২ : কালের প্রহরী

২ : কালের প্রহরী

একটি বাড়ির চোখ দিয়ে দেখা দুই শতাব্দীর ইতিহাস, মানুষের জীবন ও সময়ের নির্মম পরিবর্তনের কাহিনি

তিন

রোজকার মতো সকাল-সকাল ঘোষালবাড়িতে হাজির হয়ে গেল বংশী। নতুন বাড়ির বৈঠকখানায় বসে অপেক্ষা করে মনিবের। সত্যচরণ তৈরি হয়ে বেরোলেই একসঙ্গে যাবে আড়তে।

বংশীর মতো বিশ্বস্ত কর্মচারী সত্যচরণের আড়তে দুজন নেই। কারবার যেদিন শুরু করেছিল সত্যচরণ, সেদিন থেকেই তার ছায়াসঙ্গী এই বংশী।

বংশী বলে,
— ছোটঠাকুর, আমরা ঘোষালবংশের নুন খেইছি, তাই জীবন দিতে পারি গো তোমাদের জন্যে। আমার বাপ ছিল বটঠাকুরের খাস লোক। তিনি বলতেন, হারুর নৌকোয় চাপলে আমি নিশ্চিন্তি। রাতভিত, বর্ষা-বাদলা, যখনই হোক, হারু মাঝি ছাড়া কারুর নৌকোয় তিনি চাপতেন না। আমাদের তিন পুরুষের পেটে তোমাদের অন্ন আছে গো ঠাকুর। তাই তোমার জন্যে সব করতে পারি।

এই বলেই মাঝিগিরি ছেড়ে এক কথায় রাজি হয়ে সত্যচরণের আড়তে লেগে পড়েছিল বংশী। সেই থেকে সে জুড়ে আছে সত্যচরণের সঙ্গে।

সকাল হলেই চলে আসে ঘোষালবাড়িতে। তার ছোটঠাকুর তৈরি হয়ে বেরোলেই মাথায় ছাতা ধরে সত্যচরণের এক কদম পিছন-পিছন হাঁটতে থাকে বংশী। হাতে চাবির থলিটা ঝুলিয়ে, মুখে একখান পান গুঁজে আগে আগে চলে সত্যচরণ। নানান জ্ঞানগর্ভ কথা আর উপদেশের বন্যা বয়ে যায় তখন। যার পনেরো আনাই বেরিয়ে যায় বংশীর মাথার ওপর দিয়ে।

তবে পথ চলার সময় বংশীর সঙ্গে যেসব জ্ঞানগর্ভ কথাবার্তা সত্যচরণ বলে, তার লক্ষ্য আসলে পথচলতি মানুষ আর গাঁয়ের গরিব-গুর্বোরা। বংশী কেবল উপলক্ষ মাত্র। সে কথা বংশীও যে বোঝে না, এমন নয়। তবু সব কথাতেই মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে মনিবকে তুষ্ট করতে কখনও ভুল করে না বংশী। এ গুণ সে পেয়েছে তার বাপ হারুর থেকে।

বিনোদচরণের বাঁধা মেয়েছেলে ছিল গোপীগঞ্জে। একসময় এই গোপীগঞ্জের সুখ্যাতি ছিল খান তিনেক জেলা জুড়ে। গোপীগঞ্জের হাটে হত নামকরা হাটুরেদের ভিড়। উলুবেড়ে, ফুলেশ্বর, চেঙ্গাইল, খোলসিনি, বাউড়িয়া, রানিহাটি, এমনকি বাগনানের আশপাশের গ্রাম থেকেও হাটুরের দল নৌকো ঠেসে মাল আনত গোপীগঞ্জের হাটে।

এ হাটের বিকিকিনিতে প্রাণ জুড়িয়ে যেত কারবারিদের। লাভের কড়ি গুনতে গুনতে কোনো কোনো হাটুরের প্রথম রিপু সক্রিয় হত প্রবলভাবে। তাই দু-এক রাত এখানে কাটিয়ে একটু ফূর্তিফার্তার ব্যবস্থা করাও ছিল বিস্তর।

গোপীগঞ্জের মেয়েছেলেদের দরও নাকি ছিল বেশ চড়া। তাই বাইজি, নাচিয়ে, পায়রা উড়িয়ে বাবুগিরির নেশা ছিল যেসব বড়লোকের, তাদের অনেকেই তখন বাঁধা মেয়েমানুষ রেখে দিত এই গোপীগঞ্জে। কলকাতার কত নামীদামি বাবু যে গোপীগঞ্জের মেয়েমানুষ নিয়ে গিয়ে নিজের বাগানবাড়িতে তুলত, তার হিসেব নেই।

বিনোদচরণেরও তেমন বাঁধা রাঁড় রাখা ছিল এই গোপীগঞ্জে। সেই রাঁড়ের বাড়ি আসার জন্য একমাত্র বিশ্বস্ত লোক ছিল হারু। পেটে হাজার ঘুষি মারলেও বিনোদচরণের ওপাড়ায় যাতায়াতের বিষয় কিংবা চপলা সুন্দরী সম্বন্ধে এক ছটাক কথাও কোথাও কোনোদিন উচ্চারণ করেনি হারু।

কথায় কথায় সে বলত,
— ঘোষালবংশের নুন খেইছি, তাই বেইমানি করতে পারবুনি।

উত্তরাধিকারসূত্রে বিনোদচরণের অনেক গুণ পেলেও ওই নিষিদ্ধ পাড়ায় গিয়ে ফূর্তি করার নেশাটা অবশ্য সত্যচরণের নেই। তবে বন্ধকি কারবারটা অবশ্য সত্যচরণের উত্তরাধিকারসূত্রেই পাওয়া।

পিছু-পিছু ছাতা হাতে হাঁটতে থাকা বংশীকে সত্যচরণ বলল,
— বুঝলি বংশী, বড় খোকা চিঠি পাঠিয়েছে। দুনিয়া জুড়ে যুদ্ধ লেগেছে, শুনেছিস তো, নাকি? ও দেশে কিন্তু খুব কড়াকড়ি। পাউরুটিও নাকি রেশনে পাওয়া যাচ্ছে। কী দিনকাল পড়ল বল তো? মানুষ খাবে কী? এ দেশে তবু তো চাল, নুন হাটে-বাজারে পাওয়া যাচ্ছে রে।

সত্যচরণের এসব কথার লক্ষ্য আসলে প্রমোদ। ওদের জ্ঞাতিভাই পরমানন্দের ছেলে। স্বদেশি করত। এ তল্লাটে বিলিতি বর্জনের নেতৃত্বও দিয়েছিল কয়েক বছর আগে। বনগ্রামের জমিদারের কাছারিতে স্বদেশি ডাকাতির অভিযোগে বছর দুয়েক জেলও খেটেছে।

এখন নাকি তলে-তলে লোক খেপিয়ে বেড়াচ্ছে সত্যচরণের বিরুদ্ধে। চালের দাম বাড়ছে, মানুষ খেতে পাচ্ছে না, ওদিকে সত্যচরণের আড়তে নাকি বস্তা-বস্তা চাল পচছে।

খদ্দর পরা সেই স্বদেশি প্রমোদকে দেখেই কথাগুলো বলল সত্যচরণ। আসলে সে বোঝাতে চায়, যুদ্ধের বাজারে খোদ বিলেতেই যেখানে রুটি কিনতে রেশন দোকানে লাইন দিচ্ছে লোকে, সেখানে এ দেশে চালের দাম বাড়াটা খুব একটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

তবে তার উদ্দেশ্য সাধন হল কি না, বুঝল না সত্যচরণ। হন্তদন্ত হয়ে প্রমোদ নেমে গেল খালপাড়ে। জোড়াবটতলায় বাঁধা নৌকায় গিয়ে চাপল প্রমোদ।

— ও বংশী, কার নৌকো রে? চিনিস নাকি মাঝিকে?

ছোটঠাকুরের প্রশ্নে মাথা নাড়ে বংশী। চোখ বড় করে, ঠোঁট উল্টিয়ে বলে,
— না গো ঠাকুর, এ তো আমাদের জানাশোনা কেউ না। এ তল্লাটের মাঝি হলেই কি আর আমি চিনতুমনি?

কপালে ভাঁজ ফেলে পিছন ফিরে তাকায় সত্যচরণ। তাড়াতাড়ি নৌকো খুলে লগি মারে মাঝি। পাটাতনে বসে বিড়ি ধরায় প্রমোদ।

বিজয়াদশমীর পরের দিন সকালবেলায় আড়তে এল ফজলুল মিঁয়া। পুজালির সম্পন্ন চাষি। সত্যচরণের সঙ্গে বেশ সখ্য আছে। এদিকে এলে একবার আড়তে এসে গল্পগাছা না করে ফেরেন না ফজলুল মিঁয়া। তার জন্য আলাদা হুঁকোর ব্যবস্থাও আছে আড়তে।

তাকে দেখে সত্যচরণ বলল,
— ও বংশী, মিঁয়া এসেছে রে। দুজনের জন্যে তামাক সেজে আন।

ফজলুল মিঁয়ার আজ মুখ ভার। কোনো কথা না বলেই মিঁয়া চৌকিতে বসে। গদি থেকে নেমে হাত দুটো বাড়িয়ে দেয় সত্যচরণ—বিজয়ার কোলাকুলির আহ্বান।

বিষণ্ণ মুখে কোলাকুলি করে সত্যচরণের দিকে তাকিয়ে মিঁয়া বলে,
— সব শুনেছ তো ঘোষাল? কাল বজবজ ইস্টিশনে কী কাণ্ডটা ঘটাল লালমুখো সাহেবগুলো?

একটু বিস্মিত হয় সত্যচরণ। এমন কোনো ঘটনা তো তার কানে আসেনি! এই তো অষ্টমীতে ঠাকুর দেখতে গেল বজবজে। চার বাড়ির ঠাকুর দেখে, ঘোষবাড়ির দালানে বসে যাত্রা শুনে ভোররাতে বাড়ি ফিরল। সেদিন কত লোকের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হল। তেমন কিছু তো শুনল না।

— কী কাণ্ড, মিঁয়া?

— আর বলো কেন! সে এক রক্তারক্তি কাণ্ড, ঘোষাল। কত মানুষ যে মরেছে গোরা পুলিশ আর মিলিটারিদের হাতে, তার নাকি হিসেব পাওয়া যাচ্ছে না।

— কী বলছ, মিঁয়া? এক দিনের মধ্যে কী এমন ঘটল যে এত খুনোখুনি?

— বলছি। ও বংশী, তামাক টানিয়ে আয় চট করে।

দুই ইয়ারেই হুঁকোয় টান দেয়। একটু শ্বাস নিয়ে শুরু করে ফজলুল।

এ ঘটনার জন্য কোনো প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছিল না এই জনপদে। অন্তত চড়িয়াল কিংবা সত্যচরণের বাড়ি-বুইতার লোকজনের কাছে এমন কানাকানি কখনও শোনা যায়নি। পুজালির মানুষও কোনোদিন শোনেনি এ বিষয়ে কোনো কথা।

তবুও যত কাণ্ড ঘটে গেল, এ তল্লাটেই।

ঘটনার বীজ পোঁতা হয়েছিল কয়েক হাজার মাইল দূরে। সেটা ছিল ফেলে আসা শতক।

১৮৯৭ সালের ২২ জুন।

মহারানি ভিক্টোরিয়ার সিংহাসনপ্রাপ্তির হীরকজয়ন্তী বর্ষ। ব্রিটেনে শুরু হল এক চোখ-ধাঁধানো উৎসব। সারা বিশ্বের রাষ্ট্রনেতারা আমন্ত্রিত হলেন বাকিংহাম প্রাসাদে। সমাজের বিভিন্ন জগতের বাছা-বাছা লোকেদের ডাক পড়ল বিলেতে।

সে এক দক্ষযজ্ঞ বটে।

সে উৎসবের নিরাপত্তার কারণে ভারত থেকে পাঠানো হল শিখ রেজিমেন্টের একদল সৈন্য। উৎসব শেষে ফেরার পথে ভারতীয় সৈন্যরা ব্রিটিশের আর এক উপনিবেশ কানাডা হয়ে দেশে ফেরে।

কানাডায় নোঙর করা জাহাজে বসেই তারা খবর পায় যে, সেদেশের ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ফ্রেসার নদীর উপত্যকায় বিপুল পরিমাণ উর্বর জমি অনাবাদি থাকে লোকের অভাবে। সেখানে চাষাবাদ আর ক্ষেত-খামার করার সুযোগ আছে প্রচুর।

সে খবর পৌঁছল পঞ্চনদের দেশে। তারপর থেকেই দলে দলে শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ পাড়ি জমাতে লাগল ব্রিটিশ কলম্বিয়ায়। সেটাও ইংরেজের উপনিবেশ, তাই মহারানির প্রজা হিসেবে যাতায়াতে কোনো আইনি বাধা ছিল না।

ভাগ্যান্বেষণে যাওয়া সেদেশে শিখ সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যাটা ১৯০৭ সালের মধ্যেই গিয়ে দাঁড়াল দু-হাজারের বেশি। ১৯১৩ সালে সেই সংখ্যা ছুঁয়েছিল চার হাজারে।

এ বিষয়ে ক্রমশ বাড়ছিল ও দেশের মানুষের ক্ষোভ। বিদেশিদের ভিড়ে স্থানীয় মানুষের জীবিকায় টান পড়তে পারে—এ আশঙ্কায় ভুগতে থাকে কানাডাবাসী।

তাই ১৯০৮ সালের ৮ জানুয়ারি সেদেশে তৈরি হল এক আইন—কন্টিনিউয়াস জার্নি রেগুলেশন অ্যাক্ট

আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশশাসিত বিভিন্ন উপনিবেশ থেকে সেদেশে জীবিকার্জনের জন্য যাওয়া মানুষের স্রোত আটকানো।

নতুন আইনে একমাত্র ব্রিটিশশাসিত কোনো ভূখণ্ড থেকে সেদেশের ভূমিপুত্র যদি সরাসরি কোনো জলযানের যাত্রী হয়ে কানাডায় আসে, যে জলযানে যাত্রা শুরুর আগেই তার আসন সংরক্ষিত হয় এবং সেই যাত্রীর কাছে ন্যূনতম দু-শো কানাডিয়ান ডলার থাকে, তবেই তাকে স্পর্শ করতে দেওয়া হবে কানাডার মাটি।

কিন্তু ভারতীয় জীবিকা-প্রার্থীদের কাছে এর একটি শর্তও পূরণ করা সম্ভব ছিল না। কোনো যাত্রীবাহী জাহাজ সরাসরি ভারত থেকে কানাডা তো যেত না। তাই দেশের মাটি থেকে আগাম টিকিট কিনে জাহাজে চড়ে কানাডা যাত্রার সম্ভাবনাও ছিল না। ভাগ্যান্বেষণে যাওয়া কোনো ভারতীয় শ্রমিকের কাছে দু-শো ডলারের পুঁজি থাকাটাও তো স্বপ্নাতীত বিষয়।

গুরদিত সিং নামের এক ভারতীয় ব্যবসায়ী ব্রিটিশ উপনিবেশ সিঙ্গাপুর ও মালয় স্টেটে ঠিকাদারের কাজ করে বেশ বিত্তশালী হয়ে উঠেছিলেন। ওখান থেকে কানাডায় ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার শহর ভ্যাঙ্কুভারেও গিয়ে বেশ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন।

বছর পাঁচেক আগে একবার ভারতে আসেন এই গুরদিত সিং। তখন পাঞ্জাব প্রদেশের বিপুল অংশের কর্মঠ যুবসম্প্রদায়ের মধ্যে বেকারত্ব চরমে। ওদের শরীর আছে, স্বাস্থ্য আছে, কিন্তু হাতে কাজ নেই। বিঘের পর বিঘে জমি পড়ে থাকে রুখা-শুখা। চাষবাস হয় না জলের অভাবে।

গুরদিত সিং ভাবলেন, এই যুবশক্তির একট অংশকে নিয়ে তিনি পাড়ি দেবেন ব্রিটিশ কলম্বিয়ায়। সেখানে কৃষিকাজের সুযোগ নিয়ে তারা বেকারত্ব ঘোচাতে পারবে।

তবে সে ভাবনা বাস্তবায়নের সুযোগ আর খুব তাড়াতাড়ি হল না। সেদেশে ফিরে গিয়ে আবার তিনি ডুবে গেলেন নিজের ব্যবসাতে।

১৯১৩ সালে গুরদিত সিং ফিরলেন সিঙ্গাপুর আর হংকং-এ। সেখানকার বহু ভারতীয় বাড়তি রোজগারের আশায় আগ্রহী হয়ে উঠল ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় পাড়ি জমাতে।

এদিকে ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় নতুন অভিবাসন আইন বলবৎ হওয়ার পর এ দেশের শিখ সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে প্রবল ক্ষোভ। অন্যদিকে ১৯১৩ সালে, মানে গত বছরেই, আমেরিকার মাটিতে তৈরি হয়েছে এক বিপ্লবী দল—গদর পার্টি।

যারা ভারতের স্বাধীনতার লক্ষ্যে বিপ্লব ঘটাতে চায় এ দেশের মাটিতে। এ বিষয়ে তারাও ফুঁসছে ক্ষোভে। দেশপ্রেমিক ভারতীয়দের ব্রিটিশের বিরুদ্ধে এই ক্ষোভকে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে সচেষ্ট হয় গদর পার্টি।

গুরদিত সিং বছরের প্রথম দিকেই সিদ্ধান্ত নিলেন, ব্রিটিশ কলম্বিয়ার এই আইনের তিনি প্রতিবাদ করবেন। কয়েকশো ভারতীয়কে নিয়ে যাত্রা করবেন কানাডায়। পাশে পেয়েছেন বেশ কয়েকজন সিঙ্গাপুরবাসী ভারতীয়কে।

সেই উদ্দেশ্যে হংকং থেকে জাপানি যাত্রীবাহী জাহাজ ‘কোমাগাতামারু’-কে ভাড়া নিলেন। সে বছরের ২৭ মার্চ সেই জাহাজ চার্টার করলেন ছয় মাসের জন্য। মাসিক এগারো হাজার হংকং ডলারে স্বাক্ষরিত হল চুক্তিপত্র।

মার্চ মাসেই যাত্রার দিন স্থির করে গুরদিত সিং শুরু করলেন টিকিট বিক্রি। সিঙ্গাপুরের ব্রিটিশ পুলিশ এই ‘বেআইনি কাজের জন্য’ গ্রেফতার করল গুরদিত সিংকে।

কিন্তু বন্দি গুরদিত সিংয়ের অপরাধ এবং তার বিচার-সংক্রান্ত কোনো নির্দেশই ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে পৌঁছল না। তাই ক’দিন পরেই মুক্তি পেলেন তিনি।

হংকং-এর গভর্নর ফ্রান্সিস হেনরি মে অনুমতি দিলেন কোমাগাতামারুর কানাডা যাত্রার জন্য টিকিট বিক্রি এবং যাত্রী নিয়ে দেশ ছেড়ে যাওয়ার।

সে বছরের ৪ এপ্রিল কোমাগাতামারু যাত্রা শুরু করল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের হংকং থেকে। ১৬৫ জন যাত্রী উঠলেন জাহাজে। হংকং বন্দর থেকে চিনের সাংহাই পৌঁছল ৮ এপ্রিল। সেখান থেকে যাত্রী পেলেন ১১১ জন। তারা সবাই ভারতীয়।

১৪ এপ্রিল জাহাজ সাংহাই বন্দর ছেড়ে যাত্রা করল জাপানের উদ্দেশ্যে। জাপানের মোজি বন্দরে পৌঁছল ১৮ এপ্রিল। সেখান থেকে ৮৬ জন যাত্রী নিয়ে ২৯ এপ্রিল রওনা হল ইয়োকোহামার উদ্দেশ্যে। সেখানে পৌঁছল ২ মে।

সেখান থেকে আরও ১৪ জন ভারতীয় যাত্রী নিয়ে কোমাগাতামারু চূড়ান্ত যাত্রা শুরু করল ৩ মে।

জাহাজে মোট ৩৭৬ জন ব্রিটিশ ভারতের নাগরিক যাত্রী হিসেবে শুরু করলেন কানাডা যাত্রা। যাদের মধ্যে ৩৩৭ জন শিখ, ২৭ জন মুসলিম এবং ১২ জন ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। যাত্রীদের প্রত্যেকেই জন্মসূত্রে পাঞ্জাব প্রদেশের বাসিন্দা।

দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার শেষে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে জাহাজ পৌঁছল ২৩ মে রাত আড়াইটায়।

ইতিমধ্যেই ভারত, হংকং এবং সিঙ্গাপুরের ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত খবর পৌঁছয় ব্রিটিশ কলম্বিয়ায়। সরকারি বার্তা ছিল এমনটাই—কোমাগাতামারু জাহাজে আছে একদল গদর পার্টির সক্রিয় কর্মী, জাহাজের প্রতিটি যাত্রীই ব্রিটিশ কলম্বিয়ার আইনভঙ্গকারী।

তাই এ জাহাজকে কানাডার মূল ভূখণ্ডে প্রবেশাধিকার দেওয়া যাবে না।

মূল বন্দরের দু-শো মিটার আগে কোল হারবারে আটকে দেওয়া হল কোমাগাতামারুকে।

রবার্ট বোর্ডেন, ব্রিটিশ কলম্বিয়ার প্রধানমন্ত্রী, ঘোষণা করলেন কোনোভাবেই এই যাত্রীদের নামতে দেওয়া হবে না সেদেশের মাটিতে।

ঘোষণামতো বন্দরের মাটি স্পর্শ করতে দেওয়া হল না যাত্রীদের।

খবর পেয়েও দেশে বসবাসকারী ভারতীয়রা এগিয়ে এলেন কোমাগাতামারুর যাত্রীদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়াতে। নবাগত ভারতীয়দের সাহায্যার্থে তৈরি হল ‘শোর কমিটি’। হুসেইন রহিম ও সোহনলাল পাঠকের নেতৃত্বে শোর কমিটি শুরু করল অর্থসংগ্রহ।

তারা গদর পার্টির সহযোগিতায় কয়েক দিনের মধ্যেই সংগ্রহ করল বাইশ হাজার ডলারের তহবিল। ও দেশের আইনের দরজায় কড়া নাড়ল তারা। কিন্তু লাভ হল না।

এদিকে জাপানি জাহাজ কোম্পানির এজেন্ট দু-মাসের বকেয়া ভাড়া বাবদ বাইশ হাজার ডলার দ্রুত মিটিয়ে দেওয়ার দাবি করতে থাকে গুরদিত সিংয়ের কাছে।

গুরদিত সিং পড়লেন মহাসংকটে। কানাডার মাটিতে নামতে না পারলে যে তাঁর পক্ষে এই অর্থ মেটানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

সেই সংকটমোচনে এগিয়ে এল শোর কমিটি। সংগৃহীত ২২ হাজার ডলার ভাড়াবাবদ তুলে দিলেন জাহাজ কোম্পানির এজেন্টকে।

৬ জুলাই ব্রিটিশ কলম্বিয়ার আদালতের ফুল বেঞ্চ ঘোষণা করল, ইমিগ্রেশন অফিসের সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাদের কিছু করার নেই। নতুন আইনের বলে মাত্র ১৪ জন যাত্রী, যারা ইয়োকোহামা থেকে সরাসরি কানাডায় এসেছিলেন, তাদের অনুমতি দেওয়া হল বন্দরে নামার।

বাকিরা দিনের পর দিন বন্দিজীবন যাপন করতে লাগলেন বন্দরে দাঁড়িয়ে থাকা কোমাগাতামারুতে।

কানাডা সরকারের পক্ষ থেকে জাহাজের ক্যাপ্টেনকে নির্দেশ দেওয়া হল দ্রুত কোল হারবার ত্যাগ করে আবার সমুদ্রের দিকে রওনা হওয়ার জন্য।

কিন্তু জাহাজের যাত্রীরা থাকলেন অনমনীয়। ক্যাপ্টেন তাঁর অসহায়তার কথা জানালেন সরকারকে।

১৭ জুলাই কানাডা সরকার দুটি লঞ্চভর্তি পুলিশবাহিনী পাঠায় জাহাজকে বন্দর ছেড়ে সমুদ্রের দিকে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু জাহাজের ডেক থেকে বড়-বড় কয়লার চাঁই ছুড়তে শুরু করে কোমাগাতামারুর ক্ষুব্ধ যাত্রীরা। আহত হয় লঞ্চের বেশ কয়েকজন পুলিশ।

সেদিন বাধ্য হয়ে ফিরে গেল পুলিশবাহিনী।

ক্রমশ ধৈর্যহারা অবরুদ্ধ যাত্রীদের জাহাজসহ বিতাড়িত করতে ২১ জুলাই রয়্যাল কানাডিয়ান নেভির এইচএমসিএস নামের রণতরীকে নিয়োগ করা হল ভ্যাঙ্কুভারের বন্দরে।

দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার ক্লান্তি এবং দিনের পর দিন বন্দিজীবনে অবসন্ন যাত্রীদের একাংশকে গ্রাস করেছিল হতাশা। এমন সময় যুদ্ধজাহাজভর্তি সশস্ত্র সেনাবাহিনীর সামনে নিতান্তই অসহায় হয়ে পড়ে কোমাগাতামারুর যাত্রীরা।

টানা দু-মাস অবরুদ্ধ রাখার পর ২৩ জুলাই কোমাগাতামারুকে বাধ্য করা হল ভ্যাঙ্কুভার ত্যাগ করে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে।

এই ব্যর্থতার গ্লানি কর্মঠ, স্বাধীনচেতা, দেশপ্রেমিক একদল যাত্রী ও দলনেতা গুরদিত সিংয়ের পক্ষে মেনে নেওয়া সহজ হল না।

কানাডা অভিযানের এমন অসম্মানজনক পরিণতির জন্য ভারতের ব্রিটিশ সরকারের প্রতিই যাবতীয় ক্ষোভ হল পুঞ্জীভূত।

অন্যদিকে ভারতের স্বাধীনতা লাভের উদ্দেশ্যে তৈরি হওয়া গদর পার্টি যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছে আমেরিকা ও কানাডায়। দলের প্রত্যেক সদস্যকেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হয় এই মর্মে যে, বিদ্রোহের ডাক এলেই সবাই ভারতে ফিরে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে স্বাধীনতা সংগ্রামে।

গদর পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় তৈরি হয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকোতে। নাম যার—‘যুগান্তর আশ্রম’

যুগান্তর আশ্রম থেকে গদর পার্টির সাপ্তাহিক মুখপত্র প্রকাশ পেতে শুরু করেছে ১৯১৩ সালের ১ নভেম্বর। হিন্দি, উর্দু ও ইংরেজি ভাষায় নিয়মিত প্রকাশিত সেই পত্রিকা পৌঁছে যাচ্ছে আমেরিকার বিভিন্ন শহর, কানাডা ও ভারতবর্ষে।

ভারতে ব্রিটিশ সরকারের বিভিন্ন অত্যাচার, অন্যায়ের ঘটনা বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয় এখানে। কোমাগাতামারু জাহাজের সমস্ত ঘটনার বিবরণ এবং এর প্রতিবাদে উত্তেজক প্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছে এই পত্রিকায়।

ভ্যাঙ্কুভারে অবরুদ্ধ থাকার সময়েও এ পত্রিকার বেশ কয়েকটি সংখ্যা গোপনে পৌঁছে যায় কোমাগাতামারুতেও।

তাই কোমাগাতামারুর এই ব্যর্থতার গ্লানিকে দেশাত্মবোধে পরিণত করে ইংরেজের প্রতি ঘৃণায় পর্যবসিত করতে সাহায্য করল গদর পার্টি ও তার মুখপত্র।

ফলে গুরদিত সিং ও তাঁর সহকর্মীরা অনুরক্ত হয়ে পড়লেন গদর পার্টির প্রতি। ব্রিটিশ সরকারেরও অজানা থাকল না কোমাগাতামারুর ওপর গদর পার্টির নিয়ন্ত্রণের কথা। তাই ফিরতি পথে কোমাগাতামারুর সমস্ত গতিবিধি সন্দেহের চোখে অনুসরণ করতে লাগল ব্রিটিশ সরকার।

১৫ আগস্ট কোমাগাতামারু পৌঁছল জাপানের ইয়োকোহামায়। যাত্রীরা অবতরণ করতে চাইলেন বন্দরে। মিলল না অনুমতি।

জাহাজে দেখা দিয়েছিল খাদ্যের সংকট। সেদেশের ব্রিটিশ কনসোলের শরণাপন্ন হলেন গুরদিত সিং ও সহযোগীরা। কিন্তু কোনো খাবারের ব্যবস্থা না করেই তিনি বিদায় করে দিলেন।

ইয়োকোহামাতেই গুরদিত সিং পেলেন হংকং সরকারের এক চিঠি। সেখানে পরিষ্কার লেখা আছে, কোমাগাতামারুর কোনো যাত্রীকেই নামতে দেওয়া হবে না সেদেশে।

২০ আগস্ট কোমাগাতামারু পৌঁছল জাপানের কোবেতে। ততক্ষণে জাহাজের খাদ্যভাণ্ডার পৌঁছেছে প্রায় শূন্যে। সমস্ত যাত্রীদল একসঙ্গে বন্দরে নেমে ব্রিটিশ কনসোলের অফিস ঘেরাও করল খাদ্যের দাবিতে।

১৫ জন যাত্রী নেমে গেলেন কোবেতে। বাকিরা খাদ্যের দাবিতে তুমুল বিক্ষোভ শুরু করল ব্রিটিশ কনসোলের অফিসে।

জাপান সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের ব্রিটিশ সরকারের কাছে টেলিগ্রাম করে জানতে চাওয়া হল—এই উচ্ছৃঙ্খল যাত্রীদের কী করা হবে?

উত্তরে ভারত সরকার জানায়, এই বিপজ্জনক রাজনৈতিক শক্তি-নিয়ন্ত্রিত দলটিকে পাঠিয়ে দেওয়া হোক কলকাতায়।

সেইমতো জাপান সরকার কিছু খাদ্য ও পানীয় জলের ব্যবস্থা করে কোমাগাতামারুকে পাঠিয়ে দিল কলকাতার উদ্দেশ্যে।

৩ সেপ্টেম্বর কোবে বন্দর ছাড়ল কোমাগাতামারু। ১৬ সেপ্টেম্বর পৌঁছয় সিঙ্গাপুর। সেখানকার সরকার একজনকেও নামতে দিল না তার ভূখণ্ডে। রাইফেলধারী সৈন্য দিয়ে ঘিরে রাখা হল জাহাজকে।

অবশেষে ১৯ সেপ্টেম্বর কোমাগাতামারু সিঙ্গাপুর থেকে যাত্রা শুরু করে কলকাতার দিকে।

গদর পার্টির অকল্পনীয় পরিকল্পনার ফলে প্রায় প্রতিটি বন্দরে, যেখানেই নোঙর করেছে কোমাগাতামারু, সেখানেই পৌঁছে গেছে পত্রিকার সংখ্যা। আর সেই পত্রিকা পাঠের মধ্য দিয়েই ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব হয়েছে তীব্রতর।

অন্যদিকে বিন্দুমাত্র স্বার্থ না থাকা সত্ত্বেও ব্রিটিশের উপনিবেশ হওয়ার কারণেই ভারতও জড়িয়ে পড়েছে বিশ্বযুদ্ধে।

ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ এ বছর, অর্থাৎ ৫ আগস্ট ১৯১৪, ইন্ডিয়া গেজেটে সমস্ত ভারতবাসীর প্রতি এক ঘোষণাপত্রে জানালেন, ব্রিটিশ সম্রাট ও জার্মানির মধ্যে যুদ্ধ ঘোষিত হয়েছে।

এর অর্থ ভারত ও জার্মানির মধ্যেও যুদ্ধ ঘোষিত হল।

২০ আগস্ট ভারত সরকার জারি করল ‘ফরেনার্স অর্ডিন্যান্স’। যে আদেশের ৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী ব্রিটিশ ভারতে বিদেশিদের আগমন ও বহির্গমন এবং তাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রিত হল।

কিন্তু বিদেশে বসবাসকারী ‘অবাঞ্ছিত’ ভারতীয়দের এ দেশে আসা-যাওয়া নিয়ন্ত্রণে কোনো বাধা তখনও নেই।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গদর পার্টির সদস্য ও অন্যান্য বিপ্লবীদের দলে দলে ভারতে আগমনের তোড়জোড়ের খবর পৌঁছে গেছে ভারত সরকারের কাছে।

এই বিপ্লবী স্রোত প্রতিরোধ করতে গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ ৫ সেপ্টেম্বর ‘ইনগ্রেস ইনটু ইন্ডিয়া অর্ডিন্যান্স’ নামে আরও এক অধ্যাদেশ জারি করলেন।

এই অর্ডিন্যান্স জারির কারণ হিসেবে বলা হয়েছে—

“যেহেতু এক জরুরি অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তাই প্রয়োজন হয়েছে রাজ্যের নিরাপত্তা, স্বার্থ ও শান্তি বিঘ্নিত হওয়ার বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য ব্রিটিশ ভারতে সমুদ্রপথ বা জলপথে আগমনকারী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ করা।”

এই অর্ডিন্যান্সকে হাতিয়ার করে ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব ও বাংলা সরকার স্থির করেছে, কানাডা-ফেরত কোমাগাতামারু জাহাজকে পৌঁছতে দেওয়া যাবে না কলকাতায়।

কারণ ক্ষুব্ধ, উত্তেজিত ওই যাত্রীর দল কলকাতায় পৌঁছলে ব্যাপক রকমের শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা থাকবে। এমনিতেই যুদ্ধের পরিস্থিতি, তার ওপর এদের নতুন উৎপাত শুরু হলে তা হবে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে বেশ বিড়ম্বনার বিষয়।

তাই স্থির হল, কলকাতা থেকে কয়েক মাইল আগে তৈলবন্দর বজবজের ৬ নম্বর জেটিতে নোঙর করানো হবে কোমাগাতামারুকে। ওখানেই আছে বজবজ রেলস্টেশন।

পাঞ্জাব প্রদেশ থেকে একটি বিশেষ ট্রেনেরও ব্যবস্থা করা হল, যাতে ওই সমস্ত ‘বিপজ্জনক’ যাত্রীরা কোথাও কোনো অশান্তি তৈরি না করে সোজা ফিরে যেতে পারে পাঞ্জাবে।

বঙ্গোপসাগর থেকে কোমাগাতামারু হুগলি নদীতে প্রবেশ করল ২৬ সেপ্টেম্বর। পরের দিন ভোরে পৌঁছল ডায়মন্ড হারবারের দক্ষিণে কুলপিতে।

কয়েকজন ইউরোপীয় ও ভারতীয় আধিকারিক গিয়ে উঠলেন জাহাজে। তাদের মধ্যে ছিলেন চব্বিশ পরগনার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার ডোনাল্ড, পাঞ্জাব পুলিশের মিস্টার শ্লোকক এবং আরও কয়েকজন আধিকারিক।

তারা যাত্রীদের বললেন, পাঞ্জাব সরকারের পক্ষ থেকে তারা এসেছেন। তাদের পাঞ্জাবে নিয়ে যাবেন। সরকারের খরচে একটি ট্রেনের ব্যবস্থাও হয়েছে, যেটি সরাসরি যাবে জলন্ধর পর্যন্ত।

তারপর তারা সমস্ত জাহাজে শুরু করল তল্লাশি। ওদের ধারণা ছিল, বেশ কিছু অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া যাবে জাহাজে। কিন্তু তল্লাশিতে কিছুই উদ্ধার করতে পারেনি। অন্তত হাতেনাতে তো ধরা পড়েনি।

পরের দিন, ২৮ সেপ্টেম্বর, কুলি থেকে জাহাজ ছাড়ল। এগোতে থাকল কলকাতা অভিমুখে।

তখনও কোমাগাতামারুর কোনো যাত্রীর কাছে বিন্দুমাত্র আভাস ছিল না যে কলকাতা পর্যন্ত পৌঁছতেই দেওয়া হবে না তাদের। কোমাগাতামারুর গতিরোধ হবে কয়েক নটিক্যাল মাইল আগে বজবজ নামের কোনো এক অখ্যাত জনপদে।

ঘটনার বিবরণ শুনে সত্যচরণের মতো কঠিন হৃদয়ের মানুষের মুখেও ফুটে উঠল এক বিশেষ অভিব্যক্তি। সে কি দুঃখের, নাকি ক্ষোভের, ঠিক বুঝতে পারে না বংশী।

তাই ছোটঠাকুরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে আর দফায় দফায় তামাক সেজে সে জোগান দেয় কথক আর শ্রোতাকে।

হুঁকোতে লম্বা টান দিয়ে আবার কথা শুরু করে মিঁয়া।

গতকাল, ২৯ সেপ্টেম্বর, কোমাগাতামারু কলকাতা বন্দরে আসার পথে বজবজের ৬ নম্বর জেটিতে নোঙর করতে বাধ্য করে ব্রিটিশ ভারতের পুলিশ।

বেলা তখন বারোটা।

সকাল থেকেই পোর্ট কমিশনের জেটিগুলোর দখল নিয়েছিল পুলিশ। পুজোর বাড়িগুলোতে গিয়ে পুলিশ জানাল, বেলা এগারোটার মধ্যেই নিরঞ্জন শেষ করে ফিরে যেতে হবে গঙ্গার ঘাট থেকে।

তার আগেই পথঘাট শুনশান করে এলাকার দখল নিল পুলিশ।

কলকাতার পুলিশ কমিশনার ফ্রেডেরিক হ্যালিডে সকাল সাড়ে দশটার আগেই চলে এলেন বজবজে। চলে আসেন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার ডোনাল্ডও।

মিঃ হ্যালিডে ও মিঃ ডোনাল্ডের নেতৃত্বে মিঃ হ্যামফ্রিজসহ বেশ কয়েকজন ইউরোপীয় আধিকারিক গিয়ে উঠলেন কোমাগাতামারুতে।

দলনেতা বাবা গুরদিত সিংকে আধিকারিকরা নির্দেশ দিলেন সহযাত্রীদের নিয়ে জাহাজ থেকে নেমে যেতে। পাশের রেলস্টেশনে রাখা আছে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন। ওতেই সবাই চড়ে বসবে। সে ট্রেন সোজা যাবে জলন্ধর।

গুরদিত সিং জানতেন, কলকাতা থেকে নদী পার হওয়ার একটি পুল আছে। সেই রেলসেতু পেরিয়েই ট্রেনে চেপে বাংলা ছেড়ে অন্যত্র যাওয়া সম্ভব।

তাই তিনি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জানালেন, তারা কলকাতা পৌঁছতে চান। তাঁর ধারণা হল, তাদের আসামে নিয়ে গিয়ে কোথাও বন্দি করে রাখার ফিকির করছে ইংরেজ আধিকারিকরা।

এই কথাবার্তা চলার সময় মানসিকভাবে দুর্বল, হতাশ হয়ে পড়া প্রায় ৬০ জন যাত্রী রাজি হলেন বজবজে নেমে ওই ট্রেনেই চেপে বসতে।

বাকি সকলেই কিন্তু দলনেতার কথামতো রাজি হলেন না বজবজে নামতে।

ইতিমধ্যেই নদীর পাড় থেকে জাহাজ পর্যন্ত পরপর নৌকা সাজিয়ে তৈরি করা হয়েছে পন্টুন।

আরও কিছুক্ষণ আলোচনা চলার পর গুরদিত সিং তাঁর সহযাত্রীদের সঙ্গে তাদের ধর্মগ্রন্থ গ্রন্থ সাহেব নিয়ে পন্টুনের সাহায্যে নেমে আসেন তীরে।

কিন্তু ওই ট্রেনে চাপতে রাজি হলেন না তাঁরা।

তাঁদের দাবি, জাহাজে উঠে সাহেবরা দাপাদাপি করে তল্লাশির নামে পবিত্র ধর্মগ্রন্থের অমর্যাদা করছে। তাই তাঁরা এই গ্রন্থ সাহেব হাওড়ার গুরুদ্বারে মর্যাদার সঙ্গে জমা দিয়েই তবে ফিরবেন পাঞ্জাবে।

ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার ডোনাল্ড ৫ সেপ্টেম্বর সরকারের জারি করা ‘ইনগ্রেস ইনটু ইন্ডিয়া অর্ডিন্যান্স’-এর ধারাগুলি পড়ে শোনাতে শুরু করলেন।

দলনেতা গুরদিত সিংসহ বেশ কয়েকজন ইংরেজি ভাষা বুঝতেন এবং বলতেও পারতেন। কিন্তু সব শোনার পরেও তাঁরা কোনোভাবেই রাজি হলেন না ওই ট্রেনে চেপে রওনা হতে।

তাঁদের মেজাজ ও উত্তেজনা দেখে চিন্তিত হয়ে পড়লেন পুলিশ কমিশনার ও ম্যাজিস্ট্রেট।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সঙ্গে ছিল মাত্র ২৭ জন পাঞ্জাব পুলিশের কনস্টেবল।

উদ্বিগ্ন দুই আধিকারিক ছুটলেন টেলিফোন অফিসে। বাংলার গভর্নরের কাউন্সিল সদস্য উইলিয়াম ডিউককে টেলিফোনে ঘটনার বিবরণ দিয়ে সেনাবাহিনীর সাহায্য চাইলেন।

কিন্তু ডিউক রাজি হলেন না সৈন্য নামিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে। পরিবর্তে পরামর্শ দিলেন দলনেতাকে গ্রেফতার করে অন্যদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার কৌশল নিতে।

ডোনাল্ড জানালেন, সে কাজ করতে গেলে যত সংখ্যক পুলিশের প্রয়োজন, তা নেই।

অবশেষে সৈন্য পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে পরিস্থিতির মোকাবিলা করার পরামর্শ দিলেন।

সূর্য তখন হেলে পড়েছে পশ্চিমে।

ঘড়িতে বেলা চারটে।

কোমাগাতামারুর ৩৫২ জন যাত্রীর মধ্যে জনা ষাটেক মানুষ চড়ে বসলেন বজবজ স্টেশনে অপেক্ষারত বিশেষ ট্রেনে।

বাকি যাত্রীরা গ্রন্থ সাহেব মাথায় চড়িয়ে নামগান সহযোগে বজবজ ট্রাঙ্ক রোড ধরে এগিয়ে যায় কলকাতার দিকে।

ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ কমিশনার আবার ছুটলেন টেলিফোন অফিসে। এবার তাঁরা ফোন করলেন চিফ সেক্রেটারি মিঃ কামিং ও সুপারিনটেনডেন্ট জেইস্টউডকে।

পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে জানিয়ে তাঁরা আবেদন করেন, যত বেশি সংখ্যক সার্জেন্ট, পুলিশ ও প্রিজন ভ্যান দ্রুত বজবজে পাঠাতে।

ওদিকে নির্দেশ পেয়ে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে একদল সৈন্য রওনা দেয় বজবজের উদ্দেশ্যে।

ক্যাপ্টেন ম্যুরের নেতৃত্বে ১৫০ জনের রয়্যাল ফুসিলিয়ার সৈন্য যুদ্ধকালীন তৎপরতায় এগোতে থাকে গন্তব্যের দিকে।

আসার পথে এই বাহিনী প্রতিবাদী দলের মুখোমুখি হয় নুঙ্গীর গুমোর মাঠের পাশে। সেখান থেকেই এই ধর্মীয় নামগানকারীদের গোরা-সৈন্যের দল তাড়িয়ে ফেরত পাঠায় বজবজ রেলস্টেশনের দিকে।

ইতিমধ্যে প্রায় ষাট জন যাত্রী নিয়েই ওই বিশেষ ট্রেন রওনা হয়ে যায় পাঞ্জাবের উদ্দেশ্যে।

আহত, হতাশ, উদ্ভ্রান্ত যাত্রীর দল হয়ে পড়ল দিশাহারা।

একদিকে কোমাগাতামারু জাহাজের দখল নিয়েছে পুলিশ ও সেনাবাহিনী। অন্যদিকে বিশেষ ট্রেনও রওনা দিয়েছে পাঞ্জাবের উদ্দেশ্যে।

লটবহরসহ প্রায় তিনশো জন আহত, উত্তেজিত, ক্ষুব্ধ মানুষ এক অজানা-অচেনা রেলস্টেশন চত্বরে!

স্টেশনের পিছনে সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠে গ্রন্থ সাহেব মাঝখানে রেখে গোল হয়ে ঘিরে বসল সেই অসহায় মানুষগুলো।

ওদিকে পুলিশ কমিশনার নির্দেশ দিলেন মিঃ ইস্টউডকে—কোমাগাতামারুর এই ‘বিপজ্জনক’ ব্যক্তিদের কেউ যেন রেলপথ ধরে কলকাতার দিকে এগিয়ে না যায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

দলনেতা গুরদিত সিংকে ডেকে পাঠালেন মিস্টার ডোনাল্ড। উত্তেজনা প্রশমনে আলোচনার উদ্দেশ্যে।

রাজি হলেন না গুরদিত সিং ও সহযোগীরা। তাঁরা ভাবলেন, নেতাকে দলছুট করে নিয়ে গিয়ে গ্রেফতার করতে চাইছে ইংরেজরা।

জানালেন, মিঃ ডোনাল্ডের কিছু বলার থাকলে তাঁদের মাঝখানে এসেই বলুন।

একজন ব্রিটিশ সার্জেন্ট গুরদিত সিংকে ধরার জন্য এগোতে গেলে ডোনাল্ড নিষেধ করেন।

কিন্তু ইস্টউড ভিড়ের মধ্যে গুরদিত সিংয়ের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।

তখনই গুরদিত সিংয়ের উত্তেজিত সহকর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর।

একজন রিভলভার থেকে গুলি চালিয়ে বিদ্ধ করেন ইস্টউডকে।

শুরু হয়ে যায় খণ্ডযুদ্ধ।

এমন সময় ঘনিয়ে এল সন্ধ্যা।

সেই প্রায়-অন্ধকার স্টেশনের ওভারব্রিজ থেকে হঠাৎ নির্বিচারে গোরা সেনা এবং ব্রিটিশের পুলিশ গুলি চালাতে শুরু করল কানাডা-ফেরত ভারতীয় শিশু, বৃদ্ধসহ কোমাগাতামারুর যাত্রীদের ওপর।

প্রাণভয়ে কিছু মানুষ আশ্রয় নিলেন আশপাশের বাড়িতে। বেশিরভাগ মানুষ জীবনরক্ষার্থে আশ্রয় নিলেন ঝোপের মধ্যে।

নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বহু যুবক ও প্রৌঢ়।

অসংখ্য নারী, শিশু, বৃদ্ধের রক্তে লাল হয়ে গেল বজবজ স্টেশন চত্বর।

আহত মানুষের আর্তচিৎকারে গোধূলির নীরবতা ভেঙে হল খানখান।

আর্তের চিৎকার আর রক্তের স্রোতে ভেসে গেল বিজয়ার আনন্দ।

এমন রক্তস্নাত বিজয়া দশমী প্রত্যক্ষ করল এই জনপদ, যা পৃথিবীর মানুষ কোনোদিনও দেখেনি।

একটু জল খেল মিঁয়া।

কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর শোনাতে শুরু করল সেদিন সকালের ঘটনা।

ভোরে মিউনিসিপ্যালিটির মোষের গাড়িতে তুলে লাশগুলো সরিয়ে ফেলা হয় স্টেশন চত্বর থেকে।

কালীবাড়ির শ্মশানঘাটে নিয়ে গিয়ে সমস্ত মৃতদেহের ওপর পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় একসঙ্গে।

গুরদিত সিংয়ের কোনো খোঁজ নেই। হয়তো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল গঙ্গায়।

এ ঘটনার এত বর্ণনা, এত কথা—তারপর কানে এল যে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ আজও আমার মনে জীবন্ত হয়ে আছে।

কীভাবে ভুলব সেই বেচারা রুক্মিণীকান্তের কথা?

হতভাগা তো ছিল আসলে সেই নোয়াখালীর মানুষ। পুজো দেখার জন্য এসেছিল ওর আত্মীয় তারিনীর বাড়িতে। তারিনীকান্ত রক্ষিত ছিল হাসপাতালের কম্পাউন্ডার।

বিসর্জন দেখতে রুক্মিণীকান্ত গিয়েছিল গঙ্গার ঘাটে।

লালমুখো পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।

আর ফিরল না ঘরের ছেলে।

দীনবন্ধু পাণ্ডে ছিল ভদ্রকের মানুষ। বেচারি রাঁধুনির কাজ করত হোটেলে। তার শরীরও ঝাঁঝরা করে দিল পুলিশের গুলি।

নবকুমার হাজরা তো স্থানীয় যুবক ছিল। খোঁজ পাওয়া যায়নি তারও।

কত মানুষ যে সেদিন মারা গেল, তার আসল হিসেব তো পাওয়াই গেল না। সরকার একবার বলল আঠেরোজন, একবার বলল কুড়ি।

লোক তো বলে, সে সংখ্যা কোনো মতেই পঞ্চাশের কম নয়।

শুনেছিলাম, এর পাঁচ বছর পরে পাঞ্জাবে নাকি এমনই এক হত্যাকাণ্ড ঘটায় ব্রিটিশরা।

সেই জালিয়ানওয়ালাবাগ কাণ্ডের কথা সারা দেশ জানলেও, তার মহড়া যে এখানেই হয়েছিল ১৯১৪ সালে – সে কথা আর দেশের কজনই বা জানে?

( চলবে )

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি – ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি ধারাবাহিক অনুবাদ

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি – ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি ধারাবাহিক অনুবাদ

Read More »

২ : কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ একটি বাড়ির চোখ দিয়ে দেখা দুই শতাব্দীর ইতিহাস, মানুষের জীবন ও সময়ের নির্মম পরিবর্তনের কাহিনি পর্ব : দুই তিন রোজকার মতো সকাল-সকাল ঘোষালবাড়িতে

Read More »