ধ্রুপদী সাহিত্য
শ্যামলকৃষ্ণ বসু
৩
সংশয় তিমিরে
অতঃ রত্নাকর মনের মধ্যে একটি অদ্ভুত প্রশ্ন এবং একটি জ্বলন্ত সংশয় নিয়ে তীব্রবেগে গৃহে প্রবেশ করে এবং প্রাঙ্গনের এক অংশে এক বৃক্ষছায়াবৃত স্থানে একটি ছোট্ট খট্টিকা শয্যায় অলস শয়নে শায়িত বৃদ্ধ পিতাকে দেখে থমকে দাঁড়ায়। রত্নাকর ভাবেন কেন না প্রথমে গৃহের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য চলৎশক্তিহীণ পিতাকেই এমত প্রশ্ন করে একটা সদুত্তর পাওয়ার
প্রয়াস পাওয়া যায় ? তাই এক ভীষণ উদ্গত আবেগের সঙ্গে রত্নাকর প্রথমেই পিতাকে শুধায়, ‘ পিতা !’
রত্নাকরের বৃদ্ধ পিতা পুত্রের এমত ব্যগ্র সম্বোধন শুনে উঠে বসেন এবং জিজ্ঞাসা করেন,‘ কহো পুত্র, কি তোমার জিজ্ঞাস্য ?
‘মনুষ্য মারিয়া আমি আনি যত ধন ,
মম পাপভাগী তুমি হও কি একজন ?’ [কৃত্তিবাস ]
এ কি অদ্ভুত প্রশ্ন ? পুত্রের বচন শুনে স্বাভাবিক ভাবেই রত্নাকরের বৃদ্ধ পিতা অত্যন্ত কুপিত হয়ে ওঠেন এবং কম্পিত কলেবরে দুর্মদ পুত্রকে বলে ওঠেন, ‘ এ কি বচন শুনি পুত্র ? পুত্রের পাপভাগী ! কেন এ প্রশ্ন হঠাৎ ! হতচ্ছাড়া কুলাংগার ! বলি এমন কথা তোমায় বলেছেন কোন জন? কোন শাস্ত্রে লেখা আছে, কে বলেছে তোরে, কি পুত্রকৃত পাপ কি’না লাগিবে পিতারে? ওরে অজ্ঞান, ওরে মূর্খ, কি বলি যে কথা! কভু পিতা পুত্র হয়, পুত্র হয় পিতা ! পাষণ্ড, অনুভব করিতে পারো কি তা ? যখন বালক ছিলা পিতা ছিলাম আমি । এখন বালক আমি কিন্তু পিতা সমান তুমি ! যখন বালক ছিলে , না ছিল যৌবন , বহু যত্নে আমি তোমায় করেছি পালন।
যত করিয়াছি পাপ আমি এ সংসারে,
সে সবের পাপের ভাগ লাগে নাতো তোমারে ?
এবে পিতা হইয়াছ পুত্র তুল্য আমি !
যথাসাধ্য আমারে পুষিবে নিত্য তুমি !
মনুষ্য মারিতে তোমা বলে কোন জন ?
তোমার পাপের ভাগী হব কি কারন ?’ [কৃত্তিবাস ]
রত্নাকর মাথা হেঁট করে। এ কি সংশয় ! সন্ন্যাসী জিজ্ঞাসা করেছেন তোমার পাপের ভাগী হবে কোন জন ? পিতা বললেন তিনি পাপের ভাগীদার নহেন ! তাহলে কি জন্মদাত্রী জননীকে এ কথা জিজ্ঞাসা করা যায় ?
রত্নাকর তার জননীর কাছে গিয়ে সেই একই কথা জিজ্ঞাসা করে ,
‘ সত্য করি আমারে কহ তো জননী ,
আমার পাপের ভাগী হও কি আপনি ?’ [কৃত্তিবাস ]
জননী বলেন , ‘বাছা এ কেমন বাক্য তোমার ! তোমারে জন্ম দেওয়ার ঋণ কি শুধিতে পারো আমায় ? রত্নাকর , দশ মাস গর্ভে ধরি পুষেছি তোমায় । তোমা কৃত পাপ পুত্র না লাগে আমায় ।’
রত্নাকর যেন এক কুহকে পড়ে যায় । সন্ন্যাসী কে সে কি বলবে তবে ? পিতা নয় মাতা নয় । তবে কি পত্নী ?
রত্নাকর এইবার স্ত্রী’র কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে,‘ প্রিয়ে, তোমায় একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। তুমি আমার স্ত্রী। আমি দস্যুবৃত্তি করে এ সংসারে তোমাদের ভরণ পোষণ করি। এ কি আমার পাপ , না এ আমার পুণ্য ! তোমাদের মতামত কি ?’
রত্নাকরের স্ত্রী হঠাৎ এমন প্রশ্নে দ্বিধান্বিত বোধ করেন এবং জিজ্ঞাসা করেন, ‘ আজ হঠাৎ এই প্রশ্ন ? ‘
রত্নাকর বলে ওঠেন,‘একজন সন্ন্যাসী আজ আমার কাছে এমন একটি প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলেন ! তিনি আমার দস্যুবৃত্তির পাপপুন্যের হিসাব তুলে একটা মীমাংস্বার্থে আমাকে তোমাদের কাছে জিজ্ঞাসা করতে প্রেরন করেছেন।’
রত্নাকরের স্ত্রী বলে ওঠেন,‘ সংসারে তোমার কর্তব্য স্ত্রী-পুত্র প্রতিপালন করা। সুপথে অর্জিত অর্থেই মানুষের অহংকার। সে তুমি যে ভাবেই ক’র না কেন। তবে অসৎ উপায়ে অর্জিত অর্থ সকলেই ঘৃণা করে। অতএব দস্যুবৃত্তি করে মানুষের ধন বলপূর্বক আহরণ করে সংসারে স্ত্রী-পুত্রের পালনপোষণকে তুমি তোমার কর্তব্য বলে ভাবলে ও সংসারে তা অতীব নিন্দনীয়। আমি তোমার ধর্মপত্নী। আমি ও এই কারণে নিতান্ত দুঃখিত।’
দস্যু রত্নাকর বলে ওঠে, ‘ কিন্তু এই ভীষণ অনাবৃষ্টি কাল। কর্ষণহীন ভুমি। ফসলহীন জমি । কর্মহীন মানুষ ।’
রত্নাকরের স্ত্রী বলেন,‘ কিন্তু মানুষ তো ধর্মহীণ হওয়া অনুচিত ! সুপথে অর্জিত অর্থেই মানুষের অহংকার। তোমার দস্যুবৃত্তির পাপের ভাগ আমরা তো নিতে পারি না !’
আর যত পাপ পুন্য ভাগ লাগে মোরে ,
পোষণার্থে পাপ ভাগ না লাগে আমারে !
মনুষ্য মারিতে কে বা বলিল তোমায় ?
এই মাত্র জানি তুমি পালিবা আমায় ! [ কৃত্তিবাস ]
দস্যু রত্নাকর স্ত্রীর কথায় মনে মনে কোন যুক্তিই সাজাতে পারেনা। স্ত্রী যেখানে প্রত্যাখান করে দিয়েছেন সেখানে পুরুষের মনের আর কোন জোরই থাকে না।
দস্যু রত্নাকর এইবার তাঁর অন্যান্য পরিজন এবং পুত্র-কন্যাদের ও সেই একই কথাই জিজ্ঞাসা করে। সকলেই সেই একই কথাই রত্নাকরকে বলে ওঠে,‘না, তোমার পাপের ভাগ আমরা কেউই নিতে রাজি নই। তুমি সৎপথে অর্জন করে আমাদের প্রতিপালন করলে আমরা সুখী হতাম।’
রত্নাকর কেমন একরকম মুহ্যমান হয়ে পড়ে। পিতামাতা স্ত্রীপুত্র পরিজন সকলেই তাকে নিরাশ করে দেয় তার পৌরুষের, তাঁর কর্মের সততার।
রত্নাকরের মনে কোনদিনই এমন কথার উদয় ও হয়নি যে সংসারে এমন কোন কথা কোনদিন ও উদয় হতে পারে। অথবা রত্নাকরের মনে কোনদিন কোন সংশয় ও ঘটেনি, যে, সে পরিবার পরিজন পালনে কোন রকম অন্যায় কোন কর্ম করছে মনুষ্য হত্যা করে তাদের ধন লুট করে।
কিন্তু সংসার কোন অন্যায় কর্ম সমর্থন করে না। এ কেমন সংশয় ! এখন সে সন্ন্যাসী কে কি উত্তর দেবে !
দস্যু রত্নাকর এবার ভীষণ ভীষণ রকমে হতাশ হয়ে পড়ে। সংসারের সকলের এ হেন প্রত্যাখান সে মনে মনে মেনে নিতে পারে না। এই কঠিন অজন্মা অনাবৃষ্টিতে যাদের জন্য প্রাণপাত পরিশ্রম করে সে সংসারের সকলকে কিছুমাত্র ক্লেশ না দিয়ে তাদের ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারনে সহযোগিতা করে চলেছে, আজ অবশেষে এই কি তাঁর প্রতি তাঁহাদের সহমর্মিতার প্রতিদান! রত্নাকর মনে মনে ক্ষুণ্ণ হয়ে ওঠে।
রত্নাকরের মনে হতে থাকে হাতের লোহার মুদ্গর দিয়ে নিজের মাথায় নিজেই আঘাত করে মৃত্যুবরন করে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। রত্নাকর নিজের হাতের লোহার মুদ্গর দিয়ে নিজের মাথায় সজোরে আঘাত করে আর তৎক্ষণাৎ অচেতন হয়ে পড়ে।
দেবর্ষি নারদ অন্তর্যামী অপেক্ষা কম কিছু নন। তিনি তো আছেনই সকলের ত্রুটি সংশোধনের ব্রত নিয়ে। তিনি দস্যুকে পথিমধ্যে অনুসরন করে সব কিছুই অবগত হয়েছেন। এইবার তিনি রত্নাকরকে শুশ্রূষা করে সুস্থ করে তোলেন।
‘ওঠো রত্নাকর ! ‘ –
রত্নাকর অত্যন্ত দুঃখী মনে উঠে দাঁড়ায় মৌনী হয়ে সন্ন্যাসীর কাছে নত মস্তকে।
উঠিয়া মুনীর পুত্র ভাবিল অন্তরে ,
সেই মহাজন জদি মোরে কৃপা করে ! [কৃত্তিবাস ]
দেবর্ষি নারদ জিজ্ঞাসা করেন, ‘ রত্নাকর, তুমি এমন নীরব কেন ?’
রত্নাকর নতমস্তকে স্বীকার করে তার ভুল। তার মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ে এক বিরাট হতাশা।
দস্যু রত্নাকর দেবর্ষি নারদকে হাহাকার করে বলে ওঠে,‘ মুনিবর, আমি সত্যই পাপী। হে মহাত্মন এতদিন আমি দস্যুবৃত্তি করে মনুষ্যগণকে হত্যা করে মানুষের ধন জোরপূর্বক হরণ করে আমার সংসার প্রতিপালন করেছি। আজ দেখলাম সংসারে কেহই আমার পাপের ভাগ স্বীকার করতে রাজি নয়। আপনার কথাই ঠিক মুনিবর।’
নারদ বলেন,‘তাই হয় রত্নাকর। সংসারে পাপকর্ম মূর্তিমান অধর্ম। পরমজ্ঞান খুবই দুর্লভ। আজ তুমি অনুভব করলে যে সংসারে কেউ কারো নয়। কেহই তোমার পাপের ভাগীদার নয়। সৎপথে এবং ধর্মপথে মানুষ যা করে সেই কর্মই পরম সত্যপথ।’
রত্নাকর বলে,‘ কিন্তু মুনিবর এমন কথা আমাকে তো কেউ কোনদিন ও বলেনি যে আমি ভুল পথে চলেছি। আমি কোন অন্যায় কর্ম করেছি।’
দেবর্ষি বলে ওঠেন, ‘ রত্নাকর জানি একথা তোমাকে বলে বোঝাবার মত কোন সুহৃদ তোমার পাশে ছিল না। তুমি স্বইচ্ছায় এই গর্হিত কর্ম করনি। তুমি তোমার পরিজনের ভরনপোষণের নিমিত্ত এই দুষ্কর্ম করতে নিতান্ত বাধ্য হয়েছিলে। আজ তোমার জ্ঞানচক্ষু উন্মিলিত হয়েছে। আসলে এতদিন তুমি ভ্রান্তমতি অনন্যগতি হয়েছিলে। তুমি তোমার অতীতস্মৃতি বিস্মৃত হয়ে ছিলে। তুমি তো দস্যু নও রত্নাকর। তুমি ছিলে একজন ঋষি তনয়। একজন পবিত্র সত্তা। কিন্তু দৈবে তুমি ক্রূরকর্মে বিভ্রান্ত হয়েছিলে। এ ও সেই ঈশ্বরের লীলা।’
রত্নাকর এবার সখেদে বলে ওঠেন, ‘হে মহাত্মন আমাকে আপনি এমন কোন পথ দেখান, যে পথ পাপের পথ নয়। হে মহাত্মন আপনি আমাকে কৃপা করুন।’
মুনিবর নারদ বলেন, ‘রত্নাকর, তুমি অদ্য হতে কেন না সৎপথে অর্জন করে সংসার ধর্ম করো। তাতেই মঙ্গল । এই নাও এক্ষনে আমার কাছে যা কিছু আছে , যা তুমি বলপূর্বক হরন করতে চেয়েছিলে সেই সবই আমি তোমায় ভিক্ষা দিলাম। এই ভিক্ষাই হোক তোমার সততার অর্জন ! ‘
দস্যু রত্নাকর অধোমুখে অশ্রু বিসর্জন করতে করতে বলে ওঠেন, ‘ মুনীবর আমি পাপী। আমি মহাপাপী। আমি লোভী। আমি জোরপূর্বক মানুষের সম্পদ লুন্ঠন করেছিলাম। জানিনা আমি কোন মোহ অন্ধকারে এমন দুষ্কর্ম করেছিলাম যে আজ আমার মনে ভীষণ এক অনুশোচনা হচ্ছে। আপনি আমাকে দয়া করুন । ‘
দেবর্ষি নারদ রত্নাকরের হাত ধরে স্বান্তনা দেন। রত্নাকরের দুঃখিত অন্তর কিঞ্চিৎ স্বান্তনা লাভ করে।
৪
মহা মৃত্যুঞ্জয়মন্ত্র
দেবর্ষি নারদ বলেন, ‘রত্নাকর, ওঠো, মুখ তোলো। ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। সংসারে তোমার এখনো অনেক অনেক কর্ম বাকী। তুমি যে কর্ম করতে এই পৃথিবীতে এসেছো তা তোমাকে সমাধা করতে হবে।’
দস্যু রত্নাকর বলেন, ‘হে মুনিবর আমি আর কিছুই চাই না। এখন এই সংসারের প্রতি আমার এক বিষম বিতৃষ্ণা জন্ম নিয়েছে। আমি এখন এই সংসার হতে মুক্তি চাই। আপনার কথায় আমার নতুন দৃষ্টি লাভ হয়েছে। আপনার কাছে প্রার্থনা করি আপনি আমাকে আমার উপযুক্ত পরমস্বান্তনা প্রদান করুন। আমি আজ এই মুহূর্ত হতে সংসার ত্যাগ করলাম।’
দেবর্ষি নারদ বলেন, ‘রত্নাকর, ভেবে দেখো, তুমি তোমার স্ত্রী পুত্র পরিবার, তোমার পিতা-মাতা, সবাইকে তুমি ত্যাগ করতে উতলা হয়ে উঠেছ। সে কি উচিত হতে পারে ?’
দস্যু রত্নাকর বলেন, ’মুনিবর, আমি আজ এক্ষনি এই মুহূর্তেই সংসার ত্যাগ উচিত বলে মনে করি। আমি আমার পরিবার পরিজন সবাইকেই আজ হতেই পরিত্যাগ করলাম। এই সংসারের আমি কেউ না। জগৎ সংসারে আমি এখন একজন সম্পূর্ণ একা।’
দেবর্ষি নারদ বললেন,‘রত্নাকর,কিন্তু তোমার পরিবারের তাঁরা সকলেই যে তোমার ওপরে নির্ভরশীল। তাঁরা তো তোমার কাছে কোন দোষ করেননি ? তাঁরা এখন তাদের জীবন নির্বাহের জন্য কার ওপরে নির্ভর করবে ভেবে দেখেছ ? ‘
রত্নাকর দস্যু বলে,‘সংসারে যাদের জন্য আমি এত করলাম, তাহারা যখন আমার পুণ্য ছাড়া পাপ গ্রহনে অসন্মত হলেন, আমি তবে তাদের কাছে মৃত। হে মহাত্মন, জিভ দিয়েছেন যিনি, আহার দিবেন তিনি। আমি তো নিমিত্তমাত্র। আমি এখন আমার পথে চলতে ইচ্ছা করি। আপনি বরং আমাকে আপনার সঙ্গে নিয়ে চলুন। আমি আপনার সাথে ভিক্ষা করে জীবন ধারন করব,সে ও পরম শ্রেয়!
দেবর্ষি নারদ বলেন,‘ রত্নাকর, শোনো। তোমার মনের এই শোক, এ তো এত সহজে নষ্ট হবার নয়। আমি তোমায় শান্তির পথ দেখাতে পারি। কিন্তু জেনো সে পথ ভীষণ ভীষণ কঠিন।
রত্নাকর যেন মনের শান্তির জন্য একটা কোন উপায় অবলম্বন করতে আগ্রহী হয়ে পড়ে। তাই আগ্রহান্বিতভাবে জিজ্ঞাসা করে,‘হে মুনিবর কি সেই পথ, আপনি আমাকে বলুন? সেই পথ যত কঠিনই হোক আমি সেই পথই অবলম্বন করব। আমি আমার এই পাপের জীবনকে ভুলতে চাই। আমি নিজের এই ক্লেদাক্তময় মলিন স্বরূপকে সম্পূর্ণরূপে ভুলে যেতে চাই।’
আপনি করিয়া কৃপা দিন দিব্যজ্ঞান ।
এ সকল পাপে কি সে হব পরিত্রান ! [ কৃত্তিবাস ]
দেবর্ষি নারদ বললেন,‘ রত্নাকর আমি তবে তোমায় পরম করুনাময় ঈশ্বরের অমৃতনাম আরাধনা করতে বলব। সে নাম হ’ল রাম নাম।’
রত্নাকর বুঝে উঠতে পারে না কে রাম ! সন্ন্যাসীর কথা সে কিছুমাত্র অনুধাবন করতে পারেন। সে তাঁর বিকল মনের ব্যাথা হেতু অবশ হয়ে মুনিবরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
দেবর্ষি আবার বলেন,‘রত্নাকর, ওঠো! ওই যে পূতসলিলা গোদাবরী নদী বহমানা। যাও তুমি সেথা হতে স্নান সেরে এসো। আমি তোমাকে তোমার মানসিক দুঃখ উপশমের জন্য এক মহামৃতুঞ্জয় মন্ত্র দিতে ইচ্ছা করি।’
রত্নাকর বলেন,‘ না মুনিবর,আমি এখানে আর এক মুহূর্ত ও থাকতে ইচ্ছা করি না। আপনি আমাকে এই স্থান হতে অন্য কোথাও অন্য কোন খানে নিয়ে চলুন আপনার সঙ্গে। মুনিবর আপনি যা বলবেন আমি সেই কর্মই সম্পন্ন করতে ইচ্ছা করি।’
দেবর্ষি নারদ বলেন,‘ রত্নাকর, আমি তোমায় এক নুতন মার্গের সন্ধান দিতে পারি।’
রত্নাকর তাঁর বিষাদ মলিন মনে দেবর্ষির দিকে তাকিয়ে থাকে। দেবর্ষি বলতে থাকেন, ‘তুমি শান্তি চাও, আমি তোমাকে শান্তির সন্ধান দেবো। তুমি এইবার একজন সম্পূর্ণ নুতন মানুষ হয়ে উঠবে। রত্নাকর আমার কথা রাখো। যাও, এই মুহূর্তে তুমি ওই পুন্যসলিলা গোদাবরী নদীতে স্নান সেরে এসে বসো আমার সামনে এই মাটির ঢিপির ওপরে এই বেদীর আসনে।’
রত্নাকর এইবার দেবর্ষির আদেশ অনুসারে পায়ে পায়ে এগিয়ে যেতে থাকে অদূরে বহমানা গোদাবরী নদীর দিকে। গোদাবরীর পুন্য সলিলে ডুব দিয়ে যদি মনঃকষ্ট কিছু মাত্র দূর হয় !
দেবর্ষি তাকিয়ে থাকেন দস্যু রত্নাকরের দিকে। দীর্ঘ ঋজু শক্তসমর্থ সমুন্নত চেহারা তাঁর। দেশকালের আকালের প্রভাবে এবং তামসিক পাপাচারে গাত্রবর্ণ এক্ষনে ঘোর তাম্রবর্ণ ধারন করে আছে। দস্যুর মাথায় অযত্ন মন্ডিত লম্বা ঝাঁকড়া চুল। দৃশ্যত রত্নাকর এক দুরন্ত ঝড়ে ভূপতিত এক বটবৃক্ষ সমান। এই মানুষকে জাগিয়ে তুলতে হলে তাঁকে দীক্ষিত করতে হবে এক দৈবীমন্ত্রে যাতে সে তাঁর দস্যুস্বভাব হতে দেবস্বভাব সম্পন্ন এক উন্নত মানবে উন্নীত হয়ে উঠতে পারে।
দেবর্ষি নারদ এবার এই অবসরে কিছু সুগন্ধি পুস্প, কিছু সুমিষ্ট ফল সংগ্রহ করে একটি কদলী পত্রের উপরে রাখেন। অতঃ একটি চন্দন কাষ্ঠকে একটি প্রস্তর খণ্ডের উপর ঘষে ঘষে কিছু সুগন্ধি চন্দন প্রস্তুত করে নেন।
রত্নাকর তাঁর মনের যত মলিনতা, মনের বৈকল্য এবং বিমূঢ়তা, স্বজন বিয়োগের যত দুঃখ, আজ গোদাবরীর পুন্যস্নানে সেই সব ক্লেদ মন থেকে দূরীভূত করে তীরে উঠে দাঁড়ায়। এরপর রত্নাকর গাত্র মার্জনা করে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে সেই স্থানে যেখানে দেবর্ষি তার পথ চেয়ে অপেক্ষমাণ হয়ে রয়েছেন। রত্নাকর এবার দেবর্ষির কাছে হাত জোড় করে এসে দাঁড়ায়।
দেবর্ষি নারদ এক্ষণে একটি শুষ্কবস্ত্র প্রদান করে রত্নাকরকে পরিধান করতে বলেন এবং মাথার অসংযত কেশরাশিকে মাথায় চূড়া করে নিতে বলেন। রত্নাকর সেই আদেশ পালন করেন। তৎপরে দেবর্ষি নারদ রত্নাকরকে সেই মাটির বেদীর ওপরে উঠে বসতে বলেন।
রত্নাকর এবার দেবর্ষি নারদের কথামত জোড় আসন হয়ে সেই মাটির ঢিপির ওপরে উঠে বসে। মুনিবর এবার রত্নাকরকে তাঁর সমুন্নত ললাটে, নাসাগ্রে, দুই সুদৃঢ় বাহুমূলে, গলদেশে তৎপরে তাঁর স্ফীত বক্ষদেশে চন্দন তিলক দিয়ে সাজিয়ে দেন। তৎপশ্চাত সুগন্ধি পুষ্প চন্দনে ডুবিয়ে রত্নাকরের সারা শরীরে মুদ্রিত করে দেন। তৎপরে সেই আত্মমগ্ন মানবের শরীরের বিভিন্ন স্থানে লিখে দেন পরম আরাধ্য রাম নাম। অতঃ দেবর্ষি নারদ এইবার দস্যু রত্নাকরের দুই হাতে কিছু ফুল দূর্বা তিল হরিতকী প্রদান করে স্নিগ্ধ স্বরে বলে ওঠেন, ‘রত্নাকর এখন তুমি জোড় হস্তে চক্ষুমুদিত করে তোমার প্রিয় ঈশ্বরের ধ্যান কর।’
রত্নাকর এক প্রকার বোধশুন্য হয়ে তাকিয়ে থাকেন দেবর্ষির দিকে। কে ঈশ্বর! কোন ঈশ্বর ! কি তাঁর স্বরূপ ! সে যেন তা অনুধাবন করে উঠতে পারে না। দেবর্ষি নারদ বুঝতে পারেন রত্নাকরের এই ভ্রম তাঁর এত দিনের পাপাচারের বিকার। সে তাই ঈশ্বর বোধশুন্য।
দেবর্ষি তাই সস্নেহে আদেশ করেন,‘রত্নাকর, আমার কথা শোন। তুমি চোখ বুজে ভাবার চেষ্টা কর। মনে কর স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্র তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। এই যেমন আমি তোমার চোখের সামনে দৃশ্যমান !
রত্নাকর এখন একজন মোহমুগ্ধ মানুষ। দস্যু রত্নাকরের এই মুহূর্তে যেন এক সংযত ব্রহ্মচারি সদৃশ রূপ । দেবর্ষির কথায় সে এইবার চক্ষু বুজে ধ্যানস্থ হবার চেস্টা করে।
দেবর্ষি নারদ বলেন,‘রত্নাকর এখন হতে রামই তোমার আরাধ্য দেবতা। সেই পরমপুরুষের ধ্যান করো। এই তর্জনীর গোড়ায় তোমার বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ স্থাপন কর, হ্যাঁ এইভাবে।
নারদের কথায় রত্নাকর সেইভাবেই তার বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠকে তর্জনীর গোড়ায় স্থাপন করে নেয় ।
দেবর্ষি নারদ বলেন,‘বেশ। এইবার আমার সাথে মুখে মুখে বল ‘রাম রাম রাম’ । ঈশ্বর তোমার পাপ মুছে দেবেন।’
কিন্তু পাপীমন দস্যু রত্নাকর ঈশ্বরের নাম নিতে পারে না। তার জিহ্বা জড়িয়ে যায়। রত্নাকর ‘রাম রাম’ উচ্চারন করতে পারে না। তার উচ্চারনে হয়ে যায় ‘ড়াম ‘ ‘ ড়াম’ ‘ড়াম’ । জিহ্বায় পাপজনিত জড়তা ।
দেবর্ষি বুঝতে পারেন রত্নাকরের গত্যন্তর নেই। রত্নাকরের পাপ জিহ্বা পবিত্র রাম নাম উচ্চারন করতে পারবে না।
অতঃপর তিনি কিছু চিন্তা করে অদুরে একটি শুষ্ক কাষ্ঠখন্ড দেখিয়ে রত্নাকরকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ রত্নাকর ওটা কি দেখতে পাচ্ছো ?’
রত্নাকর বলে, ‘মরা কাঠ।‘
দেবর্ষি অনুমানে বুঝতে পারেন দস্যুরত্নাকর ‘মরা’ ‘মরা’ ভিন্ন আর কিছুই বলতে পারবে না। বেশ, তবে এমন ‘মরা‘ ‘মরা’ বলতে বলতেই জিহ্বা ‘রাম’ ‘রাম’ ময় হয়ে উঠবে।
দেবর্ষি নারদ এইবার দস্যু রত্নাকরকে বলেন, ‘রত্নাকর তুমি এই ‘মরা’ ‘মরা’ দ্বিঅক্ষর জপ করো। কঠিন এ সাধনা। এই সাধনায় তুমি সিদ্ধিলাভ করলে ঈশ্বর তোমার পাপ হরন করবেন। তোমার সব পাপ ধুয়ে যাবে। তুমি এক পুন্যাত্মা মানুষ হয়ে উঠবে। তুমি এই স্থানে বসে বসে একমনে এই বীজ মন্ত্র ‘মরা’ ‘ মরা’ ‘ মরা’ জপ করবে। আমি এক বছর পরে এখানে এই গহন বনপ্রদেশে এসে তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করব। তুমি এখন মন্ত্র আদিষ্ট হয়ে এই নাম জপ করতে থাক। এখন আমি বিদায় নিচ্ছি।’
রত্নাকর যেন এখন মন্ত্র বিহ্বল। সে এখন নির্মোহ নিশ্চল স্থাণুবৎ বসে আছে মাটির বেদীর ওপরে। সদ্য পাওয়া বীজমন্ত্র যেন তাঁর ভুল না হয়ে যায়। রত্নাকর তাই শুধুমাত্র দুই হাত জোড় করে দেবর্ষি নারদকে প্রনাম জানিয়ে সেই মাটির বেদীতে বসে বসে আপন মনে জপ করতে শুরু করেন ‘মরা’ ‘মরা’ ‘মরা’। মরা মরা মরা । মরা মরা মরা।’
দেবর্ষি নারদ এইবার তাঁর দক্ষিনহস্ত আশীর্বাদের ভঙ্গীতে মেলে ধরেন রত্নাকরের দিকে। দ্বিঅক্ষর বীজমন্ত্রর গুনে আত্মস্থ রত্নাকরকে ধীরে ধীরে ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়তে দেখে দেবর্ষি নারদ এইবার আকাশ মার্গে হরি গুণগান করতে করতে বিদায় নিলেন।
দস্যু রত্নাকর দেবর্ষির কথামত মনে মনে ওই একই শব্দ জপ করতে করতে এবার এক গভীর প্রশান্তি নিয়ে ধ্যানস্থ হয়ে পড়েন। সংসারে যে আঘাত পায়, যাকে সবাই অবজ্ঞা করে, সে তো বাস্তবিকই আর জীবিত কোন সত্ত্বা থাকে না। সে যে একজন জড় ও মৃত মাত্র। তাই ওই ‘ মরা মরা ‘ জপ করতে করতে বিচলিত সত্তা রত্নাকর একদিন ওই গাছের নিচেই গভীর ভাবে ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়লেন।
রামনাম মন্ত্র পেয়ে দস্যু রত্নাকর ,
সেই নাম জপে ষাটি সহস্র বৎসর ।।
এক নাম জপে একস্থানে একাসনে ,
সর্বাঙ্গ খাইল বল্মীকের কীটগনে ।।
মাংস খাইয়া পিন্ড করিল সোসর ।
হইল কন্টক কুশ তাহার উপর ।।
খাইল সকল মাংস অস্থি মাত্র থাকে ,
বল্মীকের মধ্যে মুনী রাম নাম ডাকে ।। [কৃত্তিবাস ]
দিনে দিনে কালে কালে সেই ধ্যানবেদীর চারপাশে কত কত সুগন্ধিত পুষ্পরাজী ছেয়ে ফেলে। ধ্যানমগ্ন সেই প্রাণময় সত্তা হতে এক গম্ভীর ‘ওম’ ধ্বনি চারিদিকে গুঞ্জরিত হতে থাকে। ভ্রমরের গুঞ্জনে,বায়ুর কলস্বনে সেই নির্জন বনভূমি বাঙময় হয়ে ওঠে। অলিকুল এমন গভীর জঙ্গল প্রদেশে মধু আহরনে ব্যস্তসমস্তভাবে ছোটাছুটি করে চলেছে। তাদের গুন গুন ধ্বনিতে সেই নির্জন বনভূমি এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে উঠেছে।
[ চলবে ]



