অহংকার ও রিক্ততা: কিরণময়ী ও হেডা গ্যাবলারের মনস্তাত্বিক অস্তিত্বের দ্বৈরথ

অহংকার ও রিক্ততা: কিরণময়ী ও হেডা গ্যাবলারের মনস্তাত্বিক অস্তিত্বের দ্বৈরথ

তুলনামূলক সাহিত্যের জানালা 

উনিশ শতকের শেষ এবং বিশ শতকের শুরুর বিশ্বসাহিত্যে নারীর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, অবদমিত কামনা এবং সমাজ-নির্ধারিত অস্তিত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের যে চোরাস্রোত দেখা গিয়েছিল, তার দুটি উজ্জ্বল ও সমান্তরাল উদাহরণ হল হেনরিক ইবসেনের ‘হেডা গ্যাবলার’ (১৮৯০) এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসের ‘কিরণময়ী’ (১৯১৭)। ভৌগোলিক দূরত্ব, সাংস্কৃতিক ভিন্নতা এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটের বিপুল ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও, এই দুটি চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বুনন, অহংকারের তীব্রতা, শরীরী আকাঙ্ক্ষার অবদমন এবং শেষ পর্যন্ত অবচেতন মনের এক চরম ট্র্যাজিক বিপর্যয়—এক গভীর দার্শনিক ঐক্যে এসে মিলিত হয়েছে। কিরণময়ী ও হেডা কেউই তাঁদের নিজ নিজ সমাজের চিরাচরিত ‘আদর্শ নারীমূর্তি’ বা ‘প্রথাবিরোধী বিদ্রোহী সত্তা’—কোনো নির্দিষ্ট ফ্রেমে বন্দি হওয়ার মতো চরিত্র নন। বরং তাঁরা হলেন এক-একটি জ্বলন্ত মনস্তাত্ত্বিক আগ্নেয়গিরি, যা চারপাশের ভণ্ডামিকে পুড়িয়ে মারতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেদের অস্তিত্বকে ভস্মীভূত করে ফেলে। এই দুই কালজয়ী নারীর মনস্তত্ত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক তীব্র অবদমিত শরীরী ও মানসিক আকাঙ্ক্ষা, যা তৎকালীন সমাজব্যবস্থার কঠোর নিগড়ে পিষ্ট হয়ে এক বিকৃত রূপ ধারণ করেছিল। কিরণময়ীর বিয়ে হয়েছিল এক বাস্তববিমুখতা ও উদাসীন পুরুষ হারান মুখুজ্জের সাথে, যেখানে তাঁর যৌবন ও রূপের কোনো স্বীকৃতি ছিল না, আর স্বামীর মৃত্যুর পর হিন্দু সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক বৈধব্যের নিষ্ঠুর অনুশাসন—একাদশী, নিরামিষ আহার ও আনন্দহীন জীবন—তাঁর স্বাভাবিক জৈবিক ও মানসিক চাহিদাকে গলা টিপে হত্যা করে। ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের আলোকেই বলা যায়, এই দীর্ঘদিনের অবদমিত ‘লিবিডো’ বা কামনাই কিরণময়ীর অবচেতন মনে এক চরম ক্ষোভ, সমাজবিরোধী মানসিকতা এবং ধ্বংসাত্মক শক্তির জন্ম দিয়েছিল। অন্যদিকে, হেডা গ্যাবলারের ট্র্যাজেডিও শুরু হয় এক বুর্জোয়া সমাজের বিরক্তিকর, সাধারণ এবং আবেগহীন গবেষক জর্জ টেসমানের সাথে বিয়ের মধ্য দিয়ে, যেখানে হেডার তীব্র ব্যক্তিত্ব এবং শারীরিক ও মানসিক চাহিদার কোনো স্থান ছিল না। ইবসেনের হেডা কোনো সামাজিক বিধবা ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন এক প্রাতিষ্ঠানিক ও মানসিক খাঁচায় বন্দি স্বাধীনচেতা নারী, যাঁর ভেতরের তীব্র আকাঙ্ক্ষাগুলো ভিক্টোরীয় যুগের তথাকথিত সামাজিক লোকলজ্জা ও ‘স্ক্যান্ডাল’-এর ভয়ে অবদমিত হতে হতে এক সময় মারাত্মক বিষে পরিণত হয়েছিল। এই দুই নারীর অবদমিত কাম ও প্রেম কেবল শারীরিক তৃপ্তির অভাব ছিল না, বরং তা ছিল এক তীব্র অস্তিত্ববাদী সংকট, যেখানে নিজ জীবনের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ না পেয়ে তাঁরা চারপাশের পুরুষদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ ও ধ্বংস করার এক বিপজ্জনক খেলায় মেতে ওঠেন।
এই ধ্বংসাত্মক খেলার মূল চালিকাশক্তি ছিল তাঁদের আকাশচুম্বী এবং মারাত্মক ‘অহংকার’ বা ‘হিউব্রিস’ (Hubris), যা তাঁদের মনস্তত্ত্বকে এক জটিল দার্শনিক মাত্রা দান করে। কিরণময়ী ছিলেন অসাধারণ রূপবতী এবং প্রখর বুদ্ধিমতী, যিনি নিজের যুক্তিবোধ দিয়ে তৎকালীন শাস্ত্রের অসারতা ও পুরুষের ভণ্ডামিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। তাঁর এই অহংকারে প্রথম এবং তীব্র আঘাত লাগে যখন সমাজের আদর্শ পুরুষ উপেন্দ্র তাঁর রূপ ও বুদ্ধির মোহ কাটিয়ে তাঁকে সামাজিক ও নৈতিক কারণে প্রত্যাখ্যান করেন। উপেন্দ্রের এই প্রত্যাখ্যান কিরণময়ীর আজন্ম লালিত অহংকারকে চূর্ণ করে দেয় এবং এই আহত অহংকারের প্রতিশোধ নিতেই তিনি এক সচেতন ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠেন—নিরপরাধ, সরল দিবাকরকে প্রলোভিত করে ঘর ছাড়েন কেবল উপেন্দ্রের সমাজ ও আদর্শকে ভুল প্রমাণ করার জন্য। ঠিক একইভাবে, হেডা গ্যাবলারও ছিলেন জেনারেল গ্যাবলারের অহংকারী কন্যা, যিনি সমাজ বা কোনো পুরুষের সামনে মাথা নোয়াতে জানতেন না এবং যাঁর প্রধান আনন্দ ছিল অন্য মানুষের ভাগ্যকে পুতুলের মতো চালনা করা। হেডার অহংকারে তখন তীব্র আঘাত লাগে যখন তিনি দেখেন তাঁর প্রাক্তন প্রেমিক, প্রতিভাবান কিন্তু মদ্যপ লেখক লোভবার্গ তাঁর প্রভাব কাটিয়ে থিয়া এলভস্টেডের মতো এক সাধারণ নারীর আকর্ষণে নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন। থিয়ার এই নৈতিক জয় এবং নিজের জীবনের চরম একঘেয়েমি সহ্য করতে না পেরে হেডার ভেতরের অহংকারী ও হিংস্র সত্তা জেগে ওঠে; তিনি লোভবার্গের অমূল্য পাণ্ডুলিপিকে আগুনে পুড়িয়ে দেন—ঠিক যেভাবে একজন মা তাঁর সন্তানকে হত্যা করে—এবং লোভবার্গকে প্ররোচিত করেন এক ‘সুন্দর ও মহিমান্বিত’ আত্মহত্যার জন্য। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কিরণময়ী ও হেডা দুজনের এই ধ্বংসাত্মক আচরণ আসলে তাঁদের নিজেদের অক্ষমতা এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক চরম, মরিয়া ও নেতিবাচক চেষ্টা। কিরণময়ী যেমন দিবাকরের নৈতিক পতন ঘটিয়ে সমাজকে স্তব্ধ করতে চেয়েছিলেন, হেডাও তেমনি লোভবার্গের জীবন ধ্বংস করে নিজের ক্ষমতার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এই দুই ক্ষেত্রেই তাঁদের বাহ্যিক নিষ্ঠুরতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর মানসিক একাকীত্ব এবং তীব্র অপরাধবোধের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব।
এই দুই চরিত্রের চূড়ান্ত পরিণতিও এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক সত্যকে উন্মোচিত করে, যেখানে বাহ্যিক সমাজের চেয়ে তাঁদের নিজেদের ভেতরের মানসিক ভাঙনই প্রধান হয়ে ওঠে। কিরণময়ীর প্রখর বুদ্ধি, অহংকার এবং প্রতিশোধস্পৃহা শেষ পর্যন্ত চারপাশের নির্মম বাস্তবতার কাছে এবং উপেন্দ্রের অকাল মৃত্যুর পর নিজের কৃতকর্মের ভয়াবহতার সামনে এসে চুরমার হয়ে যায়। দিবাকরের নৈতিক অধঃপতন ও মানসিক বিকৃতির জন্য নিজের ভেতরের মাতৃত্বসুলভ বা দিদিসুলভ তীব্র অপরাধবোধ এবং সামাজিক আশ্রয়ের সম্পূর্ণ অভাব তিনি আর সহ্য করতে পারেননি; ফলে তাঁর প্রখর মস্তিষ্ক এই বিপুল মানসিক চাপ নিতে না পেরে সম্পূর্ণ বিকৃত হয়ে যায় এবং তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। শরৎচন্দ্র কিরণময়ীকে শারীরিক মৃত্যু না দিয়ে তাঁর মন ও প্রখর বুদ্ধির মৃত্যু দেখিয়েছেন, যা তাঁর চরিত্রটিকে এক পরম মনস্তাত্ত্বিক ট্র্যাজেডিতে রূপান্তর করেছে। অন্যদিকে, হেডা গ্যাবলার যখন দেখেন যে তাঁর প্ররোচনায় লোভবার্গের মৃত্যু কোনো ‘সুন্দর বা মহিমান্বিত’ উপায়ে হয়নি, বরং এক নোংরা স্ক্যান্ডালের জন্ম দিয়েছে এবং চতুর জাজ ব্র্যাক সেই সত্যকে পুঁজি করে হেডাকে ব্ল্যাকমেইল করে নিজের শয্যাসঙ্গিনী করতে চাইছে, তখন হেডার অহংকারী সত্তা চরমভাবে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। অন্য কোনো পুরুষের নিয়ন্ত্রণে বা সামাজিক কলঙ্কের খাঁচায় বন্দি হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে হেডা নিজের জীবনের ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার শেষ পথ হিসেবে লোভবার্গের পিস্তল দিয়ে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। কিরণময়ীর মানসিক ভারসাম্য হারানো এবং হেডা গ্যাবলারের আত্মহত্যা—দুটিই হলো পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, অবদমিত ইচ্ছা এবং নিজেদের আহত অহংকারের বিরুদ্ধে তাঁদের অবচেতন মনের এক চরম ও চূড়ান্ত প্রতিবাদ। সমাজ তাঁদের যে ছাঁচে গড়তে চেয়েছিল, তাঁরা সেই ছাঁচকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন; একজন নিজের বুদ্ধির আলো নিভিয়ে পাগল হয়ে গিয়ে, আর অন্যজন নিজের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং হেনরিক ইবসেন—দুজনই এই চরিত্র দুটির মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, তীব্র মেধা, সংবেদনশীলতা ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারীদের যখন সমাজ সুস্থ স্বাভাবিক বিকাশের পথ বন্ধ করে দেয়, তখন সেই অবদমিত শক্তি কীভাবে এক আত্মঘাতী ও ধ্বংসাত্মক মনস্তত্ত্বে রূপ নেয়, যা কিরণময়ী ও হেডাকে বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে চিরন্তন ও কালোত্তীর্ণ দুটি মনস্তাত্ত্বিক ট্র্যাজেডির প্রতীক হিসেবে অমর করে রেখেছে।
দর্শন অনুযায়ী, পরনির্ভরশীল বা পরাধীন হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুকে বেছে নেওয়াও এক ধরনের চূড়ান্ত স্বাধীন সিদ্ধান্ত; আর হেডা ঠিক সেই কাজটিই করেছিলেন—নিজের জীবনের ওপর শেষ নিয়ন্ত্রণটুকু বজায় রাখতে লোভবার্গের পিস্তল দিয়ে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। অন্যদিকে, কিরণময়ীর প্রখর মস্তিষ্ক যখন দিবাকরের নৈতিক পতন ও উপেন্দ্রের অকাল মৃত্যুর ফলে তীব্র অপরাধবোধ এবং সামাজিক নির্মমতার চাপ সহ্য করতে পারল না, তখন তাঁর অহং ও যুক্তিবোধ সম্পূর্ণ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কিরণময়ীর এই পাগল হয়ে যাওয়া বা মানসিক ভারসাম্য হারানো আসলে কোনো সাধারণ অসুখ নয়, বরং তা হলো চারপাশের অসার ও নিষ্ঠুর বাস্তবতার হাত থেকে বাঁচতে তাঁর অবচেতন মনের এক অস্তিত্ববাদী আত্মহনন—যেখানে তাঁর শরীরের মৃত্যু না হলেও তাঁর প্রখর চিন্তাশীল সত্তার চূড়ান্ত মৃত্যু ঘটে। ফলস্বরূপ, সিগমুন্ড ফ্রয়েডের অবদমিত কামনার মনস্তত্ত্ব এবং সার্ত্র-কাম্যুর অস্তিত্ববাদী সংকটের এই যুগলবন্দি কিরণময়ী ও হেডা গ্যাবলারকে কেবল দুটি নারী চরিত্র হিসেবে আটকে রাখে না, বরং তাঁদের করে তোলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার নির্মম জাঁতাকলে পিষ্ট মানব-অস্তিত্বের এক পরম, কালোত্তীর্ণ ও চিরন্তন ট্র্যাজেডি।

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

৩ : কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ একটি বাড়ির চোখ দিয়ে দেখা দুই শতাব্দীর ইতিহাস, মানুষের জীবন ও সময়ের নির্মম পরিবর্তনের কাহিনি পর্ব : দুই | চার | চৈত্রের মাঝামাঝি।

Read More »

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি – ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

৩ : কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ একটি বাড়ির চোখ দিয়ে দেখা দুই শতাব্দীর ইতিহাস, মানুষের জীবন ও সময়ের নির্মম পরিবর্তনের কাহিনি পর্ব : দুই | চার | চৈত্রের মাঝামাঝি।

Read More »

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি – ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি

Read More »

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য : ভজ মন রাম চরণ – শ্যামলকৃষ্ণ বসু ভজ মন রাম চরণ ভজ মন রাম চরণ ভজ মন রাম চরণ ভজ মন রাম

Read More »