সলিল সমাধি

সলিল সমাধি

[ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে নাজিরা মহাবিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।রাজীব বরা সাহিত্যের বিভিন্ন বিভাগে নিজ প্রতিভার পরিচয় দানে সমর্থ হয়েছেন।তিনি একাধারে কবি,সমালোচক,গল্পকার,ঔপন্যাসিক এবং প্রাবন্ধিক।বর্তমান অসমিয়া কবিতার জগতে রাজীব বরা একটি অতি সুপরিচিত নাম।কাব্যগ্রন্থগুলি যথাক্রমে ‘তটিনী তীরর খেলা’,’ঢেউ’,’মানুহ চেরাই বাচি থকা নাযায়’,’মাউরর দিন’,এই ফালেও কবি আছে’।মৌলিক প্রবন্ধ সংকলন ছাড়াও সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘চিন্তা-পরিক্রমা’,’অসমিয়া আরু কথা সাহিত্যর আভাস’ ইত্যাদি।আলোচ্য উপন্যাস ‘সলিল সমাধি’ (‘জলজাহ’)মাখন হাজরিকা স্মৃতি উপন্যাস পান্ডুলিপি প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয়। এছাড়াও শ্রীবরা বিভিন্ন পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ]

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ – বাসুদেব দাস

১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলার যমুনামুখে বাসুদেব দাসের জন্ম হয়।১৯৮২ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বে এম এ করেন। আজ পর্যন্ত অসমিয়া অনূদিত গল্পের সংখ্যা পাঁচশত পঞ্চাশটির ও বেশি।সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে নিয়মিত ভাবে অসমিয়া গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ এবং উপন্যাস অনুবাদ করে চলেছেন।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত সংস্থা NEINADএর পক্ষ থেকে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের জন্য Distinguished Life Membership এর দ্বারা সম্মানিত করা হয়।প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশটি।হোমেন বরগোহাঞির অসমিয়া উপন্যাস ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’(সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়) বাংলা অনুবাদের জন্য ২০২৪ সনের সাহিত্য আকাদেমি অনুবাদ পুরস্কারে সম্মানিত হন।


স্রোত না ঘড়িয়ালের দাঁত …
আঠিয়া কলার একটা ভেলার মতো ভেসে,পথ-ঘাট ভেঙ্গে যাওয়া স্রোতে পড়ে, ধানের ছড়ার ভাঁড়ারটা চোখের সামনে দিয়ে লুইতের উদ্দেশ্যে ভেসে গেল।তা দেখে ছটফট করতে করতে শাড়ি খসে পড়ে উলঙ্গ হয়ে যাওয়া নিজের বুকে সজোরে দুটো কিল বসিয়ে সোহাগী মূর্ছিত হয়ে পড়ল।
‘এই কে আছিস।ধর,ওকে ধর।চোখে-মাথায় জলের ছিটে দে।পথের পাশে ঘাসের ওপরে শুইয়ে দে।তাড়াতাড়ি কর।’
-গোড়া কেটে দেওয়া গাছের মতো জায়গাতেই গড়িয়ে পড়া সোহাগীর অচেতন দেহটা নিয়ে ছিন্ন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলি ব্যস্ত হয়ে পড়ল।তার অবস্থা দেখে বিলাপ করার সময় মানুষগুলি বুঝতেই পারল না;ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাওয়া রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা ঝাঁপ দিল—ঘূর্ণিপাক এবং স্রোতের বেগে ভেসে আসা ধানের ছড়ার ভাঁড়ারটার চালার দিকটাতে।
কে পড়ে গেল?কে জলে পড়ে গেল?রাস্তা ভেঙ্গে যাওয়া জলের স্রোতে কে ঝাঁপিয়ে পড়ল?ছিন্ন রাস্তার প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা উৎকণ্ঠিত মানুষেরা দেখতে পেল-ও দামোদর।সোহাগীর স্বামী দামোদর।এইমাত্র ছিন্ন-ভিন্ন রাস্তার পাশ দিয়ে ভেসে যাওয়া ধানের ভাঁড়ারটার মালিক দামোদর।
ঘটনাটা এত দ্রুত আর ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ঘটল যে লোকগুলি কিছু একটা বুঝে উঠার আগেই তীব্র স্রোতে ভেসে গিয়ে ভাঁড়ারটা বেশ খানিকটা দূরে সরে গেল।আর তার মধ্যে উঠে বিশাল জলস্রোতে ভেসে গেল দামোদর।
দামোদরের শরীরটা তখনও কাঁপছিল।যে কাঁপুনি সকালবেলা নৌকায় উঠে মাঠে আসার সময় তাকে কাঁপিয়ে ছিল।দুর্ঘটনাক্রমে জলে ডোবার পরেও আর জল থেকে উদ্ধার করার পরেও সেই কম্পন তাকে ছেড়ে যায় নি।অবশ্য কম্পনটা শরীরের বাইরের দিকে ছিল না,ভেতরের দিকের,গোপন গভীর-অন্তরাত্মাকে নাড়িয়ে দেওয়া।
পথের যে প্রান্তে অন্যান্য মানুষদের সঙ্গে দামোদর অস্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার থেকে প্রায় দুই কুড়ি নল দূরে থাকা তাঁর নিজের বাড়িটা,গোয়ালঘরটা এবং ভাঁড়ারটা আবছাভাবে দেখা যায়।বন্যার কবলে পড়ে ঘর-বাড়ি ছেড়ে এসে সকালের দিকে সে সপরিবারে রাস্তার ওপরে আশ্রয় নিয়েছিল।ভাঁড়ার আর গোয়ালঘরটা স্রোতের ধাক্কায় কাঁপতে দেখে সেই মানুষটা ভেতরে ভেতরে কাঁপছিল।সেটা স্রোত নয় যেন ঘড়িয়ালের দাঁত।
গ্রামটির পেছন দিক থেকে চেপে ধরা ব্রহ্মপুত্রের জল দামোদরের বাড়ির সামনের সরকারি রাস্তাটা ভোরবেলাতেই ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলেছে।প্রথমে ঝিরঝির করে জল গড়িয়ে আসা ছোট্ট গর্তটা দুপুরের মধ্যে বড়ো হয়ে গিয়েছিল।প্রাণের মমতায় অন্যান্য আত্মীয় স্বজনদের মতো বাড়ি-ঘর ছেড়ে এসে তাকেও রাস্তার উঁচু জায়গাটায় আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
বন্যার জল এবং স্রোতের চাপে কাঁপতে থাকা ঘরটা থেকে বেরিয়ে নৌকায় উঠে,তিন মেয়ের সঙ্গে নিজের পত্নীকে নিয়ে,ভাইয়ের সঙ্গে পথে এসে আশ্রয় নেওয়া কতটুকু সময় আর হয়েছে।তখনই তার চোখের সামনে দিয়ে স্রোতে ভাঁড়ারটা ভেসে এল।ভাঁড়ারটা হাতছাড়া হওয়া মানে দৈনন্দিন আহারের জোগাড়ে অসুবিধা।আহারের অভাবে পরিবারটা কীভাবে চলবে-কথাটা ভাবতে পারছে না,মাথা ঘুরতে থাকে।
বন্যায় ঘরের চাল ডুবে যাওয়া,স্রোতে কাঁপতে থাকা গোয়ালঘরটা ভেসে যাবার সময় সে নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে রেখেছিল।স্রোতের ধাক্কায় ভাঁড়ারটা কাঁপতে শুরু করার পর থেকে তার বুকের ভেতরের কম্পনটা বোধহয় মাঝে মধ্যে বেরিয়ে আসছিল।সেটা যেন সন্নিপাত জ্বরের আগের মুহূর্তের কম্পন,জীবনটাকে নিঃশেষ করে ফেলবে।
দামোদরের বাড়ির সামনের দিকে এবং ছিন্ন হয়ে যাওয়া পথের ঠিক সামনে গ্রামের নামঘরটা।নামঘরের মণিকূটের স্থাপনা ধ্যান করে কতবার যে সে হাতজোড় করেছিল।অদৃশ্য দেবতাকে ডেকেছিল।‘বাবা ব্রহ্মপুত্রের’ উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করেছিল।আউনী-আটি সত্রের পালানামের উদ্দেশ্যে মনে মনে প্রদীপ জ্বালিয়েছিল।তবে ফল ধরল না,তার প্রার্থনা কেউ শুনল না।
একসময়ে ভাঁড়ারের চালা দুটো ভেঙ্গে ধানের ছড়াগুলিগুলি উপড়ে পড়ল।
ভাঁড়ারটাতে তিনশোর মতো খোলা ধানের আঁটি মূঠা করে বেঁধে স্তরে স্তরে রাখা ছিল।সে রাস্তা থেকেই চালা দুটো ভাঁড়ারটাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়তে দেখল।ভাঁড়ারটা ভেসে যাবে না বলে তার মনে তখনও কিছুটা আশা ছিল।কারণ ভাঁড়ারের চাঙের খুঁটিগুলি ছিল বেশ শক্ত এবং মজবুত।
কিন্তু তার সেই আস্থাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে বন্যার জল ধীরে ধীরে চাঙটাকে ডুবিয়ে ফেলল।স্রোতের বেগ খুঁটির সঙ্গে থাকা চাঙের বাঁধন ছিন্ন করে ফেলল এবং ধানের সঙ্গে ভাঁড়ারটা একটা ভেলার মতো ভাসিয়ে আনল।চাঙের নিচে পেতে দেওয়া গোটা বাঁশের মজবুত খুঁটিগুলি ভাঁড়ারটিকে ভাসিয়ে রাখল।ভাঁড়ারটার সঙ্গে ভেসে গেল তার শ্রম,স্বপ্ন এবং বেঁচে থাকার সম্বল আহারাদি।
উচিত অনুচিত বিচার করার মতো দামোদরের সময় হল না।ভাঁড়ারটা রাখতে পারবে কিনা সেটা ভাবার মতো সময়ও সে পেল না।শুধুমাত্র ধানের অভাবে পরিবারের সম্ভাব্য বিপর্যয়ের কথা ভেবে ভাঁড়ারটাকে রক্ষা করার জন্য সে ব্যাকুল হয়ে উঠল।ছিন্ন রাস্তাটার মাঝখান দিয়ে তীব্র স্রোতে ভেসে যেতে থাকা ভাঁড়ারটার চালার দিকে কোন মুহূর্তে দামোদর ঝাঁপিয়ে পড়ল সেটা কেউ বুঝে উঠতেই পারল না।
সে যখন বুঝতে পারল তখন স্রোতে ভেসে যাওয়া ভাঁড়ার-ভেলাটা পথের পাশ থেকে সরে গিয়ে গভীর জলধির রূপ লাভ করা নদীর মাঝখানে গিয়ে পড়ল।
ভেলায় ভেসে যাওয়া বাবার উদ্দেশ্যে ওরাও যেন জলে ঝাঁপিয়ে পড়বে।কেউ কেউ মেজ বা ছোটো মেয়ের হাত খামচে ধরে রইল।মূর্ছে যাওয়া মায়ের দেহটা নিয়ে ব্যস্ত বড়ো মেয়েটি বাবার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে ,গর্জন করে চিৎকার করতে লাগল—
‘বাঁচাও,বাঁচাও।কে কোথায় আছ,বাবাকে বাঁচাও।মানুষটা ডুবে মরার আগে কেউ তাকে উদ্ধার করে আন।কাকা কোথায়?বুধিরাম কাকা,যা তো যা।বাবাকে তুলে আন…।’
বন্যায় ডুবে যাওয়া গ্রামের ঘরগুলি থেকে মানুষ-জন এবং নানা জিনিসপত্র বহন করে থাকা ছেলেগুলি এবং ছিন্ন রাস্তার দুপাশে ভিড় করে থাকা লোকগুলি যেন তখন আকস্মিকভাবে ঘটে যাওয়া ঘটনাটার ভয়াবহতা বুঝতে পারল।কী করবে কী না করবে ভেবে কেউ ছটফট করল,কেউ চিৎকার–চেঁচামিচি করল,কেউ অস্থির হয়ে উঠল,কেউ এদিকে ওদিকে এমনিতে দৌড় লাগাল।বন্যার কবলে পড়া মাজুলির আভ্যন্তরীণ ব্যাপার হলেও,মঝে মধ্যে বন্যায় পড়ে বিপর্যস্ত হতে হলেও ,সেদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পরিত্যক্ত গামটির মানুষগুলি যে ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে পুরোনো দিনের বন্যায় এই ধরনের নজির নেই।ছিন্ন রাস্তাটা যেন রাস্তা নয়,তারমধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া জলের ধারা যেন জল নয়।সেটা বাউল প্রেমিকের গতি-মাজুলির দক্ষিণপারের ব্রহ্মপুত্রের স্রোতের ধারা পথ ছিন্ন করে উত্তর পারের লুইত-খেরকটীয়াতে মিশে যাবার জন্য অনিরুদ্ধ গতি।
মাজুলির দক্ষিণ দিকটি সুরক্ষিত করে রাখা চুমৈ্মারীর বাঁধ ভেঙ্গে,দলে দলে কোনো বাধা না মেনে ব্রহ্মপুত্রের জল পেছন থেকে পরিত্যক্ত গ্রামটিকে ধাক্কা দিয়ে পথ ছিন্ন-ভিন্ন করে সামনের দিকে বেরিয়ে গেছে। গ্রামের পেছন দিকের জঙ্গলে স্রোত বহন করে আনা আবর্জনার স্তূপ।স্রোতস্বিনী জলের প্রচণ্ড ধাক্কা।
গ্রাম অতিক্রম করে সামনের দিকে বেরিয়ে যাওয়া জলের ধারাটা চরের নল-বিরিণার ঘাস বন ডুবিয়ে লুইতের বিস্তীর্ণ জলধারায় গিয়ে মিশেছে।সেদিকেও বন্যা।যেন সেটা অথৈ সাগর। আবছাভাবে দূরের সবুজ দেখা যায়।কোনোদিকে এরকম মনে হয় যেন আকাশের মধ্যে হারিয়ে গেছে সাগর সংকাশ নদীর ঠিকানা।
প্রায় দিগন্ত বিস্তৃত জলজ বিস্তৃতিতে ভেসে যাওয়া দামোদরের ভাঁড়ার-ভেলাটা চোখের আড়ালে চলে যাবার আগে পথের পাশে বেঁধে রাখা একটা নৌকার রশির গিঁট খুলে বুধিরাম চিৎকার করল—‘এই আয়,কে কে যাবি এগিয়ে আয়।’
বুধিরামের আহ্বানের প্রতি প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সময় নষ্ট না করে তিনটে শক্তসমর্থ মানুষ রশি খুলে দেওয়া নৌকাটায় লাফিয়ে উঠল।দাঁড়-বৈঠা,লগী এবং গুড়ি বৈঠার আঘাতে নৌকা এগিয়ে চলল।তাতে সেদিকে জলের ভাটা।তাই নৌকার গতি বেড়ে চলল।
পথে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলির চোখের আড়ালে চলে গিয়ে উদ্ধারকারী মাঝিরা ধীরে ধীরে দামোদরের কাছে এগিয়ে চলল।দামোদর ভেলার সঙ্গে দৃশ্যমান হয়ে উঠল।তবে ক্রমশ চোখে ধরা পড়া স্পষ্টতাকে ভেঙ্গানোর জন্য যেন মলিন আবহাওয়ার কম আলোর সঙ্গে সন্ধি করে সূর্যও অস্তে যাবার জন্য যত্ন করল।নৌকার গতির অনুরূপ অন্ধকারের গতিও ধারাল হয়ে এল।
প্রায় একটা চুরুট ফুঁকতে যতটুকু সময়ের প্রয়োজন ততটুকু ব্যবধান—প্রবল স্রোতে দামোদর উঠে যাওয়া ভাঁড়ার-ভেলাটা ভাসিয়ে নিয়ে যে জায়গায় পৌছাল সেটা গ্রীষ্মকালে দেখতে পাওয়া বিরিনা এবং নলখাগড়ার চর বলে সে অনুমান করতে পারল।বন্যায় ডুবে গিয়ে ততক্ষণে সেইসবের বেশিরভাগই জলের নিচে।আগে সেখানে নিয়মিত যাওয়া –আসা করতে থাকা পরিচিতির জন্যই দামোদর জায়গাটার আভাস পেয়েছে।চরে জল হয়তো দশ-বারো হাত গভীর হবে,নদীর মূল সুঁতিতে কতটা হবে সেটা আন্দাজ করা কঠিন।
গ্রামের সম্মুখের নতুন করে ছিন্ন হওয়া চরটা জলে ডুবে থাকা ধানের ভাঁড়ারটা থামানোর কোনো উপায় ছিল না।তার মধ্যে স্রোতের বেগ মূল ধারার চেয়ে কম যদিও সেটা কি কোথাও দাঁড় করানোর মতো জলের উপরে বেরিয়ে থাকা ঝোপঝাড় বা টঙ্গী ঘর ছিল না।
অসহায় ভাবে দামোদর আশেপাশে এবং দূরের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে দেখেছিল বুধিরামদের নৌকাটা ক্রমশ কাছে চলে আসছে যদিও গ্রামটা, পথটা, পথের উপরে থাকা গাই-গরু,মানুষ এবং অস্থায়ী চালাগুলি ক্রমান্বয়ে তার দৃষ্টি থেকে সরে যাচ্ছে।
মানে স্রোতের বেগে সে অনেক দূর চলে এসেছে। সে মাথা তুলে তাকাল– নিজের গ্রামটির বিপরীত দিকে, যেদিক থেকে সে ভেসে এসেছে সেদিকে সরে থাকতে চোখের দৃষ্টিতে ধরা না পড়া চরটা ধীরে ধীরে কাছে চলে আসছে।সেই চরটির একমাত্র গ্রামটি,গ্রামটির অর্ধেক পর্যন্ত জলে ডোবা সবুজ অরণ্যের কাছেও সে পৌঁছে গেছে।অবশ্য কম আলোর জন্য সেটাও স্পষ্ট না হয়ে যেন আবছা দেখাচ্ছে।
নদীমাতৃক জীবনের অভিজ্ঞতায় সে বুঝতে পারল– স্রোতের যে ধারায় সে ভেসে এসেছে সেটা চরের গ্রামটির পাশ দিয়ে গিয়ে খেরকটীয়াতে পড়েছে। খেরকটীয়া গিয়ে ব্রহ্মপুত্রে মিশেছে।এই গতিতে ভেসে গেলে তারও ব্রহ্মপুত্রে পড়াটা নির্ঘাত। ততক্ষণ পর্যন্ত ভাঁড়ারটা নিশ্চিহ্ন না হয়ে ভেসে থাকবে তো?আশা থাকলেও তার কাছে কোনো উত্তর ছিল না।
লুইত-খেরকটীয়া –মাজুলীর উত্তর পারে ব্রহ্মপুত্রের অন্য একটি শাখা। নদীর এই ধারাটিও তার অতি পরিচিত। তবে ভেলাটা ভেসে যাওয়ার সময় লুইতের পরিচিত সুঁতিটা তার অপরিচিত বলে মনে হল।সেই দিনের মতো বন্যায় তৈরি করা বিশাল সাগরে সে আগে কখনও পড়েনি।লুইতের আশেপাশের চরগুলিতে গ্রীষ্মকালে চাষ করা এবং বর্ষায় মাছের খোঁজে, ঘাসের খোঁজে নৌকা বেয়ে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা তার দীর্ঘদিনের। ওসব তো ঋতুকালীন এড়াতে না পারা কর্ম।এইসমস্ত জায়গায় সে অনেকবার এসেছে।সেই আসা-যাওয়ায় পরিকল্পনা থাকে।আজকেরটাতে নেই।এটা একটা দুর্ঘটনা।আর তার গতিও এখন তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।স্রোত যেখানে নিয়ে যায় সেখানে যেতে হবে।জলে ডোবালে ডুবতে হবে।মারতে চাইলে মরতে হবে।
ভরা নদী সাঁতরে পার হওয়ার জন্য তার চোখে পড়ার মতো আশে পাশে তীর নেই।তাই পরিবেশটা কেমন যেন কঠিন বলে মনে হচ্ছে।নাকি তার ভয় লাগছে সে বুঝতে পারছে না।তবে তার কাছাকাছি চলে আসা বুধিরামদের নৌকাটা দেখে দামোদর চিৎকার করল–তাড়াতাড়ি এসো।সজোরে নৌকাটা চালা।চরে কিছু একটা করতে হবে।লুইতের মুল স্রোতে পড়লে আর রক্ষা নেই।’
সে চিৎকার করে কথাগুলি বলার সময়ও ভাঁড়ারের চালের খড় খাবলে বের করে নেওয়া সুরুঙের ভেতর থেকে একটা দুটো করে ধানের ছড়ার মুঠি বের করে চালার ওপরে চাপিয়ে যাচ্ছিল।মাঝখানে একবার কোমরের কোঁচড়ের কাছে রাখা নলীয়া কাটার কটারিটা বের করে চালার গিঁট কেটেছিল।ঘরের টই বাঁধা ফালা বাঁশকে ছাড়িয়ে বৈঠা বানিয়ে ,ভাঁড়ারটাকে বেয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিল।
তার চেষ্টা দেখে নৌকায় যাওয়া উদ্ধারকারী দলের কলা নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো বলেছিল–তারমানে দামোদর আত্মঘাতী হওয়ার জন্য ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাওয়া রাস্তা থেকে জলে ঝাঁপ দেয় নি।ধানের মোহেই সে ভেসে চলা ভাঁড়ারটির উদ্দেশ্যে ঝাঁপ দিয়েছিল।’
ভেলা হয়ে ভেসে যাওয়া বড়ো ভাঁড়ারটা একটা ফালা বাঁশের বৈঠা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করাটা দামোদরের পক্ষে সম্ভব ছিল না।তাই চালাটার খড়ের মধ্য দিয়ে ফালা বাঁশটা ঢুকিয়ে চাঙ পার করে,চরের মাটিতে গুঁজে ,ভাঁড়ারটা স্থির রাখার সে চেষ্টা করছিল।কিন্তু সেটা সাধ্যাতীত ছিল।ফালা বাঁশটা মাঝখানে ভেঙ্গে গিয়েছিল,স্রোতের সঙ্গে ফালা বাঁশ নিয়ে যুদ্ধ করা যে অসম্ভব সেটা সে অসহায় হয়ে বুঝতে পেরেছিল।

( চলবে )

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য  শ্যামলকৃষ্ণ বসু ১ সুরধ্বনি রামধুন রাম না জন্মাতেই রামায়ণ। বিশ্ববিদিত এ প্রবচন। এ সেই ত্রেতা যুগের কাহিনী। দেবর্ষি নারদ একদিন তাঁর ঢেঁকি বাহনে

Read More »

পিগম্যালিয়ন

জর্জ বার্নার্ড শ অনুবাদ : অরিজিতা দাস ভূমিকা একজন ধ্বনিবিজ্ঞানের অধ্যাপক ‘পিগম্যালিয়ন’ নাটকটি পড়ার পর বোঝা যাবে এর জন্য কোনো ভূমিকার প্রয়োজন নেই, বরং এর জন্য

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য  শ্যামলকৃষ্ণ বসু ১ সুরধ্বনি রামধুন রাম না জন্মাতেই রামায়ণ। বিশ্ববিদিত এ প্রবচন। এ সেই ত্রেতা যুগের কাহিনী। দেবর্ষি নারদ একদিন তাঁর ঢেঁকি বাহনে

Read More »

পিগম্যালিয়ন

জর্জ বার্নার্ড শ অনুবাদ : অরিজিতা দাস ভূমিকা একজন ধ্বনিবিজ্ঞানের অধ্যাপক ‘পিগম্যালিয়ন’ নাটকটি পড়ার পর বোঝা যাবে এর জন্য কোনো ভূমিকার প্রয়োজন নেই, বরং এর জন্য

Read More »

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি

Read More »