখতে হবে। হাইড পার্কে স্বেচ্ছাসেবকদের কুচকাওয়াজ দেখার সময় যেমন ভাষা শুনতাম, তোমার মুখে আজও সেই একই ভাষা শুনি।
হিগিন্স [অভিমানী সুরে] : ওহ্, বেশ। যদি তোমরা তাই ভাবো, তাহলে ধরে নিচ্ছি আমি সবসময় বিশপদের মতো ভদ্র ভাষায় কথা বলি না।
মিসেস হিগিন্স [হেনরির হাত ছুঁয়ে শান্ত করে] : কর্নেল পিকারিং, বলুন তো, উইম্পল স্ট্রিটে আসলে কী চলছে?
পিকারিং [হেসে, যেন হঠাৎ আলোচনার দিক বদলে গেছে] : আসলে আমি হেনরির সঙ্গে ওখানেই থাকছি। আমরা একসঙ্গে আমার ভারতীয় উপভাষাগুলো নিয়ে কাজ করি। তাই একসঙ্গে থাকাটাই সুবিধাজনক মনে হয়েছে—
মিসেস হিগিন্স : সে তো বুঝলাম। ব্যবস্থাটা নিশ্চয়ই খুব সুন্দর। কিন্তু মেয়েটি কোথায় থাকে?
হিগিন্স : অবশ্যই আমাদের সঙ্গেই। আর কোথায় থাকবে?
মিসেস হিগিন্স : কিন্তু কী পরিচয়ে? সে কি কাজের মেয়ে? যদি না হয়, তাহলে সে আসলে কী?
পিকারিং [ধীরে ধীরে, অর্থ বুঝতে পেরে] : আমার মনে হয়, আমি বুঝতে পারছি আপনি কী বোঝাতে চাইছেন, মিসেস হিগিন্স।
হিগিন্স : আরে, আমি তো জানিই! মেয়েটাকে এই জায়গায় আনতে আমাকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস খাটতে হয়েছে। তাছাড়া, সে যথেষ্ট কাজেরও। আমার জিনিসপত্র কোথায় আছে, কোন অ্যাপয়েন্টমেন্ট কবে—সব ওর নখদর্পণে।
মিসেস হিগিন্স : আর আপনার গৃহপরিচারিকা তার সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে চলে?
হিগিন্স : মিসেস পিয়ার্স? ওহ্, লিজা আসার পর থেকে উনি তো যেন স্বর্গে আছেন। আগে আমার জিনিসপত্র খুঁজে দেওয়া, সাক্ষাতের কথা মনে করিয়ে দেওয়া—সবই তাঁকে করতে হতো। এখন সেই ঝামেলা থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
কিন্তু লিজাকে নিয়ে উনার মাথায় একটা অদ্ভুত চিন্তা ঢুকেছে। সারাক্ষণ একই কথা বলেন—
“আপনি তো ভাবেনই না, স্যার!”
তাই না, পিক?
পিকারিং : হ্যাঁ, এটাই উনার ধ্রুবক বুলি—
“আপনি তো ভাবেনই না, স্যার।”
লিজাকে নিয়ে যেকোনো আলোচনা শেষ পর্যন্ত গিয়ে এই কথাতেই ঠেকে।
হিগিন্স : যেন আমি কোনোদিন লিজা আর তার ওই ভয়ানক স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ নিয়ে ভাবা বন্ধ করি!আমি ওর ঠোঁট, দাঁত, জিভ—এসব নিয়ে এত ভেবেছি, এত পর্যবেক্ষণ করেছি যে এখন ক্লান্ত হয়ে গেছি। আর ওর আত্মা! সেটাই তো সবচেয়ে জটিল ব্যাপার।
মিসেস হিগিন্স : তোমরা দু’জনকে দেখলে মনে হয়, যেন দুটো ছোট ছেলে নিজেদের জীবন্ত পুতুল নিয়ে খেলছ।
হিগিন্স : খেলা?
[প্রায় প্রতিবাদ করে ওঠে]
মা, এটা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজ। কিন্তু একই সঙ্গে সবচেয়ে রোমাঞ্চকরও।তুমি কল্পনাও করতে পারবে না—একজন মানুষকে নতুন ভাষা শেখানো, তার উচ্চারণ বদলে তাকে যেন সম্পূর্ণ নতুন মানুষে রূপান্তরিত করা কতটা বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা!এ যেন এক শ্রেণি থেকে আরেক শ্রেণির দূরত্ব পেরিয়ে যাওয়া—এক আত্মা থেকে আরেক আত্মার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা।
পিকারিং [নিজের চেয়ার আরও কাছে টেনে এনে উৎসাহভরে] : সত্যিই, এটা ভীষণ আকর্ষণীয়।আমি আপনাকে আশ্বস্ত করছি, মিসেস হিগিন্স, আমরা এলিজাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিই।প্রায় প্রতি সপ্তাহেই—না, প্রায় প্রতিদিনই—ওর মধ্যে নতুন নতুন পরিবর্তন দেখা যায়।
[আরও ঝুঁকে]
আমরা প্রতিটি পর্যায়ের রেকর্ড পর্যন্ত রেখে দিচ্ছি—ডজন ডজন গ্রামোফোন ডিস্ক, ছবি—
হিগিন্স [উত্তেজনায় কথার মধ্যে ঢুকে] : সত্যিই বলছি, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক পরীক্ষা।
লিজা যেন আমাদের পুরো জীবনটাই ভরে দিয়েছে। তাই না, পিক?
পিকারিং : আমরা প্রায় সারাক্ষণ এলিজাকেই নিয়ে কথা বলি।
হিগিন্স : লিজাকে শেখানো নিয়ে।
পিকারিং : লিজাকে সাজানো নিয়ে।
মিসেস হিগিন্স : কী বললে?
হিগিন্স : যেন প্রতিদিন নতুন নতুন লিজাকে আবিষ্কার করছি।
[এবার হিগিন্স ও পিকারিং একসঙ্গে উত্তেজিতভাবে কথা বলতে শুরু করে।]
হিগিন্স : জানো, ওর শ্রবণশক্তি অসাধারণ—
পিকারিং : আমি আপনাকে আশ্বাস দিচ্ছি, প্রিয় মিসেস হিগিন্স, মেয়েটি সত্যিই অসাধারণ—
হিগিন্স : টিয়াপাখির মতো অনুকরণ করতে পারে। আমি ওকে দিয়ে মানুষের মুখে সম্ভব এমন সব ধরনের শব্দ বলিয়ে দেখেছি—
পিকারিং : আর ওর পিয়ানো বাজানোর হাতও চমৎকার—
হিগিন্স : মানুষের পক্ষে উচ্চারণ করা যায় এমন প্রতিটি ধ্বনি!
পিকারিং : আমরা ওকে ক্লাসিক্যাল কনসার্টেও নিয়ে গেছি, আবার মিউজিক হলেও।
হিগিন্স : কন্টিনেন্টাল উপভাষা, আফ্রিকান উপভাষা, হটেন্টট—
পিকারিং : আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, ওর কাছে সবই সমান সহজ। যা শুনে, তাই বাজাতে পারে।
হিগিন্স : এমনকি সেই সব জটিল ধ্বনিও—যেগুলো সংগ্রহ করতে আমার বছরের পর বছর লেগেছে। আর বাড়ি ফিরে এলিজা সেগুলো একবার শুনেই তুলে ফেলে।
পিকারিং : ও এমন দ্রুত শেখে যেন জন্ম থেকেই এসব জানত।
হিগিন্স : বিদ্যুতের গতিতে! যেন সারাজীবন এই কাজই করে এসেছে।
পিকারিং : অথচ ছয় মাস আগেও মেয়েটা পিয়ানোর চাবিতেও হাত দেয়নি।
মিসেস হিগিন্স [অবশেষে কানে আঙুল দিয়ে] : শ্-শ্-শ্!
[দু’জনেই থেমে যায়।]
পিকারিং : মাফ করবেন।
[সে লজ্জিত ভঙ্গিতে নিজের চেয়ারটা একটু পেছনে সরায়।]
হিগিন্স : আমিও দুঃখিত।
[তারপর গম্ভীরভাবে]
পিকারিং যখন চিৎকার শুরু করে, তখন আর কারও কথা বলার সুযোগ থাকে না।
মিসেস হিগিন্স : চুপ করো, হেনরি।
[পিকারিংয়ের দিকে ঘুরে]
কর্নেল পিকারিং, আপনারা কি বুঝতে পারছেন না—যেদিন এলিজা উইম্পল স্ট্রিটের বাড়িতে ঢুকেছিল, সেদিন তার সঙ্গে আরও কিছু ঢুকেছিল?
পিকারিং : তার বাবাও তো এসেছিল। তবে হেনরি খুব তাড়াতাড়িই তাকে বিদায় করেছে।
মিসেস হিগিন্স : তার মা এলেও বরং সুবিধা হতো। কিন্তু যেহেতু তার মা আসেনি, তাই সঙ্গে এসেছে আরও অন্য কিছু।
পিকারিং : কী?
মিসেস হিগিন্স [একটু থেমে, যেন শব্দটি বেছে নিচ্ছেন] : একটা সমস্যা।
পিকারিং : ওহ্, বুঝতে পারছি। মানে, কীভাবে তাকে একজন ভদ্রমহিলা হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা যায়—সেই সমস্যা?
হিগিন্স : ওটা কোনো সমস্যাই নয়। আমি ইতিমধ্যেই তার অর্ধেক সমাধান করে ফেলেছি।
মিসেস হিগিন্স : না, তোমরা দু’জনই ভীষণ বোকা পুরুষমানুষ।
সমস্যাটা হলো—এরপর এলিজার কী হবে?
হিগিন্স : আমি এর মধ্যে কোনো সমস্যাই দেখি না। আমি তাকে সুযোগ-সুবিধা দিয়েছি, শিক্ষা দিয়েছি। এখন সে নিজের মতো জীবন কাটাতে পারে।
মিসেস হিগিন্স : এইমাত্র যে বেচারি মহিলাটি এখান থেকে গেলেন, তাঁর জীবনটাই তো তার প্রমাণ। একজন সম্ভ্রান্ত মহিলার যেসব আচার-আচরণ আর অভ্যাস থাকে, সেগুলোই তাকে এমন এক অবস্থায় ফেলে যে উপযুক্ত আয় না থাকলে সে নিজের জীবিকা নির্বাহই করতে পারে না। তোমরা কি এলিজার ক্ষেত্রেও সেটাই চাও?
পিকারিং [হালকা বিরক্তি চেপে, সান্ত্বনার সুরে] : ওহ্, এত চিন্তার কিছু নেই, মিসেস হিগিন্স।
[সে উঠে দাঁড়ায়।]
হিগিন্স [সেও উঠে দাঁড়িয়ে] : আমরা ওর জন্য কোনো না কোনো সহজ কাজের ব্যবস্থা করে দেব।
পিকারিং : আর সে এখন বেশ সুখেই আছে। সত্যিই, ওকে নিয়ে আপনি অত ভাববেন না। বিদায়।
[সে এমন ভঙ্গিতে হাত মেলায়, যেন কোনো উদ্বিগ্ন শিশুকে শান্ত করছে।]
হিগিন্স : যাই হোক, এখন আর এসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। যা হওয়ার হয়ে গেছে। বিদায়, মা।
[সে মাকে চুমু খেয়ে পিকারিংয়ের পিছু নেয়।]
পিকারিং [দরজার কাছ থেকে ফিরে শেষবার আশ্বাস দিয়ে] : যা ঠিক হবে, সেটাই আমরা করব। অনেক সুযোগ আছে। বিদায়।
হিগিন্স [পিকারিংকে নিয়ে বেরোতে বেরোতে] : চলো, এলিজাকে আর্লস কোর্টের শেক্সপিয়র প্রদর্শনীতে নিয়ে যাই।
পিকারিং : হ্যাঁ, চলো। ওর মন্তব্যগুলো নিশ্চয়ই অসাধারণ হবে।
হিগিন্স : আর বাড়ি ফিরে ও আমাদের জন্য সব লোকের অনুকরণও করবে।
পিকারিং : ফাটাফাটি হবে!
[দু’জনের হাসির শব্দ সিঁড়ি বেয়ে নিচে মিলিয়ে যায়।]
মিসেস হিগিন্স [হঠাৎ অস্থিরভাবে উঠে নিজের লেখার টেবিলে ফিরে যান]।
তিনি টেবিলের উপর ছড়িয়ে থাকা কাগজপত্র গুছিয়ে ফেলেন, লেখার বাক্স থেকে একটি কাগজ বের করেন এবং দৃঢ়ভাবে লিখতে শুরু করেন।
কিন্তু তৃতীয় লাইনে পৌঁছাতেই থেমে যান। বিরক্তিতে কলম ছুঁড়ে ফেলে টেবিল আঁকড়ে ধরে প্রায় চিৎকার করে ওঠেন—
“ওহ্, পুরুষেরা!
পুরুষেরা!!
পুরুষেরা!!!”
( চলবে )



