তুলনামূলক সাহিত্যের জানালা
বিবেক চট্টোপাধ্যায়
উনিশ শতকের বিশ্বসাহিত্যে নারীর মনস্তত্ত্ব, অবদমিত আকাঙ্ক্ষা এবং দাম্পত্য সংকটের দুটি অনন্য সৃষ্টি লেভ তলস্তয়ের ‘আনা কারেনিনা’ (১৮৭৮) এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নষ্টনীড়’ (১৯০১)। বাহ্যিক পটভূমি, সমাজবাস্তবতা এবং কাহিনির পরিণতি ভিন্ন হলেও, উপন্যাসের কেন্দ্রীয় দুই চরিত্র—আনা ও চারুলতা—একই রকম মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, একাকীত্ব এবং নিষিদ্ধ প্রেমের অভিঘাতে জর্জরিত। এই দুই নারীর প্রেম, মানসিক উন্মাদনা এবং ট্র্যাজেডির একটি বিস্তৃত তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে তাদের অন্তরের গভীর সংকটগুলো আমরা দেখতে পাব।
আনা এবং চারুলতা—উভয়েরই মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মূল উৎস লুকিয়ে রয়েছে তাদের শূন্যগর্ভ, যান্ত্রিক এবং একাকী দাম্পত্য জীবনের মধ্যে। আনা বিবাহিত এক বয়োজ্যেষ্ঠ, আবেগহীন ও সমাজ-সচেতন রুশ সরকারি কর্মকর্তা আলেক্সেই কারেনিনের সাথে। কারেনিনের কাছে সামাজিক মর্যাদা, নিয়মকানুন ও দায়িত্বই শেষ কথা; সেখানে হৃদয়ের উষ্ণতা বা আবেগের কোনো স্থান নেই। আনা এই প্রাণহীন খাঁচায় বছরের পর বছর বন্দি থেকে হাঁপিয়ে উঠেছিল। সে তার এই অবদমিত জীবনের সত্য অনুধাবন করে একবার তীব্র আকুলতায় বলেছিল –
I am like a starving man to whom food has been given, who is cold and is given a coat, and who knows that he is saved, but cannot help feeling that he is still hungry and cold.
অন্যদিকে, চারুলতার জীবনও এক সুবর্ণ খাঁচার মতো। তার স্বামী ভূপতি একজন অত্যন্ত ভালো মানুষ ও উদার মনের মানুষ হলেও সে সংবাদপত্র সম্পাদনা, প্রেসের কাজ এবং রাজনীতি নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে, চারুর নিঃসঙ্গ অন্তরের খবর রাখার সময় বা মানসিক ফুরসত তার ছিল না। চারুর জগৎ কেবল চার দেয়ালের খড়খড়ি আর বারান্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। চারুর এই একাকীত্ব কোনো জাগতিক বা বৈষয়িক অভাবের ছিল না, বরং তা ছিল তীব্র মানসিক ও আত্মিক শূন্যতার। রবীন্দ্রনাথ চারুর এই অবস্থাকে ব্যাখ্যা করে লিখেছেন, “চারুলতার কোনো অভাব ছিল না। কেবল একটি অভাব ছিল, সে আর কিছু নয়—উহার স্বামী ভূপতি।” এভাবে দুই ভিন্ন সংস্কৃতির দুই নারী তাদের দাম্পত্য জীবনের শুরুর দিকেই এক চরম মানসিক শূন্যতার মুখোমুখি হয়, যা পরবর্তীতে তাদের অবদমিত সত্তাকে এক চরম বিস্ফোরণের দিকে ঠেলে দেয়।
এই তীব্র একাকীত্বের পটভূমিতেই উভয় চরিত্রের জীবনে প্রেমের আগমন ঘটে এক ঝড়ের মতো, যা তাদের চিরচেনা জগতকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দেয়। তবে এই প্রেমের ধরণ ও প্রকাশের মধ্যে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ভিন্নতা রয়েছে। আনার জীবনে কাউন্ট ভ্রনস্কির প্রেম আসে তীব্র শারীরিক ও মানসিক আকর্ষণ এবং এক দুর্নিবার গতি নিয়ে। আনা সমাজ, পরিবার, এমনকি নিজের সন্তানকেও ত্যাগ করে সেই প্রেমে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিল এই সামাজিক নিয়ম ভাঙার প্রেম তাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে, তাও সে নিজের আবেগকে রুখতে পারেনি। প্রেমের এই বৈচিত্র্য ও গভীরতা নিয়ে আনা বলে – If there are as many minds as there are heads, then there are as many kinds of love as there are hearts.
বিপরীতে, চারুলতার জীবনে দেবর অমল আসে সাহিত্যের আলো, তারুণ্যের চঞ্চলতা এবং নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র সহচর হয়ে। অমল ও চারুর সম্পর্কটি গড়ে ওঠে ছাদ-বাগানের আড়ালে, সাহিত্যচর্চা, কবিতার খাতা সাজানো, খুনসুটি আর তীব্র মানসিক সখ্যতার মধ্য দিয়ে। চারু রক্ষণশীল বাঙালি সমাজের লোকলজ্জা ও সংস্কারের কারণে নিজের মুখে কখনো একে ‘প্রেম’ বলে স্বীকার করতে পারেনি, এমনকি অবচেতন মনেও সে এটিকে একটি পবিত্র পারিবারিক স্নেহের সম্পর্ক হিসেবেই দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু অমলের প্রতি চারুর তীব্র অধিকারবোধ, ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত অমলের সেবা করার আকুলতা এবং পরবর্তীতে অমলের বিয়ের খবরে তার মনের ভেতরের তীব্র ঈর্ষা প্রমাণ করে যে, এটি কেবল ভ্রাতৃসুলভ বা দেবর-বৌদির সহজ স্নেহ ছিল না। এটি ছিল তার অবদমিত নারীসত্তার গভীর ও তীব্র অনুরাগ, যা সমাজস্বীকৃত সম্পর্কের আড়ালে ফলবতী হয়েছিল।
আনা ও চারুলতার এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং ট্র্যাজেডিকে গভীরভাবে বুঝতে হলে তৎকালীন সমাজকাঠামো ও নৈতিকতার নির্মম ভূমিকা বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন আছে। উনিশ শতকের রাশিয়ার উচ্চবিত্ত বা অভিজাত সমাজ ছিল চরম ভণ্ডামিতে ভরা। সেখানে পরকীয়া সম্পর্ককে এক ধরণের গোপন বিনোদন হিসেবে মেনে নেওয়া হতো, যদি তা পর্দার আড়ালে থাকত। কিন্তু আনা সেই ভণ্ডামির আশ্রয় নেয়নি; সে তার প্রেমকে সত্য ও সততার সাথে প্রকাশ্যে এনেছিল। সমাজ এই সততাকে ক্ষমা করেনি। যে সমাজ ভ্রনস্কিকে একজন বীর বা পুরুষালী সফলতার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছিল, সেই সমাজই আনাকে ‘পতিতা’ বা ‘পাপী’ আখ্যা দিয়ে একঘরে করে দেয়। থিয়েটারে আনার প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়, উচ্চবিত্ত নারীরা তাকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এই দ্বিচারিতা ও নিষ্ঠুর সামাজিক নৈতিকতাই আনাকে ক্রমশ একাকী ও বিষণ্ণ করে তোলে। নিজের এই সামাজিক নির্বাসন ও মানসিক লাঞ্ছনা নিয়ে সে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিল – They look at me as if I were a leper. They don’t understand that to me, my love is everything and their society is nothing.
অন্যদিকে, উনিশ শতকের শেষভাগের রক্ষণশীল বাঙালি সমাজ ও কুলীন পরিবারের নৈতিকতাবোধ ছিল আরও বেশি অবদমনমূলক। সেখানে নারীর নিজের কোনো স্বাধীন সত্তা বা আবেগের অধিকার ছিল না। স্বামীর প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং চার দেয়ালের শাসনই ছিল নারীর একমাত্র ধর্ম। চারুলতার মনস্তাত্ত্বিক সংকট তাই আরও বেশি জটিল; কারণ সে এমন এক সমাজে বাস করত যেখানে নিজের স্বামীর বাইরে অন্য কোনো পুরুষের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করাও ছিল এক মহাপাপ। বাঙালি সমাজের এই কঠোর নৈতিকতার ভয়েই চারু কখনো তার অনুভূতিকে ভাষা দিতে পারেনি। সে প্রতিনিয়ত নিজের মনের ভেতরের খাঁটি আবেগ এবং সমাজের চাপিয়ে দেওয়া ‘আদর্শ বধূ’- র নৈতিকতার দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। অমলের প্রতি তার আকর্ষণ প্রকাশ পাওয়া মাত্রই যে সমাজ তাকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে, এই ভীতি তাকে এক বোবা ও অবরুদ্ধ নরকযন্ত্রণার দিকে ঠেলে দেয়।
এই মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক অবরুদ্ধতাকে ফুটিয়ে তুলতে উভয় লেখকই চমৎকার কিছু মোটিফ বা প্রতীকের আশ্রয় নিয়েছেন। তলস্তয়ের ‘আনা কারেনিনা’ উপন্যাসের অন্যতম প্রধান এবং শক্তিশালী প্রতীক হলো ‘ট্রেন’ বা রেলপথ। ট্রেন এখানে কেবল একটি যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং তা আনার জীবনের অমোঘ নিয়তি, আধুনিক যান্ত্রিক সমাজের নিষ্ঠুরতা এবং ধ্বংসের প্রতীক। উপন্যাসের শুরুতে আনার সাথে ভ্রনস্কির প্রথম দেখা হয় এক রেলস্টেশনে, যেখানে এক রেলকর্মীর ট্রেনে কাটা পড়ে মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। সেই মৃত্যুকে আনা অশুভ সংকেত হিসেবে দেখেছিল। পরবর্তীতে ট্রেন যেমন আনাকে সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে মস্কোয় তার নতুন জীবনের দিকে নিয়ে যায়, ঠিক তেমনি শেষপর্যন্ত সেই ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়েই সে তার যন্ত্রণার অবসান ঘটায়। ট্রেন এখানে এক অপ্রতিরোধ্য সামাজিক শক্তির প্রতীক, যা আনার মতো সংবেদনশীল ও নিয়মভাঙা মানুষকে পিষে ফেলে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নষ্টনীড়’ উপন্যাসে চারুলতার নিঃসঙ্গতা এবং বহির্জগতের প্রতি তার তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে ফুটিয়ে তুলতে ‘বাইনোকুলার’ (দূরবীন) এবং ‘খড়খড়ি’ (জানালার পর্দা) প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে চারু বাইরের পৃথিবীকে দেখে—যে পৃথিবী সচল, প্রাণবন্ত কিন্তু তার জন্য নিষিদ্ধ। আর বাইনোকুলারটি ছিল তার অবরুদ্ধ চোখের এক কৃত্রিম সম্প্রসারণ। দূরবীনে চোখ রেখে সে রাস্তার ফেরিওয়ালা, ছ্যাকরা গাড়ি কিংবা অচেনা মানুষকে দেখে এক ধরণের পরোক্ষ স্বাধীনতার স্বাদ পেত। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই দূরবীন দিয়েই সে প্রথম অমলের আগমনকে লক্ষ্য করেছিল। দূরবীন এখানে চারুর অবদমিত দেখার আকাঙ্ক্ষা, একাকীত্ব এবং বাইরের মুক্তির প্রতি ব্যাকুলতার প্রতীক। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এই দূরবীন তাকে কেবল দূর থেকেই দেখতে দেয়, সেই দূরত্বের পৃথিবীকে আপন করার অধিকার বা স্পর্শ করার ক্ষমতা তাকে দেয় না। খড়খড়ি যেমন তাকে ঘরে বন্দি রাখে, দূরবীন তেমনি তাকে তার বন্দিত্বের সীমানা স্মরণ করিয়ে দেয়।
প্রেমের এই আনন্দের ক্ষণস্থায়ী জোয়ার যখন কেটে যায়, তখন সামাজিক প্রত্যাখ্যান ও এই রূপক অবরুদ্ধতার কারণে উভয়ের মনেই একসময় গ্রাস করে তীব্র অপরাধবোধ এবং মানসিক বিপর্যয়। এখানেই তলস্তয় ও রবীন্দ্রনাথের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের অনন্য শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায়। সমাজ কর্তৃক সম্পূর্ণ বর্জিত হওয়া এবং নিজের বুক চেরা ধন পুত্র কোনিয়ার থেকে নিষ্ঠুরভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আনা তীব্র হ্যালুসিনেশন, সাইকোসিস ও মানসিক বৈকল্যের শিকার হয়। সে অবিরত সন্দেহ করতে শুরু করে যে ভ্রনস্কির ভালোবাসা বুঝি কমে গেছে, ভ্রনস্কি বুঝি অন্য কোনো নারীর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। এই তীব্র মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণার চরম মুহূর্তে জগতের সবকিছুর ওপর বিশ্বাস হারিয়ে সে উক্তি করে – Everything is false, everything is a lie, everything is deception, everything is evil !
ব্যথা উপশমের জন্য মাদক (ওপিয়াম) গ্রহণ এবং অবিরত আত্মদ্বন্দ্বে আনার মনস্তত্ত্ব এক চরম উন্মাদনার স্তরে পৌঁছায়, যেখানে চারপাশের পৃথিবী তার কাছে এক নরকতুল্য ও অর্থহীন ঠেকে।
অন্যদিকে, অমলের হঠাৎ বিলেত চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এবং ভূপতির মাধ্যমে অমলের প্রেরিত চিঠির নিষ্ঠুর সত্যতা চারুর মানসিক জগতকে এক নিমেষে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। চারু নিজেকে আর সামলাতে পারে না। অমল চলে যাওয়ার পর চারুর যে মানসিক বিপর্যয় ঘটে, তা আনার মতো উচ্চকিত বা চিৎকার করে সামনে প্রকাশ পায় না। কারণ বাঙালি ঘরের বধূ হিসেবে তার কাঁদার অধিকারটুকুও সীমিত। তার উন্মাদনা অন্তর্মুখী, নীরব এবং ক্ষয়িষ্ণু। সে ঘরের কোণে অন্ধকার করে শুয়ে থাকে, তার চোখের জল গোপনে বালিশ ভেজায়। স্বামীর আলো-ঝলমল ঘরে থেকেও সে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ এক জীবন্মৃতে পরিণত হয়। তার বুকের ভেতরের তীব্র হাহাকার বাইরে প্রকাশের কোনো পথ পায় না বলেই তা ভেতরে ভেতরে তার অস্তিত্বকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।
উভয় উপন্যাসের ট্র্যাজেডির রূপ দুটির মধ্যে মৌলিক এবং দার্শনিক পার্থক্য রয়েছে। তলস্তয় যেখানে বাহ্যিক, নাটকীয় ও চূড়ান্ত ধ্বংসের পথ বেছে নিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ সেখানে দেখিয়েছে অভ্যন্তরীণ, নিঃশব্দ এবং দীর্ঘমেয়াদী এক ট্র্যাজেডি। আনার ট্র্যাজেডি চরম নাটকীয়, রক্তাক্ত এবং চূড়ান্ত। ট্রেনের চাকার নিচে ঝাঁপ দিয়ে সে তার জীবনের ও সমস্ত অপমানের ইতি টানে। মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে, যখন ট্রেনটি তার দিকে ধেয়ে আসছিল, তখন তার চেতনার শেষ আলোয় যে তীব্র আত্মোপলব্ধি ও বিভ্রান্তি জেগেছিল, তা তার এই উক্তি থেকে স্পষ্ট হয় – Where am I? What am I doing? What for?
আনা সমাজ, ধর্ম এবং নিজের ভেতরের অন্তহীন দ্বন্দ্ব থেকে স্থায়ী মুক্তি পেতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিজেকে বিলীন করে দেয়।
বিপরীতে চারুলতার ট্র্যাজেডি আরও বেশি নির্মম এবং ভয়াবহ, কারণ তাকে বেঁচে থাকতে হয় এক মৃত সম্পর্ক ও ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। উপন্যাসের শেষে যখন ভূপতি চারুর মনের আসল সত্যটি অর্থাৎ অমলের প্রতি তার গভীর অনুরাগটি টের পায়, তখন ভূপতির পায়ের তলার মাটি সরে যায়। সে ঘর ছেড়ে, চেনা পরিবেশ ছেড়ে দূরে চলে যেতে চায়। কিন্তু পরক্ষণেই চারুর সেই পাণ্ডুর, ব্যথিত ও অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে করুণাবশত যখন সে বলে, “চল তবে, একসাথেই যাই”, তখন চারু সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে উত্তর দেয়, ” না, থাক।” এই দুটি শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে চারুর জীবনের চূড়ান্ত ট্র্যাজেডি। সে খুব ভালো করেই বুঝে গেছে, ভূপতির সাথে তার বাহ্যিক যাতায়াত বা সহবস্থান হতে পারে, কিন্তু মনের যে গভীর ফাটল তৈরি হয়েছে তা আর কোনোদিনও জুড়বে না। চারুর ট্র্যাজেডি হলো এক ছাদের নিচে, এক বিছানায় দুই সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের মতো বছরের পর বছর অভিনয় করে বেঁচে থাকার ট্র্যাজেডি—যা মৃত্যুর চেয়েও কঠিন।
আনা কারেনিনা এবং চারুলতা—উভয়ই তাদের নিজ নিজ সময়ের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে থাকা দুটি সংবেদনশীল নারী চরিত্র। তারা প্রথাগত, প্রাণহীন ও ছক-কাটা দাম্পত্যের শেকল ভেঙে হৃদয়ের সত্যকে স্পর্শ করতে চেয়েছিল। তলস্তয় উনিশ শতকের রাশিয়ার সামন্ততান্ত্রিক ও অভিজাত সমাজের পটভূমিতে আনার মনস্তত্ত্বকে এক মহাকাব্যিক, তীব্র ও ধ্বংসাত্মক রূপ দিয়েছেন, যেখানে আনার উক্তিগুলো তার অন্তরের অবদমিত ক্ষোভ, মোহভঙ্গ ও তীব্র হাহাকারকে বিশ্বজনীন করে তোলে। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ বাংলার রক্ষণশীল অন্তপুরের শান্ত পটভূমিতে চারুলতার মনস্তাত্ত্বিক সূক্ষ্মতা, নীরব অভিমান ও একাকীত্বকে অত্যন্ত সংবেদনশীল তুলির টানে ফুটিয়ে তুলেছেন। আনা ট্রেনের নিচে মরে গিয়ে নিজের ট্র্যাজেডিকে সমাপ্ত করেছে, আর চারু লোকচক্ষুর অন্তরালে প্রতিদিন তিল তিল করে বেঁচে থেকে ট্র্যাজেডির এক জীবন্ত ও চিরন্তন প্রতীক হয়ে উঠেছে।



