১৭ : অনুবাদের বাদ বিসংবাদ ও সংবেদনা

১৭ : অনুবাদের বাদ বিসংবাদ ও সংবেদনা

অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা - তৃষ্ণা বসাক

১ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা

২ : অনুবাদের অপযশ

৩ : অনুবাদ- ও  সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতা

৪ : শাসকের ভাষা, শাসিতের ভাষা এবং অনুবাদকের অবস্থান

৫ : অনুবাদকের সংকট

৬ : সংস্কৃতির অনুবাদ

 ৭ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা

৮ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা

৯ : অনুবাদের স্বর্ণযুগ : মধ্যযুগ  

১০ : অনুবাদকের কথা

১১ : অনুবাদের বাদ বিসংবাদ ও সংবেদনা

১২ : লেখক ও অনুবাদকের আন্তঃসম্পর্ক- অনুবাদক যখন নারী

১৩ : অনুবাদের বাদ বিসংবাদ ও সংবেদনা

১৪ : অনুবাদ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

১৫ : অনুবাদের বাদ বিসংবাদ ও সংবেদনা

১৬ : অনুবাদের বাদ বিসংবাদ ও সংবেদনা

১৭ : অনুবাদের বাদ বিসংবাদ ও সংবেদনা

অনুবাদকের কথা

ছয় বছরের এক ডানপিটে মেয়েকে বই পড়ানোর জন্য মা একদিন বলেছিলেন—ভালো বাচ্চা হয়ে থাকলে বই উপহার দেবেন। সেই বইয়ের নেশাই একদিন তাকে পৌঁছে দিল তলস্তয়, অরবিন্দ, ভারতীয় নানা ভাষার সাহিত্য এবং শেষ পর্যন্ত অনুবাদের বিস্তীর্ণ জগতে।

কিন্তু অনুবাদক হয়ে ওঠার পথটি কি আদৌ সহজ ছিল?

কেন বাবা চেয়েছিলেন তিনি বহু ভাষা শিখুন, কিন্তু অনুবাদক হয়ে উঠুন – তা চাননি? কীভাবে মণিপুরী নাচ থেকে তাঁর অনুবাদের প্রথম পাঠ? রামকুমার মুখোপাধ্যায় ও অরিজিৎ কুমারের উৎসাহ কীভাবে তাঁকে টেনে আনল অনুবাদের জগতে?

‘অনুবাদ পত্রিকা’র সম্পাদক হিসাবে তাঁর কাছে লেখক নির্বাচনের মাপকাঠি কী? বাজারের চাহিদা, নাকি ভালো সাহিত্য?

“অনুবাদকের নাম প্রচ্ছদে থাকবেই” – এই দাবি কেন তাঁর কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ? অনুবাদকদের সম্মান, পারিশ্রমিক এবং প্রকাশনা জগতে তাঁদের অবস্থান নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতাই বা কী?

আক্ষরিক অনুবাদ না অনুসৃজন – তিনি কোন মধ্যবর্তী পথ বেছে নিয়েছেন? কেন মনে করেন, অনুবাদ ছাড়া বহুভাষিক ভারতকে বোঝাই সম্ভব নয়?

আর তরুণ অনুবাদকদের জন্য তাঁর স্পষ্ট বার্তা—
অনুবাদ একটি-দুটি বইয়ের কাজ নয়; এটি এক নিরন্তর যাত্রা।

শৈশবের বই-পড়া থেকে অনুবাদ পত্রিকার দীর্ঘ পথচলা, সাফল্য-ব্যর্থতা, অসম্মান ও পাঠকের ভালোবাসা—সব মিলিয়ে এই দীর্ঘ আলাপ যেন একজন অনুবাদকের ব্যক্তিগত জীবনকথার পাশাপাশি ভারতীয় সাহিত্যের বহুভাষিক মানচিত্রেরও এক অন্তরঙ্গ পাঠ।

পড়ুন ‘অনুবাদকের কথা’, পর্ব ১৭ – তৃষ্ণা বসাকের প্রশ্নে বিতস্তা ঘোষালের অনুবাদ-জীবনের নানা অজানা অধ্যায়।

তৃষ্ণা বসাক– প্রথমেই জানতে চাইব তোমার শৈশব, পরিবার, স্কুল, বেড়ে ওঠার পরিবেশ  আর তোমার অনুবাদক হবার পেছনে কে বা কোন কোন ঘটনার প্রেরণা রয়েছে।

বিতস্তা–  আমার শৈশব আর পাঁচটা বাচ্চার মতোই ছিল।তবে খুব ছোটো থেকে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল।তার পিছনের গল্পটা হল, আমি এবং আমার মেজোবোনের ওপর দায়িত্ব ছিল ছোটো বোনকে সামলানোর।এই সময় আমার বয়স ছয়, মেজর সাড়ে চার আর ছোটোটির দুই। আর মা বি এড পড়তে যেতেন আমাদের বাড়িতে রেখে।যদিও একজন পিসি ছিলেন আমাদের দেখভাল করার জন্য, কিন্তু দুই বোনই আমার কাছেই থাকতে পছন্দ করত।এদিকে আমি মনে করতাম বড়ো দিদি মাতৃসমান। আবার অন্য দিকে আমার মতো ডানপিটে বাচ্চা একটাও ছিল না পাড়ায়।এই অবস্থায় মা একটা বুদ্ধি বের করলেন। রোজ বলতে লাগলেন, আমি যদি ভালো বাচ্চা হয়ে থাকি একটা বই উপহার দেবেন। তাতে আমার লাভ হল বই করার নেশায় ধরল।তো এবার আমাকে এত বই পড়তে দেখে বাবা আমি ক্লাস ফোরে পড়ার সময় নিয়ে এলেন তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ আর অরবিন্দর ‘সাবিত্রী।’এখন আমাদের সময় ছিল সেই ঐতিহাসিক সময় যখন ক্লাস ফোর পর্যন্ত ইংরেজি তুলে দেওয়া হয়েছিল।থাকলেও নিশ্চিত এই দুটি বই পড়ার ক্ষমতা হত না। বাবা যখন বুঝতে পারলেন আমি বই দুটি হাতই দিচ্ছি না, তখন বললেন তাহলে এক প্যারা করে পড়ে বাংলায় মানে লেখ। তখন আমার ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচির অবস্থা।যাহোক পড়তে না পারার শাস্তি হল অনুবাদ পত্রিকা ও ভাষা সংসদের যাবতীয় সেমিনার ওয়ার্কশপে অংশ নিতেই হবে।সেইসব আলোচনা শুনে ও দেখে সত্যি বলতে কী অনুবাদ নিয়ে আমার মনে ভালো লাগার বদলে ভীতিই জন্মালো।আমার সে অর্থে অনুবাদের সূচনা হল মণিপুরী নাচ শিখতে গিয়ে।সেখানে নাচের গভীর ভাব ফুটিয়ে তোলার জন্য বৈষ্ণব পদাবলী ও মণিপুরী বেশ কিছু শ্লোক অনুবাদ করতে হত। এরপর ক্লাস নাইনে প্রার সময় হিন্দি শেখার শুরু হল। ভাষা সংসদ থেকে তখন ভারতীয় ভাষা চর্চার একটা ক্লাস হত।যেগুলোর সার্টিফিকেট দেওয়া হত। ফলে হিন্দি ও অসমীয়া শিখলাম। এর পর এম এ পাশ করে লাইব্রেরি সায়েন্স পড়ার ফাঁকে রবীন্দ্রভারতীতে ভর্তি হয়ে হিন্দিতে অনেকটাই লিখতে পড়তে শিখলাম।আমার শিক্ষক হিসাবে পেলাম শ্রদ্ধেয় অনুবাদক ননী শূর জেঠুকে।ধীরে ধীরে অনুবাদ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হলাম।মূলত তখন থেকেই একটু আধটু অনুবাদের সূচনা।তবে বৃহৎ অর্থে অনুবাদ বলতে যা বোঝায় আমি তা করিনি।খুব সামান্যই অনুবাদ করেছি।   বাবা বারবার ভাষা শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছিলেন, চেয়েছিলেন অনেকগুলো ভাষা শিখি এবং বিশ্ব সাহিত্যর সঙ্গে আমার যোগসূত্র তৈরী হোক। কিন্তু অনুবাদক বিতস্তা -এটা তিনি প্রথম থেকেই চান নি।কারণ তিনি কখনোই চান নি আমার সাহিত্যিক সত্তার তুলনায় অনুবাদক বা সম্পাদক সত্তা বেশী হোক। সেক্ষেত্রে মায়ের উৎসাহ পেয়েছি।            

তৃষ্ণা বসাক– আমার পরের প্রশ্ন এই যে পরিবার ছাড়া কে বা কারা তোমাকে অনুবাদ করতে সবচেয়ে উৎসাহ দিয়েছেন?  তুমি কোন একটি নির্দিষ্ট ভাষা নয়, অনেকগুলি ভাষা থেকে অনুবাদ করো। হিন্দি এবং ইংরেজি ছাড়া কোন মূল ভাষা থেকে কি করেছ অনুবাদ? ভারতীয় লেখকদের মধ্যে  তোমার সবচেয়ে প্রিয় সাহিত্যিক কে এবং কেন তিনি প্রিয়?  এখনো পর্যন্ত কাদের কাদের লেখা অনুবাদ করেছ?

বিতস্তা– আমি মূলত মা বাদে সাহিত্যিক রামকুমার মুখোপাধ্যায় ও প্যাপিরাসের কর্ণধার অরিজিত কুমার উৎসাহ ও পরামর্শেই অনুবাদ করতে শুরু করেছিলাম। যখন অনুবাদ পত্রিকার দপ্তরে অল্প বিস্তর যাতায়াত করছি এবং বিজ্ঞাপনের জন্য কাজ করছি তখন এই দুজন বলেছিলেন, ‘অনুবাদ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত, ঘোষাল বাবুর মেয়ে তুমি, তুমি অনুবাদ না করলে হয়!’তাঁরাই পরামর্শ দিয়েছিলেন কর্তার সিং দুগগাল ও কমলা দাস করার বিষয়ে।সেটাই করেছি।এর বাইরে ভালোবাসা থেকে টুকটাক ইসমত, অমৃতা, তেলুগু কবি এন গোপীর বৃহত্তম কাব্য গ্রন্থ জল গীতের অনুবাদ… তবে সংখ্যাটা বড়োই কম।

অসমীয়া থেকে কিছু করেছিলাম প্রথম দিকে। আর আগেই বলেছি মণিপুরী থেকে কিছু গানের অনুবাদ।বার বার ওডিশায় যাওয়ার সূত্রে কিছুটা ওডিয়া এখন মন দিয়ে পড়লে বুঝতে পারি।তবে ওই দু একটা কবিতাই অনুবাদ করেছি। ভারতীয় ভাষায় প্রিয় লেখক লেখিকার সংখ্যায় অনেকেই আছেন। যেমন প্রথম চারজন যাঁদের অনুবাদ করেছি।এছাড়াও বি এম জাহারা, অজিত কৌর, বামা, সুকীর্থারানি, প্রতিভা রায়, তালিকাটা অনেক, যত পড়ছি তা দীর্ঘ হচ্ছে।যেমন তোমার অনুবাদে শিবা ই কে পড়ে মুগ্ধ। ঠিক তেমনি ঊর্মিলা শিরিস, বানু মুস্তাক, অলকা সরাওগি, রুমি লস্কর বোরা এদের লেখাও ভালো লাগছে।আসলে আমি এখন আমাদের সমবয়সীদের লেখা পড়তে চাইছি। তাঁরা কীভাবে দেখছেন জগতটাকে সেটা জানা জরুরি আমাদের জন্যও। আমি সেইসব সাহিত্য পড়তে চাই যেগুলো একটা দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে, কিন্তু তার ব্যপ্তি বিশ্ব জুড়ে।   

তৃষ্ণা বসাক– এই যে এত অনুবাদ করেছ, এর পেছনে কি কোন বিশেষ পরিকল্পনা কাজ করেছে? মানে বলতে চাইছি, কেউ ঠিক করতে পারেন আমি শুধু নারীদের সাহিত্য অনুবাদ করব, বা দলিত সাহিত্য অনুবাদ করব, কারণ শুনতে পাই এর জন্য প্রকাশক পাওয়া একটু সহজ। তো তুমি কি বাজারে চলবে এমন কোন বিষয় বা লেখক অনুবাদের জন্যে এযাবত বেছেছ? নাকি সেসব না ভেবে তোমার বিচারে যাঁরা মহান লেখক, তাঁদের লেখাই নির্বাচন করেছ, যাঁদের অনুবাদ বাঙালি পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া উচিত মনে হয়েছে? মোট কথা জানতে চাইছি, তোমার লেখক নির্বাচনের মাপকাঠি কী?

বিতস্তা– না, আমি এসব ভেবে অনুবাদ করিনি।যখন শুরু করেছিলাম তখন যাঁদের নাম জেনেছিলাম রামকুমারবাবু ও অরিজিৎবাবুর থেকে সেই দুজনেরই করেছি।বরং অনুবাদ পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে চেষ্টা করেছি সামগ্রিকভাবে ভারতীয় সাহিত্যকে তুলে ধরতে। আর প্রকাশক হিসাবে যে ভাষারই যে ধর্মেরই হোক না কেন, যাদের লেখা ভালো লেগেছে, মনে হয়েছে পাঠকের ভালো লাগবে সেগুলো প্রকাশ করেছি।একজন প্রকাশকের বা সম্পাদকের কাজ হল যে ভাষাতেই হোক না কেন ভালো গল্প উপন্যাস কবিতা প্রবন্ধ নাটক পাঠককে পড়ানো।অনুবাদের পাঠক কম।তাই আমি যা বাজারে চলছে বলে চালাতে চাইব- বললে পাঠকের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়।আমার দায়িত্ব সবরকম লেখা পাঠকের কাছে তুলে ধরা।এবার পাঠক ঠিক করবেন, তিনি নারীদের না দলিতদের নাকি মেন স্ট্রিম লেখা পড়বেন। আমার ব্যক্তিগত ভাবে যেটা পড়তে গিয়ে মনে হবে আরিব্বাস এটা সহজেই পড়া যাচ্ছে অথচ তার ভেতরের অর্থ গভীর, যা সমাজ, অর্থনীতি, রাষ্ট্র, সম্পর্ক, ভালোবাসা,শান্তি এসবের একটা খোঁজ দিচ্ছে আমি সেটাই পড়তে, অনুবাদ করতে বা প্রকাশ করব।   

তৃষ্ণা বসাক– নারী লেখকের লেখা অনুবাদ করতে কি তুমি বেশি পছন্দ করো? কেন?

বিতস্তা– না, এমন কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।তবে এটা ঠিক দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ করেছি মেয়েদের লেখা নিয়ে মানুষের উৎসাহ কম। যেন নারীদের লেখা মানেই নরম মনের কিছু শব্দ।আমি সেটাকে ভাঙতে চেয়েছি বরাবর। সে আমার নিজের লেখাতেও আবার অনুবাদেও।কমলা দাস পড়ে কি মনে হয় না তা আমারও কাহিনি, আবার আমি যখন ঊর্মিলা বা বাল্মীকি আশ্রমে সীতা এবং তারপর…, সুশীলা সুন্দরী লিখছি তাতেও এই একাত্মীকরণটাই গুরুত্ব দিয়েছি।বাঙালি পাঠক ভারতীয় লেখক লেখিকা বলতে বোঝেন ইসমত,অমৃতা, মন্টো, কিষান চন্দর, মুন্সী প্রেমচাঁদ, কমলা দাস…এরকম কিছু নাম।কিন্তু এর বাইরেও যে একটা বড়ো অংশ আমরা জানিনা, এবং তাতে নারী লেখিকারা অনেকটা অংশ জুড়েই আছেন-সেটা জানানো ও পড়ানো দুটোই দরকার।        

তৃষ্ণা বসাক– এযাবত ঠিক কতগুলি অনুবাদ করেছ? সবগুলিই কি প্রকাশিত হয়েছে?

বিতস্তা– আগেই বলেছি আমি খুব কম অনুবাদ করেছি। কমলা দাসের দুটি গ্রন্থ, একটি ছোটো গল্প সংকলন –‘রক্ষিতা ও অন্যান্য গল্প’,(আজকাল) ’মাই স্টোরি,’( ভাষা সংসদ) ‘নির্বাচিত দুগগাল’,(প্যাপিরাস) ‘পনেরো ভাষায় মেয়েদের গল্প’-(সৃষ্টিসুখ) এই হচ্ছে আমার একক অনুবাদ গ্রন্থ। এন গোপীর জল গীত সুপ্তশ্রী সোমের সঙ্গে করেছি।আর করেছি বব ডিলানের কবিতা। এগুলো প্রকাশিত।

তবে গত দশ বছর আমি এককভাবে অনুবাদ করছি না কিছুই। সম্পাদনা করতে গিয়ে হয়তো কিছু ভালো লাগলে সেটা করেছি।

 তৃষ্ণা বসাক– তোমার কোন অনুবাদটির জন্যে লোকে তোমাকে চিনেছে এবং কোন অনুবাদটি সবথেকে বাণিজ্য সফল?

বিতস্তা– কঠিন প্রশ্ন। সে অর্থে আমাকে সাহিত্যিকরা অনুবাদক হিসাবে দাগিয়ে দেওয়ার যে প্রচেষ্টা চালান বার বার, এই পরিসংখ্যান তাদের আশাহত করবে।আমাকে সাধারণ পাঠক চেনেন লেখক হিসাবে। অনুবাদ পত্রিকার পাঠক, অনুবাদক লেখকরা চেনেন সম্পাদকরূপে। আমার অনুবাদে সে অর্থে কমলা দাসের জন্যই অনুবাদক বিতস্তাকে মানুষ চিনেছেন বলে আমার বিশ্বাস।এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালে।তখন থেকে এখন পর্যন্ত বিক্রি ১২০০ কপি।এই সংখ্যাটা বলতে পারছি,কারণ ভাষা সংসদ থেকে প্রকাশিত।সে অর্থে যদি বাণিজ্যিকভাবে সফল বলা যায়, তবে এটাই সফল।     

 তৃষ্ণা বসাক- একটা কথা আছে যে Translation is nothing but a negotiation. কথাটা কি তোমার জন্যে খাটে? তুমি কি আক্ষরিক অনুবাদেই বিশ্বাসী? না অনুসৃজনে? তোমার অনুবাদের প্রসেসটা ঠিক কী রকম? প্রথমে আক্ষরিক অনুবাদ, তারপর ভাষাটিকে  সুন্দর করার জন্যে অল্প হেরফের, নাকি অন্য কিছু?

বিতস্তা– অনুবাদ হলে আক্ষরিক হওয়া উচিত।কিন্তু সেটা আবার অনেক সময়ই পড়তে ভালো লাগে না।খুব সহজ উদাহরণ হল, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত।প্রথমজন আক্ষরিক অনুবাদ করতেন, যা পড়তে সবসময় ভালো লাগত না।অন্য দিকে দ্বিতীয়জন অনুবাদকের স্বাধীনতা নিতেন। আমি একটা মধ্যবর্তী পথ মেনে অনুবাদ করেছি। যাতে পড়তে ভালো লাগে কিন্তু লেখাটা পালটে যায় না।

 তৃষ্ণা বসাক-বাংলা থেকে অন্য ভাষাতে  অনুবাদও কি করো? যদি না  করো তবে কেন করো না? এটাও তো দরকার।

বিতস্তা- আমি নিজে করি না অন্য ভাষায়। অন্য ভাষায় অনুবাদ করার মতো পাণ্ডিত্য আমার নেই।তবে আমি যাঁরা অন্য ভাষাটি ভালোভাবে জানেন তাঁদের দিয়ে নিয়মিত অনুবাদ করাই।কারণ এটা অত্যন্ত জরুরি আমাদের বাংলা লেখাও যেন বাইরে যায়। অবাঙালিরাও আমাদের লেখা পড়তে পারবেন তখনই যখন অনুবাদ হবে। 

তৃষ্ণা বসাক-তুমি ট্রান্সলেটর্স  ব্লককে কীভাবে ডিল করো? এমন কোন ড্রিম প্রজেক্ট আছে যা তুমি অনেক দিন ধরে করতে চাইছ?

বিতস্তা– অনুবাদ খুব ভালো না লাগলে যেহেতু করি না, তাই এই ব্লক আসে না। তবে যদি স্বপ্নের কথা বলো, তাহলে যদি সুযোগ হয়, ভারতের বিভিন্ন ভাষার লেখকদের আত্মজীবনী অনুবাদ করব।

 তৃষ্ণা বসাক– তুমি ভারতীয় সাহিত্য থেকে অনুবাদ করো। তোমার কি মনে হয়, এই বহুভাষিক দেশে অনুবাদের ভূমিকা অনেকখানি? তার জন্যে কি যথেষ্ট অনুবাদক আছেন? অনুবাদকদের সম্মান ও সাম্মানিক এবং অন্যান্য পরিকাঠামোর ঠিক কতটা অভাব আছে? কীভাবে তা উন্নত করা যায়?

বিতস্তা– অনুবাদ ছাড়া এই বহুভাষিক দেশকে ধরাই সম্ভব নয়।এত বৈচিত্রের মাঝেও যে দেশটা টিকে আছে তার একটা বড় কারণ সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐক্য।আর সেটাকে বজায় রাখার জন্য এক মাত্র বিকল্প অনুবাদ।

অনুবাদকদের সম্মান ও সাম্মানিক দুটোই বিরল। আমি যখন কাজ করতে শুরু করেছিলাম তখন বেশীরভাগ সময়ই অনুবাদকের নাম প্রচ্ছদে বা প্রিন্টার্স পেজে রাখা হত না। আমি প্রথম সেটাকে ভাঙি। দুটো জায়গাতেই অনুবাদকের নাম রাখা শুরু করি। অবশ্য এটা বাবাই শুরু করেছিলেন।আমি সেটাকেই বাধ্যতামূলক করি।এছাড়া অনুবাদকদের পরিচিতিও সমান গুরূত্ব দিয়ে রাখা শুরু করি। আমি এও দেখেছি অনেক সময় কোনো অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশ হচ্ছে, অথচ অনুবাদককে মঞ্চেই ডাকা হল না। নিজের অভিজ্ঞতা বলি।একটি বেশ দুদিন ধরে চলা অনুষ্ঠানে ডেকে নিয়ে গেলেন কর্ণধাররা অনুবাদ নিয়ে বলতে হবে বলে।বিকেল পাঁচটায় সময় দেওয়া হল। রাত আটটায় আমাকে ডাকা হল, তখন বলা হল অনুবাদ নয়, একটা কবিতা বললেই হবে।অর্থাৎ অনুবাদ নিয়ে যারা কাজ করবেন, বা কাজ করছেন, তাঁদের সম্মান কতটা দেওয়া হয়- এটা থেকেই বোঝা যায়।এই সমস্যা শুধু আমাকে নয়, বাসুদেব দাস থেকে শুরু করে অনেককেই করতে হয়েছে।আমি উপস্থিত থাকলে তীব্র আপত্তি জানাই সে নিজের রাজ্যেই হোক বা বাইরের রাজ্যে।

কিন্তু অনুবাদকদের ভূমিকা কী তাতে পালটে যায়! তারা কিন্তু প্রাণপন চেষ্টা করেন অনুবাদের জন্য।তবে আমার মনে হয়েছে আমরা নিজেরাই সচেষ্ট নই, তাই এরকম ভাবে ভাবা হয়, অনুবাদকদের মর্যাদা দেওয়া হয় না।

পারিশ্রমিকের বিষয়েও আমি যথেষ্ট সোচ্চার।অনুবাদ পত্রিকায় যতটা পারা যায় দিই। বাকিদেরও বলি।কিন্তু ওই যে এখানে সবই ভালোবসে…, পত্রিকার স্বার্থে- তাই কোনো সংঘবদ্ধতা নেই।       

তৃষ্ণা বসাক-চাকরির পাশাপাশি অনুবাদ করা, পরবর্তী কালে অনুবাদ পত্রিকার সম্পাদক হয়ে অনুবাদ করা  কতখানি কঠিন ছিল?

বিতস্তা– খুবই শক্ত ছিল।কারণ আমি একেবারেই বাইরে থেকে উড়ে এসে বসেছি। বাবা তখন সাধনার জগতে।কাজেই কোনো সাহায্য পরামর্শ পাইনি।এমনকি প্রথমদিকে তাঁর মেয়ে আমি-এই পরিচয়ও দেওয়া নিষিদ্ধ ছিল। ফলে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে। আরেকটা বিষয় ছিল, বই পড়ার নেশা থাকলেও ভারতীয় সাহিত্য সেভাবে পড়িনি তার আগে। ফলে এই পড়াটা আমাকে পড়ানোর পাশাপাশি পড়তে হয়েছে।একজনও ছিলেন না যিনি একটা দিশা দেখাবেন।যারা সেই সময় দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরাও সাহায্য করেননি।আমি যা করেছি সবটাই অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে পথ খোঁজার মতো হাতড়ে হাতড়ে। সেটার ফল কি হয়েছে সেটা তোমরা বা অনুবাদ পত্রিকার পাঠকরা বলতে পারবেন।

তৃষ্ণা বসাক– অনুবাদক তৈরিতে এই পত্রিকার ভূমিকা ঠিক কতখানি?

বিতস্তা– আমি মনে করি একা ‘অনুবাদ পত্রিকা’ বা বৈশম্পায়ন ঘোষাল ১৯৭৫ সালে যা করেছেন তা আজও কোনো পত্রিকা পারেনি করতে। এমন একজনের নামও তুমি দেখতে পাবে না যাঁর অনুবাদের পথে ‘অনুবাদ পত্রিকা’ নেই।আমি জানি না ইতিহাস কিভাবে এর বিশ্লেষণ করবে, কারণ আমরা আমাদের অতীত বড় ভুলে যাই, কিন্তু এটা জানি যে পরিমাণ অনুবাদক ‘অনুবাদ পত্রিকা’ সঙ্গে যুক্ত তা আর কোনো পত্রিকা গত ৫১ বছরে পারেনি।পারলে আর একটি ‘অনুবাদ পত্রিকা’ গড়ে উঠত এত বছরে। 

তৃষ্ণা বসাক– তোমার কোন কোন অনুবাদ সম্মানিত হয়েছে এখনো পর্যন্ত?

বিতস্তা- দেখো অনুবাদের জন্য আমি একটিই সম্মান পেয়েছি। সেটা ‘লীলা রায়’ স্মারক সম্মান। কিন্তু কেন দিয়েছেন তা জানি না। কারণ বলা হয়েছে সারাজীবন আমার অনুবাদ কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ। ফলে এটা বলা দুষ্কর। আমার মনে হয় যারা সম্মানিত করেন, তাঁরা নিজেরাই জানেন না আমার কী কাজ আছে! ‘অনুবাদ পত্রিকা’র সম্পাদক কাজেই অনুবাদক এটাই সম্ভবত তাঁরা ভেবেন। কিন্তু কোন বই তা জানেন না-এই বক্তব্য খুব দায়িত্ব নিয়ে বলছি।  

তৃষ্ণা বসাক- তোমার অনুবাদক জীবনে অনেক অসম্মান প্রত্যাখ্যান আছে, অসৎ প্রকাশক আছে, আবার  নিশ্চয় এমন কিছু ঘটনা আছে, যা আজো তোমার কাজের স্পৃহা জাগিয়ে রেখেছে? সেইরকম কিছু স্মরণীয় ঘটনা, পাঠকের ভালবাসার কথা জানতে চাই।

বিতস্তা– মেয়েদের কোন জীবনটাই বা সহজে হয়েছে! তবে আমার সাহিত্য জীবনের সব ঘটনাই স্মরণীয়।অতি তুচ্ছ এই কলমচিকে পাঠক থেকে সবাই এত ভালোবাসা দিয়েছেন যে ব্যক্তিগত দুঃখ অসম্মান কিচ্ছু মনে পড়ে না।

তৃষ্ণা বসাক– তরুণ অনুবাদকদের জন্যে তুমি কিছু বলতে চাও? কীভাবে তারা এগোতে পারে অনুবাদকে পেশা করে?

বিতস্তা– শুধু অনুবাদ করতে চাইলে বলব এটা তাদের জন্য সঠিক নয়।কারণ যার লেখা অনুবাদ করবেন, তাকে সেই ভাষাটাকে আয়ত্ত্ব করতে হবে। ভালো অনুবাদক হতে হলে এক দুটি অনুবাদ করলে ঠিক আছে। অনুবাদ একটা নিরন্তর যাত্রা। প্রতিনিয়ত সেটা নিয়ে যাপন করতে হয়।এই চাপ নেওয়ার জন্য অনুবাদ করার আগে মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে।

অনুবাদ পেশা হিসাবে নিলে তার জন্য প্রচুর সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আছে।এমনকি সংবাদপত্র, বিজ্ঞাপন সংস্থাতেও নিয়মিত অনুবাদকের দরকার। এছাড়া এখন গ্লোবাল মার্কেটের জন্য দোভাষীর চাহিদা বিশ্ব জুড়ে।ফলে যারা সত্যি এটাকে পেশা করতে চান, তাঁরা এভাবে ভাবতে পারেন।পাশাপাশি সাহিত্যের অনুবাদ হোক।কারণ একটা অনুবাদ করে গ্রাসাচ্ছাদন করার মতো অবস্থা এখানে নেই। সেক্ষেত্রে এইসব চাকরিগুলো ভালো। আমি নিজে একটি অ্যাড এজেন্সীতে বেশ কয়েক মাস বিজ্ঞাপন, টেন্ডার অনুবাদের কাজ করেছি, একটি সংবাদ পত্রেও। ফলে জানি এটা ভালো পেশা হতে পারে।

তৃষ্ণা বসাক– বিতস্তা, তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ  এতটা সময় আমাকে দেবার জন্যে। শেষে জানতে চাই তোমার ঠিক কতগুলি অনুবাদের বই আসছে সামনে এবং তাদের প্রকাশক কারা?

বিতস্তা– তোমাকেও অনেক ভালোবাসা আমার জন্য এত পরিশ্রম করে প্রশ্ন করেছ।

আপাতত একটিও অনুবাদের বই আসছে না। হয়তো সম্পাদিত কিছু বই আসবে। তবে সেটা কবে জানি না।

অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা - তৃষ্ণা বসাক

১৬ : অনুবাদের বাদ বিসংবাদ ও সংবেদনা

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

১৭ : অনুবাদের বাদ বিসংবাদ ও সংবেদনা

This entry is part 17 of 17 in the series অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক ১ : অনুবাদের

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

১৭ : অনুবাদের বাদ বিসংবাদ ও সংবেদনা

This entry is part 17 of 17 in the series অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক ১ : অনুবাদের

Read More »