সীমান্তহীন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায় অনুবাদ

সীমান্তহীন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায় অনুবাদ

অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা - তৃষ্ণা বসাক

১ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা

২ : অনুবাদের অপযশ

৩ : অনুবাদ- ও  সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতা

৪ : শাসকের ভাষা, শাসিতের ভাষা এবং অনুবাদকের অবস্থান

৫ : অনুবাদকের সংকট

৬ : সংস্কৃতির অনুবাদ

 ৭ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা

৮ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা

৯ : অনুবাদের স্বর্ণযুগ : মধ্যযুগ  

১০ : অনুবাদকের কথা

১১ : অনুবাদের বাদ বিসংবাদ ও সংবেদনা

১২ : লেখক ও অনুবাদকের আন্তঃসম্পর্ক- অনুবাদক যখন নারী

১৩ : অনুবাদের বাদ বিসংবাদ ও সংবেদনা

১৪ : অনুবাদ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

১৫ : অনুবাদের বাদ বিসংবাদ ও সংবেদনা

১৬ : অনুবাদের বাদ বিসংবাদ ও সংবেদনা

১৭ : অনুবাদের বাদ বিসংবাদ ও সংবেদনা

সীমান্তহীন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায় অনুবাদ

কীভাবে শুরু?

কলকাতায় জন্ম হলেও আমি বড় হয়ে উঠি কলকাতা থেকে অনতিদূরে , ১৮ কিলোমিটার দূরে এক ছোট শহরে। সেই শহরে সেই সত্তরের দশকেই ছিল চার চারটি সিনেমা হল, যেখানে অক্ষর পরিচয়ের আগে থেকেই আমার সিনেমা দেখার শুরু শুধু নয়, একটি হলের মর্নিং শো-তে দীক্ষা বিশ্ব সিনেমায়। সেই সিনেমাগুলো তো ইংরেজিতেই হত। আমি কীভাবে বুঝতাম? বুঝতাম ভাষা ও লিপি নিরপেক্ষ এক চিরন্তন হৃদয়ের ভাষায়।

প্রথম যে গল্পের বই পড়ি তা হচ্ছে হ্যানস অ্যান্ডারসনের রূপকথা। সেই গল্প গুলো আমার ওপর একটা চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলে যায়। সেই আগলি ডাকলিং, টোমোলিজ কিংবা উড়ুক্কু কার্পেটের গল্প। উড়ুক্কু কার্পেটের গল্পে রান্নাঘরের পিরিচ পেয়ালা কেটলি যেভাবে গল্প বলে- সেই গল্প বলার আমেজটা আমার ভেতরে ধীরে ধীরে কাজ করেছিল। বহু বছর পরে গল্প লিখতে বসে সেটা আমি টের পেয়েছি। সেই গল্প গুলো যে অনুবাদ গল্প, সেটা তখন বুঝিনি। এটা নিশ্চয় বুঝতাম যে চরিত্রগুলো বিদেশের, তাদের নাম আলাদা, সেসব দেশে বরফ পড়ে , ঘরে ফায়ারপ্লেস রাখা হয়, চরিত্রগুলো শীতের জামা পরে, পরিজ, সুরুয়া এইসব খায়, ফলে তা তো আমার চেনা জায়গার হতেই পারে না, লেখকের নাম লেখা আছে হ্যান্স অ্যান্ডারসন- সুতরাং এটা বিদেশি বই, নিশ্চয় ইংরেজি বই, কারণ বিদেশি মানে ইংরেজি ভাষাই তো, আর যে কোন ভাষা আছে পৃথিবীতে, তা তো জানতাম না।

এরপর বাবার মুখে মুখে শোনা টলস্ট্য, মপাসা,অ হেনরির গল্প। আমার ছোট জগতটা এভাবেই বড় হচ্ছিল। বিশ্ব সাহিত্যের গল্প উপন্যাস বাংলা অনুবাদে খণ্ডে খণ্ডে বেরিয়েছিল একটি প্রকাশনী থেকে, নাম মনে নেই। সেগুলো কাছাকাছি সময়েই প্রেছিলাম। এইরকম সময়ে বাবার মুখে একটি নাম শুনলাম- অমৃতা প্রীত্ম। তিনি পাঞ্জাবি ভাষায় লেখেন। সেই প্রথম আমার ভারতীয় সাহিত্যে প্রবেশ হল। তার আগে ভারতব র্ষ যে এক বহু ভাষিক দেশ- তা খুব অদ্ভুতভাবে বুঝেছিলাম। সেই মফস্বলে শীতে সার্কাস আসত। আমাদের বারির সামনেই রাস মাথে তাঁবু পড়ত প্রতি বছর রাস মেলার সময়। সার্কাসের স্টার পেয়াররা তাঁবুতে থাকতেন না, কাছাকাছি কোন গৃহস্থ বাড়িতে তাঁদ্র জন্য ঘর ভাড়া নেওয়া হত। আমাদের নিচ তলা ফাঁকা থক্লে  সার্কাসের স্থানীয় ম্যানেজার এসে ধরত ঘর ভাড়া দেবার জন্যে। সার্কাসেরপ্লেয়ার বলে তাদের ভড়া দেবার ইচ্ছে ছিল না মার। নোংরা করবে, হ্ললা করবে। কিন্তু গেদু কাকুর পেড়াপেড়িতে একবার আমাদের নিচতলায় ভাড়া এলেন মাল্যালি এক পরিবার। চারটি মেয়ে আর তাঁদের বাবা মিস্টার কুট্টি। পরীর মতো চারটি েয়ে ট্রাপিজ আর সাইকেলের খেলা দেখায়, ওরা এসে সার্কাসের মেয়ে স্মপ্ররকে মায়ের ধারণা পালটে দিল। তুলসীতলায় প্রদীপ দেখাত ওরা, প্রতিটি ঘরের সামনে রঙ্গোলী, রোজই কিছু রেঁধে দিয়ে যেত। যেমন বিচিত্র সে রান্নার স্বাদ, তেমনি স্বাদ তাদের মুখের ভাষায়। এই ভাবেই ভারতব র্ষ আমার ঘরে ঢুকে পড়েছিল। সেই হয়তো আমার ভারটীয় সাহিত্য অনুবাদের পূর্বাভাষ।

১. অনুবাদের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তোমার ধারণা কী?

উত্তর-  এই প্রশ্নটা অনেকটা বাড়ির জানলা রাখার প্রয়োজনীয়তার মতো শোনাল। বাড়িতে জানলা না রাখলে কী হয়? ঘুলঘুলি দিয়ে হাওয়া বা আলো যা আসে তাতে তো কাজ হয়ে যাবার কথা। ‘জানলা বাড়িতে বিশ্বকে বয়ে আনে। আমরা পড়শির উঠোনে কী গাছ গজাল, লঙ্কা আচারের বয়াম রোদে মেলা আছে কিনা তা জানতে পারি, জানলার শিক ধরে আকাশ দেখেও নিতে পারি, আকাশে পাখির ওড়া দেখতে পারি। জানলা না থাকলে বাড়ির বাইরের প্রবহমান জীবন সম্পররকে  আমরা তো কিছুই জানতে পারতাম না। অনুবাদ সেইরকম, বাইরের জানলাটা খুলে দেয়। বিশেষ করে ভারতবর্ষের মতো বহুভাষিক দেশে অনুবাদের গুরুত্ব অপরিসীম । প্রতিটি ভারতীয় শিশু কিন্তু জীবনে প্রথম যে গল্প শোনে তা কিন্তু অনুবাদ। মহাভারত, রামায়ণ, বাইবেল বা আরব্য রজনীর গল্প।

২. মৈথিলি থেকে বাংলায় অনুবাদের জার্নি সম্পর্কে একটু বলো।

উত্তর-সময়টা সম্ভবত ২০০৭ বা ২০০৮। আমার কেরিয়ারের যেদিকে হাঁটার কথা ছিল, তা থেকে আমাকে সরে আসতে হল । আমার মনে আছে আমি শেষতম ইন্টারভিউ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের  দু নম্বর গেট দিয়ে বেরিয়ে আসছি। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে। একদিকে তীব্র কষ্ট, অন্যদিকে ভীষণ হালকা লাগছে, মুক্তি মুক্তি। আমি বুঝতে পারছি, এই গেট দিয়ে আর কোনদিন ঢুকব না, আর কোনদিন নিজেকে এই চক্রের মধ্যে পিষ্ট হতে দেব না। আমার জীবন এবার অন্য দিকে বয়ে যাবে। মুক্তি সঙ্গে সঙ্গে শূন্যতাও নিয়ে আসে। চারদিক কীরকম ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। এইরকম একটা সময়ে আমি একটা অন্য ভাষাকে আঁকড়ে ধরতে চাইছিলাম। অনেকদিন ধরে আমার এক স্যার আমাকে স্প্যানিশ শেখার জন্যে বলছিলেন, বলছিলেন মূলে মার্কেজ পড়বে তো এসো আমার স্প্যানিশ ক্লাসে, কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার মনে হল একটা ভারতীয় ভাষাই শিখব। সেই সময়  ঘটনাচক্রে সাহিত্য অকাদেমির তরুণ লেখক ভ্রমণ অনুদান প্রকল্পে আমার নাম অনুমোদন পেল। আমি ভেবেছিলাম মারাঠি বা অসমীয়া শিখব। তখন রামকুমারদা বললেন ‘মৈথিলী শেখো, কম লোকই জানে এ ভাষার কথা। অন্য ভাষায় অনেক ভিড়।‘ মৈথিলী যে আলাদা ভাষা আছে সেটাও তখন জানতাম না। সেটা কোথায় কার কাছে শিখব,  জানতাম না। গৌরী সেনের নম্বর পেলাম।রামলাল বাজারের দিকে থাকতেন। চলে গেলাম সেখানে। তাঁর কাছে মৈথিলী আগে যে বর্ণমালায় লেখা হত, সেই তিরহুতিয়া লিপি দেখলাম। সেই লিপি প্রথম চোখে দেখার অভিঘাত ভোলার নয়। আমার মনে হল এ তো অবিকল বাংলা লিপি। মনে আছে একটা গল্প মৈথিলীর, অনুবাদ করতে শুরু করেছিলাম , অন্ধের মতো হাঁতড়ে হাঁতড়ে কিছু না জেনেই, হাতে লিখতাম তখন, সেটা নিয়েও আরেকবার গেছিলাম, গৌরীদির কাছে প্রাইমার আর ব্যকরণ বই চেয়েছিলাম। কিন্তু উনি বলছিলেন ওঁর কাছে নেই। সেইরকম সময়ে, ভ্রমণ অনুদান যখন পাওয়া গেল, আমি ঠিক করলাম এখানে যখন মৈথিলী শেখার কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না, তখন অকুস্থলেই যেতে হবে অর্থাৎ মিথিলায়। সাধারণত ভ্রমণ অনুদান  পেয়ে লোকে দিল্লি মুম্বাই শিলং যায়, দক্ষিণের এক সাহিত্যিক দার্জিলিং গেছিল দেখেছি- সাহিত্য সেখানে বুড়ি ছোয়া, ভ্রমণটাই মুখ্য, তো আমি গেলাম দ্বারভাঙ্গা মধুবনী পটনা। দ্বারভাঙ্গা , একসময় অত্যন্ত গরিমা ছিল তার, এখন বিহারের ধূলিধূসর ঘিঞ্জি এক শহর। বিদ্যুৎ প্রায় থাকে না বললেই হয়। গরম, মশা প্রচন্ড। সকালে পৌঁছে বিকেলে মৈথিলী লেখকদের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। এইভাবেই শুরু হল আমার মৈথিলী ভাষা ও সাহিত্যের যাত্রা। আমি ক্লাস করার মতো শিখিনি। কাজ করতে করতে শিখেছি। কানে শুনে যখন যে কবিতা ভালো লেগেছে, তখন অনুবাদ করেছি। কবি বা লেখককে জিজ্ঞেস করেছি কোন সমস্যা হলে। আমার প্রথম মৈথিলী অনুবাদের চেষ্টা কার গল্প ছিল ভুলে গেছি। সেটা চেষ্টা করে পুরোটাই করেছিলাম মনে আছে।  হারিয়ে গেছে সেই অনুবাদ। তবে ঐ সফরে পটনায় গিয়ে এক প্রকাশনা দপতরে অজিত আজাদের কবিতা শুনে এত ভাল লাগে যে আমি অনুবাদ করতে শুরু করি। নিজের লেখার পাশাপাশি একটু একটু করে করি দীর্ঘদিন ধরে। এইভাবেই বেরোয় অজিত আজাদের কবিতা। তবে তার প্রকাশক নবারম্ভ, পটনা। সে কারণে এখানে বইটি পাওয়া যায় না। যদিও কলকাতায় ছাপা হয়েছিল।  আমার প্রথম যে গল্পের অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল, খোয়াব বলে এক ওয়েব পত্রিকায়,  তা হচ্ছে ঊষাকিরণ খানের সদ্গতি। ওঁর স্বকণ্ঠে স্মৃতিকথা পাঠ শুনে ছিলাম সেবারই পটনায় বিদ্যাপতি ভবনে। ওঁর লেখা ভাল লেগে যায়। এর ফল তো ঊষাকিরণ খানের গল্প। মিসিসিপির মেঘ থেকে প্রকাশিত। এইভাবেই আমার মৈথিলী যাত্রার শুরু।

৩. মৈথিলি থেকে বাংলা অনুবাদ বাংলা সাহিত্যের জন্যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

উত্তর- আমি যখনি মৈথিলী লেখকদের সঙ্গে মিলিত হয়েছি, সেই প্রথম দিন থেকেই, একটা অভিযোগ আমাকে শুনতে হয়েছে- যে তোমরা আমাদের এত কম পড়ো কেন? আমরা তো তোমাদের মূল থেকে পড়ি, অনুবাদ করি, তোমরা আমাদের কী অনুবাদ করেছ? একটা সময় অব্দি এটা খুবই সত্যি ছিল। মৈথিলী লেখকরা রাজশেখর বসু, বিমল মিত্র ধরে ধরে অনুবাদ করেছেন, কিন্তু একদম সমসাময়িক কালে তেমন কিছু করছেন বলে শুনিনি। কিন্তু সেটুকু তো আমরাও করিনি। মৈথিলী থেকে অনুবাদক একমাত্র ছিলেন গৌরী সেন, আর তাঁর পরে আমি। কিন্তু আমাকে তো শুধু অনুবাদক বলা যায় না। আমি নিজের লেখার পাশে অনুবাদ করি। শুধু মৈথিলী অনুবাদক- এমন কেউ তৈরি হচ্ছেন না। এর পাশাপাশি এটাও সত্য, মৈথিলী ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি সেই সবাভিমানের জায়গাটা কোথায় যেন নষ্ট হয়ে গেছে। হিন্দির আগ্রাসন এর জন্য দায়ী না কি নতুন মৈথিলী লেখক উঠে আসছেন না- এটা অনুসন্ধান করতে হবে। তবে এটা ঠিক, আমি অ্যাসাইনমেন্টের কথা বলছি না, সাধারণ ভাবে বাঙালি ভারতের অন্য ভাষা থেকে অনুবাদের কথা ভাবে না। তার স্বাভাবিক নির্বাচন ভারতের আঞ্চলিক ভাষা নয়। সে বিদেশের ভাষা থেকে কাজ করতে অনেক বেশি আগ্রহী। সাধারণত ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষা না জানলেও সে অন্য ভাষা থেকে অনুবাদ করে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই মৈথিলী ভাষা থেকে অনুবাদ খুব কম হয়েছে। সমসাময়িক সাহিত্য হয়নি বললেই চলে। কিন্তু সেটা না জানলে আমরা গ্রামীণ ভারতকে চিনব না বললেই চলে। কারণ মৈথিলী সাহিত্য অনেকটাই গ্রামকেন্দ্রিক। গ্রাম জীবনের রাজনীতি সংকীর্ণতা, অন্ধ বিশ্বাস যেমন আছে, তেমনি আছে বর্ণিল রীতি রেওয়াজ, উৎসব আনন্দ।  ঊষাকিরণ খানের নোচনী মাইয়া না পড়লে এখনো গ্রামে মেয়েদের অবস্থান কী ভয়ানক, তা জানা যাবে না। ভারতীয় সাহিত্যের বাস্তববাদী ধারার সঙ্গে সম্যকভাবে পরিচিত হতে চাইলে মৈথিলী সাহিত্য পড়তেই হবে। ফিকশন ছাড়াও এখানে অন্যরকমের ভাল কাজ আছে। আমার মনে আছে লেহরিইসরাইয়ে রামদেব ঝার বাড়ি গেছি। তাঁর বয়স নব্বইয়ের কাছাকাছি তখন, ক্যান্সারে আক্রান্ত। টিমটিমে আলোর চারপাশে শ্যামা পোকার রাশ। এর মধ্যে বসে উনি অভিধানের কাজ করছেন। আমাকে বললেন শৃঙ্গারের অভিধান সংকলন করছেন- মানে সাজগোজ গয়নাগাটি এসবের শব্দকোষ। তারপর বললেন বাংলাতে নিশ্চয় এসব কাজ আগে হয়ে গেছে। এর আগে তিনি খাবারের ওপরেও একটি শব্দকোষ করেছেন। আমি লজ্জায় পড়ে গেলাম। আমার জ্ঞানে বাংলায় এমন শব্দকোষ নেই। তো এই ধরনের কাজের খবর পেতে এবং সেখান থেকে শেখার জন্যে তো আমাদের মৈথিলী থেকে বাংলা অনুবাদ করতেই হবে। কূপমণ্ডূকতা উন্নাসিকতা এইসব সাহিত্যের পক্ষে ত্যাজ্য।

৪. মলয়ালম থেকে বেশ কিছু অনুবাদ করেছো, কিন্তু সেক্ষেত্রে ইংরেজি কে intermediary ভাষা হিসেবে ব্যাবহার করতে হয়েছে। এই ধরণের অনুবাদ করতে গিয়ে কী ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে?

উত্তর- ঠিকই, মলয়ালম থেকে অনুবাদের জন্য আমাকে লিংক ল্যাঙ্গয়েজ অর্থাৎ সংযোগকারী ভাষা ইংরেজির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, কারণ আমি মলয়ালম জানি না। কিন্তু এই ভাষায় আমার কিছু বন্ধু আছে। তাদের মাধ্যমে আমি সেই ভাষার রত্ন রাজির সন্ধান পেতে থাকি। এক বন্ধু সুষ্মেশ চন্দ্রোথ আমাকে একটা গল্প পড়তে দেয়, ইংরেজি অনুবাদে তার গল্পটি পড়ে এত মুগ্ধ হই, যে তা অনুবাদ করি। এইভাবেই আমার মলয়ালম ভাষার অনুবাদের কাজ শুরু। আজ প র্যন্ত সব কাজ এইভাবেই হয়েছে। লেখকের কাছ থেকে সরাসরি এসেছে তাদের গল্প বা কবিতা। ফলে কোন সমস্যা হলে আমি তাদের সরাসরি জিজ্ঞেস করতে পেরেছি। ইংরেজি অনুবাদটি অসম্পূর্ণ মনে হলে বা যথাযথ অর্থ বোঝা যাচ্ছে না মনে হলে আমি বুঝতে পারি,  খুব ছোট থেকেই বিদেশি ভাষার অনুবাদ পড়ে আসছি। খন্ডে খণ্ডে বিশ্বের সেরা গল্প উপন্যাস পড়েছি। যদিও প্রকাশক বা অনুবাদকের নাম ভুলে গেছি। আসলে সেই সচেতনতা তখন ছিল না। এইভাবেই পড়েছি মপাসা, তুর্গেনিভ, তলস্তয়, ও হেনরি, সমারসেট মম। মোটামুটিভাবে বলা যায় জীবনের প্রথম আঠেরো বছর অনুবাদেই সব পড়েছি। একটা জিনিস মনে পড়ছে। সেইসময় ইউরোপ ও রাশিয়ান লেখকদেরই আমরা বেশি পড়তাম। স্প্যানিশ অনুবাদের ঢল অনেক পরের। তারপর এই যে আফ্রিকার সাহিত্য, পাকিস্তানের সাহিত্য , জাপান কোরিয়ার সাহিত্য উঠে আসছে অনুবাদে, এই প্রবণতাও অনেক পরের। এগুলো খুব ভাল দিক।

কথা হচ্ছিল মলয়ালম ভাষা থেকে অনুবাদে অসুবিধে হয়েছে কিনা। আসলে কী জানো, যে ভাষা জানি, সেখান থেকে অনুবাদেও অসুবিধে হয়। এমনকি বাংলা থেকে বাংলা, অনেক ইন্টারসেমিওটিক ট্রান্সলেশন আমাকে হয়তো সারাদিনে অনেক করতে হয়, এমনকি নিজের অজান্তেই করছি, হয়তো কবিতা থাকে গদ্য, হয়তো ছবি থেকে গল্প, হয়তো গান থেকে একটা উপন্যাস। সেটা করতেও তো অনেক অসুবিধে হয়। কারণ এটা তো একটা প্রসেস। আর সব প্রসেসেরই নিজস্ব রক্ত ক্ষরণ, বিচ্ছেদ বেদনা ইতিহাস স্ব থাকে। অন্য ভাষা থেকে যখন ইংরেজির মাধ্যমে করি তখন একটা সুবিধে হয় । সেটা একটু আশ্চর্য । আসলে অনুবাদকদের একটা সিক্সথ সেন্স থাকে। ঠিক তাও নয়, বলতে পারি, ভাল এবং দীর্ঘদিনের মনোযোগী পাঠকের একটা সিক্সথ সেন্স  কাজ করে। কোন লেখা পড়লে কিছু বাদ গেছে কিনা, বা কোথাও গণ্ডগোল আছে কিনা বুঝতে পারি। আর তখন যতটা সম্ভব খোঁজ খবর নিতে পারি। আমি বলছি না যে মূল ভাষা না জানলেও চলে। মূল ভাষা জেনে তা থেকে অনুবাদ করাটা অবশ্যই একটা বিরাট সুবিধে। কিন্তু অনুবাদকের সততা এবং পরিশ্রম করার ক্ষমতাও জরুরি। এমন অনেক মূল ভাষা থেকে অনুবাদক আছেন, যে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা বাদ দিয়ে চলে যান। সেট তো অত্যন্ত ক্ষতিকর ব্যাপার। তবে আমার মলয়ালম শেখার ইচ্ছে আছে। তার কারণ ঐ ভাষার ধ্বনিকে আরও বেশি অনুভব করার জন্যে। ইংরজি থেকে অনুবাদ করতে গিয়ে মূল শব্দের যে ধ্বনি যে লাবণ্য তা অনেকটাই বা কিছুই পাই না বলে মনে হয়।

৫. মূল ভাষা না জানা থাকলে অনুবাদের যথার্থতা নির্ণয় কি ভাবে করা সম্ভব বলে মনে করো?

উত্তর- এর উত্তর আগের উত্তরে অনেকটাই বলেছই। শুধু যে সঠিক শব্দের মানে জানার জন্যে মূল ভাষা জানা দরকার  তা নয়, ভাষার ধ্বনি ও লাবণ্য অনুভাব করার জন্যেও দরকার। অনুবাদ থেকে অনুবাদ তার থেকে অনুবাদ – এমন যত হয় , তত আমরা মূল ভাষাকে, মূল টেক্সটকে হারিয়ে ফেলি। সেই মোল্লা নাসিরুদ্দিনের গল্পের মতো। হাঁসের সুরুয়ার সুরুয়ার সুরুয়া। শেষ অব্দি তাতে সুরুয়াত্ব আর নেই, সেটা হয়ে গেছে স্রেফ নুন দেওয়া গরম জল। কিন্তু এই ব্যস্ত জীবনে মানুষ নিজের মাতৃভাষাই ঠিক মতো শিখে উঠতে পারছে না, সেখানে তার পক্ষে আর কত ভাষা শেখা সম্ভব? এখানে  একটা উপায় আছে, তা হচ্ছে কর্মশালা। সেখানে মূল ভাষা জানেন এবং লক্ষ্য ভাষা জানেন এমন দুজন বা দুই পক্ষ থাকবে। যাতে করে সংশয়ের জায়গাগুলি সঠিক অনুবাদ করা যায়। আমি নিজে এরকম কিছু অনুবাদ কর্মশালা পরিচালনা করেছি, সাহিত্য অকাদেমি থাকতে। ওড়িয়া কবি রমাকান্ত রথের কবিতা এইরকম ভাবে অনুবাদ করানো হয়েছিল। সে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা । মণীন্দ্র গুপ্ত ছিলেন অনুবাদ পরিচালক। কিন্তু ওড়িয়া ভাষা জানা বা অল্প জানা,বা না জানলেও ওড়িয়া ভাষায় কী লেখা হয়েছে বা হচ্ছে- এসব জানেন এমন লোকের অভাব নেই। কিন্তু যেসব ভাষা সম্বন্ধে কারো তেমন কোন ধারণা নেই, সেইসব ভাষার কর্মশালা করলে বাস্তবিক কাজের কাজ হয়। এটা আমি মিজো, বোড়ো, গারো এবং মিসিং ভাষার কর্মশালা করাবার সময় দেখেছি।

৬. প্রত্যেক অনুবাদকেরই নিজস্ব রাজনীতি থাকে যার ভিত্তিতে তিনি কী অনুবাদ করবেন, কেন করবেন, সেই গুলো ঠিক করেন। তোমার অনুবাদ চয়নের পিছনে কী কারণ থাকে?

উত্তর-এটা খুব ভাল প্রশ্ন। সত্যিই কে কী অনুবাদ করবেন বা করতে চান-তার পেছনে তাঁর একটি আদর্শ , একটি অভিপ্রায় , একটি লক্ষ্য কাজ করে। এইগুলোকেই হয়তো রাজনীতি বলছ তুমি।

যেমন কেউ হয়তো দলিত লেখকদের লেখা অনুবাদ করবেন মনে করবেন- এর পেছনে সৎ অভিপ্রায় তো নিশ্চয় আছে অনেকের- যে দলিত জীবনের বঞ্চনা, শোষণ কে সবার সামনে নিয়ে আসবেন। খুব দরকার সেটা। আবার  এটাও ঠিক প্রান্তিক মানুষের কথা এখন একটা হট টপিক। খুব তাড়াতাড়ি পরিচিতি পাওয়া যায়। এইভাবেই অনুবাদের রাজনীতি তৈরি হয়। কেউ ভাবতে পারেন মধ্য যুগের কবিদের অনুবাদ করবেন, কারণ মধ্যযুগ অন্ধকার যুগ- এই ধারণা তিনি ভেঙে দিতে চান। এইভাবে কেউ আফ্রিকার সাহিত্য অনুবাদ করতে চান, কেউ এশিয়ার দেশগুলির দিকে দৃষ্টি দেন। এর মধ্যে নারীবাদী রাজনীতিও আছে। কেউ হয়তো ইসলামি দেশের নারী কবিদের অনুবাদ করতে চান, এই কারণ থেকে যে এইসব দেশের মেয়েরা কী ভাবছেন সেটা জানতে।

আবার আর একটা ইন্টারেস্টিং জিনিস হয়- একই কবির হয়তো একই কবিতার বই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষ অনুবাদ করেছেন, আলাদা আলাদা উদ্দেশ্যে। বিশেষ করে নাটকের অনুবাদ এইরকম কোন সমকালীন উদ্দেশ্য থেকে হয়।

আমি রাজনীতির থেকে মিশন শব্দটাই এক্ষেত্রে বেশি পছন্দ করব। আমার মিশন হচ্ছে ভারতীয় সাহিত্য অনুবাদ করব। কারণ বাঙালি অনুবাদকরা বড় পশ্চিমাস্য। তাঁরা হাইপার মেট্রোপিয়ায় ভোগেন। তাঁরা অনুবাদ করতে বসলেই বিদেশের দিকে তাকান। জার্মান, স্পানিশ ফ্রেঞ্চ, এখন অবশ্য এশিয়ার দিকেও তাঁদের নজর পড়েছে।  কিন্তু স্বদেশের রত্ন ভাণ্ডার তাঁদের চোখেই পড়ে না। একে আমি বলি হাইপার মেট্রপিয়া।  দৃষ্টির যে অসুখে দূরের জিনিস চোখে পড়ে, কিন্তু কাছের জিনিস নজরে আসে না।

৭. তুমি মহিলাদের লেখালেখি নিয়ে অনেক কাজ করেছো। নিজে লিখেছো, সম্পাদনাও করেছো, যেমন ভারতীয় কবিতায় নারীর স্বর, ভারতীয় গল্পে নারীর স্বর, প্রমিলা কলমে কল্পবিজ্ঞান, ইত্যাদি। ভারতীয় অনুবাদের পটভুমিকায় মহিলাদের স্থান কোথায় বলে মনে করো?

উত্তর- সংখ্যার হিসেবে ঠিক কতটা আমি বলতে পারব না, তবে কাজের গুণমান হিসেবে নারী অনুবাদকের জায়গাটা বেশ উঁচুতে এবং তাদের একটা প্রেজেন্স তৈরি হয়েছে, যেটা উপেক্ষার নয়। আমার একটি ছোট লেখা আছে, অনুবাদে মেয়েরা্‌। সেটা মজার কথা হল এই অনুবাদ প্ত্রিকাতেই বেরিয়েছিল, সেখানে আমি ভারতীয় সাহিত্য জগতে নারী অনুবাদকদের কথা লিখেছিলাম। নাম করে  করে। কে কোন ভাষা থেকে কোন ভাষায় কাজ করছেন। সারা পৃথিবীর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের ভাষা লিটারেচারে নারী অনুবাদকদের বিষয়ে একটা খুব কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা ঘটেছে। ভারত এক বহু ভাষিক দেশ। সেখানে সাধারণ ভাবে নিজের মাতৃভাষা ছাড়া কেউ ইংরেজিটা জানে, বড় জোর একটু আধটু হিন্দি। অন্য ভাষা, স্বাভাবিক ভাবে, তার শেখার কথা নয়। কিন্তু ভারতীয় সমাজের বিশেষত্ব হল বিয়ের পর নারীর মাইগ্রেশন ঘটে। অর্থাৎ সে পিত্রালয় ছেড়ে শ্বশুরালয়ে যায়। যুগ যুগ ধরে মেয়েরা এইভাবেই অন্য একটি সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছে। তাহলে ভাষাই বা কেন পারবে না? এদেশে নারী অনুবাদকদের দিকে তাকালে দেখা যায় যে বেশ অনেক সংখ্যক নারীই এক ভিন্নভাষীকে বিয়ের সূত্রে অন্য একটি ভাষা শিখেছেন, এবং নিজের উদবৃত্ত সময়ে সেই ভাষার সাহিত্য থেকে অনুবাদ করেছেন, ভালবেসে এবং নিজের ছেড়ে আসার যন্ত্রণা ভুলতে, শূন্যতা ভুলতে। আমি কয়েকজনের নাম বলি। লীলা সরকার। ইনি মলয়ালি, বিয়ে করেছেন বাঙ্গালিকে। দুই ভাষার অনেক অনুবাদ করেছেন। নীতা সেন সমর্থ । মরাঠি ও বাংলা ভাষার মধ্যে কাজ করেছেন, ভারতী নন্দী,  ওড়িয়া ও বাংলা ভাষার সেতু বন্ধন করে চলেছেন। মাত্র তিনজনের নাম বললাম, আরও অনেকে আছেন। আবার এরকমও আছেন যাঁরা বেড়ে উঠেছেন অন্য একটি ভাষাভাষী অঞ্চলে, সেই ভাষাটি তাঁরা মাতৃভাষার থেকেও ভাল জানেন। পরবতীকালে সেই ভাষার অনুবাদের কাজ করেছেন। সত্যি বলতে কি, ভারতীয় ভাষা লিটারেচারে নারী অনুবাদকদের অবদান, অবস্থান- এসব নিয়ে কোন গবেষণামূলক কাজ তো দূরের কথা, তেমন কোন নিবন্ধ ও চোখে পড়ে না।

আর একটা ব্যাপার দেখা যাচ্ছে যে নারী লেখকের অনুবাদক নারী অনুবাদকের হাতে অনেক হচ্ছে, এবং ভাল হচ্ছে। হয়তো কাজের একটা কমফোর্ট লেভেল থাকে, হয়তো নারীর লেখা বোঝার সংবেদনশীলতা নারী অনুবাদকের তুলনায় বেশি থাকে। এবং অনুবাদ ক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি বাড়ছে এবং আরও বাড়বে। একবার জয়া মিত্র বলেছিলেন অনুবাদকের প্রয়োজনীয় গুণ হচ্ছে নমনীয়তা ও শ্রদ্ধাশীলতা। হয়তো নারীর মধ্যে এ দুটি গুণ বেশি আছে। জুবান অগস্ট মাসকে উইমেন ইন ট্রান্সলেশন ঘোষণা করেছে এই উদযাপনের মধ্যে দিয়ে নিশ্চয় আরও সচেতনতা বাড়ানো যাবে।

তবে অনুবাদকের স্বীকৃতি ও পারিশ্রমিক নিয়ে যে বৈষম্য আছে, অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো সে বৈষম্য নারীর বেলা আরও বেশি। কাজ ও সচেতনতা দিয়ে তা দূর করতে হবে।

৮. একজন অনুবাদক হিসেবে অনুবাদ তত্ব কতটা প্রয়োজনীয় বলে মনে করো?

উত্তর- জরুরি বলেই তো তুমি আর আমি অনেক দিন ধরেই এই নিয়ে ভাবনা চিন্তা করছি, এবং আমাদের একটা বই শিগির আসতে চলেছে। সাহিত্যিক হতে গেলে ব্যকরণ জ্ঞান চাই, সাহিত্যের তত্ব জানতে হয়, গানের ক্ষেত্রেও থিওরি জানা দরকার। এতে পরিশীলন আসে। একই কারণে অনুবাদকের অনুবাদ তত্ত্ব জানা জরুরি। বাংলায় এ ধরনের বই তো নেইই।

৯. মৌলিক লেখা আর অনুবাদ – এই দুটোই তুমি সমান ভাবে করছো। সেটা করতে গিয়ে কি কখনো লেখক সত্তা ও অনুবাদক সত্তার মধ্যে বিরোধ ঘটেছে?

উত্তর- বিরোধ নেই, বিরোধ হতে দিই না। তবে সময়ের অভাব আছে। তাই খুব না টানলে অনুবাদ করতে পারি না। তবে আমি সব কাজই রোজ একটু একটু করে করার চেষ্টা করি। এক পাতা নাহোক, অন্তত কয়েকটা শব্দ।  ঐ যে মার্টিন লুথার কিং র কথাটা আছে না ‘ইফ ইউ কান্ট ফ্লাই, দেন রান, ইফ ইউ কান্ট রান দেন ওয়াক, ইফ ইউ কান্ট ওয়াক দেন ক্রল, বাট কিপ মুভিং অ্যাট আনি রেট। সেই ভাবেই আমি করার চেষ্টা করি। অনুবাদের অনেকটা অংশে একটা স্টিরিওটাইপ ব্যাপার আছে। মানে আমি প্রাথমিক যে খসড়া অনুবাদ করি সেটা অনেকটাই মজদুরি। আক্ষরিক অনুবাদ। সেটাকে পরে আমি ঘষে মেজে ব যেভাবে বললে এটা বাংলা বলে মনে হবে, সেটাই করি। খুব খুব পরিশ্রমের কাজ, শারীরিক পরিশ্রম, তাই একটা ডিসিপ্লিনের মধ্যে না থাকলে করা যায় না।

১০. আজকের সমাজে দাঁড়িয়ে অনুবাদকের গুরুত্ব কতটা?

উত্তর- পৃথিবীতে সংগঠিত হিংসা খুব বেড়ে গেছে। মানুষের জাতিগত, ধর্মীয় পরিচয় মানুষের থেকে বড় হয়ে উঠেছে। এই হিংসা দূর হতে পারে যদি আমরা পরস্পরকে আর একটু জানি, আর একটু বুঝি, আর একটু ভালবাসি। সেই জন্য অনুবাদ হওয়া জরুরি। কারণ অনুবাদ আমাদের মধ্যের সব দেওয়াল ভেঙে দিতে পারে। অনুবাদই পারে সীমান্তহীন ভেদাভেদহীন পৃথিবী গড়তে।

১১. অনুবাদকের সব থেকেবড় দায়বদ্ধতা কী বলে মনে করো? ‘

উত্তর- অনুবাদকের সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা নিজের কাছে সৎ থাকা। সে কী করতে চাইছে তার সম্পররকে পরিষ্কার ধারণা থাকা উচিত। হয়তো অর্থের জন্য অ্যাসাইন্ড অনুবাদ করতে হয়, সেখানে নিজের চয়েস থাকে না। কিন্তু নিজের ইচ্ছেয় ও অভিপ্রায়ের অনুবাদে অবশ্যই একটা রুচি ও নির্বাচন থাকবে। অনেকের অনুবাদের নির্বাচন খুব এলোমেলো। কোন বিশেষ ভাষা, বিশেষ বিষয়, বিশেষ লেখক- এইসবের একটা ভাবনাচিন্তা দরকার।

তৃষ্ণা বসাক (জন্ম- অগস্ট ২৯) একজন ভারতীয় বাঙ্গালি লেখক। সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে তিনি একজন স্বীকৃত বহুমুখী প্রতিভাশালী লেখক। কবিতা, ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক,  প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা, শিশুসাহিত্য এবং কল্পবিজ্ঞান- সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর অবাধ বিচরণ।

তিনি মৈথিলী, মালয়ালম ও হিন্দি ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন। বর্তমানে কলকাতা ট্রান্সলেটর্স ফোরামের সচিব। তৃষ্ণা কলকাতায় থাকেন।

তৃষ্ণা বিশ্বাস করেন যে সাহিত্য একটি পূর্ণ সময়ের পেশা এবং তাঁর কথায় একটি আখ্যানবস্তু গড়ে তুলতে লেখককে একটি একটি করে শব্দ অতি যত্নে বাছতে হয়, যেমন ভাবে একজন রাজমিস্ত্রি নিখুঁত দক্ষতায় ইঁটের পরে ইঁট সাজিয়ে একটি মজবুত কাঠামো গড়ে তোলেন।  বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মিলান কুন্দেরার গভীর অনুরাগী তৃষ্ণার রচনায় যেমন ছড়িয়ে থাকে অলীক মায়া, তেমনি এক অবহ ভারহীনতা। প্রযুক্তির  সংশ্লিষ্টতা তাঁর আখ্যানকে ডিজিটাল সিগন্যালের মতো কাটা-কাটা বিচ্ছিন্ন অস্তিত্বে ভেঙে দ্যায়।  সঙ্গীতে তাঁর অন্তর্লীন অনুরাগ তাঁর রচনাশৈলীর জটিল ম্যাট্রিক্স নির্মাণে সাহায্য  করে।

শৈশবে নাটক দিয়ে লেখালেখির শুরু, প্রথম  প্রকাশিত কবিতা ‘সামগন্ধ রক্তের ভিতরে’, দেশ, ১৯৯২। প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘আবার অমল’ রবিবাসরীয় আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯৯৫।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক তৃষ্ণা পূর্ণসময়ের সাহিত্যকর্মের টানে ছেড়েছেন লোভনীয় অর্থকরী  বহু পেশা। সরকারি মুদ্রণ সংস্থায় প্রশাসনিক পদ, উপদেষ্টা বৃত্তি,বিশ্ববিদ্যালয়ের  পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে আঞ্চলিক ভাষায় অভিধান প্রকল্পের দায়িত্বভার- প্রভৃতি বিচিত্র  অভিজ্ঞতা তাঁর লেখনীকে এক বিশেষ স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে।

প্রাপ্ত পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে– সাহিত্য অকাদেমি তরুণ লেখক ভ্রমণ অনুদান ২০০৮ ,পূর্ণেন্দু ভৌমিক স্মৃতি পুরস্কার ২০১২, সম্বিত সাহিত্য পুরস্কার ২০১৩ ,কবি অমিতেশ মাইতি স্মৃতি সাহিত্য সম্মান ২০১৩ ,ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার (বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ) ২০১৩ ,ডলি মিদ্যা স্মৃতি পুরস্কার ২০১৫, সোমেন চন্দ স্মারক সম্মান (পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি) ২০১৮ ,সাহিত্য কৃতি সম্মান (কারিগর) ২০১৯ ,কবি মৃত্যুঞ্জয় সেন স্মৃতি সম্মান ২০২০ ,নমিতা চট্টোপাধ্যায় সাহিত্য সম্মান ২০২০ ,ইতি পুরকায়েত স্মৃতি পুরস্কার ২০২২ ,অদ্বিতীয়া নির্বাচিত  সম্মান  ২০২৩, যোগমায়া দে স্মৃতি পুরস্কার  ২০২৪, রমেন্দ্রকুমার আচার্য চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার  ২০২৪, তোর্ষা সাহিত্য সংস্থার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক সম্মান,  কোচবিহার,  ২০২৪, ভারতী গঙ্গোপাধ্যায় স্মৃতি সম্মান ২০২৫ , কবি চন্দ্রাবতী স্মৃতি সম্মান ২০২৫, ভাষা সংসদ ও অন্যান্য আরো পুরস্কার

তৃষ্ণা বসাকের অনুবাদ গ্রন্থ- অজিত আজাদের কবিতা, নবারম্ভ প্রকাশন, ২০১৮ , মূল মৈথিলী থেকে অনুবাদ- তৃষ্ণা বসাক , ভারতীয় কবিতায় নারীর স্বর, ধানসিঁড়ি, ২০২০ , আকাশপথে আশ্চর্য ভ্রমণ,সৃষ্টিসুখ 2024 , উষাকিরণ খানের গল্প,মিসিসিপির মেঘ,2024 , ভারতীয় গল্পে নারীর স্বর  প্রকাশিতব্য ধানসিড়ি। নির্বাচিত মলয়ালম গল্প, ই সন্তোষকুমার , অনুষা পাবলিশিং, ভারতীয় সাহিত্য,  বাড়ির কাছে আরশিনগর, গীর্বাণ , পি কে পারাক্কাদাভু। নির্বাচিত মলয়ালম অণুগল্প, তবুও প্রয়াস  ,সুফির কথা, কে পি রামান্নুয়ি, সম্পাদনা- তৃষ্ণা বসাক, এবং অধ্যায় , ই কে শিবার সেরা গল্প, ভাষা সংসদ , অনুবাদের তত্ত্ব তালাশ, সম্পাদনা- তৃষ্ণা বসাক ও নবনীতা সেনগুপ্ত, অনুষা পাবলিশিং

অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা - তৃষ্ণা বসাক

১৭ : অনুবাদের বাদ বিসংবাদ ও সংবেদনা

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

সীমান্তহীন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায় অনুবাদ

This entry is part 18 of 18 in the series অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক ১ : অনুবাদের

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

সীমান্তহীন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায় অনুবাদ

This entry is part 18 of 18 in the series অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক ১ : অনুবাদের

Read More »

২ : কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ একটি বাড়ির চোখ দিয়ে দেখা দুই শতাব্দীর ইতিহাস, মানুষের জীবন ও সময়ের নির্মম পরিবর্তনের কাহিনি পর্ব : দুই তিন রোজকার মতো সকাল-সকাল ঘোষালবাড়িতে

Read More »