জর্জ বার্নার্ড শ
অনুবাদ : অরিজিতা দাস
পঞ্চম অঙ্ক
মিসেস হিগিন্সের বৈঠকখানা
মিসেস হিগিন্স আগের মতোই তাঁর লেখার টেবিলে বসে আছেন।ঘরে সেই একই সংযত সৌন্দর্য, একই নিস্তব্ধতা।ঠিক তখন বৈঠকখানার পরিচারিকা ভেতরে আসে।
পরিচারিকা [দরজার কাছে দাঁড়িয়ে] : মিস্টার হেনরি আর কর্নেল পিকারিং নিচে আছেন, ম্যাম।
মিসেস হিগিন্স : বেশ, ওদের উপরে নিয়ে এসো।
পরিচারিকা : ওরা এখন টেলিফোন ব্যবহার করছেন, ম্যাম।আমার মনে হয় পুলিশকে ফোন করছেন।
মিসেস হিগিন্স [মাথা তুলে বিস্ময়ে] : কী!
পরিচারিকা [আরও একটু ভেতরে এসে নিচু স্বরে] : মিস্টার হেনরির অবস্থা খুব খারাপ, ম্যাম।ভাবলাম আপনাকে আগে থেকেই জানিয়ে রাখি।
মিসেস হিগিন্স : আপনি যদি এসে বলতেন যে মিস্টার হেনরির অবস্থা ভালো, তাহলে আমি বরং আরও অবাক হতাম।পুলিশের সঙ্গে কথা শেষ হলে ওদের উপরে আসতে বলো।আমার ধারণা, উনি আবার কিছু একটা হারিয়েছেন।
পরিচারিকা : ঠিক আছে, ম্যাম।
[সে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয়।]
মিসেস হিগিন্স : আর শোনো—
উপরে গিয়ে মিস ডুলিটলকে বলো, মিস্টার হেনরি আর কর্নেল এসেছেন।আমি ডেকে না পাঠানো পর্যন্ত যেন ও নিচে না আসে।
পরিচারিকা : ঠিক আছে, ম্যাম।
[সে বেরিয়ে যায়।]
ঠিক তার পরের মুহূর্তেই হিগিন্স ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে পড়ে।
পরিচারিকার কথাই সত্যি—তার অবস্থা একেবারে এলোমেলো। চুল উসকোখুসকো, চোখে উদ্বেগ, মুখে উত্তেজনা আর বিরক্তির ছাপ।
হিগিন্স : দেখো তো, মা!
এখানে ভয়ংকর একটা কাণ্ড ঘটে গেছে!
মিসেস হিগিন্স : হ্যাঁ, বাবা। সুপ্রভাত।
[তিনি নিজের বিরক্তি সংযত করে ছেলেকে চুমু খান। এদিকে পরিচারিকা চুপচাপ বেরিয়ে যায়।]
কী হয়েছে?
হিগিন্স : লিজা পালিয়ে গেছে!
মিসেস হিগিন্স [অত্যন্ত শান্তভাবে আবার লেখায় মন দিতে দিতে] : তুমি নিশ্চয়ই মেয়েটাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছ।
হিগিন্স : ভয় পাইয়ে দিয়েছি!বাজে কথা!গতরাতে যথারীতি ওকে বাতি নেভানো আর এসব ছোটখাটো কাজের দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছিল।কিন্তু বিছানায় যাওয়ার বদলে সে জামাকাপড় বদলে সোজা বেরিয়ে গেছে।ওর বিছানায় কেউ শোয়নি।আজ সকাল সাতটার আগেই ট্যাক্সি করে ফিরে এসে নিজের জিনিসপত্র নিয়ে গেছে।আর সেই বোকা মিসেস পিয়ার্স আমাকে একটা কথাও না বলে সব জিনিস ওর হাতে তুলে দিয়েছে!এখন আমি কী করব?
মিসেস হিগিন্স : আমার মনে হয়, তোমাকে এখন ওগুলো ছাড়াই কাজ চালাতে শিখতে হবে, হেনরি।মেয়েটি তো আর তোমার সম্পত্তি নয়।
মিসেস হিগিন্স : মেয়েটির ইচ্ছে হলে চলে যাওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার আছে।
হিগিন্স [উদ্বিগ্নভাবে ঘরময় পায়চারি করতে করতে] : কিন্তু আমি তো কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না!
আমার কোন কোন অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে, তাও জানি না। আমি—
[ঠিক তখনই পিকারিং ভেতরে প্রবেশ করে।]
মিসেস হিগিন্স কলম নামিয়ে রেখে টেবিল থেকে মুখ ফেরান।
পিকারিং [হাত মিলিয়ে] : সুপ্রভাত, মিসেস হিগিন্স।
হেনরি কি আপনাকে সব বলেছে?
[সে অটোম্যানের ওপর বসে পড়ে।]
হিগিন্স : ওই গাধা ইন্সপেক্টরটা কী বলল?তোমরা কি কোনো পুরস্কার ঘোষণা করেছ?
মিসেস হিগিন্স [বিস্ময় ও রাগে উঠে দাঁড়িয়ে] : কী বললে?তোমরা লিজার পেছনে পুলিশ লাগিয়েছ?
হিগিন্স : অবশ্যই লাগিয়েছি।পুলিশ আর কীসের জন্য আছে?আমরা আর কী-ই বা করতে পারতাম?
[সে এলিজাবেথীয় চেয়ারে বসে পড়ে।]
পিকারিং : ইন্সপেক্টরটা খুব ঝামেলা করছিল।আমার তো মনে হচ্ছিল, সে যেন আমাদের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য আছে বলে সন্দেহ করছে।
মিসেস হিগিন্স : আর সে সন্দেহ করবেই তো!তোমার কী অধিকার ছিল পুলিশের কাছে গিয়ে লিজার নাম এমনভাবে বলার, যেন সে কোনো চোর, কিংবা হারিয়ে যাওয়া ছাতা?
সত্যই, হেনরি!
[তিনি আবার বসে পড়েন, স্পষ্ট বিরক্তিতে।]
হিগিন্স : কিন্তু আমরা তো ওকে খুঁজে পেতে চাই!
পিকারিং : আমরা তো ওকে এভাবে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে দিতে পারি না, মিসেস হিগিন্স।আমরা আর কী করতাম?
মিসেস হিগিন্স : তোমরা দু’জন মিলে দুটো শিশুর থেকেও কম বুদ্ধিমান।
কেন—
[ঠিক তখনই বৈঠকখানার পরিচারিকা ভেতরে এসে তার কথা থামিয়ে দেয়।]
পরিচারিকা : মিস্টার হেনরি, একজন ভদ্রলোক আপনার সঙ্গে খুব জরুরি কারণে দেখা করতে চান।তাকে উইম্পল স্ট্রিট থেকে পাঠানো হয়েছে।
হিগিন্স : ধুর! আবার কী ঝামেলা!আমি এখন কারও সঙ্গে দেখা করতে পারব না।
কে তিনি?
পরিচারিকা : একজন মিস্টার ডুলিটল, স্যার।
পিকারিং : ডুলিটল!মানে সেই ময়লাওয়ালা?
পরিচারিকা [প্রায় অপমানিত বিস্ময়ে] : ময়লাওয়ালা!
ওহ না, স্যার—একজন ভদ্রলোক।
হিগিন্স [হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে লাফিয়ে উঠে] : আরে, পিক!তাহলে লিজা নিশ্চয়ই ওর কোনো আত্মীয়ের কাছেই গেছে—যার কথা আমরা কিছুই জানি না।
[পরিচারিকার দিকে]
ওনাকে তাড়াতাড়ি উপরে পাঠাও।
পরিচারিকা : : ঠিক আছে, স্যার।
[সে বেরিয়ে যায়।]
হিগিন্স [উত্তেজিত ভঙ্গিতে মায়ের দিকে এগিয়ে এসে] : ভদ্রমহোদয়গণ, এবার কিন্তু আসল মজা শুরু হতে চলেছে!এখন আমরা কিছু শোনার মতো কথা শুনব।
[সে গিয়ে চিপেনডেল চেয়ারে বসে পড়ে।]
মিসেস হিগিন্স : আপনি কি লিজার পরিবারের আর কাউকে চেনেন, মিস্টার ডুলিটল?
পিকারিং : শুধু ওর বাবাকেই চিনি—যার কথা আমরা আপনাকে আগেই বলেছি।
[ঠিক তখনই বৈঠকখানার পরিচারিকা এসে ঘোষণা করে।]
পরিচারিকা : মিস্টার ডুলিটল।
[সে সরে যায়।]
ডুলিটল প্রবেশ করে।
কিন্তু এ যেন আগের সেই ময়লাওয়ালা মানুষটি নয়।আজ সে ঝকঝকে নতুন ফ্যাশনের ফ্রক-কোট, সাদা ওয়েস্টকোট আর ধূসর প্যান্ট পরে একেবারে ভদ্রলোকের বেশে সেজেছে।বোতামের ছিদ্রে ফুল, চকচকে রেশমি টুপি আর পেটেন্ট লেদারের জুতো তার সাজে এক অদ্ভুত আড়ম্বর যোগ করেছে।তবে পোশাক পাল্টালেও তার ভঙ্গি পাল্টায়নি।সে এতটাই উত্তেজিত ও ক্ষুব্ধ যে ঘরে ঢুকেই মিসেস হিগিন্সকে খেয়াল না করে সোজা হিগিন্সের দিকে এগিয়ে যায়।
ডুলিটল [নিজের পোশাকের দিকে ইঙ্গিত করে] : এই দেখুন!দেখছেন?এই সর্বনাশটা আপনি করেছেন!
হিগিন্স : আমি আবার কী করলাম?
ডুলিটল : কী করেছেন?
এই দেখুন!
[সে নিজের টুপিটা তুলে ধরে।]
এই টুপিটা দেখুন।
এই কোটটা দেখুন।
এই পুরো সাজসজ্জাটা দেখুন!
পিকারিং : লিজা কি আপনাকে জামাকাপড় কিনে দিয়েছে নাকি?
ডুলিটল : লিজা!ও আবার কেন আমাকে জামাকাপড় কিনে দেবে?
না, না—এ সব ওর কাজ নয়।
মিসেস হিগিন্স : সুপ্রভাত, মিস্টার ডুলিটল।
বসবেন না?
ডুলিটল [হঠাৎ গৃহকর্ত্রীর উপস্থিতি খেয়াল করে কিছুটা লজ্জিত হয়ে] : ওহ্, মাফ করবেন, ম্যাডাম।
[সে এগিয়ে গিয়ে তাঁর বাড়ানো হাত ভদ্রভাবে ধরে।]
ধন্যবাদ।
[সে গিয়ে পিকারিংয়ের ডানদিকে অটোম্যানের ওপর বসে পড়ে।]
আমি এতটাই বিপদের মধ্যে পড়েছি যে মাথায় আর কিছুই কাজ করছে না।
হিগিন্স : আচ্ছা, এবার বলুন তো—আপনার এমন কী সর্বনাশ হয়েছে?
ডুলিটল : যদি ব্যাপারটা শুধু আমার নিজের সঙ্গে ঘটত, তাহলে কিছু বলতাম না।এই দুনিয়ায় মানুষের সঙ্গে কত কিছুই তো ঘটে—সবকিছুর জন্য ভাগ্যকেই দোষ দেওয়া যায়।কিন্তু এ তো আপনি করেছেন।হ্যাঁ, আপনিই, হেনরি হিগিন্স!
হিগিন্স : আপনি কি লিজাকে খুঁজে পেয়েছেন?সেটাই তো আসল কথা।
ডুলিটল : আপনি কি ওকে হারিয়ে ফেলেছেন?
হিগিন্স : হ্যাঁ।
ডুলিটল : তাহলে তো আপনার কপাল ভালো!
আমি ওকে খুঁজে পাইনি ঠিকই—কিন্তু আপনি আমার সঙ্গে যা করেছেন, তার পরে লিজাই খুব তাড়াতাড়ি আমাকে খুঁজে বের করবে!
ডুলিটল : আমার সঙ্গে যা করা হয়েছে, সেটাই তো সর্বনাশ!
মিসেস হিগিন্স : কিন্তু আমার ছেলে আপনার এমন কী ক্ষতি করেছে, মিস্টার ডুলিটল?
ডুলিটল : ক্ষতি?
আমাকে একেবারে শেষ করে দিয়েছে!আমার শান্তি কেড়ে নিয়েছে, আমার স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে।আমাকে ধরে বেঁধে মধ্যবিত্ত নৈতিকতার হাতে তুলে দিয়েছে!
হিগিন্স [বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে তার সামনে গিয়ে] : একেবারে অর্থহীন কথা!
তুমি বকছো কী সব?
তুমি মাতাল।
অথবা পাগল।
আমি তোমাকে পাঁচ পাউন্ড দিয়েছিলাম।
তারপর আরও দু’বার তোমার সঙ্গে কথা হয়েছে—ঘণ্টায় আড়াই শিলিং হারে।
তারপর তো তোমাকে আর দেখিইনি!
ডুলিটল : ওহ্, তাই নাকি?
আমি মাতাল?
আমি পাগল?
আচ্ছা, তাহলে একটা কথা বলুন।
আপনি কি সেই আমেরিকান বুড়ো ধনকুবেরকে চিঠি লিখেছিলেন—যে সারা পৃথিবীতে নৈতিক সংস্কার সমিতি গড়ার জন্য পাঁচ মিলিয়ন ডলার দান করছিল, আর আপনার কাছে একটা “সর্বজনীন ভাষা” আবিষ্কারের অনুরোধ করেছিল?
হিগিন্স : কী! এজরা ডি. ওয়ানাফেলার?
সে তো মারা গেছে।
[সে আবার উদাসীন ভঙ্গিতে বসে পড়ে।]
ডুলিটল : হ্যাঁ, উনি মারা গেছেন।
আর আমার জীবনটাও সঙ্গে নিয়ে গেছেন।
বলুন তো, আপনি কি তাকে এই বলে চিঠি লিখেছিলেন যে, আপনার জানা মতে বর্তমানে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে মৌলিক নীতিবাদী মানুষ হল “আলফ্রেড ডুলিটল”—একজন সাধারণ ময়লাওয়ালা?
হিগিন্স [হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে] : ওহ্!
হ্যাঁ, মনে পড়ছে।
তোমার সঙ্গে শেষবার দেখা হওয়ার পরে আমি মজা করে এরকম কিছু লিখেছিলাম বোধহয়।
ডুলিটল : মজা!
আপনি ওটাকে মজা বলতে পারেন, স্যার—
কিন্তু ওই “মজা” আমার জীবনটাই ওলটপালট করে দিয়েছে!
ওই বুড়ো সাহেব তাঁর উইলে লিখে গেছেন—
আমেরিকানরা নাকি যোগ্যতার মর্যাদা দিতে জানে, সমাজের যে স্তরের মানুষই হোক না কেন।
আর সেই কারণেই, হেনরি হিগিন্স, আপনার ওই অভিশপ্ত রসিকতার জন্য ধন্যবাদ, তিনি তাঁর “প্রি-ডাইজেস্টেড চিজ ট্রাস্ট”-এর একটা অংশ আমার নামে লিখে দিয়ে গেছেন!
বছরে তিন হাজার পাউন্ড!
তবে শর্ত আছে—
আমাকে তাঁর “ওয়ানাফেলার মোরাল রিফর্ম ওয়ার্ল্ড লীগ”-এর হয়ে বছরে ছ’বার পর্যন্ত বক্তৃতা দিতে হবে, যখনই তারা ডাকবে।
হিগিন্স : শয়তান বুড়োটা সত্যিই তাই করেছে নাকি!
উফ্—এ তো দারুণ মজার ব্যাপার!
[হঠাৎ উৎসাহে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।]
কী অসাধারণ কাণ্ড!
পিকারিং : এতে তো আপনার নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়েছে, ডুলিটল।ওরা আপনাকে বারবার ডাকবে বলেও মনে হয় না।
ডুলিটল : বক্তৃতা দেওয়া নিয়ে আমার আপত্তি নেই, গভর্নর।আমি চাইলে ওদের এমন নীতিকথা শোনাব যে মুখ নীল হয়ে যাবে!আপত্তিটা অন্য জায়গায়।আমাকে “ভদ্রলোক” বানিয়ে ফেলার মধ্যে!
কে ওকে বলেছিল আমাকে ভদ্রলোক বানাতে?আমি তো সুখেই ছিলাম।স্বাধীন ছিলাম।যখন টাকার দরকার হতো, তখন যে কারও কাছে গিয়ে চাইতে পারতাম—
যেমন আপনার কাছেও গিয়েছিলাম, হেনরি হিগিন্স।
কিন্তু এখন?
এখন আমি সর্বক্ষণ চিন্তায় ডুবে থাকি।সমাজ আমাকে গলায় দড়ি, পায়ে শিকল পরিয়ে ফেলেছে।
আগে আমি মানুষের কাছে টাকা চাইতাম—
এখন সবাই আমার কাছে টাকা চাইতে আসে!আমার আইনজীবী বলেন, “এটা আপনার জন্য বিরাট সৌভাগ্য।”
সৌভাগ্য!
আমি তাকে বলি—
আপনি কি বলতে চাইছেন, এটা একটা আশীর্বাদ?
ডুলিটল : “তোমার তো খুব ভালোই হয়েছে,” আমি উকিলকে বললাম।যখন আমি গরিব ছিলাম, তখন একবার একটা ময়লার গাড়িতে একটি বাচ্চার ঠেলাগাড়ি পাওয়া গিয়েছিল।উকিলবাবু তখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে জেল থেকে ছাড়িয়ে নিজেও আমার হাত থেকে বাঁচলেন, আমাকেও তাঁর হাত থেকে বাঁচালেন।
ডাক্তারদের অবস্থাও ঠিক একই ছিল।
আমি পায়ে ঠিকমতো দাঁড়াতে পারার আগেই হাসপাতাল থেকে বের করে দিত;
এক পয়সাও খরচ করত না।
কিন্তু এখন?
এখন তারা আবিষ্কার করেছে আমি নাকি “মূল্যবান মানুষ”!দিনে দু’বার তাদের যত্ন না পেলে আমি বাঁচব না।বাড়িতে আমাকে নিজের কোনো কাজই করতে দেওয়া হয় না।সব কাজ অন্য লোক করে—আর তার জন্য আমাকেই টাকা গুনতে হয়।
এক বছর আগেও পৃথিবীতে আমার দু-তিনজন আত্মীয় ছিল, যারা আমার সঙ্গে কথাই বলত না।এখন আমার পঞ্চাশজন আত্মীয় হয়েছে। আর তাদের কারও সপ্তাহের আয়ই ঠিকমতো চলে না!এখন আমাকে নিজের জন্য নয়, অন্যদের জন্য বাঁচতে হবে।এই হলো মধ্যবিত্ত নৈতিকতা!
আপনি লিজাকে হারানোর কথা বলছেন।
চিন্তা করবেন না।আমি বাজি ধরে বলতে পারি, এই খবর শোনামাত্র সে আমার বাড়ির দরজায় গিয়ে হাজির হয়েছে।সেই মেয়েটা, যে আমি যদি “সম্মানীয়” না হতাম, তাহলে ফুল বিক্রি করেই দিব্যি নিজের জীবন চালিয়ে নিতে পারত।
আর এখন, যে লোকটা আমাকে ছুঁয়ে বদলে দিয়েছে, সে আপনি, হেনরি হিগিন্স।আপনি আমাকে ভদ্র ইংরেজি শেখাননি,আমাকে মধ্যবিত্তের ভাষা শিখিয়েছেন।এই সর্বনাশের জন্য আপনিই দায়ী।
মিসেস হিগিন্স : কিন্তু, প্রিয় মিস্টার ডুলিটল, আপনি যদি সত্যিই এত বিরক্ত হন, তাহলে তো এই সম্পত্তি গ্রহণ না করলেই পারেন।কেউ আপনাকে জোর করে উইল নিতে বাধ্য করতে পারে না।আপনি এটা প্রত্যাখ্যানও করতে পারেন।তাই না, কর্নেল পিকারিং?
পিকারিং : আমারও তাই মনে হয়।
ডুলিটল [মহিলার প্রতি সম্মান দেখিয়ে একটু নরম স্বরে] : এই তো আসল ট্র্যাজেডি, ম্যাডাম।
“সব ছেড়ে দাও”—এ কথা বলা সহজ।কিন্তু তা করার সাহস ক’জনের আছে?আমরা সবাই ভীত।হ্যাঁ, ম্যাডাম—ভীত।আমি যদি এই টাকা ফিরিয়ে দিই, তাহলে বৃদ্ধ বয়সে আমার জন্য কী অপেক্ষা করছে?
ওয়ার্কহাউস!ময়লাওয়ালার কাজটা ধরে রাখতেই এখন আমাকে চুলে রং করতে হচ্ছে।আমি যদি “প্রকৃত গরিব” হতাম, তাহলে হয়তো সামান্য সঞ্চয় নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারতাম।কিন্তু তখনই তো সমস্যা, প্রকৃত গরিবেরা সুখ কাকে বলে জানেই না।তারা সারাজীবন কষ্ট করে, নিয়ম মেনে চলে, অথচ আনন্দ বলতে কিছুই বোঝে না।
আর আমি?
আমি তো ছিলাম এক “অযোগ্য গরিব”—যে অন্তত হাসতে জানত, আনন্দ করতে জানত।কিন্তু এখন এই অভিশপ্ত বছরে তিন হাজার পাউন্ড আমাকে জোর করে মধ্যবিত্তের খাঁচায় ঢুকিয়ে দিয়েছে।
[একটু থেমে, ক্ষমা চেয়ে]
এই কথাটা বলার জন্য মাফ করবেন, ম্যাডাম।কিন্তু আমার জায়গায় আপনি থাকলেও এমন ভাষাই ব্যবহার করতেন।এখন আমি যেদিকেই যাই, ফাঁদ পাতা।একদিকে ওয়ার্কহাউসের পশুর মতো জীবন,অন্যদিকে মধ্যবিত্তের ভণ্ডামিতে মোড়া “ভদ্র” জীবন।
আর সত্যি বলতে কী—ওয়ার্কহাউসে যাওয়ার মতো সাহস আমার নেই।
আমি ভীত।
আমি নিঃস্ব।
আমি বিক্রি হয়ে গেছি।
এখন আমার চেয়েও সুখী লোকেরা আমার চারপাশে ঘুরবে, আমাকে তোষামোদ করবে, বকশিশ চাইবে—
আর আমি অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে তাদের ঈর্ষা করব।
আর এই অবস্থায় আমায় এনে দাঁড় করিয়েছে আপনারই ছেলে।
[তিনি আবেগে থেমে যান।]
মিসেস হিগিন্স : যাই হোক, আমি খুশি যে আপনি কোনো বোকামি করতে যাচ্ছেন না, মিস্টার ডুলিটল।কারণ এতে অন্তত লিজার ভবিষ্যতের একটা সমাধান হলো।এখন আপনি নিশ্চয়ই তার ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে পারবেন।
ডুলিটল [হতাশ, ক্লান্ত আত্মসমর্পণের সুরে] : হ্যাঁ, ম্যাডাম…
মনে হয় এখন সেটাই আমার নিয়তি।ডুলিটল : বছরে তিন হাজার পাউন্ড হাতে এলেই বুঝি মানুষ আর নিজের থাকে না।এখন সবাইকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বটাই আমার ঘাড়ে এসে পড়েছে।
হিগিন্স [হঠাৎ লাফিয়ে উঠে] : বাজে কথা!সে লিজার ভরণপোষণ করবে না—করতে পারে না!
মেয়েটা তার নয়।আমি ওকে পাঁচ পাউন্ড দিয়েছিলাম, এই মেয়েটার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই।
ডুলিটল : তাহলে হয় তুমি সৎ মানুষ, নয়তো একেবারে ঠগ।
ডুলিটল [ধৈর্যভরে, যেন জীবনকে খুব ভালো করেই চেনে] : আরে হেনরি, আমরা সবাই একটু একটু করে দুটোই।
তুমিও, আমিও—সবাই।
হিগিন্স : যাই হোক, তুমি ওই টাকা নিয়েছ।
তাই এখন লিজাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কোনো অধিকার তোমার নেই।
মিসেস হিগিন্স : হেনরি, বাজে কথা বোলো না।
তুমি যদি সত্যিই জানতে চাও লিজা কোথায়, তাহলে বলি—
সে ওপরতলায় আছে।
হিগিন্স [বিস্ময়ে প্রায় চিৎকার করে] : ওপরতলায়!
তাহলে আমি এখনই ওকে নিচে নিয়ে আসছি।
[সে তড়িঘড়ি দরজার দিকে এগোয়।]
মিসেস হিগিন্স [উঠে তার পথ আটকে] : শান্ত হও, হেনরি।
বসো।
হিগিন্স : কিন্তু—
মিসেস হিগিন্স : বসো, সোনা।
আর আমার কথা শোনো।
হিগিন্স : ওহ্, আচ্ছা, আচ্ছা!
[সে বিরক্ত ভঙ্গিতে গিয়ে জানালার দিকে মুখ করে অটোম্যানের ওপর ধপাস করে বসে পড়ে।]
কিন্তুআমার মনে হয়, এই খবরটা অন্তত আধ ঘণ্টা আগেই আমাকে জানানো উচিত ছিল।
মিসেস হিগিন্স : লিজা আজ সকালে আমার কাছে এসেছে।
রাতটা সে কাটিয়েছে—
কিছুটা রাগে অস্থির হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়ে,কিছুটা নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার কথা ভেবে ভয় পেয়ে,আর কিছুটা কার্লটন হোটেলে আশ্রয় নিয়ে।সে আমাকে বলেছে তোমরা দু’জনে তার সঙ্গে কত নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছ।
হিগিন্স [আবার লাফিয়ে উঠে] : কী!
পিকারিং [তিনিও উঠে দাঁড়ান] : প্রিয় মিসেস হিগিন্স, সে নিশ্চয়ই সব বাড়িয়ে বলেছে।আমরা তার সঙ্গে মোটেও নিষ্ঠুর ব্যবহার করিনি।বরং আমরা খুব ভদ্রভাবেই বিদায় নিয়েছিলাম।
[হিগিন্সের দিকে ফিরে]
হিগিন্স, আমি ঘুমোতে যাওয়ার পরে তুমি কি ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিলে?
হিগিন্স : উল্টোটা হয়েছে!সে আমার মুখের দিকে চপ্পল ছুঁড়ে মেরেছে।একেবারে ভয়ানক ব্যবহার করেছে।আমি ওকে সামান্যও উস্কানি দিইনি।
ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই,আমি একটা কথাও বলার আগেই—চপ্পল দুটো সোজা আমার মুখের দিকে উড়ে এল।
আর কী ভাষা!ভয়ানক, জঘন্য ভাষা ব্যবহার করছিল!
পিকারিং [স্তম্ভিত হয়ে] : কিন্তু কেন?আমরা ওর সঙ্গে এমন কী করেছিলাম?
মিসেস হিগিন্স : আমার মনে হয়, আমি খুব ভালো করেই জানি তোমরা কী করেছিলে।আমার ধারণা, মেয়েটা স্বভাবতই খুব স্নেহপ্রবণ।তাই না, মিস্টার ডুলিটল?
ডুলিটল : একেবারে কোমল হৃদয়ের, ম্যাডাম।আমার মতোই হয়েছে।
মিসেস হিগিন্স : ঠিক তাই।
সে তোমাদের দু’জনের প্রতিই গভীরভাবে অনুরক্ত হয়ে পড়েছিল।আর তোমার জন্য সে কী পরিমাণ পরিশ্রম করেছে, হেনরি—তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।আমার মনে হয় না তুমি বোঝো, ওরকম একটা মেয়ের কাছে “বুদ্ধির কাজ” বা “যোগ্যতা প্রমাণ” কত বড় ব্যাপার।যাই হোক, যখন সেই বড় পরীক্ষার দিনটা এলো—আর সে নিখুঁতভাবে সব সামলে তোমাদের মুখ উজ্জ্বল করল। তখন তোমরা দু’জনে সেখানে বসে কী করলে?তাকে একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত দিলে না।বরং নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগলে যে,
“উফ্, অবশেষে সব শেষ হয়েছে!”
আর “পুরো ব্যাপারটা কত বিরক্তিকর ছিল!”তারপর অবাক হয়ে ভাবছো, কেন সে তোমার দিকে চপ্পল ছুঁড়ে মেরেছিল!
আমি হলে শুধু চপ্পল নয়; আগুনে গরম ইস্ত্রিই ছুঁড়ে মারতাম।
হিগিন্স : আরে, আমরা তো শুধু বলেছিলাম যে আমরা ক্লান্ত, আর ঘুমোতে যেতে চাই।
তাই না, পিক?
পিকারিং [কাঁধ ঝাঁকিয়ে] : হ্যাঁ, এটুকুই।
মিসেস হিগিন্স [তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গভরে] : সত্যিই?
শুধু এটুকুই?
পিকারিং : সত্যিই।
আমরা ওকেই বলছিলাম।
মিসেস হিগিন্স : কিন্তু তোমরা কি একবারও তাকে ধন্যবাদ দিয়েছিলে?বা তার প্রশংসা করেছিলে?বা বলেছিলে সে কত অসাধারণ ছিল?
হিগিন্স [অধৈর্য হয়ে] : কিন্তু সে তো জানতই!আমরা কি আর আলাদা করে বক্তৃতা দেব নাকি?
যদি আপনি সেটাই বোঝাতে চান—
পিকারিং [হঠাৎ একটু অপরাধবোধে] : হয়তো…হয়তো আমরা একটু অবিবেচক ছিলাম।
সে কি খুব রেগে আছে?
মিসেস হিগিন্স [আবার নিজের লেখার টেবিলে ফিরে গিয়ে] : আসলে আমার মনে হয় না সে আর উইম্পল স্ট্রিটে ফিরে যেতে চায়।বিশেষ করে এখন, যখন মিস্টার ডুলিটল আপনারা ওর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া “সম্মানীয়” অবস্থানটা ধরে রাখতে বাধ্য হয়েছেন।
তবে লিজা বলেছে, সে তোমাদের সঙ্গে ভদ্রভাবে দেখা করতে রাজি।সে অতীতের সব ঝামেলা ভুলে যেতে চায়।
হিগিন্স [রাগে ফেটে পড়ে] : তাই নাকি!
ওহ্, খুব ভালো!
মিসেস হিগিন্স : হেনরি, তুমি যদি ভদ্রভাবে আচরণ করার প্রতিশ্রুতি দাও, তাহলে আমি ওকে নিচে আসতে বলব।না হলে তুমি এখনই বাড়ি ফিরে যাও।কারণ আজ তুমি আমার যথেষ্ট সময় নষ্ট করেছ।
হিগিন্স : ওহ্, আচ্ছা!
বেশ!
পিক, তাহলে তুমি ভদ্রলোকের মতো আচরণ করো।চলো, কাদামাটি থেকে তুলে আনা এই প্রাণীটার সামনে আমরা রবিবারের সেরা ভদ্রতা প্রদর্শন করি।
[সে গোমড়ামুখে গিয়ে এলিজাবেথীয় চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ে।]
ডুলিটল [ক্ষুব্ধ প্রতিবাদে] : আরে আরে, হেনরি হিগিন্স!
ডুলিটল : এখন আমি যেহেতু একজন মধ্যবিত্ত মানুষ, তাই আমার অনুভূতির প্রতিও একটু সহানুভূতি দেখান।
মিসেস হিগিন্স : তোমার প্রতিশ্রুতিটা মনে রেখো, হেনরি।
[তিনি লেখার টেবিলের ওপর রাখা ঘণ্টার বোতাম টিপলেন।]
মিস্টার ডুলিটল, আপনি কি একটু বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াবেন?
আমি চাই না এলিজা হঠাৎ আপনার এই নতুন অবস্থার কথা শুনে ধাক্কা খাক, অন্তত ওর সঙ্গে এই দুই ভদ্রলোকের বোঝাপড়া না হওয়া পর্যন্ত।আপনার কিছু মনে হবে না তো?
ডুলিটল : আপনার যা ইচ্ছে, ম্যাডাম।হেনরিকে সাহায্য করার জন্য আমি সবই করতে রাজি—বিশেষ করে যদি তাতে এলিজা আমার নাগালের বাইরে থাকে।
[সে জানালার দিক দিয়ে বারান্দায় চলে যায়।]
ঠিক তখনই ঘণ্টার শব্দে বৈঠকখানার পরিচারিকা দরজা খুলে ভেতরে আসে।পিকারিং উঠে ডুলিটলের ফাঁকা জায়গাটায় বসে পড়ে।
মিসেস হিগিন্স : অনুগ্রহ করে মিস ডুলিটলকে নিচে আসতে বলুন।
পরিচারিকা : জি, ম্যাডাম।
[সে বেরিয়ে যায়।]
মিসেস হিগিন্স : শোনো, হেনরি—ভদ্রভাবে আচরণ করবে।
হিগিন্স : আমি তো একেবারে নিখুঁত ভদ্র আচরণই করছি।
পিকারিং : ও সত্যিই চেষ্টা করছে, মিসেস হিগিন্স।
একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে আসে।
হিগিন্স মাথা পেছনে হেলিয়ে, পা ছড়িয়ে দিয়ে বিরক্ত ভঙ্গিতে শিস দিতে শুরু করে।
মিসেস হিগিন্স : হেনরি, সোনা, এই ভঙ্গিতে তোমাকে একদম ভালো দেখাচ্ছে না।
হিগিন্স [নিজেকে একটু সামলে নিয়ে] : আমি তো সুন্দর দেখানোর চেষ্টা করছিলাম না, মা।
মিসেস হিগিন্স : তাতে কিছু যায় আসে না।আমি শুধু চাইছিলাম তুমি যেন কথা বলো।
হিগিন্স : কেন?
মিসেস হিগিন্স : কারণ তুমি একই সঙ্গে কথা বলতে আর শিস দিতে পারো না।
হিগিন্স বিরক্তিতে গোঙায়।আবারও ঘরে নেমে আসে সেই অস্বস্তিকর, ভারী নীরবতা।
হিগিন্স [হঠাৎ অধৈর্য হয়ে লাফিয়ে উঠে] : ওই মেয়েটা কোথায় গেল?আমাদের কি সারাদিন এখানেই বসে থাকতে হবে?
ঠিক তখনই লিজা প্রবেশ করে।
কিন্তু সে আর আগের সেই অস্থির, আবেগপ্রবণ ফুলবিক্রেতা মেয়ে নয়।আজ সে শান্ত, আত্মবিশ্বাসী, আশ্চর্য রকম সংযত।তার সহজ ভদ্র আচরণ এতটাই স্বাভাবিক ও বিশ্বাসযোগ্য যে মুহূর্তের জন্য সবাই যেন হতবাক হয়ে যায়।
তার হাতে একটি ছোট কাজের ঝুড়ি।মুখে হালকা হাসি।চোখে আত্মমর্যাদার স্থির দীপ্তি।পিকারিং এতটাই বিস্মিত হয়ে পড়ে যে উঠে দাঁড়াতেও ভুলে যায়।
লিজা : কেমন আছেন, প্রফেসর হিগিন্স?আশা করি আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন?
লাইজা : কারণ, দেখুন কর্নেল পিকারিং, একজন ফুলবিক্রেতা মেয়ে আর একজন ভদ্রমহিলার মধ্যে প্রকৃত পার্থক্যটা তার আচরণে নয়, বরং মানুষ তার সঙ্গে কেমন আচরণ করে তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।আমি প্রফেসর হিগিন্সের কাছে সবসময়ই ফুলওয়ালি এলিজাই ছিলাম—
আর থাকবও।কারণ উনি সবসময় আমাকে ফুলওয়ালি হিসেবেই ব্যবহার করেছেন, ব্যবহার করবেনও।কিন্তু আপনার কাছে আমি সবসময় একজন ভদ্রমহিলা ছিলাম।আমি জানি, একজন ভদ্রমহিলার সামনে দাঁড়াতে হয়, তার জন্য দরজা খুলে ধরতে হয়, তাকে চেয়ার এগিয়ে দিতে হয়—এসব ছোটখাটো ব্যাপারগুলো থেকেই আমি প্রথম বুঝেছিলাম যে আমিও হয়তো একজন ভদ্রমহিলা হতে পারি।আপনি সবসময় উঠে দাঁড়াতেন যখন আমি ঘরে ঢুকতাম।আপনি কখনো আমার সামনে অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার করেননি।আমাকে সবসময় সম্মান আর সৌজন্যের সঙ্গে ব্যবহার করেছেন।এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই আমার কাছে অনেক বড় ছিল।কারণ, যতদিন মানুষ আপনাকে ময়লার মতো ব্যবহার করবে, ততদিন আপনি নিজেকেও ময়লা বলেই ভাববেন।কিন্তু যখন কেউ আপনাকে সম্মান দেয়, তখন ধীরে ধীরে আপনি নিজেকেও সম্মান করতে শেখেন।
পিকারিং [গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে] : মিস ডুলিটল—
লিজা : আমি জানি, আমি হয়তো খুব একটা শিক্ষিতা নই।আমি এখনও ভুল করি।কিন্তু অন্তত এটুকু আমি বুঝেছি যেএকজন মানুষকে মানুষ বলে মনে করানোই সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
হিগিন্স [অধৈর্য হয়ে] : আহ্, এইসব আবেগী বাজে কথা!আমি যদি তোমার সঙ্গে এত ভাবগম্ভীর ব্যবহার করতাম, তাহলে তুমি কখনোই কিছু শিখতে না।আমি তোমাকে মানুষ করেছি।
লিজা [শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে] : না, প্রফেসর হিগিন্স।আপনি আমাকে কথা বলতে শিখিয়েছেন।কিন্তু মানুষ হিসেবে নিজের মর্যাদা অনুভব করতে শিখিয়েছেন কর্নেল পিকারিং।
[ঘরের মধ্যে এক মুহূর্তের নীরবতা নেমে আসে।
হিগিন্স বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেন।
পিকারিং গভীর সংকোচে চুপ করে বসে থাকেন।
আর মিসেস হিগিন্সের মুখে ফুটে ওঠে মৃদু, তৃপ্ত এক হাসি।]
লিজা। না। এটা আপনার ভালো কাজ, কর্নেল পিকারিং। আপনি যদি আমাকে সবসময় সম্মান না দিতেন, তাহলে হয়তো আমি কখনোই নিজেকে বদলাতে পারতাম না।
হিগিন্স [অস্থিরভাবে উঠে দাঁড়িয়ে] : আহ্, এসব আবেগপূর্ণ কথাবার্তা আমার সহ্য হয় না। তোমরা দু’জনে মিলে যেন কোনো সস্তা উপন্যাসের দৃশ্য তৈরি করছো।
মিসেস হিগিন্স [শান্ত গলায়] : কিন্তু, হেনরি, মেয়েটা ঠিক কথাই বলছে।
হিগিন্স। আমি ওর সঙ্গে কখনো ভণ্ডামি করিনি। আমি ওর সঙ্গে যেমন ব্যবহার করেছি, পিকারিংয়ের সঙ্গেও তেমনই করি।
লিজা। ঠিক তাই। এটাই তো সমস্যা।আপনি কর্নেল পিকারিংয়ের সঙ্গেও এমনভাবে কথা বলেন, যেন উনি আপনার পরীক্ষাগারের কোনো যন্ত্র।
পিকারিং [হেসে] : ওহ্, আমি এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
লিজা। আমিও হয়তো অভ্যস্ত হয়ে যেতাম, যদি আমি আগের সেই ফুলওয়ালি লিজাই থাকতাম।
কিন্তু আপনি আমাকে বদলে দিয়েছেন।আমাকে নতুনভাবে বাঁচতে শিখিয়েছেন।তারপর যখন আমি সত্যিই বদলে গেলাম, তখনই বুঝলাম—আমার নিজের বলে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
হিগিন্স [একটু থেমে] : এসব আবার কী?
লিজা। আগে আমি জানতাম আমি কে।আমি ছিলাম এক গরিব ফুলবিক্রেতা মেয়ে।কিন্তু এখন আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?উচ্চবিত্ত সমাজ আমাকে নিজের বলে মানবে না; আর আগের জায়গায়ও আমি আর ফিরতে পারব না।
মিসেস হিগিন্স [ধীরে] : এটাই সেই সমস্যার কথা আমি তোমাদের বলছিলাম, হেনরি।
পিকারিং [গম্ভীরভাবে] : সত্যিই, আমরা ব্যাপারটা এভাবে ভাবিনি।
হিগিন্স [জেদি ভঙ্গিতে] : বাজে কথা। মানুষ নিজের পথ নিজেই খুঁজে নেয়।
লিজা। হয়তো নেয়।কিন্তু একজন মানুষকে মাঝপথে দাঁড় করিয়ে রেখে বলা যায় না—
“এই নাও, তোমাকে বদলে দিলাম; এবার নিজের ব্যবস্থা নিজেই করো।”
[নীরবতা।
হিগিন্স বিরক্তভাবে পায়চারি করতে থাকে।পিকারিং চিন্তিত মুখে বসে থাকেন।মিসেস হিগিন্স গভীর দৃষ্টিতে এলিজার দিকে তাকিয়ে থাকেন—যেন প্রথমবার সত্যিকারের একজন স্বাধীন নারীর জন্ম দেখছেন।]
লিজা [স্তম্ভিত, অপমানিত বিস্ময়ে] : টাকার মালিক!তুমি!
ডুলিটল [দীর্ঘশ্বাস ফেলে] : হ্যাঁ, মেয়ে। ভাগ্য মানুষকে যেভাবে নিয়ে খেলে, আমাকেও সেভাবেই খেলেছে। এখন আমি আর স্বাধীন গরিব নই—আমি সম্মানীয় মধ্যবিত্ত।
হিগিন্স [হাসতে হাসতে] : আর এটাই ওর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
ডুলিটল। তুমি হাসছো, হেনরি হিগিন্স; কিন্তু আমি বলছি, এটা মানুষের স্বাধীনতার শেষ। এখন আমাকে নিয়মিত জামাকাপড় পরতে হয়, ভদ্র ভাষায় কথা বলতে হয়, আত্মীয়স্বজনদের ভরণপোষণ করতে হয়, আর বছরে ছয়বার নীতিবাক্য আওড়াতে হয়।
লিজা [বাবার দিকে তাকিয়ে] : তাহলে তুমিও বদলে গেছো।
ডুলিটল। বদলাতে বাধ্য হয়েছি। টাকাই মানুষকে বদলে দেয়। আগে আমি স্বাধীন ছিলাম; এখন আমি “সম্মানীয়”।
মিসেস হিগিন্স [হালকা ব্যঙ্গের সুরে] : সমাজ সাধারণত এটাই করে, মিস্টার ডুলিটল।
পিকারিং। কিন্তু অন্তত এখন লিজার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই।
ডুলিটল [তাড়াতাড়ি] : ওহ্ না, গভর্নর। এখন আমার দায়িত্ব বেড়েছে। এখন সবাই আমার ঘাড়ে চেপে বসবে। লিজাও তার মধ্যে একজন।
লিজা [ধীরে, আত্মমর্যাদার সাথে] : আমি কারও ঘাড়ে বোঝা হয়ে থাকতে চাই না।
হিগিন্স [উপহাস করে] : আরে ধুর! তুমি তো নিজের নাটক নিজেই লিখছো। যেন তোমাকে কেউ রাস্তায় ফেলে দিচ্ছে।
লিজা। আমি শুধু চাই, আমাকে মানুষ হিসেবে দেখা হোক।না তোমার পরীক্ষার বস্তু হিসেবে,
না কারও দয়ার পাত্র হিসেবে।
হিগিন্স [অধৈর্যভাবে] : তুমি ভীষণ বিরক্তিকর হয়ে উঠছো, লিজা। আগে তুমি অনেক বেশি মজার ছিলে।
লিজা [শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণভাবে] : আগে আমি কিছুই বুঝতাম না। এখন বুঝি। এটাই তোমার সমস্যা।
[হিগিন্স বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
পিকারিং গভীর অস্বস্তিতে চুপ করে থাকে।ডলিটল নিজের নতুন সামাজিক অবস্থানের ভারে ক্লান্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।আর মিসেস হিগিন্স নীরবে লিজার দিকে তাকিয়ে থাকেন—যেন তিনি বুঝতে পারছেন, এই মেয়েটি আর আগের সেই ফুলওয়ালি নয়।]
ডুলিটল [গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে] : আহ্, কর্নেল, বিয়ে জিনিসটা একজন মানুষের স্বাধীনতার কফিনে শেষ পেরেক।
হিগিন্স [হাসতে হাসতে] : আর তুমি তো এখন নৈতিকতার জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ হতে চলেছো।
ডুলিটল। হ্যাঁ, হেনরি হিগিন্স। আগে আমি ছিলাম সুখী গরিব; এখন আমি হব সম্মানীয় স্বামী।আগে মানুষ আমাকে এড়িয়ে চলত; এখন তারা আমাকে নিমন্ত্রণ করবে।আগে আমি যখন খুশি যেতাম-আসতাম; এখন আমাকে জিজ্ঞেস করা হবে কোথায় যাচ্ছি।
এই হলো সভ্যতা!
মিসেস হিগিন্স [মৃদু হাসি নিয়ে] : তবু আপনি বেশ গর্বিতই মনে হচ্ছেন, মিস্টার ডুলিটল।
ডুলিটল [টুপি ঠিক করতে করতে] : মানুষ নিজের দুর্ভাগ্যকেও একটু গর্বের সঙ্গে বয়ে বেড়াতে শেখে, ম্যাডাম।
পিকারিং। আপনি খুব ভালোভাবেই সামলে নেবেন।
ডুলিটল। সামলাতেই হবে, গভর্নর।
কারণ এখন আমার আর পালাবার পথ নেই।
মধ্যবিত্ত সমাজ একবার কাউকে ধরে ফেললে আর ছাড়ে না।
হিগিন্স [ব্যঙ্গভরে] : আর তুমি ছিলে “অযোগ্য গরিবদের” শেষ বীরপুরুষ।
ডুলিটল। ঠিক তাই।
আমি ছিলাম স্বাধীন।
আজ আমি শিকল পরতে যাচ্ছি—
একটা সাদা টাই আর ফ্রক-কোটের শিকল।
[সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
ডুলিটল নিজের নতুন চকচকে জুতোর দিকে তাকায়, যেন সেগুলোই তার বন্দিত্বের প্রতীক।
পিকারিং সহানুভূতির হাসি হাসেন।
মিসেস হিগিন্সের চোখে মৃদু রসিকতা।
আর হিগিন্স বিরক্ত হলেও ভিতরে ভিতরে এই নাটকীয় দৃশ্যটা বেশ উপভোগ করে।]
লিজা [ধীরে, কিন্তু গভীর অভিমানে] : না, তুমি কখনোই তা বলো না।
তুমি কখনো কাউকে সত্যি সত্যি চাওও না।
তুমি শুধু অভ্যস্ত হয়ে পড়ো।
হিগিন্স [চট করে] : আরে ধুর! মানুষজন সবসময় এসব আবেগ নিয়ে এত মাথা ঘামায় কেন?
লিজা। কারণ মানুষের হৃদয় আছে।
হিগিন্স। আমারও আছে, আশা করি। কিন্তু আমি ওসব নাটুকেপনা পছন্দ করি না।
লিজা। না।তুমি শুধু নিজের সুবিধাটাই বোঝো।আমি চলে যাওয়ার পর থেকেই তুমি বিরক্ত হয়ে উঠেছো।কারণ তোমার জিনিসপত্র কেউ খুঁজে দেয় না,তোমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট মনে করিয়ে দেয় না,তোমার চপ্পল এনে দেয় না।
হিগিন্স [একটু থেমে] : ধরো তাই। তাতে কী?
লিজা। তাতেই সব।আমি তোমার কাছে মানুষ নই—
আমি একটা অভ্যাস।
[হিগিন্স বিরক্ত হয়ে হাঁটতে শুরু করে।
লিজা শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু তার চোখে এখন আর আগের অসহায়তা নেই।]
হিগিন্স। তুমি খুব বাড়াবাড়ি করছো।আমি তোমাকে সবসময় নিজের সমান বলেই ভেবেছি।
লিজা [তীক্ষ্ণ হাসি হেসে] : নিজের সমান!তুমি কি কখনো কর্নেল পিকারিংয়ের দিকে চপ্পল ছুঁড়ে মারো?নাকি ওনাকে “জঘন্য প্রাণী” বলো?
হিগিন্স [অপ্রস্তুত হয়ে] : ওটা আলাদা ব্যাপার।
লিজা। না।সেখানেই পার্থক্য।তুমি যাদের সম্মান করো, তাদের সাথে তুমি অন্যরকম ব্যবহার করো।
[নীরবতা।]
হিগিন্স [কিছুটা নরম হয়ে] : তাহলে তুমি কী চাও, লিজা?
লিজা। আমি চাই তুমি বুঝতে শেখো।মানুষকে শুধু শেখানো যায় না—তাকে মর্যাদাও দিতে হয়।
হিগিন্স [হাসতে চেষ্টা করে] : তুমি তো এখন একেবারে দার্শনিক হয়ে উঠেছো।
লিজা। হয়তো।কারণ তুমি আমাকে ভাবতে শিখিয়েছো।এটাই তোমার বিপদ।
[হিগিন্স তার দিকে তাকিয়ে থাকে—
প্রথমবার যেন সত্যিই নতুন এলিজাকে দেখছে।আর লিজা শান্ত, দৃঢ় চোখে তার দৃষ্টি ফিরিয়ে দেয়।]
লিজা [হালকা তিক্ত হাসি নিয়ে] : তাই তো।তুমি সবসময় এগিয়ে চলতে চাও—আর অন্যরা তোমার ধাক্কা সামলাবে, এটাই যেন স্বাভাবিক।
হিগিন্স। জীবন তো এমনই। যে শক্তিশালী, সে এগিয়ে যায়।
লিজা। আর যে দুর্বল?
হিগিন্স। সে শিখে নেয়। অথবা সরে দাঁড়ায়।
লিজা [ধীরে মাথা নেড়ে] : আগে আমি সরে দাঁড়াতাম।এখন আর দাঁড়াব না।
[হিগিন্স তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
মেয়েটির মধ্যে নতুন এক দৃঢ়তা সে অনুভব করে।]
হিগিন্স। তুমি ভীষণ জেদি হয়ে উঠেছো।
লিজা। তোমার কাছ থেকেই শিখেছি।
হিগিন্স [হেসে] : আহা! এবার কিন্তু তোমাকে আমারই সৃষ্টি মনে হচ্ছে।
লিজা। না।
আমি এখন নিজের সৃষ্টি।
[এক মুহূর্ত নীরবতা।]
হিগিন্স [কিছুটা নরম গলায়] : তাহলে এখন কী করবে তুমি?
লিজা। আমি কাজ করব।নিজের মতো করে বাঁচব।
হয়তো ভাষা শেখাব। হয়তো ফুলের দোকান খুলব।কিন্তু এবার আমি নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেব।
হিগিন্স। আর আমাকে ছাড়া পারবে?
লিজা [শান্ত আত্মবিশ্বাসে] : পারতেই হবে।কারণ তুমি আমাকে এমন জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছো, যেখান থেকে আর পেছনে ফেরা যায় না।
হিগিন্স [অদ্ভুত এক গর্ব লুকিয়ে] : তুমি জানো, এলিজা, তুমি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছো।আগে তুমি শুধু নকল করতে।এখন তুমি তর্ক করো।
লিজা। কারণ এখন আমি ভয় পাই না।
হিগিন্স [হাসে] : শয়তান মেয়ে!
লিজা [মৃদু হাসি নিয়ে] : হ্যাঁ, প্রফেসর হিগিন্স।
তোমারই তৈরি শয়তান।
[দুজনের চোখাচোখি হয়।
তাদের মধ্যে এখনও দ্বন্দ্ব আছে, বিরক্তি আছে, অভিমানও আছে—কিন্তু তার ভেতরে জন্ম নিয়েছে এক নতুন সমতা।এখন লিজা আর কেবল হিগিন্সের “পরীক্ষা” নয়;সে নিজের স্বাধীন সত্তা নিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।]
হিগিন্স [চট করে] : আহ্, “ভালোবাসা”! আবার সেই পুরোনো শব্দ!সবাই যেন সারাক্ষণ এই নিয়েই মাথা ঘামায়।
লিজা। কারণ মানুষের হৃদয় আছে।
হিগিন্স। আমারও আছে, আশা করি; কিন্তু আমি ওটাকে নিয়ে বাজারে হাঁকডাক করি না।
লিজা। না।তুমি শুধু মানুষকে ব্যবহার করো—
তারপর বলো, “এটা তো স্বাভাবিক।”
হিগিন্স [তীক্ষ্ণভাবে] : ব্যবহার!
তুমি কি ভাবো আমি তোমাকে ব্যবহার করেছি?
লিজা। তুমি আমাকে বদলে দিয়েছো।তারপর আশা করেছো আমি যেন কৃতজ্ঞ কুকুরের মতো তোমার পায়ের কাছে বসে থাকি।
হিগিন্স [অসন্তুষ্ট কিন্তু সৎ ভঙ্গিতে] : আমি কখনো কাউকে আমার পায়ের কাছে বসতে বলিনি।আমি সমান মানুষ পছন্দ করি।
লিজা। না।তুমি এমন মানুষ পছন্দ করো যারা তোমার শক্তি সহ্য করতে পারে।
[নীরবতা।
হিগিন্স ধীরে ধীরে তার দিকে তাকায়।]
হিগিন্স। আর তুমি পারো।এই কারণেই তুমি অন্য সবার চেয়ে আলাদা।
লিজা [চোখ নামিয়ে] : আগে পারতাম না।আগে আমি তোমাকে ভয় পেতাম।
হিগিন্স। আর এখন?
লিজা [ধীরে তার দিকে তাকিয়ে] : এখন আমি নিজেকে হারানোর চেয়ে বেশি কিছু ভয় পাই না।
হিগিন্স [গভীর মনোযোগে] : তুমি জানো, লিজা, তুমি এখন সত্যিই স্বাধীন হয়ে উঠেছো।
লিজা। হ্যাঁ।আর স্বাধীন মানুষ কাউকে ভিক্ষা করে ভালোবাসতে বলে না।
হিগিন্স [হালকা হাসি নিয়ে] : তুমি ভীষণ শক্ত মেয়ে।
লিজা। কারণ তুমি আমাকে শক্ত হতে বাধ্য করেছো।
হিগিন্স। আর তবুও তুমি ভাবো আমি তোমার জন্য পরোয়া করি না।
লিজা। তুমি হয়তো করো—তোমার নিজের অদ্ভুত উপায়ে।
কিন্তু তুমি কখনো সেটা বলতে শিখোনি।
হিগিন্স [অর্ধেক বিরক্ত, অর্ধেক অসহায় ভঙ্গিতে] : এসব কথা বলা আমার স্বভাবে নেই।
লিজা। আমি জানি।
এই কারণেই আমি এখন চলে যেতে পারি—
রাগ নিয়ে নয়,বরং সব বুঝে।
[ঘরের মধ্যে গভীর নীরবতা নেমে আসে।
হিগিন্স প্রথমবার অনুভব করে—লিজা আর তার তৈরি কোনো “ডাচেস” নয়।
সে এখন নিজের ইচ্ছা, মর্যাদা আর স্বাধীনতা নিয়ে সম্পূর্ণ একজন মানুষ।]
লিজা [গভীর আহত গলায়] : হয়তো তাই।হয়তো আমি অনেক কিছু পেয়েছি।কথা বলতে শিখেছি, পোশাক পরতে শিখেছি, ভদ্র সমাজে চলতে শিখেছি।কিন্তু তার বিনিময়ে আমি কী হারিয়েছি, সেটা কি তুমি জানো?
হিগিন্স। কী হারিয়েছো?
লিজা। আমার পুরোনো জীবন।আমার নিজের জায়গা।আমার সেই সহজ সরল নিশ্চিন্ত ভাব, যেখানে আমি জানতাম আমি কে।
[হিগিন্স একটু চুপ করে থাকে।]
লিজা। আগে আমি ছিলাম গরিব; কিন্তু অন্তত নিজের ছিলাম।এখন আমি মাঝখানে ঝুলে আছিউচ্চবিত্তরা আমাকে পুরোপুরি নেবে না,আর গরিবদের মধ্যেও আমি আর আগের মতো ফিরতে পারি না।
হিগিন্স [দৃঢ়ভাবে] : এসবই তোমার কল্পনা।মানুষের মূল্য তার ভেতরে, বাইরের অবস্থানে নয়।
লিজা। কথাটা বলা সহজ।কারণ তুমি জন্ম থেকেই নিজের জায়গায় ছিলে।তোমাকে কখনো নিজের পরিচয় হারিয়ে নতুন করে গড়ে উঠতে হয়নি।
হিগিন্স [একটু নরম হয়ে] : তবুও আমি তোমাকে দুর্বল হতে শেখাইনি।
লিজা। না।
তুমি আমাকে শক্ত হতে শিখিয়েছো।এই কারণেই আমি আজ তোমার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারছি—আমি তোমার দাসী হয়ে ফিরব না।
হিগিন্স [হালকা হাসি নিয়ে] : ভালোই।আমি কখনো দাসী চাইওনি।
লিজা। কিন্তু তুমি কখনো বুঝতেই চাওনি যে একজন নারী শুধু “সহযোগী” বা “পরীক্ষার বিষয়” নয়।সে ভালোবাসা চায়।সম্মান চায়।নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি চায়।
হিগিন্স। আর আমি কি তোমাকে সম্মান করিনি?
লিজা। তুমি আমার মস্তিষ্ককে সম্মান করেছো।আমার প্রতিভাকে সম্মান করেছো।কিন্তু আমার হৃদয়কে নয়।
[দীর্ঘ নীরবতা।]
হিগিন্স [ধীরে] : হয়তো আমি হৃদয়ের ভাষা জানি না।
লিজা [শান্ত, ক্লান্ত হাসি নিয়ে] : আমি জানি।এই কারণেই আমি আর তোমার উপর রাগ করতে পারি না।
[দুজনেই চুপ করে থাকে।
তাদের মধ্যে দূরত্ব এখনও রয়ে গেছে—
কিন্তু সেই দূরত্বের ভেতরেই জন্ম নিয়েছে এক ধরনের গভীর বোঝাপড়া।]
হিগিন্স [জোরে হেসে ওঠে] : ধন্যবাদ!এটা তো বেশ ভালোই বললে।আমাকে বিয়ে! ভাবতেই হাসি পায়।
লিজা। আমারও তাই মনে হয়।তুমি বিয়ে করার মতো মানুষ নও।
হিগিন্স। অবশ্যই নই।আমি স্বাধীন থাকতে পছন্দ করি।
লিজা। আর অন্যদেরও তোমার মতো স্বাধীন ভাবতে ভালোবাসো—যতক্ষণ না তারা তোমার কাছ থেকে কিছু চায়।
হিগিন্স [তীক্ষ্ণভাবে] : তুমি আবার সেই পুরোনো কথায় ফিরে যাচ্ছ।আমি তো বলেছি, আমি স্নেহের ব্যবসা করি না।
লিজা। কিন্তু মানুষ তো ব্যবসার জিনিস নয়।
হিগিন্স। আমিও তো তাই বলছি!এই জন্যই আমি কাউকে নিজের সম্পত্তি বানাতে চাই না।
লিজা। অথচ তুমি বুঝতেই পারো না—কাউকে “নিজের” ভাবা আর কাউকে “মূল্য দেওয়া” এক জিনিস নয়।
[হিগিন্স কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।]
হিগিন্স। তুমি জানো, লিজা, তুমি এখন ভীষণ বিরক্তিকর হয়ে উঠেছো।আগে তুমি অনেক বেশি সরল ছিলে।
লিজা [মৃদু হাসি নিয়ে] : আগে আমি ভাবতাম তুমি যা বলো, সবই সত্যি।
হিগিন্স। আর এখন?
লিজা। এখন আমি নিজেও ভাবতে শিখেছি।
হিগিন্স [অদ্ভুত গর্ব নিয়ে] : আহ্, এটাই তো আমার আসল সাফল্য।
লিজা। হয়তো।কিন্তু এই সাফল্যের জন্য তোমাকেও মূল্য দিতে হবে।
হিগিন্স। কী মূল্য?
লিজা। তুমি আর কখনো আমাকে আগের সেই ফুলওয়ালি মেয়ে হিসেবে পাবে না।
হিগিন্স [আধা-হাসি, আধা-দীর্ঘশ্বাস ফেলে] : শয়তান মেয়ে!
তুমি এখন সত্যিই নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছো।
লিজা। হ্যাঁ।
আর সেই কারণেই আমি এখন তোমার সামনে সমান হয়ে দাঁড়াতে পারি।
[দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে।তাদের সম্পর্কের মধ্যে প্রেমের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে এক জটিল সম্মান—সংঘর্ষ, বোঝাপড়া এবং স্বাধীনতার এক অদ্ভুত সমীকরণ।]কেবল নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যও নয়। তুমি আমাকে মানুষ বলে মনে করেছিলে— অন্তত আমি তাই ভেবেছিলাম। আর সেই কারণেই আমি তোমার জন্য সব করতে রাজি হয়েছিলাম।
হিগিন্স [একটু নরম হয়ে] : আচ্ছা, লিজা, আমি তোমাকে মানুষ বলেই মনে করি।
লিজা। না। তুমি মানুষকে যন্ত্রের মতো দেখো।তুমি মানুষের কণ্ঠস্বর শোনো, কিন্তু হৃদয়ের কথা শোনো না।
হিগিন্স [আবার উত্তেজিত হয়ে] হৃদয়! হৃদয়!সবাই এই হৃদয় নিয়ে এত মাতামাতি করে কেন?
যদি দু’জন মানুষ সৎভাবে, স্বাধীনভাবে একে অপরের সঙ্গে থাকতে পারে, তাহলে ওইসব আবেগের বাড়াবাড়ির কী দরকার?
লিজা। কারণ মানুষ পাথর নয়।কারও কাছ থেকে একটু মমতা পাওয়ার ইচ্ছেটা অপরাধ নয়।
হিগিন্স। কিন্তু আমি তো তোমার সঙ্গে প্রতারণা করিনি।আমি কখনও বলিনি যে আমি প্রেমিক সাজার চেষ্টা করব।
লিজা। হ্যাঁ, তুমি প্রতারণা করোনি।তুমি তার থেকেও কঠিন কিছু করেছো।
তুমি আমাকে বদলে দিয়েছো—তারপর এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছো যেন এতে তোমার কোনো দায়িত্বই নেই।
[হিগিন্স চুপ করে যায়।]
লিজা [ধীরে, কিন্তু গভীর কষ্টে] : আগে আমি ছিলাম একটা গরিব ফুলওয়ালি মেয়ে।আমার নিজের জগৎ ছিল, নিজের মানুষ ছিল।এখন আমি সেখানে ফিরতে পারি না।আবার পুরোপুরি তোমাদের জগতেও ঢুকতে পারি না।আমি মাঝখানে ঝুলে আছি।
হিগিন্স [একটু থেমে] : তাহলে তুমি কী করতে চাও?
লিজা। নিজের মতো বাঁচতে চাই।নিজের সম্মান নিয়ে।কাউকে ভয় না পেয়ে।
হিগিন্স। আর ফ্রেডি?
লিজা [হালকা হাসি] : হয়তো ও আমাকে ভালোবাসে।হয়তো ওর সঙ্গে আমি দরিদ্র থাকব।কিন্তু অন্তত ও আমাকে “পরীক্ষা” বলে দেখবে না।
হিগিন্স [তিক্ত হাসি] : ও তোমাকে পূজা করবে, আর তুমি ওকে চালাবে।
লিজা। হয়তো।
কিন্তু সেটাও অন্তত মানুষের সম্পর্ক হবে—
প্রফেসর আর পরীক্ষাগারের নমুনার সম্পর্ক নয়।
[একটু নীরবতা।]
হিগিন্স [অদ্ভুত কোমলতায়] : তুমি জানো, লিজা, তোমার এই নতুন শক্তিটা আমার ভালো লাগছে।আগের সেই কান্নাকাটি করা মেয়েটাকে আমি কখনও সহ্য করতে পারতাম না।
লিজা। কারণ এখন আমি তোমার সামনে মাথা নত করছি না।
হিগিন্স। ঠিক তাই।
এখন তুমি আমার সঙ্গে সমানে লড়তে পারো।
লিজা। আর সেই কারণেই এবার আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে পারি।
[হিগিন্স তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার চোখে প্রথমবারের মতো স্পষ্ট হয়—
লিজা আর তার সৃষ্টি নয়,
সে এখন স্বাধীন একজন মানুষ।]
লিজা :
আমাদের দুজনের পার্থক্যগুলো ভুলে গিয়ে যদি একটু মানুষের মতো, বন্ধুত্বপূর্ণভাবে কথা বলতে পারতে!
হিগিন্স :
হ্যাঁ, অবশ্যই। অন্তত আমার তো তাই মনে হয়। আর পিকারিংও ঠিক সেটাই মনে করে।
লিজা :তুমি একটা নির্বোধ।
[সে কাঁদতে কাঁদতে লেখার টেবিলের পাশের চেয়ারে বসে পড়ে।]
হিগিন্স :
যতক্ষণ না তুমি নিজের বোকামি কাটিয়ে উঠছ, ততক্ষণ এই কথাটাই তোমার প্রাপ্য। যদি সত্যিই একজন ভদ্রমহিলা হতে চাও, তাহলে এই ধারণাটা আগে ত্যাগ করতে হবে যে কোনো পুরুষ তোমাকে অর্ধেক সময় আদর করবে আর বাকি অর্ধেক সময় অপমান করবে—তবেই নাকি সে তোমাকে গুরুত্ব দিচ্ছে।যদি আমার মতো করে জীবনের কঠোরতা আর তার চাপ সহ্য করতে না পারো, তাহলে বরং নর্দমায় ফিরে যাও। সেখানে গিয়ে মানুষ হওয়ার বদলে পশুর মতো খেটে মরো; তারপর ক্লান্ত হয়ে আদর করো, ঝগড়া করো, মদ খাও আর ঘুমিয়ে পড়ো।আহা, কী অপূর্ব সেই নর্দমার জীবন!ওটা বাস্তব, ওটা উষ্ণ, ওটা বুনো। সবচেয়ে মোটা চামড়ার মানুষও তার স্পর্শ অনুভব করতে পারে। কোনো শিক্ষা লাগে না, কোনো সাধনা লাগে না—সহজেই তার স্বাদ পাওয়া যায়।
বিজ্ঞান, সাহিত্য, ধ্রুপদী সঙ্গীত, দর্শন কিংবা শিল্পের মতো নয়।তোমার মনে হয় আমি শীতল, অনুভূতিহীন, স্বার্থপর—তাই তো?বেশ, তাহলে চলে যাও। যাদের তুমি পছন্দ করো, তাদের কাছেই ফিরে যাও। বিয়ে করো এমন কোনো আবেগপ্রবণ মোটা চামড়ার লোককে, যার কাছে তোমাকে চুমু খাওয়ার জন্য পুরু ঠোঁট আছে আর লাথি মারার জন্য ভারী বুট আছে।তুমি যদি সত্যিকারের মূল্য চিনতে না পারো, তাহলে বরং যেটার মূল্য বোঝো, সেটাই বেছে নাও।
লিজা [গভীর হতাশায়] :
ওহ্, তুমি এক নিষ্ঠুর স্বৈরাচারী। তোমার সঙ্গে কথা বলাই অসম্ভব। তুমি সব কথা ঘুরিয়ে আমার বিরুদ্ধেই দাঁড় করাও। শেষ পর্যন্ত আমিই সবসময় ভুল হয়ে যাই।
কিন্তু তুমি খুব ভালো করেই জানো—তুমি আসলে একজন গুণ্ডা ছাড়া আর কিছু নও।
তুমি খুব ভালো করেই জানো, আমি আর সেই নর্দমার জীবনে ফিরে যেতে পারব না—যেমনটা তুমি আমাকে বারবার বলো। এই পৃথিবীতে তুমি আর কর্নেল পিকারিং ছাড়া আমার সত্যিকারের কোনো বন্ধু নেই। আর এটাও তুমি জানো যে, তোমাদের দুজনের সংস্পর্শে থাকার পর আমি আর কোনো নীচ, অশিক্ষিত সাধারণ মানুষের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারব না। তবু তুমি ইচ্ছে করেই আমাকে এমন কথা বলে অপমান করো, যেন আমি অনায়াসে সেখানে ফিরে যেতে পারি।তুমি মনে করো, আমার যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই বলেই শেষ পর্যন্ত আমাকে উইম্পল স্ট্রিটেই ফিরে আসতে হবে। কিন্তু এতটা নিশ্চিন্ত হয়ো না যে তুমি আমাকে চিরকাল তোমার পায়ের নিচে ফেলে অপমান করবে, কিংবা কথার আঘাতে ছোট করবে।
আমি ফ্রেডিকেই বিয়ে করব—হ্যাঁ, করবই—যেই মুহূর্তে সে আমার ভরণপোষণের সামর্থ্য অর্জন করবে।
হিগিন্স [তার পাশে বসে, হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি নিয়ে] :
বাজে কথা! তুমি ফ্রেডিকে নয়, কোনো রাষ্ট্রদূতকে বিয়ে করবে। কিংবা ভারতের গভর্নর-জেনারেলকে, আয়ারল্যান্ডের লর্ড-লেফটেন্যান্টকে—অথবা এমন কাউকে, যার জীবনে একজন উপযুক্ত ‘ভাইসরিন’ দরকার।
আমি আমার সেরা সৃষ্টি কোনো ফ্রেডির হাতে নষ্ট হতে দেব না।
লিজা :তুমি মনে করো এসব কথা শুনে আমি খুশি হই। কিন্তু এক মুহূর্ত আগেই তুমি আমাকে যা বলেছ, আমি তা ভুলিনি। আমি কোনো শিশু নই, কোনো পোষা কুকুরছানাও নই যে দুটো আদরের কথায় সব অপমান ভুলে যাব।যদি আমি সম্মান আর সহানুভূতি না পাই, তাহলে অন্তত নিজের স্বাধীনতাটা আমি নিজেই নিয়ে নেব।
হিগিন্স :স্বাধীনতা! এ তো সেই মধ্যবিত্তদের ভ্রান্ত বিশ্বাস। পৃথিবীতে কেউই একা নয়। আমরা সবাই একে অপরের উপর নির্ভরশীল—এই পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীই।
লিজা [দৃঢ়ভাবে উঠে দাঁড়িয়ে] :আমি তোমাকে দেখিয়ে দেব, আমি তোমার উপর নির্ভরশীল কি না। তুমি যদি বক্তৃতা দিতে পারো, তাহলে আমিও শেখাতে পারি। আমি গিয়ে একজন শিক্ষিকা হব।
হিগিন্স :
কী শেখাবে, শুনি?
লিজা :যা তুমি আমাকে শিখিয়েছ। আমি ধ্বনিবিজ্ঞান শেখাব।
হিগিন্স :হা! হা! হা!
লিজা :আমি গিয়ে প্রফেসর নিপিয়ানের সহকারী হওয়ার প্রস্তাব দেব।
হিগিন্স [হঠাৎ ক্রোধে বিস্ফোরিত হয়ে] :কি বললে! ওই ভণ্ড লোকটার কাছে? ওই প্রতারক, তোষামোদে ভরা নির্বোধটার কাছে? তুমি ওকে আমার পদ্ধতি শেখাবে? আমার আবিষ্কার?
[সে উত্তেজনায় লিজার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার বাহু চেপে ধরে]শোনো, তুমি যদি ওর দিকে এক পা-ও বাড়াও, আমি তোমার গলা টিপে ধরব!
লিজা [কোনো ভয় না পেয়ে, স্থিরভাবে] :টিপে ধরো। তাতে আমার কী আসে যায়? আমি তো জানতাম, একদিন না একদিন তুমি আমাকে মারতেই চাইবে।এই কথায় হিগিন্স যেন নিজের রাগের জন্য নিজেই লজ্জিত হয়ে পড়ে। সে দ্রুত হাত সরিয়ে নেয় এবং এত তাড়াতাড়ি পিছিয়ে আসে যে টলতে টলতে গিয়ে অটোম্যানের ওপর বসে পড়ে।
লিজা [বিজয়ীর মতো] :আহা! এখন বুঝেছি তোমার সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। এতদিন এটা না বুঝে আমি কত বড় বোকা ছিলাম!তুমি আমাকে যে জ্ঞান দিয়েছ, সেটা আর ফিরিয়ে নিতে পারবে না। তুমি নিজেই বলেছিলে, আমার কান তোমার থেকেও সূক্ষ্ম। আর আমি মানুষের সঙ্গে ভদ্রভাবে, দয়ালুভাবে ব্যবহার করতে পারি—যা তুমি পারো না।আহা, হেনরি হিগিন্স, এবার তোমার সর্বনাশ! এখন তোমার ধমক, গর্জন, বড় বড় কথা—কিছুতেই আর আমি ভয় পাই না।
[আঙুল মটকে]
আমি খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেব—“প্রফেসর হিগিন্সের ডাচেস আসলে এক ফুলওয়ালি মেয়ে, যাকে তিনি শিক্ষা দিয়েছেন। এখন সেই মেয়েই মাত্র ছয় মাসে এক হাজার গিনির বিনিময়ে যে কাউকে ডাচেস বানাতে পারে।”যখন ভাবি, এতদিন আমি তোমার পায়ের কাছে হামাগুড়ি দিয়েছি, তোমার অপমান সহ্য করেছি, আর তুমি আমাকে পদদলিত করেছ—অথচ তোমার সমান হতে আমার শুধু একটা আঙুল তুললেই চলত—তখন নিজের ওপরই রাগ হয়।
হিগিন্স [বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে] :
তুই একেবারে বেহায়া মেয়ে! কিন্তু সত্যি বলতে কী, এই রূপটাই আমার বেশি পছন্দ। কান্নাকাটি করার চেয়ে অনেক ভালো। চপ্পল এনে দেওয়া, চশমা খুঁজে দেওয়া পোষা মেয়ের চেয়ে এটা অনেক ভালো।
[সে উঠে দাঁড়ায়]
সত্যিই বলছি, লিজা—আমি বলেছিলাম তোকে একজন নারী বানাব। আর আজ আমি সেটা করেছি। তোকে এখন আমার সত্যিই ভালো লাগছে।
লিজা :হ্যাঁ—কারণ এখন আমি তোমাকে ভয় পাই না। আর তোমাকে ছাড়াও বাঁচতে পারি।
হিগিন্স :
অবশ্যই পারিস, তুই ছোট্ট বোকা মেয়ে! পাঁচ মিনিট আগেও তুই ছিলি আমার গলার কাঁটা। আর এখন? এখন তুই শক্তির স্তম্ভ। যেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাশাপাশি দাঁড়ানো এক সহযোদ্ধা জাহাজ।এখন থেকে আমরা তিনজন—তুই, আমি আর পিকারিং—হব তিনজন স্বাধীন মানুষ। আর শুধু দুজন পুরুষ আর এক অসহায় মেয়ে নয়।এই সময় মিসেস হিগিন্স ফিরে আসেন। তাঁর পরনে বিয়ের পোশাক।
লিজা সঙ্গে সঙ্গে শান্ত, সংযত ও মার্জিত হয়ে ওঠে।
মিসেস হিগিন্স :
গাড়ি এসে গেছে, লিজা। তুমি কি প্রস্তুত?
লিজা। ঠিক। প্রফেসর কি আসছেন? মিসেস হিগিন্স। একদমই না। উনি গির্জায় ঠিকমতো আচরণ করতে পারেন না। উনি সারাক্ষণ পাদ্রীর উচ্চারণ নিয়ে উচ্চস্বরে মন্তব্য করেন। লাইজা। তাহলে আপনার সাথে আমার আর দেখা হবে না, প্রফেসর। বিদায়। [সে দরজার দিকে এগিয়ে যায়]। মিসেস হিগিন্স [হিগিন্সের কাছে এসে] বিদায়, সোনা। হিগিন্স। বিদায়, মা। [সে তাকে চুমু খেতে যাবে, এমন সময় তার কিছু একটা মনে পড়ে যায়]। ওহ, যাইহোক, এলিজা, একটা হ্যাম আর একটা স্টিলটন চিজ অর্ডার করবে? আর ইল অ্যান্ড বিনম্যান’স থেকে আমার জন্য আট নম্বর মাপের একজোড়া রেইনডিয়ার গ্লাভস আর আমার নতুন স্যুটের সাথে মেলানো একটা টাই কিনে আনবে। তুমি রংটা বেছে নিতে পারো। [তার হাসিখুশি, বেপরোয়া, জোরালো কণ্ঠস্বর বুঝিয়ে দেয় যে তাকে শুধরানো যাবে না]। লাইজা [অবজ্ঞার সাথে] কিনে নাও। [সে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে যায়]। মিসেস হিগিন্স। আমার মনে হচ্ছে তুমি মেয়েটাকে বিগড়ে ফেলেছ, হেনরি। কিন্তু কিছু মনে করো না, প্রিয়: আমি তোমাকে টাই আর দস্তানা কিনে দেব। হিগিন্স [হাসিমুখে] ওহ, কষ্ট করার দরকার নেই। ও নিজেই সব কিনে নেবে। বিদায়। তারা চুম্বন করে। মিসেস হিগিন্স দৌড়ে বেরিয়ে যান। একা হয়ে হিগিন্স পকেটে টাকা নাড়াচাড়া করতে থাকেন; খিকখিক করে হাসেন; এবং অত্যন্ত আত্মতৃপ্তির সাথে আমোদ-প্রমোদ করতে থাকেন। গল্পের বাকি অংশ ঘটনাক্রমে দেখানোর প্রয়োজন নেই, এবং সত্যি বলতে, তা বলারও তেমন দরকার পড়ত না যদি না আমাদের কল্পনাশক্তি সেইসব তৈরি পোশাকের ওপর অলসভাবে নির্ভরশীল হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ত, যেখানে রোমান্স তার সব গল্পের সাথে বেমানান “সুখকর সমাপ্তি”-র ভান্ডার রাখে। এখন, এলিজা ডুলিটলের কাহিনী, যদিও এতে বর্ণিত রূপান্তরের কারণে একে রোমান্স বলা হয়, তা অত্যন্ত অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এটি যথেষ্ট প্রচলিত। নেল গুইন যখন কমলালেবু বিক্রি করে থিয়েটারে কর্মজীবন শুরু করেন, তখন সেখানে রানির ভূমিকায় অভিনয় করে এবং রাজাদের মুগ্ধ করে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তারপর থেকে শত শত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণী এই ধরনের রূপান্তর অর্জন করেছেন। তা সত্ত্বেও, শুধুমাত্র একটি রোমাঞ্চকর উপন্যাসের নায়িকা হওয়ার কারণেই চারপাশের মানুষ ধরে নিয়েছে যে, তিনি নিশ্চয়ই সেটির নায়ককে বিয়ে করেছেন।
লাইজা :
ঠিক আছে। প্রফেসর, আপনি কি আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন?
মিসেস হিগিন্স :
একেবারেই না। ও গির্জায় কখনও ভদ্রভাবে থাকতে পারে না। পাদ্রীর উচ্চারণ শুনলেই উচ্চস্বরে ভুল ধরতে শুরু করে।
লাইজা :
তাহলে এটাই আমাদের শেষ দেখা, প্রফেসর। বিদায়।
[সে দরজার দিকে এগিয়ে যায়।]
মিসেস হিগিন্স [হিগিন্সের কাছে এসে] :
বিদায়, সোনা।
হিগিন্স :
বিদায়, মা।
[সে মাকে চুমু খেতে যায়, কিন্তু হঠাৎ কিছু মনে পড়ে যায়]
ও হ্যাঁ, এলিজা—ফিরে আসার সময় একটা হ্যাম আর একটা স্টিলটন চিজ কিনে আনবে। আর ইল অ্যান্ড বিনম্যান’স থেকে আমার জন্য আট নম্বর মাপের একজোড়া রেইনডিয়ার গ্লাভস আর নতুন স্যুটের সঙ্গে মানানসই একটা টাই নিয়ে আসবে। রংটা তুমি নিজের পছন্দমতো বেছে নিও।
তার কণ্ঠের সেই চিরচেনা হাসিখুশি, বেপরোয়া ও আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি যেন স্পষ্ট করে দেয়—এই মানুষটিকে বদলানো অসম্ভব।
লাইজা [তীব্র অবজ্ঞায়] :
নিজেই কিনে নিও।
[সে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে যায়।]
মিসেস হিগিন্স :
আমার মনে হচ্ছে, হেনরি, তুমি মেয়েটাকে নষ্ট করে ফেলেছ। তবে কিছু যায় আসে না। আমি তোমার টাই আর দস্তানা কিনে দেব।
হিগিন্স [হেসে] :
ওহ্, তার দরকার হবে না। ও নিজেই সব কিনে আনবে। বিদায়।
মা ও ছেলে পরস্পরকে চুম্বন করেন। তারপর মিসেস হিগিন্সও দ্রুত বেরিয়ে যান।
ঘরে একা থেকে হিগিন্স পকেটের কয়েন নাড়াচাড়া করতে থাকে, নিজের মনে হাসে, আর এক অদ্ভুত আত্মতৃপ্ত আনন্দে ডুবে যায়।
এরপরের ঘটনাগুলো মঞ্চে দেখানোর আর বিশেষ প্রয়োজন পড়ে না। সত্যি বলতে, সেগুলো বলারও খুব দরকার হতো না, যদি না আমাদের কল্পনাশক্তি সেই চিরাচরিত “সুখী সমাপ্তি”-র গল্পের ওপর এতটা নির্ভরশীল হয়ে পড়ত। আমরা এমনভাবে অভ্যস্ত যে, কোনো রোমান্টিক কাহিনির শেষে নায়ক-নায়িকার বিয়ে না হলে যেন গল্পটাই অসম্পূর্ণ মনে হয়।
কিন্তু এলিজা ডুলিটলের গল্প, যদিও তার বিস্ময়কর রূপান্তরের জন্য একে রোমান্স বলা যায়, আসলে ততটা অবাস্তব নয়। ইতিহাসে এমন উদাহরণ অনেক আছে। নেল গুইনও তো একসময় থিয়েটারের বাইরে কমলালেবু বিক্রি করতেন। পরে সেই মেয়েই মঞ্চে রানির চরিত্রে অভিনয় করেছেন এবং রাজাদের হৃদয় জয় করেছেন।
তারপর থেকে শত শত উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও দৃঢ়চেতা তরুণী নিজেদের জীবন এভাবেই বদলে ফেলেছে।
তবু মানুষ এক অদ্ভুত ভুল ধারণা পোষণ করে—যে কোনো নারী যদি একটি রোমাঞ্চকর কাহিনির নায়িকা হয়ে ওঠে, তাহলে নিশ্চয়ই সে গল্পের নায়ককেই বিয়ে করেছে।
এমন ধারণা সত্যিই অসহনীয়। শুধু এই কারণে নয় যে, এত সামান্য এবং অবিবেচক একটি অনুমানের ভিত্তিতে পুরো নাটকটির অর্থই বিকৃত হয়ে যায়; বরং এই কারণেও যে, নাটকের প্রকৃত পরিণতি যে কারও কাছেই স্পষ্ট হওয়ার কথা, যার মানব-স্বভাব সম্পর্কে সামান্যতম বোধ আছে—বিশেষত নারী-মন সম্পর্কে।
এলিজা যখন হিগিন্সকে স্পষ্টভাবে বলেছিল যে, সে কখনও তাকে বিয়ে করবে না—এমনকি যদি হিগিন্স নিজেই তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিত—তখন সে কোনো ছলনা করেনি, কোনো নাটকীয় অভিমানও দেখায়নি। সে আসলে একটি গভীর ও ভেবেচিন্তে নেওয়া সিদ্ধান্তের কথাই ঘোষণা করেছিল।
একজন অবিবাহিত পুরুষ যখন কোনো অবিবাহিত নারীর জীবনে প্রবেশ করে, তাকে শিক্ষা দেয়, তার উপর প্রভাব বিস্তার করে, তার অভ্যাস, ভাষা ও জীবনধারা গড়ে তোলে—এবং ধীরে ধীরে তার জীবনের এক অপরিহার্য উপস্থিতিতে পরিণত হয়, যেমনটা হিগিন্স এলিজার ক্ষেত্রে হয়েছিল—তখন সেই নারী, যদি তার নিজের বিচারবুদ্ধি ও স্বাধীন মানসিকতা থাকে, তবে খুব স্বাভাবিকভাবেই ভাবতে শুরু করে: এই মানুষটিকে কি সে নিজের স্বামী হিসেবে চাইবে?
বিশেষত তখন, যখন সেই পুরুষ বিয়ের ব্যাপারে উদাসীন, নির্লিপ্ত এবং আত্মকেন্দ্রিক—যে ধরনের পুরুষকে কোনো দৃঢ়চেতা ও নিবেদিতপ্রাণ নারী চাইলে শেষ পর্যন্ত জয় করেও নিতে পারে।
কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নির্ভর করে আরও কিছু বাস্তব বিষয়ের উপর—নারীটি সত্যিই স্বাধীন কি না, তার নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কতটা নিশ্চয়তা আছে, তার বয়স কত, তার আয়ের উপায় আছে কি না।
যদি কোনো নারী যৌবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে যায় এবং নিজের জীবিকা সম্পর্কে অনিশ্চয়তায় ভোগে, তবে সে প্রায় বাধ্য হয় এমন কাউকে বিয়ে করতে, যে তার ভরণপোষণের দায় নেবে। কারণ সমাজ তাকে খুব কম স্বাধীনতাই দেয়।
কিন্তু এলিজা তখনও তরুণী, সুন্দরী, প্রাণবন্ত। তার সামনে এখনও সম্ভাবনার পথ খোলা। তাই সে বাধ্য হয়ে নয়, নিজের প্রবৃত্তি ও স্বাধীন ইচ্ছা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
আর তার সেই সহজাত প্রবৃত্তি তাকে স্পষ্টভাবেই বলে—হিগিন্সকে বিয়ে করা উচিত নয়।
তবে সেই একই প্রবৃত্তি তাকে এটাও বলে না যে, হিগিন্সকে পুরোপুরি ছেড়ে চলে যেতে হবে। কারণ এলিজার জীবনে হিগিন্স এমন এক শক্তিশালী মানসিক উপস্থিতি হয়ে উঠেছে, যাকে সহজে অস্বীকার করা সম্ভব নয়। সে জানে, ভবিষ্যতেও হিগিন্স তার জীবনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ও প্রভাবের কেন্দ্র হয়েই থাকবে।
হ্যাঁ, যদি অন্য কোনো নারী এসে হিগিন্সের জীবনে নিজের জায়গা করে নিত, তবে এলিজার মনেও হয়তো তীব্র অস্থিরতা ও ঈর্ষা জন্ম নিত। কিন্তু সে হিগিন্সকে এতটাই চেনে যে, এই আশঙ্কা তার মনে প্রায় নেই বললেই চলে। তাই তাদের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার মধ্যে কোনো দ্বিধা নেই। এমনকি তাদের বয়সের ব্যবধান—যা তরুণদের কাছে বিরাট বলে মনে হয়—তাও তার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে না।
আমাদের নিজেদের সামাজিক অভ্যাস বা রোমান্টিক কল্পনা হয়তো এলিজার এই সিদ্ধান্তকে সহজে মেনে নিতে চায় না। তাই আমরা চেষ্টা করি এর মধ্যে কোনো যুক্তি খুঁজে বের করতে।
হিগিন্স যখন বলেছিল, নারীদের প্রতি তার নির্লিপ্ততার প্রধান কারণ তার মা—যিনি তার কাছে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী আদর্শ—তখনই আসলে সে নিজের আজীবন অবিবাহিত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছিল।
ঘটনাটি অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে তা ততটাই বিরল, যতটা বিরল এমন অসাধারণ মায়েরা।
যদি কোনো কল্পনাপ্রবণ ও বুদ্ধিমান ছেলের জীবনে এমন একজন মা থাকেন—যিনি ধনী, রুচিশীল, তীক্ষ্ণবুদ্ধি, ব্যক্তিত্বময় এবং আবেগে সংযত—তবে পৃথিবীর অধিকাংশ নারীই তার কাছে তুলনামূলকভাবে অসম্পূর্ণ বলে মনে হতে পারে।
কঠোরতা ছাড়াই দৃঢ় চরিত্র, মার্জিত রুচিবোধ এবং নিজের গৃহকে শিল্পসম্মত সৌন্দর্যে ভরিয়ে তোলার অসাধারণ ক্ষমতার মাধ্যমে মিসেস হিগিন্স তাঁর ছেলের সামনে এমন এক উচ্চ মানদণ্ড স্থাপন করেছিলেন, যার সমকক্ষ হয়ে ওঠা খুব কম নারীর পক্ষেই সম্ভব ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বে ছিল বুদ্ধিমত্তা, সংযম, সৌন্দর্যবোধ ও আত্মমর্যাদার এমন এক সুষম সমন্বয়, যা হিগিন্সের মানসজগতে গভীর ছাপ ফেলেছিল।
এর ফলেই হিগিন্সের মধ্যে এক অদ্ভুত মানসিক গঠন তৈরি হয়। তিনি নিজের স্নেহ, সৌন্দর্যচেতনা এবং আদর্শবাদকে যৌন আকর্ষণ থেকে আলাদা করে দেখতে শিখেছিলেন। অর্থাৎ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, শিল্পরুচি কিংবা মানসিক আকর্ষণ—এসব তাঁর কাছে নিছক প্রেম বা যৌনতারই রূপ ছিল না।
এই কারণেই তিনি সাধারণ মানুষের কাছে এক রহস্যময় চরিত্র বলে মনে হতেন। বিশেষত তাদের কাছে, যারা অরুচিকর পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছে এবং যাদের কাছে সাহিত্য, চিত্রকলা, সঙ্গীত, ভাস্কর্য কিংবা স্নেহপূর্ণ মানবিক সম্পর্ক—সবকিছুর শেষ অর্থ এসে দাঁড়ায় যৌনতা বা দাম্পত্য আকর্ষণে।
তাদের কাছে “আবেগ” মানেই প্রেমের মোহ বা শরীরী আকর্ষণ। ফলে হিগিন্স যে ধ্বনিবিজ্ঞান নিয়ে গভীরভাবে উচ্ছ্বসিত হতে পারে, কিংবা এলিজার বদলে নিজের মাকেই জীবনের আদর্শ হিসেবে দেখতে পারে—এ কথা তাদের কাছে অস্বাভাবিক, এমনকি প্রায় অবিশ্বাস্য বলেই মনে হয়।
তবু বাস্তব জীবনের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, পৃথিবীতে এমন মানুষ খুব কমই আছে যারা চাইলে কোনো জীবনসঙ্গী খুঁজে পেতে সম্পূর্ণ অক্ষম। চেহারায় কুৎসিত বা স্বভাবে বিরক্তিকর মানুষও প্রয়োজনে বিবাহ করে। অথচ সমাজে এমন বহু শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান, প্রতিভাবান নারী-পুরুষ আছেন যারা আজীবন অবিবাহিত থেকে যান।
তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—কেন?
সম্ভবত কারণ, কিছু মানুষ যৌনতাকে জীবনের অন্য অনুভূতিগুলো থেকে আলাদা করে দেখতে শেখে। প্রতিভাবান ও গভীর মননের মানুষ প্রায়ই বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই বিচ্ছিন্নতা অর্জন করেন। আর অনেক সময় সেই প্রবণতা জন্ম নেয় বা শক্তি পায় কোনো অসাধারণ পিতা-মাতার প্রভাব থেকে।
এলিজা অবশ্য এত বিশ্লেষণ করে এসব বোঝাতে পারত না। কিন্তু সে সহজাতভাবেই অনুভব করেছিল, ফ্রেডির মতো সহজে হিগিন্সকে জয় করা সম্ভব নয়। ফ্রেডি প্রথম দর্শনেই তার প্রেমে পড়েছিল; কিন্তু হিগিন্সের মধ্যে ছিল এক ধরনের অদম্য মানসিক স্বাধীনতা, যা তাকে কারও সম্পূর্ণ অধীন হতে দিত না।
এলিজা বুঝেছিল—সে কখনও হিগিন্সকে পুরোপুরি নিজের করে পাবে না। বিশেষ করে সে কখনও তার মা ও তার চিন্তার জগতের মাঝখানে এসে দাঁড়াতে পারবে না। অথচ একজন স্ত্রীর কাছে সবচেয়ে বড় চাওয়া হলো—স্বামীর জীবনে সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে অন্তরঙ্গ ও সবচেয়ে উষ্ণ সম্পর্ক হয়ে ওঠা।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, এলিজা অনুভব করেছিল যে কোনো এক রহস্যময় কারণে হিগিন্সের মধ্যে “স্বামী” হওয়ার মৌলিক গুণটি অনুপস্থিত। তিনি মানুষকে ভালোবাসতে পারেন, প্রভাবিত করতে পারেন, তাদের জীবন বদলে দিতে পারেন—কিন্তু কাউকে নিজের জীবনের কেন্দ্রস্থলে বসাতে পারেন না।
এমনকি যদি মিসেস হিগিন্স পৃথিবীতে না-ও থাকতেন, তবুও হিগিন্সের জীবনে মিল্টন, ধ্বনিবিজ্ঞান এবং তার “সার্বজনীন বর্ণমালা”-র গবেষণাই প্রধান হয়ে থাকত। তাঁর কাছে চিন্তা ও জ্ঞানই ছিল জীবনের সর্বোচ্চ অনুরাগ। কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক কখনও সেই বৌদ্ধিক আকর্ষণের উপরে স্থান পেত না।
ল্যান্ডরের সেই ধারণা—যে মানুষের জীবনে ভালোবাসা কখনও কখনও গৌণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়—এলিজাকে মোটেই আকৃষ্ট করেনি। তার সঙ্গে যদি যোগ করা হয় হিগিন্সের কর্তৃত্বপরায়ণ আচরণের প্রতি এলিজার স্বাভাবিক বিরাগ, এবং যখনই হিগিন্স নিজের সীমা ছাড়িয়ে বেপরোয়া জবরদস্তি করতে যেত, তখন তাকে এড়িয়ে চলার প্রবণতা ও তার চাতুর্যের প্রতি এলিজার গভীর অবিশ্বাস—তাহলে স্পষ্ট বোঝা যায়, কেন এলিজার সহজাত প্রবৃত্তি তাকে হিগিন্সকে বিয়ে না করার বিষয়ে সতর্ক করেছিল।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে—শেষ পর্যন্ত এলিজা কাকে বিয়ে করল?
কারণ, হিগিন্স যদি জন্মগতভাবেই এক চিরকুমার মানুষ হয়ে থাকে, তবে এলিজা মোটেই এমন নারী নয়, যে সারা জীবন অবিবাহিত থেকে যাবে।
আসলে, যারা এলিজার নিজের কথার ইঙ্গিত বুঝতে পারেনি, তাদের জন্য বিষয়টি খুব সংক্ষেপেই বলা যায়। হিগিন্সকে বিয়ে না করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরপরই এলিজা উল্লেখ করেছিল যে তরুণ ফ্রেডরিক আইন্সফোর্ড হিল প্রতিদিন তাকে প্রেমপত্র লিখছে।
ফ্রেডি তখন তরুণ—হিগিন্সের চেয়ে প্রায় কুড়ি বছরের ছোট। সে একজন ভদ্রলোক; এলিজার ভাষায়, “একজন অভিজাত”। তার কথা বলার ভঙ্গি মার্জিত, পোশাক-পরিচ্ছদ পরিচ্ছন্ন, আর কর্নেল পিকারিংও তাকে নিজের সমকক্ষ বলেই গণ্য করেন। সবচেয়ে বড় কথা, সে এলিজাকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসে।
আর হিগিন্সের মতো নয়—ফ্রেডির মধ্যে এলিজার উপর আধিপত্য বিস্তারের কোনো প্রবণতা নেই। সামাজিক অবস্থানের সুবিধা তার থাকলেও, সে কখনও এলিজার প্রভু হয়ে উঠতে চায় না।
এলিজা সেই পুরনো রোমান্টিক ধারণাটিকে বিশ্বাস করত না, যেখানে বলা হয় সব নারীই নাকি শাসিত হতে চায়—এমনকি অপমানিত বা নিপীড়িত হতেও ভালোবাসে।
নিৎশে এক জায়গায় লিখেছিলেন—
“নারীদের কাছে গেলে চাবুক সঙ্গে নিও।”
কিন্তু বাস্তবে বিচক্ষণ স্বৈরশাসকেরা শুধু নারীদের ক্ষেত্রেই নয়, পুরুষদের সঙ্গেও একই কৌশল প্রয়োগ করেছে। ইতিহাসে এমন বহু পুরুষ আছে, যারা তাদের উপর অত্যাচার চালানো শক্তিমান নেতাদেরই ভক্তি করেছে, প্রায় দাসের মতো।
অবশ্যই পৃথিবীতে দাসসুলভ নারী যেমন আছে, তেমনি দাসসুলভ পুরুষও আছে। মানুষ সাধারণত নিজের চেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়। কিন্তু কোনো শক্তিশালী মানুষকে শ্রদ্ধা করা আর তার অধীনে নিজেকে সমর্পণ করা—এই দুই বিষয় এক নয়।
দুর্বল মানুষ হয়তো পূজিত হয় না, কিন্তু তারা ঘৃণিতও নয়। বরং বাস্তবে দেখা যায়, সাধারণ ও দুর্বল মানুষদেরও নিজেদের চেয়ে অনেক বেশি গুণী, শক্তিশালী বা উন্নত কাউকে বিয়ে করতে তেমন অসুবিধা হয় না।
হ্যাঁ, সংকটময় মুহূর্তে তারা হয়তো ভেঙে পড়তে পারে। কিন্তু জীবন তো কেবল একটানা সংকটের নাম নয়। জীবন আসলে অসংখ্য ছোট ছোট পরিস্থিতির ধারাবাহিক প্রবাহ—আর সেই প্রবাহে সহানুভূতি, নির্ভরতা, কোমলতা ও সঙ্গই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মূল্য পায়।
জীবনের অনেক কাজই আছে, যেগুলোর জন্য অসাধারণ শক্তি বা প্রতিভার প্রয়োজন হয় না। এমনকি কিছুটা দুর্বল মানুষও সেগুলো সুন্দরভাবে সামলে নিতে পারে, যদি তার পাশে একজন শক্তিশালী ও সহায়ক সঙ্গী থাকে। এই কারণেই মানবসমাজে একটি চিরন্তন সত্য দেখা যায়—শক্তিশালী মানুষ, সে নারী হোক বা পুরুষ, কেবল নিজের সমকক্ষ শক্তিমান মানুষকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেয় না; বরং অনেক সময় তারা সঙ্গীর মধ্যে শক্তির চেয়ে অন্য গুণগুলোকেই বেশি মূল্য দেয়।
দুটি সিংহ যখন একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আরও জোরে গর্জন করার প্রতিযোগিতায় নামে, তখন শেষ পর্যন্ত তারা পরস্পরকে বিরক্তিকর বলেই মনে করে। একইভাবে, যে মানুষ নিজেকে দুজনের জন্যই যথেষ্ট শক্তিশালী বলে বিশ্বাস করে, সে সঙ্গীর মধ্যে আরেকটি শক্তিমান প্রতিদ্বন্দ্বী খোঁজে না; বরং কোমলতা, নির্ভরতা, স্নেহ, সৌন্দর্য বা শান্তির মতো গুণের খোঁজ করে।
উল্টোদিকে, দুর্বল মানুষেরাও এমন শক্তিশালী কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে চায়, যে তাকে সম্পূর্ণ ভয় পাইয়ে দেবে না। কিন্তু এখানেই তারা প্রায়শই ভুল করে বসে। তারা এমন কিছু পেতে চায়, যার জন্য নিজেরা প্রস্তুত নয়। আমরা যাকে রূপক অর্থে বলি—“নিজের সামর্থ্যের বাইরে হাত বাড়ানো।”
তারা অল্প দিয়ে অনেক বেশি পাওয়ার আশা করে। আর যখন সেই অমিল অত্যন্ত তীব্র হয়ে ওঠে, তখন সম্পর্ক আর টেকে না। পরিণতিতে দুর্বল মানুষটি হয় পরিত্যক্ত হয়, নয়তো সারা জীবন সেই সম্পর্ককে বোঝার মতো বয়ে বেড়ায়—যা আরও কষ্টকর।
বিশেষত যারা শুধু দুর্বলই নয়, কিছুটা নির্বোধও, তারা এ ধরনের ভুলে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতার আলোকে প্রশ্ন ওঠে—ফ্রেডি আর হিগিন্সের মধ্যে দাঁড়িয়ে এলিজা শেষ পর্যন্ত কী করত?
সে কি সারাজীবন হিগিন্সের চপ্পল এগিয়ে দেওয়ার অপেক্ষায় থাকত? নাকি এমন একজন মানুষকে বেছে নিত, যে বরং তার নিজের চপ্পল এনে দিতে আনন্দ পায়?
উত্তরটি খুবই স্পষ্ট।
যদি না ফ্রেডি তার কাছে স্বভাবগতভাবে অপছন্দনীয় হতো, কিংবা হিগিন্স এমন অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণের অধিকারী হতো যা এলিজার অন্য সব প্রবৃত্তিকে মুছে দিত—তবে তাদের দুজনের মধ্যে কাউকে বিয়ে করলে এলিজা অবশ্যই ফ্রেডিকেই বেছে নিত।
আর সে সেটাই করেছিল।
তবে এরপর যে সমস্যাগুলো দেখা দেয়, সেগুলো প্রেমের নয়—অর্থনৈতিক।
ফ্রেডির হাতে টাকা ছিল না, কোনো স্থায়ী পেশাও ছিল না। তার মায়ের যৌতুকের টাকাই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা—যা একসময়ের অভিজাত জীবনযাপনের শেষ চিহ্ন হিসেবে আর্লস কোর্টে কোনোমতে ভদ্রতার মুখোশ টিকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু সেই অর্থ সন্তানদের ভালো শিক্ষা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না; ফ্রেডিকে কোনো প্রতিষ্ঠিত পেশায় দাঁড় করানোর প্রশ্নই ওঠে না।
সপ্তাহে ত্রিশ শিলিং বেতনের কোনো কেরানির চাকরি ফ্রেডির কাছে যেমন অপমানজনক মনে হতো, তেমনি তা তার স্বভাবের সঙ্গেও মানাত না। তার পুরো জীবনটাই যেন এক অলস প্রত্যাশায় কাটছিল—যদি সে ভদ্রলোকের বাহ্যিক চাকচিক্য বজায় রাখতে পারে, তাহলে হয়তো কোনো একদিন কেউ তার জন্য কিছু একটা করে দেবে।
ফ্রেডির মনে ভবিষ্যৎ নিয়ে একধরনের অস্পষ্ট কল্পনা ছিল। সে ভাবত, হয়তো কোনোদিন কোনো ধনী ব্যক্তির ব্যক্তিগত সচিব হবে, অথবা এমন কোনো আরামদায়ক ও সম্মানজনক পদ পাবে যেখানে খুব বেশি পরিশ্রম করতে হবে না, অথচ ভদ্রলোকের মতো জীবনযাপন করা যাবে।
অন্যদিকে, তার মায়ের স্বপ্ন ছিল আরও আলাদা। তিনি হয়তো মনে মনে আশা করেছিলেন, তাঁর ভদ্র, মার্জিত ও নম্র ছেলেটি একদিন কোনো ধনী মহিলার মন জয় করবে, আর সেই বিয়ের মাধ্যমে পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে।
তাই কল্পনা করা কঠিন নয়, কত বড় ধাক্কা তিনি খেয়েছিলেন যখন ফ্রেডি বিয়ে করল এক প্রাক্তন ফুলওয়ালী মেয়েকে—যে অদ্ভুত ও কুখ্যাত এক সামাজিক রূপান্তরের মাধ্যমে নিজের শ্রেণী ছেড়ে উঠে এসেছে।
অবশ্য এলিজার অবস্থাকে পুরোপুরি অসম্মানজনকও বলা যাচ্ছিল না।
তার বাবা, যিনি একসময় ছিলেন সাধারণ এক ময়লাওয়ালা, ভাগ্যের এক বিস্ময়কর মোড়ে নিজেই শ্রেণীচ্যুত হয়ে এক অদ্ভুত সামাজিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। তার মধ্যে এমন এক স্বাভাবিক সামাজিক প্রতিভা ছিল, যা সমাজের সব কুসংস্কার আর ভেদরেখাকে অতিক্রম করতে পেরেছিল।
যে মধ্যবিত্ত সমাজকে তিনি ঘৃণা করতেন, তাদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও তিনি নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, নির্লজ্জ আত্মবিশ্বাস, নিজের পুরনো পেশাকে লজ্জা না পেয়ে গৌরবের মতো বহন করার ক্ষমতা, এবং ভালো-মন্দের ঊর্ধ্বে থাকা এক নিৎশে-প্রভাবিত দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সমাজের উচ্চতম স্তরে প্রবেশ করেছিলেন।
ডিউকদের নৈশভোজে তিনি ডাচেসদের পাশে বসতেন। দেশের অভিজাত প্রাসাদগুলোতে তিনি কখনও বাটলারদের সঙ্গে ধূমপান করতেন, কখনও আবার মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে সমান তালে আলোচনা চালাতেন। সমাজের সব স্তরেই তিনি যেন সমান স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করতেন।
তবু, বছরে চার হাজার পাউন্ড আয় থাকা সত্ত্বেও, সেই সামাজিক অবস্থান ধরে রাখা তার কাছেও প্রায় ততটাই কঠিন মনে হতো, যতটা কঠিন ছিল আর্লস কোর্টে মিসেস আইন্সফোর্ড হিলের অতি সামান্য আয়ে সম্মান বাঁচিয়ে জীবনযাপন করা।
এই অবস্থায় এলিজার ভরণপোষণের অতিরিক্ত দায় নিতে তিনি মোটেও আগ্রহী ছিলেন না।
ফলে, ফ্রেডি ও এলিজা—এখনকার মিস্টার ও মিসেস আইন্সফোর্ড হিল—প্রায় নিঃস্ব অবস্থাতেই তাদের দাম্পত্য জীবন শুরু করত, যদি না কর্নেল পিকারিং বিয়ের উপহার হিসেবে এলিজাকে পাঁচশো পাউন্ড দিতেন।
সেই অর্থই তাদের প্রথম জীবনের প্রধান ভরসা হয়ে ওঠে।
টাকাটা আশ্চর্যজনকভাবে অনেকদিন টিকে গিয়েছিল। কারণ ফ্রেডি টাকা খরচ করতে জানত না—জীবনে কখনও তার হাতে যথেষ্ট টাকা ছিলই না। আর এলিজা, যে দুজন বয়স্ক অবিবাহিত পুরুষের কাছে সামাজিক শিক্ষা পেয়েছিল, ফ্যাশনের পিছনে ছোটা বা অহেতুক বিলাসিতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিল। সে জামাকাপড় ততদিন পরত, যতদিন সেগুলো টেকসই আর দেখতে মোটামুটি সুন্দর থাকত—ফ্যাশন বহুদিন আগেই বদলে গেল কি না, সে নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথাই ছিল না।
কিন্তু পাঁচশো পাউন্ড দিয়ে তো সারাজীবন চলে না।
শেষ পর্যন্ত তাদের দুজনকেই বুঝতে হয়েছিল যে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেদেরই গড়ে নিতে হবে।
এলিজা চাইলে উইম্পল স্ট্রিটে থেকে যেতে পারত, কারণ সেটাই ধীরে ধীরে তার নিজের বাড়ি হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সে খুব ভালো করেই জানত, ফ্রেডিকে সেখানে রেখে দেওয়া উচিত হবে না। তাতে ফ্রেডির আত্মসম্মানও নষ্ট হতো, আর তাদের সম্পর্কও কখনও স্বাধীন ভিত্তির উপর দাঁড়াতে পারত না।
উইম্পল স্ট্রিটের সেই দুই অবিবাহিত ভদ্রলোক যে এ নিয়ে আপত্তি করেছিলেন, তা নয়। বরং এলিজা যখন তাদের সঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করল, তখন হিগিন্স পুরো বিষয়টাকেই অবাক করা রকমের হালকাভাবে নিলেন। ফ্রেডিকে সঙ্গে নিয়ে কোথায় থাকবে, কীভাবে সংসার গড়বে—এসব প্রশ্ন তাঁর কাছে এতটাই তুচ্ছ মনে হয়েছিল যেন এলিজা বাড়ির জন্য আরেকটা ছোটখাটো আসবাব কেনার অনুমতি চাইছে।
ফ্রেডির চরিত্র, আত্মসম্মান কিংবা নিজের জীবিকা অর্জনের নৈতিক প্রয়োজনীয়তা—এসব যুক্তিও হিগিন্সের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেল না। তিনি সরাসরি ঘোষণা করলেন যে ফ্রেডির আদৌ কোনো দৃঢ় চরিত্র নেই। বরং যদি তাকে জোর করে কোনো গুরুগম্ভীর পেশায় ঠেলে দেওয়া হয়, তবে তাতে সমাজেরই ক্ষতি হবে, আর ফ্রেডির নিজের জীবনে নেমে আসবে দুর্ভাগ্য। হিগিন্সের মতে, প্রকৃতি ফ্রেডিকে তৈরি করেছে হালকা, আনন্দময় জীবনের জন্য—এলিজাকে খুশি রাখার জন্য। তাঁর চোখে সেটাই ছিল অফিসে গিয়ে কাজ করার চেয়ে অনেক বেশি মানবিক ও সম্মানজনক কাজ।
এলিজা আবার ধ্বনিবিজ্ঞান শেখানোর নিজের পুরোনো পরিকল্পনার কথাও তুলেছিল। কিন্তু হিগিন্স সে বিষয়ে এতটুকুও নমনীয় হলেন না। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য ছিল—ধ্বনিবিজ্ঞানের মতো গুরুতর বিষয়ে দক্ষ হওয়ার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে এলিজার এখনও বহু বছর বাকি। তাঁর মতে, অন্তত দশ বছর না শিখে এ বিষয়ে শিক্ষকতা করার কথা ভাবাই অবাস্তব।
কর্নেল পিকারিংও যে এই মতের সঙ্গে একমত, তা এলিজা বুঝতে পেরেছিল। ফলে সে অনুভব করল, এই বিষয়ে তাদের বিরুদ্ধে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ হিগিন্সের কাছ থেকে যে জ্ঞান সে পেয়েছে, সেটাকে সে নিছক কোনো সাধারণ বিদ্যা বলে মনে করত না; বরং যেন হিগিন্সের ব্যক্তিগত সম্পত্তি—ঠিক তাঁর ঘড়ি বা বইয়ের মতো। এলিজা মোটেই এমন মানুষ ছিল না, যে অন্যের জিনিস নিজের বলে দাবি করতে পারে।
তার উপর, বিয়ের পরও—বরং আগের চেয়ে আরও গভীরভাবে—সে হিগিন্স ও কর্নেলের প্রতি এক অদ্ভুত স্নেহ ও আনুগত্য অনুভব করত। হয়তো সেটা ছিল অভ্যাস, হয়তো কৃতজ্ঞতা, হয়তো আরও জটিল কিছু।
শেষ পর্যন্ত সমস্যার সমাধান করলেন কর্নেল পিকারিংই। তিনি বিষয়টি নিয়ে অনেক ভেবেছিলেন। একদিন একটু সংকোচের সঙ্গে এলিজাকে জিজ্ঞেস করলেন, ফুলের দোকান খোলার স্বপ্নটা সে একেবারে ছেড়ে দিয়েছে কি না।
এলিজা বলল, একসময় সে ব্যাপারটা ভেবেছিল ঠিকই, কিন্তু পরে আর এগোয়নি। কারণ তার মনে ছিল, সেদিন মিসেস হিগিন্সের বাড়িতে কর্নেল নিজেই বলেছিলেন—ওটা বাস্তবসম্মত নয়।
পিকারিং একটু লজ্জিত হাসি দিয়ে স্বীকার করলেন, সেদিন তিনি এখনও সেই চমক আর উত্তেজনার প্রভাব থেকে পুরোপুরি বেরোতে পারেননি।
সেই সন্ধ্যাতেই তাঁরা দুজনে মিলে বিষয়টি হিগিন্সকে জানালেন।
হিগিন্সের প্রতিক্রিয়া ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু যথেষ্ট বিস্ফোরক। তাঁর মন্তব্যের সারমর্ম ছিল—ফ্রেডিকে দিয়ে দোকানের জন্য একেবারে আদর্শ “কাজের ছেলে” পাওয়া যাবে।
এই মন্তব্যে এলিজা এতটাই অপমানিত বোধ করেছিল যে, প্রায় বড়সড় ঝগড়া বেঁধে যাচ্ছিল।
এরপর ফ্রেডির মতামতও জানতে চাওয়া হলো। সে স্বীকার করল যে, সেও মাঝে মাঝে একটা ছোট দোকান খোলার কথা ভেবেছে। যদিও তার পকেটের হাল এমনই করুণ ছিল যে, কল্পনায় দোকানটা খুব সামান্যই জায়গা জুড়ে দাঁড়াত—একদিকে এলিজা ফুল বা তামাক বিক্রি করছে, আর অন্যদিকে সে খবরের কাগজ।
তবু এই সামান্য স্বপ্নের মধ্যেও তার এক গভীর আনন্দ ছিল। সে বলল, প্রতিদিন ভোরে এলিজার সঙ্গে কভেন্ট গার্ডেনে যাওয়া, সেই জায়গা থেকে ফুল কেনা যেখানে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল—এই ভাবনাটাই তার কাছে অপূর্ব সুখের। এই কথায় এলিজা এতটাই আবেগাপ্লুত হলো যে, সে ফ্রেডিকে একের পর এক চুমু খেতে লাগল।
ফ্রেডি আরও জানাল, সে এতদিন এমন প্রস্তাব দিতে সাহস পায়নি। কারণ ক্লারা নিশ্চয়ই ভীষণ আপত্তি করত। তার ধারণা ছিল, দোকানদারি করলে তাদের সামাজিক মর্যাদা নষ্ট হবে এবং ক্লারার ভবিষ্যৎ বিয়ের সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর তার মা, যিনি বহু বছর ধরে কষ্ট করে সমাজের এক বিশেষ স্তরে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন, তিনিও সহজে মেনে নিতেন না যে তাঁর ছেলে খুচরা ব্যবসা করবে।
কিন্তু ভাগ্য অদ্ভুতভাবে সেই সমস্যার সমাধান করে দিল।
ক্লারার জীবনে এমন এক পরিবর্তন এল, যা তার মা কখনও কল্পনাও করতে পারেননি। শিল্প-সাহিত্যপ্রিয় আধুনিক সমাজে মেলামেশা করতে গিয়ে ক্লারা আবিষ্কার করল—সেখানে গ্রহণযোগ্য হতে হলে অবশ্যই এইচ. জি. ওয়েলসের উপন্যাস পড়া এবং সেগুলো নিয়ে কথা বলার ক্ষমতা থাকা দরকার।
ফলে সে চারদিক থেকে বই ধার করতে শুরু করল। এমন উৎসাহ নিয়ে পড়ল যে মাত্র দুই মাসের মধ্যেই প্রায় সব বই শেষ করে ফেলল। আর সেই পড়াশোনার ফলেই তার মধ্যে শুরু হলো এক নতুন মানসিক রূপান্তর—যে ধরনের পরিবর্তন তখনকার আধুনিক সমাজে প্রায় এক নতুন সামাজিক ধর্মান্তরের মতো ছড়িয়ে পড়ছিল।
যদি কেউ আধুনিক যুগের “প্রেরিতদের কার্যবিবরণী” লিখতে বসত, তবে তা হয়তো পঞ্চাশটি বাইবেলের সমান দীর্ঘ হতো।
বেচারি ক্লারা! হিগিন্স আর তার মায়ের কাছে সে ছিল হাস্যকর, কিছুটা বিরক্তিকর এবং সামাজিকভাবে ব্যর্থ এক তরুণী। এমনকি নিজের মায়ের কাছেও সে যেন এক অদ্ভুত ধাঁধা—যে ঠিকমতো সমাজে নিজের জায়গা খুঁজে নিতে পারেনি।
কিন্তু ক্লারা নিজেকে কখনও এভাবে দেখেনি।
ওয়েস্ট কেনসিংটনের সমাজে তাকে হয়তো একটু ঠাট্টা করা হতো, একটু অনুকরণও করা হতো; কিন্তু তবুও সে ছিল সেই সমাজেরই একজন স্বাভাবিক সদস্য। তাকে অদ্ভুত বলা যেত, কিন্তু অগ্রহণযোগ্য নয়।
সবচেয়ে বেশি হলে লোকে তাকে “দ্য পুশার” বলে ডাকত—অর্থাৎ এমন একজন, যে সবসময় নিজেকে জোর করে সামনে ঠেলে দিতে চায়। কিন্তু তাদের কেউই, এমনকি ক্লারা নিজেও, মনে করত না যে সে ভুল পথে এগোচ্ছে।
তবু সে সুখী ছিল না।
ক্রমশ তার মধ্যে এক ধরনের হতাশা জন্ম নিচ্ছিল। কারণ সে বুঝতে শুরু করেছিল, তার একমাত্র গর্ব—তার মা একজন “ক্যারেজ লেডি”, অর্থাৎ গাড়িতে চড়ে চলাফেরা করা ভদ্রমহিলা—এই পরিচয়ের বাস্তব জীবনে কোনো মূল্য নেই।
বরং এই ভদ্রতার মুখোশই যেন তাকে জীবনের প্রকৃত সম্ভাবনা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল।


