রক্তকরবীর লাল আভা ও সার্কাসের সুর: যান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে দুই নারীর মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ

রক্তকরবীর লাল আভা ও সার্কাসের সুর: যান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে দুই নারীর মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ নাটকের নন্দিনী এবং চার্লস ডিকেন্সের ‘হার্ড টাইমস’ উপন্যাসের সিসি জুপ—ভৌগোলিক দূরত্ব ও সমাজবাস্তবতার ভিন্নতা সত্ত্বেও এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক আত্মীয়তায় আবদ্ধ। একজন বাস করে রক্ত-ছাঁকা সোনা নিষ্কাশনের কদর্য যান্ত্রিক খনি ‘যক্ষপুরী’তে, অন্যজন বেড়ে ওঠে কয়লার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, বাস্তববাদী ও উপযোগিতাবাদী দর্শনের যান্ত্রিক শিল্পশহর ‘কোকটাউন’-এ। এই দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েও দুই নারী চরিত্র তাদের সমসাময়িক পুরুষতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী সমাজকাঠামোকে যেভাবে অবলোকন করেছে এবং যেভাবে তাদের নিজস্ব নারীত্বের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ ঘটিয়েছে, তা বিশ্বসাহিত্যে এক অনন্য সমান্তরাল রেখা তৈরি করে। তারা কেউ প্রথাগত অর্থে কোনো রাজনৈতিক বিপ্লবের ব্যানার হাতে তুলে নেয়নি, অথচ তাদের সহজাত মানবিক সংবেদনশীলতা ও জীবনকে দেখার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিই হয়ে উঠেছে শোষক ব্যবস্থার ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার।

যক্ষপুরী ও কোকটাউনের সমাজব্যবস্থা মূলত গড়ে উঠেছে মানুষের মানবিক সত্তাকে অস্বীকার করে তাকে কেবল বস্তু বা সংখ্যায় রূপান্তর করার লক্ষ্যে। যক্ষপুরীর নেপথ্যচারী রাজা এবং সর্দারেরা মানুষকে গণ্য করে কেবল খনির সোনা তোলার হাতিয়ার বা নম্বর হিসেবে; সেখানে আবেগ বা সৌন্দর্যের কোনো উপযোগিতা নেই। অন্যদিকে, কোকটাউনের প্রধান পুরুষ চরিত্র থমাস গ্র্যাডগ্রাইন্ডের জীবনদর্শন গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ গাণিতিক বাস্তবতার ওপর, যেখানে কেবলই ‘ফ্যাক্টস’ বা তথ্যের স্থান, অনুভূতির কোনো জায়গা নেই। এই দুই শুষ্ক মরুভূমির মাঝে নন্দিনী এবং সিসি জুপ হলো এক পশলা সবুজ ও প্রাণবন্ত বৃষ্টির মতো। তাদের মনস্তত্ত্ব এই যান্ত্রিক পরিবেশের দ্বারা কলুষিত বা দমিত হয় না, বরং তারা সমাজকে বিচার করে হৃদয়ের আরশিতে। নন্দিনী যখন যক্ষপুরীর জটিলতা ও লোহার জালের পেছনে লুকিয়ে থাকা রাজার কৃত্রিম অহংকারকে প্রত্যক্ষ করে, তখন তার মনস্তত্ত্বে এক গভীর করুণা ও বিস্ময় জাগে। সে বুঝতে পারে, এই শক্তি আসলে এক ধরণের কঙ্কালসার অক্ষমতা, যা সুন্দরকে আপন করতে পারে না বলেই তাকে বন্দি করতে চায়। রাজাকে উদ্দেশ্য করে নন্দিনীর সেই অমোঘ উচ্চারণ—” তুমি শক্তিকে সুন্দর করতে চাও না, সুন্দরকে শক্তি দিয়ে লুট করতে চাও, তাই তোমাকে দেখে আমার ভয় করে।” —সমাজকে দেখার ক্ষেত্রে তার গভীর মনস্তাত্ত্বিক পরিপক্বতাকেই তুলে ধরে। সে ক্ষমতার জাঁকজমককে ভয় পায় না, বরং ক্ষমতার ভেতরের কদর্য রূপটিকে চিনে নিতে পারে।

একই মনস্তাত্ত্বিক সমান্তরালে দাঁড়িয়ে সিসি জুপ তার চারপাশের শুষ্ক, হিসেবি সমাজব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে। সিসি এসেছে সার্কাসের এক মুক্ত ও আবেগঘন পরিবেশ থেকে, যেখানে জীবনের হিসাব গণিতে নয়, বরং পারস্পরিক ভালোবাসা আর জাদুকরী আনন্দের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়। ডিকেন্স এই উপন্যাসে সার্কাসকে কেবল একটি বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখাননি, বরং এটিকে যান্ত্রিক ও নির্মম শিল্প-সভ্যতার বিপরীতে মুক্ত মানবিক আনন্দ, কল্পনা ও আবেগের একটি মহৎ রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। গ্র্যাডগ্রাইন্ডের যান্ত্রিক স্কুলে যখন সিসিকে আনা হয়, তখন সে তথাকথিত বাস্তববাদী শিক্ষার ধাঁচে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না। সমাজ যখন মানুষকে সংখ্যার খতিয়ানে বিচার করে, সিসির মনস্তত্ত্ব তখন সেই সংখ্যার নিচে চাপা পড়ে যাওয়া একক মানুষের বেদনাকে অনুভব করে। ক্লাসরুমের এক দৃশ্যে যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়, একটি দেশের বিপুল জনসংখ্যার মধ্যে যদি মাত্র পঁচিশ জন মানুষ না খেয়ে মারা যায়, তবে সেই পরিসংখ্যানকে সে কীভাবে দেখবে? সিসি তার সহজাত নারীসুলভ সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উত্তর দেয়—”আমার মনে হয় যে ক্ষুধায় মারা যাচ্ছে, তার কাছে পরিসংখ্যাটি ততটাই বেদনাদায়ক, বাকিরা কতটা সুখে আছে তাতে তার কিছু যায় আসে না।” সিসির এই সংলাপটি পুঁজিবাদের সেই নিষ্ঠুর মনস্তত্ত্বের গালে এক বিরাট চপেটাঘাত, যা বৃহত্তর উন্নয়নের নামে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মানুষের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিকে আড়াল করতে চায়। নন্দিনী যেভাবে যক্ষপুরীর জটিল হিসাবের মাঝে দাঁড়িয়ে জ্যান্ত মনটাকে খুঁজে বেড়ায়, সিসিও কোকটাউনের ধোঁয়াটে যান্ত্রিকতার মাঝে দাঁড়িয়ে ঠিক সেই একক হৃদয়ের স্পন্দনকেই প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

নন্দিনী ও সিসি জুপের এই মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধের প্রধান শক্তি সরবরাহ করে তাদের পেছনে থাকা দুটি সমান্তরাল মুক্ত জগৎ—একদিকে রক্তকরবীর ‘পৌষের গান’ ও গ্রামীণ আবহ এবং অন্যদিকে সিসির ‘সার্কাসের মুক্ত পরিবেশ’। যক্ষপুরীর সুড়ঙ্গের নিচে যখন অন্ধকারের রাজত্ব, তখন নেপথ্য থেকে ভেসে আসা ‘পৌষের গান’ মনে করিয়ে দেয় মাটির ওপরের উন্মুক্ত আলো-হাওয়া ও ফসলের অকৃত্রিম আনন্দ-উৎসবের কথা। একইভাবে, কোকটাউনের কঠোর গাণিতিক শিক্ষার বিপরীতে ‘স্লিয়ারি’স সার্কাস’ মনে করিয়ে দেয় মানুষের মনস্তত্ত্বে কল্পনা ও বিস্ময়ের প্রয়োজনীয়তাকে। এই দুই জগতের মধ্যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক মিল এই যে, এরা উভয়ই যান্ত্রিক একঘেয়েমির বিরুদ্ধে প্রাণের স্বতঃস্ফূর্ত ছোঁয়া ধরে রাখে। নন্দিনী তার সমস্ত অবিনশ্বর প্রাণশক্তি সংগ্রহ করে যক্ষপুরীর বাইরের মুক্ত প্রকৃতি, ধানক্ষেত আর খঞ্জনা পাখির চপলতা থেকে। অন্যদিকে, সিসি জুপ কোকটাউনের বিষাক্ত পরিবেশেও নিজের নিষ্পাপ মানবিকতা বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে তার সার্কাস-লব্ধ শৈশবের মায়াবী স্মৃতির জোরে। তবে এদের মধ্যে সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক অমিলও বিদ্যমান। রবীন্দ্রনাথের ‘পৌষের গান’ ও গ্রামীণ আবহ সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির শাশ্বত ঋতুচক্র ও আধ্যাত্মিক মিলনের ওপর নির্ভরশীল, যা শেষ পর্যন্ত যক্ষপুরীর রাজাকেও মাটির আকর্ষণে টেনে আনে। অন্যদিকে, ডিকেন্সের সার্কাস হলো মানুষের তৈরি একটি পারফর্মিং আর্ট এবং সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্যুত একদল প্রান্তিক মানুষের আশ্রয়। সার্কাসের মালিক স্লিয়ারির ভাষায়—”মানুষকে কেবল কাজ করলেই চলে না, তাদের কিছুটা আমোদ-প্রমোদেরও প্রয়োজন আছে।” অর্থাৎ, রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি যেখানে সামষ্টিক আত্মিক মুক্তির গান গায়, ডিকেন্সের সার্কাস সেখানে যান্ত্রিক ক্লান্তির হাত থেকে বেঁচে থাকার একটি মনস্তাত্ত্বিক উপশম হিসেবে কাজ করে।

এই দুই চরিত্রের নারীত্বের বিকাশ প্রথাগত সমাজ-নির্ধারিত নারীত্বের ধারণাকে ছাপিয়ে যায়। তাদের নারীত্ব কেবল মাতৃত্ব বা সহধর্মিণীর পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা হয়ে ওঠে এক ধরণের নিরাময়কারী বা ধাত্রী সত্তা(Healing Persona)। কার্ল ইয়ুং-এর মনস্তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, এরা দুজনেই সমাজের অবদমিত সংবেদনশীলতার প্রতীক। নন্দিনীর নারীত্বের বিকাশ ঘটে তার ভালোবাসার মানুষ রঞ্জনের প্রতি একনিষ্ঠতায় এবং সেই ভালোবাসার আলো যক্ষপুরীর প্রতিটি শোষিত মানুষের মনে ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। সে তার রূপ বা যৌবনকে কোনো ভোগের সামগ্রী হতে দেয় না, বরং রক্তকরবীর মঞ্জরী দিয়ে সে যক্ষপুরীর মলিন ললাটে প্রাণের তিলক পরিয়ে দেয়। তার এই আত্মিক শক্তির সামনে এসে পরাক্রমশালী রাজাও নিজের ভেতরের একাকিত্ব ও হাহাকারকে আবিষ্কার করে। রাজা যখন নন্দিনীকে বলে যে সে নন্দিনীর মাঝের এই অবিনশ্বর প্রাণকে মুঠো ভরে পেতে চায়, তখন নন্দিনী তার শৃঙ্খল ভাঙার ডাক দিয়ে রাজাকে নিজের তৈরি অহংকারের দেয়াল ভাঙতে উদ্বুদ্ধ করে। অনুরূপভাবে, সিসি জুপের নারীত্বের বিকাশ ঘটে এক গভীর নীরব অথচ দীর্ঘস্থায়ী রূপান্তরের মধ্য দিয়ে। গ্র্যাডগ্রাইন্ডের নিজের মেয়ে লুইসা যখন অতিরিক্ত বাস্তববাদী ও অনুভূতিহীন শিক্ষার চাপে পড়ে নিজের জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়, তখন সিসি জুপই তার সেই মমতাময়ী ও সংবেদনশীল নারীত্ব নিয়ে লুইসার পাশে এসে দাঁড়ায়। যে সিসিকে একসময় বোকা বা অযোগ্য বলে অবহেলা করা হয়েছিল, সেই সিসির নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত গ্র্যাডগ্রাইন্ডের পাথুরে মনস্তত্ত্বকে গলিয়ে দেয়। উপন্যাসের শেষে গ্র্যাডগ্রাইন্ড যখন তার নিজের তৈরি দর্শনের অসারতা বুঝতে পেরে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন, তখন সিসি তার দিকে স্নেহের হাত বাড়িয়ে দেয়। নন্দিনী যেভাবে রাজাকে তার লোহার জাল ছিঁড়ে মুক্ত আলোয় বের করে আনে, সিসি জুপও ঠিক তেমনিভাবে গ্র্যাডগ্রাইন্ডকে তার তাত্ত্বিক অন্ধকারের খাঁচা থেকে বের করে এনে এক নতুন মানবিক জীবনের স্বাদ দেয়।

নন্দিনী এবং সিসি জুপ—উভয়েই নিজ নিজ সাহিত্যের আঙিনায় এক একটি আলোকবর্তিকা। সমাজকে দেখার ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার চেয়ে অনেক বেশি গভীর ও দূরদর্শী। তারা দুজনেই প্রমাণ করে যে, লোহার জাল বা কয়লার ধোঁয়ায় ঘেরা কারখানা—শৃঙ্খল বা শোষণের রূপটি যাই হোক না কেন, মানুষের ভেতরের সহজ, সরল ও সংবেদনশীল মনস্তত্ত্বের স্পর্শে তার পতন অনিবার্য। নন্দিনীর রক্তকরবীর লাল আভা আর সিসি জুপের সার্কাস-লব্ধ সহজ মানবিকতার সুর আসলে একই শাশ্বত জীবন-সঙ্গীতের দুটি ভিন্ন রাগ, যা যুগে যুগে যান্ত্রিক সভ্যতার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মানবাত্মার জয় ঘোষণা করে।

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য  শ্যামলকৃষ্ণ বসু ১ সুরধ্বনি রামধুন রাম না জন্মাতেই রামায়ণ। বিশ্ববিদিত এ প্রবচন। এ সেই ত্রেতা যুগের কাহিনী। দেবর্ষি নারদ একদিন তাঁর ঢেঁকি বাহনে

Read More »

পিগম্যালিয়ন

জর্জ বার্নার্ড শ অনুবাদ : অরিজিতা দাস ভূমিকা একজন ধ্বনিবিজ্ঞানের অধ্যাপক ‘পিগম্যালিয়ন’ নাটকটি পড়ার পর বোঝা যাবে এর জন্য কোনো ভূমিকার প্রয়োজন নেই, বরং এর জন্য

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য  শ্যামলকৃষ্ণ বসু ১ সুরধ্বনি রামধুন রাম না জন্মাতেই রামায়ণ। বিশ্ববিদিত এ প্রবচন। এ সেই ত্রেতা যুগের কাহিনী। দেবর্ষি নারদ একদিন তাঁর ঢেঁকি বাহনে

Read More »

পিগম্যালিয়ন

জর্জ বার্নার্ড শ অনুবাদ : অরিজিতা দাস ভূমিকা একজন ধ্বনিবিজ্ঞানের অধ্যাপক ‘পিগম্যালিয়ন’ নাটকটি পড়ার পর বোঝা যাবে এর জন্য কোনো ভূমিকার প্রয়োজন নেই, বরং এর জন্য

Read More »

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি

Read More »